শাইখুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক রহ. প্রতিষ্ঠিত

শাইখুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক রহ. প্রতিষ্ঠিত

শাইখুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক রহ. আমার প্রেরণার বাতিঘর মুফতি ফজলুল হক আমিনী

শাইখুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক রহ. ছিলেন অত্যন্ত উঁচুমাপের দার্শনিক ও আলেম। হাদিস শাস্ত্রে তার গভীর পদাচারণার কোনো তুলনাই হয় না। তিনি ছিলেন বর্তমান যুগের শ্রেষ্ঠ হাদিস বিশারদ। এই মাপের যোগ্য বিজ্ঞ হাদিস বিশারদের আবির্ভাব দুনিয়ার বুকে আর হবে কি না তা বলা মুশকিল।

রাজনীতিতে তিনি ছিলেন আমিরে শরীয়ত হজরত মাওলানা মোহাম্মদুল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর রহ.-এর দক্ষিণ হস্ত। ’৮১-এর নির্বাচনের মাধ্যমে হজরত হাফেজ্জী হজুর রহ. যে আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন সেই নির্বাচনী আন্দোলনে হাফেজ্জী হুজুর রহ.-এর শিষ্য-ছাত্রদের মাঝে অনেকেই সরে গেলেও এ নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত শাইখুল হাদিস রহ. স্বক্রীয় ও অগ্রণী ভূমিকা রাখেন। নির্বাচন পরবর্তী সময়ে হজরত হাফেজ্জী হুজুর রহ. খেলাফত আন্দোলন গঠন করলে তিনি মনোনীত হন এই সংগঠনের সিনিয়র নায়েবে আমির।

কর্ম-পদ্ধতিতে মতবিরোধ হওয়া দুনিয়ার একটি স্বাভাবিক নিয়ম। জীবনের শেষ দিকে হজরত হাফেজ্জী হুজুর রহ.-এর সঙ্গে শাইখুল হাদিস রহ. কর্মপদ্ধতির সামান্য অমিল হলেও আজীবন তিনি ইসলামি আন্দোলনের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন।
হজরত হাফেজ্জী হুজুর রহ.-এর আন্দোলনে অংশগ্রহণের আগে তিনি ছিলেন মুজাহিদে আজম আল্লামা শামছুল হক ফরিদপুরী রহ.-এর আন্দোলনের চালিকাশক্তি। তিনি শামছুল হক ফরিদপুরী রহ.-এর সব কর্মকাণ্ডই পরিচালনা করেছেন তার দক্ষিণ হস্ত হিসেবে। সে সময় পার্বত্য চট্টগ্রামে খ্রিস্টান মিশনারিদের ব্যাপক তৎপরতা ছিল। যা বর্তমানেও আরও তীব্র গতিতে অব্যাহত রয়েছে।
হজরত শামছুল হক ফরিদপুরী রহ. খ্রিস্টান মিশনারিদের অপতৎপরতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর লক্ষ্যে গড়ে তোলেন আঞ্জুমানে তাবলিগুল কুরআন নামে একটি দাওয়াতি সংগঠন। তৎকালীন প্রায় সব শীর্ষ আলেমই এই সংগঠনের সদস্য ছিলেন। মুজাহিদে আজম হজরত শামছুল হক ফরিদপুরী রহ. হজরত শাইখুল হাদিস রহ.-এর প্রতি এতই আস্থাশীল ছিলেন যে, তিনি হজরত শাইখুল হাদিস রহ. কে এই সংগঠনের জেনারেল সেক্রেটারির পদে আসীন করে ছিলেন। শাইখুল হাদিসের কর্ম-কৌশল ও কর্ম তৎপরতায় ছিলেন তিনি বিমুগ্ধ। হজরত শাইখুল হাদিস রহ.