শাইখুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক
নিখিল সৃষ্টির আদি ও গোড়া সম্পর্কে বৈজ্ঞানিকদের অনেক কথা আছে। বস্তুত সেসব কোনো তথ্য নয়; তা কিংবদন্তী কিছু উপকথা। এ তথ্যের উদঘাটন বৈজ্ঞানিকের সামর্থেরও উর্ধ্বে। কারণ, বৈজ্ঞানিক তো নিজেই অনেক পরবর্তী সৃষ্টির একজন। অতএব, এই তথ্য উদঘাটনে তার প্রচেষ্টা অন্ধের হাতড়ানি তুল্যই হবে। এ সম্পর্কে একমাত্র সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তায়ালা এবং তার ওহীপ্রাপ্ত প্রতিনিধি রাসূলের কথাই হবে সঠিক তথ্য এবং সেটাই হবে প্রামাণ্য ও গ্রহণযোগ্য।
কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘আল্লাহ তায়ালাই সৃষ্টি জগতকে প্রথমবারে (কোনো প্রকার উপাদান ব্যতিরেকে) সৃষ্টি করেছেন এবং তিনিই তাদেরকে মৃত্যুর পর পুনরায় জীবিত করবেন, যা তার পক্ষে খুবই সহজ।’
উপাদান ব্যতিরেকে বস্তু তৈরি করা অপেক্ষা বিকৃত বস্তুর পুনর্গঠন স্বাভাবিক জ্ঞানেই সহজ গণ্য হয়ে থাকে; অবশ্য আল্লাহ তায়ালার কাজে উভয় সমান সহজ। হযরত ইমরান ইবনে হুসাইন রা. বর্ণনা করেন, একদা আমি নবীজি সা. এর খিদমতে উপস্থিত হলাম এবং তাঁর ঘরের কাছেই আমার উট বেঁধে রাখলাম। ইতিমধ্যেই তাঁর কাছে বনু তামিম গোত্রের কয়েক ব্যক্তি (সাহায্যের জন্য) উপস্থিত হলো। রাসূলুল্লাহ সা. তাদেরকে বললেন, তোমরা সুসংবাদ গ্রহণ কর। তারা বলল, আরো অনেকবার সুসংবাদ দান করেছেন, এবার কিছু সাহায্য করুন। এ কথায় রাসূলুল্লাহ সা. অসন্তুষ্ট হলেন; তাঁর চেহারা মুবারক বিবর্ণ হয়ে গেল। অতঃপর সেই মজলিসে ইয়ামান দেশ থেকে কয়েকজন ব্যক্তি উপস্থিত হলো। রাসূল সা. তাদেরকে লক্ষ্য করে বললেন, ‘হে ইয়ামানবাসীরা! তোমরা সুসংবাদ গ্রহণ কর; বনু তামিমবাসী তো তা গ্রহণ করল না। ইয়ামানবাসীরা বললো, আমরা আপনার সুসংবাদ স্বাদরে গ্রহণ করলাম। তারা এও বললো, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা সৃষ্টির গোড়ার কথা জিজ্ঞেস করার জন্য আপনার খেদমতে হাজির হয়েছি। রাসূল সা. ইরশাদ করেন, ‘আদি থেকে একমাত্র আল্লাহ তায়ালাই ছিলেন, আল্লাহ তায়ালা ভিন্ন অন্য আর কিছু ছিল না। (প্রথমে তিনি পানি সৃষ্টি করলেন অতঃপর আরশ সৃষ্টি করলেন) তখন আরশ পানির ওপর ছিল এবং লাওহে-মাহফুজের মধ্যে তিনি (সৃষ্টি জগতের) সবকিছু লেখে দিলেন। অতঃপর (সে লেখা অনুপাতে সৃষ্টি করতে থাকলেন)। ইমরান রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. কেবল এতোটুকু বর্ণনা করেছেন। এমতাবস্থায় এক ব্যক্তি আমাকে ডেকে বলল, হে ইমরান! তোমার উট ছুটে গেছে, তাই আমি উটের তালাশে চলে গেলাম। হায়! তখন যদি আমি উটের পরওয়া না করে হযরতের বিবরণ শুনতাম তবে ভালো ছিল।
উল্লেখিত হাদিসের সঙ্গেই ইমাম বুখারী রহ. সনদসহ আরো একটি হাদিস উল্লেখ করেছেন, হযরত ওমর রা. বর্ণনা করেছেন। ‘একবার নবীজি সা. বিশেষ এত ভাষণ দেয়ার জন্য দাঁড়ালেন এবং সৃষ্টির আদি ইতিহাস থেকে আরম্ভ করে সেই ইতিহাসের সমাপ্তি বেহেশতীদের বেহেশতে প্রবেশ করা এবং দোযখীদের দোযখে প্রবেশ করা পর্যন্ত সমুদয় তথ্য ও বিবরণ আমাদের সম্মুখে প্রকাশ করলেন। তন্মধ্যে যে যতটুকু স্মরণ রাখতে সক্ষম হয়েছে ততটুকু স্মরণ রেখেছে।
আবু হুরাইরা রা. বলেন, রাসূল সা. বর্ণনা করেছেন, আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, আদমতনয় আমার গ্লানি করায় লিপ্ত অথচ আমার গ্লানি করা তার পক্ষে অতীব দোষনীয় এবং আমার সত্যতা স্বীকার করে না, এটাও তার জন্য মারাত্মক অন্যায়। আমার গ্লানি এই যে, সে বলে, আমার সন্তান আছে, সত্যতা অস্বীকার এই যে, সে বলে আল্লাহ প্রথমবার আমাকে সৃষ্টি করার ন্যায় পুনঃজীবিত করতে পারবেন না বা করবেন না।
