শাইখুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক রহ. প্রতিষ্ঠিত

শাইখুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক রহ. প্রতিষ্ঠিত

ধর্মনিরপেক্ষতা : বিভ্রান্তিকর প্রচারণা

আবুল ফাতাহ মুহাম্মদ ইয়াহইয়া


ধর্মনিরপেক্ষতা একটি রাষ্ট্রীয় দর্শন। ইউরোপের একটি বিশেষ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এর উদ্ভব। সেই রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটকে সামনে না রেখে শুধুমাত্র শব্দটির তাত্ত্বিক বিশে-ষণের মাধ্যমে এর অর্থ ব্যাখ্যার প্রয়াস গ্রহণ করতে অনেককেই দেখা যাচ্ছে। এমনকি অনেক বিজ্ঞ আলেমও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রদর্শনের তাৎপর্য না বুঝেই এর পক্ষে বিপক্ষে মতামত ব্যক্ত করছেন। আমাদের দেশে যারা ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রদর্শনের পক্ষে কাজ করেন তাদেরও অনেকেই বিষয়টির আদি অন্ত না জেনেই কথা বলেন। এহেন প্রেক্ষিতে যে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে এই রাজনৈতিক দর্শনটির উদ্ভাব তা আমাদের সামনে আসা খুবই প্রয়োজন বলে মনে করছি।

করণ একটা সময় রোমানরা যখন দেশের পর দেশ জয় করে নিচ্ছিল। সাম্রাজ্য বিস্তারের পাশাপাশি সমাজের মানুষের শিক্ষা সংস্কৃতি এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রতি মনোনিবেশ না করার কারণে রোমানরা বিশাল সাম্রাজ্যের অধিপতি হলেও জনমানুষের ভালোবাসা ও আন্তরিক সমর্থন লাভ করতে পারেনি। ফলে বিদেশী শক্তিগুলো যেমন জার্মান, টিউটনিক, বাবরিয়ানসহ বিভিন্ন জাতি যখন রোম আক্রমণের পাঁয়তারা করে তখন নাগরিকরা সেই রাষ্ট্রটি রক্ষা করার জন্য ব্যাপকভিত্তিতে স্বতঃস্ফূর্ত কোনো উদ্যমী ভূমিকা পালন করেনি। ৩৭৬ খৃষ্টাব্দে এদিকে বাবরিয়ানরা সার্বিফ ও বোলগেরিয়ান অঞ্চলে অবস্থান গ্রহণ করে। পরে ৪১০ খৃষ্টাব্দে ভিসিপথক রাজা ঐ্যালারিকের নেতৃত্বে রোম আক্রমণ করে। তিনদিন পর্যন্ত প্রচণ্ড লড়ায়ের পর রোমান সাম্রাজ্য তাসের ঘরের মতো ভেঙ্গে পড়ে। যে পরাজয় এ বিশাল সাম্রাজ্যের জন্য ছিল একান্তই অভাবনীয়। বিভিন্ন কারণে জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে সাড়া না দেয়াই এত সহজে এই বিশাল  সাম্রাজ্যের পতনের মূল কারণ বলে ঐতিহাসিক বিদগ্ধজনরা মনে করেন।

শুরুর দিকে রোমানরা মূলত তাদের প্রাচীন ধর্মবিশ্বাসের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। খৃস্ট ধর্মের মূল কেন্দ্রভূমি ছিল জেরুজালেম। রোম খৃষ্টধর্ম সম্প্রসারিত হলে রোমানরা পুরাতন ধর্মমত পরিত্যাগ করে খৃস্ট ধর্মের দীক্ষাগ্রহণ করতে শুরু করে। ক্রমে খৃষ্টধর্মই রোমানদের মূল ধর্ম হয়ে দাঁড়ায়। হযরত ঈসা আ. এর জন্মে তিনশত বছর অতিবাহিত হওয়ার পর খৃষ্টধর্ম রোমান সম্রাটদের পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে। ৩৯৩ খৃস্টাব্দের এদিকে খৃস্টধর্মকে রোমের সরকারি ধর্মের মর্যাদা দেয়া হয়। খৃস্টধর্মকে রাষ্ট্রীয় ধর্ম হিসেবে গ্রহণ করার ১৭ বছর পর অর্থাৎ ৪১০ খৃস্টাব্দে রোম ভেঙ্গে খান খান হয়ে যায়।

কিন্তু এই ভাঙ্গনের সূচনা বলতে গেলে আরো পূর্বেই হয়েছে। কারণ ৩৯৫ খৃস্টাব্দে রাজধানী রোমনগর থেকে প্রশাসনিক সুবিধার্থে কনস্টান্টিনোপলে স্থানান্তর করা হয়। আর সে থেকেই ভাঙ্গনের সূত্রপাত হয়। একদিন তা পূর্ব রোম ও পশ্চিম রোম এই দুইভাগে বিভক্ত হয়ে যায়।