-এর দক্ষ নেতৃত্বে তখন পার্বত্য অঞ্চলের মিশনারিদের অপতৎপরতা মুখ থুবরে পড়েছিল। তখন যদি তার নেতৃত্বে মিশনারিদের বিরুদ্ধে তাবলিগি কার্যক্রম পরিচালিত না হতো তাহলে বহু আগেই পার্বত্য অঞ্চল পূর্ব তিমুরে পরিণত হতো। সেই সময় সংগঠনের ‘মুবাল্লিগ’ হিসেবে যারা কঠোর পরিশ্রম করেছেন তাদের মাঝে অন্যতম একজন ছিলে হজরত মাওলানা ফজলুর রহমান মাদারীপুর। তিনি ছিলেন শামছুল হক রহ.-এর যোগ্য শাগরেদ ও মুরিদ। এ সব মহান ব্যক্তিত্বের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলেই তখন ভয়ঙ্কর একটি বিপদ থেকে এদেশের অখণ্ডতা রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে।
বাতিলবিরোধী আন্দোলনে মুজাহিদে আজম আল্লামা শামছুল হক ফরিদপুরী রহ. ছিলেন সব সময় সোচ্চার। ইসলামবিরোধী কোনো অপতৎপরতাই তিনি বিনা চ্যালেঞ্জে ছেড়ে দেননি। ফিল্ডমার্শাল আইয়ুব খান পাকিস্তান শাসন করেছেন বেশ শক্ত হাতেই। তার কোনো কাজের সমালোচনা বা বিরোধিতা করার কোনো সুযোগ বা সাহস কারও ছিল না। কিন্তু হজরত শামছুল হক ফরিদপুরী রহ. আইয়ুবের ইসলামবিরোধী সব অপতৎপরতার বিরুদ্ধেই বাঘের মতো গর্জে ওঠেছেন। প্রতিবাদ করেছেন প্রকাশ্যে। প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন সারা দেশে। ডাক্তার ফজলুর রহমান ছিলেন তৎকালীন ইসলামিক একাডেমীর মহাপরিচালক। আইয়ুব খান তাকে দিয়ে একটি সেক্যুলার শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার অপচেষ্টায় লিপ্ত হলে হজরত শামছুল হক ফরিদপুরী রহ. ডা. ফজলুর রহমানের চক্রান্তের বিরুদ্ধ দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলেন। আইয়ুববিরোধী মুজাহিদে আজমের এই আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী ছিলেন হজরত শাইখুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক রহ.।
শাইখুল হাদিস রহ. কে সেই শিশুকাল থেকেই তিলে তিলে গড়ে তুলেছিলেন শামছুল হক ফরিদপুরী রহ.। কারণ তিনি বুঝতে পেরেছিলেন পরিণত বয়সে এই ছেলেটিই হবে ইসলামের অন্যতম কাণ্ডারী।
তাই তিনি বালক শাইখুল হাদিসকে গড়ে তুলেছেন চোখে চোখে রেখে। মন ও আবেগ দিয়ে যোগ্য হিসেবে গড়ে তুলেছেন শাইখুল হাদিসকে। খোদ শাইখুল হাদিস রহ.-এর ভাষ্য থেকেই বিষয়টি একেবারে স্পষ্ট হয়ে যায়। এ সম্পর্কে শাইখুল হাদিস রহ. বলেনÑ
