কোটি হৃদয়ের আলোর মিনার একজন শায়খুল হাদিস একটি জামিয়া ও কিছু স্মৃতি

কামরুল হাসান রাহমানী

আশির দশকের শেষের কথা। আমি তখন দুরন্ত কৈশোর পার করছি। হাফেজ্জি হুজুর, বটগাছ, খেলাফত আন্দোলন, শায়খুল হাদিস এই শব্দগুলো তখন শহরের গণ্ডি পেরিয়ে অজপাড়াগাঁয়ের মানুষেরও মুখে মুখে। আমার বাংলা শিক্ষিত বাবা আলেম-ওলামা বা রাজনীতি সচেতন ব্যক্তি পেলেই অক্টোপাসের ন্যায় আঁকড়ে ধরেন। আর বাড়ি ফিরে প্রবল আগ্রহ নিয়ে গল্পের ঝাঁপি খুলে বসেন। অগ্র-পশ্চাতের ধারাবাহিকতা আমরা বুঝি না, হয়তো তা বোঝার বয়সও ছিল না। তবুও  রাজ্যের বিস্ময় নিয়ে গোগ্রাসে গিলতে থাকি। কৌতূহলবশত হয়তো কখনো-কখনো দু’একটি প্রশ্নও করি। আমাদের কৌতূহল নিবারণের প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা চলতে থাকে বড়দের। এসব আলোচনা-পর্যালোচনার সূত্রধরেই এককালের স্কুল শিক্ষক আমার বাবা এবং সত্তুর দশকের আলিয়া মাদরাসা পড়–য়া আমার মা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন তারা তাদের সকল সন্তানকে কওমি মাদরাসায় পড়াবেন এবং যথাসম্ভব শায়খুল হাদিসের তত্ত্বাবধানেই।

বড় এবং মেজোভাই তখন অলরেডি কওমি মাদরাসায় অধ্যায়নরত। তাদের ওপর মা-বাবার পক্ষ থেকে বরাবর চাপ বাড়ছিল শায়খুল হাদিসের মাদরাসায় ভর্তি হওয়ার জন্য। বিশেষত বড়ভাই ওপরের দিকে পড়ায় মূল চাপটা তার ওপরই ছিল। নানা অজুহাতে তিনি সময় নিচ্ছিলেন। অজুহাত বলতে, হুজুর নিচের দিকে পড়ান না, ঢাকা শহরে পড়ালেখার খরচ অনেক, খাওয়া দাওয়ার সমস্যা, তাই আরও ওপরের জামাতে গিয়ে ভর্তি হব ইত্যাদি। যাহোক একপর্যায়ে বড় ভাই শায়খুল হাদিসের মাদরাসায় হাজির হলেন। হুজুর তখন জামিয়া মুহাম্মদিয়া ছেড়ে বর্তমানের রাহমানিয়ার অদূরে নূর হোসেন  কোম্পানীর নির্মাণাধীন বিল্ডিং, সাত মসজিদ এবং মসজিদ সংলগ্ন টিনের ছাপড়া মিলিয়ে তার মাদরাসার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। যতদূর মনে পড়ে আমি সেই সময় সর্বপ্রথম ঢাকা আসি বেড়াতে। বেড়ানো বলতে হযরত শায়খুল হাদিস এবং তার জামিয়া দেখা। মনে পড়ে বড় ভাই থাকতেন সাত মসজিদে। তখন বর্ষাকাল। এই রোদ এই বৃষ্টি। চৈত্র্যের কাঠফাঁটা রৌদ্র উপেক্ষা করেই চলতো পঠন-পাঠন। ইলমে ওহীর সুমধুর তানে যখন পুরোমাত্রায় মুখরিত সাতমসজিদ চত্বর, হঠাৎ শুরু হতো বৃষ্টি। রোদের মতো বৃষ্টিতো আর উপেক্ষা করা যায় না। অগত্যা শুরু হয় ছোটাছুটি। খাতা-কিতাব বাঁচানোর জানতুড় মেহনত। একই অবস্থা পাশের টিনশেড ঘরটিরও। মেঝেতে ইট বিছানো স্যাতসেঁতে পরিবেশ। সূর্যের শাসন আর আষাঢ়ের বর্ষণ সমান সমস্যার কারণ। সম্ভবত সাতমসজিদ গম্বুজের দোতলায়ও থাকতো ছাত্ররা। সে এক অকল্পনীয় দৃশ্য। মানুষ জানতো আগুনের পরশে পঙ্গপালের জীবন উৎসর্গের কথা। আর জামিয়ার শুরুর দিনগুলিতে রচিত হলো শায়খুল হাদিসের জন্য প্রিয় ছাত্রদের জীবন উৎসর্গের নতুন ইতিহাস। দারুসসুফফা আর দারুল উলূম দেওবন্দের ঈমান জাগানিয়া উপাখ্যানের নতুন অধ্যায় রচিত হয় শায়খুল হাদিস ও তার সন্তানতুল্য ছাত্রদের মাধ্যমে। যে ইতিহাসকে কলমের আঁচড়ে চিত্রায়িত করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

