শিয়াদের মতবাদ ও আকীদা
শিয়া সম্প্রদায় “ইমামিয়া”দের প্রধানতম দল যা ‘ইসনা আশারিয়া’ নামে পরিচিত বর্তমানে সারা বিশ্বে তাদের অবস্থান ব্যাপক। তাদের মতবাদ ও আকীদা নি¤েœ তুলে ধরা হলো-
ইমামদের সম্বন্ধে শিয়াদের আকীদা
১. ইমামগণের গর্ভ ও জন্ম হয় অদ্ভুত প্রক্রিয়ায়। অর্থাৎ সাধারণত মানুষ যে প্রক্রিয়ায় জন্ম গ্রহণ করে সে প্রক্রিয়ায় তারা জন্ম গ্রহণ করে না।
২. ইমামগণ নবীর ন্যায় আল্লাহর পক্ষ থেকে মনোনীত হন।
৩. শিয়াদের বক্তব্য হলো কুরআন মাজীদে ইমামত ও ইমামগণের বর্ণনা ছিল।
৪. ইমামগণ পয়গম্বরগণের মতই আল্লাহর প্রমাণ, নিষ্পাপ ও আনুগত্যশীল।
৫. ইমামগণ পয়গম্বরগণের মত নিষ্পাপ।
৬. ইমামগণের মর্তবা রাসূলুল্লাহ সা. এর সমান এবং অন্য সকল পয়গম্বরের উর্ধ্বে।
৭. ইমামগণ যা ইচ্ছা হালাল অথবা হারাম করার ক্ষমতা রাখেন।
৮. ইমাম ব্যতিত দুনিয়া কায়েম থাকতে পারে না।
৯. ইমামগণের অতীত ও ভবিষ্যতের জ্ঞান অর্জিত ছিল।
১০.ইমামগণের জন্য কুরআন হাদীস ছাড়াও জ্ঞানের অন্যান্য অত্যাশ্চর্য সূত্র রয়েছে।
১১.ইমামগণের এমন জ্ঞান আছে, যা ফেরেশতা ও নবীগণেরও নেই।
১২.প্রত্যেক জুমার রাত্রিতে ইমামগণের মেরাজ হয়। তারা আরশ পর্যন্ত পৌঁছেন।
১৩.ইমানগণের প্রতি প্রতিবছরের শবে কদরে আল্লাহর পক্ষ থেকে এক কিতাব নাযিল হয় যা ফেরেশতা ও রূহ নিয়ে আসেন।
১৪.ইমামগণ তাদের মৃত্যুর সময়ও জানেন এবং তাদের মৃত্যুও তাদের ইচ্ছাধীন থাকে।
১৫.ইমামগণের সামনেও মানুষের দিবারাত্রির আমল পেশ হয়।
১৬.ইমামগণ কিয়ামতের দিন সমসাময়িক লোকদের জন্য সাক্ষ্য দিবেন।
১৭.ইমামগণের আনুগত্য করা ফরজ।
১৮.ইমামগণের ইমামত, নবুওয়াত ও রিসালাত স্বীকার করা এবং তাঁদের প্রতি ঈমান-বিশ্বাস স্থাপন করা নাজাতের জন্য শর্ত।
১৯.ইমামত, ইমামগণের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন ও তা প্রচারের আদেশ সকল পয়গম্বর ও সকল ঐশী গ্রন্থের মাধ্যমে এসেছে।
২০.ইমামগণ দুনিয়া ও আখেরাতের মালিক এবং তারা যাকে ইচ্ছে শাস্তি দেন ও ক্ষমা করেন।
২১.ইমামগণ মানুষকে জান্নাত ও দোযখে প্রেরণকারী।
২২.যে ইমামকে মানে না সে কাফের।
২৩.জান্নাতে যাওয়া না যাওয়া ইমামদের মান্য করা না করার উপর নির্ভরশীল।
সাহাবা বিদ্বেষ সংক্রান্ত আকীদা
১. তারা প্রথম তিন খলীফা হযরত আবু বকর, ওমর ও উসমান রা. কে কাফের ও ধর্মত্যাগী মনে করে। (হযরত আলী রা. এর ইমামত না মানার কারণে)
২. শিয়াদের কথিত ব্যাখ্যা অনুসারে যারা আলী রা. এর ইমামত মানে না তারা জাহান্নামী। এভাবে তারা সব সাহাবীকে এবং সমস্ত মুসলমানকে কাফের সাব্যস্ত করেছে।
৩. শিয়াদের সাহাবা বিদ্বেষের পর্যায়ে একথাও উল্লেখযোগ্য যে, তাদের ধারণা হলো প্রতিশ্রুত মাহদী আতœপ্রকাশ করার পর হযরত আয়েশা রা. কে জীবিত করে শাস্তি দিবেন।
৪. শিয়াদের ধারণায় সাহাবায়ে কেরামের প্রায় সকলেই বিশেষত খলীফাত্রয় কাফের ধর্মত্যাগী আল্লাহ ও রসূলের প্রতি বিশ্বাসঘাতক, জাহান্নামী ও অভিশপ্ত।
৫. শিয়াদের ধারণায় অন্তর্নিহিত ইমাম যখন আত্মপ্রকাশ করবেন, তখন শায়খাইন হযরত আবু বকর ও ওমর রা. কে কবর থেকে বের করবেন এবং হাজারো বার শূলীতে চড়াবেন।
৬. শিয়াদের ধারণা হযরত আয়েশা ও হযরত হাফসা মুনাফিকা ছিলেন। তারা রাসূল সা.কে বিষ দিয়ে খতম করেছেন।
কুরআন বিকৃতি বিষয়ক আকীদা
১. কুরআনে “পাঞ্জতক পাক” ও সকল ইমামের নাম ছিল।
২. কুরআনের দুই তৃতীয়াংশ গায়েব করে দেয়া হয়েছে।
৩. কুরআন বিকৃতি সম্বন্ধে হযরত আলীও বলে গেছেন।
৪. আসল কুরআন ইমামে গায়েবের নিকট রয়েছে।
৫. পরিবর্তনের রেওয়ায়েত দু’হাজারেরও অধিক।
