মাওলানা আবুল ফাতাহ মুহাম্মদ ইয়াহইয়া
ইসলামই নারী উন্নয়ন ও নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রথম প্রবক্তা। কখনই এর বিপক্ষে নয়। নারী নির্যাতনের এক চরম সন্ধিক্ষনে দাঁড়িয়ে সারা বিশ্বের নির্যাতিত ও নিগৃহীত নারীর পক্ষে ইসলামই সর্বাগ্রে আওয়াজ বুলন্দ করেছে। জীবন্ত প্রোথিত হওয়ার আবহ থেকে, পন্য হিসাবে বাজারে বিক্রি হওয়ার পরিবেশ থেকে উঠিয়ে এনে নারীকে সম্মানের রাজাসনে ইসলামই সর্বপ্রথম অধিষ্ঠিত করেছে। সামাজিক সমূহনিগ্রহের অক্টোপাস থেকে মুক্ত করে নারীকে স্বাধীন জীবন উপভোগ করার সুযোগ করে দিয়েছে। নারীর মর্যাদাকে করেছে সমুন্নত। মাতৃত্বের গৌরবে বিভূষিত নারীদেহ যাতে যার তার লালসা ও লোলুপ দৃষ্টির শিকার না হয় সেজন্য পর্দার বিধান দিয়ে মানব-রূপী পশুদের দৃষ্টি সীমার অন্তরালে নিয়ে নারীকে করেছে দুর্লভ, মহামূল্যবান ও মহাসম্মানী। বিয়েতে মোহরের প্রথার প্রবর্তন করে নারীল মূল্য যে পুরুষের তুলনায় বেশি সে বিষয়টি পরিস্কার করে দিয়েছে। পারিবারিক অর্থযোগানের দায়-দায়িত্ব ও কায়িক কষ্টকর শ্রমের বোঝা নারীর উপর অর্পন না করে পুরুষের কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর নারীকে আগামী পৃথিবীর জন্য যোগ্য, আদর্শবান, সৎপরায়ন, ন্যায়নিষ্ঠ ও মমত্ববোধ সম্পন্ন নতুন প্রজন্ম গড়ে তোলার সর্বশ্রেষ্ঠ দায়িত্ব অর্পন করে তাকে মর্যাদার শীর্ষ বিন্দুতে পৌঁছিয়ে দিয়েছে। কোনরূপ আর্থিক ব্যয়ের দায়িত্ব নারীর উপর অর্পন না করেও পৈত্রিক উত্তরাধিকারে তাকে পুরুষের অর্ধেক প্রদান করে তার জীবনের অর্থনৈতিক ভিত্কে করা হয়েছে সুদৃঢ়। যাতে দুর্যোগের মোকাবেলা সে সহজেই করতে পারে। যৌথ জীবনে পুরুষকে তার অভিভাবক সাব্যস্ত করে সমস্ত জটিলতা ও দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত রেখে নারীকে দান করেছে উদ্বেগহীন এক আনন্দময় জীবন। বলতে গেলে ইসলাম নারীকে যে সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত করেছে তার চেয়ে বেশি সম্মান দেওয়া আদৌ সম্ভব নয়। পৃথিবীতে কেউ দেয়নি কোন কালে দিতে পারবেনা ।
বস্তুতঃ নারী-পুরুষের স্বভাব ও মেজাজ বিবেচনা করে ইসলাম কোনক্ষেত্রে নারীকে দায়িত্ব দিয়েছে কম পুরুষকে দিয়েছে বেশি। আর কোন ক্ষেত্রে পুরুষকে দায়িত্ব দিয়েছে কম নারীকে দিয়েছে বেশি। আবার-অধিকারের প্রশ্নেও কোন কোন ক্ষেত্রে পুরুষকে দেওয়া হয়েছে বেশি আর নারীকে দেওয়া হয়েছে কম বা নারীকে দেওয়া হয়েছে বেশি কিন্তু পুরুষকে দেওয়া হয়েছে কম। তবে এ ধরনের ক্ষেত্র খুব একটা বেশি নয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ইসলাম উভয়ের দায়িত্ব ও অধিকারে সাম্য বিধান করেছে । যেসব ক্ষেত্রে কাউকে বেশি ও কাউকে কম দেওয়া হয়েছে তার যুক্তিসঙ্গত কারন ব্যাখ্যা করে দিয়েছে ইসলাম। সামাজিক ভারসাম্য ও পারিবারিক বন্ধন অটুট রাখার জন্যই যে এরূপ করা হয়েছে তা বলা বাহুল্য। ইসলামের এই ভারসাম্য পূর্ণ নীতি অনুসরন করে দেড় হাজার বছর যাবত মুসলিম সমাজ নির্বিঘেœ পরম শান্তি ও শৃংখলার সাথে অতিবাহিত করে আসছে তাদের জীবন। কিন্তু পাশ্চাত্য নারী ইসলাম প্রদত্ত অধিকার থেকে বঞ্চিত থাকার কারণে ছিল চরম নিগ্রহের শিকার। সেই নিগৃহের যাতাকলে পিষ্ট হতে হতে একদিন তথাকার নারীরা বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। তারা তাদের অধিকারের দাবী নিয়ে রাজপথে অবর্তীন হয়। সেই আন্দোলন জোরদার হয়ে একদিন তা সমঅধিকারের দাবীতে পরিনত হয়। বস্তুত সেই প্রেক্ষাপটেই