ছদর সাহেব রহ. ছিলে মানুষ গড়ার একটি কারখানা। আমার নিজের কথাই বলি। আমার প্রতি হুজুরের এক খাছ নজর ছিল। ব্রাহ্মণবাড়িয়া মাদরাসায় আমার আব্বা আমাকে হুজুরের কাছে দিয়ে আসলেন তখন আমার বয়স সাত বছর, বেহেস্তি জেওর পড়ি। মালিবাগ খিলগাঁও চৌধুরীপাড়ার মাওলানা ইয়াহইয়া জাহাঙ্গীরের আব্বা মাওলানা সিদ্দিকুর রহমান তখন সেখানে দাওরায়ে হাদিস পড়াতেন হুজুর তাকে ডেকে বলে দিলেন, এই ছেলেটিকে বেহেস্তি জেওর পড়িয়ে দাও। তাছাড়া তখন মাদরাসার ময়দানে প্রতিদিন মক্তব বিভাগের ছাত্রদের জোহর নামাজের প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। আমাকে তার ইমাম বানাতেন। নামাজে কিরাত তাজবিদসহ সব কিছুই জোরে আওয়াজ করে পড়তে হতো। পুরা নামাজের সময় হুজুর পাশে দাঁড়িয়ে থাকতেন। এভাবে হুজুর ছোটকাল থেকেই ছাত্র গড়ে তুলতেন। এরপর হুজুর বড় কাটরা মাদরাসায় চলে আসলেন। রমজানের পর মাদরাসার দরস শুরু হলো। আমি ঈদের পর চলে আসলাম। এখানে আসার পর হুজুর আমাকে ‘ফার্সি কী পাহলি’ কিতাব পড়ালেন। এরপর অসুস্থ্যতার কারণে আর পড়াতে পারেননি। অবশ্য এর আগে তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সিহাহ সিত্তাহ পড়িয়েছেন। লালবাগ মাদরাসাতেও কয়েক বছর হাদিসের দরস দিয়েছেন। এরপরও হুজুর আমাকে প্রতিদিন মাগরিবের পর বিভিন্ন কিতাব পড়াতেন। নাশরুততীব নামক জটিল কিতাব এবং মুনাজাতে মকবুল হুজুর আমাকে আগাগোড়া বিশেষভাবে পড়িয়েছেন। তাছাড়া হুজুর বিভিন্ন প্রশ্ন করতেন। একটি প্রশ্ন এখানো মনে আছে, তোমার বাবার সাথে পীরজি হুজুরের যদি বিরোধ হয়, তবে তুমি কার পক্ষে থাকবে। এ ধরনের নানা প্রশ্ন করতেন। আমার বুঝ মতো উত্তর দিতাম। কিছু বলার থাকলে হুজুর বুঝিয়ে দিতেন। রমজানে হুজুর আমাকে প্রায় বাড়ি যেতে দিতেন না। কান্নাকাটি করেও লাভ হতো না তখন হুজুরের মুতাআল্লিকীনরা আসতো। আমি তাদের মুনাজাতে মাকবুল পড়ে শুনাতাম। হুজুর প্রায়ই সভা সমিতিতে যেতেন। কিন্তু অসুস্থতার কারণে বয়ান করতে পারতেন না। আমাকে সঙ্গে নিয়ে যেতেন। বয়ান করতে বলতেন, হুজুর পাশে বসে থাকতেন। কিন্তু এক ঘণ্টার বেশি বয়ান করতে নিষেধ করতেন। শ্রোতারা অনুরোধ করলে, তাদের বুঝাতেন। অসুস্থতার কারণে পড়াতে পারতো না তাই আমি প্রতিদিন মিশকাত শরিফের ইবারত পড়ে হুজুরকে শুনাতাম। সপ্তাহে দুএকটি শব্দ বলতেন, কিন্তু সেই কথাগুলো ইলমি মাকাম এতা বুলন্দ ছিল যা ভাষায় বর্ণনা করা যায় না। আমি যখন ভারত থেকে দেশে আসলাম, তখন হুজুর আমাকে গওরডাঙ্গা মাদরাসার সালানা জলসায় নিয়ে গেলেন। ওই সময় মাদরাসার যে মসজিদ ছিল তাতে ওই দিন জুমা উদ্বোধন করা হবে। হুজর আমাকে ডেকে বললেন জুমা তোমার পড়াতে হবে। খুৎবা মুখস্ত বলবে। মুহতামিম সাহেবকে ডেকে বললেন, এলান করে দাও, জুমা আজিজুল হক পড়াবে। আর নামাজে যাওয়ার আগে আমার মাথায় হুজুর নিজ হাতে পাগড়ি বেঁধে দিলেন। এই ঘটনা বলছি মানুষ গড়ায় হুজুর কতো আন্তরিক ছিলেন তা বুঝানোর জন্য। মাওলনা আমিনী ও মাওলনা আবদুল হাইকে হুজুর ছেলের মতো মনে করতেন। এ সম্পর্কে একটি ঘটনা মনে