৬. কুরআনে একটি সূরা ছিল যা বর্তমান কুরআনে নেই। (সেটি হলো সূরাতুল বিলায়াত, আয়াত-৭)
শিয়াদের আরও কিছু মৌলিক আকীদা
১. তাকিয়্যা ঃ
তাকিয়্যা হলো- এক গুরুত্বপূর্ণ মাসআলাহ, যাকে তাদের নিকট দ্বীনের এক গুরুত্বপূর্ণ রুকন মনে করা হত। এর অর্থ হলো- মানুষ তার মান ও মর্যাদা এবং জান ও মাল শত্রুর কবল থেকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে যা কিছু অন্তরে আছে তার বিপরীত প্রকাশ করবে।
২. কিতমান ঃ কিতমান এর অর্থ হলো- আসল আকীদা, মাযহাব ও মত গোপন করা এবং অন্যের কাছে প্রকাশ না করা। তাকিয়্যার অর্থ কথায় ও কাজে বাস্তব ঘটনার বিপরীতে অথবা আপন আকীদা মাযহাব ও মতের বিপরীত প্রকাশ করা এবং এভাবে অপরকে ধোঁকা ও প্রতারণায় লিপ্ত করা। শিয়াদের মতে তাদের ইমামগণ সারাজীবন এ শিক্ষা মেনে চলেছেন।
৩. প্রায়শ্চিত্তের আকীদা ঃ- যেমন: কোন শিয়া যদি এমন অবস্থায় মারা যায় যে, তার যিম্মায় কোন মুমিন ভাইয়ের কর্জ থাকে তাহলে তা ইমাম মাহদি আ. এর আত্মপ্রকাশের পর তিনি তা পরিশোধ করবেন।
ইমামিয়া শিয়াদের দ্বিতীয় বৃহত্তম দল হলো ‘ইসমাঈলিয়া শিয়া’
এ সম্প্রদায় হলো জাফর ছাদেকের পর তার বড় পুত্র ইসমাঈল এবং তারপর তার পুত্র মুহাম্মাদ আল মাকতুমের ইমামতে বিশ্বাসী।
এ সম্প্রদায়ের আকিদা ঃ-
শরিয়তের একটা জাহির এবং একটা বাতিন থাকে। সাধারণ লোকেরা জাহির সম্বন্ধে অবগত থাকেন আর ইমামগণ জাহির-বাতিন উভয়টি সম্বন্ধে আবগত থাকেন। এ কারণে তাদেরকে বাতিনিয়াও বলা হয়।
ইমামিয়া শিয়াদের তৃতীয় বৃহত্তম দল হলো “যায়দিয়া”
যায়দিয়াগণ ইমাম আলী ইবনে হুসাইন অর্থাৎ ইমাম জয়নুল আবেদীনের দ্বিতীয় পুত্র যায়েদ শহীদকে ইমাম মানেন। অতঃপর তারই আউলাদ ও বংশের মধ্যে ইমাম অব্যাহত থাকার বিশ্বাস রাখেন।
প্রথম দিকে যায়দিয়া সম্প্রদায় আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের কাছাকাছি সম্প্রদায় হিসেবে গণ্য হত। তারা কোন সাহাবীর তাকফীর করত না। তবে পরবর্তীতে অধিকাংশ যায়দিয়ার আকীদা বিশ্বাস ইছনা আশারিয়াদের ন্যায় হয়ে যায়। বর্তমানে সহীহ আকীদা বিশ্বাস সম্পন্ন “যায়দিয়া” ইয়ামান প্রভৃতি দেশে কিছু সংখ্যক পাওয়া যায়।
গাইরে মুকাল্লিদ তথাকথিত ‘আহলে হাদীস’ আকীদা
১. আল্লাহ তা‘য়ালার গঠন ও আকৃতি আছে। (হাদয়াতুল মাহদী-১/৭, ফেরকায়ে আহলে হাদীস-১১৫)
২. আল্লাহ তা‘য়ালার অবস্থানের স্থান আছে। তিনি আরশে উপবিষ্ট। (হাদয়াতুল মাহদী-১/৯, তাবয়ীবুল কুরআন-৫০, ফেরকায়ে আহলে হাদীস-১১৫)
৩. “আল্লাহ” শব্দে জিকির করা বিদআত। (আল বুনইয়ানুল মারসূস-১৭৩, ফেরকায়ে আহলে হাদীস-১১৮)
৪. রামচন্দ্র ও কৃষ্ণ আল্লাহর নবী ছিলেন। (হাদয়াতুল মাহদী-১/৯, ফেরকায়ে আহলে হাদীস-১১৮)
৫. নবীদের কবরে জীবিত থাকাকে অস্বীকার।
৬. হযরত ঈসা আ. এর পিতা ছিলেন। (ফেরকায়ে আহলে হাদীস-১২৬)
৭. সাহাবীদের কথা ও কাজ প্রমাণযোগ্য নয়। (ফেরকায়ে আহলে হাদীস-১৩১)
৮. সাহাবায়ে কেরামের শানে বেয়াদবী। তারা তারাবীর নামায বিশ রাকাত সুন্নাত হওয়াকে অস্বীকার করে বিদআতে উমরী এবং জুম‘আর প্রথম আযানকে বিদআতে উসমানী বলে আখ্যা দেয়া।
৯. কতিপয় সাহাবাগণ ফাসেক ছিলেন। (নাউযুবিল্লাহ) এমনকি হযরত মুয়াবিয়া রা. কবীরা গুনাহ ও বিদ্রোহ করেছেন। (নাউযুবিল্লাহ) (আল বুনইয়ানুল মারসূস-১৮৪, ফেরকায়ে আহলে হাদীস-১৩৫)
১০. জুমআর খুতবায় খোলাফায়ে রাশেদার নাম নেয়া বিদআত। (হাদয়াতুল মাহদী-১১০)
১১. তাকলীদকে অস্বীকার। (আদইয়ানে বাতেলা আওর সিরাতে মুসতাকীম-২৩২)
১২. ইজমায়ে উম্মাতকে অস্বীকার। (আদইয়ানে বাতেলা আওর সিরাতে মুসতাকীম-২৩২)
১৩. আসলাফে উম্মাত বিশেষ করে আইম্মায়ে আরবা‘য়াকে গালী গালাজ ও তাদেরকে অপবাদ।
