কেমন আছেন ইলমে হাদীসের জিবন্ত কিংবদন্তী শাইখুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক

গাজী মোহাম্মাদ সানাউল্লাহ

বি,বাড়িয়া যাচ্ছি। ট্রেনের নাম মহানগর প্রভাতী । অনেকদিন পর ২টি কাজ এক সাথে হল বি,বাড়িয়া যাওয়া আর ট্রেনে চড়া। জামিয়া দারুল আরকামের ১৮ সালা দস্তারবন্দী সম্মেলন। প্রতিষ্ঠার দির্ঘ সময় পর এই প্রথম মাহফিল। সে উপলক্ষে সাবেক সকল ছাত্রবৃন্দ সেখানে একত্রিত হচ্ছে। আমি সেখানের কিছু সময়ের সাবেক। সে উপলক্ষেই যাওয়া। সকাল ৮ টার ট্রেন ছাড়লো ১০টায়। যাক তাও তো ছাড়লো, না ছাড়লেও তো কিছু করার ছিল না। বি,বাড়িয়া শহর পাশ কাটিয়ে আমার অন্তরঙ্গ বন্ধুদের কারো ভাষ্যে এ দেশের ‘জামে আজহার’ জামিয়া দারুল আরকাম আল ইসলামিয়ার দৃষ্টি নন্দন ভুবনে যখন পৌছলাম তখন দুপুর ১টায়।

বেলা ৩ টা থেকে মাহফিল শুরু হলেও মজমা জমে উঠলো বাদ আসর। বিশাল প্যান্ডেল,স্বাভাবিকভাবে কমপক্ষে হাজার দশেক লোক এটে যাবে, মাগরিবের পর দেখলাম পেন্ডেল পুরুপুরি ভরে গেছে । এমনকি বাহিরেও প্রচুর লোক বসা। এতো বিপুল পরিমান লোক সমাগমের মুল কারণ দারুল উলুম দেওবন্দের শাইখুল হাদিস আল্লামা সাইদ আহমাদ পালনপুরী। তিনি আজ এখানের প্রধান অতিথি। ইতিমধ্যে হযরতের তাশরিফ এনেছেন দারুল আরকামে। মাঝখানে একবার গিয়ে শতবর্ষি মাদরাসা জামিয়া ইউনুসিয়া ও ফখরে বাঙ্গাল হযরত তাজুল ইসলাম রা:এর মাকবারা যিয়ারত করে এসেছেন। তিনি মঞ্চে উঠবেন রাত ৯ টায় । এখন চলছে দোয়া নেবার পালা। নানা প্রান্তের নানা মানুষ দির্ঘ লাইনে দাড়িয়ে একজন একজন করে নির্ধারিত রুমে ঢুকে মুসাহাফা করছেন।

আমি দাড়িয়ে আছি নির্ধারিত সে রুমে, হযরতের পাশে। এমনি সময় এক ভদ্র লোক এলেন দোয়ার জন্য । বি,বাড়িয়ার নামকরা ব্যবসায়ী, তিনি নিজের জন্য দোয়া চাইলেন,সাথে সাথে দোয়া চাইলেন মাদরাসায় পড়–য়া নিজের ছোট ছেলের জন্য। প্রসঙ্গতই হযরত জানতে চাইলেন,ছেলে কোথায় পড়ে, বিনয়াবনত লোকটি যা বল্লেন হযরতের খাদেম তা উর্দুতে জানালেন,বাচ্চা আজিজুল হক সাহেবের মাদরাসায় পড়ে। হযরতের আবার প্রশ্ন, কোন আজিজুল হক সাহাব? খাদেমের প্রতি উত্তর, শাইখুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক সাহাব। সাদা ফর্সা মুখের মানুষ পান খেলে এমনিতেই সুন্দর দেখায়, হযরতকে যেন আরো সুন্দর লাগছিলো,খাদেমের মুখে শাইখুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক সাহেবের নাম শুনে হযরত হাসি মুখটি আরো উজ্জল হয়ে উঠলো। তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন,হযরত শাইখুল হাদিস কা সিহাত কায়ছে হ্যা?