পড়ছে। মিশকাত শরিফ দীর্ঘদিন যাবৎ মাওলনা হিদায়াতুল্লাহ সাহেব রহ. পড়াতেন। একজনের কাছেই দীর্ঘদিন যাবৎ কিতাবটি আটকে আছে। তাই উস্তাদদের অনেকেই কিতাবটি পরিবর্তনের পক্ষে ছিলেন। এ নিয়ে মিটিং বসল। কিন্তু কেনো মুদাররিসই মুহাদ্দিস সাহেব হুজুরের কিতাব নিতে সাহস পাচ্ছিলেন না। আমি তখন বুখারি শরিফ জিলদে সানী পড়াই। আমি বললাম, মুহাদ্দিস সাহেব যদি বুখারি শরিফ নেন, তবে আমি মিশকাত পড়াতে রাজি আছি। আমার কথায় সবাই রাজি হলেন। সদর সাহেব হুজুর বাড়ি থেকে এসে জানতে পেরে খুশি হলেন। ওই বছর পড়ালাম। দ্বিতীয় বসর কিতাবটি পড়ানোর ইচ্ছা ছিল না। কিন্তু হুজুর আমাকে বিশেষভাবে ডেকে বললেন, তুমি এ বছরও মিশকাত পড়াও। আমার দুটি ছেলে আছে মিশকাত পড়বে। হুজুর ছেলে বলতে মাওলানা আমিনী আর মাওলানা আবদুল হাইকে বুঝিয়ে ছিলেন। তাই বলছিলাম, যাদের প্রতি হুজুরের দৃষ্টি পড়ত তাদের এভাবে আপন করে নিতেন। ভালোবাসতেন, গড়ে তুলতেন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জামিয়া ইউনুসিয়ার প্রতিষ্ঠাতা হজরত মাওলনা ইউনুস সাহেব রহ. ছিলেন শাইখুল ইসলাম হজরত মাদানীর হ. এর অন্তরঙ্গ বন্ধু মানুষ। তিনি একবার মাদানী সাহেবের কাছে মুদাররিস চাইলেন। তখন হজরত মাদানী রহ. সদর সাহেব রহ. পীরজি হুজুর রহ. এবং হাফেজ্জী হুজুর রহ. এই তিনজনকে পাঠালেন। তিন জনেরই হজরত থানবী রহ.-এর দরবারের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল। হজরত সদর সাহেব রহ. বলতেন, আমি তখন হজরত থানবী রহ. কে জিজ্ঞেস করলাম, মাদানীসাহেব বি.বাড়িয়া যেতে বলেছেন, কি করব? উত্তরে হজরত বললেনÑ যখন উস্তাদ বলেছেন তবে মশওয়ারা কিসের? তখন তারা সকলেই ব্রাহ্মণবাড়িয়া মাদরাসায় যোগ দেন এবং সদর সাহেবকে ‘সদরে মুদাররিস’ হিসেবে নেওয়া হয়। এখান থেকেই সদর সাহেব হিসেবে তার নাম প্রসিদ্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে বড় কাটরা এবং লালবাগ মাদরাসায় আসার পরও এই নামেই তাকে সবাই ডাকতে শুরু করেন।
মুজাহিদে আজম বলা হতো মূলত রাজনৈতিক ময়দানে তার অনবদ্য ভূমিকার কারণে। তৎকালে মুসলিম লীগের পক্ষে প্রচারণা চালানোর জন্য যখন ‘জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম’ গঠিত হয়, তখন তার আটআনা কৃতিত্ব ছিল সদর সাহেবের। পরে নির্বাচনের সময় হুজুর অপরিসীম মেহনত করেছেন। ইত্যাদি কারণে হুজুরের নামের সাথে ‘মুজাহিদে আজম’ যুক্ত হয়ে যায়।
১৯৯৭ সালে লালবাগ জামেয়া থেকে প্রকাশিত স্মারকগ্রন্থ ‘আলোর কাফেলা’য় শাইখুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক রহ.-এর স্মৃতিচারণমূলক লেখা ‘আমার জীবনে সদর সাহেব রহ. লেখা থেকে সংগ্রহিত
