মাদরাসা শিক্ষা : একটি পর্যালোচনা ও দারুল উলূম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠার পটভূমি

জাবালে নূর তথা ফারা পর্বত গুহায় রাসূলে আরাবি নির্দেশপ্রাপ্ত হলেন পাঠের। ‘পড়, হে মুহাম্মাদ’। চমকিত-চকিত নবী দ্বিতীয়বার শুনতে পেলেন একই নির্দেশ- ‘পড়’। অভিভূত নবী উত্তর দিলেনÑ ‘আমি উম্মি-পড়া জানি না।’ উত্তর হল- ‘পড় তোমার প্রভুর নামে যিনি তোমায় সৃজিলেন। যিনি সৃজিলেন মানুষকে জমাট রক্ত হতে।’ সুরা আলাক ঃ ১-২
পড়ার নির্দেশ পেয়ে উম্মি নবী স্বয়ং রবের ছাত্রত্বগ্রহণ করলেন। ইলমে ওহী তাবলিগের নির্দেশ পেয়ে দায়িত্ব পেলেন শিক্ষকের।
ছাত্র হিসেবে পেলেন- হযরত আবু বকর রা., হযরত উমর রা. উসমান রা., হযরত আলী রা., হযরত যায়েদ বিন হারেস রা.-এর মতো পূণ্যবান ব্যক্তিদের। ধীরে ধীরে ছাত্র সংখ্যা বাড়তে লাগল। এমতাবস্থায় তাদের দ্বীনি তালিম ও তারবিয়াতের উদ্দেশ্যে সর্বপ্রথম উপ-আনুষ্ঠানিক মাদ্রাসা স্থাপিত হয়, হযরত আবু বকর সিদ্দিক রা.-এর বাড়ির আঙ্গিনায়।

মাদ্রাসা শিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ
এরপর সর্বপ্রথম মাদ্রাসা শিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ মাদ্রাসায়ে ‘দারুল আরকাম’-এর ভিত্তি স্থাপিত হয় হযরত আরকাম বিন আবুল আরকাম রা.-এর বাড়িতে সাফা পাহাড়ের পাদদেশে। যারা প্রথম থেকে দারুল আরকাম মাদ্রাসায় তালিম নিয়েছিলেন- পরবর্তীতে তারাই এখানে শিক্ষকতা করেন।
মদিনায় প্রথম প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসা ও মসজিদ হল মসজিদে বনু যুরাইক মাদ্রাসা। এর উস্তাদ ও ইমাম ছিলেন হযরত রাফে বিন মালেক যরকি আনসারি। এই মসজিদেই প্রথম নামাজ আদায় ও কুরআন তেলাওয়াত শুরু হয়। এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশ ছাত্র খাযরায গোত্রের শাখা বনি যুরাইক গোত্রের মুসলমান ছিলেন।
রাসূল সা.- এর হিজরতের পর মদিনার মসজিদে নববী মাদ্রাসা হয়ে যায় কেন্দ্রিয় প্রতিষ্ঠান। রাসূলুল্লাহ সা. আসহাবে সুফফার দরিদ্র ও দূর্বল নও মুসলিম এবং বর্হিরাগত ব্যক্তিদের নিয়ে সেখানে বৈঠক করতেন, কুরআন-শরিয়তের দরস দিতেন। আর এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই মূলত ইসলামি সাম্রাজ্যের শিক্ষা-দীক্ষার নবদিগন্ত উন্মোচন করে।
মূলত রাসূল সা. এর ইন্তেকালের পর সাহাবায়ে কেরাম দাওয়াত ও তাবলিগের কাজে পুরো পৃথিবী ছড়িয়ে পড়েন। খোলাফায়ে রাশেদার যুগে বিভিন্ন স্থানে মসজিদ-মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা হয়। আর তারা যেখানেই বসতেন সেখানেই মাহফিলের চেরাগ হয়ে সকলের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হতেন।
প্রকৃতপক্ষে খোলাফায়ে রাশেদিনের যুগে সাধারণ থেকে শুরু করে সরকারি কর্মচারি এমনকি ইসলামি সাম্রাজ্যের খলিফা পর্যন্ত যখন যেখানে গিয়ে ছিলেন সেখানেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করে ছিলেন। শিক্ষার জন্য তারা রাজকোষ থেকে প্রচুর অর্থও ব্যয় করেছেন। খোলাফায়ে রাশেদিনের প্রথম যুগেই কুরআন শরিফকে একত্রিত করা হয় এবং এর বহু কপি বিভিন্ন দেশে বিলি করা হয়। শিক্ষার প্রতি খোলাফায়ে রাশেদিনের গুরুত্বারোপ উক্ত ঘটনা হতে আরো স্পষ্ট হয়।
সাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈন, তাবে-তাবেঈনের যুগে মসজিদ কিংবা নিজবাড়ি অথবা খানকা ভিত্তিক ধর্মীয় শিক্ষা ব্যবস্থার প্রচলন সুস্পষ্ট ইতিহাসে বিদ্যমান। পরবর্তীতে উমাইয়া শাসনামলে কিঞ্চিত পরিবর্তন এনে আরো সুন্দরভাবে আনুষ্ঠানিকতার রূপ দেয়া হয়।
খোলাফায়ে রাশেদার যুগে ধর্মীয় শিক্ষার যে ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল তাকে প্রথম যুগ হিসেবে গণ্য করা হয়। উমাইয়া শাসনামলে ধর্মীয় শিক্ষা ব্যবস্থাকে দ্বিতীয় যুগ এবং আব্বাসিয়দের যুগের শিক্ষা ব্যবস্থাকে তৃতীয় যুগ বলা হয়।
এ যাবত বিদ্যা শিক্ষা করা ও বিদ্যা শিক্ষা দেয়া ছিল লিল্লাহিয়্যাতের কাজ। শিক্ষকতাকে কেউ জীবন-জীবিকার উপায় হিসাবে গ্রহণ করেনি। উমাইয়া খলিফা হযরত উমর বিন আব্দুল আজিজ রহ. এর শাসনামলে বিদ্যা শিক্ষার প্রচার-প্রসারের উদ্দেশ্যে প্রচলিত রীতি-নীতি পরিবর্তন করা হয়।