গৃহীত হয় “কনভেনশন অন দা এলিমিনেশন অব অলফর্ম অব ডিসক্রিমিনেশন এগেইনস্ট উইমেন্স” সংক্ষেপে (সিডও)। জাতিসংঘ এ সিডও সনদ জারি করতে চাইলে বিশ্বের অনেক দেশই তা মেনে নেয়নি। কেননা সেই সনদে নারীকে যেভাবে চিত্রায়ন করা হয়েছে তা স্থানীয় সংস্কৃতির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ করে বাস্তবায়ন করা সম্ভব ছিল না। অনেক মুসলিম দেশও তা মেনে নেয়নি। কেননা তার বহু ধারা ইসলামের সাথে ছিল সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। কেননা সিডও সনদের মূল বক্তব্য ছিল রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক সব ক্ষেত্রেই নারী ও পুরুষকে সমান করে ফেলা। আর এ লক্ষ্য বাস্তবায়নের দায়িত্ব রাষ্ট্র সমূহের ওপর অর্পণ করা হয়েছে। রাষ্ট্র এ দায়িত্ব বাস্তবায়নকল্পে পূর্বেকার আইনকানুন, ধর্মীয় বিধি-বিধান সংস্কার ও সংস্কৃতি সবকিছুকে পরিবর্তন করে নতুন করে আইনকানুন ও বিধি-বিধান তৈরী করবে। আসলে জাতিসংঘের মাধ্যমে এই নীতি সেই নীতি জারীর নামে ইসলামি সভ্যতার মূলোৎপাটনই পশ্চিমা দুনিয়ার উদ্দেশ্য। এক এক নীতির নামে তারা কিছু কিছু ইসলামি বিধানের মূলোৎপাটনের পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হয়। এভাবে এই নীতি সেই নীতি গেলানোর কৌশল করে। তারা ইসলামি সভ্যতার জড় কর্তনের কাজ এমন ভাবে করে যাচ্ছে তাতে একদিন ইসলামি সভ্যতা ও সংস্কৃতি, বিধান ও আইন কানুনের কিছুই পৃথিবীতে অবশিষ্ট না থাকে। মুসলিম সভ্যতা পৃথিবী থেকে চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে যায়। নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় মুসলিম জাতি। মুসলিম রাষ্ট্রের অপরিনামদর্শী শাসকরা তাদের প্রচারনায় বিভ্রান্ত হয়ে এবং আন্তর্জাতিক সাহায্য সুবিধার প্রলোভনে পড়ে সেসব উন্নয়ন ফর্মূলা নির্বিবাদে গলধ: করন করে থাকে। হায়রে দুর্ভাগা মুসলিম জাতি।
সিডও সনদও সেই পরিকল্পনারই অংশ। নারী উন্নয়নের শ্লোগানের মাঝ দিয়ে নারীর জন্য ইসলাম প্রদত্ত স্ট্রাকচারকে এতে সম্পূর্ন পাল্টিয়ে ফেলার কৌশল করা হয়েছে। এক্ষেত্রে ইসলামের প্রচলিত বিধি-বিধানকে পরিবর্তন করে নতুন বিধি-বিধান প্রনয়নের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানদেরকে। এমনকি প্রয়োজনে সংবিধানও পরিবর্তন করে ফেলতে বলা হয়েছে। তাদের উদ্দেশ্য যাই হোক শ্লোগানটি গ্রহন করা হয়েছে বড়ই চিত্তাকর্ষক, মোহনীয়, নারী নির্যাতন রোধ, নারী উন্নয়ন ও সকল ক্ষেত্রে নারীর সমঅধিকার নিশ্চিত করণের নামে এই শ্লোগানে কেবল নারীরা খুশি হবে তাই নয় পুরুষরাও মানবতা বোধের তাড়নায় এই শ্লোগানের সাথে একাত্ম হয়ে যাবে। কিন্তু ইসলাম নির্মূলের কৌশলগুলোর প্রতি সহজে কারো নজর পড়বে না। বিভিন্ন সচেতন মুসলিম দেশ সিডও সনদের কিছু কিছু ধারার ব্যাপারে গুরুতর আপত্তি জানিয়েছে, যেমন- তুরস্ক, মালয়েশিয়া, আলজেরিয়া, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, মরক্কো, মিশর, লিবিয়া, লেবানন। বাংলাদেশও প্রথমে ২.