শাইখুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক রহ. প্রতিষ্ঠিত

শাইখুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক রহ. প্রতিষ্ঠিত

একটি পরাধীন দেশের সিলেবাস এবং একটি স্বাধীন দেশের সিলেবাস এক হতে পারে না

মাওলানা লিয়াকত আলী
শিক্ষাসচিব মাদরাসা দারুর রাশাদ
সহ সম্পাদক দৈনিক নয়া দিগন্ত

প্রশ্ন : ব্যতিক্রমধর্মী সিলেবাসের প্রতিষ্ঠান মাদরাসা দারুর রাশাদ প্রতিষ্ঠার পেছনে আপনাদের অনুপ্রেরণা ও লক্ষ্য কী?
উত্তর : আমাদের মাদরাসার মোহতামিম, মাওলানা মুহাম্মদ সালমান দা.বা. কলেজ থেকে মাদরাসায় এসে ভর্তি হন। তখন তিনি দেখেন তার মতো অনেক ছেলে কলেজ থেকে মাদরাসায় আসছে কিন্তু তারা পরিবেশগত আনুকূল্য পাচ্ছে না। বয়সের কারণে অনেকে পাঠ্যক্রম শেষ করতে পারছে না। এরপর তিনি স্কুল কলেজ পড়–য়া ছাত্রদের জন্য স্বল্প মেয়াদী একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠায় অনুপ্রাণিত হন। যার ফল আজকের দারুর রাশাদ। হ্যাঁ, লক্ষ্য হলো, এসব ছেলেদেরকে ভিন্ন ও মানানসই একটি পরিবেশে স্বল্প সময়ে আলেম করে তোলা।
প্রশ্ন: আপনাদের অনুসৃত সিলেবাসের মূলভিত্তি কি?
উত্তর : আমাদের সিলেবাসের মূলভিত্তি হযরত থানবী রহ. রচিত ‘তালখিছাতুল আশার’ এবং পাশাপাশি অন্যান্য মনীষীদের চিন্তা ও দর্শনের প্রতি লক্ষ্য রাখা হয়। চেষ্টা করা হয়েছে যেনো কোনো মৌলিক বিষয় বাদ না যায়। তবে এর চিন্তা ও দর্শনগত ভিত্তি খুঁজতে দেখি হযরত থানবী রহ. ছাড়াও হযরত হুসাইন আহমদ মাদানী, ইয়াহয়া কান্ধলভী, সদর সাহেব রহ. সহ অনেক আকাবির এমনটি ভেবে গেছেন।
প্রশ্ন : আপনি কি মনে হয়, দীনী শিক্ষার মৌলিক উদ্দেশ্যগুলো আপনাদের সিলেবাসের মাধ্যমে অর্জিত হচ্ছে?
উত্তর : মৌলিক উদ্দেশ্য ব্যহত হয় এমন কোনো কিছুই বাদ দেয়া হয়নি এবং দারুর রাশাদের এ যাবত কালের ফলাফল ও অর্জনের দিকে তাকালে আমার মনে হয় মূল উদ্দেশ্য পূরণ হচ্ছে।
প্রশ্ন : আপনারা কি দরসে নেজামীর ওপর আস্থাশীল নন? বা দরসে নেজামী কি বর্তমান যুগে তার আবেদন হারিয়ে ফেলেছে?
উত্তর : আমরা দরসে নেজামীর ওপর পূর্ণ আস্থাশীল। মৌলিক বিষয়ে দরসে নেজামীর আবেদন এখনো অক্ষুণœ রয়েছে। তবে আমরা দরসে নেজামীর প্রয়োজনীয় সংস্কারের কথা বলি। তাতে সংযোজন ও বিয়োজনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করি।
প্রশ্ন: সংস্কারের প্রয়োজন কেনো হলো?
উত্তর : দরসে নেজামীর সূচনাকালে তাতে সমকালীন প্রয়োজনীয় জাগতিক বিষয়গুলোও অন্তর্ভুক্ত ছিলো। কিন্তু ভারতবর্ষ যখন পরাধীন হলো। মুসলমানের তাহজিব-তমদ্দুন ও ধর্মীয় অস্থিত্ব সংকটের মুখে পড়লো। তখন নেহায়েত ধর্মীয় প্রয়োজন সামনে রেখে জাগতিক বিষয়গুলো পাশ কাটিয়ে দরসে নেজামীর একটি সংস্কারকৃত রূপরেখা দারুল উলূম দেওবন্দে চালু করা হয়। এখন মুসলমানের অস্থিত্বের সংকট কেটেছে তাই সমকালীন প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো সংযোজন করতে হবে। একটি পরাধীন দেশের সিলেবাস এবং একটি স্বাধীন দেশের সিলেবাস এক হতে পারে না।
প্রশ্ন : দরসে নেজামীর কোন কোন বিষয়গুলো বর্তমান যুগের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ বলে মনে করেন?