সেই সফরে যদিও শায়খুল হাদিসকে নামেমাত্র দেখতে পেরেছিলাম, কিন্তু আজকের অবয়বে তখনো অস্তিত্বহীন জামিয়ার উস্তাদ-ছাত্রদের ত্যাগ আর কুরবানির জান্নাতি দৃশ্য আমাকে এক অদৃশ্য মায়াজালে আবদ্ধ করে ফেলেছিল। শায়খুল হাদিস আর তার জামিয়ার প্রেমে ততদিনে আমি পাগলপ্রায়। এই সফর পর্যন্ত আমি স্কুলের ছাত্র। ঢাকা থেকে বাড়ি ফেরার পর স্কুলের পাঠ শিকেয় তুললাম। আমার ধ্যানে-জ্ঞানে তখন পুরামাত্রায় মাদরাসা স্থান করে নিয়েছে। বড় ভাই মাওলানা এনামুল হক দাওরা ফারেগ হয়ে শায়খুল হাদিসের পরাপর্শে রাহমানিয়ায় উস্তাদ হিসেবে খেদমতে নিয়োজিত হলেন। আমি স্কুলের পড়ার ফাঁকে ফাঁকে মাদরাসার প্রাথমিক কিতাব পড়া শুরু করলাম। ওই বছরটি শেষ করে আর স্কুলে ভর্তি হলাম না। এলাকার মাদরাসায় মিজান পর্যন্ত মাদরাসার কিতাবপত্র একবছরে শেষ করলাম। মক্তব, নাজেরা ও কিতাববিভাগের নাহবেমির পর্যন্ত প্রায় ৬ থেকে ৮ বছরের বি¯তৃপ্রান্তর। যা আমি মাত্র দুবছরেরও কম সময়ে অতিক্রম করি। অবশ্য এই কৃতিত্বের কারামতি দ্রুতই আমার সামনে উদ্ভাসিত হয়েছিল।

 

একানব্বই শেষ বিরানব্বই শুরু। ঈদুল ফিতরের কয়েকদিন পর বড় ভাইয়ের সঙ্গে রাহমানিয়ার পথে রওনা হলাম। আমার মধ্যে সে কী আবেগ, উৎকণ্ঠা আর উত্তেজনা। লিখে বোঝানো যাবে না। আমি যে রাহমানিয়ায় যাচ্ছি এবং নাহবেমিীর জামাতে ভর্তি হচ্ছি তা এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছিল। পড়েছিল না, আসলে ছড়িয়ে দিয়েছিলাম। প্রবাদ আছে, পাঠায় কুঁদে খুঁটার জোরে। আমার অবস্থাও তাই। বড় ভাই রাহমানিয়ার উস্তাদ। আমাকে আর ঠেকায় কে? মা গভীর রাত পর্যন্ত আমার সামানপত্র ঠিকঠাক করলেন। সাতসকালে মা-বাবা, ভাই-বোন, পাড়া প্রতিবেশীরা অনেকদূর পর্যন্ত আসলেন আমাদের বিদায় জানাতে।

পেছনে ফিরে দেখছিলাম আর চোখ মুছছিলাম। একসময় সবকিছু দৃষ্টির আড়ালে ঢাকা পড়লো। কল্পনার পর্দায় আস্তে আস্তে রাজধানী ঢাকা ও মাদরাসার দৃশ্যাবলী উদ্ভাসিত হলো। হযরত জাফর আহমাদ ওসমানী, শামসুল হক ফরিদপুরী, হযরত হাফেজ্জি হুজুর, হযরত মুহাদ্দিস সাহেব হুজুর, হযরত শায়খুল হাদিস দা.বা.সহ জগৎবিখ্যাত মনীষীগণের পদধূলিতে একসময় যে জামিয়াটি ছিল বাংলার জমিনে এক কিংবদন্তির নাম, সেই জামিয়া ততদিনে তার দিপ্রহরের তেজস্ক্রিয়তা হারিয়ে বিকালের সূর্যের রূপ ধারণ করেছে। আর খরস্রোতা নদী যেমন বাধা পেয়ে খুঁজে নেয় নতুন গতিপথ, মিলিত হয় নতুন মোহনায়- জামিয়া রাহমানিয়া তখন সেই খরস্রোতার নতুন মোহনা। যেই মোহনায় ঠাঁই নিতে তখন পঙ্গপালের মতো ছুটছে ইলমপিপাসু হাজারো বনিআদম। আস্তে আস্তে আপনজনদের স্মৃতি অপসারিত হয়ে সে স্থান দখলে নিল এই জামিয়া। কল্পনায় স্বপ্নের জাল বুনতে বুনতে আসরের সময় রাহমানিয়ায় হাজির হলাম। জামিয়া ততদিনে ফুলে ফলে সুশোভিত এক ষোড়শীর রূপ নিয়ে পথিকের হৃদয় হরণে পুরোমাত্রায় তৎপর। পুরোনো ভবনের পাঁচতলার নির্মাণ সমাপ্ত। চলছে রং ঢংয়ের কাজ। তিন তলার কাজ যখন চলমান তখন আরও একবার এসেছিলাম। কলেবর বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় সে অংশকে পাঠক সম্মুখে আনা হলো না। হযরত শায়খুল হাদিসের ৫০ সালা সম্মেলনস্মারকের একটি লেখায় সেই সফরের কিছু স্মৃতি স্থান পেয়েছে।