মাদরাসা প্রতিষ্ঠায় উমর বিন আব্দুল আজিজ রহ. এর অবদান
উমাইয়া খলিফা উমর বিন আব্দুল আজিজের ইলমে দ্বীন শিক্ষার নির্দেশে নতুন যুগের সূচনা হয়। পবিত্র মক্কায় হযরত আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস রা. কুরআন মাজীদ, হাদিসে রাসূল, ফিক্বাহ, ফারায়েয ও আরবি ভাষা শিক্ষা দিতেন। মদিনায় রবীয়াতুর রায়-এর মাদ্রাসায় উচ্চ মানের শিক্ষা ও তালিমের কাজ চলত। হিজাজের পর ইরাকই ছিল ইসলামি শিক্ষার দ্বিতীয় প্রধান কেন্দ্র। কুফা নগরিতে আব্দুর রাহমান বিন আবি লাইলা এবং ইমাম শাফি রহ. স্ব-স্ব মাদ্রাসায় কুরআন-সুন্নাহ শিক্ষা দিতেন। বসরা নগরিতে অবস্থিত ইমাম হাসান বসরি রহ. তার পরিচালিত মাদ্রাসা বিশেষ মর্যাদা ও গুরুত্বের অধিকারী ছিল। সে সময় মাদ্রাসাসমূহ মসজিদ কিংবা মসজিদের বারান্দায় অথবা মসজিদ সংলগ্ন চত্বরে বসত।
আব্বাসিয় যুগে শিক্ষার যে বিকাশ রচিত হয়, তা আধুনিক পৃথিবি গড়ায় এক বিপ্লবি অবদান রাখে। সেই যুগে মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার তত্ত্বাবধানে রাষ্ট্র পরিচালিত হত। ওই যুগে পৃথক কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল না। যে কারণে মাদ্রাসা শিক্ষায় শিক্ষিত ব্যক্তিবর্গই বড় বড় চিকিৎসক, বড় বড় ইঞ্জিনিয়ার, দার্শনিকসহ বিভিন্ন বিষয়ে পাণ্ডিত্ব অর্জন করতে পারতেন।
আব্বাসিয় খিলাফতের শাসনামলেই প্রসিদ্ধ ইসলামি চিন্তাবিদ ও মাজহাবি ইমামদের আবির্ভাব ঘটে। হযরত ইমাম আবু হানিফা রহ., হযরত ইমাম মালেক রহ., হযরত ইমাম শাফেয়ি রহ., হযরত ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. প্রমূখ ইমামদের বৈচিত্রময় কর্মের পরিস্ফুটন ঘটে। হযরত ইমাম বুখারি রহ. হযরত ইমাম মুসলিম রহ. হযরত ইমাম আবু দাউদ রহ. হযরত ইমাম তিরমিজি রহ. হযরত ইমাম নাসাঈ রহ. হযরত ইমাম ইবনে মাজা রহ. প্রমূখের হাদিস সংগ্রহ মুসলমানদের জ্ঞান-বিজ্ঞানের অনুশীলনকে শাণিত করে।
আব্বাসিয় যুগেই শিক্ষার মান অনুসারে প্রথম শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচি প্রণীত হয়। এতে সাধারণ জ্ঞান স্থান পায়। শিক্ষাধারাকে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা- এই তিন স্তরে বিন্যস্ত করা হয়।