বাংলা ভাষায় বুখারি শরিফের অনুবাদ ও ব্যাখ্যা শাইখুল হাদিস রহ.-এর জীবনের এক অমর কীর্তি। তিনিই প্রথম ব্যক্তিত্ব যিনি বুখারি শরিফের মতো বরকতময় এই হাদিসগ্রন্থের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ বাংলাভাষী মুসলমানের সামনে হাজির করার সৌভাগ্য অর্জন করেছেন। তার এই অমূল্য গ্রন্থটি কিয়ামত পর্যন্ত আগত মুসলমানদের কল্যাণ ও উপকারে পথ প্রদর্শকের ভূমিকা পালন করবে বলে আমার বিশ্বাস। তার জীবনে যদি কোনো ভুলভ্রান্তি হয়েও থাকে তবুও আমি মনে করি এই বুখারি শরিফের অমর কীর্তির কারণে আল্লাহ তায়ালা তাকে জান্নাতুল ফিরদাউসের সর্বোচ্চ মাকাম দান করবেন। বুখারি শরিফের অনুবাদের ক্ষেত্রে শাইখুল হাদিস যার প্রেরণা পুঁজি করে এই বিশাল কর্ম-সম্পাদন করেছেন তনি হলেন আল্লামা শামছুল হক ফরিদপুরী রহ.। স্বয়ং শাইখুল হাদিস রহ.-এর জবান থেকে এ সম্পর্কে শোনা যাক। শাইখুল হাদিস রহ. বলেনÑ
হাদিসের বিশুদ্ধতম কিতাব বুখারি শরিফের বঙ্গানুবাদ করার পেছনে মূল প্রেরণা দানকারী হিসেবে কাজ করেছেন হজরত সদর সাহেব হুজুর রহ.। প্রথম যখন আমার মনে এই স্পৃহা জন্ম নিল। তখন আমি একদিন হুজুরকে বললাম, আমার তো বুখারি শরিফের বাংলা অনুবাদ করতে মন চায়। হুজুর বললেনÑ এখন নয়, পরে দেখা যাবে। হুজুরের কথায় তখনকার মতো নিবৃত্ত হলেও মনের স্পৃহাকে দমন করতে পারলাম না। নিরিবিলিতে থাকার জন্য হুজুর বেগম বাজার মসজিদের ইমামের কামরায় থাকতেন। তখন রমজান মাস। বুখারি শরিফের শুরুর দিকে একটি হাদিসের তরজমা এবং ব্যাখ্যা একটু কঠিন। তাই আমার মনে পড়ে, হাদিসের অনুবাদ এবং ব্যাখ্যা একটি কাঠপেন্সিল দিয়ে লিখেই বেগম বাজার মসজিদে গেলাম। প্রথমে আমার ব্যাখ্যা অনুবাদ না দেখেই হুজুরের নিকট হাদিসটির ব্যাখ্যা জানতে চাইলাম। হুজুর তাকরির করার পর আমার লেখাটি দেখালাম। হুজুর অত্যন্ত মনোযোগের সাথে পড়ে খুব খুশি হয়ে বললেনÑ ঠিক আছে, তুমি অনুবাদ লেখা শুরু করো।’ আমি প্রথম দিকের সবলেকা হুজুরকে দেখিয়ে ঠিক করে নিতাম। যা কিছু সংশোধনের তা তিনি করে দিতেন। তাছাড়া দুটি হাদিস পুরোটাই হুজুরের লেখা। একটি হলো হাদিস ‘জিব্রাইল’ ও দ্বিতীয়টি হলো ‘আল হালালু বাইয়্যনুন ওয়াল হারামু বাইয়্যনুন’। এভাবে উৎসাহ ও প্রেরণাই শুধু নয়, এ ব্যাপারে আগাগোড়া তিন আমাকে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। এই সময় হুজুর হজে গেলেন। তখন আমি নিয়মিত লিখছি। ছাপার কাজ আরম্ভ হয়নি। হজ থেকে ফিরে এসে হুজুর আমাকে কিছু কাগজ দিয়ে বললেন, দেখ তো এর ভেতর তোমার প্রয়োজনীয় কোনো কাগজ থাকলে বেছে নাও। আমি দেখলাম, এর ভেতর বুখারি শরিফের হাদিসের অনুবাদ করা আছে। এমনিভাবে হুজুর আগাগোড়া আমার এই কাজে সাহায্য করেছেন।