কিছু পাঠকের মনে কৌতূহল সৃষ্টি হতে পারে যে, জামিয়া রাহমানিয়ায় তো বিল্ডিং একটাই। এখানে নতুন-পুরাতন এলো কী করে। তাদের জ্ঞাতার্থে বলছি, মাঝখানের সিঁড়িসহ উত্তরদিকের পাঁচতলা বিল্ডিংটি সম্পূর্ণ হওয়ার অনেকদিন পর দক্ষিণদিকের সিঁড়িসহ নতুন বিল্ডিংটি নির্মিত হয়। কিন্তু দুটি বিল্ডিং এর মাঝে কোনো ব্যবধান না রাখায় নির্মাণ সমাপ্তির পরের দর্শকদের নিকট একটি ভবন রূপেই পরিচিতি লাভ করেছে।

যাহোক, মোঘল সম্রাজ্যের স্থাপত্যশিল্পের অপূর্ব নিদর্শন- উপমহাদেশের অসংখ্য পুরাকীর্তির অন্যতম ঐতিহাসিক সাতমসজিদে আসর নামাজ পড়লাম। সম্ভবত শাওয়াল মাসের ৮ তারিখ। পুরোমাত্রায় ভর্তির কাজ চলছে। দফতর ও এর আশপাশে তিল ধারনের ঠাঁই নাই। ইলমেওহীর মধু সন্ধানীরা শায়খুল হাদিসের এই কাননে জায়গা করে নেওয়ার মানসে প্রাণান্তকর প্রচেষ্ঠা চালিয়ে যাচ্ছে। আমি হজরেআসওয়াদে পৌঁছার মতো আস্তে আস্তে দফতরের গ্রিল পর্যন্ত পৌঁছতে সক্ষম হলাম। হযরত আসাতিযায়েকেরাম ভর্তির কাজকর্মে ব্যস্ত। শায়খুল হাদিস  ব্যতীত আমি আর কাউকেই তেমন একটা চিনি না। লক্ষ করলাম হুজুর দফতরে নেই। চার-পাঁচজনের কাছে জিজ্ঞেসা করলাম হুজুর আসবেন কি না। মনে হলো আমার এই প্রশ্নে তারা মহাবিরক্ত। কারণ দফতর ও এর আশপাশে তখন কিয়ামতে ছুগরা চলছে। সকলেই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত। অন্যের কথায় মনোযোগ দেওয়ার মতো সামান্য ফুরসতও কারও নেই। মানুষের আধিক্যে ছোট ছোট শব্দগুলোর সমন্বয়ে শব্দতরঙ্গ বয়ে যাচ্ছে। বার বার ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে, সকলেই চুপ থাকুন এবং বলা যায় চুপই আছে। কিন্তু আওয়াজ থামছে না।

হঠাৎ চতুর্দিক নিরব নিস্তব্ধ। কোনো শব্দ নেই, আওয়াজ নেই, নেই কোনো নড়াচড়া। যাকে বলে পীনপতন নিরবতা। পরিবেশের এই আমূল পরিবর্তনে আমি চকিত হলাম। কারণ অনুসন্ধানে নিজ মস্তিস্ককে কাজে লাগানোর পূর্বেই পেছনে তাকিয়ে দেখি মুসা আ. আর তার উম্মতের পারাপারের জন্য নীলনদের রাস্তার ন্যায় এক বিরাট রাস্তা তৈরি হয়েছে। করিডোরের দুই দিকের দেয়াল ঘেষে জমাট পানির ন্যায় দাঁড়িয়ে আছে নতুন-পুরাতন ছাত্ররা। আর সীমাহীন বিনয় ও নম্রতা নিয়ে অত্যন্ত সাদাসিধে পোশাকে অনুচ্চস্বরে জিকির করতে করতে নিচতলা থেকে সিঁড়ি ভেঙে ওপরে ওঠছেন কোটি হৃদয়ের আলোর মিনার-আশার বাতিঘর, যুগের নকীব, আকাবিরে দেওবন্দের মূর্তপ্রতীক উপমহাদেশের অবিসংবাদিত রাহবর শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক দা. বা.।

