মুহাম্মদ যাইনুল আবিদীন
অবশেষে সুপ্রিমকোর্ট ফতোয়া বৈধ বলে রায় দিয়েছে। এর ভেতর দিয়ে আমাদের আাদালত বড় ধরণের একটি কলঙ্ক থেকে জাতিকে মুক্তি দিয়েছে। সব প্রশংসা আল্লাহর। ২০০১ সালে ধর্মাপরাধী আইনজীবী বিচারপতি গোলাম রববানী নাজমুন আরা-‘সব ধরনের ফতোয়া অবৈধ’ বলে রায় প্রদানের মাধ্যমে মুসলিম বাংলার হাইকোর্টকে অপবিত্র করেছিল। রোষে-ক্ষোভে ফেটে পড়েছিল ঈমানদার বাংলাদেশ। শুরু হয়েছিল মাটি-মানুষ ও পতাকার হাজার বছরের ঐতিহ্য উদ্ধারের সংগ্রাম। সাবাস বাংলাদেশ। সাবাস ঈমানদার জনতা। সাহসের মিছিল মুছে দিয়েছে পাপী দুশমনদের কলঙ্কের ছাপ। বিজয়ের সন্দেশ মুঠোয় ভরে ঘরে ফিরেছে সত্যের পতাকাবাহী মানুষের দল। এই ঘটনা আগামী দিনে সত্য-প্রতিষ্ঠার বিপ্লবের পথে বাতিঘর হয়ে থাকবে।
দুই.
ফতোয়া নিষিদ্ধ করে দেয়া হাইকোর্টের রায়ের বিরু দ্ধে আপিল শুনানিতে অ্যামিকাস কিউরি (আদালত সহায়ক আইনজীবি) হিসেবে অভিমত ব্যক্ত করেন দেশের শীর্ষস্থানীয় আইনজীবি-টি এইচ খান, ব্যরিস্টার রফিক উল হক এবং এবি এম নূরু ল ইসলাম প্রমুখ। এতে ফতোয়ার পক্ষে অভিমত দিয়ে ব্যারিস্টার রফিক উল হক বলেছেন-এটি একটি বৈধ বিষয়। ফতোয়া বিজ্ঞ আলেমদের একটি সাংবিধানিক অধিকার। তবে গ্রাম্য সালিশকারীদের ফতোয়ার নামে কোনো আদেশ দিলে তাদের বিরু দ্ধে ফৌজদারি অপরাধ গণ্য করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। তিনি বলেন-ঢালাওভাবে ফতোয়া নিষিদ্ধ করে হাইকোর্ট যে রায় দিয়েছে তা সঠিক হয়নি। কারণ ফতোয়া হুে ছ ব্যাক্তিগত অভিমত। বিজ্ঞ আলেমদের অধিকার রয়েছে এ অভিমত ব্যক্ত করার।
ফতোয়াকে আলেমদের ‘সাংবিধানিক অধিকার’ আখ্যা দিয়ে জ্যৈষ্ঠতম আইনজীবী টি এইচ খান বলেছেন-সংবিধান অনুযায়ি প্রতিটি নাগরিকের স্বাধীন মত প্রকাশের অধিকার রয়েছে। ১০২ অনুুে ছদ অনুযায়ী বিজ্ঞ আলেমদের অধিকার রয়েছে অভিমত দেয়ার। তিনি এও বলেছেন, ফতোয়ার বিরু দ্ধে এই ধরনের রায় দেয়ার অধিকার আদালতের নেই। ফতোয়া নিষিদ্ধ করা হলে, দেশে যৌতুকপ্রথা বেড়ে যাবে। যৌন হয়রানি ও নারী-নির্যাতন বেড়ে যাবে। দেশের পরিস্থিতি ভয়ংকর আকার ধারণ করবে। (ইনকিলাব: ২৬ এপ্রিল ২০১১)
বিজ্ঞ আইনজীবি এবি এম নূরু ল ইসলাম বলেছেন-‘ফতোয়া দেয়ার অধিকার মুফতিদের রয়েছে। সেটা হতে হবে কুরআন ও হাদিসের আলোকে।’ (কালের কন্ঠ:২৮.৪.২০১১)
দেশের বিজ্ঞ আলেমগণ সভা, সেমিনার, মতবিনিময় সভা এবং লেখালেখির মাধ্যমে বার বার একথাই খোলাসা করে বলেছেন-ফতোয়া হলো আমাদের পবিত্র ধর্মের বিধান। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র-সকল ক্ষেত্রে আমাদের ধর্ম আমাদের যে অকাট্য কল্যাণবিধান দান করেছে তাই ফতোয়া। যে কোনো মুসলমান তার প্রয়োজনে বিজ্ঞ আলেমের কাছে এই বিধান জানতে চাইতে পারে এবং জিজ্ঞাসিত আলেমও তাকে সঠিক উত্তর বলে দিতে পারেন বরং ধর্মের আইনে বলে দেয়া তার অধিকার ও কর্তব্য। ধর্মের এ বিধান বর্ণনাটাই ফতোয়া দান। পৃথিবীর কোনো সুস্থ মানুষ এটাকে অবৈধ বলতে পারে না। পৃথিবীর কোনো স্স্থু মানুষ যেটা পারে না- সেটাই পেরেছেন বিচারপতি গোলাম রববানী এবং বিচারপতি নাজমুন্নাহার।
তিন.