লালবাগ জামেয়ায় হিদায়াতুন্নাহু থেকে আমার লেখাপড়া শুরু। ভর্তি হওয়ার পর থেকেই শামছুল হক ফরিদপুরী রহ.-এর রুমে থাকার এবং তার খেদমত করার সুযোগ হয় আমার। ওই সময় দেশের সব রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন তিনি। সবদলের বড় বড় লিডাররা তার দরবারে ধর্না দিতেন। তারা হজরতের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরামর্শের জন্য আসতেন। পূর্ব পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর আবদুল মুনয়েম খান, খাজা নাজিমুদ্দীন, খাজা খায়রুদ্দীন, নেজামে ইসলাম পার্টির সভাপতি খতিবে আজম হজরত মাওলানা সিদ্দীক আহমদ রহ., সেক্রেটারি জেনারেল মাওলনা আশরাফ আলী ধর মণ্ডলী রহ. জামায়াতে ইসলামির নেতা মাওলানা মোহাম্মদ আবদুর রহীম, অধ্যাপক গোলাম আযম এমন কি মরহুম শেখ মুজিবুর রহমানও হজরত সদর সাহেব রহ.-এর দরবারে পরামর্শের জন্য আসতেন। সদর সাহেব রহ.-এর একজন নগণ্য খাদেম হিসেবে তিনি আমাকে এসব গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে হজরত শাইখুল হাদিস রহ. কে উপস্থিত থাকতে সংবাদ দেওয়ার দায়িত্ব অর্পণ করতেন। প্রায় অধিকাংশ সময় আমি এই দায়িত্ব পালন করতাম। তিনিও সংবাদ পেয়ে নিয়মিত হজরত সদর সাহেবের সঙ্গে এসব গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ সভাব হাজির থাকতেন। এসব ঘটনা প্রমাণ করে যে, তিনি হজরত সদর সাহেবের খুবই আস্থাভাজন ও বিশ্বস্ত ছিলেন। আর তাই তিনিও তাকে গুরুত্বপূর্ণ সব বৈঠকে আলোচনার দায়িত্বভার অর্পণ করতেন।

আমার সৌভাগ্য বলতেই হয় যে, হিদায়াতুন্নাহু থেকে মেশকাত পর্যন্ত অনেক কিতাবই তার কাছে পড়েছি। মেশকাত শরিফ ও ইবনে মাজাহ শরিফ তার কাছেই পড়েছি। যদিও বুখারি শরিফ তার কাছে পড়ার সৌভাগ্য হয়নি তথাপি হাদিসের উল্লিখিত দুই কিতাব পড়ার মাধ্যমেই তার দরসে হাদিসের মাহাত্ম ও গুরুত্ব অনুধাবন করতে পেরেছি। অবশ্য বুখারি শরিফ যুগের দুই শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস হজরত মাওলনা হিদায়াতুল্লাহ রহ. এবং হজরত মাওলানা মুফতি আবদুল মুঈয রহ. এ কাছে পড়ার সৌভাগ্য হয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা হলো কিতাবি এবং দরসি জ্ঞান ছাড়াও সব বিষয়েই আমি হজরত শাইখুল হাদিস রহ. থেকে দিকনির্দেশনা নিয়েছি। তার ইলমি যোগ্যতা, জ্ঞানের গভীরতা তার সহচার্য নেওয়া ছাড়া অন্য কারও পক্ষে তা অনুমান করা সম্ভব নয়। তিনি মূলত ছিলেন জ্ঞানের সাগর। যে কোনো কঠিন বিষয়কেও তিনি এতো সহজভাবে উত্থাপন করতে পারতেন যা কল্পনার বাইরের বিষয়। কোনো চিন্তা-ফিকির ছাড়াই কঠিন থেকে কঠিনতর বিষয়কেও ছাত্রদের সামনে