শাইখুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক
মানুষ সম্প্র্রদায় থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ‘জিন’ নামে একটি সম্প্রদায় এ জগতে বসবাস করছে। সে জিন সম্প্রদায়ের অস্তিত্বকে সম্প্রমাণিত করার উদ্দেশ্যেই ইমাম বুখারী রহ. তার কিতাবে জিনদের আলোচনা করেছেন।
বুখারী শরীফের সুপ্রসিদ্ধ একজন ব্যাখ্যাকার বলেনÑ কুরআন ও হাদীসের স্পষ্ট উক্তিসমূহ এবং সাহাবা ও তাবেয়ীনদের যুগ থেকে সমস্ত ওলামাদের ঐক্যমতপূর্ণ সিদ্ধান্ত এবং পূর্ববর্তী নবীগণ থেকে অকাট্য বিশ্বস্ত সূত্রে পরম্পরা যা বর্ণিত হয়ে আসছে, সেসব দ্বারা জিন সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব সপ্রমাণিত। সুতরাং যুক্তির ধ্বজাধারীগণ কর্তৃক এর অস্তিত্ব অস্বীকার করা কোনো প্রকার দ্বিধার সৃষ্টি করতে পারে না। কাসতালানী : ৫ম খণ্ড, ৩০৩ পৃ:
অধুনা মুসলমান নামধারী কোনো কোনো মানুষ জিনের অস্তিত্ব সম্পর্কে সকল মুসলমানদের আকিদাকে উপেক্ষা করছে। এমনকি স্বীয় পাণ্ডিত্যের বলে তফসীরকার সেজে এ সম্পর্কীয় স্পষ্ট আয়াতসমূহের বিকৃত ব্যাখ্যা প্রদান করার অসাধু চেষ্টা করছে। তাই নিুে জিনদের অস্তিত্ব প্রমাণকারী কয়েকটি আয়াত ও হাদিস বিবৃত হলোÑ
কিয়ামত দিবসে আল্লাহ তা’লার পক্ষ থেকে তিরষ্কারস্বরূপ বলা হবে ‘হে জিন এবং মানব সমাজ! তোমাদের নিকট কী তোমাদেরই মধ্যে থেকে রসূলগণ পৌঁছেনি? যারা তোমাদেরকে আমার আয়াতসমূহ পড়ে শোনাতেন? এবং হিসাব দিবস সম্পর্কে সতর্ক করতেন?
অন্যত্র ইরশাদ করেনÑ অবিশ্বাসীরা কিয়ামত দিবসে বলবেÑ ‘হে প্রভু! মানুষ ও জিন-দুই দলের যারা আমাদের ভ্রষ্ট করেছে তাদেরকে আমাদের দৃষ্টিগোচরে এনে দিন, তাদেরকে আমরা পদদলিত করবো।’ সূরা আহকাফ : ২৯
জিন সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব সম্পর্কে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ পবিত্র কুরআনের ২৯ পারায় বিশেষ সূরা ‘সূরাতুল জিন’। উক্ত সূরাটি সম্পূর্ণরূপে জিনদের একটি বিশেষ ঘটনার বর্ণনা। ঐ সূরার মধ্যে জিন সম্প্রদায় সম্পর্কে বহু তথ্য বর্ণিত রয়েছে। কোনো খাঁটি আলেমের নিকট ঐ সূরাটির শুধু অর্থ জ্ঞাত হলে একটি সাধারণ মানুষ বলতে বাধ্য হবে যে, পবিত্র কুরআনের প্রতি ঈমানদার ব্যক্তি জিন সম্প্রদায় নামে এই জগতের বাসিন্দা বিশেষ সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব সম্পর্কে সন্দিহান হতে পারে না।
