শাইখুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক রহ. প্রতিষ্ঠিত

শাইখুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক রহ. প্রতিষ্ঠিত

বাংলা ভাষার শেকড়ের খোঁজে

বেহুলা-লক্ষ্মীন্দরের রূপকথা আমাদের জানা আছে। কাহিনী জানা না থাকলেও বেহুলা-লক্ষ্মীন্দর যে আমাদের বাঙালি সংস্কৃতির-লোককথায় অত্যন্ত প্রতাপশিষ্ট প্রবাদকথা সে ব্যাপারে কম-বেশি সবাই ওয়াকিফহাল। কেবল বেহুলা-লক্ষ্মীন্দর নয় আমাদের বাঙালি রূপকথায় ছড়িয়ে আছে এমন আরো অনেক রূপক কিংবা ইতিহাসাশ্রিত চরিত্র যাদের প্রভাব আমাদের সামাজিক জীবন-যাপনে হরেক রঙে মিশে আছে। এগুলো আবেগী দুর্বলতার বিষয় নয় কিংবা নাক সিঁটকে ছুঁড়ে ফেলে দেয়ার মতো অচ্ছুৎ চিজও নয়। এগুলো ঐতিহাসিক সমাজ-পরম্পরার স্বাভাবিক সাংস্কৃতিক বিষয়। বিগত সমাজের প্রতিচ্ছবি অঙ্কিত থাকে এসব লোক কাহিনীতে।

কেবল বেহুলা-লক্ষ্মীন্দর নয়; কালু-গাজী, সোনাভান, ঈসা খাঁ-স্বর্ণময়ী, মনসা গীতিকা, রাম-লক্ষ্মণ-সীতা, চন্দ্রাবতীসহ আরো অনেক লোকজ-কাহিনী আমাদের সমাজে প্রচলিত রয়েছে। এসব লোককাহিনীর প্রধান আশ্রয় ছিলো পুঁথিতে। সেকালের সাহিত্য বলতে এই পুঁথিকেই বুঝাতো। কবিরা নানাজন থেকে নানা কাহিনী শুনে সেসব ছন্দাকারে পুঁথি লিখতেন। তারপর সেই পুঁথি সুর করে পাঠ হতো গ্রামীণ আসরে। সেখান থেকে ছড়িয়ে পড়তো গ্রাম-গঞ্জে, হাট থেকে মাঠে। পুঁথি হয়ে পড়তো সমাজের সর্বস্তরের মানুষের ‘বাংলাঘরে’র সাহিত্য।

অনেক সময় ধর্মীয় ঐতিহাসিক কাহিনী নিয়েও পুঁথি রচিত হতো। যেমন ষোড়শ শতকের কবি শেখ চান্দ রাসূল সা.-এর বিজয়কাহিনী নিয়ে লিখেছিলেন ‘রসূল বিজয়’। এ শতকেরই আরেক কবি শেখ পরান রাসূল সা.-এর সীরাত নিয়ে লিখেছিলেন ‘নূরনামা’ পুঁথি। এ শতকেরই বিখ্যাত মহিলা কবি ছিলেন চন্দ্রাবতী। তিনি হিন্দুধর্মের দেব-দেবীদের নিয়ে রচনা করেন রামায়ণ। আবার দেখা গেছে সমসাময়িক শাসকদের বিজয়-বন্দনা নিয়েও রচিত হতো পুঁথি। ষোড়শ শতকে ঈসা খানের সমসাময়িক কবি শাহ বন্দে আলীর যেমন ঈসা খানের বিজয়-বন্দনা করে লিখেন

সালার সাজাইয়া যবে আসিলেক রণে

পরাজিত হইল তবে মোঘল পাঠানে

রাজত্ব করিল কায়েম ঈসা খান বীর

গড়িয়া উঠিল জনপদ লোহিত্যের তীর।

পুঁথিসাহিত্য আমাদের এই ‘ঝাক্কাস’ প্রজন্মের কাছে দারুণ বেমানান শোনালেও পুঁথির লুপ্তি কিন্তু খুব বেশিদিনের নয়। আমরা ছোটবেলায় আমাদের দাদা-চাচাদের মুখে হররাত সন্ধ্যায় পুঁথি শুনতাম। বড়বাড়িতে পুঁথিপাঠের আসর বসতো। সুর করে করে পাঠক পড়তেন ‘আল্লাহর নাম স্মরণ করি কাগজ-কলম হাতে ধরি লেখি কিছু ভাবিয়া খোদায় …’।