উত্তর : যেমন, দরসে নেজামীতে প্রাচীন যুগের মানতেক,-ফালসাফা ও ফার্সি সাহিত্য পড়ানো হয় এগুলোর পরিবর্তে বর্তমান যুগেরর মানতেক, ফালসাফা, গণিত, বিজ্ঞান, অর্থনীতি, ভূগোল ও ইংরেজি পড়ানো দরকার।
প্রশ্ন : সংস্কার ও সমন্বয়ের নামে বর্তমানে যে স্বেচ্ছাচারিতা হচ্ছে, সে গুলোকে আপনি কিভাবে দেখেন?
উত্তর : স্বেচ্ছাচারিতা হচ্ছে সমন্বয়ের অভাবে। যারা সিলেবাস নিয়ে ভাবছেন, কাজ করছেন সবার উদ্দেশ্য হয়তো ভালো। অভিজ্ঞতা ও দূরদর্শিতার অভাবে ভুলের শিকার হচ্ছে। এক্ষেত্রে বড়রা এগিয়ে আসলে বিশেষ করে বর্তমান মাদরাসা শিক্ষাবোর্ডগুলোর সমন্বয় হলে স্বেচ্ছাচারিতা হতো না।
প্রশ্ন : অনেকে আশঙ্কা করেন, মাদরাসা সিলেবাসে জাগতিক বিষয় ঢুকালে ছাত্ররা জগতমুখি হয়ে যাবে?
উত্তর : দুনিয়ামুখি বা দুনিয়াদার হয়ে যাওয়া নির্ভর করে নিয়তের ওপর। দুনিয়ার উদ্দেশ্য কেউ কুরআন-হাদিস পড়লেও সে দুনিয়াদার। পাকিস্তানের মুফতি রফী উসমানী দা.বা. বলেছেন, জাগতিক বিষয়গুলো পড়ার আগে দুটো বিষয় ঠিক করতে হবে। এক. কেনো পড়বো, দুই. তার প্রভাব ও পরিবেশ কি হবে? অর্থাৎ নিয়ত ও পরিবেশ ঠিক করতে হবে।
প্রশ্ন : একজন ডাক্তারকে যদি ইঞ্জিনিয়ার হতে বলা না হয়। বা ইঞ্জিয়ারকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী তবে আলেমকে কেনো জাগতিক জ্ঞান অর্জন করতে হবে?
উত্তর : এটা একটা ভুল ও স্থূল দৃষ্টান্ত যা অনেকে দেয়। একজন ইঞ্জিনিয়ার রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হবে না। তবে তার রাষ্ট্রের মৌলিক বিষয়ে জ্ঞান রাখতে হবে। ইঞ্জিনিয়ার ডাক্তার হবে না। তবে তাকে স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সম্পর্কে মৌলিক জ্ঞান রাখতে হবে। কিছু বিষয় আছে যেগুলো মৌলিক যেমন, বাংলা, ইংরেজি, সাধারণ গণিত, সাধারণ বিজ্ঞান এগুলোকে বলা হয় কোর সিলেবাস যা নির্ধারিত স্তর পর্যন্ত সকলের জন্য বাধ্যতামূলক। আমরা বলি আলেমরা অন্তত এতোটুকু জানুক।
প্রশ্ন : আল্লামা ইউসুফ বিননূরী রহ. বলেছেন, বর্তমান যুগে ধর্মের সংকট আরো বেড়েছে।’ তাহলে কী ধর্মের বিষয়গুলোকে আরো গুরুত্ব দেয়া যৌক্তিক নয়?
উত্তর : মুসলমানের জাগতিক জীবনও ধর্মের অন্তরগত। সুতরাং জগত-জীবন থেকে বিমুখ থাকলে ধর্মের সংকট বাড়বে বৈ কমবে না।
প্রশ্ন : আপনাদের নতুন প্রতিষ্ঠান জামেয়াতুর রাশাদ সম্পর্কে কিছু বলুন?
উত্তর : জায়েমাতুর রাশাদ বেফাকের সিলেবাস অক্ষুণœ রেখে সাধারণ শিক্ষার মানবিক বিভাগের বিষয়সমূহের সমন্বিত একটি সিলেবাস। এর লক্ষ্য হলো, একটি ছেলে যেনো ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণ করতে গিয়ে জগত-জীবন থেকে বঞ্চিত না হয়। আবার সাধারণ শিক্ষা গ্রহণ করতে গিয়ে ধর্মীয় জ্ঞান থেকে বঞ্চিত না হয়। আলহামদুল্লিাহ! বেফাক ও সমাপনি উভয় পরীক্ষায় ছেলেরা খুব ভালো ফল করেছে।
প্রশ্ন : সর্বশেষ প্রশ্ন। আপনার দৃষ্টিতে একটি বিকাশমুখি সমাজমুখি শিক্ষা সিলেবাসের বৈশিষ্ট্য কি হওয়া উচিত?
উত্তর : একটি সিলেবাসকে আদর্শ সিলেবাস তখনই বলা যাবে যখন তা যুগ ও সমাজের চাহিদা পূরণে সক্ষম হবে। মানুষের ইহকালীন ও পরকালীন প্রয়োজনগুলো তার দ্বারা মিটবে। অর্থাৎ যা পাঠ করলে একটি ছেলে দীন ইসলামের শিক্ষা-দীক্ষা লাভ করবে। খোদাভীরু ও পরহেজগার হয়ে উঠবে অপর দিকে আবার দেশ, জাতি ও সমাজের খেদমত করার মতো যোগ্যতা অর্জন করবে।