পাঠকবর্গ! আমাদের সমাজে কিছু কিছু পণ্ডিত রয়েছে যারা নিজেদেরকে তফসীরকার সাজিয়ে পরিত্র কুরআনের যেসব অপব্যাখ্যা করেছেনÑ তন্মধ্যে আবি®কৃত একটি তথ্য এও যে, জিন নামে কোনো বিশেষ সম্প্রদায় নেই। একজন তো পরিষ্কার লিখেছেনÑ“কুরআনের বর্ণনামতে জিন বলতে এক শ্রেণীর মানুষকেই বুঝাইতেছে।” এমনকি মানুষ জাতির কোনো শ্রেণীটিকে জিন বলে স্থির করবেন সে সম্পর্কেও পণ্ডিত সাহেব কম চেষ্টা করেননি।
আরেক জায়গায় তিনি লিখেছেনÑ আরবের ‘বদ্ধ’ ইউরোপের ‘বেদুইন’ ও আমাদের দেশের বাদিয়া (বেদে) থেকেই উৎপন্ন। ফলে কুরআনে বর্ণিত জিনদের বাস ছিল নাগরিক জীবনের সংশ্রব থেকে দূরে, পাহাড়-পর্বতে ও বন-জঙ্গলে। দুনিয়ার সব দেশের আদিম অধিবাসীদের অবস্থাও এমনই ছিল। হযরত রাসূলে করীম সা. এই বন্য ও পাহাড়িয়া মানুষ (জিনদেরকে) নাগরিক ও সামাজিক মানুষদের সমান পর্যায়ে উপনীত করে দিতেছেন।
উক্ত ব্যক্তির মতবাদের সারমর্ম এই যে,
১। বাস্তবে “জিন” বলতে মানুষ থেকে ভিন্ন কোনো সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব নেই।
২। পবিত্র কুরআনে বিশেষভাবে সূরা জিনের মধ্যে নানা প্রকার বিষয় সম্পর্কে যে, জিনের উল্লেখ আছে, তার উদ্দেশ্যে মানুষেরই একটি শ্রেণী।
৩। “জিন” বলে যে শ্রেণীকে উদ্দেশ্যে করা হয়েছে তারা হলো প্রত্যেক দেশের আদিম অধিবাসীগণ যারা অনুন্নতরূপে পাহাড়ে-জঙ্গলে জীবন-যাপন করে সেই শ্রেণীর মানুষ। তারা ধীরে ধীরে আদর্শবাদী হিসেবে রূপান্তরিত হয়ে নাগরিক ও সামাজিক জীবন লাভ করতে পারে এবং অনেকে তা করেছে।
পাঠকবর্গ! জিন সম্প্রদায় নামে একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব প্রমাণিত করার জন্য আমরা পবিত্র কুরআন থেকে বেশ কিছু আয়াত উদ্ধৃতি করেছি। যেগুলো দ্বারা স্পষ্টত প্রমাণিত হচ্ছে যে, জিন মানুষ সম্প্রদায়ের ন্যায় একটি বিশেষ সম্প্রদায়। জিন এই জগতে বিদ্যমান আছে- যারা অন্যান্য জীব-জন্তু থেকে ভিন্ন। মানুষের ন্যায় আল্লাহ তা‘য়ালার হুকুম-আহকাম আদেশ ও নিষেধাবলী পালনে আদিষ্ট; তা লঙ্ঘনে তারাও দোযখের শাস্তি ভোগ করবে এবং পালনে দোযখ থেকে মুক্তি পাবে। পণ্ডিত সাহেবের মতবাদ উক্ত আয়াতসমূহ ও সকল দলীল প্রমাণাদির সম্পূর্ণ বিরোধী।
এমনকি পণ্ডিত সাহেবও স্বীয় তথাকথিত ‘তফসীরুল কুরআনে’ আলোচ্য আয়াতসমূহ সম্পর্কে স্বীয় মতবাদ অনুসারে কোনো কিছু সরবরাহ করতে সক্ষম হন নাই, হবেও না।
