বিজয়ের রমজান শানিত হোক আমাদের প্রার্থনার ভাষা

মুহাম্মাদ যাইনুল আবেদিন

আজ রকমারি ইফতারির স্বাদে উৎসবমুখর আমাদের রমজান। ইফতারের বর্ণিল আয়োজন আর ঈদের চঞ্চল স্বপ্নের দাপাদাপিতে আমরা ভুলেই গেছি এই রমজান ছিল একদা মুষ্ঠিবদ্ধ বিজয়ের প্রতীক। দুর্দণ্ড অসম শক্তিকে প্রবল দুঃসাহসে পরাজিত করে একদা বুক টান করে দাঁড়িয়েছিল ‘সত্য’। আর সময়টা ছিল রমজান মাস।
হিজরি দ্বিতীয় বছর। হযরত রাসুল সা. সংবাদ পেলেন প্রতিপক্ষ মক্কাবাসি মেরুদণ্ড শক্তিশালী করতে বড় ধরনের একটি সম্মিলিত বাণিজ্যিক দল পাঠিয়েছে সিরিয়ায়। হযরত রাসুল সা. গোয়েন্দা মারফত জানতে পারলেন ৪০ সদস্যের এই ব্যবসায়ী টিম সফল বাণিজ্যের পর এখন মক্কায় ফেরার পথে। এও জানতে পারলেন তারা অর্থনৈতিকভাবে শক্তি সঞ্চয় করছে মুসলমানদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের যুদ্ধের প্রস্তুতি স্বরূপ। শত্র“র পায়ের তলে মাটি জমতে দেয়া কোনো বিচক্ষণ প্রতিপক্ষের কাজ নয়। শত্র“ পক্ষকে ঘায়েল করার সহজ পন্থা হলো তাদের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়া। হযরত রাসুল সা. সমরনীতির এই পরীক্ষিত পথেই এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। কিন্তু করুণাময় আল্লাহ দয়া করে বেঈমানদের কোমরের জায়গায় তাদের মাথাগুলো বিছিয়ে দিলেন। ফলে ব্যবসায়ীকাফেলা কৌশলে পালিয়ে গেলেও হাতের মুঠোয় এসে ধরা দেয় আবু জাহালের নেতৃত্বে মক্কার সব রাঘববোয়াল। সমকালীন সর্বোচ্চ সমরাস্ত্রে সজ্জিত প্রায় ১০০০ বাহিনীর প্রতিপক্ষের সামনে মাত্র ৩১৩ জন মুসলমান। শত্র“পক্ষের হাতে ২০০ ঘোড়া। আর মুসলমানদের হাতে মাত্র দুটি ঘোড়া, ৭০ টি উট। শত্র“পক্ষের সঙ্গে আছে সমরসঙ্গীত গায়িকা নটিনীর দল। আছে দামামা বাদক। এই অসম যুদ্ধে জয় হয় মুসলমানদের। কোরআনের ভাষায় আর বদর যুদ্ধে যখন তোমরা হীনবল ছিলে, আল্লাহ তোমাদের সাহায্য করেছিলেন। সুতরাং তোমরা আল্লাহকে ভয় করো। যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারো।’ (আল-ইমরান : ১২৩)

বিজয়ের এই শুভ সময়টি ছিল পবিত্র রমজানের সতের তারিখ। আমরা স্মরণ করতে পারি আল্লাহ তায়ালা রমজানুল মুবারকের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেছেন ‘রমজান মাস, যাতে মানুষের দিশারী এবং সতপথের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যাসত্যের পার্থক্যকারীরূপে কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে।’ (বাকারা : ১৮৫)
রমজানের রোজা ফরজ হয়েছে হিজরি ২য় সালে। এই মাসেরই শবেকদরে অবতীর্ণ হয়েছে পূর্ণ কোরআন। অবতীর্ণ হয়েছে সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারীরূপে। এবং শুধু যৌক্তিক ও বিশ্বাসিকভাবেই নয়, বাস্তবে সত্য ও মিথ্যার চূড়ান্ত পার্থক্য করে দেখিয়ে দিয়েছেন বদর ময়দানে। আমাদের ইতিহাসের এই শির উঁচু করা অধ্যায় নানা কারণে আজ স্ববিশেষ স্মরণীয়।