১৪. রাসূল সা. এর রওজা যিয়ারতের উদ্দেশ্যে সফর করা জায়েজ নয়। (আরফুল জাদী-২৫৭, ফেরকায়ে আহলে হাদীস-১১৯)
১৫. একই সময়ে যতজন মহিলাকে ইচ্ছে বিয়ে করা জায়েয। চারজনই হতে হবে এমন কোন বাধ্যবাধকতা নেই। (যফরুল লাজী-১৪১,১৪২ এবং আরফুল জাদী-১১৫)
১৬. কাফেরদের জবাই করা পশু হালাল। আর তা খাওয়া জায়েয। (দলীলুত তালেব-৪১৩, আরফুর জাদী-২৪৭)
মওদুদী মতবাদ
১. আম্বিয়ায়ে কেরাম আ. এর ইসমত (নিষ্পাপ হওয়া) প্রসঙ্গ: মওদুদী সাহেব বলেন- এ ব্যাখ্যা গ্রহন করতে কেউ কেউ দ্বিধাবোধ করে থাকেন। তার একমাত্র কারণ এই যে নবীদের বিরুদ্ধে এ ধরনের ভুল-ভ্রান্তির অভিযোগ তোলা নবীদের নিষ্পাপ হওয়া সংক্রান্ত আকীদার পরিপন্থী বলে মনে হয়। কিন্তু যারা এরূপ মতামত পোষণ করেন তারা সম্ভবত: এ ব্যাপারে গভীর ভাবে চিন্তা ভাবনা করেন নি যে, নিষ্পাপ হওয়াটা আসলে নবীদের সত্ত্বাগত অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য নয়; বরং আল্লাহ তাদেরকে নবূওয়াত নামক সুমহান পদটির দায়িত্ব ও কর্তব্য সুষ্ঠভাবে পালন করার সুযোগ দানের জন্য একটা হিতকর ব্যবস্থা হিসেবে গুনাহ থেকে রক্ষা করেছেন। নচেৎ আল্লাহর এই সংরক্ষণমূলক ব্যবস্থাটা যদি ক্ষণিকের জন্যও তাদের ব্যক্তিসত্তা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় তাহলে সাধারণ মানুষের যেমন গুনাহ হয়ে থাকে তেমনি নবীদেরও হতে পারে। এটা বড়ই মজার কথা যে, আল্লাহ ইচ্ছাকৃত প্রত্যেক নবী থেকেই কোন না কোন সময় নিজের সংরক্ষণ ব্যবস্থা তুলে নিয়ে দু‘একটা গুনাহ ঘটে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন যাতে মানুষ নবীদেরকে খোদা মনে করে না বসে এবং তারা যে মানুষ খোদা নন সেটা বুঝতে পারে।
২. নবীগণ কর্তৃক নবুওয়াতের দায়িত্ব পালন প্রসঙ্গ: রাসূল সা. সম্পর্কে তিনি বলেন-
সে পবিত্র সত্ত্বার নিকট কাতর কন্ঠে আবেদন করুন হে মালিক! এ তেইশ বছরের নববী জীবনে দ্বীনের খেদমত আঞ্জাম দানকালে স্বীয় দায়িত্বসমূহ আদায়ের বেলায় যে সকল ত্রুটি-বিচ্যুতি আমার থেকে সংঘটিত হয়েছে তা ক্ষমা করে দাও।
৩. আম্বিয়ায়ে কেরামের সমালোচনা প্রসঙ্গ: তিনি বিভিন্ন নবী সম্পর্কে সমালোচনা করে বলেন- হযরত দাউদ আ. তার যুগের ইসরাঈলী সমাজের সাধারণ প্রথায় প্রভাবান্বিত হয়ে উরিয়ার কাছে তার স্ত্রীকে তালাক দেয়ার আবেদন করেছিলেন। অন্যত্র বলেছেন- হযরত দাউদ আ. এর এ কাজে কুপ্রবৃত্তির কিছুটা দখল ছিল।
হযরত ইউছুফ আ. সম্পর্কে বলেন- এটা কেবল অর্থ মন্ত্রীর গদী লাভের দাবী ছিল না ; যেমন কোন কোন লোক মনে করে থাকেন বরং তা ছিল ডিরেক্টরশীপ লাভের দাবী। এর ফলে ইউছুফ আ. যে পজিশন লাভ করেছিলেন তা প্রায় এ ধরনের ছিল যা ইটালীর মুসেরিনরের রয়েছে। আদি পিতা আদম আ. থেকে প্রকাশিত ঐ মানবিক দুর্বলতার হাকীকত বুঝে নিতে হবে যা আদম আ. এর মধ্যে এক আত্মবিস্মৃতির জন্ম দিয়েছিল এবং আত্মœনিয়ন্ত্রণের বাধন ঢিলা হওয়া মাত্রই তিনি আনুগত্যের সু-উচ্চ মর্যাদা থেকে পাপের অতল গহ্বরে তলিয়ে গিয়েছিলেন।
নবীদের সম্পর্কে বলেন- অন্যদের কথা তো স্বতন্ত্র। প্রায়শ:ই পয়গম্বরগণও তাদের কু-প্রবৃত্তির মারাতœক আক্রমণের সম্মুখীন হয়েছেন।
৪. সাহাবায়ে কেরামের আদালত ও সমালোচনা প্রসঙ্গ: তিনি বলেন-
অনেক সময় মানবিক দুর্বলতা সাহাবীদেরকেও আচ্ছন্ন করে ফেলত। এবং তারা পরস্পরের উপর আঘাত করে কথা বলতেন। ঐতিহাসিকদের ভাষ্য কাঁট ছাঁট করে হযরত মুয়াবিয়া রা. এর বিরুদ্ধে অভিযোগ হিসেবে তুলে ধরেছেন।
৫. সাহাবায়ে কেরামের সত্যের মাপকাঠি হওয়া প্রসঙ্গ: তিনি বলেন-