এতদ্ভিন্ন সূরা জিন যার তফসিরে পণ্ডিত সাহেব স্বীয় পলীদ মতবাদের উদগার করেছেন, সে সূরারই একটি আয়াতে আল্লাহ তা‘য়ালা স্বয়ং জিনদের একটি উক্তি করেছেনÑ“আমরা আকাশের নিকটবর্তী হয়েছিলাম; দেখলাম, তা পরিপূর্ণ হয়ে আছে মজবুত রক্ষীগণের ও নক্ষত্রগুলির দ্বারা। আর পূর্বে আমরা তার (আকাশের) বিশেষ স্থানসমূহে বসতাম ( সেখানকার আলোচনা) শ্রবণের উদ্দেশ্যে, কিন্তু এখন যদি কেউ শোনার চেষ্টা করে সে প্রস্তুত অগ্নি-শিখার সম্মুখীন হয়। (আকাশের এই পরিবর্তনের দ্বারা) বস্তুত পৃথিবীর অধিবাসীগণের অমঙ্গলের ইচ্ছা করা হয়েছে কিংবা তাদের পরওয়ারদেগার তাদের জন্য কোনো মঙ্গল সাধনের ইচ্ছা করেছেন-তা আমরা অবগত নই।
হাদীস : ইবনে আব্বাস রা. হযরত রাসূলুল্লাহ সা. থেকে শোনে বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ সা. এক সময় কয়েকজন সাহাবীসহ মক্কা নগরী থেকে বহু দূরে তায়েফ নগরীর নিকটবর্তী ‘ওয়াকায’ নামক প্রসিদ্ধ মেলা বা হাটের দিকে যাচ্ছিলেন। ইতিপূর্বে দুষ্ট জিনগণ যে, আকাশের নিকটবর্তী গিয়ে ফেরেশতাগণের আলাপ আলোচনা থেকে কোনো কোনো তথ্য জ্ঞাত হতো তা বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল এবং সেসব জিনদের প্রতি নক্ষত্র নিক্ষিপ্ত করে তাদেরকে সেখান থেকে বিমুখ হয়ে ফিরে যেতে বাধ্য করা হয়েছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রত্যাবর্তনকারী জিনদেরকে অন্যান্য জিনগণ জিজ্ঞাসা করল, তোমাদের কি অবস্থা? তারা উত্তরে বলল উর্দ্ধ জগতে আমাদের যাতায়াত বন্ধ করে দেয়া হয়েছে এবং আমাদের প্রতি নক্ষত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে। চলো সকলে জগতের চতুর্দিকে তালাশ করে বেড়াই যে, ঐ বস্তুটি কীÑ অত:পর তারা বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়লো।
জিনদের যে দলটি মক্কার পার্শবর্তীসহ ‘তেহামা’ নামক এলাকার প্রতি এসেছিল তারা (মক্কা থেকে একদিনের পথ দূরে অবস্থিত) বতনে-নখলা নামক স্থানের দিকে এলো। তখন ঐ স্থানে রাসূলুল্লাহ সা. ওয়কাযের হাটের দিকে (ইসলামের তাবলীগ উদ্দেশ্যে) যাওয়ার পথে স্বীয় সঙ্গীগণসহ ‘নখলাহ’ নামক স্থানে বিশ্রাম নিতে ছিলেন এবং (উচ্চঃস্বরে কেরাতের সঙ্গে) ভোর বেলার নামাজ আদায় করছিলেন। ঐ জিনগণ কুরআন তেলাওয়াতের আওয়াজ শুনতে পেয়ে তার প্রতি মনোযোগের সঙ্গে লক্ষ্য করত: সেখানে দাঁড়িয়ে গেল এবং দৃঢ় বিশ্বাস করল যে, এটাই সেই বস্তু যার কারণে আকাশের নিকটবর্তী আমাদের যাতায়াত বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। তৎক্ষণাত তারা সেখান থেকে স্বজাতিদের প্রতি ফিরে এলো এবং সকলের সম্মুখে ঘটনা বর্ণনা করলো।
জিন সম্প্রদায়ের নেক-বদ আমলের পরিণাম সম্পর্কে