১৩,১৬ ধারায় আপত্তি জানিয়েছিল। কিন্তু বর্তমান সরকার সেসব আপত্তি প্রত্যাহার করে নিয়ে সিডও পরিপূর্ণ বাস্তবায়নের পক্ষে স্বাক্ষর করে এসেছে। অনেক অমুসলিম দেশও সিডও সনদ তাদের সামাজিক কোড ও সাংস্কৃতিক ভাবধারার সাথে অসংগতিপূর্ন বলে আপত্তি জানিয়েছে। যেমন- যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, রাশিয়া, সুইজারল্যান্ড, আর্জেন্টিনা, অষ্ট্রেলিয়া, ইসরাইল, লুক্সেমবার্গ, অষ্ট্রিয়া, বেলারুশ, ব্রাজিল, বেলজিয়াম, বুলগেরিয়া, কানাডা, চিন, চিলি, হাংগেরী, ভারত, আয়ারল্যান্ড, ইতালী, মেক্সিকো, মোঙ্গলিয়া, মিয়ানমার, নিউজিল্যান্ড, পোল্যান্ড, কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, স্পেন, থাইল্যান্ড, ভেনিজুয়েলা, ডেনমার্ক, গ্রিস, লাটভিয়া, নরওয়ে, পর্তুগাল, রুমানিয়া, সুইডেন। এসব দেশগুলোর অনেক রাষ্ট্রই আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। যেমন- যুক্তরাজ্য, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড, ইতালি, ফ্রান্স, অষ্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ইত্যাদি। মুসলিম দেশগুলোর পক্ষ থেকে যেসব ধারার উপর আপত্তি জানানো হয়েছে সেগুলো হল- ২, ৩, ৯, ১৩ এবং ১৬নং ধারা। এই ধারা গুলোর বক্তব্য আমরা হুবহু উদ্বৃত করছি।
২নং ধারায় বলা হয়েছে- নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্যের প্রতি নিন্দা জানিয়েছে সনদে স্বাক্ষরকারী দেশগুলো। নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য দূর করতে তারা নিজ নিজ দেশে প্রয়োজনীয় আইন তৈরীর ঘোষনা দিচ্ছে। সংবিধানে সমঅধিকারের ঘোষনা না থাকলে সমঅধিকারের নিশ্চয়তা দিয়ে সংবিধান নতুন করে প্রণয়ন করবে। নারীর প্রতি বৈষম্য মূলক সব আইন কানুন ও বিধি-বিধান বিলোপ করবে।
৩নং ধারায় বলা হয়েছে- রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সব ক্ষেত্রেই পুরুষের পাশাপাশি নারীর সমান অধিকার নিশ্চিত করবে রাষ্ট্র।
১৩নং ধারায় বলা হয়েছে- অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনের সবক্ষেত্রে নারীর প্রতি সব বৈষম্য দূর করে সমতার ভিত্তিতে নারী ও পুরুষের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠায় রাষ্ট্র পদক্ষেপ গ্রহন করবে। এ অধিকারের মাঝে পারিবারিক সুযোগ সুবিধা ও ব্যাংক লোনও অর্ন্তভুক্ত রয়েছে।
১৬নং ধারায় বলা হয়েছে- বিয়ে এবং পারিবারিক সম্পর্কসহ সব বিষয়ে নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য দূর করতে রাষ্ট্র পদক্ষেপ নেবে এবং এসব ক্ষেত্রে নারী পুরুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করবে।
১৬.ক – বিবাহিত জীবনে প্রবেশের ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের সমান অধিকার থাকবে।
১৬. খ- বিয়ে এবং তালাকের ক্ষেত্রে নারী পুরুষের সমান অধিকার ও সমান দায়-দায়িত্ব থাকবে।
১৬.চ- শিশু লালন পালনের ক্ষেত্রে নারী পুরুষের সমান অধিকার ও সমান দায় দায়িত্ব থাকবে।
আলজেরিয়া সিডও সনদের ২,৯,১৫, ১৬, ও ২৯নং ধারার উপর আপত্তি জানিয়ে বলেছে যে, সিডও সনদের এসব ধারার আলজেরিয়ান ন্যাশনাল কোড ও আলজেরিয়ান ফ্যামেলি কোডের সাথে সাংঘর্ষিক। ১৫নং ধারার সমালোচনা করে বলা হয়েছে যে, সবক্ষেত্রে নারী পুরুষের সমান অধিকার প্রদান করা তাদের ফ্যামেলি কোড বিরোধী। তারা এটি মানতে বাধ্য নয়। অন্যান্য মুসলিম দেশও প্রায় একই মর্মে প্রতিবাদ জানিয়েছে। বাংলাদেশও এই ধারাগুলোর ব্যাপারে আপত্তি জানিয়েছিল। এতে পরিস্কার হয়ে যায় যে এই ধারাগুলো যে, ইসলামি আইন ও মুসলিম সংস্কৃতির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয় এই উপলব্ধি বাংলাদেশ সরকারেরও আছে। তার পরও কোন স্বার্থে বর্তমান সরকার আপত্তি প্রত্যাহার করে নিল। ইসলাম প্রিয় ৯০% নাগরিকের আজ সেটিই জিজ্ঞাসা।