শুধু হযরত পালনপুরীর মুখেই কেবল এ প্রশ্ন নয়, একি প্রশ্ন ছড়িয়ে আছে দেশে বিদেশের অসংখ্য মানুষের মুখে। শায়েখের ছাত্র বা ভক্ত অথবা সাধারন মানুষ, জানতে চান শাইখুল হাদিসের খবর। কেমন আছেন হাদিসে রাসুলের জিবন্ত কিংবদন্তী শাইখুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক। কিভাবে দিন কাটছে ঐতিহাসিক বাবড়ী মসজিদ লংমার্র্চ নেতা শতবর্ষী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এ মনিষার। যারা ঢাকার বাহিরে থাকেন তারা তো বটেই, ঢাকায় থাকা আনেকেই যারা নানা ব্যস্ততায় হয়তো বেশ কিছু দিন হযরত শায়েখের খবর রাখতে পারেন নি, শায়েখ পরিবারের কাউকে বা জামেয়া রাহমানিয়া কোন শিক্ষক অথবা এ দুজায়গার সাথে সম্পৃক্ত কাউকে পেলেই অত্যান্ত আগ্রহভরে জানতে চান শায়েখের শারিরিক হালাত। দেখা করে দোয়া নেবার কোন সুযোগ আছে কিনা তার খোজ খবর। সম্প্রতি জাতীয় একটি দৈনিকে হযরত শায়েখের শারিরিক অবস্থা নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে,প্রকাশিত প্রতিবেদনে যদিও তথ্যের অনেক গড়মিল ছিল তবুও অসংখ্য পাঠকের আগ্রহ ছুতে পেবেছিল নিউজটি। উন্নয়ন গবেষনা বিষয়ে কাজ করতে গিয়ে পরিচয় ও হৃদ্যতা, আর্ন্তজাতিক ইসলামী সংস্থা অর্গানাইজেশন অফ ইসলামিক কনফারেন্স ও,আই,সি‘র তথ্য ও প্রযুক্তি বিভাগের ডাইরেক্টর জেনারেল, ড. রিজলী বিন মুহাম্মাদ নুরুদ্দিন। সৌদি বংশদ্ভোত এ ব্যাক্তিটিও শায়েখের একজন আন্তরিক ভক্ত। বসেন জেদ্দাস্থ ও,আই,সি‘র হেড অফিসে। ফোনে বা ইন্টারনেটে তার সাথে কথা হলে আগে জানতে চাইবে শায়েখের কথা।

এরকম অসংখ্য মানুষের আগ্রহ এবং নিজের ব্যাপক কেীতুহল নিয়ে কদিন আগে উপস্থিত হয়েছিলাম হযরত শাইখুল হাদিস এর বাসবভনে। সেদিনকার দুপুর গড়িয়ে বিকেল । আসর নামাজের কিছু পর। রিকশা থেকে নেমে গুটিগুটি পায়ে গিয়ে দাড়ালাম সেই অনেকদিনের চেনা বাড়িটির সামনে। আমার সল্প দিনের সহপাঠি ও দির্ঘ সময়ের বন্ধু শায়েখ দোহীত্র মাওলানা নাইমুল হক আজিজের সভাবসুলভ আন্তকিতার বদৌলতেই শায়েখের সাথে আজকে সাক্ষাতের এই সুযোগ। শুধু সুযোগ নয় বলতে হবে অভাবনীয় সুযোগ। শারিরিক দুর্বলতার কারণে শায়েখ এখন প্রায় সবরকম সাক্ষাত এড়িয়ে চলেন। প্রায় পুরুটা সময় থাকেন পারিবারিক আবহে। এর ফলে বাহিরের কারো সাক্ষাতের সুযোগ সাধারনত হয় না । কদাচিৎ কারো সে সুযোহ হলে তাকে তো অবশ্যই অভাবনীয় সুযোগ বলতে হবে। শুকরিয়া আল্লাহ পাকের।

