মুহাম্মদ যাইনুল আবিদীন
৬ জানুয়ারি বর্তমান সরকারের দুই বছর পূর্তি উপলক্ষে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ভাষণ দিয়েছেন। জাতির উদ্দেশে প্রদত্ত এই ভাষণে দুই বছরে সরকারের শুভকীর্তিগুলো তুলে ধরেছেন। ডাল-চাল আর গরিবের চাকরি দানের মতো তুচ্ছ বিষয়গুলো বাদ দিলে প্রদত্ত এই ভাষণকে তারিফ না করে পারা যায় না। অন্তত ভাষণদানে তাকে বাপের কন্যা মানতেই হবে। তবে গত দুই বছরের অর্জনগুলোর মধ্যে প্রধানতম অর্জন-চূড়ান্ত শিক্ষানীতির বিষয়টি যে ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের প্রথম ইটÑ বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী সেভাবে বলেননি। বললে ভালো হতো। আগামী দিনে তার রাজনীতির গতি প্রকৃতি ও অবদান সহজভাবে চিহ্নিত হতে পারত।
বর্তমান সরকারের এই মহৎ অর্জন ‘জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০’ এখনো আমাদের সামনে। প্রায় পনের কোটি মুসলমানের দেশের শিক্ষানীতি এটা। সঙ্গত কারণেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রকাশিত এই শিক্ষানীতি ‘প্রাক-কথন’Ñএ লিখেছেনÑ ‘এই শিক্ষানীতির উল্লেখযোগ্য দিন হলো এখানে ধর্ম, বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষাকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে।’ প্রধানমন্ত্রীর এই বাণীই আমাদের এ পথে ভাবতে সাহায্য করেছে। বিজ্ঞান ও কারিগরি যেমন সময়ের দাবি তেমনি পকেটেরও বন্ধু। পেট ও পকেটের আমন্ত্রণ যেখানে থাকে সেখানে আয়োজন না থাকলেও উপেক্ষা থাকে না। কিন্তু ধর্ম তো আর পেট কিংবা পকেটের আমন্ত্রণ নিয়ে আসে না। তাই ধর্মের ক্ষেত্রে আয়োজন করেও সাড়া মেলে না। বরং উপেক্ষাই সব কিছুকে ছাপিয়ে ওঠে। সেই ধর্মই যদি শিক্ষানীতিতে ‘প্রাধান্য’ লাভ করে তাহলে তো মহাখুশির কথা!
কিন্তু এই খুশি ধরে রাখা কঠিন। কারণÑ উল্লিখিত শিক্ষানীতির ‘প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক শিক্ষা’ ধারারÑ বিভিন্ন ধারার সমন্বয় শিরোনামের অধীনে বলা হয়েছে :
‘২. একই পদ্ধতির মৌলিক শিক্ষা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার বাংলাদেশের সংবিধানে ব্যক্ত করা হয়েছে। সাংবিধানিক তাগিদে বৈষম্যহীন শিক্ষাব্যবস্থা চালু করার লক্ষ্যে সমগ্র দেশে প্রাথমিক স্তরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নির্ধারিত বিষয়সমূহ এক ও অভিন্ন শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচি প্রবর্তন করা হবে। অর্থাৎ প্রাথমিক শিক্ষার বিভিন্ন ধারা যথা সরকারি ও বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কিন্ডারগার্টেন (বাংলা ও ইংরেজি মাধ্যম), ইবতেদায়িসহ সব ধরনের মাদরাসার মধ্যে সমন্বয় ঘটানোর জন্য এই ব্যবস্থা চালু করা হবে। নির্ধারিত বিষয়সমূহ ছাড়া অন্যান্য নিজস্ব কিংবা অতিরিক্ত বিষয় শিক্ষা সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের অনুমতি সাপেক্ষে বিভিন্ন ধারার সন্নিবেশ করা যাবে।
৩. শিক্ষার মান ও শিক্ষার্থীদের দক্ষতা উন্নয়নের লক্ষ্যে ইবতেদায়িসহ সব ধরনের মাদরাসাসমূহ আট বছর মেয়াদি প্রাথমিক শিক্ষা চালু করবে এবং প্রাথমিক স্তরের নতুন সমন্বিত শিক্ষা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করবে।’