রাসূলে খোদাকে ছাড়া কাউকে হকের মাপকাঠি বানাবে না। কাউকে সমালোচনার উর্ধ্বে মনে করবে না। কারো যিহনী গোলামীতে লিপ্ত হবে না।
৬. ঈসা আ. সম্পর্কে বলেন- এটাই ভাল যে হযরত ঈসা আ. কে স্বশরীরে আসমানে উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে এ কথা বলা থেকে বিরত থাকা এবং তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন একথা বলা থেকেও বিরত থাকা।
৭. ইমাম মাহদী সম্পর্কে বলেন- আমার মুসলমানদের মধ্যে যারা ইমাম মাহদীর আগমনের উপর বিশ্বাস রাখেন তারা যথেষ্ট বিভ্রান্তির মধ্যে অবস্থান করছেন। তারা মনে করেন ইমাম মাহদী পুরাতন যুগের কোন সুফী ধরনের লোক হবেন। আমার মতে আগমনকারী ব্যক্তি তার নিজের যুগের একজন আধুনিক নেতা হবেন।
৮. কুরআন ও ইসলাম সর্বযুগে সংরক্ষিত কি না এ প্রসঙ্গ: তিনি বলেন-
কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার সময় এ শব্দগুলোর (ইলাহ, রব, দ্বীন ও ইবাদত) যে মৌল অর্থ প্রচলিত ছিল পরবর্তী শতকে ধীরে ধীরে তা পরিবর্তিত হতে থাকে। শেষ পর্যন্ত একটি শতাব্দীতে তার সম্পূর্ণ ব্যাপকতা হারিয়ে একান্ত সীমিত বরং অস্পষ্ট অর্থের জন্য নির্দিষ্ট হয়ে পড়ে। এক পৃষ্ঠা পর লিখেছেন, এটা সত্য যে কেবল এর চারটি মৌলিক পরিভাষার তাৎপর্যে আবরণ পড়ে যাওয়ার কারণেই কুরআনের তিন চতুর্থাংশের চেয়ে বেশী শিক্ষা এবং তার সত্যিকার স্প্রিটই দৃষ্টি থেকে প্রচ্ছন্ন হয়ে যায়।
৯. আমল এবং ইবাদতের ক্ষেত্রে তার দৃষ্টিভঙ্গি: নামাজ, রোজা, হজ্জ, যাকাত ইত্যাদি ইবাদতসমূহ জিহাদ ও ইসলামী হুকুমত কায়েমের প্রস্তুতির জন্যই নির্দিষ্ট করা হয়েছে। অন্যত্র বলেন: মূলত মানুষের রোজা, নামায, হজ্জ, যাকাত, যিকির, তাসবীহ ঐ বড় ইবাদতের জন্য প্রস্তুত করার ট্রেনিং কোর্স।
১০.দাড়ি প্রসঙ্গ: তিনি বলেন- রাসূল সা. যতবড় দাড়ি রেখেছেন ততো লম্বা দাড়ি রাখাই হলো সুন্নাতে রাসূল বা উসওয়ায়ে রাসূল। আপনার এ ধারণার অর্থ এই দাঁড়ায় যে আপনি রাসূলের অভ্যাসকে হুবহু রাসূলের এই সুন্নাতের মর্যাদা সম্পন্ন মনে করেছেন, যা জারি ও প্রতিষ্ঠা করার জন্য নবী পাক সা. এবং অন্যান্য আম্বিয়ায়ে কেরাম প্রেরিত হয়েছিলেন। তিনি আরো বলেন- আমার মতে কারো দাড়ি ছোট কিংবা বড় হওয়ার মধ্যে বিশেষ কোন পার্থক্য নেই।
হাদীস অস্বীকারকারীদের মতবাদ
১. রাসূলে কারীম সা. এর দায়িত্ব ছিল শুধু কুরআন পৌঁছানো। আনুগত্য ওয়াজিব শুধু কুরআনের। রাসূল হিসেবে রাসূল এর আনুগত্য না সাহাবায়ে কেরামের উপর ওয়াজিব ছিল, না আমাদের উপর ওয়াজিব। এবং ওহী শুধু মাতলূ। ওহীয়ে গায়রে মাতলূ বলতে কোন জিনিস নেই। তাছাড়া কুরআনে কারীম বুঝার জন্য হাদীসের প্রয়োজন নেই।
২. রাসূল সা. এর বাণীগুলো সাহাবীদের জন্য তো প্রমাণ ছিল। কিন্তু আমাদের জন্য তা প্রমাণ নয়।
৩. রাসূল সা. এর হাদীসসমূহ সমস্ত মানুষের জন্য হুজ্জাত বা প্রমাণ। কিন্তু বর্তমানে হাদীসগুলো আমাদের দায়িত্বে বর্তায় না।
৪. রাসূল সা. এর হাদীস হুজ্জাত, কিন্তু খবরে ওয়াহেদ হল ظنىবা ধারণামূলক হাদীস। তাই তা গ্রহনযোগ্য নয়।
সুরেশ্বরী এর মতবাদ
১. তাদের মতে সামা, নাচ, গান, বাদ্য সবই জায়েজ।
২. তারা সেজদায়ে তাহিয়্যাহ (সম্মানের সেজদা) বৈধ হওয়ার প্রবক্তা।
৩. তারা মাযারে গিলাফ, ফুল, আগরবাতি, মোমবাতি ও গোলাপজল দেয়ার প্রবক্তা।
৪. কবরের মাটি নরম কিংবা তাতে জল কাদা থাকলে তাতে বিছানা কিংবা কাঠ দেওয়া কর্তব্য। নেক লোকের কবরে খাট দিলেও কোন দোষ নেই।
৫. মরণের পর যে কয়েকদিন রুহ দোয়া দানের জন্য আসে, তার নাম তিজা, চাহারম, সপ্তমী, দশই, সাতাইশা, চল্লিশা, ছমাসি, সালায়ানা।
