হযরত শাইখুল হাদিস আল্লামা আজীজুল হক আর নেই।

শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক আর নেই

উপমহাদেশের প্রখ্যাত হাদিসবিশারদ, দেশের শীর্ষ আলেম, বিখ্যাত হাদিসগ্রন্থ বোখারি শরিফের প্রথম বাংলা অনুবাদক, ইসলামী আন্দোলনের আপসহীন জননেতা, ইসলামী ঐক্যজোটের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক আর নেই। গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে রাজধানীর আজিমপুরে নিজ বাসায় তিনি ইন্তেকাল করেন (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজিউন)। তার বয়স হয়েছিল ৯৬ বছর। শায়খুল হাদিস দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত রোগে ভুগছিলেন।
তিনি পাঁচ ছেলে, আট মেয়ে, নাতি-নাতনিসহ আত্মীয়স্বজন ও অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। দেশ-বিদেশে তার হাজার হাজার ছাত্র রয়েছে। তার পরিবারের ছেলেমেয়ে, নাতি-নাতনিসহ শতাধিক সদস্য কোরআনে হাফেজ। তার মৃত্যুতে পরিবারসহ সারাদেশে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
শায়খুল হাদিস দেশ-বিদেশে হাদিসবিশারদ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ছয় দশকেরও বেশি সময় তিনি হাদিসের চর্চা ও পাঠদানের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের ইসলামী রাজনীতির পুরোধা ব্যক্তিত্ব। চারদলীয় জোট প্রতিষ্ঠাকালীন তিনি ছিলেন অন্যতম শীর্ষ নেতা। ১৯৯৩ সালে বাবরি মসজিদ ভাঙার প্রতিবাদে যে লংমার্চ হয়েছিল, তাতে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন শায়খুল হাদিস। মোহাম্মদপুর সাতমসজিদ জামেয়া রাহমানিয়া মাদরাসাসহ অসংখ্য প্রতিষ্ঠান তিনি গড়ে তুলেছিলেন। দেশ-বিদেশে তার হাতেগড়া হাজার হাজার ছাত্র হাদিসের চর্চা ও গবেষণায় রত আছেন।
জন্ম : তত্কালীন ঢাকা জেলার মুন্সীগঞ্জ মহকুমার বিক্রমপুর পরগনার লৌহজং থানার ভিরিচ খাঁ গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত কাজী পরিবারে ১৩২৬ বাংলা সনের পৌষ মাস মোতাবেক ১৯১৯ সালে জন্মগ্রহণ করেন শায়খুল হাদিস। তার বাবার নাম আলহাজ এরশাদ আলী ও মা হাজেরা বেগম। তিনি মাত্র পাঁচ বছর বয়সে তার মাকে হারান। এতে নানাবাড়িতে নানি ও খালার কাছে লালিত-পালিত হন তিনি।
শিক্ষাজীবন : গ্রামের মক্তবে কিছুদিন পড়ার পর সাত বছর বয়সে ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া জামেয়া ইউনুসিয়া মাদরাসায় ভর্তি হন। সেখানে মাওলানা শামছুল হক ফরিদপুরীর (রহ.) তত্ত্বাবধানে চার বছর লেখাপড়া করেন। ১৯৩১ সালে ঢাকা বড় কাটারা মাদরাসায় ভর্তি হয়ে ১২ বছর লেখাপড়া করে কৃতিত্বের সঙ্গে মাদরাসা শিক্ষার সর্বোচ্চ ধাপ দাওরায়ে হাদিস পাস করেন। এ সময় আল্লামা জাফর আহমদ উছমানি, আল্লামা রফিক কাশ্মীরি, মাওলানা শামছুল হক ফরিদপুরী, মাওলানা মোহাম্মাদুল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর (রহ.) প্রমুখ বিজ্ঞ হাদিসবিশারদদের কাছে কোরআন ও হাদিসের জ্ঞানলাভ করেন। ১৯৪৩ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য ভারতের বোম্বের সুরত জেলার ডাভেল জামেয়া ইসলামিয়ায় ভর্তি হন। সেখানে মাওলানা শাব্বির আহমাদ উসমানি (রহ.), মাওলানা বদরে আলম মিরাঠী (রহ.) প্রমুখের কাছে শিক্ষালাভ করেন। শাব্বির আহমাদ উসমানি (রহ.) বোখারি শরিফের যে আলোচনা করেন, তা তিনি নোট করে রাখেন। পরবর্তী জীবনে এ ব্যাখ্যাই তার জীবনের বিশেষ সম্বল হয়ে ওঠে। সর্বশেষ ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দ থেকে মাওলানা ইদরিস কান্ধলবির (রহ.) তত্ত্বাবধানে তাফসির বিষয়ে উচ্চশিক্ষা লাভ করেন। পরে তার উস্তাদ মাওলানা শামছুল হক ফরিদপুরীর (রহ.) নির্দেশে ঢাকায় চলে আসেন।