আজিমপুরের যে বাড়িটির সামনে নাম্বার প্লেটে লেখা ৭/২ আজিমপুর, এটি যে ঐতিহ্যবাহী একটি বাড়ি তা এর প্রাচিনত্ত ও সেকেলে আমলের স্থাপত্য স্টাইলই বলে দেয়। চার তলার বাড়িটির দু তলায় হযরত শায়েখ নিজে থাকেন । অন্যগুলীতে শায়েখের ছেলেরা। দির্ঘ দিন পর্যন্ত বাড়ির রং ছিল হলুদ। এখন সাদা রং করা হয়েছে। নিচ তলার পুরুনো সেই গেইটটির সামনে যখন দাড়ালাম, মনে একটা অন্য রকম অনুভুতি জেগে উঠলো। যদি বাড়িয়ে না বলি তবে বলতে হবে, গায়ের পশমগুলী দাড়িয়ে গিয়েছিল। মনে জেগে ছিল ভিন্ন রকম শিহরণ। জাগতেই তো হবে, এখানে, ঠিক এ জায়গাটাতে অসংখ্যবার শায়েখকে নামিয়ে দিয়ে গিয়েছি মাদরাসা থেকে বা কোন মাহফিল থেকে । শায়েখ নিজ গাড়ি থেকে নেমে এ জায়গা দিয়ে ধিরে ধিরে হেটে যেতেন , ইকটু সামনে গেলেই সিড়ি,শায়েখ সিড়িতে উঠতেন আর আল্লাহ আল্লাহ যিকির করতেন, শায়েখের সুউচ্চ আল্লাহ আল্লাহ জিকির স্বাভাবিকের চে ইকটু ছোট এই নিচ তলার চারপাশটায় প্রতিত্ধনিত হতো গম্ভির ভাবে। মনে হতো যেন শায়েখের সাথে সাথে চারপাশের পরিবেশ, ইটা- বালি- কনাও জিকির করছে ।

গেটের এ জাগাটাতেই শায়েখের সাথে হযরত খতিব সাহেব রা: এর একটি মধুর দৃশ্য দেখেছিলাম। খতিব সাহেব রাহ: কোন এক প্রোগ্রাম শেষে শায়েখ কে বাসায় নামিয়ে দিয়ে যাচ্ছিলেন,আরেকটু সামনে গেলেই বিখ্যাত চায়না বিল্ডিং,তার পাশেই খতিব সাহেবের বাসা। শায়েখ খুব তাড়াহুড়– করে গাড়ি থেকে নামলেন, যেন খতিব সাহেবের বেশিক্ষণ দাড়ানোর কষ্ট করতে না হয়, কিন্তু রসিক খতিব সাহেব নিজ আঞ্চলিক ভাষায় বল্লেন,আরেখবার মুসাহাফা না করিইয়্যা আপনি চলিইয়্যা যাইতেছেন,এইট্যা কি করিইয়্যা হইবে। খতিব সাহেব শায়েখের সাথে আবারো আন্তরিকভাবে মুসাহাফা করলেন,তারপর গেলেন। আমাদের মনিষিরা একে অপরের প্রতি কত আন্তরিক ছিলেন তা পৃথিবির কোন ভাষায় বুঝানো যাবে না। বুঝতে হবে অন্তর দিয়ে। দৃশ্যগুলো দেখতে হবে হৃদয়ের আয়নায়।

অনেক দিন পর শায়েখের বাসায় যাওয়া । মেহমানদের বসার রুমটা পরিবর্তন হয়েছে । আগের পুরুনো সে রুমটাতে নয় বসতে দেয়া হল অন্য একটি রুমে। রুমের নানা জায়গায় শুভা পাচ্ছে বিভিন্ন সম্মেলন ও প্রতিষ্ঠান থেকে শায়েখ কে দেয়া সন্মাননা ক্রেস্ট। মানপত্রও রয়েছে বেশ কয়েকটি। নাইম ভাই জানালেন শায়েখ এখন ঘুমিয়ে আছেন, উঠার পর আমাকে নিয়ে যাওয়া হবে। সময় যেন কাটেনা। বসে বসে দুরুদ শরিফ পড়ছি। আল্লাহর কাছে দোয়া করছি, হযরত শায়েখের দোয়া নেয়া থেকে যেন বঞ্ছিত না হয়। অন্য সময়ের কথা জানিনা তবে সেদিনের দোয়া কবুল হয়েছিল,আধা ঘন্টা পড়ে এসে নাইম ভাই বল্লেন চলেন,দাদাজী উঠেছেন।