উল্লিখিত দু’টি ধারার সারকথা হলোÑ
ক. দেশের সকল প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মাদরাসায় আট বছর মেয়াদি প্রাথমিক শিক্ষা চালু করা হবে।
খ. সকল প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত বিষয়সমূহ এক ও অভিন্ন শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচি অনুসরণ করবে। এবং গ. এই আট বছর মেয়াদি শিক্ষার পাশাপাশি অন্য কিছু পড়াতে চাইলে শিক্ষাসংশিষ্ট অধিদপ্তরের কাছে অনুমতি প্রার্থনা করবে। অনুমিত ‘দান’ করলে অতিরিক্ত বিষয় পড়াতে পারবে অন্যথায় নয়! অবশ্য এরই মধ্যে শিক্ষার্থীদের ওপর যাতে চাপ না হয় সে দিকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। বলার অপেক্ষা রাখে নাÑ অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত সকরকারের নির্ধারিত বিলেবাসের সাথে অতিরিক্তকিছু পড়ালে তো চাপ হবেই। আর চাপকে ‘না’ করে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। সুতরাং ‘সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের অনুমতি’র আর থাকল কি?
তারপর ‘ভর্তির বয়স’ শিরোনামে বলা হয়েছেÑ
‘বর্তমানে চালু ৬+ বছর বয়সে প্রথম শ্রেণীতে ভর্তির নিয়ম বাধ্যতামূলক করা হবে।’ [জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ : ৫-৬ পৃ.]
ফলাফল কি দাঁড়াচ্ছে? ফলাফল দাঁড়াচ্ছেÑ ৬ বছর বাধ্যতামূলক ভর্তি। ৮ বছরের বাধ্যতামূলক সরকারি শিক্ষাসিলেবাস। সুতরাং চৌদ্দ বছর বয়স পর্যন্ত কোনো শিশু চাপ হয় এমন অতিরিক্ত কিছু পড়তে পারবে না। তাহলে কুরআন শরীফ হেফজ করবে কবে? চৌদ্দ বছর বয়স হবার পর? বিষয়টি অভিজ্ঞজনদের কাছে ভয়াবহ! কারণ চৌদ্দ বছর বয়স হবার পর আর কুরআন শরিফ মুখস্ত করার মত মন শক্তি ও পরিবেশ থাকে না। ফলে সরকারের এই সখের আহলাদের ও স্বপ্নের শিক্ষানীতির বাস্তবায়ন রুদ্ধ করে দিবে কুরআন হেফজ করার পথ! জাতি হিসেবে মুসলমানদের জন্যে এরচে’ বড় দুঃসংবাদ আর কী হতে পারে! রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের জন্যেও এরচে’ বড় কোনো অভিশাপ হতে পারে বলে আমাদের জানা নেই।
যারা সচেতন তারা জানেন, কুরআনের হেফজ প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ বিশ্বদরবারে দীর্ঘদিন ধরে একটা সম্মানজনক আসন দখল করে আছে। এই প্রতিযোগিতায় সৌদি আরবের মত আরব এবং ইসলামী রাষ্ট্রগুলোও বাংলাদেশের পাশে দাঁড়াতে অক্ষম। আর আমাদের দেশের সরকার আইন করে রাষ্ট্রকে সম্মানের এই আসন থেকে টেনে নামাচ্ছেÑ এর মর্ম বোঝা কঠিন! এরচে’ও বড় কথা হলÑ পরিপূর্ণ ও যোগ্য আলেম হওয়ার জন্যে কুরআনের হাফেজ হওয়া পূর্বশর্ত। তাই চূড়ান্ত এই শিক্ষানীতি আমাদের ধর্মশিক্ষাকে ‘বামন’ বানিয়ে রাখবে। আর প্রতিটি রমজান মাস খতমে তারাবি’র উদ্ভাসে যেভাবে উৎসবমুখর হয়ে ওঠতোÑ আমাদের আত্মার আশ্রয় মসজিদগুলো হারাবে সে জৌলুস। জীবনে এক পৃষ্ঠা কুরআন না শিখেও যারা হাফেজের পেছনে দাঁড়িয়ে থেকে প্রতি রমজানে সত্তর খতম কুরআন শোনার পুণ্যলাভে ধন্য হতো এই শিক্ষানীতি তাদের কপাল পুড়িয়ে ছাই বানিয়ে দিবে। হতাশ বন্দি শয়তানকে করবে বিজয়ে উদ্ভাসিত। ভাবতে কষ্ট হয়Ñ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই স্বাধীন বাংলাদেশকে দেখতে হবে কুরআনশূন্য সেই হতভাগা বাংলাদেশ!
