আওয়ামীলীগ-জামায়াত সংঘাত : আলেম সামাজের ভাবনা

মুহাম্মদ মামুনুল হক

বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে একটা রহস্যময়তা রয়েছে। রাজনীতি নিয়ে যারা ভাবেন এবং যথেষ্ট পরিমাণ ভাবেন, তারাও এর কোনো কুল-কিনারা খুঁজে পাননা। আমার কাছে এর মূল কারণ যা মনে হয়, রাজনীতি ও রাজনীতিবিদদের ভেতর-বাইরের অমিল। রাজনীতিবিদগণ বাইরে যেমন সুন্দর সুন্দর কথা বলেন। দেশ-জনতার প্রতি ভালোবাসা দেখান। বাহিরটা তাদের যতো সুন্দর ভেতরটা তাদের ততই কদর্য। রাজনীতির অঙ্গনের এই ভেতর-বাইরের অমিলের ব্যাপারটাকে অন্যান্য ক্ষেত্রের মতো গড়পড়তায় বলে দেয়া যায় না যে, ভালো মন্দ সব জায়গাতেই আছে। সুতরাং রাজনীতিতেও থাকবে। কারণ রাজনীতিতে ভালো আর মন্দের তফাৎটা এতই বেশি মনে হয় যে, মন্দের বিপরীতে ভালোর পরিমাণটা এখানে কোনো পরিসংখ্যানেই আসার উপযুক্ত নয়। জানিনা এ থেকে মুক্তি মিলবে কি না আদৌ। মিললেও কীভাবে এবং কবে? তা এক আলেমুলগায়েব আল্লাহই বলতে পারেন।
সাম্প্রতিক সময়ের রাজনীতি ও রাজনৈতিক অঙ্গনের অস্থিরতা দেশের চিন্তাশীল সকল মানুষকে গভীর উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। উৎকণ্ঠায় গোটা জাতি এর ভবিষ্যৎ পরিণাম নিয়ে। সাধারণ মানুষের মতো আমরাও উদ্বিগ্ন ও চিন্তিত। আমাদের উদ্বেগ ও চিন্তার মাত্রা বোধ করি অন্য দশজনের চেয়ে একটু বেশি। কারণ যুগপৎ ধর্ম ও দেশ আমাদের চিন্তার বিষয়। মানুষের নিরাপত্তা ও ইসলামের ভবিষ্যৎ চিন্তা আমাদের উদ্বেগের কারণ। রাজনীতির খুব জটিল মারপ্যাচে না গিয়ে ইসলাম ও দেশের কল্যাণ চিন্তায় ইসলামিক অঙ্গণ থেকে স্রেফ একটি সাধারণ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা বক্ষমান নিবন্ধের উদ্দেশ্য। আমাদের এই পর্যবেক্ষণের মূল বিষয় বাংলাদেশের বর্তমান সংঘাতময় রাজনৈতিক পরিস্থিতি। যুদ্ধাপরাধের বিচার, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ও নাস্তিক মুরতাদগোষ্ঠী কর্তৃক মহান আল্লাহ তা’য়ালা, মহানবী হযরত মুহাম্মদ সা. ও ইসলামের চরম অবমানা এই তিন ইস্যুতে এখন অগ্নিগর্ভ বাংলাদেশ। ইস্যু তিনটি ভিন্ন ভিন্ন হলেও সময়, প্রেক্ষাপট ও পারিপার্শিকতার কারণে অনেক ক্ষেত্রে এক সূত্রে গেথে যাচ্ছে এবং জাতি দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ছে।