পানির মতো করে বুঝিয়ে দিতেন। হাদিসের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ, হাশিয়া, টিকা ছিল তার নখদর্পণে। কুরআনের তাফসির, কুরআনের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ বর্ণনায় তিনি ছিলেন অনন্য অদ্বিতীয়। সাধারণ মুসলমানরাও তার কুরআনি ব্যাখ্যা অবলিলায় আত্মস্থ করতে পারত। আমি জ্ঞান চর্চায় তার থেকে যে পরিমাণ উপকৃত হতে পেরেছি, বর্ণনা অপেক্ষা রাখে না। তিনিও আমাকে বেশ øেহ করতেন। অন্তর থেকে দোয়া করতেন। আমার উন্নতি, আমার সফলতায় খুশি হতেন। আমার সমস্যায় তিন সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতেন। ছাত্র জীবন পারি দেওয়ার পর আমার কর্ম জীবনের দীর্ঘ একটা সময় তার সাহচর্যেই কেটেছে। তিনি সব সময় আমাকে সবকাজেই আগে বাড়িয়ে দিতেন।
লালবাগ জামেয়া হজরত হাফেজ্জী হুজুরের ছায়াতলে থেকেই আমাদের কর্ম জীবন চলছিল। ১৯৮১ সালে হজরত হাফেজ্জী হুজুর রহ. রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশ দিলে হজরতের নির্বাচনী জিহাদে আমি এবং হজরত শাইখুল হাদিস রহ. পূর্ণভাবে অংশগ্রহণ করি। নির্বাচন পরবর্তী সময়ে মাদরাসার তৎকালীন শক্তিশালী কমিটি আমাকে এবং হজরত শাইখুল হাদিস রহ. কে মাদরাসার দায়িত্ব থেকে অব্যহতি দেয়। আর হজরত হাফেজ্জী হুজুর রহ. কে আনুষ্ঠানিকভাবে অব্যাহতি না দিলেও আমাদের অব্যাহতির কারণ দেখানো হয় সরাসরি হজরত হাফেজ্জী হুজুর রহ.-এর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ। কমিটির এই অবৈধ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তখন লালবাগ জামেয়ায় ছাত্রদের একটি সফল বিপ্লব সংগঠিত হয়। ছাত্রদের এই সফল বিপ্লবে লালবাগ জামেয়া কমিটির রাহু থেকে মুক্ত হয়। এর পর লালবাগ জামেয়ার প্রিন্সিপালের মহান দায়িত্ব আসে হজরত হাফেজ্জী হুজুর রহ.-এর হাতে। হাফেজ্জী হুজুর রহ. নিজ বয়োবৃদ্ধের কারণে তার কাজের সহযোগিতার জন্য ভাইসপ্রিন্সিপাল হিসেবে আমার ওপর দায়িত্ব চাপিয়ে দেন। আর হজরত শাইখুল হাদিস রহ. কে করেন ভারপ্রাপ্ত প্রিন্সিপাল। এ সময় হজরত শাইখুল হাদিস মাদরাসা পরিচালনার ক্ষেত্রে যে সাহস ও যে হিম্মত যুগিয়েছেন তা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়; তখন তিনি একজন যোগ্য অভিভাবক হিসেবে এবং একজন দক্ষ পরিচালক হিসেবে আমাকে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। তার দিকনির্দেশনার অনুসরণের ফলেই আজও এই প্রতিষ্ঠানটি তার ঐতিহ্য নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।