বস্তুত রাজধানী কমস্টন্টিনোপলে স্থানান্তর করার ফলে মূল রোমের কর্তৃত্ব রোমান গীর্জার প্রধান পোপের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। মোন গীর্জার প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন সেন্ট পিটার যিনি প্রধান ধর্মযাজক ও ধর্ম প্রচারকরূপে সর্ব মহলে ব্যাপক স্বীকৃতি লাভ করেছিলেন। তার প্রভাবে রোমান গীর্জার প্রাধান্য সর্ব মহলে স্বীকৃত হয়ে পড়ে। সেন্ট পিটার ইতিপূর্বে পশ্চিমের টিউটনিক জাতসমূহকে খৃস্টধর্মে দীক্ষিত করার জন্য বিভিন্ন মিশন প্রেরণ করে ছিলেন এবং ব্যাপক প্রচারাভিযান চালিয়েছিলেন এর ফলে যারা খৃস্টধর্মে দীক্ষিত হয়েছিল তাদের কাছে রোমান গীর্জার প্রাধান্য স্বাভাবিকভাবেই স্বীকৃত ছিল। তাছাড়া পশ্চিমে যেসব গীর্জা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল সেগুলো রোমান গীর্জার অধীনে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। সে সব গীর্জা থেকে রোমানগীর্জা বাৎসরিক আর্থিক সুযোগ সুবিধা ভোগ করতো। তাই পশ্চিমাঞ্চলের খৃস্টসমাজের কাছে রোমান গীর্জার শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকৃত ছিল। তাছাড়া রোমান বিশপকে সেন্ট পিটারের উত্তরাধিকারী মনে করা হতো। এ কারণে তারা রোমান বিশপকেও মেনে চলতো।

পরে এক সময় টিউটনিকরা রোমজয় করে নেয়। এর ফলে রোমের ওপর কমস্টান্টিনোপলের সরকারের আইনগত যে কতৃত্ব ছিল সেও শেষ হয়ে যায়। এই অনুকূল পরিস্থতিতে রোমের গীর্জার প্রধান পোপ শাসকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। পশ্চিমাঞ্চলীয় দেশসমূহও গীর্জাসমূহের সমর্থন রোমান পোপের প্রতি থাকার কারণে তার প্রভাব এতো বৃদ্ধি পায় যে, কনস্টন্টিনোপলের শাসকের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কোনো ক্ষমতাই তার ওপর থাকল না।

অবশ্য রাজধানী কনস্টন্টিনোপলে স্থনান্তরিত করার পর এখানে একটি গীর্জা প্রতিষ্ঠা করা হয়। এ গির্জার পোপ ছিলেন সরকার নিয়ন্ত্রিত। ফলে রাষ্ট্রের ইচ্ছার অনুকূলে তা পরিচালিত হয়। ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান পালনের মাঝে তাদের কার্যক্রম সীমিত হয়ে পড়ে। এরা ধর্মীয় বিষয়ে ছিল খুবই রক্ষণশীল। ফলে আচার পালনের ক্ষেত্রে এরা যথেষ্ট সুখ্যাতি অর্জন করে। কিন্তু এরা চলমান জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। পক্ষান্তরে পশ্চিমাঞ্চলীয় জাতিসমূহের প্রভাব রোমান বিশপকে যথেষ্ট সংস্কারধর্মী মনোভাব নিয়ে কাজ করতে হয়। তাছাড়া রাষ্ট্রক্ষমতা ও অর্থপ্রাপ্তির সাথে সাথে রোমান গীর্জার পোপ পাদ্রীদের জীবন ধারা কৃচ্ছতার দর্শন খানিকটা শিথিল হয়ে পড়ে।  জীবন ধারার সাথে খৃস্টধর্মের সমন্বয় করতে গিয়ে ধর্মীয় বিশ্বাস ও অনুশীলনের ক্ষেত্রে যথেষ্ট পরিবর্তন আনতে হয়। ফলে দুই প্রধান গীর্জা দুই ধরায় প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে। যাই হোক খৃস্টধর্মকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে গ্রহণ করার পর রাষ্ট্রের ওপর ধর্মের প্রভাব মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পায়।

বস্তুত টিউটনিকদের দ্বারা রোমের পতনের এ সময়কে রাষ্ট্রদর্শনের ইতিহাসে মধ্যযুগ বলে অভিহিত করা হয়। মধ্যযুগকে আবার দুটি ভাগে বিভক্ত করা হয়। শুরু ভাগ ও শেষ ভাগ। শুরু ভাগের এ যুগের খ্যাতনামা রাষ্ট্র দার্শনিক ছিলেন সেন্ট আস্্েরাজ, সেন্ট আগস্টিন পোপ গ্রেগোরী প্রমূখ ধর্মযাজকবৃন্দ। এ যুগকে চার্চের স্বর্ণযুগ বলা হয়। কেননা এ সময়ে খোদ পোপের মাথায় ছিল রাজমুকুট, চার্চ ছিল দিগি¦জয়ী, আর খৃস্ট ধর্মের নিয়ম নীতি ছিল সর্বব্যাপী বি¯তৃত। কিন্তু মধ্য যুগের শেষ ভাগে চার্চের ক্ষমতা হ্রস পায়, সম্রাটদের নিকট পেপের মর্যদা নি¯প্রভ ও হীন বলে পরিগণিত হতে থাকে। ধর্ম বিশ্বাসের স্থলে যুক্তিবাদ প্রাধান্য লাভ করতে থাকে। এ সময়টা মূলত: ছিল চার্চ ও রাষ্ট্রের পারস্পরিক দ্বন্ধ সংঘাতের কাল। এ সময়ে  এ সময়ে রাষ্টর জন্য একদল দার্শনিক দর্শনের পক্ষে জোরালো বক্তব্য পেশ করেছেন যেমন সেন্ট অগাস্টিন, পোপ গ্রেগোরী, সেন্ট এক্যুনাস প্রমুখ। এরা পোপকে করে তোলে ছিলেন প্রকৃতির মতো নিত্য আবশ্যক এবং দন্ডমুন্ডের হর্তাকর্তা।

