অশ্রু ও রক্তের আগুনে জ্বলছে জনপদ

মুহাম্মদ যাইনুল আবিদীন

: ঝন্টু তুমি বলো!

: আমি পাইলট হবো স্যার!
: পাইলট কেন?
: বিনে পয়সায় দেশ-বিদেশে ঘুরে বেড়াতে পারবো। আর কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায় ‘জগতটাকে দেখবো আমি আপন হাতের মুঠোয় ভরে।’ মজা হবে না স্যার!
: অবশ্যই অবশ্যই…
: এবার মিন্টু বলো!
: আমি উকিল হবো স্যার!
: কেন বলো তো!
: স্যার বড় কাকু বলেছেন, উকিল-মুক্তাররা নাকি প্রতিদিন বেতন পান তাই।
: অ আ”ছা!
: এবার সবুজ দাঁড়াও। বলো লেখাপড়া করে ভবিষ্যতে কী হতে চাও।
: স্যার আমি ডাক্তার হতে চাই।
: কিন্তু কেন?
: দুঃখী মানুষদের সেবা করবো। অসহায় মানুষদের দুঃখ মোচনের চেষ্টা করবো।
: সাবাশ বেটা সাবাশ। এই না আদর্শ ছাত্রের কথা। যে শিক্ষা জাতির মেরুদ- সে শিক্ষা গ্রহণ করেও যদি আমরণ জাতির কল্যাণের কথা না ভাবি, জাতির দুঃখ ঘুচাবার স্বপ্ন না দেখি তাহলে আমাদের এই শিক্ষা হবে অর্থহীন। অতঃপর ডাক্তার ও মানবসেবার মহিমা সম্পর্কে শিক্ষাগুরুর দীঘল ভাষণ!
যুগ যুগ ধরে গুরুগৃহে এভাবেই শিক্ষাগুরুগণ তাদের শিষ্যদের দীক্ষা দিয়ে এসেছেন। সামান্য ভাষার ব্যবধানসহ এখনও চালু আছে আদর্শের এই পাঠ। গুরুর বচনে ব্যত্যয় নেই কোনো
কালেই। অথচ আমরাই যখন এই মানবতার স্বপ্নে সমর্পিত সেই ডাক্তারের কাছে যাই তখন কী পাই! পত্রিকার ভাষায়Ñ ‘সড়ক দুর্ঘটনায় ডান পায়ের গোড়ালি বি”িছন্ন হয়ে
যায় জজ মিয়ার। চিকিৎসা নিতে আসেন রাজধানীর পঙ্গু হাসপাতালে। নিচতলায় অপারেশন থিয়েটারে পাঠানো হয় তাকে। কর্তব্যরত চিকিৎসক দেখে বললেন, বি”িছন্ন পা জোড়া লাগানো সম্ভব নয়। কেটে ফেলতে হবে। কিন্তু জজ মিয়া কিছুতেই রাজি হ”িছলেন না। সার্জনও নাছোড়বান্দা। পা কাটবেনই। নিরুপায় জজ মিয়া এক আত্মীয়কে ধরে তৎকালীন স্বাস্থ্যপ্রতিমন্ত্রী ক্যাপ্টেন (অব) মুজিবুর রহমান ফকিরকে দিয়ে তাৎক্ষণিক ফোন করান চিকিৎসকের কাছে। স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীর নির্দেশে পায়ের গোড়ালি জোড়া লাগিয়ে দিতে বাধ্য হন চিকিৎসক। জজ মিয়া সুস্থ হয়ে উঠেন। এখন হাঁটা-চলা করছেন। {আমাদের সময় : ২০ মে ‘১৪}
এটা উপমা। এমন ঘটনা এখন আর বিরল নয়। বরং নিত্যদিনের। আর এই যদি হয় দরদি চিকিৎসকদের চেহারা- তাহলে রাজনৈতিকদের মুখ কেমন হবে তাকি আর বলতে হয়? বিশেষ করে খুনের ঘটনার পর যদি নিহতের পরিবার নিরাপত্তাহীন আর খুনির দল সদর্পে চলাফেরা করার সংস্কৃতি গড়ে ওঠে তখন আর খুন-হত্যার অভিশাপ থেকে মুক্তির আশা করা যায় না। তারপরও দেশে এখনও যারা রাজনীতিক নয়, দলের কর্মী নয়, শুধু ‘মানুষ’ তারা যেকোনো খুনের ঘটনায় আহত বোধ করেন। কাঁদেন এবং ইনসাফের আশায় বুক বাঁধেন।
দুই.
সমাজে মানুষ হওয়ার সমস্যা হলোÑ অন্যের যন্ত্রণায় পাষাণ হয়ে থাকা যায় না। কিছু করতে না পারলেও সঙ্গে কাঁদতে হয়, দীর্ঘশ্বাস ছাড়তে হয়। সান্তনার কথা শোনাতে হয়Ñ ‘অপেক্ষা করো। আল্লাহ তো আছেন। বিচার একদিন হবেই।’
