যাকাতের ফাযাইল ও মাসাইল

মুফতি তাউহিদুল ইসলাম

মুফতি,জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া

ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে অন্যতম  হচ্ছে যাকাত। শরীয়তের দৃষ্টিতে যাকাতের অনেক গুরুত্ব ও ফযীলত রয়েছে এবং যাকাত আদায় না করলে রয়েছে অত্যন্ত ভয়াবহ  শাস্তির সতর্কবাণী। নবী কারীম সা. এর ইন্তিকালের পর একগোত্র যাকাত আদায়ের অস্বীকার করলে হযরত আবু বকর সিদ্দীক রা. তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা দেন এবং যুদ্ধ করেন

 যাকাতের ফযীলত

হযরত আনাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন- নিঃসন্দেহে দান-সদকা (যাকাত) আল্লাহ তা’আলার ক্ষোভের আগুন নিভিয়ে দেয় এবং অপমৃত্যু থেকে রক্ষা করে। -সুনানে তিরমিযী: ১/১৪৪

যাকাত আদায় না করার শাস্তি

মহান আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন- যারা স্বর্ণ ও রৌপ্য জমা করে রাখে এবং তা আল্লাহর পথে ব্যয় করে না তাদেরকে আপনি যন্ত্রনাদায়ক শাস্তির সুসংবাদ দিন। যেদিন সেগুলো উত্তপ্ত করে তা দ্বারা তাদের মুখমন্ডল, পার্শ্ব ও পিঠে দাগ দেয়া হবে (এবং বলা হবে) এগুলো তোমাদের সে সম্পদ যা তোমরা নিজেদের জন্য কুক্ষিগত করে রেখেছিলে। এখন তোমরা নিজেদের অর্জিত সম্পদের স্বাদ আস্বাদন করো। -সূরা তাওবা: ৩৪-৩৫

নবী কারীম সা. ইরশাদ করেন- আল্লাহ তা’আলা যাকে ধন সম্পদ দিয়েছেন সে যদি তার সম্পদের যাকাত আদায় না করে তাহলে তার সম্পদকে কিয়ামতের দিন টাক পড়া বিষধর সাপে রূপ  দেয়া হবে যার চোখের উপর দুটি কাল দাগ থাকবে। কিয়ামতের দিন সেটা তার গলায় পেঁচিয়ে দেয়া হবে। এরপর সাপ তার মুখে দংশন করতে থাকবে এবং বলবে আমি তোমার সম্পদ, আমি তোমার  সঞ্চয়। -সহীহ বুখারী: ১/১৮৮

যাকাত কার উপর ফরয

প্রাপ্তবয়স্ক (নাবালক নয়)  সুস্থ মস্তিষ্ক সম্পন্ন (পাগল নয়) প্রত্যেক মুসলিম নরনারী যার  মালিকানা সত্ত্বে ঋণ ব্যতীত নিত্যপ্রয়োজনের অতিরিক্ত নিম্ন বর্ণিত সম্পদ থাকবে এবং সে সম্পদের উপর এক চান্দ্র বছর অতিবাহিত হবে, তার উপর যাকাতযোগ্য সম্পদের ৪০ ভাগের এক ভাগ আদায় করা ফরয হবে। -হেদায়া:  ১/১৮৫-১৯৫

নিম্নে লিখিত পরিমাণ সম্পদ থাকলে যাকাত দিতে হবে

ক. সারে বায়ান্ন ভরি রৌপ্য তা অলংকার হোক বা অন্য কোন আকৃতিতে হোক।

খ. সারে বায়ান্ন ভরি রৌপ্যের মূল্য (নগদ ক্যাশ) যা বর্তমান বাজার মূল্য হিসেবে ১২০০*৫২.৫০=৬৩০০০/= তেষট্টি হাজার টাকা মাত্র।

গ. কিছু স্বর্ণ ও তার সাথে কিছু নগদ টাকা কিংবা কিছু রূপা যেগুলোর  মোট মূল্যমান সারে বায়ান্ন ভরি রূপার মূল্যের সমান। যেমন, কারো কাছে এক ভরি স্বর্ণ আছে যার মূল্য ৫০ হাজার টাকা এবং আরো ১৩ হাজার টাকা কিংবা সমপরিমাণ মূল্যের রূপা আছে, তাহলে তার উপর যাকাত  ওয়াজিব হবে।  কেননা এসকল সম্পদের মোট মূল্য দাঁড়ায় ৬৩ হাজার টাকা। যা বর্তমান বাজার মূল্য হিসেবে সারে বায়ান্ন ভরি রূপার মূল্যের সমপরিমাণ হয়।

ঘ. সারে বায়ান্ন ভরি রূপার মূল্য পরিমাণ ব্যবসায়িক সম্পদ।

ঙ. সারে সাত ভরি স্বর্ণ (অলংকার বা অন্য কিছু) যখন কারো কাছে শুধু স্বর্ণ থাকবে সাথে কোন টাকা বা রূপা না থাকবে, তখন সারে সাত ভরি স্বর্ণ থাকলে তার উপর যাকাত আবশ্যক হবে। কিন্তু যদি কারো স্বর্ণের সাথে টাকা কিংবা রূপা থাকে তাহলে স্বর্ণ ও রূপার বা টাকা সবগুলোর মূল্য কত হয় তা  দেখতে হবে। যদি মূল্য ৬৩ হাজার টাকা হয়, তাহলেই যাকাত দিতে হবে। -ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া: ১৪/৩৮