বিশ্বাস করি গোলাম রব্বানীর বিকৃত কলঙ্কময় রায় শুনে যারা উল্লাস করেছিল, সুপ্রিমকোর্টের এই সাহসী রায় দীর্ঘ দিন তাদের স্মৃতিতে ‘উড়াল পাদুকা’ হয়ে ঘরে ফিরবে। সেই সাথে এও বলবো- রায়ে বলা হয়েছেÑ‘ধর্মীয় বিষয়ে ফতোয়া দেয়া যেতে পারে।’ তবে যথাযথ শিক্ষিত ব্যাক্তিরাই ফতোয়া দিতে পারবে।’এখানে সবচেয়ে’ গুরু ত্বপূর্ণ যে কথাটি থেকে যাুে ছ, তা হলো অফতোয়াকে ফতোয়া বলে যারা চালিয়ে দিয়ে যারা বারবার জল গোলা করে এসেছে তাদের কি ক্ষতি হবে! আমরা মনে করি ফতোয়া যদি সাংবিধানিক অধিকার হয়, তাহলে রাষ্ট্রীয় বিচারে এর মূল্য অসামান্য। এই সাংবিধানিক অধিকারের মর্যাদা রক্ষার কোনো ব্যবস্থা আদালত দেননি। ফলে বিতর্কের চোরাপথ খোলাই থেকে যাুে ছ। একটা নগদ উপমা দিই।
হালে এদেশের নতুন ধারার একটি দৈনিক ‘ফতোয়া বিষয়ক একটি রিপোর্ট করেছে। মন্তব্যের আগে পুরো রিপোর্টটি তুলে ধরছি!
ফতোয়ার আরেক শিকার
অসামাজিক কাজে জড়িত থাকার মিথ্যা অপবাদে এবার বগুড়ার আদমদিঘীতে ফাতোয়া দিয়ে এক গৃহবধুর মাথা ন্যাড়া করেছে গ্রাম্য মাতব্বররা। শুধু তাই নয়। তারা লাভলী বেগম নামে ওই গৃহবধু এবং তার পরিবারের সদস্যদের দু’দিন বাড়িতে আটকে রাখে। দুদিন পর রোববার রাতে লাভলী ও পরিবারের সদস্যরা দুপচাঁচিয়ায় এক আত্মীয়ের বাড়িতে পালিয়ে যান। পরে একটি বেসরকারি সংস্থা পরিচালিত হিউম্যান রাইটস এ্যান্ড লিগ্যাল এইড সার্ভিস কর্মীদের সহায়তায় লাভলী আদমদিঘি থানায় মামলা করে। আদমদিঘি উপজেলার বিনাহালী গ্রামের আবু তালেবের মেয়ে লাভলী বেগম ও তার স্বামী পাশ্ববর্তী অর্জুনগড়ি গ্রামে আব্দুল করিমের ছেলে আব্দুল কাদিরে প্রায় ৫ বছর আগে ছেলেমেয়েদের নিয়ে কাজের সন্ধানে ঢাকায় যান। সেখানে তারা গার্মেন্টে কাজ শুরু করেন। দু’মাস আগে স্ত্রী-সন্তানকে রেখে কাদের এলাকায় ফিরে আসেনÑ এলাকায় ফিরে তিনি স্ত্রীর বিরু দ্ধে অসামাজিক কাজে জড়িত থাকার অপবাদ দিয়ে প্রচারণা শুরু করেন।
লাভলী বেগম অভিযোগ করেন, ঢাকাতে গিয়ে কাদের মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে। কাজ ছেড়ে দিয়ে লাভলীর আয়ের টাকায় নেশা করতো সে। একপর্যায়ে লাভলী টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাদের মধ্যে দন্ধ দেখা দেয়। স্ত্রীর কাছে টাকা না পেয়ে কাদের বিভিন্ন স্থানে ধার-দেনা করে করে দু’মাস আগে পালিয়ের যায়। গত শুক্রবার লাভলী ঢাকা থেকে বিনাহালী গ্রামে বাবার বাড়ি বেড়াতে এলে কাদের হঠাৎ করেই গ্রামে সালিশ ডাকে। শালিশ চলাকালে গ্রামের মাতব্বর সাদেক হোসেন বাবুসহ বেশ কয়েকজন তার মাথা ন্যাড়া করার ফতোয়া দেন। কাঁচি দিয়ে তার চুল কেটে পরে ব্লেড দিয়ে মাথা ন্যাড়া করা হয়। মাতব্বর উজ্জ্বল, মোজাফফর, শফিকুল ও তার স্বামী আব্দুল কাদের এ কাজে সহযোগিতা করেন। এরপর তাদের বাড়ি থেকে বের হওয়ার ওপর মাতবররা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। রোববার পর্যন্ত তারা বাড়িতে একপ্রকার বন্দিই ছিলেন। তবে ওইদিন রাতে সকলের অগোচরে তারা তার পাশ্ববর্তী দুপাচঁচিয়া উপজেলায় এক আত্মীয়ের বাড়িতে গিয়ে আশ্রয় নেন। গতকাল হিউম্যানরাইটস আ্যান্ড লিগ্যল এইড সার্ভিস কর্মীদের সহযোগিতায় লাভলী আদমদিঘি থানায় স্বামী আব্দুর কাদের ছাড়াও গ্রামের চার মাতব্বরের বিরু দ্ধে নারী-শিশু নির্যাতন ও শ্লীলতাহানির অভিযোগে মাললা দায়ের করেন।