উপরোক্ত তিন ইস্যুর ভিত্তিতে আমাদের জাতীয় রাজনীতির পর্যবেক্ষণের পূর্বে সুবিধার জন্য জাতীয় রাজনীতির পক্ষগুলো সম্পর্কে একটু আলোচনা করে নেয়া প্রয়োজন। ইসলামিক অঙ্গণ থেকে আমরা বাংলাদেশের রাজনীতিতে পাঁচটি পক্ষকে ক্রিয়াশীল দেখতে পাই। যার দুটি ইসলামি অঙ্গনের আর তিনটি এর বাইরের। পক্ষগুলো যথাক্রমে এক. ধর্ম নিরপেক্ষ ও বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী আওয়ামীলীগ। দুই. ইসলামি মূল্যবোধ ও বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী বিএনপি। তিন. ইসলামবিদ্বেষী, কম্যুনিজমে বিশ্বাসী বামপন্থী দলগুলো। চার. মডারেট ইসলাম ও মাওলানা মওদুদীর দর্শনে বিশ্বাসী জামায়াতে ইসলামী। পাঁচ. কওমি মাদরাসা কেন্দ্রিক আলেম-ওলামাদের নেতৃত্বাধীন ইসলামি শক্তি। ভোটের রাজনীতিতে হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয়পার্টির বিশাল ভূমিকা থাকলেও রাজনৈতিক দর্শনের ক্ষেত্রে বিএনপির সাথে মৌলিক ব্যবধান কম। বিদ্যমান পাঁচটি পক্ষের মধ্যেই পরস্পর কিছু স্বার্থ সংশ্লিষ্ট দ্বন্দ্ব-সংঘাত রয়েছে। ঐতিহাসিক ভাবেই এ অঞ্চলের মানুষ দুটি শিবিরে বিভক্ত। একটি হলো ইসলামের পক্ষাবলম্বী আর অপরটি হলো ইসলামবিরোধী। মুসলিমলীগ থেকে আওয়ামী মুসলিমলীগ হয়ে আওয়ামীলীগের জন্ম সূত্রের ইতিহাস একথাই প্রমাণ করে যে, তারা নিরেট মুসলিম বলয় থেকে বেরিয়ে গিয়ে ভিন্ন বলয়ের আনুকূল্যে রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এতদঞ্চলে মুসলিমবিরোধী শক্তির প্রতিনিধিত্বকারী দল হিসেবেই আওয়ামীলীগের উত্থান। অপর দিকে এর বিপরীত ধারার যে শক্তিগুলো বিভিন্নভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল এবং সবচেয়ে বড় কথা যে বিশাল জন সমর্থন ছিল তারই প্রতিনিধিত্বের রূপ নিয়ে আত্মপ্রকাশ ঘটে বিএনপির। আওয়ামীলীগ ও বিএনপির এই জন্মগত প্রেক্ষাপট স্বাভাবিক ভাবেই দুই দলকে দুই শিবিরের সমর্থন পেতে সাহায্য করেছে। নদীর স্রোত যেমন ভাসমান কচুরিপানাগুলোকে অনুকূল প্রান্তে নিয়ে জড়ো করে তেমনি এই দুটি স্রোত ভাসমান পক্ষগুলোকে আপন আপন অনুকূলে একত্রিত করেছে। সেই সূত্রেই চরম ইসলাম বিদ্বেষী, নাস্তিক খোদাদ্রোহী শক্তির সখ্যতা আগাগোড়াই আওয়ামীলীগের সাথে। অপর দিকে ইসলামের পক্ষের জনসমর্থন পায় বিএনপি। আওয়ামীলীগ, বিএনপি শুধুই ক্ষমতার রাজনীতি করে। এই কারণেই লক্ষ্য করা যায়, আগাগোড়া ইসলামের দোহাই দিয়ে রাজনীতি করলেও প্রকৃতপক্ষে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থেকেও ইসলামের পক্ষে বড় কোনো কাজ বিএনপি করেনি। সমর্থন আদায় করতে যতটুকু করতে হয় দায়সাড়া গোছের সেটুকুতেই আটকে থেকেছে তারা। আর বলার মতো আকেটি বড় বিষয় হলোÑ ইসলামের বিরুদ্ধে বিএনপির নিজস্ব কোনো এজেন্ডা নেই। পক্ষান্তরে ইসলামবিরোধী কট্টর বামপন্থীদের প্ররোচনায় আওয়ামীলীগের দ্বারা ইসলামের বিরুদ্ধে বড় বড় পদক্ষেপ পরিচালিত হয়েছে এই বাংলাদেশে। অবশ্য এ কারণে ইসলামের পক্ষের জনসমর্থন সব সময় গিয়েছে আওয়ামীলীগের বিরুদ্ধে।
