শাইখুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক রহ. প্রতিষ্ঠিত

শাইখুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক রহ. প্রতিষ্ঠিত

বেকারত্ব যদি জঙ্গিতপরতার দিকে নিয়ে যায় তাহলে সোনার বাংলার এক কোটি বেকার এখন কী করছে?

মুহাম্মদ যাইনুল আবিদীন

গল্পটা আমাদের এই সোনার বাংলার। ২০০৮ সালের তথ্য মতে এদেশে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা প্রায় চার কোটি। আর এদের মধ্যে বেকারের সংখ্যা প্রায় এক কোটি বিশ লাখ। মজার বিষয় হলো এই বেকারদের মধ্যে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা প্রায় এক কোটি। অবশিষ্ট বিশ লাখ অশিক্ষিত বেকার। মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী এবং শিক্ষাবিদদের অগ্রপথিকদের পিলে চমকে দেওয়ার মতো তথ্য হলো‘দেশের শিক্ষাপ্রাপ্ত শিক্ষিত শ্রেণীর প্রায় সত্তর ভাগ বেকার। তাছাড়া শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি পায়নি এমন বেকারের সংখ্যাও অনেক।’ [তথ্য : মাধ্যমিক পৌরনীতিÑনমব দশম শ্রেণীর পাঠ্যপুস্তক’ শিরোনাম : বেকারত্ব]
তারপর এই বেকারত্বের গভীর গুহা থেকে বেরিয়ে আসার পথ হিসেবে ছয়টি উপায় নির্দেশ করা হয়েছে এই গ্রন্থে। সংক্ষেপে উপায় ছয়টি হলো
১। শিল্পের উন্নয়ন। শিল্পের উন্নয়ন ও প্রসার ঘটলে কলকারখানা গড়ে উঠবে। কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে।
২। কর্মসংস্থান বৃদ্ধি। গ্রামে গঞ্জে কুটিরশিল্প স্থাপন করে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করা যায়। তাছাড়া মাছের চাষ, হাঁস-মুরগির খামার, পশুপালন ও ফলের চাষ কর্মসংস্থান বাড়াতে পারে।
৩। জনশক্তির উন্নয়ন। হস্তশিল্প, কাঠের কাজ, বেতের কাজ, বাঁশের কাজ, মাছের চাষ, হাঁস-মুরগির খামার, পশুপালন সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ, লেদ মেশিন স্থাপন, ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ, হোটেল সংক্রান্ত ট্রেনিং, চুলকাটার ট্রেনিং, দর্জি, কলকারখানার কাজ, সেলসম্যানশীপ ইত্যাদি বিষয়ে প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশের বিপুল বেকারদের শ্রমশক্তিতে পরিণত করা যেতে পারে।
৪। সর্বজনীন শিক্ষা। বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা, বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রসার, আত্মকর্মসংস্থান সংক্রান্ত শিক্ষা, কর্মমুখী শিক্ষা ও উচ্চশিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে।
৫। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ। সরকার পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমকে জোরদার করে জনসংখ্যা বৃদ্ধি রোধ করতে সক্ষম হলে সহজেই বেকার সমস্যার সমাধান করা যাবে।
৬. গ্রামভিত্তিক উন্নয়ন কার্যক্রম। রাস্তা ঘাট, বৃক্ষরোপণ, হাট-বাজার উন্নয়ন, কুটিরশিল্প ও কৃষি খামার স্থাপন ইত্যাদি সংক্রান্ত কার্যক্রম হাতে নিলে আপনা থেকেই বেকারত্ব হ্রাস পাবে। [ঐ, পৃ. ১৩৪]
এ হলো নব ও দশম শ্রেণীর সরকারী পাঠ্যপুস্তকে প্রকাশিত বেকারত্ব সম্পর্কিত তথ্য ও উত্তরণের পন্থা। যে কোনো পাঠকই বলতে পারেন উল্লেখিত ছয়টি বেকারত্ব-উত্তরণের কোনটি এমন যার জন্যে কাড়ি কাড়ি পড়াশোনা দরকার। সন্দেহ নেই, বেকারত্ব থেকে বের হয়ে আসার যতোগুলো ‘কর্ম’ নির্দেশ করা হয়েছে সেগুলো অশিক্ষিতরাই ভালো পারবে। হয়তো প্রয়োজন হবে স্বাক্ষর জ্ঞান কোথাও বা প্রাথমিক শিক্ষার। তাই বলা যায় বিজ্ঞজনদের দেওয়া এই ফর্মূলা বাস্তবায়িত হলে বিশ লাখ অশিক্ষিত বেকারের ঘর কলঙ্কমুক্ত হবে। কিন্তু এক কোটি শিক্ষিত? রসিকতার বিষয় হলো বেকারত্ব ঘুচাবার কর্মসূচিতে আবার এই শিক্ষাকেও একটি উপায় হিসেবে ধরা হয়েছে ‘সর্বজনীন’ শিরোনামে। তাও বাধ্যতামূলক বৃত্তিমূলক এবং উচ্চশিক্ষার মতো ব্যাপার স্যাপার। কারণ এই ফর্মূলা শিক্ষিতদের প্রসব। শিক্ষার ‘লাজ’ রক্ষা করা আর কি!