হযরত ইউসুফ আ. কে দেখার পর মিশরীয় রমণীকুল কতোটা অভিভূত, চমকিত ও সম্মোহিত হয়েছিল সে অনুমান আমার নেই, তবে কুরআনের বর্ণনা অনুযায়ী তারা ফলের পরিবর্তে হাত কেটে রক্তাক্ত করেছিল তা নিশ্চিত জানা যায়। এদ্বারা বোঝা যায় তাদের কর্মক্ষমতা অর্থাৎ কর্তনক্ষমতা বিদ্যমান ছিল কিন্তু নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা লোপ পেয়েছিল। কিন্তু সেদিন ছাত্ররা এতটাই চমকিত ও অভিভূত ছিল যে, তাদের চেহারাগুলো পর্যন্ত ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছিল। আমার পাশের একজন ছাত্রের হাত থেকে তার ভর্তিফরমটি পড়ে গেল। কিন্তু সেটা তোলার মতো বোধশক্তি ও কর্মশক্তি কোনোটাই তার বাকি ছিল না। হুজুর দফতরে প্রবেশের পর যতক্ষণ ছিলেন ততক্ষণ আশপাশে কোনো মানব অস্তিত্ব বিদ্যমান ছিল কিনা, শব্দ দ্বারা তা নির্ণয় করার কোনো উপায় ছিল না। আমার এই ক্ষুদ্র জীবনে এমন সম্মোহনী ক্ষমতাসম্পন্ন দ্বিতীয় কোনো ব্যক্তিত্ব আর দেখিনি। অথচ লেবাসে-পোশাকে, চলনে-বলনে এতটাই সাদাসিধে যে, আজকে আমার মতো মৌলবীকেও যদি অমন সাদাসিধে পোশাকে কোথাও যেতে বলা হয় তাহলে প্রেস্টিজ নিয়ে ভাবতে ভাবতে হৃদক্রিয়া বন্ধ হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। হুজুরের রুয়ুব বা ব্যক্তিত্বপূর্ণ সম্মোহনী ক্ষমতার এই বর্ণনা চুল পরিমাণও অতিরঞ্জিত নয়। আমি রাহমানিয়ার দীর্ঘ বিশ বছরের জীবনে এমন অসংখ্য ঘটনার জ্বলন্ত সাক্ষী। কলেবর বেড়ে যাবে তাই এই নিবন্ধে সেদিকে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আল্লাহ যদি তৌফিক দেন তাহলে অন্যকোনো লেখায় সে বিষয়গুলো তুলে ধরার প্রয়াস পাব ইনশাআল্লাহ।

সংক্ষেপে শুধু এতটুকুই বলবো, আমাদের সমাজে কিছুলোক খুব অল্পতেই অন্যের সমালোচনা করে আনন্দ পান। শায়খুল হাদিস বরাবর এমন কতিপয় অপরিণামদর্শী সমালোচকের অহেতুক সমালোচনার শিকার। যদিও হুজুর এসব সমালোচনাকে কখনোই গায়ে মাখেন না এবং রুচিহীন তাসনিফের ক্ষেত্রে তিনি যে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন তাও এজাতি আজীবন মনে রাখবে। বি¯তৃত পরিসরে বুখারি শরিফের বঙ্গানুবাদের মাধ্যমে তিনি হাদিসে নববীকে আলেম ওলামা থেকে শুরু করে সাধারণ মুসলমানদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়েছেন। অনেকে মনে করেন, বাংলা বোখারি শরিফ বাংলাশিক্ষিত সাধারণ লোকদের জন্য। একটি সময় পর্যন্ত আমিও তাই মনে করতাম। ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল। কিতাবটি পড়ার পর দেখলাম- সীমিত শব্দে তিনি এমন কিছু গুপ্তধনের সন্ধান দিয়েছেন, যার গভীরতা উপলব্ধি করা সাধারণের জন্য প্রায় অসম্ভব। যদিও এই গভীরতায় পৌঁছতে অক্ষমের জন্যেও প্রয়োজনীয় ইলম অর্জনের রাস্তা মসৃণ রেখেছেন। এছাড়াও তিনি বাংলা ভাষায় আরও অনেকগুলো গ্রন্থ রচনা করেছেন।

তাকরির ও বয়ানের ময়দানে হুজুর এক বেমেছাল দীনের দায়ী ও ওয়ায়েজ। জটিল থেকে জটিল বিষয়গুলোকে গ্রাম্য উপামা ও গল্পচ্ছলে খুবই সাবলীল ভঙ্গিতে শ্রোতাদের মন-মস্তিষ্কে ঢুকিয়ে দেওয়া হুজুরের এক অনন্য বৈশিষ্ট্য। যে বৈশিষ্ট্য তুলে ধরতে হলে স্বতন্ত্র প্রবন্ধ লিখতে হবে। আমি তখন সবে মাদরাসায় আসা-যাওয়া শুরু করছি, সেই সময়ের কথা। হুজুর আসলেন আমাদের ফরিদপুর জেলার বোয়ালমারীতে। শায়খুল হাদিস সাহেব আসছেন এই খবরে দীনদার শ্রেণী তো বটেই, সচরাচর যারা মাহফিলে যায় না তাদের মধ্যেও সাড়া পড়ে গেল। মানুষের ঢল নামলো সেই মাহফিলে। কিন্তু সকলের মনে একটিই প্রশ্ন- হুজুরের বয়ান কি আমরা বুঝবো ? আমাদের মহল্লার লোকজনসহ আমি আব্বার সঙ্গে হেঁটে হেঁটে সেই মাহফিলে শরীক হলাম। দীর্ঘ ৬-৭ কিলোমিটার রাস্তা। পুরো রাস্তায় আলোচ্য বিষয় একটিই ‘হুজুর এতবড় শাইখুল হাদিস হুজুরের বয়ান বোঝা আমাদের জন্য কি সম্ভব?’ আব্বা তাদের আশ্বস্ত করলেন, সব না বুঝলেও কিছুতো বুঝবো। সবটা না বুঝলেও চলবে। এখলাসের সঙ্গে যারা যাবে, বয়ান শুনবে তাদের আল্লাহ ঠিকই সওয়াব দিয়ে দিবেন। যাহোক এমন নানা জল্পনা-কল্পনার মধ্যদিয়ে প্রতীক্ষার প্রহর শেষ হলো। হুজুরকে বয়ানের জন্য স্টেজে আনা হলো।