বেদনাবিধুর এমন ঘটনা তো প্রতিদিনই দেখছি, কাঁদছি, দীর্ঘশ্বাস ছাড়ছি। আর না কেঁদে উপায় কি, যখন কোনো মা বুক চাপড়ে বলতে থাকেন  ‘ছেলেটা বিয়ের পিঁড়িতে বসার কথা ছিল। সে অনুযায়ী আত্মীয়-স্বজনদের দাওয়াতকার্ড দেয়া হয়েছিল। বিয়ের
আয়োজন ছিল চূড়ান্ত পর্যায়ের। বিয়ের ব্যয় ও পারিবারিক অন্যান্য কাজ করতে তিলে তিলে গড়া জমিও বিক্রি করি। কিন্তু জমি বিক্রির টাকাগুলো হাতে আসাতেই যত বিপত্তি। র‌্যাব-১১-এর মেজর আরিফ হোসেন তার অস্ত্রধারী র‌্যাব সদস্যদের দিয়ে চোখের সামনে ছেলেটিকে নারায়ণগঞ্জের ক্যাম্পে ধরে নিয়ে যায়। তারপর ছেলেকে ফেরত দেয়ার শর্তে আমার কাছ থেকে ৪২ লাখ টাকাও নেয়। কিন্তু ১৬ দিন পর মেজর আরিফ আমার ছেলে শওকত আলী ইমনের লাশ ফেলে রেখে যায় কাঞ্চন ব্রিজের নিচে। {আমাদের সময় : ১৯.৫.১৪}
এ ছিল গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসের ঘটনা। কিন্তু এই ঘটনা মিডিয়া কিংবা সরকারের এইটুকুও টনক নাড়াতে পারেনি। কারণ, ইমনরা বিশ্বজিতের মতোই এই সমাজের সাধারণ মানুষ। তবুও বিশ্বজিতের কপাল ভালো সামনে দাঁড়িয়ে ধারালো অস্ত্রের ক্রমাগত আঘাতে অসীম অসহায়ত্বে জীবন বিসর্জন দিতে পেরেছে বলে অন্তত জাতির পক্ষ থেকে নগদ কিছু চোখের জল পেয়েছিল। কিন্তু ইমনদের মতো বরাবর যাদের ধরে ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়- অতঃপর সাত সকালে পথের ধারে পাওয়া যায় ক্ষত-বিক্ষত লাশ, তারা আমাদের এই চোখের জলটুকুও পায় না। দেশের সচেতন পাঠক মাত্রই জানেন সাদা কিংবা কালো পোষাকে অস্ত্রধারী একটি দল সাদা মাইক্রোবাসে করে যাকে তাকে যখন তখন তুলে নিয়ে যা”েছ  বিশেষ করে ব্যবসায়ী কিংবা বিরোধী রাজনীতিকদের এটা এখন যেন কোনো ঘটনাই নয়। অথচ এভাবে ধরে নিয়ে যাওয়া অতঃপর পথে কিংবা ডোবায় লাশ পড়ে থাকতে দেখা- সে তো মুক্তিযোদ্ধের সময়কার কাহিনী। বিদেশি হায়েনারা এভাবে এদেশের সূর্যসন্তানদের ধরে নিয়ে খুন করেছে। তখন আমরা ছিলাম পরাধীন। আর এখন? ‘কেতাবে’ আছে আমরা স্বাধীন! আসলেই কি আমরা স্বাধীন?
সুমনের বাবা আবদুল লতিফের কথা শুনুন ‘লাশ উদ্ধারের পর রূপগঞ্জ থানায় র‌্যাবের বিরুদ্ধে মামলা করতে যাই। কিন্তু ওসি হুমকি দেন র‌্যাবের বিরুদ্ধে মামলা করা যাবে না। করলে পুরো পরিবারকে ক্রসফায়ারের ভয় দেখায় আসলাম। এ কারণে এতদিন
মুখ বুঝে ছিলাম। কিন্তু মেজর আরিফ গ্রেপ্তার হওয়ায় এখন সাহস পেয়েছি। {প্রাগুক্ত}
কী ভয়াবহ পরিস্থিতিতে বাস করছি আমরা। যেখানে আমার জন্ম, জন্ম
আমার বাবার সেখানে আমার চোখের সামনে আমার সন্তানকে তুলে নিয়ে খুন করে ফেলছে। আমি খুুনিদের চিনি। কিন্তু তাদের নাম বলতে পারছি না। তাদের বিরুদ্ধে নালিশ করতে পারছি না। এরচে’ কঠিন জঘন্য এবং পাষাণ সময় আর কী হতে পারে? যারা মুক্তিযুদ্ধের সময়কার বদ্ধভূমির ফেরি করে খায়, তারা কি স্বীকার করবেনÑ এখন যে পুরোটা বাংলাদেশই বদ্ধভূমি!