তবে হিন্দু দেব-দেবীদের কেচ্ছা-কাহিনীনির্ভর রূপকথাই লোককাহিনীর অন্তরালে পুঁথিতে বাঁধা পড়েছে বেশি। অবশ্য এর কারণও আছে। কারণ জানতে কিছুটা গোড়ার দিকে যাওয়া যাক। ত্রয়োদশ শতক এবং তৎপরবর্তী বাংলায় মুসলিম শাসকদের আগমন হয়েছে মূলত আফগান, পারস্য, তুর্কিস্তান বা এতদঞ্চল থেকে। দিল্লির সিংহাসনের শাসকরাও এসেছেন এসব অঞ্চল থেকেই। বস্তুত তাদের ভাষা ছিলো ফার্সি নয়তো আরবি। সে ভাষাতেই তারা প্রশাসনিক, দাপ্তরিক কার্যক্রম চালাতেন। ফলে বাংলাভাষার দিকে মুসলিম শাসকদের সেভাবে নজর দেয়া হয়ে ওঠেনি কোনোকালেই। তবে কোনো কোনো শাসক যদিও পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছেন কিন্তু পরবর্তী শাসকরা তা ধরে রাখার প্রয়োজন বোধ করেননি। যেমন আলাউদ্দীন হোসেন শাহ নিজের দরবারে অনেক বাঙালি কবিদের স্থান করে দিয়েছিলেন।

এই প্রয়োজন বোধ না করার কারণেই বাংলা ভাষাটা দাপ্তরিকভাবে সুলতানী আমলে খুব বেশি কদর পায়নি। ফলে তৎকালীন মুসলমানদের কাছেও এর প্রয়োজনীয়তা কথ্য হয়েই থেকেছে লেখ্য আর হয়ে ওঠেনি। বিশেষ করে ভিনদেশি মুসলমানদের বেলায়। অপরদিকে হিন্দুরা ছিলো সংস্কৃত ভাষার সেবাদাস। কেননা সংস্কৃত তাদের ধর্মগ্রন্থের ভাষা। তাদেরকে এটা শিখতেই হয়। এটা শেখার ফলে বাংলা লেখাপড়াটা তাদের আয়ত্তেই থাকতো। বাংলায় লেখালেখির বিষয়টাও স্বাভাবিকভাবে তাদের দ্বারাই বেশি সংরক্ষণ হয়েছে মুসলমানদের তুলনায়। এ কারণেই বাংলাসাহিত্যে তৈরি হয়েছে দেব-দেবীদের নিয়ে নানা কল্পকাহিনী, অনেক মহাভারত।

আরেকটি কারণও ছিলো। তখনকার মুসলমানরা মনে করতো হিন্দুদের ধর্মগ্রন্থের ভাষা যেহেতু সংস্কৃত তাই এটি তাদের ভাষা। আর বাংলা যেহেতু এ ভাষা থেকেই উদ্ভব সুতরাং এ ভাষা শিক্ষা করা মুসলমানদের উচিত নয়। কিন্তু ভাষা কি আল্লাহ কারো জন্য নির্ধারিত করে দিয়েছেন যে, অমুক জাতি অমুক ভাষায় কথা বলবে, তমুক জাতি বলবে তমুক ভাষায়? বিষয়টি মোটেও এমন নয়। ভাষা আল্লাহ তায়ালার বিশেষ রহমত। এ রহমতকে হেলাভরে তাচ্ছিল্য করা কোনো কাজের কথা নয়। পৃথিবীর সব জনপদে সকল ভাষায় আল্লাহ নবী পাঠিয়েছেন। সংস্কৃত ভাষায়ও যে কোনো নবী আসেনি এর নিশ্চয়তা আপনি কীভাবে দেবেন? হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী পৃথিবীর সকল জনপদে সবভাষাতেই নবী এসেছিলেন। সেমতে কোনো না কোনো নবী এতদঞ্চলেও এসেছিলেন এবং হাদিসের ভাষ্য সত্য জানলে তিনি সংস্কৃত ভাষায়ই কথা বলেছেন। সুতরাং নবী যদি সংস্কৃত কিংবা বাংলাভাষায় কথা বলতে পারেন তাহলে আমাদের বলতে তো কোনো বাধা থাকতে পারে না। আমরা তো আর নবীর চেয়ে বড় পরহেযগার হইনি।