বর্তমান সরকার নারী উন্নয়ন নীতিমালার নামে যে খসড়া প্রণয়ন করেছে তা সিডও বাস্তবায়নের অঙ্গিকারেরই একটি কৌশলপত্র। সিডও সনদের ধারা সমূহের হুবহু প্রতিধ্বনি করা হয়েছে নারী উন্নয়ন নীতিমালা-২০১১ এর খসড়ায়। তারপরও প্রধানমন্ত্রীসহ বিভিন্ন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রীরা বলছেন নারী উন্নয়ন নীতিমালায় ইসলাম বিরোধী কোন কিছু নেই। অথচ দেশের বিজ্ঞ আলেম উলামা ও ইসলামী বিশেষজ্ঞরা বলছেন নারী উন্নয়ন নীতিমালা কুরআন সুন্নাহ ও ইসলামী শরীয়তের সাথে সাংঘর্ষিক। তথ্য ভিত্তিক পর্যালোচনার মাধ্যমেই বিতর্কের নিরসন হওয়া উচিৎ।
বর্তমান নারী উন্নয়ন নীতিমালা বিগত ৭ইমার্চ মন্ত্রী সভায় অনুমোদিত হয়। অনুমোদনের পর বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) পরিবেশিত খবরে বলা হয় “ভূমিসহ সম্পদ, সম্পত্তি ও উত্তরাধিকারে নারীর সমান অধিকারের স্বীকৃতি দিয়ে নারী উন্নয়ন নীতি ২০১১ এর খসড়া অনুমোদন করেছে মন্ত্রীসভা। মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী বলেন “জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি ২০১১ অনুমোদন করেছে মন্ত্রীসভা। এটি কার্যকর করার জন্য কোন আইন করা হবে না। নতুন নীতিতে উত্তরাধিকারসহ উপার্জন ও বাজার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অর্জিত সম্পদে নারীকে পূর্ন নিয়ন্ত্রন অধিকার দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে উত্তরাধিকার সম্পদে নারীর সমঅধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। কালের কন্ঠ ৮ই মার্চ ২০১১। বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে যে, ৭ই মার্চ যে খসড়াটি অনুমোদন লাভ করেছিল তার ২৫.২ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছিল যে, “ভূমিসহ সম্পদ সম্পত্তি এবং উত্তরাধিকারে নারীর সমান অধিকার থাকবে”। ৮ই মার্চ এই বক্তব্যটি বিভিন্ন দৈনিকে প্রকাশিতও হয়েছিল। মন্ত্রনালয়ের এক কর্মকর্তার সূত্রে জানাগেছে যে সর্ব মহলের প্রতিবাদের প্রেক্ষিতে ধারাটিতে সামান্য ঘষামাজা করা হয় এবং উত্তরাধিকারে নারীর সমান অধিকার থাকবে এর স্থলে উপার্জন, উত্তরাধিকার, ঋণ, ভূমি ও বাজার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অর্জিত সম্পদের ক্ষেত্রে নারীর পূর্ননিয়ন্ত্রনাধিকার থাকবে- এরূপ উল্লেখ করা হয়। (নয়া দিগন্ত ১১ই মার্চ-২০১১) এতটুকু সংস্কারের পরই সরকারী মহল থেকে জোরে শোরে বলা হতে থাকে যে নারী উন্নয়ন নীতিমালায় ইসলাম বিরোধী কিছু নেই। মন্ত্রী প্রতিমন্ত্রী এমনকি প্রধানমন্ত্রীও বেশ জোরের সাথেই একথা দাবী করে চলেছেন।
এদেশের বিজ্ঞ উলামায়ে কেরাম খসড়া নারী নীতিটি গভীর মনোযোগসহ অধ্যয়ন করেছে এবং ইসলামের সাথে সঙ্গতি অসঙ্গতির বিষয়টি পর্যবেক্ষন করছে। আলেমদের দৃষ্টিতে নারী উন্নয়ন নীতিমালায় ঘষামাঝার পরও থেকে যাওয়া সমস্যাগুলো এবং ইসলামের সাথে তথা কুরআন সুন্নাহর সাথে সাংঘর্ষিক বিষয়গুলো নিুরূপ
১. এই নীতিমালা সিডও সনদ বাস্তবায়নের অঙ্গিকারে কৌশল হিসাবে প্রনয়ন করা হয়েছে। সিডও সনদের ২,৩,৯,১৩,১৬ ধারায় ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিকতা মুসলিম রাষ্ট্রগুলো কর্তৃক স্বীকৃত। যার কথাপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে অথচ নারী নীতিতে সিডও বাস্তবায়নের অঙ্গিকার স্পষ্ট ভাষায় বারবার ব্যক্ত করা হয়েছে। (দ্রষ্টব্য নারী উন্নয়ন নীতিমালা ৪নং ধারার শেষ প্যারা ৪.১, ১৭.২।