বিগত নির্বাচনের আগে আওয়ামীলীগ তার এই দীর্ঘদিনের ইসলামবিরোধী পরিচয়ের খোলস থেকে বেরিয়ে আসার জন্য কিছু পদক্ষেপ নিয়েছিল। (যদিও তাতে তারা অটল থাকতে পারেনি) সেই সাথে ইসলামপন্থীদের সাথে দূরত্ব কমানোর চেষ্টাও তারা করেছে। এক্ষেত্রে আওয়ামীলীগ কৌশলী ভূমিকা গ্রহণ করে। ইসলামপন্থীদের মধ্যকার জামায়াত ও কওমি মহলের বিভাজনকে উপলব্ধিতে নিয়ে কওমি মহল ও অন্যান্য জামায়াতবিরোধী ইসলামি পক্ষের সাথে সখ্যতা গড়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু বরাবরের মতো আওয়ামীলীগের মাথায় বামপন্থীদের ভুত সাওয়ার থেকেছে। সেজন্য বামপন্থী রাজনীতি থেকে আওয়ামীলীগে যোগদানকারী ও বাম নেতা-নেত্রীরা প্রায়ই ইসলাম, ইসলামি রাজনীতি, সংবিধানে অবশিষ্ট ইসলামের নাম নিশানা বিষয়ে কঠোর ও বিদ্বেষমূলক বক্তব্য প্রদান অব্যাহত রাখে। এমনকি সর্বশেষ শাহাবাগে গড়ে ওঠা গণজাগরণমঞ্চ যে সকল দাবি নিয়ে মাঠে নামে তার মধ্যে অন্যতম প্রধান দাবি ছিল ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করা। যদিও সরকারের বর্তমান কৌশলের আলোকে পরে শাহাবাগীরা সংশোধন করে শুধু জামায়াত-শিবিরের রাজনীতির বিরুদ্ধে কথা বলে। আওয়ামীলীগের বর্তমান এই কৌশল, কওমি মাদরাসা কেন্দ্রিক ইসলামি মহলের প্রতি আওয়ামীলীগের কিছুটা নমনীয় মনোভাব, আওয়ামীলীগ-জামায়াতে ইসলামির বর্তমান মুখোমুখি অবস্থান ও আলেম সমাজের সাথে জামায়াতে ইসলামীর দীর্ঘদিনের বিরোধের প্রকৃতি নিয়ে একটু পর্যালোচনা করা দরকার।
আওয়ামীলীগ-জামায়াত সংঘাত, আলেম সমাজ-জামায়াত বিরোধ ও আলেম সমাজের সাথে আওয়ামীলীগের নমনীয়তা সব মিলিয়ে এখানে একটি ত্রিভূজ সম্পর্ক-সংঘাতের ব্যাপার রয়েছে। যারা ইসলামি রাজনীতি নিয়ে ভাবেন তাদের বিষয়টির ওপর গভীর দৃষ্টি দিতে হবে। এজন্য আমরা প্রথমে আলেম সমাজ বনাম জামায়াতে ইসলামী বিরোধের এবং পরে আওয়ামীলীগ বনাম জামায়াতে ইসলামী বিরোধের প্রকৃতি তুলে ধরতে চাই।
আলেম সমাজ বনাম জামায়াতে ইসলামী বিরোধ :
এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ আলেম ওলামাদের সাথে মাওলানা মওদুদী সাহেবের প্রতিষ্ঠিত জামায়াতে ইসলামের বিরোধ নতুন নয়; দীর্ঘ অর্ধ শতাব্দী কালের। এই বিরোধ মূলত কোনো রাজনৈতিক চিন্তা দর্শনের বিরোধ নয়। বরং নিতান্তই কিছু ধর্মীয় চিন্তা, বিশ্বাস ও দর্শনের বিরোধ। উপমহাদেশের আলেম সমাজের মধ্যে ১৯৪৭ এর ভারত বিভক্তির সময় যে বড় রকমের রাজনৈতিক মতপার্থক্য