হুজুর নাতিদীর্ঘ খুতবা শেষ করে সর্বপ্রথম যে কথাটা বললেন তা হল, ‘আপনারা কি ছেড়াকাঁথা চেনেন?’ হাজার হাজার শ্রোতা সকলেই নিশ্চুপ। হুজুর আবার প্রশ্ন করলেন, আপনারা কাঁথা চেনেন না? এবারও শ্রোতাদের কোনো উত্তর নেই। এবার মঞ্চের থেকে দু’একজন বললেন, হুজুর! কাঁথা মানে শীতের সময় আমরা যে গায়ে দেই সেই কাঁথা? হুজুর হেসে বললেন, হ্যাঁ গায়ে দেওয়া কাঁথা।

উপস্থিত শ্রোতারা একটু নড়ে চড়ে বসলেন। শীতের তীব্রতা এবং হুজুরের অসামান্য ব্যক্তিত্বের সামনে এতোক্ষণ তারা বরফতুল্য জমাট ছিলেন। গ্রামীণ তুচ্ছ বস্তু কাঁথা দিয়ে হুজুর কথা শুরু করায় শ্রোতাদের মধ্যে এক ধরনের ফিসফিসানি এবং কৌতুহল সৃষ্টি হলো। আমার ধারণা হুজুর শ্রোতাদের মনোভাব আঁচ করেই পরিস্থিতিকে স্বাভাবিক করার জন্য ছেড়াকাঁথার প্রসঙ্গ টেনে এনেছেন। হুজুর বললেন, মুমিনের ঈমান হলো কাঁথার মতো। কাঁথা যতো পুরাতন হয় তত তাড়াতাড়ি তাতে ওম ধরে। আর কাঁথা যদি নতুন হয় তাহলে তা গরম হতে এবং ওম ধরতে দেরি হয়। মুমিনের ঈমান যত পুরাতন এবং মজবুত হয় দীনের কথা শুনলে ততো তাড়াতাড়ি জযবা সৃষ্টি হয়। আর যদি দীনের কথা শুনে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হতে বিলম্ব হয় তাহলে বুঝতে হবে তার ঈমান নতুন। শ্রোতাদের প্রশ্ন করলেন, আপনারা কি আমার কথা বুঝছেন ?

শ্রোতারা সমস্বরে চিৎকার করে বলে উঠল, জ্বি হুজুর। মুহূর্তেই যেনো সকলের ঈমানী শক্তি জেগে উঠল। জযবা বেড়ে গেলো। এরপর হুজুর দীর্ঘসময় বয়ান করলেন। শ্রোতারা সময়জ্ঞান ভুলে মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় আত্মস্থ করলেন সে বয়ান। ফেরার পথে শ্রোতাদের মুখে মুখে একটি কথাই ভাসছিল, হুজুর তো একেবারে আমাদের মতো করেই কথা বলেন। এতবড় আলেম অথচ…  ইত্যাদি।

বোদ্ধাজনরা বলে থাকেন, শায়খুল হাদিসকে যদিও আমরা জানি- দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম হাদিস বিশারদ হিসেবে। কিন্তু বাস্তবে তিনি একজন শায়খুত্তাফসিরও বটে। হুজুরের এলমে তাফসীর এমন উঁচুমানের যা শুধুমাত্র একজন উঁচুমাপের মুফাসসিরের পক্ষেই অনুধাবন করা সম্ভব। হুজুর সাধারণত ঢাকার আঞ্চলিক ভাষার সংমিশ্রণে বয়ান করে থাকেন। কিন্তু তাঁর বড় বৈশিষ্ট্য হলো, আলোচ্য বিষয়ের গভীরে গিয়ে বর্তমান সময়ের একটি উপমা টেনে গরল বিষয়কে সরলভাবে উপস্থাপন করা। অনেক বিতর্কিত বিষয়কে অভিনব উপমার আড়ালে তিনি এমনভাবে শ্রোতাদের হৃদয়ে গেঁথে দেন যে, বিষয়টি সকলেই বিনাবাক্যে মেনে নিতে বাধ্য হয়।