মানবসহ সকল সৃষ্টির আদি কথা উল্লেখিত আয়াত ও হাদিসদ্বয়ে এ প্রমাণিত হয়, নিখিল সৃষ্টি, এমনকি মানবকেও প্রথমেই মাতৃ গর্ভে আল্লাহ তায়ালা তাদের নিজ নিজ সত্ত্বায় ও অবয়বে সৃষ্টি করেছেন ও করেন। অন্য কোনো বস্তু বা জীব রূপান্তরিত হয়ে এসব হয়নি বা হয় না।
আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সা. বর্ণনা করেন, আল্লাহ তা’য়ালা সৃষ্টি জগতের সৃষ্টিকার্য পূর্ণ করার পর তার লিখাপত্র (লৌহে মাহফুজ) যা তার তত্ত্বাবধানে মহান আরশের উপর সুরক্ষিত, তাতে লেখে দিয়েছেন যে, আমার রহমত আমার গজবের তুলনায় অধিক ও প্রবল আছে এবং থাকবে।’ এ হাদিসের বর্ণনার মর্ম সুস্পষ্ট যে, সৃষ্টি জগত আল্লাহ তা’য়ালা কর্তৃক সৃষ্টি করায় অস্তিত্ববান হয়েছে- তা স্বভাবগত (নেচারালী) এমনিতেই সৃষ্ট হয়নি।
বিশ্লেষণ : আল্লাহ তা’য়ালার রহমতের আধিক্য ও প্রাবল্যতার প্রতিক্রিয়া এই যে, অনেক ক্ষেত্রে বান্দা স্বীয় কাজে ও আমল দ্বারা রহমতের অধিকারী না হলেও আল্লাহর রহমত তার নিকটে পৌঁছাতে থাকে, পক্ষান্তরে বান্দা স্বীয় কার্যকলাপে অপরাধী সাব্যস্ত না হওয়া পর্যন্ত সে আল্লাহর গজবে পতিত হয় না। অনেক ক্ষেত্রে অতি সাধারণ নেকির ওসীলায় অশেষ পরিমাণে আল্লাহর রহমত লাভ করে থাকে, কিন্তু গজবের বেলায় সাধারণতঃ তেমনটি হয় না। এতদ্ভিন্ন এটাও তার প্রতিক্রিয়া যে, এক একটি নেক আমলের সওয়াব দশগুণ থেকে সাতশত গুণ পর্যন্ত প্রদান করেন। কিন্তু গোনাহের কাজে তা হয় না। নেক আমলের শুধু নিয়্যত করলেই ঐ কাজের সওয়াব লাভ হয়, পক্ষান্তরে গোনাহের কাজ করার বা দৃঢ় সংকল্পের পরে তার গোনাহ লেখা হয়, এটা তারই প্রতিক্রিয়া।
অবশ্য আইনের ধারা অনুসারে অপরাধের নির্দিষ্ট শাস্তি প্রদত্ত হবে তা কিন্তু ঐটার পরিপন্থী নয়; অপরাধের শাস্তি বস্তুতঃ আইনের ধারা অনুসারেই হয়ে থাকে। সুতরাং অপরাধ ও শাস্তি উভয়ের সময়-সমতার প্রশ্নই আসে না; চুরি, ডাকাতি, অগ্নিসংযোগ ইত্যাদি অপরাধ অল্প সময়েই সংঘটিত হয়ে থাকে কিন্তু তার শাস্তি তিন বৎসর ছয় বৎসর দশ বৎসর এমনকি কারো ক্ষেত্রে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডও হয়ে থাকে। অপরাধের ধারা অনুসারে শাস্তি প্রদত্ত হয়। সময়ের সমতা লক্ষ্য করা হয় না।
কুফরী ও আল্লাহদ্রোহিতার শাস্তি অনন্তকাল দোযখের আজাব ভোগ করা এ শাস্তিও আল্লাহ তা’য়ালা কর্তৃক নির্ধারিত আইনের ধারা অনুসারেই হবে। বিদ্রোহীদের শাস্তি ধারায় শিথিলতা প্রদর্শন করা অনুগতদের প্রতি অন্যায় অবিচার করার শামিল।
নভমণ্ডল ও ভূমণ্ডল উভয়েরই সংখ্যা সাত
পবিত্র কুরআনের কথা, ‘আল্লাহ সেই মহান সৃষ্টিকর্তা যিনি সাত আসমান সৃষ্টি করেছেন এবং জমিনও ঐ সংখ্যায় সৃষ্টি করেছেন।’
পবিত্র কুরআনের অসংখ্য স্থানে আসমান জমিন সম্পর্কে বিভিন্ন আলোচনা রয়েছে। তেমনিভাবে হাদীস শরীফেও ইরশাদ হয়েছে-
হাদীস : জমির সীমানা নিয়ে অন্য কিছু লোকের সঙ্গে হযরত আবু সালামা রা. তাবেয়ীর বিরোধ ছিল। তিনি হযরত আয়েশা রা. নিকট গিয়ে ঘটনা ব্যক্ত করলেন। তখন হযরত আয়েশা রা. বললেন, হে আবু সালামা! জমির ব্যাপারে সতর্ক থেকো; রাসূলুল্লাহ সা. এ সম্পর্কে ইরশাদ করেছেন- যে ব্যক্তি এক বিঘত পরিমাণ জমিও অন্যের ওপর জুলুম করে গ্রহণ করবে কিয়ামতের দিন সাত জমিনের প্রতিটি থেকে ঐ পরিমাণ জমি তার গলায় বেঁধে দেয়া হবে।’
উপরোক্ত হাদীস থেকে প্রমাণিত হয় যে, সপ্ত আসমানের ন্যায় জমিনও সাতটি।