বাসার ভিতরের দিকের মাঝারি ধরনের একটি রুম। একপাশে বাথরুম। অন্যপাশে খাট পাতা। খাটের পাশে জানালা। থাই গ্লাস সিসটেম হওয়ায় অর্ধেকটা খোলা। আলো কম হওয়ায় ঘরটাতে আলো আধারের এক ভিন্নরকম খেলা,কিছুটা আধার আর অনেকটা আলো। খাটের কাছাকাছি গেল সে আলো প্রকট হয়ে উঠলো,সেটা কি খোলা জানালার কারনে, নাকি খোলা মনের আলোকিত এ মানুষটির কারনে। জানালার পাশে পাতা ছোট্র খাটে শুয়ে আছেন শাইখুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক দা.বা। আমি সালাম দিয়ে মুসাহাফার জন্য এগিয়ে গেলাম। ভক্তি ভরে শায়েখের হাতে চুমু খেলাম, পরম শ্রদ্ধায হাত দুটি বেশ কিছুক্ষণ ধরে রাখলাম। শায়েখ জিবনের নানা র্বনাঢ্য প্রান্ত অত্যন্ত সফল ভাবে পেড়িয়ে এসেছেন, শিক্ষকতা, রাজনীতি, পারিবারিক ব্যবসা বানিজ্য, মাদরাসা পরিচালনা,জাতিয় নেতৃত্ব সহ জিবনের সকল প্রঙ্গনে শায়েখের যে পরিচয়টি বারবার ফুটে উঠেছে তা হলো অমায়িকত্য ও নির্বিবাদীতা। কারো সাথে কোন শত্র“তা নয়। হিংশা নয়। নয় বিদ্বেশ। এতো বড় মাপের এ লোকটি যে ছোট্র এ খাটটিতে শুয়ে আছেন তা ভাবতে অবাক লাগে। দেখে মনে হল এখানে আরো কয়েকজন আল্লামা আজিজুল হক নিশ্চিন্তে ঘুমুতে পারবেন,একসাথে। কোন বিবাদ বাধবে না। একজন, যিনি শায়েখের ছাত্র, দির্ঘ দিন থেকে শায়েখকে, জামিয়া রাহমানিয়াকে কষ্ট দিচ্ছেন, এখনো দিয়ে যাচ্ছেন। কোন এক অনুষ্ঠানে তিনি……….. হঠাৎ করে শায়েখের সামনে পড়ে গেলেন এবং দেখা করলেন, কিন্তু শায়েখের কোন অভিযোগ নেই, নেই কোন তিরস্কর, চির চেনা ভঙ্গীতে বল্লেন, আরে তুমি নাকি,তুমি ত দেহি আগের তে মুটা হইয়া গেছ। উদরতা আর অহিংশতার যুগান্তকরী এব নযির দেখল সে অনুষ্ঠানের হাজারো মানুষ।

অন্য সব কিছুর মত শায়েখের শোয়ার ধরনও খুব সুন্দর। ডান দিকে ফিরে মাথার নিচে একটি হাত দিয়ে,হাটু ২টি ভাজ করে খানিকটা বুকের কাছে এনে শুয়ে আছেন,আরেকটি হাত গায়ের উপর। কেমন যেন নিজেই নিজেকে জড়িয়ে রেখেছেন। পোষাকও খুব স্বাভাবিক। পড়নে লুঙ্গী গায়ে সাদা রঙ্গের একটি ফতোয়া। বেশ আগ থেকেই শায়েখ লাগানো দাত ব্যবহর করেন। মাদরাসায় দেখতাম মাঝে মাঝে পরিস্কার করার জন্য দাত গুলা খুলে রাখতেন, আজকেও মনে হয় দাত খোলে রেখেছেন। শরির বেশ দুর্বল হয়ে পড়েছে এটা প্রথম দেখাতেই বুঝা যায়। শরির দুর্বল হলেও কথার স্বর এখনো একেবারে পরিস্কার ।