বুঝতে কারোরই অসুবিধা হওয়ার কথা নয় বেঈমান ইংরেজদের দেওয়া হাতে ওঠার রঙিন তকমা ‘আধুনিকশিক্ষা’ এখন আমাদের গলার ফাঁস হয়ে দাঁড়িয়েছে। মূর্খ ছেলেটা বেকার হলে একটা সান্ত্বনা থাকে। ওর পেছনে কোনো ইনভেস্ট নেই। কিন্তু লাখ লাখ টাকা খরচ করে উচ্চশিক্ষা দানের পর যদি ছেলেটা বেকার হয়ে পরিবারের পিঠে চেপে বসে তখন একমাত্র ‘ফাঁসি’ ছাড়া এই ‘আপদ’ থেকে মুক্তির আর পথ থাকে কি? সেই সাথে ‘বৃত্তিমূলক’ ও ‘বাধ্যতামূলক’ বিদ্যার ঘোড়া চালিয়ে রাষ্ট্রের অবস্থা কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় তাও তো ভাববার বিষয়।

দুই.
রাষ্ট্রকে অবশেষে একথা ভাবতে হয়েছে। চার কোটি কর্মক্ষম মানুষের মধ্যে যখন এক কোটি ছাড়িয়ে যায় শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা তখন তো অবশ্যই সেই শিক্ষা নিয়ে ভাবতে হয়। অধিকন্তু সেই হার যখন ক্রমবর্ধমান। তাও প্রতি একশ’জন শিক্ষিতের মধ্যে যখন সত্তরজন বেকার। কী রক্ত হিম করা তথ্য!
দেশ ও জাতিকে এই ভার থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন একটি কৌশলপত্র প্রণয়ন করেছে এবং সরকারের হাতে তুলে দিয়েছে। এই কৌশলপত্রের সুপারিশ অনুযায়ী আগামী ২০ বছরের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত করার কথা বলা হয়েছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সব ধরনের ভর্তুকি তুলে নেওয়ার সুপারিশ করেছে এই কমিশন। মঞ্জুরি কমিশনের কৌশলপত্রে বলা হয়েছে ভর্তুকি তুলে নেওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিজস্ব অর্থায়নে চলতে হবে। নিজস্ব অর্থ কিভাবে আসবে তারও একটা ছক তুলে ধরা হয়েছে কৌশলপত্রে।
আলোচিত এই কৌশলপত্রের ১৩ পৃষ্ঠায় মানবিক ও বিজ্ঞান বিভাগ সম্পর্কে বলা হয়েছে ‘পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মানবিক ও বিজ্ঞান শাখা থেকে বের হওয়া ছাত্রদের বর্তমান চাকরির বাজারে ও বাস্তব জীবনে তেমন কোনো মূল্য নেই।’
এসব বিষয় থেকে পাশ করা উচ্চশিক্ষিায় শিক্ষিতদের যেহেতু চাকরি নেই, সেহেতু ওই বিষয়গুলোর প্রয়োজনীয়তাও শেষ হয়ে গেছে বলে মনে করেন কৌশলপত্রের নির্মাতারা। বিজ্ঞান ও মানবিক শিক্ষার বাজারমূল্য নেই। তাই বাজারমুখি উচ্চশিক্ষার বিষয়গুলোর প্রতি জোর দেওয়া হয়েছে কৌশলপত্রে।
