জন্ম নিয়ন্ত্রণ প্রসঙ্গ

 

জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি প্রসঙ্গে

জিজ্ঞাসা : জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি বৈধ কি না? ইসলাম এ ব্যাপারে কি বলে, বিস্তারিত জানাবেন।

মুহাম্মদ সাদাত আল আবরার মুহাম্মদপুর, ঢাকা

জবাব : জড় ও জীবসহ সবকিছুই আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টি করেছেন এবং তিনিই পবিত্র কুরআনে ভূপৃষ্ঠে বিচরণকারী সকল প্রাণীর রিযিক তথা জীবিকার দায়িত্বভার নিজে গ্রহণ করার কথা ঘোষণা করেছেন। আর তার ভাণ্ডার অফুরন্ত। যা কখনো শেষ হবার নয়। একটি হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ তা’য়ালা বলেন যে, তোমাদের সর্বপ্রথম ও সর্বশেষ অর্থাৎ সমস্ত জিন-ইনসান কোনোস্থানে একত্রিত হয়ে আমার নিকট প্রার্থনা করে। আর আমি তাদের সকলের প্রার্থণা মাফিক তাদেরকে দান করি, তাহলে আমার ভাণ্ডার থেকে এতোটুকুও কমবে না যতোটুকু সুঁই সাগরে ডুবিয়ে উঠালে সাগরের পানি কমে। তাই পৃথিবীতে জনসংখ্যা যতোই হোক না কেন। প্রত্যেকের রিযিকের ব্যবস্থা অবশ্যই আল্লাহ তা’য়ালা করে থাকেন ও করবেন। প্রত্যেক মুসলমানের এই বিশ্বাস রাখা চাই। এর বিপরীত আকীদা পোষণ করা কুফরী। তাই জন্মনিয়ন্ত্রণ করা নিষেধ। সুতরাং ওলামায়ে কেরাম যে ব্যাখ্যা করেন তা যথার্থই করেন। তবে অবস্থা ও পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে কখনও এক্ষেত্রে হুকুমের মধ্যে কিছু শিথিলতা আসে। যা ব্যাখ্যা সাপেক্ষ। নিম্নে ব্যাখ্যাসহ এর হুকুম বর্ণনা করা হলো।  জন্মনিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনিয়তা ও পদ্ধতিতে ভিন্নতা রয়েছে। সকল ক্ষেত্র ও সকল পদ্ধতির হুকুম এক নয়।

মৌলিকভাবে এর তিনটি পদ্ধতি রয়েছে।

এক. জন্মনিয়ন্ত্রণের স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা যার দ্বারা নারী বা পুরুষ প্রজনন ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।

দুই. অস্থায়ীভাবে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা, যার ফলে স্বামী-স্ত্রীর কেউ প্রজনন ক্ষমতাহীন হয়ে যায় না যেমন : কনডম ব্যবহার করা, পিল সেবন করা ইত্যাদি।

তিন. গর্ভধারনের পর গর্ভপাত ঘটানো।

প্রথম পদ্ধতিটি গ্রহণ  করা সম্পূর্ণ অবৈধ। কেননা এতে আল্লাহর সৃষ্টির পরিবর্তন করা আবশ্যক হয়ে পড়ে। তবে এক্ষেত্রেও কখনও কোনো  কোন অভিজ্ঞ দীনদার ডাক্তারের বক্তব্যমতে গর্ভধারণের কারণে মায়ের প্রাণনাশের আশঙ্কা হলে স্থায়ী পদ্ধতি গ্রহণ করা বৈধ হবে।

আর দ্বিতীয় পদ্ধতি কেবল নিম্মোক্ত ক্ষেত্রে বৈধ হবে।

১। দুই বাচ্চার জন্মের মাঝে কিছু সময় বিরতি দেওয়া যাতে প্রথম সন্তানের লালন-পালন, পরিচর্যা ঠিকমত হয়।

২। কোন কারণে মহিলার বাচ্চা লালন-পালনের সামর্থ না থাকলে।

৩। মহিলা অসুস্থ ও দূর্বল হওয়ার কারণে গর্ভধারণ বিপদজনক হলে। তবে ভালোভাবে মনে রাখা দরকার যে, এ সকল ক্ষেত্রে বৈধতা শুধু ব্যক্তিগত প্রয়োজনে। রাষ্ট্রীয় ও সম্মিলিতভাবে মানুষের নিকট প্রচারণা করা ও এতে উদ্বুদ্ধ করা কোনোভাবেই বৈধ নয়।