৬. পীরের নিকট দীক্ষিত না হলে কোন বন্দেগী কবুল হয় না।
৭. কোন কামেল ওলীর কোন ইবাদাত বন্দেগীর প্রয়োজন হয় না।
৮. আহাদ ও আহমাদের (আল্লাহ ও তার রাসূলের) মীমের পার্থক্য কেবল হামদ ও নাতের জন্য।
৯. রাসূল সা. ইলমে গায়েবের অধিকারী।
এনায়েতপুরী
১. এনায়েতপুরী সাহেবের বংশের সকলেই মাদারজাত ওলী। তিনি বলেন- আমার বংশের তেফেল শিশু বাচ্চাকেও যদি তোমরা পাও তাহাকে মাদারজাত ওলী মনে করিও।
২. আহাদ ও আহমাদের (আল্লাহ ও তার রাসূলের) মীমের মধ্যে পার্থক্য কেবল হামদ ও নাতের জন্য। তিনি বলেন-
আহাদে আহম্মদ বানাইয়ে মিমকা পদ মাঝে দিয়ে
খেলতিয়াছেন পাক বারি হইয়া বে-নিশান
৩. একশত ত্রিশ ফরজ (যার মধ্যে চার কুরছী অর্থাৎ মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহর পুত্র, তিনি আব্দুল মোতালেবের পুত্র, তিনি হাশেমের পুত্র, তিনি আব্দুল মানাফের পুত্র। ইত্যাদি কথা রয়েছে) জানাকে ফরজ সাব্যস্ত করেছেন।
৪. তাদের মতে পীর ধরা ফরজ।
৫. পীরের মধ্যে ‘তাওয়াজ্জুহ দিয়ে মানুষের মধ্যে পরিবর্তন এনে দিতে পারেন’ এমন ক্ষমতা রয়েছে।
৬. এনায়েতপুরী তার মুরীদ ও খলীফাকে বলেন- বাবা তোর ভাল-মন্দ উভয়টাই আমার হাতে রইল। তোর কোন চিন্তা নাই।
তার সাহেবযাদা লিখেছেন- খাজা তোমার দরবারে কেউ ফিরে না খালি হাতে, খাজা তোমার পাক রওজায় এসে যদি কেউ কিছু চায়, চাইতে জানলে রয়না কাঙ্গাল অফুরন্ত ভান্ডারে।
৭. তাদের মতে সামা জায়েয। তারা ওরস এর প্রবক্তা। আটরশির পীর তার উদ্বৃতি দিয়ে বলেন- ওরস শরীফ কাজা করিলে পরবর্তী এক বছরের জন্য বহু দুর্ভোগ পোহাইতে হয়। যাবতীয় আয় উন্নতির পথ রুদ্ধ হয়।
চন্দ্রপুরী
১. কোন লোক বড় বুযুর্গ হলে তার আর ইবাদত লাগে না। তিনি বলেন- কোন লোক মাকামে ছুদুর, নশোর, শামসী, নুরী, করবে মাকিনের মোকাম অতিক্রম করিয়া নফসির মোকামে গিয়ে পৌঁছে তখন তাহার কোন ইবাদত থাকে না। জযবার অবস্থায়ও কোন লোক যখন ফানার শেষ জজবায় গিয়ে পৌঁছে, তখনও তাহার কোন ইবাদত থাকেনা। এমনকি তখন ইবাদত করিলে কুফুরী হইবে।
২. জিব্রাঈল আ. এবং আল্লাহ এক ও অভিন্ন। তিনি বলেন- জিব্রাঈল বলতে অন্য কেহ নন, স্বয়ং হাকীকতে আল্লাহ।
৩. ফেরেশতারা আল্লাহর নাফারমানী করে।
৪. তিনি পুনর্জ¤œবাদের প্রবক্তা। তিনি বলেন- “আল্লাহর বাণী ثم يحييكم” এর অর্থ পৃথিবীতে পুনরায় জন্মলাভ করা।
দেওয়ানবাগী
১. মুক্তির জন্য ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করা জরুরী নয়। তিনি বলেন- আমার এখানে এক ব্যক্তি আসে সে ভিন্ন ধর্মের আনুসারী। তার ধর্মে থেকেই ওজীফা আমলের নিয়ম তাকে বলে দিলাম। কিছুদিন পর লোকটা এসে আমাকে জানালো হুজুর, একরাত্রে স্বপ্নে আমার রাসূল সা. এর রওযা শরীফে যাওয়ার খোশ নসীব হয়।
২. জান্নাত, জাহান্নাম, হাশর, মীযান, পুলসিরাত, কিরামান-কাতেবীন, মুনকার-নাকীর, ফেরেশতা, হুর, তাকদীর, আমলনামা ইত্যাদির ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, এগুলোর অর্থ আমরা যা মনে করি তা নয়। বরং জান্নাতের অর্থ হল প্রভূর সাথে পুনরায় মিলনে আত্মœার যে প্রশান্তি ও আনন্দ লাভ হয় উহাই শ্রেষ্ঠ সুখ। এরই নাম জান্নাত।
জাহান্নাম সম্পর্কে বলেন- আতœার চিরস্থায়ী যন্ত্রনাদায়ক অবস্থাকেই জাহান্নাম বলে।
হাশর সম্পর্কে বলেন- সূফী সাধকগণের দৃষ্টিতে মানুষের হাশর পৃথিবীর বুকে সংঘঠিত হয়ে থাকে। তিনি বলেন- প্রকৃত পক্ষে মৃত্যুর পর মৃত ব্যক্তির দেহের কোন ক্রিয়া থাকে না। তার আত্মার উপরই সব কিছু হয়ে থাকে। আর এ আত্মাকে পরিত্যাক্ত দেহে আর কখনো প্রবেশ করানো হবে না।