হুজুর একবার তাবলিগি ভাইদের উৎসাহিত করতে তিনদিনের জামাতে বের হলেন। কাকরাইল মসজিদে সাজ সাজ রব পড়ে গেল। মুরব্বিরা পরামর্শের মাধ্যমে হুজুরকে পুরান ঢাকায় পাঠালেন। বরকতময় সঙ্গ পেতে মুহাম্মাদপুর এবং কাকরাইল মিলে এক বিরাট কাফেলা হুজুরের পিছু নিল। এলাকাটি ছিল উপশহরীয় অঞ্চল। এক-দুটি প্রাইভেটকার সে অঞ্চলে কখনো-সখনো প্রবেশ করতো। একসঙ্গে অনেকগুলো প্রাইভেট ও মাক্রোবাস প্রবেশ করতে দেখে তারা তো কিংকর্তব্যবিমূঢ়। মাইকে হুজুরের আগমনবার্তা ঘোষণা করা হলো। পঙ্গপালের ন্যায় বনিআদম ছুটে এলো ঐতিহাসিক লংমার্চ নেতাকে দেখার জন্য। ইমাম সাহেব এসে জানালেন তিনি হুজুরের ছাত্র। যার অর্থ হলো, হুজুরের জুমার বয়ান করার পথের সব বাধা দূর হলো। হুজুর তাঁর স্বভাবজাত ভঙ্গিতে বয়ান করে যচ্ছেনÑ আর শ্রোতারা বিমোহিত হয়ে শুনছেন। সময় শেষ হয়ে এলো। পাঁচ মিনিটও বাকি নেই। কিন্তু হুজুর তাবলিগের কথা কিছুই বলছেন না। হুজুরের সঙ্গী-সাথীরা পেরেশান। বারবার ঘড়ি দেখছেন। বিরাট কিছু অর্জনের পর হারানোর বেদনা তাদের চোখে-মুখে। বয়ানের দু’তিন মিনিট বাকি। হুজুর হঠাৎ প্রশ্ন করলেন, আমি এতোক্ষণ যে বয়ান করলাম আপনাদের কেমন লেগেছে? ‘খুব ভালো লেগেছে’  তিনতলা বিশাল মসজিদ কেঁপে ওঠলো। হুজুর বললেন, এই পূর্ণ আলোচনার নাম-ই তাবলিগ। এখন বলেন, তাবলিগ ভালো না মন্দ? আবার চিৎকার ধ্বনি ‘খুবভালো’। বললেন, যারা এই ভালো কাজ করতে রাজি আছেন তারা নাম লেখান। অসংখ্য লোক দাড়িয়ে নাম লেখালেন এবং তিন দিনের বেশ কয়েকটি জামাত নগত বের হলো।

সমাজের অন্যায়-অপকর্মগুলোকে এমনভাবে চোখে আঙুল দিয়ে ধরিয়ে দেন যে, অপরাধী মাত্রই সতর্ক হতে ব্রতী হয়। যেমন, হুজুর এক বয়ানে বললেন আপনারা কি জানেন, বনি ইসরাঈলের আলোচনা কুরআন শরিফে বার বার কেন এসেছে? এজন্যই এসেছে যে, নবীদের কথার বিরুদ্ধাচারণ করা তাদের স্বভাবে পরিণত হয়ে গিয়েছিল। আপনারা মনে মনে ভাবছেন, আমরা বনি ইসরাঈল থেকে কতো ভালো ! শোনেন, এই কথা মনে করে আত্মতৃপ্তিতে ভোগার কোনো সুযোগ নেই। কারণ আপনারাও নবীর সা. আদেশ অমান্য করতে তাদের থেকে কোনো অংশে কম নন।   হয়তো বলবেন, হুজুর এতো শক্ত কথা কেন বললেন? তাহলে শুনুন, হাদিস শরিফে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, পুরুষরা তাদের কাপড় হাঁটুর নিচে এবং টাখনুর উপরে পরবে। অথচ এই সমাজের লোকেরা হয়তো পরবে টাখনুর নিচে নয়তো হাটুর উপরে। আল্লাহর নবী যেখানে পরতে বললেন সেখানে পরলে নাকি ফ্যাশন হয় না। তাহলে আর বনি ইসরাঈলের দোষ কী? এভাবেই তিনি সমাজের চলমান ত্র“টি-বিচ্যুতি চোখে আঙুল দিয়ে ধরিয়ে দিতেন।

প্রিয় পাঠক! যেহেতু এই লেখাটি স্মৃতিচারণমূলক। তাই হাজারো স্মৃতি হৃদয়পটে উকিঝুঁকি মারছে। কারণ হুজুরের মতো মহান ব্যক্তিত্বের সান্নিধ্যে এক-দুইদিন কাটানোর স্মৃতিই এতো সমৃদ্ধ হতে বাধ্য যে, এমন একটি প্রবন্ধ তা ব্যক্ত করতে যথেষ্ট নয়। আর দীর্ঘ প্রায় দুই যুগের স্মৃতিচারণে এমন একটি কেন ২০টি প্রবন্ধ কি যথেষ্ট হতে পারে? কলেবরের সীমাবদ্ধতায় তার যৎকিঞ্চিত আলোচনা করেই ইতি টানতে হবে।