স্বীকার করিÑ সরকার একটি উদার অর্থবহ ও গ্রহণযোগ্য শিক্ষানীতির জন্যে এ বিষয়ে প্রাজ্ঞ ও পণ্ডিতদেরই দায়িত্ব দিয়েছে। সুতরাং এর মধ্যে যদি গভীর কোনো ষড়যন্ত্র থাকে তাহলে এর দায় প্রথমত ওই পণ্ডিতদেরই নিতে হবে! তবুও কথা থাকেÑ এটা তো বাংলাদেশ। এখানকার নাগরিকদের শতকরা নব্বইজন মুসলমান। এখানে ভোটে জিততে হলে মাথায় হেজাব পরতে হয়। নির্বাচনের আগে ওমরা করতে হয়। রাশেদ খান মেননের মতো মানিককেও নামাজের সময় হওয়ার এক ঘণ্টা আগে গিয়ে মসজিদে বসে থাকতে হয়। বিসমিল্লাহ মুখস্ত না থাকলে কাগজে লিখে হলেও বক্তৃতার আগে সেটা আদরের সাথে তেলাওয়াত করতে হয়। সুতরাং সেই বাংলাদেশের শিক্ষানীতি প্রণয়নের জন্যে কি অবসরপ্রাপ্ত ‘মুসলমান’ শিক্ষাবিদ পাওয়া গেল না? প্রধানমন্ত্রীর ভাষায় ‘ধর্ম’ যখন প্রাধান্য পাবে তখন জাফর ইকবালের মত দাগী ধর্মদুশমনদের কেন সদস্য রাখা হলো?
ভুলে থাকার সুযোগ নেইÑ ইসলামের প্রতি আওয়ামী লীগের বন্ধুত্বকে এদেশের মানুষ কোনো সময়ই উদার চোখে দেখেনি। এ জন্যেই নির্বাচনের আগে দলনেত্রীকে অনেক বেশি ধর্মীয় মেকাপ নিতে হয়। অঙ্গীকার করতে হয়Ñ ক্ষমতায় গেলে কুরআন সুন্নাহবিরোধী কোনো আইন করব না। এদেশের মানুষ সখ করে যে আওয়ামী লীগকে অবিশ্বাসের চোখে দেখে তা কিন্তু নয়। এই সন্দেহ বরং আওয়ামী লীগেরই সৃষ্টি। কয়েকটি ঘটনার উদ্ধৃতি দিইÑ
১. সংবাদ শিরোনাম : মাদরাসশিক্ষার প্রসার মানে জাতিকে অন্ধকারে নেয়া
‘শিক্ষা ক্ষেত্রে সংকট ও করণীয়’ শীর্ষক গোল টেবিল আলোচনা [বুধবার জাতীয় প্রেসক্লাব]
আয়োজক : বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, নারীনেত্রী ও এনজিও কর্মীগণ মাদরাসা শিক্ষাব্যাস্থার সমালোচনা করে বলেছেনÑ এই শিক্ষা জাতিকে পশ্চাৎপদ করে তুলছে। মাদরাসাশিক্ষার প্রসারের অর্থই হলো জাতিকে অন্ধকারের দিকে নিয়ে যাওয়া। মাদরাসাশিক্ষাকে কিছুতেই ইসলামীশিক্ষা বলা যায় না।
প্রফেসর অজয় কুমার রায় তার পুরো বক্তৃতায় মাদরাসাশিক্ষার বিরুদ্ধে বিষোদগার করেন। তিনি বলেন সংবিধানে যখন বিসমিল্লাহ লেখা হয় আমরা এর বিরোধিতা করেছিলাম। এখানেও দেখছি আল্লাহ সর্বশক্তিমান। আল্লাহ সর্বশক্তিমান কি-না আমি জানি না। তবে এ ধরনের কথা ধর্মনিরপেক্ষতা পরিপন্থী।