আর তৃতীয় পদ্ধতিও নাজায়েয। তবে যদি মহিলা অত্যাধিক দূর্বল হয়, যার কারণে গর্ভধারণ তার জন্য আশঙ্কাজনক হয় আর গর্ভধারনের মেয়াদ চার মাসের কম হয়। তাহলে গর্ভপাত বৈধ হবে। আর মেয়াদ চার মাসের অধিক হলে বৈধ নয়।

[মুসলিম শরিফ ২/৩১৯, জাদীদ ফিকহী মাবাহেস ১/২৮২]

 

 

 

 

মসজিদের নিচে মার্কেট করার বিধান

 

জিজ্ঞাসা :  আমরা জানি মসজিদের জায়গা তার মাটিসহ ওয়াকফ। এখন অনেক স্থানে দেখা যাচ্ছে মসজিদের নিচ তলায় মার্কেট তৈরি করে ২য় তলায় মসজিদ করা হচ্ছে। আর মার্কেটের দোকান বিভিন্ন বৈধ অবৈধ কাজের জন্য ভাড়ায় দেওয়া হচ্ছে এবং মার্কেটের ভেতর থুতু ফেলাসহ হিন্দু, মুসলমান, মহিলা, পুরুষ, পবিত্র, অপবিত্র ব্যক্তিরা গমনাগমন করছে। এতে মসজিদের পবিত্রতা নষ্ট হচ্ছে। তা ছাড়া মসজিদের মার্কেটে গানবাদ্যসহ টিভি, ভিসিডিও চালানো হয়। এখন প্রশ্ন হলো এমনভাবে মসজিদের নিচে মার্কেট করা বৈধ আছে কি না? এবং সেই মার্কেটে অপবিত্র মহিলাগণ আসতে পারবে কি না? গান বাদ্য ও টিভি ভিসিডির দোকান মসজিদের মার্কেটের ভাড়া দেয়া যাবে কি না?

মামুনুর রশীদ ,সাভার, ঢাকা

জবাব : মসজিদ নির্মাণের সময় নিচ তলায় মার্কেট ও উপরে মসজিদ নির্মাণ করলে তা বৈধ হবে এবং সেই মার্কেটের দোকান সকল বৈধ কার্যক্রম ও ব্যবসার জন্য ভাড়ায় দেয়া এবং তাতে পবিত্র অপবিত্র, কাফের মুসলমান, সব ধরনের লোকের জন্য প্রবেশ বৈধ হবে। তবে টিভি, ভিসিডি বা অন্যকোনো হারাম পণ্যের ব্যবসা কিংবা অবৈধ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য দোকান ভাড়া দেয়া বৈধ নয়।

বলাবাহুল্য যে, নাজায়েয কাজ করা যে কোনো স্থানেই বৈধ হবে না। আর মসজিদ মার্কেটে তা আরো কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।

পক্ষান্তরে নিচ তলায় শুরু থেকেই মসজিদ নির্মিত হলে পুন:নির্মাণের সময় নিচে মার্কেট করা কিছুতেই বৈধ হবে না এবং কোনো কাজে তা ভাড়ায় দেয়া, অপবিত্র কোনো ব্যক্তির প্রবেশও জায়েজ হবে না।

[তাবয়ীনুল হাকায়েক ৫/১২৫, ফাতাওয়া আলমগিরী ২/৪৫৫]

জালালী খতম প্রসঙ্গে

জিজ্ঞাসা : কয়েকদিন আগে আমরা জুমার নামাজ পড়ার জন্য মসজিদে যাই। উক্ত মসজিদের খতীব সাহেব তার বয়ানে খতমে ইউনুস, জালালী, দুরূদে নারীয়া ইত্যাদি খতমগুলোকে বেদআত বলে উল্লেখ করেন। দলীল হিসেবে কুরআন হাদিসের কোথাও নেই একথা পেশ করেন। পরে জানতে পারি অনেক উলামায়ে কেরামই এগুলোকে বেদআত হিসেবে ফতোয়া দিয়ে থাকেন।

এখন আমার জানার বিষয় হলো

১। কুরআন হাদিসের কোথাও কি এ সমস্ত খতমের কথা উল্লেখ আছে?

২। কুরআন হাদিসে না থাকলে আমল করা যাবে কি?

৩। যদি কুরআন হাদিসে থেকে থাকে তাহলে শরীয়তের কোন মূলনীতির আলোকে আমল করা হচ্ছে?

মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম, মোহাম্মদপুর ঢাকা

জবাব : প্রশ্নোক্ত খতম সমূহের কথা কুরআন হাদিসে উল্লেখ নেই। তবে যেহেতু এসব খতম কুরআন শরীফের আয়াত কিংবা হাদিসের বর্ণিত দোয়া বা অর্থবোধক এমন শব্দ দ্বারা করা হয় যা বুযুর্গ ও আওলিয়াগণ থেকে বর্ণিত। সেহেতু চিকিৎসা হিসেবে এসব খতম করা বৈধ। এটা দোষের কিছু নয়। তবে এগুলোকে শুধুমাত্র উপার্জনের মাধ্যম না বানিয়ে মুসলমানদের উপকারের উদ্দেশ্যে করা উচিত।

চিকিৎসা হিসেবে যে কোনো বৈধ আমল করার অবকাশ হাদিসও ফিকাহের দ্বারা প্রমাণিত। আর এর জন্য যে কোনে বৈধ পদ্ধতি নির্ধারণ করতেও কোনো বাধা নেই। সেমতে খতমে ইউনুস, খতমে জালালী, দুরূদে নারিয়া এ জাতীয় খতম পড়া যেতে পারে। তবে এ বিশ্বাস রাখতে হবে যে আল্লাহ তা’য়ালাই একমাত্র আরোগ্যদানকারী।

উল্লেখ্য, কুরআন হাদিসে নেই, এমন বিষয়কে ইবাদত হিসেবে গ্রহণ করাকে বিদআত বলে। বলাবাহুল্য যে উক্ত বিষয়গুলোকে তদবীর ও চিকিৎসা স্বরূপই গ্রহণ করা হয় ইবাদত হিসেবে নয়। তাই এগুলোকে বিদআত বলা অবান্তর।

[বুখারি শরিফ ২/৮৫১, আহকামূল কুরআন]

 

পিতা মাতার  সঙ্গে ভালো ব্যবহার করা প্রসঙ্গে

জিজ্ঞাসা : আমি একজন ব্যবসায়ী। সংসারের মধ্যে আমি সবার ছোট। আমার অন্য ভাইয়েরা ভিন্ন। আমি আমার মা-বাবা এবং স্ত্রী এক সংসারে থাকি। কিন্তু আমার মায়ের সঙ্গে আমার স্ত্রীর সব সময় মনোমালিন্য লেগে থাকে। আমি যখনই বাড়িতে যাই তখন আমার মা আমার স্ত্রীর বিরুদ্ধে এমন সব অভিযোগ করে যে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত যে আমার স্ত্রী কখনো এই রকম করতে পারে না।

আমি জানি যে মায়ের মনে কষ্ট দিলে জান্নাতে যাওয়া যাবে না। আমি সকলকে নিয়ে এক সাথে থাকতে চাই।  আমার প্রশ্ন এই যে এখন আমি কী করতে পারি? তা আমাকে জানাবেন।

আসলাম হুসাইন, নড়াইল।

জবাব : প্রশ্নোক্ত অবস্থায় সম্ভব হলে স্ত্রীকে আপনার পিতা-মাতা থেকে পৃথক করে রাখা উচিত। তবে আপনার কর্তব্য হচ্ছে, পিতা-মাতার যথাযথ সেবা শুশ্রƒষা করা এবং তাদের প্রয়োজনাদি পূরণ করা এবং কখনোই তাদের সাথে দুর্ব্যবহার না করা। এরপরও যদি তারা শুধুমাত্র আপনার স্ত্রীকে দূরে রাখার কারণে মন খারাপ করে থাকে, তাহলে তা আপনার জন্য ক্ষতিকর নয়।

[মুসলিম শরীফ ১/৩৯৭]

 

আপন ভাইকে যাকাত দেয়ার হুকুম

জিজ্ঞাসা : আমি প্রতি বৎসর যাকাত আদায় করি। তবে আমার ভাই কিছু আর্থিক সঙ্কটে রয়েছে। তাই এবারের যাকাত আমার ভাইকে দিতে চাচ্ছি। যাতে তার উপকার হয়। জানার বিষয় হলো যাকাতের মাল আপন ভাইকে দেয়া জায়েয হবে কি না?

আছমা আক্তার, মোমেনশাহী

জবাব:  আপনার ভাই যাকাত গ্রহণের উপযুক্ত হলে তাকে যাকাতের টাকা দেয়া যাবে। বরং উত্তম। কেননা, তাকে দিলে দুটি সওয়াবের অধিকারী হবেন। সদাকার সাওয়াব ও আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার সওয়াব।

[বুখারি শরিফ ১/১৯৮]

Share

Comments are closed.