২. এই নীতি মালায় সিডও এরই প্রতিধ্বনি করা হয়েছে মাত্র। সিডও সনদে নারীকে উপস্থাপন করা হয়েছে ইউরোপিয় জীবনধারা ও সংস্কৃতির আলোকে। ফলে এই নীতিমালায় মুসলিম নারীর জীবনধারা ও ইসলামী সংস্কৃতির মোটেই প্রতিফলন ঘটেনি। যে কারনে এই নীতিমালা ৯০% মুসলমানের দেশের জীবনাচারের সাথে সঙ্গতি পূর্ণ নয়। আমাদের বিশ্বাস এই নীতিমালার মাধ্যমে মুসলমানদেরকে মুসলিম সংস্কৃতি বর্জন করে ইউরোপিয় সংস্কৃতি অবলম্বনে বাধ্য করার নীরব কৌশল অবলম্বন করা হয়েছে।
৩. ইসলাম নারী উন্নয়ন ও নারী অধিকারের সর্বোচ্চ প্রবক্তা হলেও এবং নারী নির্যাতনের রোধে সর্বাধিক বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করলেও পুরুষপ্রধান সমাজব্যবস্থার সপক্ষে। পরামর্শের সকল পর্যায়ে নারীকে সমঅধিকার প্রদান করলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অধিকার পুরুষকেই প্রদান করা হয়েছে। আল কুরআনে এই মর্মে স্পষ্টতই উল্লেখ আছে যে,
‘নারীদেরও ন্যায়সঙ্গত অধিকার ও দায় দায়িত্ব রয়েছে পুরুষের প্রতি যেমন পুরুষের রয়েছে নারীদের ওপর তবে পুরুষের নারীদের উপর একপর্যায়ের প্রাধান্য রয়েছে। আল্লাহ পরাক্রমশালী ও বিজ্ঞানময়।’ (সূরা-২ বাকারা আয়াত ২২৮)
আরো ইরশাদ হয়েছে –
‘পুরুষগণ নারীদের ওপর কর্তৃত্বশীল হবে। যেহেতু আল্লাহ তাদের কতিপয়কে কতিপয়ের ওপর মর্যাদাবান করেছেন। আর এজন্যও যে পুরুষরা নারীদের জন্য তাদের অর্থ সম্পদ ব্যয় করে।’ (সূরা নিসা, আয়াত ৩৪)
বুখারী ও মুসলিম শরীফের এক হাদীসে রাসূল সা. ইরশাদ করেছেন –
শুন! তোমরা সবাই (কোন না কোন পর্যায়ে) দায়িত্বশীল। তোমাদের প্রত্যেকেই আপন দায়িত্বাধীন বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। ইমাম বা রাষ্ট্রপ্রধান দায়িত্বশীল, সে জিজ্ঞাসিত হবে আপন দায়িত্বাধীন নাগরিকদের ব্যাপারে। পুরুষ আপন স্ত্রী পরিজনের দায়িত্বশীল, সে জিজ্ঞাসিত হবে আপন দায়িত্বাধীনদের ব্যাপারে, রমনী দায়িত্বশীল তার স্বামীর ঘর সংসারের। সে জিজ্ঞাসিত হবে আপন দায়িত্বাধীন বিষয়ে। বুখারী, খন্ড-২, পৃষ্ঠা ১০৫৭ মুসলিম খন্ড-২, পৃঃ ১২২।
এই হাদীস থেকেও পরিস্কার ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে নারীর তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব পুরুষের।
সুতরাং, কর্তৃত্বের প্রশ্নে নারীকে সমানাধিকার প্রদান করা হলে তা হবে সম্পূর্ণ কুরআন সুন্নাহর পরিপন্থী। অথচ নারী উন্নয়ন নীতিমালার বিভিন্ন ধারায় তা সুষ্পষ্টই উল্লেখ করা হয়েছে। দ্রষ্টব্য ১৯.৯, ৩২.৯, ৩৩.৭ নারী উন্নয়ন নীতিমালা-২০১১
৪. নারী উন্নয়ন নীতিমালা যেহেতু ইউরোপিয় নারীর কল্পচিত্রকে সামনে রেখে প্রনীত হয়েছে অতএব নীতিমালাটি প্রনয়নের ক্ষেত্রে ইসলামের অলঙ্ঘনীয় বিধান পর্দার বিষয়টির প্রতি মোটেও লক্ষ্য রাখা হয়নি। ফলে এর অধিকাংশ ধারা পর্দার বিধান লংঘন না করে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না। ফলে উন্নয়ন পরিকল্পনা হিসাবে উপস্থাপিত বিষয়গুলোর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কুরআনের বিরুদ্ধাচরন প্রকাশ পেয়েছে এবং পর্দার বিধান লংঘন হওয়ার কারনে তা কুরআন বিরোধী বলে প্রতিপন্ন হয়েছে।
৫. ইসলাম মূলতঃ নারী পুরুষের পারষ্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে যে সৌহার্দ্যপূর্ণ পারিবারিক জীবন গড়ে তুলতে চেয়েছে নারীনীতি বাস্তবায়ন হলে তা সম্পূর্ণ রূপে ধ্বংস হয়ে যাবে। অধিকারের টানাটানিতে পারিবারিক জীবন এর সংঘাতময় কুরুক্ষেত্রে পরিনত হবে। পারিবারিক সৌহার্দ্য শেষ হয়ে যাবে। যা এখন ইউরোপের সমাজ ব্যবস্থায় নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাড়িয়েছে। সুতরাং এদিক থেকে এই নীতিমালা ইসলামের পারিবারিক নীতির সাথে সাংঘর্ষিক।