কৌশলপত্রে সুপারিশকৃত বিষয় সম্পর্কে বলা হয়েছেÑ ‘তথ্য ও প্রযুক্তিবিদ্যা, ব্যবসা ও শিল্প বিষয়ে উচ্চশিক্ষার দ্বার খুলে গেছে। কিন্তু এই নতুন শিক্ষা খাতের তুলনায় মানবিক শাখার কোনো ভবিষ্যত নেই।’ মানবিক ও বিজ্ঞান শিক্ষার ভবিষ্যত না থাকায় কৌশলপত্রের অন্যত্র বলা হযেছে ‘মৌলিক বিজ্ঞান, সাহিত্য (বাংলা, ইংরেজি) দর্শন ইতিহাস ও ভাষাতত্ত্বের মতো মৌলিক বিষয়গুলো উচ্চশিক্ষা থেকে বাদ পড়ে যাবে।’
কী আশ্চর্য কথা! রবি ঠাকুর যে সাহিত্যে নোবেল এনে বাঙালির মাথা খাড়া করল সেই সাহিত্যটাই বাদ পড়ে যাবে উচ্চশিক্ষার ফর্দ থেকে? তারপর থাকবে না সাধের বিজ্ঞান! রুখে দাঁড়াবার শ্লোগান। নেমে এলো জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহসী শিক্ষার্থীরা। বিজ্ঞানময় ভঙ্গিতে জ্বালাও পোড়াও আন্দোলন। সরকার সরে এলো তার লক্ষ্য থেকে।
প্রধানমন্ত্রী মেনে নিলেন শিক্ষার্থীদের দাবি। শিক্ষার ভার আবার তুলে দিলেন ভারবহনে অভ্যস্ত হতভাগা বাঙালি জাতির কাঁধে। সেই ভার কেমন একজন তরুণের খেদোক্তি দেখুন! গত ১লা অক্টোবর ফেইসবুকের এক তরুণের স্ট্যাটাস ছিল এমন ২১ হাজার শিক্ষার্থীর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট ২০১১-১২ সালের জন্যে মাত্র ৩০ কোটি টাকা। যে দেশে ১লাখ ৬৩ হাজার কোটি টাকার বাজেট করা হয়, যে দেশে জ্বালানি খাতে বহুজাতিক কোম্পানিকে বছরে আড়াই হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেয়া হয়, যে দেশে সামরিক খাতের বাজেট এক বছরে ১০ হাজার ৯১৮ থেকে ১ হাজার ২১৬ কোটি টাকা বাড়িয়ে ১২ হাজার ১৩৪ কোটি টাকায় পরিণত করা হয়, সেই ২১ হাজার শিক্ষার্থীর জন্যে এক বছরে মাত্র ৩০ কোটি টাকা ব্যয় রাষ্ট্রের জন্যে কষ্টকরই বটে। [তথ্য: কালের কণ্ঠের সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন রাজনীতি: ৪ অক্টোবর ২০১১]
খেদ যথার্থ! ২১ হাজার ছাত্রের জন্যে বছরে মাত্র ৩০ কোটি টাকা! কিন্তু মঞ্জুরি কমিশনের কথা হলো দশ টাকাই হোক! টাকা খরচ করে কেউ সংকট কিনে আনে? তাও আবার শিক্ষিত বেকারের মতো সংকট! কথার পুরোটাই যুক্তি।
তিন.