হজরত হাফেজ্জী হুজুর রহ.-এর ইন্তেকালের পর হজরতের সূচিত ইসলামি আন্দোলনকে বেগবান রাখার ক্ষেত্রে হজরত শাইখুল হাদিস রহ.-এর ভূমিকা অনন্য। বিতারিত তসলিমা নাসরিন বিরোধী যে আন্দোলনের বিস্ফোরণ ঘটেছিল সম্মিলিত সংগ্রাম পরিষদ নামে সেই আন্দোলনের নেতৃপুরুষ ছিলেন শাইখুল হাদিস রহ.। আমি ছিলাম ওই পরিষদের সদস্য সচিব। খতমে নবুওয়তের আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন তিনি, সেখানেও একজন সাধারণ কর্মী হিসেবে হজরতের পাশে থাকার সুযোগ হয়েছে। ইসলামি ঐক্যজোট গঠিত হওয়ার পর দীর্ঘ সময় তিনি এই জোটের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেনÑ আমি ছিলাম তার মহাসচিব। তার বলিষ্ঠ নেতৃত্বের ফলেই ইসলামি ঐক্যজোট তীব্র আন্দেলন গড়ে তুলতে সক্ষম হয়। দেশ-বিদেশে ব্যাপক খ্যাতি অর্জন করে এবং ২০০১ সালে আন্দোলনের মাধ্যমে তৎকালীন আওয়ামী দুঃশাসনের পতন ঘটে। ১৯৯২ সালের ৩ রা ডিসেম্বর ভারতের অযোদ্ধা ঐতিহাসিক বাবরী মসজিদ ধ্বংস করা হলে বাংলাদেশ থেকে ভারতের অযোদ্ধা অভিমুখে লংমার্চ কর্মসূচি ঘোষণা দেন শাইখুল হাদিস রহ.। সেই লংমার্চ কর্মসূচি সফলের জন্য গঠিত হয় লংমার্চ বাস্তবায়ন কমিটি। এ কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন শাইখুল হাদিস আল্লমা আজিজুল হক রহ.। আমি ছিলাম এই কমিটির সদস্য সচিব।
২০০১ সালে হাইকোর্ট থেকে সব ধরনের ফতোয়া নিষিদ্ধ ঘোষিত হলে ইসলামি আইন বাস্তবায়ন কমিটির মাধ্যমে দেশব্যাপী আইন বাস্তবায়ন কমিটির মাধ্যমে যে আন্দোলন গড়ে ওঠে এর নেতৃত্বে ছিলেন শাইখুল হাদিস রহ.। ফতোয়ার জন্য আন্দোলন করতে গিয়ে ২০০১ সালে ৪ জানুয়ারি আমি এবং হজরত শাইখুল হাদিস রহ. এক দিনই গ্রেফতার হই এবং দীর্ঘ চার মাস কারাভোগের পর মুক্তি লাভ করি। চারদলীয় মোর্চা গঠিত হওয়ার পর তিনি ছিলেন এর অন্যতম শীর্ষনেতা। আমি ছিলাম তার মহাসচিব। ওই সময় সারাদেশব্যাপী রোডমার্চসহ যে সব কর্মসূচি পালিত হয় তার সফলতার পেছনে তার ভূমিকা অনন্য।
আলহামদুলিল্লাহ। আমার রাজনৈতিক জীবনের একটি বড় অংশই হজরত শাইখুল হাদিসের পাশে কেটেছে। তিনি ছিলেন একজন সফল ইসলামি রাজনীতিবিদ।
মোটকথা হজরত শাইখুল হাদিস রহ. ছিলেন যোগ্য মানুষ গড়ার কারিগর। তার সফল জীবনের সার্বিক দিক আলোচনা করা আমার পক্ষে সম্ভব নয় তবে তার কর্ম জীবনে তার দাওয়াতি পদ্ধতি আমাদের অনুসরণের প্রত্যয় নিতে হবে। কাজে লাগাতে হতে তার হাদিসের জ্ঞান ভাণ্ডার আমাদের জীবনের ধাপে ধাপে। মুসলিম উম্মাহর হারানো ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারে শাইখুল হাদিসের বাতানো ফর্মুলায় আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে শাইখুল হাদিস রহ.-এর চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে দ্বীনের কাজ করার তাওফিক দান করুন। আমীন।