ছিল। হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রহ. এর শিষ্য শাগরেদগণ ভারতের বিভক্তি তথা পাকিস্তান আন্দোলনের পক্ষে ছিলেন। পক্ষান্তরে হযরত মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানী রহ. এর নেতৃত্বে তার অনুসারীগণ অভিভক্ত ভারতের পক্ষে ছিলেন। রাজনৈতিক এই ইস্যুতে উপমহাদেশের আলেম সমাজ স্পষ্টত:ই দুই শিবিরে বিভক্ত হওয়া সত্ত্বেও মাওলানা মওদুদী সাহেব ও তার প্রতিষ্ঠিত জামায়াতে ইসলামীর ব্যাপারে অভিন্ন অবস্থানেই ছিলেন। জামায়াতে ইসলামী আগাগোড়াই আলেম সমাজের সাথে তাদের বিরোধকে একটি রাজনৈতিক বিরোধ হিসেবে চিত্রিত করার প্রয়াস চালিয়েছে। কিন্তু সচেতন আলেম সমাজ কখনোই এই প্রয়াসকে প্রশ্রয় দেননি। আওয়ামীলীগ বনাম জামায়াতে ইসলামী বিরোধ :
জামায়াতে ইসলামীর সাথে আওয়ামীলীগের বিরোধ মূলত রাজনৈতিক বিরোধ। আওয়ামীলীগ ইসলাম বিদ্বেষী ধর্ম নিরপেক্ষ রাজনৈতিক দর্শনের দল। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ইসলামি শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ঘোর বিরোধী রাজনৈতিক দর্শনই আওয়ামীলীগের দর্শন। রাষ্ট্রের সকল স্তর থেকে ধর্মীয় পরিচয় তুলে দিয়ে শুধু ব্যক্তি পর্যায়ে ধর্মপালনের চিন্তায় বিশ্বাসী তারা। সংবিধানে ইসলাম ও মুসলমানদের সামান্য প্রাধান্যও তাদের অসহ্য। তাদের সংসদীয় উপনেতার ঘোষণা হলোÑ ‘সংবিধান থেকে ধর্মের কালো ছায়াকে অপসারণ করা হবে।’ অপর পক্ষে জামায়াতে ইসলামী হলো রাষ্ট্রে ইসলামী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গঠিত একটি ধর্মীয় রাজনৈতিক সংগঠন। এ ছাড়া আওয়ামীলীগ ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যকার আরো একটি বড় বিরোধের বিষয় হলো স্বাধীনতা যুদ্ধে দুই দলের বিপরীতমুখী ভূমিকা।

আওয়ামীলীগ ও জামায়াতে ইসলামীর বর্তমান মুখোমুখি অবস্থান ও আলেম সমাজের ভাবনা
আওয়ামীলীগ ও জামায়াতে ইসলামীর অতীতÑ বর্তমান কর্মকাণ্ড ও চরিত্র নিয়ে সমালোচনামূলক আলোকপাতের মাধ্যমে আলেম সমাজের ভাবনার জন্য কিছু বিষয় তুলে ধরতে চাই। জামায়াতে ইসলামীর সাথে আওয়ামীলীগের ঐতিহাসিকভাবে বিরোধ থাকলেও বর্তমান মুখোমুখি অবস্থানটি একটু ভিন্নভাবেই বিশ্লেষণ করতে হবে। আওয়ামীলীগ ও তার মিত্রদের মধ্যে দুটি ধারা রয়েছেÑ
এক. যারা মনে প্রাণে ইসলামি রাজনীতি ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় ইসলামের উপস্থিতির প্রতি চরম বিদ্বেষ পোষণ করে। এদের রাজনীতি হলো রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে ইসলামকে নির্মূল করা।