৬. ইসলাম পৈত্রিক উত্তরাধিকারে নারীকে পুরুষের তুলনায় অর্ধেক প্রদান করেছে। এই বিধান সূরা নিসার ১১নং আয়াতে সুষ্পষ্টভাবে বিবৃত হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে-
আল্লাহ তোমাদের সন্তানদের (উত্তরাধিকার প্রাপ্তির) ব্যাপারে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, পুত্র সন্তান পাবে দুই কন্যাসন্তানের সমান। এ হল আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত বিধান। আল্লাহ সর্বজ্ঞাতা ও প্রজ্ঞাময়। সুরাঃ ৪ নিসাঃ আয়াতঃ১১
সুতরাং উত্তরাধিকারে যদি নারীকে পুরুষের সমান অংশ প্রদানের সুযোগ রাখা হয় তাহলে এটি হবে সুষ্পষ্ট কুরআন বিরোধী।
কিন্তু সরকার মুখে বলছে যে, কুরআন বিরোধী কোন বিষয় নারী নীতিতে নেই। সরকারের এই বক্তব্যকে অন্য ক্ষেত্রে নাহলেও শুধু উত্তরাধিকারের প্রশ্নে সরল অর্থে গ্রহন করা যেত যদি সিডও বাস্তবায়নের অঙ্গিকার দৃঢ়তার সাথে নারী নীতিতে ব্যক্ত না করা হত। সিডও সনদের পূর্বোল্লেখিত ধারা সমূহ যে কুরআন সুন্নাহ ও ইসলামী জীবন দর্শনের পরিপন্থী তা আন্তর্জাতিক ভাবেই স্বীকৃত। যে কারনে মুসলিম দেশগুলো সেগুলো মেনে নেয়নি। স্বয়ং বাংলাদেশও সেগেুলোকে কুরআন সুন্নাহর পরিপন্থী মনে করে সেগেুলো সংরক্ষন করেই সিডও সনদে স্বাক্ষর করেছিল। সকল ক্ষেত্রে নারীর সমঅধিকারের ঘোষনার মাধ্যমে মুসলিম উত্তরাধিকার আইনকে অকার্যকর করাই যে সিডও সনদের মূল লক্ষ্য তা অন্ধজনও বুঝতে সক্ষম। আমাদের শিশু ও নারী বিষয়ক মন্ত্রী শিরীন শারমিন চৌধুরীও তাই বুঝেছিলেন। আলেম উলামা ও বুদ্ধিজীবিরা যদি এরূপ বুঝে থাকেন তাতে আর দোষের কী?
তাছাড়া নারী নীতির ভূমিকা – ২য় লাইন ৪,৪.১, ১৬.১, ১৬.৮, ১৬.১২, ১৭.১, ১৭.৪, ২৩.৫, ধারা সমূহ যেভাবে বর্ণিত হয়েছে তাতে যেকোন ব্যক্তি তা দ্বারা উত্তরাধিকারে নারী পুরুষ সমান পাবে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারবে। সিডও বাস্তবায়নের অঙ্গিকারে আবদ্ধ সরকার পরে সেই ধারাগুলোকে পুঁজি করে উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রেও যে সমতার ব্যাখ্যা করবেন না এর নিশ্চয়তা কে দিবে?
পাঠকের সুবিধার্থে উপরোল্লেখিত ধারা সমূহের বক্তব্য আমরা সরকারের নারী নীতি থেকে উদ্ধৃত করে দিচ্ছি।
* ভূমিকার ২য় লাইনে উল্লেখ করা হয়েছে “সকল ক্ষেত্রে নারীর সমসুযোগ ও সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা জাতীয় উন্নয়ন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একান্ত অপরিহার্য”।
* ৪নং ধারার মাঝামাঝি উল্লেখ করা হয়েছে যে, “ক্ষমতা বন্টন, ও সিদ্ধান্ত গ্রহনের ক্ষেত্রে নারী পুরুষের মাঝে তীব্র অসমতা বিদ্যমান। এই অসমতা ও সীমাবদ্ধতা নিরসনের উদ্দেশ্যে সরকার সমূহকে উদ্যোগ নিতে তাগিদ দেওয়া হয়”।
* ৪.১ ধারায় নারীর প্রতি বৈষম্য বিলোপ সনদ শিরোনামের অধীনে উল্লেখ করা হয় “রাষ্ট্র, অর্থনীতি, পরিবার, সমাজ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য দূরী করনের লক্ষ্যে ডিসেম্বর ১৯৭৯ইং সালে জাতিসংঘে নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ সনদ (সিডও) গৃহীত হয়।
* জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতির লক্ষ্য শিরোনামের অধীন ১৬.১ ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে “রাষ্ট্রীয় ও গণজীবনের সকল ক্ষেত্রে নারী পুরুষের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা করা।