সর্বপ্রথম মাদ্রাসা শিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি স্থাপন
আল্লামা সুবকি রহ. বলেন- নিজামুল মুলক তুসি সর্বপ্রথম মাদ্রাসা শিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি স্থাপন করেন। মূলত তা ঠিক নয়, বরং নিজামুল মুলকেরও জন্মের পূর্বে নিশাপুরে (ইরানের একটি প্রসিদ্ধ শহর) প্রথম মাদ্রাসাই-বায়হাকিয়া প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এরপর নিশাপুরেই সুলতান মাহমুদের ভাই আমির নাছের ইবনে সবুক্তগীনের পৃষ্ঠপোষকাতায় মাদ্রাসাই সাইয়্যেদিয়া নামে দ্বিতীয় মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। তৃতীয় বৃহত্তর মাদ্রাসাটিও নিশাপুরেই ছিল। উস্তাদ আবু বকর ফাওয়ারেককে জনসাধারণ সমারোহের সাথে আমন্ত্রণ করে আনেন। তার দরস শোনার জন্যই এই মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করা হয়।

দরসে নিজামি ও নিজামিয়া মাদ্রাসার
৪৫৯ হিজরি মুতাবিক ১০৬৭ সালের ১৩ যিলকদ শনিবার সেলজুক সুলতান তুঘরিলের ভ্রাতুষ্পুত্র আলফে আরসালানের প্রধানমন্ত্রী নিজামুল মুলক তুিস কর্তৃক বাগদাদে মাদ্রাসায়ে নিজামিয়া দারুল উলূম প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি সর্বপ্রথম ছাত্রদের জন্য বৃত্তি প্রদানের ব্যবস্থা করেন। ঐ মাদ্রাসায় বিভিন্ন বিভাগ ছিল এবং শ্রেণী অনুসারে প্রতি বিভাগে ছয় হাজার ছাত্র ছিল।
ইমাম গাজালি রহ., ইমাম তাবারি রহ., ইবনুল খতিব রহ., তাবরিযি রহ, আবুল হাসান ফকিহ রহ., আব্দুল কাদের জিলানি রহ. এই মাদ্রাসারই ছাত্র ছিলেন।
নিজামুল মুলূকের হাতে ৫ম শতাব্দিতে আধুনিক মাদ্রাসা শিক্ষার শুভ সূচনা হয় এবং ৬ষ্ঠ শতাব্দির শেষ পর্যন্ত তা বাকি থাকে। ইসলামি সাম্রাজ্যের আনাচে-কানাচে কোথাও মাদ্রাসা গড়ে উঠতে বাকি ছিল না। মুসলিম সাম্রাজ্যে গড়ে উঠা মাদ্রাসাসমূহ নিজামুলমুলক কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসার সিলেবাস গ্রহণ করা এবং মাদ্রাসায়ে নিজামিয়া দারুল উলূম এর সাথে সম্পৃক্ত হওয়ার কারণে অন্যান্য মাদ্রাসাগুলোকেও নিজামিয়া মাদ্রাসা বলা হতে থাকে।

