শাইখুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক রহ. প্রতিষ্ঠিত

শাইখুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক রহ. প্রতিষ্ঠিত

কওমী মাদরাসার সরকারী স্বীকৃতির বাড়তি পাওয়ার চেয়ে শিক্ষা ব্যবস্থার স্বকীয়তা-স্বাধীনতার মূল্য বহু বহুগুণ বেশি।

সনদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির বিষয়টি কওমী মাদরাসা মহলে সময়ের আলোচিত বিষয়। বিগত প্রায় ৭/৮ বছর যাবত কওমী ঘরানার সকলে ঐকমত্যে এ ব্যাপারে জোড়ালো দাবি জানিয়ে আসছে। শুরুতে কারো কারো কিছুটা দ্বিমত থাকলেও পরিস্থিতি প্রেক্ষাপট দৃশ্যে কওমী মাদরাসার সনদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির প্রয়োজনীয়তা এক অনস্বীকার্য বাস্তবতায় পরিণত হয়। ধীরে ধীরে তাই এই স্বীকৃতির দাবিতে কওমী ছাত্র-শিক্ষকগণ আরো বেশি স্বোচ্ছার হতে থাকে।
উপনিবেশ কালে ১৮৬৬ সালে ভারতের উত্তর প্রদেশের দেওবন্দ এলাকায় দারুল উলূম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দেবন্দী সিলসিলা তথা কওমী মাদরাসার গোড়া পত্তন। উপনিবেশ কালে ইসলামী শিক্ষা ধ্বংস করে মুসলিম জাতিকে ইসলামী চেতনাশূন্য করার রাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্রের মোকাবিলায় সরকারী নিয়ন্ত্রণের বাইরে থেকে বেসরকারী উদ্যোগে পরিচালনার মূলনীতি নিয়ে যাত্রা শুরু করে এই কওমী মাদরাসা শিক্ষা। ১৮৬৬ থেকে ২০০০ অনেক পরিবর্তন এসেছে। প্রয়োজনীয়তার নতুন নতুন দিক উম্মোচিত হয়েছে। সমাজের সর্বস্তরে অবাধে সহীহ দীনী শিক্ষা ও দাওয়াত পৌঁছানোর এবং স্বদেশের মাটিতে শিক্ষার মর্যাদা লাভের লক্ষ্যে শিক্ষাব্যবস্থার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির প্রয়োজনীয়তা তীব্র হতে থাকে।
অপর দিকে কওমী শিক্ষা শিক্ষাধারা তার স্বকীয় বৈশিষ্টের কারণে সমাজের তৃণমূল পর্যায়ে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে ও পড়তে থাকে। কওমী শিক্ষার এ নিরব বিপ্লব ও ব্যাপক বি¯তৃতি একটা সময় অবধি অনেকের অলক্ষ্যে ঘটতে পারলেও সম্প্রতিক সময়ে এটি ইঙ্গ-মার্কিন নেতৃত্বাধীন পাশ্চাত্য শক্তির উদ্বেগের কারণ হয়ে দেখা দেয়। তারা নড়ে চড়ে বসে। সারা দুনিয়ার আনাচে কানাচে ছড়িয়ে পড়া এই শিক্ষার ব্যাপারে তারা খোঁজ-খবর নিতে আরম্ভ করে। তাদের সামনে এটা সম্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থার বি¯তৃতির চেয়ে আরো বেশি হারে কওমী শিক্ষা বি¯তৃতি লাভ করতে পারে। সরকারী কোনো অনুমোদনের তোয়াক্কা না থাকায় ব্যাপারটি খুব সহজে ঘটে যায়। তাই জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মণ্ডলে এই শিক্ষার ক্রমবর্ধমান বি¯তৃতির রশি টেনে ধরার কৌশল গৃহীত হয়। সঙ্গত কারণেই এই শিক্ষাধারার প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকারী ছাঁচে নিয়ে আসার একটা গরজ ঐ মহলে সৃষ্টি হয়।
এহেন পরিস্থিতিতে কওমী শিক্ষা ব্যবস্থার কাণ্ডারীদের কাঁধে জাতীয় আমানতের ঐতিহাসিক দায়িত্ব। এক দিকে শিক্ষার মর্যাদা লাভ ও দীনী তা’লীম ও দাওয়াতকে নির্বিঘ ও ব্যাপক করার প্রয়োজনে শিক্ষা ব্যবস্থার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবি আদায়। অপর দিকে প্রতিপক্ষের পাঁতা ফাঁদ থেকে কওমী শিক্ষার স্বকীয় চরিত্র ও ভাবাদর্শকে রক্ষা করার এক জটিল চ্যালেঞ্জের মুখোমুখী দাঁড়িয়ে কওমী মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থা।
আমরা গভীর উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করছি যে, সরকারীভাবে এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত কুটিল ও জটিল একটি পথ তৈরি করা হয়েছে। অনৈক্য-বিভাজনের বীজ বুনে দিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে স্বীকৃতির রূপ তৈরি করার শর্ত জুড়ে দিচ্ছে আর অপর দিকে নিজেদের মতো করে একটি সিলেবাস ও রোল মডেল তৈরি করে স্বীকৃতির মুলা ঝুলিয়ে দেওয়ার পাঁয়তারা করছে। এটি এমন এক নাজুক চ্যালেঞ্জ যা সফলভাবে মোকাবিলায় ব্যর্থ হলে এর মাশুল গুণতে হবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে।
আমরা যদি একাধিক পক্ষে বিভক্ত হয়ে সরকারের কাছ থেকে মূলা আনার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হই, তাহলে প্রতিযোগিতার সময় লক্ষ্য আর দৃষ্টি থাকবে শুধু মূলার দিকে; দীন-মিল্লাত ও শিক্ষা ব্যবস্থার স্বার্থের কথা চিন্তা করার সুযোগ থাকবে থোড়াই! সুতরাং এমন অন্ধ প্রতিযোগিতা হবে নি:সন্দেহে চরম আত্মঘাতি। আমরা সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি আহবান জানাই, পরস্পর অন্ধ প্রতিযোগিতার বিপদজনক পথ পরিহার করে সম্মিলিত ও সুপরিকল্পিতভাবে জটিলতম এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুত হোন। ভুলে যাবেন না, সরকারী স্বীকৃতির বাড়তি পাওয়া টুকুর চেয়ে শিক্ষা ব্যবস্থার স্বকীয়তা-স্বাধীনতার মূল্য বহু বহুগুণ বেশি।
আয় তায়েরে নাহুতি
উস রিয্ক সে মওত আচ্ছি
যিস রিয্ক সে হো পরওয়াজ মে কোতাহী