* ১৬.৮ ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে ”নারী পুরুষের বিদ্যমান বৈষম্য দূর করা”।
* ১৬.১২ ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে “রাজনীতি প্রশাসন ও অন্যান্য কর্মক্ষেত্রে আর্থসামাজিক কর্মকান্ড, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ক্রীড়া এবং পারিবারিক জীবনের সর্বত্র নারী পুরুষের সমানাধিকার প্রতিষ্ঠা করা।”
* ১৭.১ ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, “রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইত্যাদি ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষ যে সমঅধিকারী তার স্বীকৃতি স্বরূপ নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ করা।”
* ১৭.৪ ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, “বিদ্যমান সকল বৈষম্যমূলক আইন বাতিল করা এবং নতুন আইন প্রণয়ন ও সংস্কারের লক্ষ্যে গঠিত কমিশন বা কমিটিতে নারী আইনজ্ঞদের অংশগ্রহন নিশ্চিত করা”।
* ২৩.৫ ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, “সম্পদ, কর্মসংস্থান বাজার ও ব্যবসায় নারীকে সমান সুযোগ ও অংশিদারিত্ব দেওয়া। বস্তুতঃ এই ধারাগুলো ব্যাখ্যা করে “উত্তরাধিকারে নারী পুরুষের সমান অংশ পাবে” এই বক্তব্য বের হয়ে আসা খুবই সহজ একটি বিষয়। যারা সিডও বাস্তবায়নের অঙ্গিকারাবদ্ধ তারা আজ না হউক কাল যে এই ধারা সমূহের আলোকে উত্তরাধিকারে নারীর সমঅংশিদারিত্বের বিধান উদ্ভাবন করবেন না, এ নিশ্চয়তা কে দেবে?
তাছাড়া নারী বিষয়ে যে কোন নতুন আইন প্রনয়নের পথ ও খোলা রাখা হয়েছে নারী নীতিতে। দ্রষ্টব্য ২৬.৬, ১৯.২, ১৯.৪। এমতাবস্থায় এই নীতিমালার মাধ্যমে উত্তরাধিকারে নারী পুরুষের সমতা বিধানের কৌশল অবলম্বন করা হয়েছে বলে যদি আলেম উলামা ইসলামী চিন্তাবিদরা ধারনা করে থাকেন তাহলে এটা মোটেও অযৌক্তিক নয়।
নারীকে উত্তরাধিকারে সমান না দেওয়ার প্রশ্ন উঠিয়ে এক শ্রেনীর তথা কথিত বুদ্ধিজীবি নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য যে মায়াকান্না কাদেন তারা আসলে ইসলামী সমাজ ব্যবস্থা সম্পর্কে ধারনা রাখেন বলে মনে হয় না। কেননা পৈত্রিক উত্তরাধিকারই নারীর এক মাত্র উত্তরাধিকারের সূত্র নয়। বরং নারীরা পিতামাতার সম্পদে উত্তরাধিকার লাভের সাথে সাথে স্বামীর সম্পদেও উত্তরাধিকার লাভ করে থাকেন। স্বামী নিঃসন্তান হলে তার সম্পদের ১৪অংশ লাভ করেন। আর স্বামীর সন্তান থাকলে তখন ১৮অংশ লাভ করেন। আর নারীর জীবদ্দশায় তার সন্তান মারা গেলে তার সম্পদের ১৬অংশ লাভ করে থাকেন। এভাবে বিভিন্ন সূত্রে থেকে পাওয়া তার সম্পদের পরিমান তার দায়-দায়িত্ব ও প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি।
ইসলামী সমাজে নারীর কোন অর্থনৈতিক দায়িত্ব বহন করতে হয় না। এমনকি তার নিজের দায়িত্বও তাকে বহন করতে হয় না। জন্মের পর থেকে বিয়ের পূর্ব পর্যন্ত তার লালন পালন ও ভরন পোষনের দায়িত্ব পিতার। বিয়ের পর তার ভরন পোষনের দায়িত্ব স্বামীর। স্বামীর মৃত্যুর পর তার ভরন পোষনের দায়িত্ব ছেলের। সুতরাং কোন এক সন্ধিক্ষনেও তার নিজের দায়িত্ব তাকে বহন করতে হয় না। সন্তানের ভরন পোষনের দায়িত্ব পিতার, মাতার নয়। বাবা মা বৃদ্ধ হয়ে গেলে তাদের ভরন পোষনের দায়িত্ব ছেলের। পারিবারিক আত্মীয়-স্বজনের আপ্যায়ন ও সামাজিকতার দায়িত্ব পুরুষের, নারীর নয়। সার কথা এই দাড়ায়, জীবনের কোন ক্ষেত্রেই নারীকে তার নিজের বা অন্যের দায়িত্ব বহন করতে হয় না। অথচ ছেলেসন্তান হলে বালেগ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তার ভরন পোষনের দায়িত্ব পিতার। বালেগ হওয়ার পর থেকে তার নিজের ভরন পোষনের দায়িত্ব আইনগত ভাবে তার নিজের। বিয়ে করলে স্ত্রীর ভরন পোষনের দায়িত্ব তার ওপর বর্তায়। সন্তান জন্মালে তাদের ভরন পোষনের দায়িত্ব বাবা হিসাবে তার ওপর। পিতা মাতা বৃদ্ধ হয়ে গেলে তাদের সম্পদ না থাকলে এবং উপার্জনে অক্ষমহলে তাদের দায় দায়িত্ব ছেলের। আত্মীয় স্বজনের আপ্যায়নের দায়িত্ব ছেলের ওপর। বেচারা পুরুষ নিজের, নিজের স্ত্রী সন্তান ও পিতা-মাতা সহ সকলের দায়িত্ব বহন করে যা পায় তা নারীর প্রাপ্তির তুলনায় যথেষ্ট কম। পক্ষান্তরে নারী নিজের দায়িত্বও বহন করে না আর অন্যকারো কোন দায়িত্ব বহন করে না তারপরও তাকে যদি পৈত্রিক উত্তরাধিকারে পুরুষের অর্ধেকসহ অন্য সূত্রেও উত্তরাধিকারের অংশ দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলেও কি বিষয়টা অবিচার করা হয়েছে বলে মনে হবে ? তদুপরি মহর হিসাবে প্রাপ্ত টাকা, বৈধ পন্থায় উপার্জিত যাবতীয় সম্পদে তার পূর্ন অধিকার থাকে। স্বামী অভাবে পড়লেও স্ত্রীর ব্যক্তিগত সম্পদে হস্তক্ষেপ করার কোন অধিকার তার নেই। সুতরাং বলা যায় যে দায় দায়িত্ব ও প্রয়োজনের বিচারে নারীকে উত্তরাধিকারের হিসাবে যতটুকু দেওয়া হয়েছে তা অনেক বেশি। নারী দুর্বল বলেই দায়িত্ব না দিয়ে তাকে পিতা মাতার উত্তরাধিকারে অর্ধেক দেওয়া হয়েছে যাতে দুর্যোগের সময় বা কারো অসহযোগিতার মুহূর্তে সে সংকটে নিপতিত না হয়। ইসলামী সমাজের এই ষ্ট্রাকচারাল দিক সম্পর্কে যারা অবগত নয় তারাই আল্লাহর বিচারে সন্তুষ্ট হতে না পেরে নিজেরা অন্যায় অধিকারের দাবীতে সোচ্চার হয়।
সার কথা এই যে, নারীনীতিতে কিছু বিষয় ইসলাম বিরোধী হওয়ার বিষয়টি সুষ্পষ্ট। উত্তরাধিকারের বিষয়টি ধোয়াটে ধুম্রাচ্ছন্ন। সরকার বলছে এগুলো দ্বারা উত্তরাধিকারে নারী পুরুষের সমান অধিকারের কথা বলা হয়নি। আর আলেম উলামারা বলছেন বিষয়টি ধুম্রাচ্ছন্ন করে উল্লেখ করা হয়েছে যা ব্যাখা করলে উত্তরাধিকারে নারী পুরুষের সমতার বিধান বের করে আনা যায়। সুতরাং এমতাবস্থায় এ সংকটের নিরসন সরকারকেই করতে হবে। নারী নীতির যে সব বিষয় সুষ্পষ্ট কুরআন সুন্নাহ ও ইসলামী ভাবধারার পরিপন্থী সেগুলোকে সংশোধন করে এমন ভাবে উপস্থাপন করতে হবে যাতে সেগুলো কোরআন সুন্নাহর সাথে সাংঘর্ষিক না হয়। আর উত্তরাধিকারের বিষয়টি নিয়ে মৌখিক বক্তব্য যথেষ্ট নয়। বরং নারী নীতিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে যে, উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে মুসলমানদের বেলায় ইসলামের উত্তরাধিকার আইন প্রযোজ্য হবে। অন্যথায় ৯০% মুসলিম নাগরিক এই নীতি কিছুতেই মেনে নিবে না।
বরং আমরা পরামর্শ দেই, যে ইসলাম নারীকে যে অধিকার ও মর্যাদা দিয়েছে তার আলোকে ইসলামী বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে নতুন করে নারী উন্নয়ন নীতিমালা প্রণয়ন করিয়ে নেওয়া হউক। কেননা ইসলামই নারীকে সর্বোচ্চ মর্যাদা ও অধিকার দিয়েছে এবং নারী নির্যাতনের বিপক্ষে সবচেয়ে বেশি সোচ্চার ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। পশ্চিমাদের দীক্ষা গ্রহন না করে ইসলামের মহান শিক্ষার আলোকে ৯০% মুসলমানের দেশের নারী উন্নয়ন নীতি প্রনয়ন করাই হবে গণতন্ত্রের অনুকূলে এবং আগামী দিনে ভোট যুদ্ধে বিজয়ী হওয়ার উত্তম রণকৌশল। অন্যথায় পরিনতি কোন দিকে গড়াবে তা আল্লাহই ভাল জানেন।