উপমহাদেশে মাদ্রাসা শিক্ষা ঃ
একাদশ শতাব্দিতে বাগদাদে মাদ্রাসা শিক্ষার যে আলো জ্বলে উঠেছিল সে আলো ক্রমান্বয়ে পূর্ব দিকে ইসলাম প্রচার ও সাম্রাজ্য বিস্তারের সাথে সাথে আরও অগ্রসর হয়ে পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও ভারত হয়ে বাংলাদেশে চলে আসে।
মুসলিম শাসকদের রাজ্যাভিযান ৭১২ সালে ভারতবর্ষের সিন্ধু, মুলতান জয় করে কাশ্মীর পর্যন্ত অগ্রসর হয়। উমাইয়া সেনাপাতি মুহাম্মদ বিন কাসিম রাজ্য জয় করে সাথে সাথেই বেসামরিক প্রশাসন চালু করেন। একই সঙ্গে তিনি শিক্ষার প্রতিও মনোযোগী হন। তার পরবর্তী শাসকগণ একই নীতি গ্রহণ করেন। উমাইয়া যুগের পর আব্বাসিয় যুগেও পূর্বাঞ্চলে মাদ্রাসা শিক্ষা সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে। বিশেষত দশ শতকের শেষের দিকে সবুক্তগীন এবং একাদশ শতাব্দির প্রারম্ভে তার পুত্র সুলতান মাহমুদ গজনিসহ সমগ্র উত্তর ভারতে মুসলিম শাসন কায়েম করেন। তিনি গজনিতে মাদ্রাসা মসজিদ নির্মাণ করে জ্ঞান-বিজ্ঞান, তাহজিব-তমদ্দুন প্রভৃতি ক্ষেত্রে গজনিকে বাগদাদের সমকক্ষতায় নিয়ে যেতে সক্ষম হয়ে ছিলেন।
অবশেষে সুলতান মুহাম্মদ ঘোরি ও সুলতান কুতুব উদ্দীন আইবেক (১২০৬-১২১০) ভারতের অনেকাংশ জয় করেন। মুসলিম শাসকগণ রাজ্য জয়ের সাথে সাথে মসজিদ, মাদ্রাসা, সরাইখানা প্রভৃতি নির্মাণ কাজে পৃষ্ঠপোষকতা করেন।
বেসরকারি পর্যায়ে সূফি ও আউলিয়া দরবেশগণ ইতিপূর্বে সমগ্র উপমহাদেশ জুড়ে তাদের মিশনে সাফল্য লাভ করেন।
মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা জহিরুদ্দীন মুহাম্মদ বাবর (১৫২৬-১৮৫৭ খৃ.) থেকে শুরু করে প্রায় ৩০০ বছরের সকল শাসককেই বিদ্যা শিক্ষা ও বিদ্যালয় বা মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা ও পৃষ্ঠপোষক হিসেবে পাওয়া যায়।
মুঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা হয় ১৫২৬ সালে। সম্রাট বাবর আরবি, ফার্সী ও তুর্কি ভাষায় পাণ্ডিত্য অর্জন করেছিলেন। বাবর পুত্র হুমায়ূন ও তার পুত্র আকবর বিদ্যোৎসাহী ছিলেন। সম্রাট হুমায়ূন সাম্রাজ্যের চেয়েও কুতুবখানাকে বেশি ভালবাসতেন।