আদমদিঘি থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মোতালেব হোসেন মামলার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, মামলার পর থেকেই আসামিদের ধরতে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। (আমাদের সময় : ১০ মে ১১)
প্রশ্ন হলো, এই রিপোর্টে উল্লিখিত ঘটনাটির কোথাও কি ইসলামের পবিত্র ফতোয়ার সামান্য ছোঁয়া আছে? কিংবা কোনো আলেম মুফতি বা ইমামের নাম? তাহলে গ্রাম মাতব্বরদের এই অবাধ মাস্তানিকে ফতোয়া বলা হুে ছ কেন? উত্তর মহল! যৌনবাদী বুদ্ধিজীবিদের ফতোয়াবিরোধী ক্ষেত্র তৈরি করাই এর লক্ষ্য! তারপর মানিক বুদ্ধিজীবীরা কি বলবেন- ভাবতে অবাক লাগে, আমাদের বিশেষজ্ঞ আইনজীবীরা কি সংবাদপত্র পড়েন না? হয়তো তাদের কর্মব্যস্ততা সেক্ষেত্রে বড় বাধা, তবু তাদের পেশার কারণেই বোধ হয় কাগজ- পড়াটা জরু রি। তাহলে দেখতে পেতেন ফতোয়াবাজী কতো নারীর সর্বনাশ করেছে, জীবন নিয়েছে। (কালের কণ্ঠ ১২ মে,১১)
কথাগুলে, বলেছেন- কবি ভাষাসংগ্রামী ও গবেষক আহমদ রফিকÑ তার সাদা কালো কলামে! বলেছেন ব্যরিস্টার রফিকুল হক সাহেবদের ফতোয়ার পক্ষে রায় দানের প্রতিবাদে! কথার পিঠে কি আমরাও বলতে পারি না? গবেষণা ও লেখালেখির দেশাজগত প্রয়োজনেই কি ফতোয়া বিষয়ে ভিন্নমত দেয়ার আগে অন্তত ফতোয়ার পরিচয়টা জানা জরু রি ছিল না? তবে কাজের কথা হলো, ফতোয়ার পক্ষে যারা বিলাপ করেছেন তাদের পথ আরো বাকি! যৌনবাদী আঁধারমিত্র কবি সাংবাদিক বুদ্ধিজীবী ও তরু ণীপ্রিয় অধ্যাপকদের হাত থেকে ফতোয়াকে বাঁচাতেই হবে। এর জন্যে সুস্পষ্ট আইন, অফতোয়াকে ফতোয়া বলে যারা মানবাধিকারের পথে কাঁটা ছড়ায় তাদের আইনের সামনে দাঁড় করতে হবে। লাখ লাখ শহীদের রক্তে কেনা স্বাধীন রাষ্ট্রের সবুজ জমিনে দেশের ঈমানদার নাগরিকগণ নির্বিঘেœ ধর্ম পালন করতে পারবে না; বিলুপ্তপ্রায় ডাইনোসর প্রজাতির কালো বুদ্ধিজীবীরা আমাদের ধর্মের পাক বদনে যখন তখন চিমটি কাটবেÑআর আমরা নীরবে তামাশা দেখব? এটা ভারত নয়Ñ বাংলাদেশ।
নিজেদের জন্যে বলি, চোর পুলিশের আগমনকে স্বাগত জানাবে না এটাই স্বাভাবিক। গেরস্থ জেগে গেলে চোর আবোল তাবোল বকবেই। জালেম অবিচারী অত্যাচারী শোষক আইয়ুব খানের জন্য মওলানা ভাসানীর ‘খামোশ’ যেমন, সকল অনিষ্টের সওদাগর আমাদের কথিত আধুনিক সংস্কৃতিজীবী কটি সাংবাদিক অধ্যাপকের জন্য ‘ফতোয়া’ কথাটিও তেমন। তাছাড়া ফতোয়া তো অপরাধির চোখে চোখ রেখে তর্জনি ওঠিয়ে মওলানা ভাসানীর ‘খামোশ’ ছাড়া আর কিছু না। তাই শোষক পাকিস্তানীদের মতো সব অপরাধই ভয় পায় এই ফতোয়াকে।
ঢাকা. ২৪.২৫.১১