আর একদল পোপের মর্যাদাকে ক্ষুণœ করা থেকে নিয়ে দর্শন বিবর্জিত রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রবর্তনের পক্ষে কথা বলেছেন। যেমন দান্তে, মারিসিলে উইলিয়াম, জন প্রমুখ। এরা চেষ্ট করেছেন পোপকে রাষ্ট্রের আজ্ঞাবহ বানাতে। আর রাষ্ট্রকে চিন্তা করেছেন ধর্মহীন এক অবকাঠামোর আঙ্গিকে। ম্যাকয়াভেলী বিষয়টিকে সুস্পষ্ট ভাষায় ব্যক্ত করেছেন এই যা।

বস্তুত: রাষ্ট্রপরিচালনা করতে গিয়ে পোপের নিকট যে দায়বদ্ধতা ও ধর্মীয় অনুশাসনে মেনে চলার যে বাধ্যবাধকতা ছিল এটি রাষ্ট্র ও চার্চের মাঝে সংঘাতের সূচনা করে। রাষ্ট্র প্রধান চাইতেন এক রকম আর পোপ চাইতেন অন্য রকম। ফলে রাষ্ট্র ও চার্চের মাঝে বিরোধ শুরু হতো। পরিণামে চার্চই অধিকাংশ ক্ষেত্রে জয়ী হতো। কেননা,ধর্মের প্রতি মানুষের স্বভাবজাত আবেগের কারণেই জনগণ ধর্মকে সমর্থন করতো। তাছাড়া কিছু স্বেচ্ছাচারী প্রবৃত্তিপূজারী মানুষ ক্ষমতার প্রত্যাশী ছিলেন। কিনউত পোপের মনোপূত: না হলে এবং ধর্মীয় বিধি বিধানের অনুসারী না হলে পোপ তার অভিষেক করতেন না। ফলে তাদের সুপ্ত আশা কোনো দিনই বাস্তবায়ন হতো না। এ কারণেই তারা রাষ্ট্রের ওপর ধর্মীয় কর্তৃত্বের প্রতি খুবই নাখোশ ছিল।

এইসব রুষ্টশ্রেণীরা পোপতন্ত্রের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করেন। ফলে এদের সাথে ধর্মানুসারীদের সংঘাত অপরিহার্য হয়ে পড়ে। কিন্তু চূড়ান্ত সংগ্রামে ধর্মই বারবার জয়ী হয়। কারণ ধর্মের প্রতি মানুষের সুপ্ত ভালোবাসা একদিন জেগে উঠেই এবং একদিন তারা ধর্মের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ হয়েই যায়। গোটা মধ্যযুগ ধরেই রাষ্ট্র ও চার্চের মাঝে দ্বন্দ্ব সংঘাত চলতেই থাকে।  কখনো রাষ্ট বিজয়ী হতো চার্চের ওপর আবার কখনো চার্চ বিজয়ী হতো রাষ্ট্রের ওপর। কখনো জনগণ টেক্স দিত চার্চকে আবার কখনো দিত রাষ্ট্রকে। কখনো কখনো পরিস্থিতির শিকার হয়ে চার্চ ও রাত্র উভয়কেই টেক্স দিতে হতো।

ফলে গোটা ইউরোপেই চরম অস্থিরতা বিরাজিত ছিল। এই অস্থিরতার জন্য পরস্পর পরস্পরকে দায়ি করতো।