কর্মজীবন : ভারতের অধ্যাপনা শেষ করে ঢাকার বড় কাটারা মাদরাসায় শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন। লালবাগ মাদরাসায় প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে বোখারি শরিফ পাঠ দান করেন। এর মধ্যে তার রচিত বোখারি শরিফের প্রথম বাংলা অনুবাদ প্রাকাশিত হয়। এছাড়া তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগে, বরিশাল জামিয়া মাহমুদিয়া, জামিয়া মুহাম্মাদিয়া আরাবিয়া মোহাম্মদপুর, মিরপুর জামেউল উলুম, উত্তরা দারুসসালাম, লালমাটিয়া জামেয়া ইসলামিয়া, সাভার ব্যাংক কলোনি ও বনানী জামিয়া ইসলামিয়া মাদরাসায় বোখারি শরিফের পাঠদান করেন। ১৯৭৮ সালে কওমি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের (বেফাক) প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি লালবাগ কেল্লা জামে মসজিদ, মালিবাগ শাহী মসজিদ ও আজিমপুর স্টেট জামে মসজিদের খতিব ছিলেন। জাতীয় ঈদগাহেও ঈদের ইমামতি করেছেন কয়েক বছর। আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের শরিয়া বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন তিনি। ১৯৮৮ সালে ঢাকার মোহাম্মদপুরে সাতমসজিদের পাশে জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া গড়ে তোলেন। এর আগে মালিবাগ জামিয়া শরইয়্যায়ও প্রিন্সিপাল হিসেবে কিছুদিন দায়িত্ব পালন করেন।
রাজনৈতিক জীবন : ছাত্রজীবনেই ইংরেজ খেদাও আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন শায়খুল হাদিস। ভোগ করেন ইংরেজদের নির্যাতন। নেজামে ইসলাম পার্টির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তার রাজনৈতিক জীবন শুরু। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সভাপতির দায়িত্ব পান, ১৯৮১ সালে হাফেজ্জী হুজুরের (রহ.) ডাকে খেলাফত আন্দোলনে যোগদান করেন এবং দলের নায়েবে আমিরের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৭ সালে তার নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন। এ সময় তিনি স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে ভূমিকা রাখেন। ১৯৮৯ সালের ৮ ডিসেম্বর খেলাফত মজলিস প্রতিষ্ঠা করে রাজনীতির ইতিহাসে এক ইতিবাচক পরিবর্তন নিয়ে আসেন শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক। ১৯৯১ সালে সমমনা ইসলামী কয়েকটি দল নিয়ে গঠন করেন ইসলামী ঐক্যজোট। তিনি এর চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তার নেতৃত্বে ইসলামী ঐক্যজোট ১৯৯১ সালে সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে একটি আসন (সিলেট-৫) লাভ করেন। ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর ভারত সরকারের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদতে বাবরি মসজিদ ভাঙা হলে এর প্রতিবাদে শায়খুল হাদিস মিছিল, মিটিং ও আন্দোলনে সক্রিয় হন। ১৯৯৩ সালের ২-৪ জানুয়ারি বাবরি মসজিদ পুনঃনির্মাণের উদ্দেশে ঢাকা থেকে যশোরের বেনাপোল হয়ে অযোধ্যা অভিমুখে লংমার্চের নেতৃত্ব দেন। এ লংমার্চে পাঁচ লক্ষাধিক লোক স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেয়।
বাবরি মসজিদ ভাঙার পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরসিম রাওকে বাংলাদেশে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেন এবং বিমানবন্দর ঘেরাও কর্মসূচির ডাক দেন। এতে তত্কালীন সরকার ৯ এপ্রিল ১৯৯৩ সালে তাকে গ্রেফতার করে। জনগণের বিক্ষোভের মুখে অবশেষে ৮ মে ১৯৯৩ সালে সরকার শায়খুল হাদিসকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। আজিজুল হক খেলাফত মজলিসের আমির থাকাকালে ২০০৬ সালে আওয়ামী লীগের সঙ্গে বহুল আলোচিত পাঁচ দফা চুক্তি স্বাক্ষর করেন। পরে অসুস্থতার কারণে তিনি আমির পদ ছেড়ে দেন। পরে অবশ্য আওয়ামী লীগের সঙ্গে করা সেই চুক্তি বাতিল হয়।
রচনা : বাংলা ভাষায় ১০ খণ্ডে বোখারি শরিফের প্রথম বাংলা অনুবাদ করেন তিনি। তার ছাত্রজীবনেই রচিত ১৮০০ পৃষ্ঠার বোখারি শরিফের উর্দু ব্যাখ্যাগ্রন্থ ‘ফজলুল বারি শরহে বোখারি’ পরে পাকিস্তান থেকে প্রকাশিত হয়। আল্লামা জালাল উদ্দিন রুমির মসনবি শরিফের বাংলা অনুবাদ করেন। সত্যের পথে সংগ্রাম, পুঁজিবাদ, সমাজবাদ ও ইসলাম, কাদিয়ানি মতবাদের খণ্ডন, মাসনূন দোয়া সংবলিত মুনাজাতে মাকবূল, সত্যের পথে সংগ্রাম ইত্যাদি তার অনবদ্য গ্রন্থ। তার প্রতিষ্ঠিত বাংলা ভাষায় ধর্মীয় পত্রিকা ‘মাসিক রাহমানী পয়গাম’ দীর্ঘ দুই যুগ ধরে প্রকাশিত হচ্ছে।