এই যখন আমাদের পরাধীনতার আমলের কথিত আধুনিশিক্ষার হাল তখন আমাদের এক ‘মানিক’ অধ্যাপক একখানা ‘কেতাব’ রচনা করেছেন। রচনা তো নয় রীতিমতো নিষ্ঠুর গবেষণা। গবেষণার বিষয় মাদরাসাশিক্ষা। গবেষণায় নেতৃত্ব দিয়েছেন অর্থনীতিবিদ ড. আবুল বারাকাত। বইয়ের শিরোনাম : ‘পলিটিক্যাল ইকোনমি অব মাদ্রারাসা এডুকেশন ইন বাংলাদেশ।’ এর প্রকাশনা উৎসব অনুষ্ঠিত হয় গত ১লা অক্টোবর রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে। এই গবেষণায় দাবি করা হয়েছে দেশের প্রতি তিনজন শিক্ষার্থীর একজন মাদরাসায় পড়ে। মাদরাসা থেকে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের মাত্র ২ শতাংশ কর্মসংস্থানের সুযোগ পায়। ধীমান গবেষকগণ আরো দাবি করেছেন মাদরাসার শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের ৯২ শতাংশই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এর ৬৭ শতাংশ জড়িত বিএনপি জামায়াত ইসলামি শাসনতন্ত্র কিংবা খেলাফত মজলিসের সঙ্গে। অতঃপর তাদের মেধা সাধনা ও আদর্শকে ‘মারাত্মকভাবে’ প্রতিষ্ঠিত করার জন্যে সেই কথাটা বলেছেন যে কথাটা তাদের পূর্বসূরি বেঈমান বুদ্ধিজীবীরা বলেছেন বহুবার। কথাটা হলো‘তাদের একটি অংশ জঙ্গি তৎপরতায় লিপ্ত হয়।’ গবেষণার ফলাফলে বলা হয়েছে তাদের প্রাপ্ত তথ্য শিক্ষাব্যবস্থায় বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতা নির্দেশ করে। দরিদ্র-নি¤œবিত্ত ঘরের সন্তানদের সংখ্যা মাদরাসায় আনুপাতিক হারে বেশি। এটা নির্দেশ করে যে, রাষ্ট্র দরিদ্র ঘরের সন্তানদের মূলধারার শিক্ষায় আনতে ব্যর্থ হয়েছে। [সূত্র: কালের কণ্ঠ : ২ অক্টোবর ২০১১]
অনুষ্ঠানে উপস্থিত একমাত্র আলেম আলোচক মাওলানা ফরীদউদ্দীন মাসউদ বইটির মূল্যায়ন করতে গিয়ে বলেছেন ‘৯০ ভাগই ভাল হয়েছে আর ১০ ভাগে কলঙক রয়েছে।’ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বইটিতে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। [প্রাগুক্ত]
‘কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে’একথার মাধ্যমে সচেতন বিদ্বান মাত্রই জানেন গবেষণায় চাতুর্য একটা বড় অপরাধ। অথচ এই গবেষণা কর্মে সেই চাতুর্য স্পষ্ট। গবেষকগণ দাবি করেছেন ‘বাংলাদেশে এখন ১৪ হাজার ৫১৮টি আলিয়া মাদরাসা রয়েছে। এর বিপরীতে কওমী মাদরাসা সংখ্যা ৩৯ হাজার ৬১২টি।’ ভালো কথা! তাহলে ছাত্র সংখ্যাও বলুন! সেটা বলেননি। কারণ দাখেল পরীক্ষার্থী যদি আড়াই লাখ হয় তাহলে তার সমমান বাংলাদেশ কওমি মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড (বেফাক) এর মুতাওয়াসতিার পরীক্ষার্থী সংখ্যা হয় আড়াই হাজার। বেফাকের বাইরে অন্য সকল প্রতিষ্ঠান মিলে হয় তো আরো আড়াই হাজার। সুতরাং কোথায় পাঁচ হাজার আর কোথায় আড়াই লাখ। এই সংখ্যা সামনে রাখলেই বের হয়ে আসবে ‘প্রতি তিনজন শিক্ষার্থীর একজন মাদরাসায় পড়ে’ এর অর্থ কি? এরা কোন মাদরাসায় পড়ে? অংকের ফাঁকটা ধরা কোন মুসলমানের পক্ষে কঠিন হওযার কথা নয়। তাছাড়া কওমী মাদরাসাশিক্ষার সবচে’ বড় বোর্ড বেফাকের মাদরাসা সংখ্যা ২০০৯ সালের তথ্য মতে ১৬৭৯টি। সুতরাং সারা দেশে প্রায় চব্বিশ হাজার মাদরাসা কোথা থেকে আবিষ্কার করলেন ড. আবুল সাহেবরা তাও বলেননি। এই সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই স্কুলকে মাদরাসা বানিয়ে নাটক করা হয়েছিল। ড. আবুল সাহেবরা সেই ‘খাজানা’ থেকে তথ্য আনেননি তো? সন্দেহ হতেই পারে।
আরেকটু পরিষ্কার করি বিগত ৩২ বছরে সাতটি স্তরে বেফাক বোর্ডের অধীনে পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করেছে মাত্র ২৯৯৯০৫জন ছাত্র। যা শুধুমাত্র এক বছরের এসএসসি পরীক্ষার্থীর প্রায় তিন ভাগের এক ভাগ। এই হলো সর্বোচ্চ বোর্ডের ছাত্র সংখ্যা। এই সংখ্যাকে প্রতি তিনজনের একজনে এনে দাঁড় করানো কতোটা হাস্যকর এবং বিকৃত চরিত্রের পরিচায়ক তা আর বলতে হয় না।
আরেকটি বিষয় পরিষ্কার করে নিই। স্কুল এবং আলিয়া মাদরাসা বেঈমান দখলদার বৃটিশের সৃষ্টি এটা এ দেশের সচেতন নাগরিক মাত্রই জানেন। সুতরাং ‘মূলধারা’ বলতে যদি ব্রিটিশ-প্রসব’ বুঝানো হয়এবং এই হয়েতো বুঝাচ্ছেন তাহলে আলিয়া মাদরাসাকে মুসলমানদের দেড় হাজার বছরের ‘ধন’ কওমী মাদরাসার সাথে মিলিয়ে ফেলা এই গবেষণার একটি জঘন্যতম কলঙ্কময় দিক। এই কলঙ্ক প্রসব করতে একদল গবেষককে দীর্ঘ দিন ওম তাপ দিতে হয়েছে।
কিন্তু কেন এই কলঙ্কপূর্ণ গবেষণা! পাঠকের মনে হয় উত্তর জানা হয়ে গেছে। আমরা এই নিবন্ধের সূচনায় সরকারি পাঠ্যপুস্তকের বরাত দিয়ে উল্লেখ করেছি এই গুণধর ধীমান কৌশলদীপ্ত মান্যবর অধ্যাপক মহোদয়গণ এরই মধ্যে এক কোটি বেকার জন্ম দিয়েছেন যা রাষ্ট্রের মূল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর এক চতুর্থাংশ। যা রাষ্ট্রের পিঠকে বাঁকা করে ফেলেছে। সচেতন অভিভাবকদের মধ্যে খেদ ক্ষোভ ও হতাশা পুঞ্জীভূত হতে শুরু করেছে লাখ লাখ টাকা খরচ করে সন্তানদের এই শিক্ষায় শিক্ষিত করে কী পেয়েছি কী পাব? যার হরফে বাঁধানো প্রতিধ্বনি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের কৌশলপত্র। সময়ের বাস্তবতা, বিদ্বান বেকারের আদিগন্ত বিস্তৃত মিছিল, হা করা অভাব, অভিভাবকের আকাশ আকাশ স্বপ্ন, স্বপ্ন পূরণে শিক্ষা শক্তির ব্যর্থতা, পাছে উড়াল আশ্বাস, প্রতিষ্ঠানপক্ষের বরাবর বাগাড়ম্বরতাপুরো আধুনিক শিক্ষাকেই অস্তিত্বের সংকটে ফেলে দিয়েছে। মানুষ দেখছে শিক্ষিত বানানো মানেই বেকার বানানো! টাকা খরচ করে সন্তানকে প্রথমে ‘বেকার- বোঝা’ অতঃপর ‘করুণাপত্রে’ পরিণত করা অতি বেকার পক্ষে শোভনীয় নয়। আলোচ্য গবেষণার ভেতর দিয়ে গুণমান গবেষকগণ হয় তো দেখাতে চেয়েছেনÑ বেকার আমরাই বানাচ্ছি না। মাদরাসাগুলোও বেকার বানাচ্ছে। কিন্তু ভুল করেছেন সঙ্গে কওমী মাদরাসার নাম করে। শুধু আলিয়া মাদরাসাকে সঙ্গে নিয়ে কিছু কলঙ্ক হয়তো ওদের পিঠেও চাপানো যেতো। কারণ কওমী মাদরাসা সম্পূর্ণ জনগণের শরীর ও আত্মার আওতায় পরিচালিত।
