ইসলামে দাস প্রথা

                                                             

প্রশ্ন : পবিত্র কোরআন ও হাদিসের আলোকে ইসলামে দাস প্রথা অনুমদিত। ইসলাম কেন এ প্রথা রহিত করেনি? এর একটি সুষ্ঠু ব্যাখ্যা দিবেন। আরো জানতে চাই যে, বর্তমানে আগের মতো দাস-দাসী  রাখা যাবে কিনা?

নিবেদক

আব্দুল্লাহ হিমেল

চট্টগ্রাম

                   

بسْم الله الرّحْمن الرّحيْم             

                       ফাতওয়া বিভাগ                                             তারিখ:6/৩/২০১৩ খৃ  

জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া                                                     মোবাইলঃ ০১৮১৬৩৬৭৯৭৫    

সাত মসজিদ, মুহাম্মদ পুর, ঢাকা-1207                                         www.rahmaniadhaka.com       

حامدا و مصليا ومسلما

উত্তর:

         ইসলাম পূর্ব  যুগ থেকেই দুনিয়ার সর্বত্র এবং প্রায় সকল জাতীর মধ্যেই দাস-দাসীর প্রথা চালু ছিল। মূলত: যখন থেকে দুনিয়ায়যুদ্ধ-বিগ্রহ শুরু হয়, তখন থেকেই প্রথাটির আবির্ভাব হয়। প্রথমে তো যুদ্ধবন্দীদের নির্দয়ভাবে হত্যা করে দেওয়া হতো। এরপর কিছুটাশিথিল হয়ে শুধু যুদ্ধবন্দীদের মধ্যে যাদেরকে হুমকি ভাবা হতো, তাদেরকে হত্যা করে দেওয়া হতো। আর দূর্বল, মহিলা ও শিশুদের দাস-দাসী বানিয়ে রাখা হতো সারকথা দাস-দাসীর প্রথা হলো বিজিতদের ওপর বিজয় বা কর্তৃত্ব লাভের একটি রূপ।ইসলাম বহু যুগ আগ থেকে চলে আসা প্রথাটিকে একেবারে নিষিদ্ধ করে দেয়নি। কেননা,প্রথাটি সম্পূর্ণ মানবতা বিরোধী নয়। যার ব্যাখ্যা হলো যে, মানুষ বিভিন্নভাবে মানুষের পরাধীনতা শিকার করে থাকে। মানুষের মধ্যে দেখা যায় কেউ মালিক কেউ চাকর, কেউ পরিচালক কেউ পরিচালিত, কেউ সেবক কেউ সেবিত। আল্লাহ তা‘আলাই পার্থক্য দ্বারা মানুষকে সৃষ্টি করেছেনএটা তাঁর সৃষ্টির রহস্য সে জন্য ইসলাম এসে এই প্রথাকে রহিত করেনি। কেননা, এটি একটি পরাধীনতার রূপ। তবে এব্যবস্থার মধ্যে যে সকল দিক মানবতা বিরোধী ছিল তা নিষেধ করেছে। বিভিন্ন হাদীস এর প্রমাণ বহন করে।  যেমন- হাদীসে দাস-দাসীকে অন্যায়ভাবে প্রহার করা নিষিদ্ধ করা হয়েছেতাদের খাওয়া-দাওয়াসহ সকল মানবীয় প্রয়োজন যথাযথ পন্থায় পূরণের আদেশ দিয়েছে। আর দাসীকে স্ত্রী (উম্মে ওয়ালাদ) হিসেবে ব্যবহার করা তো হলো অনেকাংশে তাকে স্ত্রীর মর্যাদা দেওয়া এটি নি:সন্দেহে দোষণীয় নয়।

        বর্তমানে মানবতা রক্ষার তথাকথিত দাবীদার  যারা ইসলাম স্বীকৃত গোলামী প্রথা নিয়ে সমালোচনা করে তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলা প্রয়োজন যে, ইসলামের গোলামী প্রথা পাশ্চাত্যের মহাজনী প্রথার চেয়ে অনেক ভাল। কেননা, পূর্বে বর্ণনা করে আসা হয়েছে যে, ইসলাম অনেক যৌক্তিক কারণে তা নিষিদ্ধ না করলেও মানুষের অধিকারকে সংরক্ষণ করার ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করেছে। যারা এই বলে গর্ব করে আমরা গোলামী প্রথাকে দূর করেছি। নি:সন্দেহে তারা শুধুগোলামীর শব্দটা দূর করেছে। মানুষের অধিকার সংরক্ষণের কোনো ব্যবস্থা করেনি।

         উল্লেখ্য, ইসলাম প্রথাটি শিথিল করার জন্য অনেক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। যাতে ধীরেধীরে   এটি বন্ধ হয়ে যায়। যেমন হাদীসে গোলাম আযাদের অনেক ফযিলত বর্ণনা করা হয়েছে। একটি হাদীসে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি কোনো মুসলমান গোলাম আযাদ করবে, আল্লাহ তাআলা সেই গোলামের প্রতিটি অঙ্গের বিনিময়ে আযাদকারীর একেক অঙ্গকে জাহান্নাম থেকে মু্ক্তি দান করবেন। বুখারী:১/৩৪৪ এমনিভাবে অমুসলিম গোলাম আযাদের অনেক ফযিলত এসেছে।

      এসব ফযিলত লাভের আশায় অনেক ছাহাবীই গোলাম আযাদ করেছেন যেমন- হযরত আবু বকর রা. এর আযাদকৃত গোলামের সংখ্যা ৬৩, হযরত আব্দুর রহমান ইবনে আউফ রা. এর ৩০, হযরত হাকীম ইবনে হিযাম রা. এর ২০০, হযরত আব্বাস রা. এর ৭০, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা. এর ১০০০, হযরত আয়েশা রা. এর ৬৯, হযরত উসমান রা. প্রতি জুমাআয় একজনকে আযাদ করতেন