প্রথমত এই কারণে আজও আমরা পৃথিবীব্যাপী হতবল। আমাদের নিষ্পাপ শিশু, অসহায় নারী ও বৃদ্ধদের পবিত্র রক্তে প্রতিদিন মনের সুখে আলপনা আঁকছে বেঈমানরা। আর আবু জাহালদের মানসপুত্রেরা দিকে দিকে গাইছে সমরসঙ্গীত। জাতিসংঘের প্রশিক্ষিত কসাইবাহিনী অবিরাম বাজিয়ে চলেছে যুদ্ধের বন্য দামামা। জ্বলছে কাশ্মীর, সিরিয়া,্ আফগান, বসনিয়া, ইরাক আর প্রাণের ফিলিস্তিন। অভাগা মিয়ানমার তো জ্বলছেই। জ্বলছে মুসলিম ঐতিহ্যের দেশ মিশর। পুড়ে ছাই হয়েছে গাদ্দাফির লিবিয়া বেঈমানদের বিষ গণতন্ত্রের অনলে।
এই আগুনে প্রতিদিন ঢালা হচ্ছে নতুন ঘি। অনেক রক্ত দানের পর সেই ইরাকে মুসলমানরা একটু ঘুরে দাঁড়াবার চেষ্টা করছে, বীর সাদ্দামের ভূমি তিকরিতে স্বাধীনতার শ্লোগান শব্দময় হতে চলেছে, অমনি কসাই আমেরিকার রাজা ওবামা বাণী দিয়ে বলেছেন ইরাকি জনগণকে জঙ্গিদের হাত থেকে রক্ষা করতে এবং আঞ্চলিক ও মার্কিন স্বার্থে দেশটির সরকারী বাহিনীকে সাহায্য করা হবে। (আমাদের সময় : ২১ জুন’১৪)
শুধু সাহায্য করবে বলেই বসে থাকেনি এই কসাই সম্্রাট। পত্রিকার ভাষ্যÑ ‘ইরাকে আরও সেনা পাঠাল যুক্তরাষ্ট্র’। ইরাকে আরও তিনশতাধিক সেনা পাঠিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরাকে আগে পাঠানো সেনাদের মতো নতুনরাও রাজধানী বাগদাদে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস ও দেশটিতে অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বে থাকবে।
সুন্নি বিদ্রোহীদের হামলার পর দুই সপ্তাহ আগে ইরাকে পৌঁনে তিনশতাধিক সেনা পাঠিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। ইরাকি সেনাদের যুদ্ধ পরিকল্পনায় সহায়তা করতে তিন’শ সামরিক বিশেষজ্ঞ পাঠায় যুক্তরাষ্ট্র্। যাদের একটি অংশ এরই মধ্যে দেশটিতে পৌঁছে কাজ শুরু করে দিয়েছে। এ ছাড়াও জঙ্গিদের হামলা ঠেকাতে ও তাদের ওপর নজরদারী করতে অস্ত্রশজ্জিত ও গোয়েন্দাকাজে নিয়োজিত বেশ কিছু মার্কিন বিমান ও ড্রোন দেশটিতে কাজ করছে। (আমাদের সময় : ২ জুলাই’১৪)
কী মধুর বর্ণনা। স্বদেশে নির্যাতিত সুন্নি মুসলমানগণ যখনই স্বাধীনতার শ্লোগানে মুষ্ঠিবদ্ধ তখনই তারা হয়ে গেল জঙ্গি। আর বিদেশি বর্বর ড্রোনবাজরা এসেছে বাগদাদের স্বার্থ রক্ষা করতে সশস্ত্র বিমান নিয়ে। অধিকন্তু নির্লজ্জের মতো চলছে ‘মার্কিন স্বার্থ’ রক্ষার কথা। কথা হলো, যে বাগদাদের প্রতিষ্ঠাতা হযরত উমর, হযরত আলী যে বাগদাদের শাসক, যে ইরাকে আজও ঘুমিয়ে আছেন হযরত হুসাইন রাযি. এবং উম্মাহর শ্রেষ্ঠ ইমাম আবু হানিফা রহ.- সেখানে আবার বেঈমানদের স্বার্থ কী?