দুই. যারা ক্ষমতার পাগল। ক্ষমতার জন্য যা করা দরকার তাই করতে এরা প্রস্তুত। সাম্প্রতিক সময়গুলোতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে জোটবদ্ধতার হাওয়া লেগেছে। এই সূত্রে বিএনপি জামায়াত বেশ সংহত এক জোটে পরিণত। বিপরিত দিকে আওয়ামীলীগ বামপন্থী গোষ্ঠী গাটছড়া বাধা। জোটের এই রাজনৈতিক মেরুকরণে আওয়ামীলীগ চায় বিরোধী জোটকে দুর্বল করতে। এই জন্য তারা জামায়াতের দুর্বল স্থানকে টার্গেট করেছে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় দলটির রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে মানবতা বিরোধী অপরাধের নামে যুদ্ধাপরাধের বিচার করার উদ্যোগ নিয়েছে আওয়ামীলীগ। আওয়ামীলীগের এই উদ্যোগের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে দেখা আজকের প্রেক্ষাপটে অতীব প্রয়োজন। ইতিপূর্বে আওয়ামীলীগ আরও দুইবার ক্ষমতায় ছিল। স্বাধীনতার পরপর আধিপত্য নিয়ে একবার এবং ৯৬ থেকে ২০০১ পর্যন্ত দ্বিতীয়বার। তখন কিন্তু তারা এমন উদ্যোগ নেয়নি। স্বাধীনতার পর পর আওয়ামীলীগ বাংলাদেশে, যাই চাইত করতে পারত। কিন্তু তখন তারা জামায়াতের বিচার করেনি। ৯৬ এর মেয়াদেও করেনি। তাহলে এবার তারা এই ইস্যুতে এতোটা মরিয়া কেন? এর সম্ভাব্য দুটি উত্তর হতে পারে।
প্রথমটি হলোÑ স্বাধীনতা পরবর্তী ঐ সময়ে জামায়াতে ইসলামী এতোটা শক্তিশালী ছিল না। আর ৯৬ এর মেয়াদে তাদের সাথে লিয়াজোঁর সম্পর্ক ছিল। আর দ্বিতীয়টি, বিএনপির সাথে জোটবদ্ধ হয়ে জামায়াত আওয়ামীলীগের ক্ষমতার পথে বাঁধা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তাই তাদের সাথে এতো বিরোধ।
যদি জামায়াতের বিরুদ্ধে আওয়ামীলীগের কঠোর ভূমিকার কারণ এই হয়ে থাকে যে, জামায়াত আগে এতা শক্তিশালী ছিল না, বর্তমানে তাদের শক্তিমত্ত্বা বেড়ে যাওয়ার কারণেই তাদের ওপর এই খড়গ। মৌলবাদী ও ইসলামী রাজণৈতিক দল হিসেবে জামায়াতের উত্থানই যদি এই কঠোরতার কারণ হয়ে থাকে তাহলে হক্কানী আলেম সমাজের জন্য চিন্তার বিষয় হলোÑ যারা জামায়াতের মডারেট কাট-ছাট মার্কা ইসলামকেই বরদাশত করতে পারে না সত্যিকার ইসলামপন্থীদের যদি রাজনৈতিকভাবে সেই শক্তি অর্জন হয়, তাহলে পূর্ণাঙ্গ ইসলামি শক্তি ও কঠোর ইসলামি অনুশাসনের রাজনীতির সঙ্গে তাদের আচরণ কী হবে? কোনো কোনো ধর্মনিরপেক্ষতাবাদিকে জামায়াতের বিরোধিতা করার সময় এমনও বলতে শোনা যায় যে, তারা মওদূদীর ইসলামে বিশ্বাসী নয় তারা মদিনার ইসলামে বিশ্বাসী।