এদেশের যারা মসজিদে যায় তারা জানে এখনো এদেশে যে পরিমাণ দীনদার আলেম প্রয়োজন কওমী মাদরাসা তা দিতে পারেনি। বেকার হওয়া পরের কথাপ্রয়োজনের ঘরই শূন্য পড়ে আছে। এই গবেষণার আরো কটি মোটা দাগের কলঙ্ক হলো কল্পিত ছক অনুযায়ী ছবি বানাতে গিয়ে এই গবেষকরা জানবারও সুযোগ পাননি জামায়াত আর কওমী মাদরাসা হলো সাপে নেউলের মতো। প্রসবিত গবেষণা হলে যা হয়! কওমী মাদরাসার ছাত্র-শিক্ষকদের পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে তাদের দুশমন জামায়াতের ঘরে। কী দুর্লভ আবিষ্কার। তাছাড়া মাদরাসায় যে কোন ‘কর্মকর্তা’ নেই সে তো যে কোন মুসলমানকে জিজ্ঞেস করলেই হতো। তাছাড়া দরিদ্ররাই যদি মাদরাসায় পড়তো তাহলে জগন্নাথের ছেলেরা কেন রাস্তায় নেমে গাড়ি ভাংচুর করল। বছরে ৩০ কোটি টাকায়ও যাদের শিক্ষা চলছে না তারা ধনী? খাঁটি মুসলমানের সন্তানরা মাদরাসাতেই পড়ে। এই তথ্যটা বোধ হয় গবেষণায় ধরা পড়েনি। ১০ ভাগ কলঙ্কের মধ্যে হয় তো এও ছিল।

অনুষ্ঠানে জাতীয় অধ্যাপক ড. সালাহ উদ্দিন আহমেদ বলেছেন ‘মাদরাসাশিক্ষা ব্যবস্থার প্রধান সীমাবদ্ধতা হলো, এ শিক্ষা পদ্ধতিতে নতুন জ্ঞান চর্চার সুযোগ নেই।’ সবিনয়ে বলি জনাব!
মাদরাসা ধর্ম শেখায়। ধর্ম নতুন হয় না। তাছাড়া নতুন জ্ঞান দিয়ে এক কোটি বেকার তৈরির পরও ওই বস্তুটার চাহিদা পূরণ হয়নি? আপনারা কি পুরো জাতিটাকেই বেকার বানাতে চান? আর জঙ্গি তৎপরতা সম্পর্কে বলব বেকারত্ব যদি জঙ্গিতপরতার দিকে নিয়ে যায় তাহলে আপনার গড়া এক কোটি বেকার এখন কী করছে বলবেন কি?

শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক। একটি হিমালয়ের নাম। যার উু চতা আকাশের মেঘমালা ঠেলে আরো বহুদূর ওঠে গেছে। দিগন্ত জোড়া এই সাদা-শুভ্র নামের বি¯তৃতি দেখে অবাক বিস্ময়ে চেয়ে আছে পৃথিবীর লক্ষ কোটি চোখ। এই নামের সুবিশাল বক্ষ বেয়ে জ্ঞান, প্রজ্ঞা আর বিপ্লবের শত-সহস্র নির্ঝরণীর অপ্রতিরোধ্য অবিরল ধারা যেদিকটাতেই বয়ে গেছে সবুজ-শ্যামলে তার দুই পাশ ভরিয়ে দিয়ে গেছে।

‘শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক’ এই নামের হিমালয়টি বাংলাদেশের হৃদয়ের অতল গহীন থেকে ওঠে এসে দশকের পর দশক ধরে যে সকল অন্যায়-অনাচার আর অপশক্তির বিক্ষুব্ধ ঝড়-ঝাঞ্ঝা এবং যে সকল প্রতিকূলতাকে ছিন্ন ভিন্ন করে দিয়ে বুক চিতিয়ে অনড়-অবিচল দাঁড়িয়ে আছে,সে ইতিহাস আমাদের অনেকের দেখা, অনেকের জানা। কিন্তু ইতিহাসের পেছনের আরেক ইতিহাস-কী করে খন্ড-খন্ড শিলা জমে এরূপ সুদৃঢ়, দীপ্তিময় মেঘ ছোঁয়া হিমালয়ের জন্ম তা আমাদের অধিকাংশেরই অজানা। সেই অজানার তৃঞ্চার্ত জিবে খানিকটা শীতলজল ঢেলে দেয়ার উদগ্র বাসনা নিয়ে