কথা কিন্তু এখানেই থেমে যায়নি। ইরাকের এই নতুন যুদ্ধে বেরিয়ে এসেছে গোপন বন্ধুত্বের তালিকা। পত্রিকায় খবর বেরিয়েছে ‘ইরাকে সুন্নি বিদ্রোহীদের রুখতে যুদ্ধবিমান সরবরাহ করছে ইরান। রাশিয়া থেকে যুদ্ধ বিমান ক্রয়ের কয়েকদিন পর ইরাকে ইরানের য্্ুদ্ধবিমান পৌঁছানোর শক্ত প্রমাণ পাওয়া গেছে। উল্লেখ্য, এর আগে ইরাকি শিয়া সরকারকে সাহায্য করতে যুদ্ধবিমান ও ড্রোন মোতায়েন করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এ থেকে বোঝা যায় ইরাকের শিয়াপন্থি সরকারকে রক্ষা করতে দুই বিরোধপূর্ণ দেশ- যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান এক সঙ্গে কাজ করছে’। (আমাদের সময় : ৩ জুলাই’১৪)
আমাদের দুঃসময় হলেও শিয়াদের প্রকৃত মুখ মুখোশ ভেঙে বেরিয়ে এসেছে। মুখে যতই তারা নিজেদের মুসলমান বলে দাবি করুক, তারা যে মুসলমানদের শত্র“Ñ যুক্তরাষ্ট্র খুব সরলভাবে তা প্রমাণ করে দিয়েছে।
এদিকে মিয়ানমারের মুসলমানরা তো প্রতিদিনই নির্যাতিত হচ্ছে। হচ্ছে আশ্রয় হারা। গতকালও (২.৭.১৪) মিয়ানমারের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মান্দালায় অবস্থিত মুসলিম দোকান ও মসজিদে হামলা চালিয়েছে কয়েক’শ বৌদ্ধ। ২০১২ সালের জুলাই থেকে শুরু হওয়া বৌদ্ধ-মুসলিমের এই দাঙ্গায় পত্রিকার ভাষ্যমতে ২০০ জনের বেশি নিহত হয়েছে। আর ঘর ছাড়া হয়েছে এক লাখ ৪০ হাজারেরও বেশি মুসলমান।
আমাদের পহেলা কেবলা অবরুদ্ধ। ফিলিস্তিন ইহুদি নির্যাতনের যেন প্রশিক্ষণ মঞ্চ। এইতো একদিন আগেও তিন ইসরায়েলি কিশোরের লাশকে কেন্দ্র করে ইসরায়েল ৩০ দফা বিমান হামলা করেছে ফিলিস্তিনের ওপর। কী ভয়াবহ কথা!