এক্ষেত্রে নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে, এই ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা কোন কওমি আলেমের কাছ থেকে ‘মওদূদীবাদ’ শব্দটি শিখে নিয়েছে। কিন্তু হায়! এই ধরনের মুর্খ ধর্মনিরপেক্ষবাদিরা যদি জানতো, তাদের ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদের সাথে মওদূদী সাহেবের ইসলামের যতো বিরোধ, মদিনার ইসলামের সাথে তাদের মতবাদের বিরোধ আরো অনেক বেশি! সুতরাং এই বিবেচনায় সম্পূর্ণ ব্যাপারটিকে ইতিবাচকভাবে ভাববার কোনো সুযোগ নাই। দ্বিতীয় সম্ভাবনা ছিল বিএনপির সাথে জোট বদ্ধতাই এ কঠোরতার কারণ। তাহলে এটাকে ‘রাজনীতির খেল’ বলতে হবে। এমন অনেক খেল চলতে থাকে নিষ্ঠুর রাজনীতিতে। এক্ষেত্রে কট্টর ইসলাম বিদ্বেষী বামপন্থী গোষ্ঠি যারা ইসলামি রাজনীতিকে একবারেই বরদাশত করতে পারে নাÑ আওয়ামীলীগের এই রাজনৈতিক গেমের মধ্যে দিয়ে তারা তাদের দৃষ্টিতে এদেশের ইসলামি রাজনীতির সবচেয়ে শক্তিশালী গোষ্ঠী জামায়াত-শিবিরকে নিশ্চিহ্ন করতে চায়। আর আওয়ামীলীগের মূল লক্ষ হলো সম্ভাব্য দুটি সুবিধার যে কোন একটি লাভ করা। অর্থাৎ যুদ্ধাপরাধের বিচারের নামে চাপ প্রয়োগ করে বিএনপি থেকে জামায়াতকে বিচ্ছিন্ন করা আর তা না পারলে জামায়াতকে কোনঠাসা করে বিরোধী জোটকে দুর্বল করে দেয়া।
আওয়ামীলীগের এই কৌশল বিষয়ে সাধারণ নাগরিক হিসেবে বলতে হয়, রাজনীতিতে অনেক খেলা চলে। ল্যাং মারামারিও চলে। বিরোধী পক্ষকে ঘায়েল করার সম্ভাব্য সকল পন্থাই গ্রহণ করা হয়। আমরা এগুলো দেখতে দেখতে অভ্যস্ত। কিন্তু খেলতে খেলতে এমন শক্তিশালী, দেশের সর্বত্র সেকড় গেড়ে বসা একটি সংগঠনের শীর্ষ নেতৃত্বকে ফাঁসি দিয়ে দিবেÑ এই পর্যায়ের রাজনীতির খেল কতোটা বাস্তবসম্মত?
কোনো দেশে অভ্যুত্থান পরিস্থিতি ছাড়া সাধারণ রাজনৈতিক পরিবেশে এই পর্যায়ের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃবর্গকে ফাঁসি দিয়ে হত্যা করার নজির বিরল। এমন পরিস্থিতিতে জামায়াত-শিবিরের জন্য ব্যাপারটি জীবন মরণের প্রশ্ন হয়েই দেখা দিয়েছে। এই ধরনের পরিস্থিতে বেঁচে থাকার জন্য যা করার দরকার তা করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প পথ খোলা থাকে না।
জামায়াত-শিবির জীবন-মরণের প্রশ্নে যা করছে আওয়ামীলীগ এই ধরণের পরিস্থিতির শিকার হলে কমপক্ষে এর চেয়েও দশগুণ বেশি তাণ্ডব চালাতো। আওয়ামীলীগ যদি এ বিষয়ে আরো অগ্রসর হয় সে ক্ষেত্রে সচেতন মহলের উদ্বেগ হলো যে, দেশ একটি দীর্ঘ মেয়াদি গৃহযুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাবে। আল্লাহ না করুন, যদি এমন অনাকাক্সিক্ষত কোনো পরিস্থতির সৃষ্টি হয়Ñ তাহলে এর দায়ভার কি সম্পূর্ণ আওয়ামীলীগের ওপর বর্তাবে না?