৩. তিনি পুনর্জন্মœবাদের প্রবক্তা। তিনি বলেন- “আল্লাহর বাণী ثم يحييكم” এর অর্থ পৃথিবীতে পুনরায় জন্মলাভ করা।
৪. আল্লাহ ও রাসূলকে স্বচক্ষে না দেখে কালিমা পড়ে সাক্ষ্য দেয়ার ও বিশ্বাস করার কোন অর্থ হয় না।
৫. কুরআন, কিতাব, হাদীস, তাফসীর পড়ে আল্লাহকে পাওয়া যায় না। একমাত্র সাহায্য নিয়ে আধ্যাতিœক সাধনা করেই আল্লাহকে পাওয়া সম্ভব। এমনকি দুনিয়াতেই স্বচক্ষে দেখা যায়।
৬. আল্লাহর সাথে যোগাযোগ ক্বালবেরই হয়ে থাকে। অন্য ভাবে হাজার ইবাদত করেও আল্লাহকে পাওয়া যায় না।
৭. সাধনার দ্বারা আল্লাহকে নিজের ভিতরই খুঁজে পাওয়া সম্ভব। বাইরে কোথাও নয়।
৮. এরূপ ধ্যান করবেন যে, আদমের পায়ের নীচে ক্বালব। এই ক্বালবে আল্লাহ ও রাসূল থাকেন।
৯. ১৯৯৮ সালে বিশ্ব আশেকে রাসূল সম্মেলনে আল্লাহ ও রাসূল স্বয়ং দেওয়ানবাগে এসেছিলেন। আল্লাহ ফেরেশতাদেরকে উক্ত সম্মেলনে উপস্থিত সমস্ত আশেক্বদের তালিকা তৈরী করতে নির্দেশ দিলেন। ঐ তালিকাভুক্ত সবাই বেহেশতে চলে যাবে।
১০.সূর্যোদয় পর্যন্ত সেহরী খাওয়ার সময়। হুজুররা ঘুমানোর জন্য তাড়াতাড়ি আযান দিয়ে দেয়। আপনি কিন্তু খাবার বন্ধ করবেন না।
১১.তাদের অন্যতম শ্লোগান হল, ঘরে ঘরে মীলাদ দাও রাসূলের শাফায়াত নাও।
বে-শরা ফকীর
১. শরীয়ত বা মা‘রেফাত ভিন্ন ভিন্ন। শরীয়তে যা নাজায়েয মা‘রেফাতের পন্থায় তা জায়েয।
২. তারা বাতেনী দায়েমী নামাযের প্রবক্তা।
৩. ক্বালব ঠিক থাকলে সব ঠিক। ক্বালব ঠিক থাকলে যাহিরী ইবাদতের প্রয়োজন পড়ে না।
৪. কুরআনের ত্রিশ পারা যাহিরী আর দশ পারা বাতেনী। এই দশ পারা পীর ফকীরদের সিনায় সিনায় চলে আসছে।
৫. গায়রে মাহরাম নারী-পুরুষ পর্দাহীন ভাবে যিকির করা বৈধ।
৬. কোন পুরুষ যে কোন নারীকে ভোগ করতে পারে।
৭. তাদের মতে গান বাদ্য করা বৈধ।
৮. তাদের মতে মদ গাজা খাওয়া বৈধ।
৯. তারা পীর ফকীরদের মধ্যে আল্লাহর হুলুলের আকীদা রাখে।
বাউল সম্প্রদায়
১. চার চন্দ্র তত্ত্ব: অর্থাৎ সিদ্ধি অর্জন করার জন্য শুক্র, রজ, বিষ্ঠা ও মুত্র এ চারটি জিনিসের গুরুত্ব অপরিসীম।
২. মনের মানুষ তত্ত্ব: তারা আল্লাহ, অচিন পাখি, মনের মানুষ, আলেক সাঁই ইত্যাদিকে সমার্থবোধক মনে করে থাকেন। আত্মসন্ধানের মাধ্যমে তারা এই কথিত মনের মানুষ তথা খোদাকে সন্ধানই তাদের প্রধান লক্ষ্য।
৩. আল্লাহ ও রাসূল এক হওয়ার তত্ত্ব: তাদের ধারণা হল আল্লাহ ও রাসূলের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। যিনি আল্লাহ তিনিই রাসূল।
৪. মুরশিদ তত্ত্ব: তারা যেমন আল্লাহ ও রাসূলের মধ্যে কোন পার্থক্য করে না তেমনি আল্লাহ ও মুরশিদের মধ্যেও কোন পার্থক্য করে না।
৫. সর্ব ধর্ম সমন্বয়ের দর্শন: অর্থাৎ বাউল ধর্মের লক্ষ্য হল- সর্ব ধর্মের সার সমন্বয় সাধন।
৬. তারা ঐশী শাস্ত্র ভিত্তিক কোন ধর্ম ও সমাজ ব্যবস্থা মানে না। তারা দেশ জাত বর্ণ ধর্ম নির্বিশেষে কেবল মানুষকে জানতে মানতে ও শ্রদ্ধা জানাতে চায়। মানুষের ভেতর মনের মানুষকে খুঁজে পেতে চায়।
৭. তারা সংসার বিরাগী হয়ে থাকে। আত্মœসন্ধানের মাধ্যমে কথিত মনের মানুষকে সন্ধান করাই তাদের প্রধান লক্ষ্য।
৮. তাদের সাধনার প্রধান অঙ্গ হল সঙ্গীত।
বেরেলভীদের আকীদা
রাসূল সা. এর প্রেমের আতিশয্য প্রকাশ করতে গিয়ে বেরেলভীরা জঘন্য ধরনের বহু শিরকী ও বিদআতী আকীদার উদ্ভব ঘটিয়েছে। নি¤েœ তার কিছু নমুনা দেয়া হল-
১. তাদের বিশ্বাস হল, রাসূলুল্লাহ সা. এমন ক্ষমতার অধিকারী, যার মাধ্যমে তিনি সারা দুনিয়া পরিচালনা করে থাকেন। (বেরেলভীয়্যত: আকাইদ ও তারীখ, দিল কা সরূর)