হুজুর যেহেতু শায়খুল হাদিস পরিচয়ে দেশ-মহাদেশ এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সমাদৃত। তাই বাস্তবতার দাবি ছিল এ ব্যাপারে বিশেষভাবে কিছু বলা। কিন্তু সমস্যা হলো, আমার যোগ্যতার সুতা এতটাই ছোট যে, যে সব সফলতার মুক্তা গেঁথে গেঁথে হুজুর শায়খুল হাদিস খেতাবে ভূষিত হলেন। তার একটা মুক্তা ভেদ করে দ্বিতীয় মুক্তা পর্যন্ত পৌঁছতে আমার এ সুতা অকার্যকর। তাছাড়া হুজুরকে আমরা তখন পেয়েছি যখন হুজুর মধ্যগগনের জ্যোতির্ময় সূর্যের আলো নিয়ে জগতবাসীকে হাদিসের আলো বিতরণে পুরোমাত্রায় ব্যস্ত একজন পরিপূর্ণ শায়খুল হাদিস। উলামায়ে উম্মত স্বপ্রণোদিত হয়ে হুজুরকে এনামে ডেকেই তৃপ্তি বোধ করছেন। তাই বলা যায়, এ উপাধি কোনো বিশেষ প্রতিষ্ঠান কর্তৃক প্রদত্ত স্বীকৃতি বা  কোনো ব্যক্তি বিশেষের মূল্যায়নের ভিত্তিতে প্রদত্ত ডক্টরেড জাতীয় নিছক কোনো ডিগ্রি নয়। বরং ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান নির্বিশেষে সম্মিলিত সম্মানবোধের অতুলনীয় বহিঃপ্রকাশ এই উপাধি। অতএব বিন্দু বিন্দু মুক্তাকণা জমা করে হুজুর কি করে এই মহাসিন্ধুতে পরিণত হলেন তা অনুধাবনে হুজুরের হাজার হাজার প্রবীণ ছাত্রদের মূল্যায়ন জানতে হবে। আমি এ প্রবন্ধে এমন একজন প্রবীণ এবং প্রিয় ছাত্রের আংশিক মূল্যায়ন তুলে ধরবো।

হুজুরের সুহবতে দীর্ঘদিন অবস্থান করার সুযোগ ও সৌভাগ্য যাদের হয়েছে, তাদের অন্যতম মুফতি মাওলানা মনসূরুল হক সাহেব। মুফতি সাহেব হুজুর যখন লালবাগ জামিয়ার নবীন উস্তাদ সেই সময়কার এবং তার পরবর্তী জীবনের নানা ঘটনাপ্রবাহ, ঘাত-প্রতিঘাত আর ভাঙ্গাগড়ার অসংখ্য উপাখ্যান আমাদের কাছে বর্ণনা করতেন আবেগভরা হৃদয় নিয়ে। আর সেসব আলোচনায় বার বার ঘুরেফিরে আসত শাইখুল হাদিসের সুমহান ব্যক্তিত্ব ও সীমাহীন কর্তৃত্বের প্রসঙ্গ। সেসব আলোচনার বিস্তারিত বর্ণনার সুযোগ এখানে নেই। তবুও সংক্ষেপে একটি বিষয় উল্লেখ করতে চাই। যে বিষয়টি আমাদের হৃদয়কে খুব নাড়া দিত। আর তাহলো, আমরা যখন মোটামুটি ওপরের দিকে পড়ি, তখন দেখতাম মুফতি সাহেব হুজুর একটা তেপায়া নিয়ে ছাত্রদের পাশাপাশি বসে নিয়মিত হযরত শায়খুল হাদিসের সবকে শরীক হতেন। আমাদের সম্বোধন করে মাঝে মধ্যেই বলতেন, ‘তোমরা তো নামমাত্র হুজুরকে চেন। হুজুরের ইলমী গভীরতা অনুধাবন এবং তা ধারণ করার জন্য আমি এই পর্যায় এসে নিজেকে উপযুক্ত মনে করি। তোমরা হুজুরের তাকরীর কি বুঝবে? আমরা সেই লালবাগ থেকেই হুজুরকে দেখছি। প্রতিদিন, প্রতিমাস এবং প্রতিবছর হুজুরের ইলমে এমন সব সূক্ষ্মবিষয় যোগ হচ্ছে যা আমাদের রীতিমতো অবাক করে দেয়।’

মুফতি সাহেব হুজুরের পূর্ণ আদব ও এহতেরামের সঙ্গে দরসে শরীক হওয়া এবং এসব নসিহত একদিকে যেমন শায়খুল হাদিসের প্রতি আমাদের আরও উৎসর্গপ্রাণ হতে উদ্বুদ্ধ করত, অন্যদিকে হুজুরের দরসে বসার অপেক্ষাকে আমাদের জন্য অসহনীয় করে তুলতো।

বাস্তবেই মুফতি সাহেব হুজুরের মতো হাজারও প্রতিভা পরশপাথরতুল্য শায়খুল হাদিসের ছোঁয়া পেয়ে আজ দেশ ও জাতির খেদমতে অসামান্য অবদান রেখে চলছেন। জগতের চিরাচরিত নিয়মে শায়খুল হাদিস একদিন নশ্বর এ ধরা থেকে বিদায় নিয়ে চলে যাবেন। কিন্তু হাজার হাজার রুহানীসন্তানদের মাধ্যমে তিনি জগতবাসীর হৃদয়আকাশে দ্বিপ্রহরের সূর্যের দীপ্তিতে আলো ছড়াবেন কাল থেকে কালান্তরে।