আমরা পরিস্কার বুঝতে চাই, জামায়াতের বিরুদ্ধে যদি এমন পদক্ষেপই নিতে হবে, তাহলে সেটা ৭১-৭৫ এর সময়ে নেয়া হয়নি কেন? ৯৬ এ কেন তাদের সাথে লিয়াজোঁ করে এক সাথে পথ চলা হলো? কেন গোলাম আযমের আশীর্বাদ গ্রহণ করা হলো? এসব করে করে জামায়াত-শিবিরকে দেশের সবচেয়ে সংঘবদ্ধ শক্তিতে পরিণত হওয়ার পথে সহযোগিতা করা হয়েছে। কিন্তু নিজেদের ক্ষমতার রাজনীতির পথে যখন শক্তিশালী বাঁধা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, তখন চরমপন্থা অবলম্বন করতে চাইছে।
জনগণের জানমালের নিরাপত্তার প্রশ্ন উপেক্ষা করে, দেশের মধ্যে গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতি সৃষ্টি করে রাজনৈতিক স্বার্থ উদ্ধার করবে; বিবেকহীনতার এই সময়েও এতোটা নৃশংস রাজনীতি মেনে নিতে বিবেকের সাড়া পাওয়া যাবে না। আমাদের বক্তব্য হলোÑ রাজনৈতিক ও আদর্শিক দেওলিয়াত্বের এই সময়েও বিরোধে জড়াবেন, জড়ান। আবার আতাঁত করবেন, করেন। পর্দার পিছনে আঁতাত করবেন। আর বাইরে এসে লম্বা লম্বা বক্তৃতা দিয়ে জনগণের সরলতার সাথে বিশ্বাস ঘাতকতা করবেন তাও করেন। কিন্তু দয়া করে এতোটা চরমন্থী হয়ে উঠবেন না যে দেশ একটি দীর্ঘ অরাজকতার মধ্যে পতিত হয়।
নাগরিকদের মধ্যে এই যে বিদ্বেষ ও চরমপন্থী মনোভাব তৈরি হচ্ছে এর কারণেই প্রকাশ্যে পিটিয়ে পিটিয়ে জীবন্ত মানুষকে হত্যা করে তার মরদেহের উপর নৃত্য ও উল্লাস করার পেশাচিকতা আমরা প্রদর্শন করতে পেরেছি। মানবতার এই বিপর্যস্ত চিত্র জাতি হিসেবে আমাদের জন্য কি খুবই সুখকর?
বিরোধি থাকলে আদর্শ, যুক্তি ও সৃজনশীলতার মাধ্যমে মোকাবিলা করুন। নির্মূল করে দেওয়ার চরমন্থী চিন্তা আজকের পৃথিবীতে বড় ভয়ঙ্কর।
আওয়ামীলীগ তাদের বর্তমান জামায়াত বিরোধী এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে পারুক অথবা না পারুক দেশের সাধারণ জনগণের মধ্যে কিন্তু স্পষ্ট একটা বিভাজন তৈরি হয়ে যাচ্ছে। এই ক্ষেত্রে আওয়ামীলীগের কর্মকাণ্ড বুমেরাং হয়ে যেতে পারে।
ধর্মপ্রাণ ব্যাপক জনগোষ্ঠী আওয়ামীলীগের মাত্রাতিরিক্ত বাড়াবাড়ির কারণে জামায়াতের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে উঠতে পারে। যার কিছু কিছু আলামতও দেখা যাচ্ছে। এই পয়েন্ট থেকে আলেম সমাজের ভূমিকা খুবই সুচিন্তিত ও দায়িত্বশীল হওয়া বাঞ্চণীয়। জামায়াতের সাথে আলেম সমাজের দ্বন্দ মোটেও আওয়ামীলীগের মতো নয়। রাজনৈতিক সুবিধার জন্য জামায়াত কখনো আওয়ামীলীগের বন্ধু হয় আবার কখনো শত্র“ হয়। তাদের এই বন্ধুত্ব