সম্রাট আলমগির রহ. এর পৃষ্ঠপোষকতায় মাদ্রাসা শিক্ষা
মুঘলদের পরবর্তী সম্রাট শাহজাহান (১৬২৭-১৬৬৬ খৃ.), আওরঙ্গজেব তথা সম্রাট আলমগির (১৬৬৬-১৭০৭ খৃ.) তার পূর্বসূরিদের মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতা করেন। শাহজাহান দিল্লির জামে মসজিদ এবং তৎসংলগ্ন একটি বড় মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। যেখান থেকে সাম্রাজ্যের বড় বড় স্থানে কাজি নিয়োগ করা হতো। এ ছাড়া সাম্রাজ্যের বহু মাদ্রাসার সংস্কার ও নতুনভাবে বহু মাদ্রাসা স্থাপন করেন।
আওরঙ্গজেব তথা সম্রাট আলমগির প্রত্যেক মসজিদে সরকারিভাবে ইমাম নিয়োগ করেন। অধিকাংশ মসজিদ সংলগ্ন মক্তব-মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। এ সব মসজিদ মাদ্রাসা পরিচালনার লক্ষ্যে লা-খেরাজ সম্পত্তি দান করে যান। মুঘল সাম্রাজ্য পরবর্তী ইংরেজদের আমলে ১৭৯৩ সালে এক আইন জারির মাধ্যমে তা রহিত করা হয়। মসজিদ এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নামে বরাদ্দকৃত লা-খেরাজ সম্পত্তি না থাকায় ধীরে ধীরে তা বন্ধ হয়ে যায়।

বাংলা অঞ্চলে শিক্ষা ব্যবস্থা ঃ
অষ্টাদশ শতাব্দির শেষের দিকে বঙ্গ দেশের শিলাপুর নামক স্থানে কিছু ছোট ছোট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল। যেখানে হিন্দু ও মুসলমানরা আরবি ও ফার্সি শিক্ষা করতেন। মুসলিম আমলে বাংলাদেশে প্রতি ৪ হাজার লোকের জন্য একটি করে প্রাথমিক মাদ্রাসা ছিল। বাংলাদেশে এরূপ প্রায় ৮০ হাজার প্রাথমিক মাদ্রাসা ছিল। এ জাতীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মসজিদের সঙ্গে যুক্ত ছিল। এগুলোতে আরবি-ফার্সি ইত্যাদি পড়ানো হতো।