৫০০ খৃষ্টাব্দের এদিকে এই দ্বন্দ্ব সংঘাত নিরসনের জন্য পোপ গেলসিয়াস তার সমান্তরাল দর্শন বা দুই তরবারী দর্শন পেশ করেন। তিনি চিন্তা করেছেন মানব জীবনের দুটি স্বতন্ত্র লক্ষ্য রয়েছে। একটি হল পার্থিব জীবনের সুখ অপরটি হল আত্মিক উন্নয়ন ও পারলৌকিক প্রশান্তি। রাষ্ট্র মূলত: মানুষের পার্থিব জীবনের সুখ শান্তির জন্য কাজ করে। আর চার্চ মানুষের আত্মিক উন্নয়ন পারলৌকিক প্রশান্তি অর্জনের লক্ষ্যে কাজ করে। এর একটি অপরটির সথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। কোনোটিকে বাদ দিয়ে জীবন পূর্ণ হয় না।  তাই এ দুটি ক্ষেত্রের জন্য দুটি কর্তৃপক্ষ থাকতে পারে।  সে প্রেক্ষিতেই গেলসিয়াস দুটি সমান্তরাল শক্তির কল্পনা করেন। তাই তিনি বলেন, সম্রাটের যা পাওনা তা সম্রাটকে দাও আর ঈশ্বরের যা পাওনা তা ঈশ্বরকে দাও। এটিই মূলত: দুই তরবারীদর্শন বা সমান্তরাল নীতি। বস্তুত: গেলসিয়াস চেয়েছিলেন এ পদ্ধতিতে দ্বন্দ্বের নিরসন করতে। কিন্তু এতে সংঘাত এড়ানো সম্ভব হয়নি। এই দ্বন্দ্ব সংঘাতের মাঝ দিয়ে অতিবাহিত হয় ১২০০ খৃস্টাব্দ পর্যন্ত। ইতিমধ্যেই যুক্তিবাদ বেশ ঝেঁকে বসে। ফলে পার্থিব জীবন সংক্রান্ত বিষয়কে যুক্তির আলোকে গ্রহণ করার বিষয়টি প্রাবল্য লাভ করে। একশ্রেণী রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে ধর্মের বিধিবিধানকে গ্রহণ না করে যুক্তির আলোকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পক্ষে মতামত পোষণ করতে শুরু করেন। তাদের বক্তব্যের সারকথা ছিলÑ রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে ধর্মের উপস্থিতি নি:®প্র্রয়োজন।’ এক্ষেত্রে মানুষ যুক্তি বিচারের দ্বারা এগিয়ে যাবে। আর মানুষ ধর্মীয় বিষয়াসয়ের ক্ষেত্রেই ধর্মীয় বিধান প্রযোজ হবে। ফলে চার্চ ও সমাটকে  সমান্তরাল মর্যাদায় আনার চেষ্টা করেন।

দার্শনিকদের মাঝে দান্তে ছিলেন এর প্রবক্তা। তিনি বলেন, মানবজীবনের দুটি লক্ষ্য অর্জনের জন্য চাই দুই জন প্রদর্শক। দুটি আলোক বর্তিকা। শ্বাশত জীবনের শুভ পথ দেখাবেন পোপ ধর্মগ্রন্থের দিব্যজ্ঞানের মশাল হাতে নিয়ে। আর পার্থিব সুখের পথ প্রদর্শক হবেন সম্রাট তার যৌক্তিক ও দার্শনিক পসরা হাতে নিয়ে। তিনি আরো মনে করতেন ঈশ্বর সর্বশ্রেষ্ঠ মহত্বর সত্তা। আর চার্চ ও সাম্রাজ্য এদুটিই আর্শিবাদপুষ্ট হয় তারই ইঙ্গিতে। সুতরাং চার্চ সম্রাট অপেক্ষা শ্রেষ্টতর এরূপ ভাবা ঠিক নয়।

দান্তের এই বক্তব্যের মাঝে চার্চের শ্রেষ্ঠত্ব ও আধিপত্যকে খর্ব করার প্রথম সূচনা হয় যা ক্রমে আরো অগ্রসর হয়ে চার্চ ও ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে উৎখাত করার পর্যায় পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছে।

পরবর্তীতে দার্শনিক মারসিলিও এসে চার্চের ওপর রাষ্ট্রের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করেন। এবং ধর্মকে জীবনের আঙ্গিনা থেকে হঠিয়ে কেবল পরলৌকিক মুক্তির পরিমণ্ডলে আবদ্ধ করে ফেলেন। তিনি বলতেন যাজকদের মূল কাজ হল পরকালে উন্নত জীবনের নিশ্চয়তার আশ্বাস। আর রাষ্ট্রের কাজ হল উন্নত জীবন সংগঠন এবং তা শুধু ইহকালে নয় পরকালেও। ইহকালে উন্নত জীবনের আস্বাদ পাওয়া যাবে বিবেক বুদ্ধি ও যুক্তি দর্শনের অনুশীলনের মাধ্যমে। কিন্তু পরকালে উন্নত জীবনে আশীর্বাদ পেতে হলে আমাদেরকে নির্ভর করতে হবে ঐশীবাণী ও যাজকের ওপর। সুতরাং যাজকের আসল কাজ হচ্ছে পরকালে মুক্তি লাভের ব্যাপারে সাহায্য করা। পার্থিব সুখের জন্য যাজকদের কিছুই করণীয় নেই। তাদের যা কিছু করণীয় তা করতে হবে পরকালের জন্য। জাগতিক বিষয়ের কোনো কিছুতে হস্তক্ষেপ করা যাজকদের জন্য সম্পূর্ণ অসঙ্গত। সুতরাং একটি বিশেষ শ্রেণী হিসেবে বিশেষ কর্তৃত্ব খাটানোও সুবিধাদিভাগ করার কোনোই অধিকার তাদের নেই। অন্যন্য শ্রেণীর ন্যায় এ শ্রেণীকেও রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের সম্পূর্ণ অধীন থেকে কাজ করতে হবে। পার্থিব ব্যাপারে রাষ্ট্রকর্তৃক যাজক সম্প্রদায়ের প্রতি নিয়ন্ত্রণ হবে কৃষি ও বাণিজ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণের ন্যায়।