ও শত্র“তা রাজনৈতিক স্বার্থকে জড়িয়ে। আর আলেম সমাজের দ্বন্দ সম্পূর্ণ ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে। আদৌ কোনো সাময়িক স্বার্থ কিংবা রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে নয়। জামায়াত চায় এটাকে রাজনৈতিক কালার দিতে। অতি উৎসাহি কোন কোন আলেমের ভূমিকাও জামায়াতের উদ্দেশ্য সফলে সহায়ক বলে মনে হয়।
দীর্ঘ আলোচনার উপসংহারে এসে বলতে চাই, আলেম সমাজকে বর্তমান আওয়ামীলীগ জামায়াত দ্বন্দের ক্ষেত্রে নিজেদের ভূমিকা নিজেদের অবস্থান থেকেই নির্ধারণ ও পালন করতে হবে। আওয়ামীলীগের এজেন্ডা কিংবা তাদের বক্তব্যের সমর্থনে জামায়াত বিরোধিতায় নামলে জামায়াতের সাথে আলেম সমাজের দ্বন্দও রাজনৈতিক রূপ লাভ করবে এবং আওয়ামীলীগের বাড়াবাড়ির কারণে ধর্মপ্রাণ মহল জামায়াতের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ার পাশাপাশি আলেম সমাজের কাছ থেকে দূরে সরে যেতে পারে।
আর জামায়াতের সাথে মৌলিক ও আদর্শিক মতপার্থক্য গুলোকে স্বযতেœ রাজনৈতিক রঙ চড়ানো থেকে বিরত থাকতে ও রাখতে হবে। কাদিয়ানীদের দোসর শাহরিয়ার কবিরদের মুখ থেকে যেমন মওদূদীর ইসলাম ও মদিনার ইসলামের পার্থক্য শুনে খুশি হওয়ার কিছু নেই। আওয়ামীলীগারদের কাছ থেকেও তদ্রুপ। এরা মদিনার ইসলামকে বুঝলে মওদূদীর ইসলামকেই নিজেদের জন্য অধিকতর নিরাপদ মনে করবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
জামায়াতের সাথে আলেম সমাজের বিরোধকে হ-য-ব-র-ল অবস্থা থেকে নিরাপদে রেখে পরিস্কারভাবে জামায়াতকে বলে দিতে হবে, আলেম সমাজের সমর্থন পেতে হলে মওদূদী সাহেবের বিভ্রান্ত চিন্তা ও দর্শনগুলো থেকে প্রকাশ্যে সরে আসার ঘোষণা দিতে হবে। সেই সাথে জামায়াতের ব্যাপারে আরো সুনির্দিষ্ট দুটি অভিযোগ আলেম সমাজের পক্ষ থেকে উত্থাপিত হওয়া বাঞ্চণীয়। এক. জামায়াত-শিবির ইসলামের নামে রাজনীতি করা সত্ত্বেও তাদের বিভিন্ন কর্মসূচি ও কর্মকাণ্ডে নানা রকম অনৈসলামী কর্মকাণ্ডের অনুপ্রবেশ ঘটছে।
দুই. তারা ইসলামের নামে রাজনীতি করে, অথছ বিভিন্ন ইসলামি ইস্যুতে এমন কি আল্লাহ, রাসূল সা. ও পবিত্র কুরআনের সম্মান রক্ষায় তাদের জোড়ালো কোনো ভূমিকা নেই। উপরন্তু আলেম সমাজের সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক নিরেট ইসলামি ইস্যুর বিভিন্ন কর্মসূচিতে অনুপ্রবেশ করে সেগুলোকেও তারা তাদের দলীয় রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার কতে চায়। এটা বড়ই কাপুরুষোচিত ও ধূর্ত আচরণ!