তবে দাত না থাকার ফলে কথা মাঝে মাঝে ভেঙ্গে যায়। আমাকে অনেক কথাই খুটিয়ে খুটিয়ে জিজ্ঞেস করলেন। এমনকি মাসিক রাহমানী পয়গামের কথাও। তবে একটা বিষয় আগের মত এখনো দেখলাম। কথা বলেন, কথার মাঝে মাঝে উচ্চ স্বরে আল্লাহ আল্লাহ জিকির করছেন। কথা বলার সময় আগের মতই একটা হাসি লেগে আছে চেহারায়। ঘরটা খুব নির্জন, সড়কের একবারে উল্টা পাশে হওয়ায় নিস্তব্দতা অনেক বেশি। আমার কাছে সারাটা ঘরময় কেমন যেন খুব গভির একটা নির্জনতা মনে হল। কিতাবে পড়া আগের দিনের বুযুর্গ ও সাধকদের গুহা অভ্যান্তরের হুজরায় যেমন নিরবতা বিরাজ করত অনেকটা সে রকম। তবে এ নিস্তবদতা কেটে যায় যখন শায়েখ কোন প্রসঙ্গে কথা বলে স্বভাবসুলভ হাসি দিয়ে উঠেন। তখন মনে হয় এক সাথে অনেকগুলো নিষ্পাপ শিশু এক সাথে খিলখিল করে হেসে উঠলো । চারদিকে খুশির বিচ্ছুরণ হতে থাকে। প্রান খোলা হাসির সঠিক পরিচয় পাওয়া যায় শায়েখের হাসিতে। সেটা আগে যেমন ছিল এখনো তাই আছে ।

খাবার দাবারের খবর নিলাম, নাইম ভাই জানালেন, শায়েখ খাওয়া দাওয়া প্রায় নিয়মিতই করেন তবে আগের মত পর্যাপ্ত পরিমান নয়। নামাজ ঘরেই পড়েন। বাসা থেকে খুব একটা বের হন না। মাঝে মাঝে শরির ভালো লাগলে কখনো বের হন নিজ গাড়িতে। জামিয়া রাহমানিয়ায় বা কোন মেয়ের বাসায় যান । কিছুক্ষন পর আবার ফিরে আসেন। বাসায় যে সময়টা থাকেন পারিবারিক আবহে থাকেন।আর থাকবেনিইবা না কেন ? এ পরিবারে ছেলে মেয়ে মিলিয়ে হাফেজে কোরআনের সংখ্যা প্রায় একশোর ও বেশি । পরিবারের আলেম সদস্যের সংখ্যাও প্রায় অর্ধ শতক। আরেকটু সহজ করে বল্লে বলা যায়, শায়েখ পরিবারে জন্ম নেয়া মানে মেয়ে হলে হাফেজা আর পুরুষ হলে আলেম ও হাফেজ। এরকম পরিবারের মাঝে থাকলে এমনিতেই মনে হবে কোন স্বগৃীয় পরিবেশে অবস্থান করছি।

শায়েখের আরেকটি ঘটনা দিয়ে লেখাটা শেষ করবে। বি,বাড়িয়া জামিয়া দারুল আরকামের যে রুমটিতে বসে হযরত সাইদ আহমাদ পালনপুরী সাহেব শায়েখের শারিরিক খবর নিচ্ছিলেন, গত কয়েক বছর আগে,সে একি রুমে, একি জায়গায় শায়েখ আরাম করছিলেন। মুল মাহফিল ছিল খানিকটা দুরে, মাওলানা জুবাইর আহমাদ আনসারীর মাদরাসায়,যে মাদরাসার নাম করনও করা হয়েছে জামিয়া রাহমানিয়ার নামানোসারে। আরাম থেকে উঠার পর মাদরাসার মুদির মাওলানা সাজিদুর রহমান সাহেব শায়েখকে অনুরুধ করলেন দাওরার ছাত্রদের ইকটু বুখারীর দরস দেয়ার জন্য। শায়খ ও সম্মত হলেন। দরস চলতে লাগলে আরকামের মসজিদে। দির্ঘ সময় পর্যন্ত শায়েখ একেকটি হাদিসের তাকরির করছেন। শায়েখের খাদেম যারা ছিলাম আমরা ভয় পাচ্ছিলাম,হয়ত শায়েখ মুল মাহফিলের কথা ভুলে গেছেন কিনা। লম্বা তাকরিরের কারণে শায়েখ ক্লান্ত হয়ে গেলে মাহফিলে আর বয়ান করতে নাও পারেন। এই ভয়ে, বেশ কিছু সময় পর, এক পর্যায়ে আমি হযরত শায়েখের কাছে গিয়ে আস্তে করে বল্লাম,হযরত আরেকটা মাহফিল আছে আপনার…. বাকিটা বলার সাহস পাইনি। শায়েখ তার সেই চেনা ভঙ্গীতে বল্লেন, কেন,এটা মাহফিল না? বুখারীর দরস হল বড় মাহফিল। এর কিছু পর, সবক শেষ করে মুনাজাত করলেন।