এভাবেই মারসিলিও পোপ পাদ্রীদেরকে সম্রাটের সমান্তরাল মর্যাদার আসন থেকে নামিয়ে এনে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের অধীনে করেছেন। আদিকাল থেকে রাষ্ট্রের ওপর ধর্মের যে প্রভাব চলে আসছিল এবং ধর্মের বিধানের আলোকে রাষ্ট্রীয় নিয়মনীতি প্রবর্তনের যে প্রথা চলে আসছিল মারসিলিও এদুটিকে একই সঙ্গে উৎখাত করতে চেয়েছেন। ইতিপূর্বে এমন দু:সাহস আর কেউ দেখায়নি। এভাবে মার্সিলিও ঐতিহ্যবাহী         সমান্তরাল নীতিও দুইি তরবারী দর্শনের মূলে কুঠারাঘাত করেন এবং ধর্মের সর্বব্যাপী বৈশিষ্ট্যকে অস্বীকার করেন। এভাবে তিনি চার্চের যে সার্বভৌম একক কর্তৃত্ব ছিল তাকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেন। তার এই দর্শনের ফলে চার্চ রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রনাধীন একটি বিভাগের পর্যায়ে অবনমিত হয়ে যায়। জীবনের সর্বক্ষেত্রে ধর্মের যে সুর অনুরণিত ছিল তা পরকালের মুক্তির সীমিত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। এক্ষেত্রেও চার্চের কর্মকান্ড রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণাধীন ও তার আজ্ঞাবহ হয়ে পড়ে। আধ্যাত্মিক ক্ষেত্রে হউক কিংবা জাগতিক ক্ষেত্রেই হোক সকল ক্ষেত্রেই চার্চ ও ধর্ম যাজকরা সরকার ও রাষ্ট্রের আজ্ঞাবহ হয়ে পড়ে এবং চার্চের ওপর রাষ্ট্রের শ্রেষ্ঠত্ব বিঘোষিত হয়। তিনি তার এ দর্শন ‘ডিফেন্সর পেপিস’ নামকগ্রন্থে সবিস্তারে আলোচনা করেন। যে কারণে সমকালীন ব্যক্তিদের কাছে এ গ্রন্থটি যথেষ্ট সমালোচনা কুড়ায়। পোপ ষষ্ঠ ক্লিমেন্ট তাই মারসিলিওকে ‘ঘৃণ্যতম পাতক’ বলে আখ্যায়িত করেন।

মূলত: মারসিলিও রাষ্ট্র ও চার্চের মাঝে ক্ষমতার দ্বন্দ্বকে ইউরোপের অশান্তি ও বিশৃংখলার মূল কারণ বলে ধরে নিয়েছিলেন। এবং তিনি মনে করতেন যে, চার্চ ও রাষ্ট্র সমকক্ষ ও সমান কর্তৃত্বের অধিকারী হলে এই দ্বন্দ্ব ও বিশৃঙ্খলা কিছুতেই নিরসন করা সম্ভব হবে না। এজন্য তিনি চার্চকে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণাধীন আনার প্রয়াস গ্রহণ করেছেন। অবশ্য এ দ্বন্দ নিরসনের একটি প্রক্রিয়া এও হতে পারত যে, রাষ্ট্র ধর্মের নিয়ন্ত্রণাধীন হবে।’ এবং এটাই যুক্তিসঙ্গত ছিল। কিন্তু মারসিলিও সে চিন্তার দিকে যাননি। কেননা তিনি মূলত: চেয়েছিলেন যাজকীয় কর্তৃপক্ষকে হেয় প্রতিপন্ন করতে এবং পোপের সর্বাত্মক ক্ষমতার মূলে কুঠারাঘাত করতে। ধর্মকে শাসন ব্যবস্থা থেকে নির্বাসন দেওয়াই ছিল তার মূল উদ্দেশ্য।  তিনি বরং যুক্তিবাদের ধাক্কা সামলাতে না পেরে রাষ্ট্রকে যুক্তির অধীন করে ফেলেন এবং