ইরান, আমেরিকা, ইসরায়েল, মিয়ানমারসহ সব বেঈমান যখন একজোট আমাদের বিরুদ্ধে; আমাদের শিশু, বৃদ্ধ নারীদের নিষ্পাপ রক্তে যখন প্রতিদিন তৃপ্ত হচ্ছে বেঈমান পিশাচদের খুনি আত্মা তখনই আমাদের দুয়ারে উপস্থিত রমজান-বিজয়ের মহানায়ক। আজ বিশ্বমুসলিমের সামনে এ এক মহা প্রশ্ন। কিভাবে গ্রহণ করবো আমরা এই বিজয়ের বার্তাবাহক মাসকে।
রমজান। যেখানে খুলে যায় প্রভুর রহমতের সব কপাঠ। ক্ষমা ও মুক্তির আশিষে ছেয়ে যায় আমাদের আকাশ। লাখ লাখ হাফেজের কণ্ঠনিঃসৃত তেলাওয়াত আল্লাহর আরশকে বেঁধে দেয় মাটির পাটাতনের সঙ্গে  যে পাটাতনে আমাদের বাস। আমরা যখন ক্লান্ত, ক্ষুধার্তপ্রাণে ইফতারের পসরা সাজিয়ে বসি দস্তরখানে, আরশ তখন মুখিয়ে থাকে আমাদের প্রার্থনা শোনার জন্যে। ইফতারের শুভ মুহূর্তে এবং রাতের নিশুতিপ্রহরে আমাদেরই চোখে পানিতে রচিত আমাদের ভবিষ্যত ইতিহাস। এই ইতিহাস রচিত হয় খোদার আরশে। পৃথিবীর কোনো শক্তি যা কোনোদিন মিটাতে পারে না।
আজ প্রতিটি মুসলমানকে ভাবতে হবে পৃথিবীর সব মুসলমান একই পরিবারভুক্ত। এও ভাবতে হবে আমার ঘরে আমি নিরাপদ। আমার সন্তান নিরাপদ। অথচ আমার ভাই ও তার সন্ত্রানরা শত্র“র অস্ত্রের মুখে। এই নিরাপত্তায় আমরা নিজেদেরকে নিরাপদ ভাবতে পারি না। ভাইকে শত্র“র যুদ্ধবিমান আর ড্রোনের নিচে রেখে শান্তিতে ঘুমোতে পারে যে পাষাণ সে কী করে দাবি করবে আমি মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সা. এর উম্মত। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না রমজানের সাধনা শুধু উপোস করা নয়; এতো ঈমানকে শানিয়ে নেয়ার মওসুম। বস্তুর শক্তিকে উজিয়ে মহান মালিকের শক্তিকে উপলব্ধি করার মাস। নিরস্ত্রগণ যখন আল্লাহনাম ভরসা করে সত্য প্রতিষ্ঠার আহ্বানে ঝাপিয়ে পড়ে আল্লাহ তখন আকাশ থেকে ফেরেশতা পাঠিয়ে সাহায্য করেন। এ কেবল বদর যুদ্ধের কথাই নয়; এই সত্য সর্বকালের। তাই আমাদের প্রার্থনার ভাষা হোক ব্যাপক ও দিগন্তস্পর্শী। আমাদের ঈমান হোক আসমানি সাহায্যে নির্ভর এবং বিশ্বের সকল মুসলিম মজলুমানের বিজয় প্রত্যাশায় আকুল। আমাদের মন ও সামর্থ্য ছড়িয়ে পড়–ক আমাদের মজলুম ভাইদের মুক্তি আন্দোলনে। আমাদের কান্নায় ফিলিস্তিনের শহিদ শিশুদের রক্ত জেগে ওঠুক রাতের গভীরে। আমাদের ইফতার ও জুমার মোনাজাতে ভাষা পাক মজলুম ইরাক, কাশ্মীর, মিয়ানমার ও রক্তাক্ত সিরিয়া। মজলুম মুসলমানের প্রতি আমাদের আহত হৃদয় শক্তিমান বন্ধুরূপে জেগে ওঠুক। ইরান, আমেরিকা, ইসরায়েল, মিয়ানমারে জালেমদের প্রতি আমাদের আত্মায় পুষিত ঘৃণা লাভাময় হোক প্রতিটি মজলুম জনপদে। বিজয়ের মাসে বিজয় লেখা হোক আমাদের মজলুমান ভাইদের নসীবে।

Share

Comments are closed.