এগিয়ে এসেছেন শায়খুল হাদিসেরই দৌহিত্র মাওলানা এহসানুল হক। রচনা করেছেন ‘ছেলেবেলায় শায়খুল হাদিস’ নামের অসাধারণ একগ্রন্থ। দৈনিক নয়া দিগন্তের সহ- সম্পাদক মাওলানা লিয়াকত আলীর সম্পাদনায় গ্রন্থটি পেয়েছে নতুন আবেগ,নতুন প্রাণ। নিজ থেকে আলোচনা-সমালোচনা করবো না। ঢাকা পল্টনের বাংলাদেশ ফটোজার্নালিষ্ট এসোসিয়েশন মিলনায়তনে ১৩ মে বৃহস্পতিবার বইটির মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দের গ্রন্থ সমালোচনা থেকে খন্ডবিশেষ তুলে ধরবো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর বিশিষ্ট কলামিস্ট, বুদ্ধিজীবি ড. মাহবুবুল্লাহ বিসমিল্লাহ দিয়ে শুরু করে নরম গলায় যা বললেন তা শুনে অনেকেই হয়ত চমকে ওঠবেন। চমকে ওঠলে ওঠুন-“বইটি আমি শুরু থেকে নিয়ে শেষ পর্যন্ত এক টানে পড়ে শেষ করেছি। বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি গুরু ত্বপূর্ণ অংশ এই বই” বইয়ের সাহিত্যগুণ, বর্ণনার আঙ্গিক ইত্যাদির বিবেচনা না করে যদি শুধু বিষয়বস্তুর প্রতি দৃষ্টিপাত করি তাহলেও ড.মাহবুবুল্লাহর মন্তব্যের যথার্থ ফুঠে ওঠে। কবি আব্দুল হাই শিকদার অন্য রকম এক হাসিতে সারা হল ঘরটা আলোকিত করে দিয়ে ডান হাতটা দু’গালে ঘষতে ঘষতে বলতে শুরু করলেন-”আমি ভাই চাচা-ছোলা মানুষ। আলোচনা করতে বলেছে বিশাল এক ব্যক্তি নিয়ে তাও আবার এতগুলো হংসের মাঝে আমি এক বককে! আমাদের ইসলামিক বইগুলোর প্রু ছদ, মুদ্রণ ইত্যাদি মানুষের দৃষ্টি কাড়ে না। কিন্তু ‘ ছেলেবেলায় শায়খুল হাদিস’ বইটির প্রু ছদ, মুদ্রণ,বাইন্ডিং অত্যন্ত রু চিশীল এবং নজরকাড়া। দেখলে ধরতে মন চায়।

পৃথিবীতে ভালকাজের সংখ্যা একেবারেই কমে গেছে। এখন আর আগের মত ফুল ফোটে না। পাখিরা গান গায় না। নদীরাও একে একে মরে যাুে ছ। এই অনুর্বর দেশে এমন একটি উর্বর বই শুভদ্বারের উন্মোচন ঘটাল।”

আমাদের কওমিঅঙ্গনের বাংলাসাহিত্যে অনেকটা পদ্মফুলের সাথে তুলনীয়, শক্তিমান লেখক কথাশি-ী মুহাম্মদ যাইনুল আবিদীন। তার বক্তব্য দিয়েই আমার লেখাটি শেষ করব।

তার সুদীর্ঘ সুললিত যুক্তিপূর্ণ আলোচনার অংশ বিশেষ এই – মাওলানা এহসানুল হক এই তরু ণ বয়সেই শায়খুল হাদিসের মত মহামনীষীকে নিয়ে এমন একটি বিষয়িগ্রন্থ রচনা করলেন যা অন্য সকল তরু ণদের অনুপ্রাণিত করবে। সাহস জোগাবে।

দ্বিতীয়ত, এই গ্রন্থ পাঠ করে যে কেউ তার আলোর বিভায় শায়খুল হাদিসের মত আকাশ বিশাল হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে জীবনের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যেতে পারেন। কারণ শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক সুদূর আকাশে মিটিমিটি করে জ্বলতে থাকা কোনো নক্ষত্র নয়। বরং ভোরের মস্ত বড় সাদা ফুলের মতো সবগুলো পাপড়ি মেলে দিয়ে আমাদের সমস্ত হৃদয় জুড়ে ফুটে আছেন। চাইলেই আমরা তার সৌরভে নিমজ্জিত হতে পারি।