একজন নগণ্য ছাত্রের দেখা শায়খুল হাদিস

একজন ছাত্র যে কখনো দেখেনি সদর সাহেব হুজুর, পীরজী হুজুর বা ফখরে বাঙ্গাল তাজুল ইসলাম রহ.দের মতো কাউকে। নামমাত্র দেখেছে হাফেজ্জি হুজুরের মতো ব্যক্তিত্বকে। শাব্বির আহমাদ উসমানী আর জাফর আহমাদ উসমানীকে তো দেখার প্রশ্নই আসে না, কিন্তু ছাত্রটি দেখেছে উল্লেখিত মহান ব্যক্তিত্বদের যোগ্য উত্তরসূরি আল্লামা আজিজুল হক দা.বা. এর মতো শায়খুল হাদিসকে। তাহলে এমন ছাত্রের জন্য গর্ব করার জন্য সবচেয়ে উত্তম আর সবচেয়ে তৃপ্তির উপলক্ষ কী হতে পরে? তাইতো আমিও আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন ও গৌরব মনে করি হুজুরের ছাত্রত্ব অর্জনকে। বাস্তবেই আমরা হুজুরের স্বর্ণযুগের ছাত্র হিসেবে অনেক প্রবীণ ও নবীন ছাত্রদের ওপর গর্ব করতেই পারি।

যোগ্যতা ও গ্রহণযোগ্যতার সকলক্ষেত্রে ষোলকলাপূর্ণ শায়খুল হাদিসকে আমরা এমন এক সময় পেয়েছি, যখন এলম ও কামালাত, শখসিয়্যাত ও মাকবুলিয়্যাতের আঠারকলা পূর্ণ করেছেন। প্রত্যেক বস্তুর চূড়ান্ত শিখর রয়েছে এবং প্রত্যেক পূর্ণতার ক্ষয় রয়েছে’। শাশ্বত এই বাণীর চূড়ান্ত শিখরে অবস্থানরত শায়খুল হাদিসকেই যে আমরা পেয়েছি, সে কথা জোর দিয়েই বলা যায়। আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে নব্বই দশকের শেষ পর্যন্ত সময়টা হুজুরের জীবনের কর্মমুখর স্বর্ণযুগ। তাসলিমাবিরোধী আন্দলন, নাস্তিক-মুরতাদবিরোধী আন্দোলন, ভাস্কর্যের নামে ঢাকার যত্রতত্র মূর্তি স্থাপনের বিরুদ্ধে আন্দোলন, বাবরী মসজিদ পুনপ্রতিষ্ঠার দাবিতে অযোধ্যা অভিমুখে লংমার্চ, ফতোয়াবিরোধী রায় বাতিলের দাবিতে আন্দোলন, খেলাফত প্রতিষ্ঠার দাবিতে নিরন্তর আন্দোলন-সংগ্রামের সঙ্গে হুজুরের এই সময়টা জড়িত। আর এই সময়গুলোতে আমরা হুজুরের সান্নিধ্যে থেকে ধন্য হয়েছি।

আমার এই ক্ষুদ্র জীবনের বড় একটা অংশ হুজুরের সান্নিধ্যে কাটানোর অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, হুজুরকে কলমের আঁচড়ে তুলে ধরা অত্যন্ত দুরূহ কাজ। কারণ পরস্পরবিরোধী অনেকগুলো গুণ আমরা তার মধ্যে দেখতে পাই। যেমন- এলমি ব্যাপারগুলো যতটাই তার নখদর্পণে, জাগতিক বিষয়গুলোর সাথে তিনি ততটাই অপরিচিত। দীন-ধর্মের শত্র“দের ব্যাপারে তিনি এতোটাই কঠোর যে, জীবনের প্রশ্নেও আপস করতে রাজি নন, আর তাকে যারা কষ্ট দেন তাদের ব্যাপারে এতোটাই ক্ষমাশীল যে, সামান্য প্রতিবাদ করতেও রাজি নন। দীনের দুশমনদের সমালোচনায় তিনি যতোটাই মুখর, নিজের সমালোচকদের ব্যাপারে ততোটাই নিথর।  অনারম্বড় জীবন-যাপনের ক্ষেত্রে নজিরবিহীন নজির হলেন শায়খুল হাদিস। জীবনের পড়ন্ত বেলায় যখন হুজুরের খুবই মহব্বতের কিছু লোকদের অবদানে হুজুরকে নিজ প্রতিষ্ঠিত হৃদয়তুল্য জামিয়া থেকে নির্বাসনে যেতে হয়, তখনও তাদের ব্যাপারে কিছু বলা হলে হুজুর বলতেন, ওরা এমনটি করতেই পারে না। মনে হয় তৃতীয় কারও কারণে ওরা এমনটি করছে। কেউ তাদের সমালোচনা করলে হুজুর তাদের পক্ষ হয়ে সমালোচনার জবাব দিতেন। এক কথায় হুজুরের ধৈর্য দেখে আমাদের অনেক সময় ধৈর্যচ্যুতি ঘটত। হুজুর বেশি অসুস্থ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত সর্বদা মাদরাসাতেই থাকতেন। তখন ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে হুজুরকে দেখতে হুজুরের রুমে যেতাম। গেলে অনেক কথা হতো। সরলতায় পরিপূর্ণ সব কথাবার্তা। না আছে কপটতা না আছে কারও সমালোচনা। মনে মনে ভাবতাম, আহ! এমন সহজ সরল মানুষকেও কি কষ্ট দেওয়া যায়?

প্রিয় সুধী! হুজুর বর্তমান শারীরিকভাবে অসুস্থ। তথাপি তার বরকতপূর্ণ ছায়া আমাদের জন্য বিরাট নিয়ামত। আল্লাহ তা’য়ালা এই রহমতি ছায়া আমাদের ওপর দীর্ঘ করে দিন। আমিন