তাদের একজন বড় নেতা আমজাদ আলী বেরেলভী বলেছেন- রাসূলুল্লাহ সা. হলেন আল্লাহর সরাসরি নায়েব। সমস্ত বিশ্বজগৎ তাঁর পরিচালনার অধীন। তিনি যা খুশী করতে পারেন এবং যাকে খুশী দান করতে পারেন, যাকে খুশী নিঃস্বও করতে পারেন। তাঁর রাজত্বে হস্তক্ষেপ করা দুনিয়ার কারো পক্ষে সম্ভব নয়। যে তাঁকে অধিপতি হিসাবে মনে করে না, সে সুন্নাত অনুসরণের স্বাদ থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
২. বেরেলভীদের বিশ্বাস হল- রাসূলুল্লাহ সা. নূরের তৈরী। (বেরেলভীয়্যত: আকাইদ ও তারীখ, এখতেলাফে উম্মত আওর সিরাতে মুস্তাকীম)
৩. এবং তিনি হাজির (সর্বত্র উপস্থিত) ও নাযির (সর্বদ্রষ্টা)। (এখতেলাফে উম্মত আওর সিরাতে মুস্তাকীম)
আর সেটা এইভাবে যে, বিশ্বের প্রতিটি অণু-পরমাণুতে তাঁর রুহানিয়্যাত (আত্মিকশক্তি) ও নূরানিয়্যাত বিচ্ছুরিত হয়। এই রুহানিয়্যাত ও নূরানিয়্যাতের জন্য স্থানের নৈকট্য -দূরত্বের কোন তারতম্য নেই। কেননা আলমে খালক্ব (সৃষ্টিজগৎ) স্থানকালের গ-িতে আবদ্ধ, কিন্তু আলমে আমর (নির্দেশজগৎ) এই গ-ি হতে মুক্ত ও পবিত্র। ফলে যুগপৎভাবে বিভিন্ন স্থানে তাঁর উপস্থিতি এবং প্রকাশ্যভাবে জাগ্রত অবস্থায় তাঁর সাক্ষাত লাভে আওলিয়া কেরামের ধন্য হওয়া সম্ভবপর। কারণ তিনি নূর। আর নূর স্বীয় দৃষ্টি শক্তি দ্বারা নিখিল বিশ্ব দর্শন করতে সক্ষম এবং তাঁর পক্ষে বিভিন্ন স্থানে একই সময়ে উপস্থিত হওয়া সম্ভব।
তাদের মতে, রাসূল সা. হলেন গায়েবজান্তা। এমন কি পঞ্চ-গায়েবের মধ্য হতে নানা শাখাগত জ্ঞান লাভ করেছেন। ভূত-ভবিষ্যতের যতসব ঘটনা লাওহে মাহফূযে সংরক্ষিত হয়েছে এবং এ ছাড়াও অন্যান্য ঘটনা রাসূল সা. অবহিত ছিলেন। আহমাদ রেজা খান লিখেছেন- আল্লাহ আমাদের নেতা। আমাদের অভিভাবক মুহাম্মাদ সা. কে লওহে মাহফূযের যাবতীয় কিছু দান করেছেন। (খালেছুল ইতক্বাদ-৩৩)
৪. রাসূল সা. কে হাজির-নাজির জ্ঞান করত: ইয়া রাসূলাল্লাহ বলে রাসূল সা. কে সম্বোধন করা। (এখতেলাফে উম্মত আওর সিরাতে মুস্তাকীম)
যেহেতু বেরেলভীদের মতে, রাসূলুল্লাহ সা, হাজির-নাজির, আলিমুল গায়েব ও নূর, সেহেতেু তার নিকট সাহায্য প্রার্থনা করা, তাঁকে ডাক দেয়া এবং ইয়া রাসূলাল্লাহ ধ্বনি দেওয়া জায়েয। সাহায্যের জন্য যে ব্যক্তি তাঁকে ডাকে, তিনি তা শ্রবণ করেন এবং তাকে সাহায্য করেন। এজন্য প্রতি ফরয ছালাতের পর তাদের ইমাম সাহেব সূরা আহযাবের ৫৬ নং আয়াত পড়ে ইয়া নবী সালামু আলাইকা বলে কোরাস শুরু করেন এবং মুক্তাদীরা সমস্বরে সেই কোরাসে যোগ দেয়।
মাইজ ভা-ারীর ভ্রান্তিকর মতবাদ সমূহ
১. ধর্ম নিরপেক্ষতা মতবাদ (অর্থাৎ হিন্দু, বৌদ্ধ, খৃস্টান যে কোন ধর্মের লোক নিজ নিজ ধর্মে সাধনা করে মুক্তি পাবে)। তথ্যসূত্র ঃ গাউসুল আজম মাইজভা-ারী জীবনী ও কারামত, সংকলক সংগ্রাহক মাওলানা শাহ ছুফী সৈয়দ দেলাওয়ার হুসাইন, পঞ্চদশ প্রকাশ, জুলাই- ২০০২। পৃষ্ঠা-১৫১,১৫২।
২. বিশেষ স্তরে শরীয়তের বিধান শিথিল হওয়ার মতবাদ (অর্থাৎ বিশেষ কামেল স্তরের ব্যক্তিবর্গের জন্য নামায রোযা ইত্যাদির বিধান শিথিল হয়ে যায়। বস্তুত একারণেই অনেক ভা-ারীকে বাতিনী নামাযের নামে নামায থেকে বিরত থাকতে দেখা যায়)। তথ্যসূত্র ঃ বেলায়েতে মোতলাকা আলহাজ শাহ সুফী সৈয়দ মুনিরুল হক, মোনতাজেম দরবারে গাউছুল আজম মাইজ ভা-ারী কর্তৃক প্রকাশিত, ৮ম সংস্করণ, এপ্রিল- ২০০১, পৃষ্ঠা-১৬।
৩. শরীয়ত ও তরীকত ভিন্ন হওয়ার মতবাদ। (অর্থাৎ শরীয়ত সাধারণ মানুষের জন্য কামেল স্তরের মানুষের জন্য শরীয়তের বিধি বিধান পালনের বাধ্যবাধকতা থাকে শরীয়তে অনেক কিছু জরুরী যা তরীকতে জরুরী নয়।)
৪. পীরের মধ্যে খোদায়িত্ব আরোপ করার মতবাদ। (অর্থাৎ তাদের পীর আল্লাহর প্রকাশ বা আল্লাহর অবতার) তথ্যসূত্র ঃ রতœ ভা-ার প্রথম খ-, পৃষ্ঠা-২১, প্রকাশক সৈয়দ মুনিরুল হক, ৮ম সংস্করণ ১৯৯৭।
