বিশ্ব ইজতেমায় দাওয়াতী কাজের জযবা সৃষ্টি হয়

-মাওলানা মাহফুজুল হক

মাওলানা মাহফুজুল হক। শাইখুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক রহ. এর যোগ্য উত্তরসূরি। জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়ার স্বনামধন্য প্রিন্সিপাল। একই সঙ্গে বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব এবং বাংলাদেশে খেলাফত মজলিস-এর ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব। তাবলিগ সংক্রান্ত স্মৃতি, অনুভূতি, ও চলমান কার্যক্রমসহ নানা বিষয় নিয়ে ইজতেমা বার্তার পক্ষে তার মুখোমুখি হন আমিন ইকবাল।

ইজতেমা বার্তা : জীবনে প্রথম তাবলিগে যান কবে?
মাওলানা মাহফুজুল হক : যতদূর মনে পড়ে, কিতাব বিভাগের শুরুর দিকে পড়া অবস্থায় আমার বয়স যখন ১২/১৩ বছর তখন মসজিদ ওয়ারি তাবলিগের সাপ্তাহিক গাস্ত, তালীম ইত্যাদি কাজে শরিক হই। পরবর্তী কয়েক বছর পর চব্বিশ ঘণ্টার জামাতে ছাত্রদের সঙ্গে অংশ গ্রহণ করি। আর তিনদিনের জামাতে প্রথম যাই ১৯৯২ সালে দ্বিতীয়বার দাওরায়ে হাদিস পড়ার জন্য দারুল উলুম দেওবন্দে ভর্তি পরীক্ষা দেওয়ার পর, ফলাফল প্রকাশের আগের সময়টুকুতে।

ইজতেমা বার্তা : সাল বা চিল্লায় যাওয়ার সুযোগ হয়েছে কখনো?
মাওলানা মাহফুজুল হক : সালে যাওয়ার সুযোগ হয়নি। তবে, চিল্লায় যাওয়ার সুযোগ একবার আল্লাহ তায়ালা করে দিয়েছিলেন। দাওয়াতের সে সফর ছিলো ২০০১ সালে মোমেনশাহীর ফুলপুর থানায়।

ইজতেমা বার্তা : তাবলিগের কাজে দেশ-বিদেশে কোথায় কোথায় সফর করেছেন?
মাওলানা মাহফুজুল হক : দেশে তো চিল্লা উপলক্ষে মোমেনশাহী সফর হয়েছে। বিদেশে শুধুমাত্র তাবলিগের কাজে কোনো সফর হয়নি। তবে, দেওবন্দে থাকা অবস্থায় তাবলিগের কাজে তিনদিন সময় দেওয়া হয়েছে। তখন তাবলিগের মারকাজ নেযামুদ্দীনে যাওয়াও সুযোগ হয়েছিলো।

ইজতেমা বার্তা : তাবলিগ সংশ্লিষ্ট বিশেষ কোনো ঘটনা মনে পড়ে?
মাওলানা মাহফুজুল হক : আমাদের শ্রদ্ধেয় আব্বাজান, শাইখুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক রহ. একবার তিনদিনের তাবলিগে গেণ্ডারিয়া এলাকার এক মসজিদে যান। শায়েখের সঙ্গে মাদরাসার কয়েকজন মুহাদ্দিস-উস্তাদ, মাদরাসার কমিটি এবং এলাকার মুরব্বিরাও অংশগ্রহণ করেন। সেখানে শায়েখের যাওয়াকে কেন্দ্র করে কাকরাইলের অনেক মুরব্বি আসেন। শায়েখ গুরুত্বপূর্ণ বয়ান রাখেন। সে বয়ানে কাকরাইলের মুরব্বিগণসহ এলাকার সাধারণ মুসল্লিরা খুব আপ্লুত হন। তখনকার চিত্রটা আমার আজও মনে পড়ে।

ইজতেমা বার্তা : জীবনের প্রথম ইজতেমায় যাওয়া হয় কবে?
মাওলানা মাহফুজুল হক : সুনির্দিষ্টভাবে মনে পড়ছে না। তবে, যতটুকু মনে হয় বিছানাপত্র নিয়ে তিনদিনের জন্য হেদায়েতুন্নাহু পড়ার সময় যাওয়া হয়েছিলো। তখন লালবাগ মাদরাসায় পড়ি।

ইজতেমা বার্তা : বাংলাদেশের বরেণ্য আলেমদের জন্য ইজতেমার মাঠে খাস রুমের ব্যবস্থা থাকে। শাইখুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক রহ. এর জন্যও ছিল। সে রুমে শায়েখের সঙ্গে যাওয়া হয়েছে কখনো? সেখানকার কিছু চিত্র যদি বর্ণনা করতেন।
মাওলানা মাহফুজুল হক : হ্যাঁ, শায়েখের সঙ্গে যাওয়া হয়েছে। সেখানে বাংলাদেশের বড় বড় মুরব্বি আলেমগণ উপস্থিত হন। তাদের জন্য কয়েকটি খাস রুমের বিশেষ ব্যবস্থা রয়েছে। শায়েখের জন্যও ছিলো। শায়েখের জীবদ্দশায় আমি দেখেছি, বর্তমানে হাটহাজারির হুজুর আল্লামা আহমদ শফি দা. বা., বসুন্ধরার মুফতি আব্দুর রহমান সাহেব, কুমিল্লার আল্লামা আশরাফ আলী সাহেব, ফরিদাবাদ মাদরাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা আব্দুল কুদ্দুস সাহেবসহ ঢাকার বড় বড় আলেম-ওলামা সেখানে উপস্থিত হতেন। বয়ান শুনতেন। বড় বড় আলেমদের একসাথে পাওয়ার সুবর্ণ সুযোগ তৈরি হয় সেখানে।