        ১. দাসীদের দ্বারা ব্যভিচার করিয়ে অর্থ উপার্জনকে নিষিদ্ধ করে পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে, তোমরা তোমাদের দাসীদেরকে অপকর্ম করতে বাধ্য করো না (তাদেরকে কোনো ধরনের অপকর্ম করতে দিয়োনা) সুরা নুর:33

       ২. গোলামদের সাথে ইসলাম পূর্ব যুগে চতুষ্পদ জন্তুর মত আচরণ করা হতো, সেটা নিষিদ্ধ করে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, এসব গোলাম-বাদীরা তোমাদের ভাই-বোন আল্লাহ তাআলাই তাদেরকে তোমাদের অধিনস্ত করেছেন। তাই তোমাদের জন্য আবশ্যক তাদের সাথে সমতা রক্ষা করা। তোমরা যা খাও তাদেরকে  তাই খাওয়াও। তাদের সাধ্যের বাইরে তাদের থেকে কোনো খেদমত নিওনা। এবং কঠিন কাজ দিলে নিজেরাও তাদের সহযোগিতা কর। বুখারী:1/346, আবু দাউদ:702, আরো ইরশাদ হচ্ছে, অন্যায়ভাবে যে ব্যক্তি গোলামকে মারপিট করবে বা থাপ্পড় দিবে, এর কাফ্ফারা হলো সেই গোলামকে আযাদ করে দেওয়াআবু দাউদ:702, এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল, গোলামের অপরাধ কতবার ক্ষমা করব। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করলেন, দৈনিক সত্তর বার ক্ষমা করবে। আবু দাউদ:702

       সর্বোপরি মৃত্যুর সময় হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মতকে যে দুটি বিষয়ে  সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছেন তা হচ্ছে, নামাজ এবং গোলামের হক্ব। আবু দাউদ:701, এগুলো তো হচ্ছে মৌলিক বিধান। এছাড়াও এমন অনেক ক্ষেত্র রয়েছে, যেখানে গোলাম আযাদ বাধ্য করে দেওয়া হয়েছে যেমন-

    ১. গোলাম যদি এমন কারো মালিকানায় আসে যিনি তার কোনো আপন আত্মীয়, তাহলেএমনিতেই আযাদ হয়ে যায়। মনিব থেকে যে দাসি বাচ্চাজন্ম দিবে, সে দাসী মনিবের মৃত্যুর পর আযাদ হয়ে যাবে।

          আর দাস-দাসীর বিধান এখনো  রহিত হয়নি বহাল রয়েছে।। যদি দুনিয়ার কোথাও আবারও সেই সব কারণ পাওয়া যায় সেখানে পুনরায় দাস-দাসীর বিধান প্রযোজ্য হবে।

كما قال الله تعالى فى القران الكريم. [النور: 33]

{وَلَا تُكْرِهُوا فَتَيَاتِكُمْ عَلَى الْبِغَاءِ إِنْ أَرَدْنَ تَحَصُّنًا لِتَبْتَغُوا عَرَضَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَمَنْ يُكْرِهْهُنَّ }

 وأخرج الإمام البخاري فى صحيحه :1/344

عن أبي هريرة  : عن النبي صلى الله عليه و سلم قال ( من أعتق رقبة مسلمة أعتق الله بكل عضو منه عضوا من النار حتى فرجه بفرجه )

 

وأخرج الإمام البخاري فى صحيحه :1/346

  قال: رأيت أبا ذر الغفاري رضي الله عنه وعليه حلة، وعلى غلامه حلة، فسألناه عن ذلك، فقال:     إني ساببت رجلا، فشكاني إلى النبي صلى الله عليه وسلم، فقال لي النبي صلى الله عليه وسلم:    «أعيرته بأمه»، ثم قال: «إن إخوانكم خولكم جعلهم الله تحت أيديكم، فمن كان أخوه تحت يدهفليطعمه مما يأكل، وليلبسه مما يلبس، ولا تكلفوهم ما يغلبهم، فإن كلفتموهم ما يغلبهم  أعينوهم»

وأخرج الإمام مسلم فى صحيحه (5/ 90)

 قال أتيت ابن عمر وقد أعتق مملوكا – قال – فأخذ من الأرض عودا أو شيئا فقال ما فيه من الأجر ما يسوى هذا إلا أنى سمعت رسول الله -صلى الله عليه وسلم- يقول « من لطم مملوكه أو ضربه فكفارته أن يعتقه ».

وأخرج الإمام أبو داود فى سننه :702

قال: سمعت عبد الله بن عمر يقول: جاء رجل إلى النبي صلى الله عليه وسلم، فقال: يا رسول الله، كم نعفو عن الخادم؟ فصمت، ثم أعاد عليه الكلام، فصمت، فلما كان في الثالثة، قال: «اعفوا عنه في كل يوم سبعين مرة»

وأخرج الإمام أحمد فى مسنده (44/ 261)

عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حِينَ حُضِرَ جَعَلَ يَقُولُ الصَّلَاةَ الصَّلَاةَ وَمَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ فَجَعَلَ يَتَكَلَّمُ بِهَا وَمَا يَكَادُ يَفِيضُ بِهَا لِسَانُهُ

ويراجع أيضا: فتاوى رحيميه:1/217

 

والله أعلم بالصواب

 محمد تاج الإسلام عفى عنه

دار الإفتاء والإرشاد

بالجامعة الرحمانية العربية

                                                                                        سات مسجد، محمد بور، دكا- 1207