৫. হায়াত- মওতের ব্যাপারে পীরের নিয়ন্ত্রণ। (অর্থাৎ পীর সাহেব বেলায়তী ক্ষমতায় আজরাঈল হইতে রক্ষা ও মৃত্যু সময় পরিবর্তন করতে পারেন) তথ্যসূত্র ঃ গাউছুল আজম মাইজভা-ারী জীবনী ও কারামত সংকলক সংগ্রাহক মাওলানা শাহ ছুফী সৈয়দ দেলাওয়ার হুসাইন, পঞ্চদশ প্রকাশ, জুলাই- ২০০২। পৃষ্ঠা-১২৯।
৬. পীর কর্তৃক পরকালে মুক্তি পাওয়ার মতবাদ। (অর্থাৎ পীর মৃত্যুকালে কণ্ঠ থেকে মুক্তি দিবেন। কবরে আরামের ব্যবস্থা করবেন, হাশরে মুক্তির ব্যবস্থা করে দিবেন।) তথ্যসূত্র ঃ রতœ ভা-ার, পৃষ্ঠা-১৭, প্রকাশক-সৈয়দ মুনিরুল হক, ৮ম সংস্করণ ১৯৯৭।
৭. পীর কর্তৃক কামনা-বাসনা হওয়ার মতবাদ। (অর্থাৎ তাদের পীর তাদের কামনা বাসনা পূর্ণ করেন।) তথ্যসূত্র ঃ রতœ ভা-ার, প্রথম খ-, পৃষ্ঠা-১৭, প্রকাশক-সৈয়দ মুনিরুল হক, ৮ম সংস্করণ।
৮. গান-বাদ্য জায়েজ হওয়ার মতবাদ। (অর্থাৎ যাহারা গান বাদ্য জনিত জিকির বা জিকরী মাহফিল করিতে চাহেন তাহাদের জন্য বাদ্য-যন্ত্র সহকারে জিকির বা জিকরী মাহফিল করিবার অনুমতি আছে।) তথ্যসূত্র ঃ মিলাদে নববী ও তাওয়াল্লেদে গাউছিয়া, মাইজভা-ারীর দ্বিতীয় পীর শাহ্ সৈয়দ দেলোয়ার হুসাইন কর্তৃক সম্পাদিত, ১১ম সংস্করণ, জুন-২০০২, পৃষ্ঠা-৪।
কাদিয়ানীদের আকীদা বিশ্বাস
১. ইমাম মাহদী সম্পর্কিত মুসলমানদের ধারণা ভুল।
২. হযরত ঈসা মাসীহ সম্পর্কিত মুসলমানদের ধারণা ভুল।
৩. খতমে নবুওয়াত সম্পর্কিত মুসলমানদের ধারণা ভুল।
৪. গোলাম আহমাদ কাদিয়ানী নবী, তার নিকট ওহী আসত, তার উপর ২০ পারার মত কুরআন
নাযিল হয়েছিল।
৫. খোদার পুত্র হয়েছিল।
৬. গোলাম আহমাদ কাদিয়ানী মুহাম্মাদ সা. এর প্রকাশ ছিলেন।
৭. গোলাম আহমাদ কাদিয়ানী আল্লাহ এর প্রকাশ ছিলেন।
৮. গোলাম আহমাদ কাদিয়ানী ছিলেন মুহাম্মাদ এবং আহমাদ।
৯. গোলাম আহমাদ কাদিয়ানী অনেক নবী; বরং সমস্ত নবী রাসূল থেকে এমনকি হযরত মুহাম্মাদ সা. থেকেও শ্রেষ্ঠ।
১০.গোলাম আহমাদ কাদিয়ানী ছিলেন খোদার অবতার বা খোদা।
১১.গোলাম আহমাদ কাদিয়ানী ছিলেন কৃষ্ণের অবতার।
১২.মির্জা সাহেব ছিলেন ইবরাহীম।
১৩.পুনর্জন্মবাদে বিশ্বাস।
১৪.কাদিয়ানীগণ নি¤েœাক্ত ব্যক্তিবর্গকে নবী মনে করেন : রামচন্দ্র, কৃষ্ণ, বুদ্ধ, জরদশত,
কনফুসিয়াস, ও বাবা নানক।
১৫.মির্জা গোলাম আহমাদ কাদিয়ানী খাতামুন্নাবীয়্যিন অর্থাৎ শেষ নবী। তার পরে আর কোন নবী আসবেন না। এছাড়াও মির্জা গোলাম আহমদের আরও কিছু দাবি রয়েছে যা পরস্পর বিরোধী।
১৬.মির্জা গোলাম আহমাদ মুজাদ্দিদ।
১৭.তিনি ইমাম।
১৮.তিনি খলীফা।
১৯.তিনি ঈসা ইবনে মারইয়াম।
২০.তিনি ঈসা ইবনে মারইয়ামের অবতার।
২১.তিনি মাসীহে মাওউদ (প্রতিশ্রুত মাসীহ) তিনি বলেন- কিয়ামতের নিকটবর্তী সময়ে হযরত ঈসা মাসীহের আসমান হতে অবতরণ করার যে কথা হাদীসে উল্লেখ আছে তা আমি।
২২. তিনি যিল্লি নবী বা রুরীজী নবী অর্থাৎ ছায়া নবী।
২৩.তিনি উম্মতী নবী।
২৪.তিনি এলহামী নবী।
২৫.তিনি নবী।
২৬.তিনি রাসূল।
২৭.তার উপর ২০ পারার মত কুরআন নাযীল হয়েছে।
২৮.তিনি ঈসা আ. এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ।
২৯.তিনি সকল নবীর সমকক্ষ।
৩০.তিনি আদম, শীশ, নূহ, ইবরাহীম, ইসহাক, ইসমাঈল, ইয়াকুব, ইউসুফ, মূসা, দাউদ, ঈসা প্রমুখ।
৩১.তিনি কোন কোন নবী থেকে শ্রেষ্ঠ।
৩২.তিনি সমস্ত নবী রাসূল থেকে শ্রেষ্ঠ।
৩৩.তিনি জগতবাসীর জন্য আল্লাহর রহমত স্বরূপ।
৩৪.তাকে সৃষ্টি না করা হলে আসমান যমীন কিছুই সৃষ্টি করা হত না।
৩৫.তিনি আল্লাহর পুত্রবৎ।
৩৬.তিনি শ্রী কৃষ্ণের অবতার।
৩৭.তিনি শ্রীকৃষ্ণ।
৩৮.তিনি যুলকারনাইন।