তিন.
তারা স্বীকার করবেন না। ভাবখানা এমনÑ দেশ যে গুম খুন আর একদলীয় সন্ত্রাসের তা-বে ল-ভ-Ñ এ যেন জীবন চঞ্চলতার স্বাভাবিক দৃশ্যপট। এরই মধ্যে ঘটলো নারায়ণগঞ্জের প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামসহ সাত খুনের বাকরুদ্ধকর ঘটনা। দিনের বেলা
শাসকদলের নেতা- নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিকে তার নির্বাচন এরিয়া থেকে তুলে নিয়ে যা”েছ। এর সঙ্গে আরও চারজন সতীর্থ। এই দৃশ্য মোবাইল ফোনে ধারণ করতে গিয়ে অপহরণের শেকলে বাঁধা পড়েন আইনজীবী চঞ্চল ও তার ড্রাইভার ইবরাহীম। এই সাতজনকে খুন করে নদীতে ফেলার সময় দেখে ফেলার অপরাধে দুই মাঝি ও দুই জেলেকে খুন করা হয়। এবং তাদেরও ডুবিয়ে ফেলা হয় নদীর গহীনে। এই ঘটনার পর কে বলবেÑ এই দেশটা আমাদের। এই ঘটনার ভাঁজে ভাঁজে যে পাষ-তা ও নির্মমতা ছড়িয়ে আছে তার ব্যাখ্যা দেয়ার ভাষা কার আছে শুনি! অন্তত মাঝি ও জেলেদের কী অপরাধ ছিল এই ঘটনায়? তাদের বিধবা স্ত্রী এবং এতিম সন্তানদের ভাষা বুঝবার ক্ষমতা কি সত্যিই এই দেশ ও সরকারের আছে? আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কথায় কথায় বলেন- তিনি বাবাহারা সন্তানের কষ্ট বুঝেন। যদি তাই হতো তাহলে তিনি ছুটে যেতেন নিহত জেলে এবং মাঝির ঘরে। হাত রাখতেন তাদের এতিম সন্তানদের মাথায়!
রাজনীতিকরা যেমন পাষাণ এখনকার খেলাধুলাও পাষাণ। শোকে নৃশংসতায় মুহ্যমান নারায়ণগঞ্জের স্মৃতিতে যখন
ক্ষুব্ধ স্তব্ধ ও স্তম্ভিত সারা দেশ, তখনই একই আগুনে জ্বলে উঠলো ফেনী। পত্রিকার শিরোনাম- প্রকাশ্য বর্বরতা : উপজেলা চেয়ারম্যানকে রাজপথে হত্যা ॥ গাড়িসহ পুড়িয়ে ভস্ম!
আর কী বলার থাকে? তবু জঘন্যতার মাত্রা নির্ণয়ের জন্য বলি- নিহত ছাই ভস্ম একরামুল হক ছিলেন সদ্য নির্বাচিত ফেনী ফুলগাজীর উপজেলা চেয়ারম্যান এবং আওয়ামী লীগ সভাপতি। তিনি খুন হয়েছেন সকাল ১০টায় ( ২২.৫.১৪) ফেনী শহরের একাডেমি এলাকার বিলাসী সিনেমা হলের সামনে। অর্থাৎ গোপনে নয়, রাতেও নয়। গুলি করে গাড়িতে আগুন ধরিয়ে পুড়িয়ে ছাই করে হত্যা করার এমন জঘন্য দৃশ্য কোনো সভ্য পৃথিবী কখনো দেখেছে? বিশেষ করে এমন কোনো নির্বিবাদ পরিবেশে!
একটা দুঃখের কথা বলি। এই দুঃখ চলতি বিশ্বের এবং বিশ্বমানবতার। আমেরিকানরা এই যে জাহাজ ভরে উড়ে এসে মুসলমান খুন করে যাচ্ছে।
ইরাকে আফগানিস্তানে কিংবা লিবিয়ায়- সেখানে কি শুধু মুসলমানই খুন হ”েছন না বেঈমানরাও ধ্বংস হ”েছ! কাউকে মারতে গেলে মরতেও হয়। মরছে আমেরিকানরাও। কিন্তু সাহস করে জরিপ প্রকাশ করতে পারছে না- ঠিক কতজন ধ্বংস হয়েছে এ পর্যন্ত আমাদের শহরে। আমরা তার হিসাব রাখি না। শৃগাল কুকুর কতটা বাঁচল আর কতটা মরল- সে হিসাব রাখবে কে? কিন্তু এ দেশে যারা স্বদলের মানিকদের হাতে জীবন দি”েছ- তাদের একটা হিসাব থাকা চাই। হিসাবটা এই কারণে চাই- ভবিষ্যত প্রজন্ম যেন এখান থেকে কিছু শিখতে পারে। করণ- এখন যে খুন হত্যা আর গুমের ধুম চলছে এ কিন্তু কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনা নয়। ইলিয়াস আলীর এতিম কন্যার চোখের পানি আর বিশ্বজিতের তাজা রক্ত থেকে উৎসারিত এই আগুন। যদি ইনসাফ ও সুবিচারের জলে নেভানো না হয় এই আগুন- তাহলে পূর্ব-পশ্চিম আর উত্তর-দক্ষিণের সকল জালেম জনপদ পুড়িয়ে ছাই করবে এই আগুন। নেতা-কর্মী কাউকেই ছাড়বে না।

ঢাকা

Share

Comments are closed.