আবদুল্লাহ মুকাররম
একটি ঘটনা মানুষের মুখে মুখে কথিত আছে। একজন অশিক্ষিত সচেতন পিতা বহু কষ্ট করে ছেলেকে উচ্চ শিক্ষিত বানান। লেখা-পড়া শেষে সে বড় চাকরিতে যোগ দেয় এবং স্বপরিবারে শহরে চাকরিস্থলেই থাকে। পিতা একদিন পিতৃøেহে ছেলে ও তার পরিবারের জন্য নিজ বাগানের মৌসুমি ফল ভর্তি বস্তা কাঁধে নিয়ে গ্রাম্য সাদাসিদা বেশে শিক্ষিত ছেলের বাসায় হঠাৎ গিয়ে হাজির হন। ছেলে তখন বন্ধুদের নিয়ে ড্রইং রুমে গল্পে মেতেছিল। আকস্মিক এমন ব্যক্তির আগমনে সবাই বিব্রত বোধ করে। বন্ধুদের কৌতূহলী প্রশ্নে ছেলে সারভেন্ট বলে যেন কোনো মতে আপন জাত-মান রক্ষা করেছে।
গত ১৯ ফেব্র“য়ারি সন্ধ্যায় বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল দশম বিশ্বকাপ ক্রিকেটের জমকালো উদ্বোধন। দেশের মাটিতে এতো বৃহৎ অনুষ্ঠান আয়োজনের সুযোগ পাওয়ায় দেশের মানুষের গর্বের শেষ নেই এবং আগ্রহেরও কমতি ছিল না কোনো অংশে। এমন বৃহৎ অনুষ্ঠানে বিশ্বমহলে নিজেদের ব্যাপক পরিচিতির পাশাপাশি আপন সৃংস্কৃতি ও ঐতিহ্য তুলে ধরার সুযোগ হয়। যে কোনো আয়োজক দেশ তা করেও থাকে। বাংলাদেশের দায়িত্বশীলরাও তা করার সবটুকু প্রয়াস চালিয়েছেন নিশ্চই। সেমতে স্মরণীয় সে অনুষ্ঠানে করেছিল চিত্তহারি রকমারি নানা আয়োজন। অনুষ্ঠানের শুরুতে বিশিষ্টজনদের ভাষণের পর আরম্ভ হয় মূলপর্ব। ক্রীড়াযজ্ঞের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের সনাতন ধারা মতে এ অনুষ্ঠানের বেশিরভাগ অংশজুড়েই ছিল নাচ-গান সাংস্কৃতিক সৌষ্টক লোকজ আনন্দ ও আতশবাজির বাহারি আয়োজন। বিশিষ্টজনদের বক্তৃতায় বাংলাদেশের যে সামান্য ইতিহাস তুলে ধরা হয় তার সূচনাই হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান থেকে। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে তার ও ক্ষমতাসীন দলের অবদানের যৎসামান্য ফিরিস্থি ও প্রশংসাবাণীই স্থান পায়।
আর গোল্ডেন বাংলাদেশ পর্বে বাংলাদেশের শিল্পীরা তাদের জনপ্রিয় গানের কয়েকটি কলি গেয়ে দর্শক মাতান। এ ছাড়া ৫২-এর ভাষা আন্দোলন ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহ্যবাহী ভাষণের সঙ্গে মহান মুক্তিযুদ্ধের গৌরবদীপ্ত কিছু ঐতিহ্য ওঠে আসে মাত্র। এই ছিল সে অনুষ্ঠানের সংক্ষিপ্ত বিবরণ।
তাহলে এবার পর্যালোচনা করে দেখা যেতে পারে বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের দায়িত্বশীলরা নিজেদের কিভাবে উপস্থাপন করেছেন। আপন জাতিসত্ত্বার কী পরিচয় দিয়েছেন। তাতে নিজেদের ঐতিহ্যই বা কী ফুটে ওঠেছে। দায়িত্বশীল মহল কি বলবেন জানি না। তবে ১৯৭১ সালে পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলাদেশের নতুন ছবি অংকিত হলেও বাঙালি জাতির ইতিহাস অনেক পুরোনো। তাদের আছে গর্বিত ঐতিহ্য ও বীরত্বগাঁথা অতীত। এ জাতির প্রকৃত ইতিহাস তুলে আনতে তাদের আরো পেছনে যাওয়ার প্রয়োজন ছিল।
পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশ বাংলাদেশ। বাংলাদেশের জলপথ বেয়ে সাহাবীদের দাওয়াতি কাফেলা এদেশে এসেছিল। পরবর্তীতে এ সিলসিলা অব্যাহত থাকে। দাওয়াতি মিশন নিয়ে অসংখ্য পীর মাশায়েখ, আউলিয়ায়ে কেরাম বঙ্গদেশে আগমন করেন। তাদের তেজদীপ্ত ঈমান নিঃস্বার্থ দাওয়াত ও আপোষহীন জিহাদি মনোভাবের সামনে বহু রাজা বাদশা নতিস্বীকার করেছে। সেই সব মহামনীষীদের অক্লান্ত প্ররিশ্রমের ফলেই আজ আমরা মুসলিম হয়ে গর্বিত। বাংলাদেশ দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্র। মসজিদের শহর ঢাকা। বৃটিশ কর্তৃক দীর্ঘ দু’শত বছর নির্যাতন, নিপীড়ন, শোষণ এবং ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও পরাধীনতার পর পীর-দরবেশ এবং আলেম ওলামার রক্তের সমুদ্র পাড়ি দিয়েই ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা এসেছিল।
১৯৭১ সালেও পাকিস্তানের জুলুম নির্যাতন ও শোষণ থেকে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। এ স্বাধীনাতার নেতৃত্বে ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তবে স্মরণ রাখতে হবে ১৯৪৭ সালের স্বাধীনতা ছিল জুলুম নির্যাতন শোষণের পাশাপাশি সংস্কৃতি ও ধর্মীয় স্বাধীনতাও। তাই ১৯৭১ এর স্বাধীনতার চেয়ে ১৯৪৭ এর স্বাধীনতার গুরুত্ব বেশি বৈ কম নয় বরং ১৯৪৭র পরবর্তী সুফলই ১৯৭১। সুতরাং এ জাতির অস্তিত্বের গোড়ায় আছেন পীর দরবেশগণ। আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যে তারা মিশে আছেন। এদেশের সর্বস্তরের জনতার হৃদয়রাজ্যে তাদের ভালবাসা শিকড় গেড়ে আছে। এ দেশের প্রথম পরিচয় শহীদ গাজির দেশ পীর আউলিয়াদের দেশ। এদেশ মুসলমানদের। এ জাতি এদেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের পরিচয়ে শুরুতেই মুসলিম ঐতিহ্য ফোটে ওঠা। পীর আউলিয়াদের ত্যাগ তিতীক্ষা জীবন ও কর্ম চিত্রায়িত হওয়াই যুক্তিযুক্ত। পর্যায়ক্রমে পরবর্তীদের কথাও আসবে যথাযথ মর্যাদায়।
কিন্তু সুকৌশলে সব এড়িয়ে যাবার বিষয়টি দেখে কথিত সেই ঘটনাটিই মনে পড়ে। তাহলে দায়িত্বশীলরা কি আপন পরিচয় ও ঐতিহ্য ধামাচাপা দিয়ে কোনো মতে জাত, মান রক্ষা করেছেন? আত্মপরিচয় ভুলে সংস্কৃতি ফেরি করে প্রভুদের খুশি করার প্রাণপণ চেষ্টায় হন্তদন্ত হয়ে ওঠেছেন? অনুষ্ঠান চলাকালে আজান বন্ধ না করে অনুষ্ঠানে খানিকটা বিরতি দিলে নিজস্ব স্বকীয়তাই ফোটে ওঠতো। শতকরা নব্বই ভাগ মুসলমানের দেশে এমনটাই কাম্য ছিল। অবস্থাদৃষ্টে সেই ইংরেজ বাবুদের কথাই মনে পড়ে, আমরা এমন ব্যবস্থা চালু করে যাচ্ছি যাতে তারা চামড়ায় ভিনদেশি হলেও মন মানসিকতায় হবে ইংরেজ। এসব কর্মকান্ড এ জাতির সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যর অশনি সংকেত বৈ কি? স্বাধীনতার বুলি সদা জপলেও তার অন্তরালে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে ১৭৫৭ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরাধীনতা। তবে স্মরণ রাখতে হবে, বিপদের সময় বাবুদরে আশির্বাদে তরী তীরে ভিড়ে না, বরং দৌড় ঝাপ শুরু হয় পীর দরবেশদের মাজার ও আলেমদের দরবারেই। নিজস্ব বেশভূষা ধারণ করে, দেশিয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যর কথা বলে ধর্মীয় বৈঠা নিয়েই তীরের সন্ধান করতে হয়। তবে আপন জাত, ধর্ম ও পূর্বসুরীদের ভুলে গিয়ে নতুন জারজ তুলিয়া ধরতে মরিয়া কেন?