দারুল উলূম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠার পটভূমি :
ভারত বর্ষে মুঘল শাসনামলের শেষ দিকে যখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারত বর্ষের ক্ষমতা নিজ হাতে নিয়ে, এ ফরমান জারি করে যে, ‘এখন থেকে বাদশাহ সালামতের রাজ্যে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিরই হুকুমত চলবে।’ সেই দিন মুসনাদুল হিন্দ শাহ ওয়ালীউল্লাহ রহ. এর সুযোগ্য সন্তান হযরত শাহ আবদুল আযীয রহ. দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে এই ফতওয়া ঘোষণা করলেন- ‘ভারতবর্ষ এখন দারুল হরব। (শত্র“ কবলিত দেশ) তাই প্রত্যেক ভারতবাসির ফরজ হল একে স্বাধীন করা।” তার এই ঘোষণা ছড়িয়ে পড়ল দাবানলের ন্যায়। দিশেহারা মুসলিম জাতি উলামাদের নেতৃত্বে ১৮৫৭ সালে সিপাহি বিপ্লব করলেন।
বিদ্রোহের কারণ ও করা নেতৃত্ব দিচ্ছেন মর্মে ইংরেজ সরকার, কোম্পানির কাছে রিপোর্ট চাইলে- ড. উইলিয়াম লিওর এ রিপোর্ট দিয়ে ছিল যে, ‘এটি ছিল মূলত: মুসলমানদের আন্দোলন, আর এর নেতৃত্ব দিয়েছে আলেম সমাজ। সুতরাং এ বিদ্রোহকে চিরতরে নির্মূল করতে হলে মুসলমানদের জিহাদি চেতনাকে অবদমিত করতে হবে। আর এ চেতনার মূল সঞ্জিবনি শক্তি আল-কুরআন ও এর ধারক-বাহক আলেম-ওলামাদেরকে নির্মূল করে ফেলতে হবে।’
এরপর শুরু হলো আলেম-উলামার উপর দমন-নিপীড়ন। হাজার হাজার আলেম-উলামাকে ফাঁসি দেওয়া হলো। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছিল যে, ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য ইসলামের নামটুকু আর বাকি থাকবে না। তবে তো বর্তমানের চেয়ে ভবিষ্যত আরো সঙ্গিন হবে। এমতাবস্থায় দীর্ঘ চিন্তা-ভাবনা, শলা-পরামর্শের পর সাময়িকভাবে সশস্ত্র সংগ্রাম বন্ধ রেখে সাম্রাজ্যবাদ ইংরেজ বেনিয়া বিরোধী, স্বাধীনতা সংগ্রামের চেতনায় উজ্জীবিত, দ্বীনি চেতনায় উৎসর্গ একদল জানবায মুজাহিদ তৈরির লক্ষ্যে এবং ইলমে নববীর সংরক্ষণ, ও ইসলামি শিক্ষা-সংস্কৃতির প্রচার-প্রসারের মহান উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী রহ.-এর ইঙ্গিতে হযরত মাওলানা কাসেম নানুতুবি রহ.-এর নেতৃত্বে এবং যুগশ্রেষ্ঠ বুযুর্গানে দ্বীনের হাতে ১৮৬৬ ঈসায়ী ৩০ মে, মুতাবিক ১৫ মুহররম ১২৮৩ হিজরি সনে ভারতের উত্তর প্রদেশস্থ সাহারানপুর জেলায় দেওবন্দ নামক গ্রামে ঐতিহাসিক সাত্তা মসজিদ প্রাঙ্গনে একটি ডালিম গাছের ছায়ায় ইলহামিভাবে বর্তমান পৃথিবির দ্বীনি শিক্ষার প্রাণকেন্দ্র বলে পরিচিত ‘দারুল উলূম দেওবন্দ’ মাদ্রাসার গোড়াপত্তন হয়।
এ তারা বুঝতে পেরেছিলেন যে, জাতীর এ ক্রান্তিলগ্নে একদল দীক্ষাপ্রাপ্ত সচেতন মুজাহিদ তৈরি করে তাদের মাধ্যমে আযাদি আন্দোলনের স্রোতধারাকে ভারতবর্ষের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে দেয়া সহজতর। তাই চরম অর্থনৈতিক দুর্দশার মাঝে কোনো প্রকার সরকারি সাহায্য ছাড়াই একমাত্র আল্লাহর ওপর ভরসা করে গড়ে তুললেন এ প্রতিষ্ঠানটিকে। সেদিন থেকে শুরু হল স্বাধীনতা সংগ্রামের এক নতুন অধ্যায়। আল্লাহ এবং তাঁর রসূলের বাণী শিক্ষা দেয়ার পাশাপাশি চলতে লাগল আজাদির দীক্ষা। ফলে অল্পদিনেই তৈরি হয়ে গেল এক নতুন জিহাদি কাফেলা। দীর্ঘ সংগ্রাম, ত্যাগ ও কুরবানির বিনিময়ে এদেশের মজলুম জনতা ফিরে পেল কাঙ্খিত স্বাধীনতা।
আজ গড়ে উঠেছে উপমহাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে এর আদলে হাজার হাজার ইসলামি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে যা কওমি মাদরাসা নামে খ্যাত। এখান থেকে ইলমে দ্বীনের অমৃত সুধা পানে পরিতৃপ্ত হচ্ছে কোটি কোটি মুসলমান। ফারা পর্বতের আলোসিক্ত এ কওমি মাদরসাগুলোই হচ্ছে মুসলমানদের দ্বীন-ঈমান সংরক্ষণের সর্বশেষ দুর্গ।

 

Share

Comments are closed.