যদি প্রশ্ন করা হয় হযরত শাইখুল হাদিসের কোন পরিচয়টি বড়? বর্ষিয়ান রাজনৈতিক নেতা, প্রখ্যাত বক্তা, বাবরী মসজিদ লংমার্চের আপোষহীন নেতা , হাদিসে রাসুলের সর্বশেষ্ঠ গ্রন্থ বুখারী শরীফের প্রথম বাংলা ভাষ্যকার,সফল সংগঠক, নির্লোভ রাজনীতিবিদ, আরো কত কি। এ সব অসংখ্য পরিচয় সমুহের মাঝে কোন পরিচয়ে তিনি পরিচিক হবেন আগামী দিন? আগামী প্রজন্মের সন্তানেরা মনের ক্যনভাসে কল্পনার তুলিতে শাইখুল হাদিসের যে প্রতিচ্ছবি আকবে তা এ সবের কোন এঙ্গেল থেকে। এ বিষয়ে তর্ক চলতে পারে। নানা মত অভিমত থাকতে পারে। প্রিিত মতের পিছনে শক্তিশালী যুক্তিও থাকবে। এবং থাকাটাই স্বাভাবিক।

তবে খুব ছোট করে আমি নিজের কথাটা বলতে চাই। আমার ক্ষুদ্র দৃষ্টিতে শাইখুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক দা.বা, এর বাকি সব পরিচয় ছাপিয়ে যে পরিচয়টি জেগে উঠে, তা হল তার সুমহান শিক্ষক সত্তা । তিনি যেমনিভাবে এদেশের অসংখ্য-অগনিত আলেম ওলামার শিক্ষক, তেমনি লাখ কুটি ধর্মপ্রান মানুষেরও শিক্ষক, যারা ইসলামের আলোকিত পথের শিক্ষা নিয়েছে দেশের নানা প্রান্তে ,তার ওয়াজ মাহফিলে। একিভাবে তাদেরও তিনি শিক্ষক, যারা হেরা গুহা থেকে উৎসাড়িত আলোক শিখার সন্ধান পেয়েছেন তার লিখিত হাদিসে রাসুলের বিখ্যাক গ্রন্থ বুখারী শরীফের তর্জমা ও সরল অনুবাদ সহ নানা কিতাব পড়ে।

এর পাশাপাশি আরেকটি বিষয় স্পষ্ট হয় তা হলো, হযরত শাইখুল হাদিস কে সমকালের শিক্ষক বলা যাবে না। কোন কাল বা যুগ দিয়ে তার মহান শিক্ষকতার প্রজ্জল রুশনীকে আটকানো যাবে না । কাল থেকে কালান্তরে,যুগ থেকে যুগান্তরে বয়ে যাবে তার শিক্ষার সুমহান ধারা। আরএভাবেই শাইখুল হাদিসের শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাবে শতাব্দীপরষ্পরায়। কেয়ামত পর্যন্ত । ইনশাআল্লাহ ।

গাজী মোহাম্মাদ সানাউল্লাহ
মিডিয়া কর্মী ও উন্নয়ন গবেষক
gazisanaullah@gmail.com