যথাশক্তি দিয়ে ঘোষণা করেন যে, পার্থিব ব্যাপারে ধর্মের কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ কিছুতেই সঙ্গত নয়। তার এ চিন্তা সমকালীন পৃথিবীতে খুব একটা বাজার পায়নি। জনগণ তা গ্রহণও করেনি। তবে তার মৃত্যুর দুইশত বৎসর পর ম্যাকয়ার্ভের মাধ্যমে এটি রাষ্ট্র দর্শনরূপে স্বীকৃতি পায় ও জনসমর্থন লাভ করে। ম্যাকয়াভেলী ১৪৬৯ খৃস্টব্দে ইতালির ফ্লোরেন্স নগরে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৫২৭ মৃত্যুবরণ করেন। তাকে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র দর্শনের জনক মনে করা হয়। তিনি মূলত: ছিলেন ধর্মে অবিশ্বাসী। তিনি বিশ্বাস করতেন মানুষের কোনো পারলৌকিক লক্ষ্য নেই। মানুষের জীবনের পরিপূর্ণতা লাভের ক্ষেত্র হল এই পৃথিবী। জীবনের পরিপূর্ণতা অর্জন করতে হলে এই পৃথিবীতেই তা অর্জন করতে হবে। খ্যাতি, ক্ষমতা ও মহত্ব প্রভৃতি গুণ মানুষকে অমরত্ব দান করে। তাই রাষ্ট্রীয় জীবনে কোনো ঐশ্বরিক বিধানের প্রয়োজন নেই। এজন্য রাষ্ট্রের সংহতি বজায় রাখার প্রয়োজনে শাসকদের নীতি নৈতিকতার বেড়াজালে আবদ্ধ থাকারও কোনো প্রয়োজন নেই। তিনি আরো মনে করতেন যে, নাগরিক ও শাসক একই নীতির আওতায় শাসিত হবেন এটিও ঠিক নয়। কেননা রাষ্ট্র হল সর্বশ্রেষ্ঠ মহত্তম সামাজিক সংস্থা, রাষ্ট্র সামাজিক মঙ্গলের ধারক ও বাহক। তাই রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রীয় প্রশাসকদের সাধারণ মানুষের পর্যায়ে আনা যায় না। রাষ্ট্্েরর লক্ষ্য মহৎ তাই এর কাজের বিচার হতে হবে ভিন্ন মানদন্ডে। তিনি মনে করতেন মানুষের জীবনে চার্চ ও তার নীতি সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয়। কেননা চার্চের নীতিসমূহ মানুষের জাগতিক জীবনে অর্থহীন। ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র দর্শন অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় প্রশাসনকে ধর্মীয় বিধিবিধান মুক্ত করে মানুষের যুক্তি বিচারের হাওলা করা ছিল তার অন্যতম উদ্ভাবন।

বস্তুত: তার সময়ে গোটা ইউরোপ ছিল বিশৃঙ্খলার শিকার। গ্রিকের নগর রাষ্ট্রের ন্যায় সমগ্র ইতালি জুড়ে ছিল বেশ কিছু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাষ্ট্র। ভেনিস ও ফ্লোরেন্সর ন্যায় কতগুলো ছিল প্রজাতন্তীধর্মী নগর রাষ্ট্র। তবে অধিকাংশই ছিল একনায়কতন্ত্রী শাসন ব্যবস্থার অধীন। এগুলোর মাঝে সর্বক্ষণ রাজনৈতিক কোন্দল ও প্রতিদ্বন্ধিতা লেগেই থাকতো। বৈদেশিক শক্তিগুলো এ অঞ্চলের প্রতি তীক্ষè শিকারীর দৃষ্টি মেলে রাখতো। রাষ্ট্রের অভ্য্যন্তরীন কোন্দলের সুযোগ নিয়ে প্রতিবেশী জার্মান, স্পেন ফ্রান্সের মতো শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো সদা সম্প্রসারণের মনোভাব নিয়ে পর রাষ্ট্র দখলের পাঁয়তারা লিপ্ত থাকতো। ষোল শতকের দিকে পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হলে কয়েকশত নগর রাষ্ট্র মিলে পাঁচটি বৃহৎরাষ্ট্রের জন্ম হয়। যথা নেপলস, ভ্যাটিকান রাজ্য, মিলান, ভেনিস, ফ্লোরেন্স। ইতালি তখন বিশ্বের মানচিত্রে থাকলেও তার অভ্যন্তরীন অবস্থা ছিল খুবই নাজুক। আপন অবস্থা সুসংহত না করতে পারলে যে কোনো সময় তা অন্যের পদানত হয়ে পড়বে। এ কারণে ম্যাকয়াভেলী পরামর্শ দিয়েছিলেন যে, ইতালির এখন এমন একজন শাসক প্রয়োজন যিনি হবেন পরম পরাক্রমশালী। প্রয়োজনে তিনি হবেন শৃগালের মতো ধূর্ত, সিংহের মতো বলবান এবং স্বীয় কাজকর্মে তিনি কোনো নৈতিকতার বন্ধনে আবদ্ধ হবেন না।

মূলত: গোটা মধ্যযুগের রাজনৈতিক চিন্তার মৌলিক নীতি ছিল ধর্মভিত্তিক এবং ঐশ্বরিক বিধিনিবাধনের অনুগত। ক্ষমতাশীলরা মূলত বিবেচিত হতেন ঈশ্বরের প্রতিনিধিরূপে। রাজনৈতিক, সামাজিক অর্থনৈতিক জীবনের সবকিছুই ছিল ধর্মনীতির অধিন, খৃষ্টীয় চার্চের নিয়ন্ত্রণাধীন। সবকিছুই ধর্মতত্বের আলোকে চার্চের ক্রোড়ে লালিত হতো। কিন্তু যুক্তিবাদের প্রভাবে ধর্মের এ আধিপত্য সমূলে উৎপাটনের জন্য যারা কাজ করেছেন ম্যাকয়াভেলী ছিলেন তাদের অন্যতম। মারসিলিও ও ম্যাকয়াভেলী উভয়েই চার্চকে ইতালির ঐক্যের পথে বড় কাঁটা মনে করেছেন। এজন্য তারা চার্চকে খুবই ঘৃণার চোখে দেখতেন। তবে এক্ষেত্রে ম্যাকয়াভেলী ছিলেন মারসিলিওর চেয়েও আগ্রাসী। এজন্য তিনি চার্চকে সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় এবং তার নীতিমালাকে জাগতিক জীবনের জন্য অর্থহীন বলে ঘোষণা করেন। এবং মানুষের রাজনৈতিক সামাজিক অর্থনৈতিক জীবনকে এক সম্পূর্ণরূপে যুক্তিবাদের প্রমোদের ওপর দাড় করিয়ে দেন এবং মানুষের জীবনকে যুক্তিবাদের হাওয়ালা করে দেন।

এই দীর্ঘ পর্যালোচনা দ্বারা একথা একেবারেই দিবালোকের ন্যায় সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, সকল ধর্মের প্রতি উদার মানসিকতা পোষণের চেষ্টা থেকে ধর্মনিরপেক্ষতার দর্শনের উদ্ভব হয়নি কিংবা  সবাইকে স্বাধীনভাবে ধর্ম কর্ম পালনর সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়ার চেতনা থেকেও ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র দর্শনের সূচনা হয়নি। বরং রাষ্ট্রীয় জীবন থেকে ধর্মকে উৎখাত করা এবং মানুষের জীবনকে যুক্তিবাদের আলোকে পরিচালিত করে ধর্মীয় নীতি নৈতিকতার বন্ধনমুক্ত করাই মূলত: ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র দর্শন উদ্ভাবনের পিছনে মূল চেতনা হিসেবে কাজ করেছে।

আমরা একথা অস্বীকার করছি না যে, খৃস্টধর্ম ছিল সাময়িক কালের ধর্ম। যে কারণে আবহমান কালের মানুষের প্রয়োজনের সাথে পাল্লা দিয়ে অগ্রসর হওয়ার মতো পর্যাপ্ত উপাদান তাতে বিদ্যমান ছিল না। অথচ খৃস্টান ধর্মযাজকরা এটাকে বিশ্বজনীন ধর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ নিয়ে  অসাধ্যকে সাধন করার চেষ্টা করছে। তাছাড়া সাময়িক কালের জন্য প্রদত্ত্ব একটি ধর্মকে কিয়ামত পর্যন্ত অনাগত মানুষের ধর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত রাখার হীন কৌশল অবলম্বন করে একদিকে যেমন তারা ঐশ্বরিক অভিপ্রায়ের সাথে প্রতারণামূলক আচরণ করেছে, অপরদিকে যে ধর্মে সর্বকালের মানুষের প্রয়োজন পূরণের উপাদান বিদ্যমান নেই তাকে সর্বকালের মানুষের জন্য চাপিয়ে দিয়ে নিজেরাই গেরা কলে আটকে গেছে। কেননা ক্রমপ্রসারমান বিশ্বের মানুষের প্রয়োজন পূরণ এবং সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে খৃস্টধর্ম ব্যার্থ বলে প্রতিভাত হয়েছে। এতে মানুষ ধর্ম বর্জন করে যুক্তিবাদের আশ্রয় নিয়েছে।

তাছাড়া ধর্মযাজকদের অতি স্বেচ্ছাচারিতা, লোভ লালসা ও নৈতিক অধপতনের ফলে মানুষ তাদের প্রতি শ্রদ্ধা হারিয়েছে। এ কারণে মানুষ তাদেরকে অনুসরণ করতে চায়নি। ফলে তাদের কারণে মানুষ ধর্মের প্রতি ভীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েেছ। আর এগুলো ধর্ম থেকে বেরিয়ে এসে যুক্তিবাদের আশ্রয় নেয়ার জন্য মানুষকে উদ্ভুদ্ধ করেছে।  তদুপরি মূল সমস্যার যেটি দেখা দিয়েছিল সেটি হর মূলধর্মকে হারিয়ে ফেলার সমস্যা। আগেই উলে-খ করা হয়েছে যে, ভ্যাটিকেনের গির্জা ছিল সংস্কারধর্মী। বার্বারিয়ানদের জীবনধারার সাথে সমন্বয় করতে গিয়ে বহুক্ষেত্রে তারা ধর্মীয় বিধিবিধানকে শিথিল করে। অনেক ক্ষেত্রে সংস্কারের নামে পরিবর্তন করে ফেলে। আবার যুক্তিবাদ যখন চেপে বসতে থাকে তখন যুক্তির সাথে সমন্বয় করতে গিয়ে ধর্মীয় বহুবিধানকে তারা পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়। খৃস্টধর্মকে বিশ্বজনীন রাষ্ট্রীয় ধর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়েও বহুক্ষেত্রে তাদেরকে পরিবর্তন করতে হয়। আবার নিজেদের অতিতাত্মিক ব্যাখ্যার  গোলক ধাঁধায় ফেসে গিয়েও বাইবেলের বহু বক্তব্যকে তাদের পরিবর্তন করতে হয়। অপরপক্ষে কস্টান্টিনোপলের গির্জা ছিল রক্ষণশীল জীবন জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন। ফলে এই গির্জার অনুসারীদের মাধ্যমে খৃস্টধর্ম ব্যাখ্যায়িত হয় জীবন জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন বৈরাগ্যপনার ধর্ম হিসেবে।