ইজতেমা বার্তা : ইজতেমার মাঠে অনেক মুসল্লিদের বলতে শোন যায় যে, বিদেশি মেহমানদের চেয়ে বাংলাদেশি মুরব্বি বা আলেমগণ বাংলায় বয়ান করলে আমাদের বুঝতে সুবিধা হতো। এ বিষয়টি আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করবেন।
মাওলানা মাহফুজুল হক : তাবলিগের মুরব্বিগণ পরামর্শের মাধ্যমে যে তরতিব বা নিয়ম চালু করেছেন, আমি মনে করি গুরুত্বের দিক থেকে সেটাই বেশি গ্রহনীয়। কারণ, বিদেশি মেহমানদের বয়ানে গুরুত্ব থাকে বেশি। আলেম-ওলামা, সাধারণ মুসল্লিসহ সবারই আলাদা আগ্রহ থাকে তাদের প্রতি। তাছাড়া সে সব বয়ানের তো বাংলায় সুন্দরভাবে অনুবাদ করার ব্যবস্থাও আছে। বাংলাদেশি মুরব্বিরাও প্রতিদিন কোনো না কোনো বয়ান করেন। যারা এমন প্রশ্ন তুলেন, আমার মনে হয় তাদের সংখ্যা খুবই অল্প।
ইজতেমা বার্তা : দাওয়াত ও তাবলিগের চলমান কার্যক্রম সম্পর্কে কিছু বলুন।
মাওলানা মাহফুজুল হক : বিশ্বব্যাপী তাবলিগের কাজ আল্লাহর রহমতে একই সূত্রে পরিচালিত হচ্ছে। সৌভাগ্যের বিষয় হলো, দাওয়াতের এ কাজ আমাদের ভারত উপমহাদেশ থেকেই শুরু হয়েছে। এবং এর মূল কেন্দ্র উপমহাদেশের ভারতে। গুরুত্বপূর্ণ সব কাজ পরিচালিত হয় ভারত, পাকিস্তান আর বাংলাদেশ থেকে। সব মিলিয়ে তাবলিগের চলমান কার্যক্রম অব্যশই প্রশংসার দাবি রাখে। বাকি, এক্ষেত্রে আমার একটু কথা হলো, ওলামায়ে কেরামগণ নিজেদের অন্যান্য দ্বীনি কাজ ঠিক রেখে তাবলিগে যেমন সময় আরেকটু বেশি দেওয়া উচিত, তাবলিগের মুরব্বিদেরও উচিত আলেমদের সঙ্গে বেশি বেশি যোগাযোগ রাখা এবং তাবলিগের কাজে আলেমদের আরও সম্পূক্ত করার চেষ্টা করা এবং তাবলিগ সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ গ্রহণ করা। কারণ, আলেম-ওলামাগণ ওভাবে সময় না দিতে পারলেও তাবলিগের কল্যাণে পরামর্শ দেওয়ার মতো যোগত্য তারা রাখেন এবং দাওয়াদের কাজে যথেষ্ট পরিমাণ আগ্রহ রাখেন।

ইজতেমা বার্তা : মাদরাসার ক্লাস বন্ধ রেখে বিশ্ব ইজতেমায় ছাত্রদের অংশ গ্রহণের গুরুত্ব কতটুকু?
মাওলানা মাহফুজুল হক : বুঝমান ছাত্রদের জন্য ক্লাস বন্ধ রেখে বিশ্ব ইজতেমায় অংশগ্রহণ করাটাই আমি শ্রেয় মনে করি। কারণ, আমাদের এই কওমি মাদরাসায় তালীমের পাশাপাশি সমভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয় তারবিয়াতের প্রতি। দাওয়াত ও তাবলিগের সঙ্গে সম্পৃক্ততা ছাত্রদের তারবিয়াতের লাইনে অনেকটা অগ্রসর করে দেয়। বিশ্ব ইজতেমা যেহেতু তাবলিগেরই অন্যতম অংশ, সেখানে শরীক হতে পারা এবং দেশ-বিদেশের হাজার হাজার ওলামায়ে কেরাম, বুজুর্গানেদ্বীন এবং লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ মুসল্লির সঙ্গে একত্রে থাকতে পারা সৌভাগ্যের বিষয়। এতে করে ছাত্রদের মাঝে দাওয়াতী কাজের জযবা সৃষ্টি হয়।

 

Share

Comments are closed.