রাহমানিয়ার আরো একটি ফুল ঝড়ে গেলো

ইসলামি অঙ্গনে মুফতি রুহুল আমিন যশোরী বহুল পরিচিত মুখ। মূলত; লেখালেখির কারণেই তার এতো পরিচিতি। গত ২৭ নভেম্বর চরমোনাই মাহফিলে গিয়েছিলেন তিনি। প্রভুর জিকিরে নিজেকে দগদ্ধ করতে ছুটে ছিলেন ফুলবাগানে। রব্বে ইলাহির আশেকিনদের পুষ্পকাননে। সেখানেই চিরতরে বিদায় নেন এই প্রথিতযশা লেখক। ২৮ নভেম্বর শুক্রবার দিবাগত রাত ১২ টায় স্টোক করেন তিনি। সঙ্গে সঙ্গে মাঠে অবস্থিত অস্থায়ী হাসপাতেলে নেয়া হয়। রাত দু’টায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার বয়স হয়েছিল ৫২ বছর।
মুফতি যশোরী ছিলেন একজন প্রতিভাবান বিজ্ঞ আলেম। ৩৫ টির মতো ধর্মীয় বই লিখেছেন। নারীদের নিয়ে তার লেখা বইগুলো বেশ সাড়া জাগিয়েছে। নববধূর উপহার, আহকামে মুমিনা, মুমিন নারীর সফল জীবনের মতো বিখ্যাত গ্রন্থগুলো জায়গা করে নিয়েছে বাংলা মায়ের ঘরে ঘরে। সমকালীন বিষয়ে নিয়মিত কলামও লিখেছেন তিনি। দেশের জাতীয় দৈনিক থেকে শুরু করে সাপ্তাহিক, মাসিক প্রায় সব পত্রিকায় লেখা ছাপা হতো। তার লেখায় নারীদের অধিকার ফুটে উঠে। কথিত নারীবাদীদের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন সোচ্চার। ইসলাম ও শান্তি প্রতিষ্ঠার আন্দোলেন রাজনীতিও করেছেন সময়ে অসময়ে।

মুফতি যশোরী স্বনামধন্য একজন শিক্ষকও ছিলেন। কর্মজীবনের শুরু থেকেই শাইখুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক রহ. প্রতিষ্ঠিত জামিয়া রাহমানিয়ায় শিক্ষকতা করে আসছেন। দেশে হাজার হাজার বিজ্ঞ ছাত্র রয়েছে তার। জামিয়া রাহমানিয়ার পাশাপাশি দারুল উলুম ইন্টারন্যাশনাল ও মাদরাসায়ে আব্দুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুমেও শিক্ষকতা করেছেন। এহসান হজ্ব কাফেলার পরিচালক এবং দারুল এহসান হাউজিং সোসাইটির চেয়ারম্যান হিসেবেও কর্মরত ছিলেন।

মুফতি রুহুল আমীন যশোরীর গ্রামের বাড়ি যশোরের বারান্দিপাড়ায়। ১৯৬৩ সনের ১ জুলাই হাজী নুর মুহাম্মাদের ঔরসে জন্মগ্রহণ করেন। তার মায়ের নামÑ মালেকা বেগম। প্রাথমিক পড়ালেখা গ্রামেই করেন। ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েন প্রাইমারী স্কুলে। তারপর ভর্তি হন যশোর নন অপিস পাড়া আলীয়া মাদরাসায়। কিছুদিন পর মুরব্বীদের পরামর্শে চলে আসেন যশোর রেল গেইট কওমি মাদরাসায়। সেখান থেকে ভর্তি হন উপমহাদেশের ঐতিহ্যবাহী ইসলামি বিদ্যাপীট মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারী মাদরাসায়। সেখানেও বেশিদিন থাকা হয়নি। ১৯৭৮ সনে চলে আসেন ঢাকার লালবাগ জামিয়া কোরআনিয়ায়। তখনকার সময়ে লালবাগ মাদরাসা ছিল ঢাকার শ্রেষ্ঠ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। মুহাম্মাদুল্লাহ হাফেজ্জি রহ. যফর আহমাদ উসমানী, শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক রহ., মাওলানা আব্দুল মজিদ ঢাকুবী রহ. ও মাওলানা মুজিবুর রহমান রহ. -এর মতো বিদগ্ধ আলেমগণ সেখানে শিক্ষকতা করতেন। তাদের সুহবতে নাহবেমীর থেকে জালালাইন পর্যন্ত পড়ালেখা করেন। মেশকাত পড়েন শায়খুল হাদিস রহ. প্রতিষ্ঠিত জামিয়া মুহাম্মাদিয়ায়। পরে মুরব্বিদের পরামর্শে উচ্চ শিক্ষার জন্য পাড়ি জমান করাচির জামিয়াতুল উলুমিল ইসলামিয়া মাদরাসায়। অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে দাওরায়ে হাদিস এবং উচ্চতর ইসলামি আইন গবেষণা (ইফতা) শেষ করে ফিরে আসেন স্বদেশে।

তার লেখা আরও কিছু বই হলো- নারী জন্মের আনন্দ, আদর্শ স্ত্রী, আদর্শ মা, আদর্শ পিতা, জান্নাতী হুর, গুনাহে জারিয়াহ, সকাল-সন্ধ্যার আমল, মহিলাদের পবিত্র জীবন, মুমিন নারীর সুন্দর জীবন, আদর্শ স্ত্রীর পথ ও পাথেয়, শিশুদের মাসয়ালা-মাসায়িল, হযরত আবু বকর রা. এর ১০০ ঘটনা, হযরত উমর ফারুক রা. এর ১০০ ঘটনা, হযরত উসমান গণী রা. এর ১০০ ঘটনা, হযরত আলী মুরতযা রা. এর ১০০ ঘটনা, হযরত হাসান হুসাইন রা. এর ১০০ ঘটনা, হযরত বিলাল হাবশী রা. এর ১০০ ঘটনা, হযরত সালমান ফারসী রা. এর ১০০ ঘটনা, ৪০ দরূদ ও সালাম, যাদু ও জ্যোতিষবিদ্যা, ইসলামের দৃষ্টিতে মিলাদ ইত্যাদি।
মুফতি যশোরী ১ ছেলে ও তিন মেয়ের জনক। যশোরের পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়েছে।
আল্লাহ তা’য়ালা আল্লাহর এই মকবুল বান্দার সকল দ্বীনি খেদমত কবুল করুন এবং তাকে জান্নাতের উচ্চ মর্যাদা দান করুন। আমীন।

Share

Comments are closed.