ফলে খৃস্টান ধর্মের অনুসারীদের সামনে ছিল এক মহা সংকট। কোন ব্যখ্যাকে গ্রহণ করে তারা ইহ জাগতিক ও পার্থিব বিষয়ের কর্মপন্থা নির্ধারণ করবে? এসব কারণে ধর্মকে বাদ দিয়ে যুক্তির দর্শনকে কাজে লাগিয়ে রাষ্ট্র ও রাষ্ট্র সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে জীবন চলার পথ রচনা করে নিতে তারা বাধ্য হয়। এজন্য ধর্মনিরপেক্ষতার দর্শন ছিল ইউরোপের জন্য এক মহা আশীর্বাদ।

কিন্তু ইসলামী দুনিয়ায় ও মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলসমূহে এ দর্শন চাপিয়ে দেয়ার কোনো যুক্তি নেই। কেননা ইসলামের আগমনই হয়েছে বিশ্বজনীন ধর্ম হিসেবে। এবং কিয়ামত পর্যন্ত মানুষের জন্য মহান আল্লাহ তা’য়ালা এ ধর্মকে মনোনীত করেছেন। সুতরাং কিয়ামত পর্যন্ত বিশ্বমানুষের জীবনের গতিপথ ও সমস্যার সমাধান এতে নিহিত আছে। তাছাড়া ইসলাম বৈরাগ্যবাদী কোনো ধর্ম নয়। জীবন জগতের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়ানো এক ধর্ম। জীবন জগতে ইলাহী নিয়ম বাস্তবায়নের মাঝ দিয়েই পরকালীন সফলতার পথ তৈরি করতে হয়। জীবনের কোনো অধ্যায়কে ধর্ম বিবর্জিত করে পরিচালনার কোনো সুযোগ ইসলামে নেই। ইসলামে মসজিদ যেমন পরিচালিত হয় ঐশী বিধানের ভিত্তিতে রাষ্ট্রও তেমনি পরিচালিত হয় ঐশী নেযামের ভিত্তিতে। এ দুইয়ের মাঝে কোনো পার্থক্য করা হয় না। তাছাড়া রাষ্ট্র সংক্রান্ত বিধানের ক্ষেত্রে অপর্যাপ্ততার যে সংকট খৃস্টধর্মে ছিল তাও ইসলামে নেই। কারণ ইসলামের সামগ্রিক বিধানে, রাষ্ট্রনীতি, অর্থনীতি ও সামাজিক ক্ষেত্রের জন্য পর্যাপ্ত বিধান বিদ্যমান রয়েছে। ইসলামের মূলধারা ও মূলভাষ্য হারিয়েও যায়নি বিকৃতও হয়নি। এসব কারণে রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে ইসলামী জীবনে ব্যবস্থা থেকে আলাদা করে ভাবার কোনো অবকাশ নেই। বরং নিজস্ব রাষ্ট্রব্যবস্থা ও জীবনব্যবস্থা নিয়েই ইসলাম পূর্ণাঙ্গ। তাই যদি কেউ রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে ইসলাম থেকে বিচ্ছিন্ন মনে করে তাহলে ইসলামের প্রতি তার বিশ্বাস হবে অপূর্ণাঙ্গ। এটাকে পূর্ণাঙ্গ ঈমান বলা যাবে না। এ কারণে কোনো মুসলমানের জন্য ধর্মনিরপেক্ষ দর্শনে বিশ্বাসী হওয়ার সুযোগ নেই।

অবশ্য আমাদের দেশে অনেকেই ধর্মনিরপেক্ষতার ব্যাখ্যা দিয়ে থাকেন এভাবে যে, প্রত্যেকেই স্বাধীনভাবে আপন আপন ধর্ম পালন করবে। এটি মূলত: ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্রের ওপর চাপানোর কৌশল হিসেবে বলা হয়। বস্তুত: ধর্মনিপক্ষ দর্শনে ব্যক্তি পর্যায়ে যে সব আমল আচার পালন করা হয় তাতে বাধা দেয়া হয় না। তবে রাষ্ট্রে ধর্মের অনুপ্রবেশকে কঠোর হস্তে দমন করা হয় যা ধর্মনিরপেক্ষ দর্শনের প্রেক্ষাপট থেকে আমরা অনুধাবন করেছি। ইসলামের যে বিধিবিধানের সম্পর্ক রাষ্ট্রের সাথে সেগুলো বাস্তবায়নের কোনো পথ খোলা থাকে না। এমনকি তা বাস্তবায়নের জন্য কোন উদ্যোগ গ্রহণের পথও খোলা থাকে না। উপরন্তু রাষ্ট্র যদি ইসলামবিরোধী কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করে তাহলে রাজনৈতিকভাবে তা প্রতিরোধেরও কোনো অবকাশ থাকে না।