হেনা দাশ বলেন, মাদরাসাশিক্ষার কারণে দেশে সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদের উত্থান ঘটছে। ঘর্মশিক্ষা বাধ্যতামূলক হওয়ায় সমাজে বিশৃঙ্খলা বাড়ছে।
রোকেয়া কবীর বলেন, মাদরাসাশিক্ষা যদি ধর্মীয় শিক্ষা হয় তবে এ ধর্ম কেউ গ্রহণ করবে না। আল্লাহ রহমত করলে পানি হয় এভাবে বিজ্ঞান শেখালে হবে না। [দৈনিক ইনকিলাব : বৃহস্পতিবার : ২০ জুন ২০০৫]
এই হলো পুরনো আওয়ামী লীগ। তারপর যখন দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় এলো আওয়ামীলীগÑ একেবারে শুরুতেই লতিফ সিদ্দিকী অনুষ্ঠানের শুরুতে কুরআন তেলাওয়াতে নখ বসিয়ে দেন। আইনমন্ত্রী মাদরাসাকে জঙ্গিদের প্রজনন কেন্দ্র বলে বসেন আর ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মাতাল ডিজি বলে বসেনÑ কেবল মুসলমানরাই সন্ত্রাসী হয়। এসব ঘটনা সাম্প্রতিক। যারা পত্রিকা পড়েন তারা এখনো এই কথাগুলো ভুলেননি। এও ভুলেননিÑ যখন বিডিআর বিদ্রোহ হলো কে একজন গবেষক অলিউর রহমান আবিস্কার করলেনÑ সেনাবাহিনীতে নতুন নিয়োগপ্রাপ্তদের ৩৫ শতাংশই এসেছে কওমী মাদরাসা থেকে। তারপর কেচু খুঁড়তে গিয়ে সাপ বেরিয়ে এলোÑ ২০০৫ সালে এই তথ্য প্রচার করে ভারতের আনন্দ বাজার পত্রিকা এবং ২০০৮ সালে একই তথ্য প্রকাশিত হয়েছিল বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়েন নিবন্ধে!
মূলত স্বল্প সময়ে ঘটে যাওয়া এসব ঘটনাই মানুষের মধ্যে আওয়ামী লীগ সম্পর্কে ধর্ম বিষয়ে একটা নেতিবাচক মনোভাব গড়ে তুলেছে। ফলে সদ্য প্রকাশিত শিক্ষানীতি যেই পড়ছে সেই আশঙ্কা করছেÑ সরকার কি জেনে- শুনেই ইসলাম শিক্ষার ভবিষ্যতকে খুন করার জন্যে এই শিক্ষানীতি জন্ম দিয়েছে? সরকারের মনে কি আছে আমরা জানি না। তবে এই শিক্ষানীতির বাস্তবায়ন যদি দেশকে কুরআন-বঞ্চিত করে তাহলে এর দায় আওয়ামী লীগ সরকার কোনোভাবেই এড়াতে পারবে না। আমরা শুধু এই কথাটুকু স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি। আর যাদের জীবন মরণ আল্লাহর জন্যে নিবেদিতÑ তারা তাদের মহান মালিকের কালাম হেফাজতের ব্যবস্থা করবে যথাসময়ে যথার্থভাবেÑ এ নিয়ে আমাদের কোনো সংশয় নেই!!