জিন সম্প্রদায়ের নাফরমানদের শাস্তি মানব সম্প্রদায়ের ন্যায়ই জাহান্নামের আজাব হওয়া সর্বসম্মত। নেককারদের জন্য সুফলের বিবরণে মতভেদ রয়েছে। ইমাম মালেক রহ. বলেন নেককার জিনগণ মানবের মতোই বেহেশত লাভের অধিকারী হবে। আর ইমাম হানীফা রহ. বলেন, নেককার জিনদের প্রতিদান হবে দোযখের আজাব থেকে মুক্তি। তিনি তার দাবির স্বপক্ষে সূরা আহকাফের ৩১ নং আয়াতটি পেশ করেন। উক্ত আয়াতে জিনদের জন্য রসূলের আহবানের প্রতি সাড়া দেয়া ও রসূলের প্রতি ঈমানের প্রতি শুধু গোনাহ মাফ ও দোযখ থেকে মুক্তিরদানের কথা উল্লেখ রয়েছে। বেহেশতদানের উল্লেখ নেই। হতে পার তারা মুসলমানদের মৃত বালকদের ন্যায় বেহেশতে থাকা, চলা-ফেরার সুযোগ পাবে ও বাগ-বাগিচার ফল ফলাদি খেতেও পারবে। তবে এটা সর্বসম্মত যে, জিনগণ মানুষের ন্যায় শরীয়তের আওতাভুক্ত।
হাদিস : আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রা. থেকে বর্ণিত, নবীজী সা. মিম্বারে উপবিষ্ট অবস্থায় ইরশাদ করেনÑ ‘তোমরা সব রকম সাপ মারবে। বিশেষতঃ যে শ্রেণীর সাপের পিঠে দুটি সাদা রেখা থাকে এবং যে প্রকার সাপের লেজ কাটা থাকে। উক্ত শ্রেণীদ্বয়ের সাপ, অতি বিষাক্ত, এমনকি মানুষের চোখের দিকে তার দৃষ্টি পড়লে মানুষের চোখ নষ্ট হয়ে যেতে পারে এবং গর্ভবর্তী তার প্রতি দৃষ্টিপাত করলে তার গর্ভপাত হয়ে যেতে পারে। অতঃপর আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রা. আরও বর্ণনা করেন একবার আমি একটি সাপকে তাড়া করেছিলাম; তখন আবু লুবাবা রা. আমাকে বলল এই সাপ মারবেন না। আমি বললাম রাসূল সা. সাপ মারার নির্দেশ দিয়েছেন। আবু লুবাবা রা. বললেন, উক্ত আদেশের পর গৃহে অবস্থানকারী সাপ মারা নিষেধ করেছেন।
বিশ্লেষণ : গৃহে অবস্থানকারী সাপ মারা নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কে ইমাম মালেক রহ. বলেন, এটা শুধুমাত্র মদীনা এলাকা সম্পর্কে। অন্য সব এলাকায় গৃহে অবস্থানকারী সাপ মারায় নিষেধাজ্ঞা নেই। কারণ, মদিনা এলাকায় কিছু সংখ্যক জিন মুসলমান হয়ে অবস্থান করতো। হয়তো সেসব জিন আত্মরক্ষার উদ্দেশ্যে সাপের আকৃতিতে মানুষের গৃহে লুকিয়ে বসবাস করতো। সে রকম সাপ মারলে ঐ জিনের আপনজনেরা প্রতিশোধ গ্রহণে ক্ষিপ্ত হবে। তাই হয়তো মদিনা এলাকায় ঐ শ্রেণীর সাপ মারায় নিষেধাজ্ঞা ছিল। অবশ্য সাপ মারার ক্ষেত্রে বিষয়টিও লক্ষ্যণীয় যেÑ প্রথমে ঐ সাপকে তিনদিন পর্যন্ত তাকে আল্লাহ ও কিয়ামত দিবস সম্পর্কে সতর্ক করবেÑ যে আমাদেরকে কষ্ট দিও না; তোমাকে যেনো আমরা আর না দেখি। এরপরও দেখা গেলে তাকে মেরে ফেলবে। সত্যিই যদি সাপটি মুসলমান জিন হয়ে থাকে তাহলে আর সে গৃহে থাকবে না। আর সতর্ক করার পরও দেখা গেলে বুঝা যাবে তা শয়তান; তথা মানুষের শত্র“ দুষ্ট প্রাণী প্রকৃত সাপ।