অনেকে ব্যঙ্গ করে বলতে পারেন নিজ দেশে যখন ইসলামের নাম-নিশানা মুছে ফেলার জন্য সেক্যুলারচক্র খড়গহস্ত; সরকার যখন নারীনীতির কাঁধে বন্দুক রেখে ইসলামের বুক বরাবর তাক করে রেখেছে তখন এসব পশ্চাতে হারিয়ে যাওয়া বিষয়-আশয় নিয়ে বাতচিত করাটা নিতান্তই অবিবেচনাপ্রসূত কাজ। আসলে দেব-দেবী আর সংস্কৃত-সংস্কৃতি নিয়ে এতো কথা বলার তাড়নাটি অনেক আশার ভেতর দিয়ে বড় হয়েছে।

আজকের বাংলাদেশের আলেমরা বাংলাভাষায় কথা বলা শিখছে, লেখালেখির হাতেখড়ি নিয়ে নাড়াচাড়া করছে। আশার খবর। কিন্তু কীভাবে শিখছি আমরা? কী শিখছি? গভীরে নেমে কখনো শেকড় খোঁজার চেষ্টা করেছি? অথচ শেকড়ের খোঁজ জানতে হয়, শেকড়ের যতœ নিতে হয়। তাহলেই কেবল বৃক্ষ ছায়াসুনিবিড় পাতাঘন হয়।

ঝড় কাকে উপড়ে ফেলে? প্রবল প্লাবন কাকে ভাসিয়ে নেয়? যার শেকড় গভীরে প্রোত্থিত নয় ঝড় তাকেই উপড়ে ফেলে। ভিত্তি যার মজবুত নয় প্লাবন তাকেই খড়কুটোর মতো ভাসিয়ে নিয়ে যায়। আমাদের চারদিকে প্রবল ঝড়ের প্রতাপ গর্জন করছে। কুরুচির সাহিত্য-সংস্কৃতির প্লাবনে ভেসে যাচ্ছে দেশ-জাতি-বিশ্ব। এমন ঝড়-প্লাবনে সীনাটান করে রুখে দাঁড়াতে হলে শেকড়ের ঠিকানা জানতে হবে। মজবুত পাটাতনে দাঁড়িয়ে যুদ্ধের ভিত গাড়তে হবে। বাংলাভাষায় লিখতে হলে বাংলার শেকড়কে জানতে হবে। অল্পকিছু শব্দ আর ব্যাকরণের প্রথাগত কায়দা-কানুন দিয়ে যুদ্ধজয়ের আশা করা বাতুলতা। এ জ্ঞান দিয়ে হয়তো কিছু সস্তা বাজারি নাম-যশ কেনা যায়, সাহিত্যের অমরত্ব আশা করা যায় না। তরবারীর প্রতিপক্ষ তরবারী দিয়েই দ্বন্দ্বে লড়ে, সুঁই দিয়ে নয়।

তাই বলে আমি বলছি না যে লুপ্ত হওয়া পুঁথিসাহিত্যের নিপুণ সমঝদার হওয়াটা একান্ত আবশ্যক। পুঁথিসাহিত্য আপনাকে একটি জাতির ইতিহাসের সন্ধান দেবে ঠিকই কিন্তু সেখান থেকে নিজের রসদ নিজেকেই জোগাড় করে নিতে হবে। আমরা কি জানি বাংলাভাষায় এপর্যন্ত কতোগুলো সীরাতগ্রন্থ রচিত হয়েছে? বিশিষ্ট গবেষক নাসির হেলাল তার ‘বাংলা ভাষায় সীরাত বিষয়ক গ্রন্থপঞ্জি’ বইটিতে ১০২৮টি সীরাতগ্রন্থের সন্ধান দিয়েছেন। আমরা হয়তো উর্দু-আরবির কয়েকটি সীরাতগ্রন্থের কথাই কেবল শুনেছি, বাংলাভাষায় এতো বিশাল সীরাতরচনা হয়েছে তা কি আমরা কখনো জানতে পেরেছি? এমন আরো অনেক স্বয়ম্ভর অবদান রয়েছে বাংলা ভাষায় মুসলমানদের। পরিতাপের বিষয়, আমরা সেগুলো উদ্ধারে কখনো ত্বরিত তৎপরতা দেখাতে আগ্রহ বোধ করিনি।

তাহলে এই বিশাল সম্ভারের পুনরুত্থান কে করবে? আপনাকেই করতে হবে। এ গুরুভার নিজের কাঁধেই তুলে নিতে হবে। যদি সাহিত্য দিয়ে, কলমের মাধ্যমে জাতিকে জাগিয়ে তোলাটাকে জিহাদ মনে করেন তবে নিজেকেই এগিয়ে যেতে হবে। সম্মুখসমরে আপনিই হবেন জাতির দামামা বাজাবার শিরউঁচু করা মুসলমান।

সা লা হ উ দ্দী ন জা হা ঙ্গী র