ঋণ গ্রস্তের যাকাত

সম্পদের মালিক যদি ঋণগ্রস্থ হয় তাহলে তার সম্পদের মূল্য থেকে প্রথমে ঋণ পরিমাণ টাকা বাদ দিতে হবে। অতঃপর  যদি অবশিষ্ট সম্পদ সারে বায়ান্ন ভরি রূপার মূল্য  (৬৩ হাজার) বা তার চেয়ে বেশি  হয়, তাহলে তার উপর যাকাত আবশ্যক হবে, নতুবা হবে না। কেউ যদি কিস্তিতে কিছু ক্রয় করে থাকে বা কিস্তি  করা ঋণ থাকে তাহলে এই  বৎসর যে পরিমাণ কিস্তি আদায় করতে হবে কেবল মাত্র সেই পরিমাণ টাকা বাদ দিয়ে অবশিষ্ট সম্পদের ৪০ ভাগের এক ভাগ যাকাত দিতে হবে।- আদ্দুররুল মুখতার:২/২৬৩

পাওনা টাকার উপর যাকাত

যদি কারো কাছে টাকা ঋণ দেয়া থাকে বা কারো কাছে গচ্ছিত রাখা থাকে অথবা  কোন কিছু বিক্রয় করেছে কিন্তু তার মূল্য এখনো হস্তগত হয়নিএবং এ টাকাগুলো পাওয়ার আশা থাকে তাহলে তা হিসাব করে যাকাত দিতে হবে। -শামী: ২/৩০৫

কারো ব্যবসায় লাগিয়ে রাখা টাকা, শেয়ার, প্রাইজবন্ড ও সঞ্চয়পত্রে যাকাত

শেয়ার, বৈদেশিক মুদ্রা, প্রাইজবন্ড বা সঞ্চয়পত্রও নগদ টাকার মতই। তাই এগুলোর মূল্য হিসাব করে যাকাত দিতে হবে। তবে এগুলো থেকে কেউ সুদপ্রাপ্ত হলে তার পূর্ণটাই সদকা করে দিতে হবে।-ফাতাওয়ায়ে উসমানী: ২/৪৮-৭১

ব্যাংক ও বীমার টাকায় যাকাত

ব্যাংকে রাখা টাকা এবং বীমায় দেয়া প্রিমিয়াম যা ফেরৎ পাওয়া যাবে তা হিসাব করে যাকাত দিতে হবে।-ফাতাওয়ায়ে উসমানী: ২/৭১

প্রভিডেন্ট ফান্ড

ঐচ্ছিক কর্তনকৃত প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকাও হিসাব করে যাকাত দিতে হবে। অবশ্য  বাধ্যতামূলকভাবে যে পরিমাণ টাকা কর্তন হয় তা হস্তগত  হওয়ার পূর্বে যাকাত নেই।-ফাতাওয়ায়ে উসমানী: ২/৫০

ব্যবসার কোন্ কোন্ পণ্যে যাকাত দিতে হবে

ক. ব্যবসার সম্পদে নগদ ক্যাশ বা পাওনা টাকা। খ. বিক্রয় করার জন্য মজুদ করা বা উৎপাদিত পণ্য। গ. প্রক্রিয়াধীন পণ্য ও কাঁচামাল। যেমন, পোশাকের ফ্যাক্টরীর কাপড়, জুতার কারখানার চামড়া, রেক্সিন ইত্যাদি।  ঘ. এমন জিনিস যা বিক্রি করে দেয়ার উদ্দেশ্য ক্রয় করা হয়েছে এবং সে ইচ্ছা এখনো বিদ্যমান আছে। যেমন, বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে ক্রয়কৃত জমি, বাড়ি, ফ্ল্যাট, প্লট,  ধান, আলু, পিঁয়াজ ইত্যাদি। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ফার্ণিচার বা বিক্রয়ের জন্য নয় এমন কোন কিছুতেই যাকাত নেই। যেমন, মাল তৈরির মেশিন, আলমারী ইত্যাদি।-ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া: ১৪/১২২

ভবিষ্যতে কোন কাজের উদ্দেশ্যে  জমা রাখা টাকার উপর যাকাত

ভবিষ্যতে হজ্জ, বিবাহ, গৃহ নির্মান কিংবা ব্যবসা-বাণিজ্য ইত্যাদি উদ্দেশ্যে জমাকৃত টাকা  ঐ উদ্দেশ্যে ব্যয় করে ফেলার পূর্বে বৎসর অতিবাহিত হয়ে গেলে সেগুলোর উপরও যাকাত আবশ্যক হবে। -ফাতাওয়ায়ে হাক্কানিয়া: ৩/৪৯৩

যাকাত কাকে দেয়া যাবে

ক. দরিদ্র অর্থাৎ যার কাছে নিত্যপ্রয়োজনের অতিরিক্ত সারে বায়ান্ন ভরি রূপার মূল্য পরিমাণ কোন সম্পদ নেই, তাকে যাকাত দেয়া যাবে। কিন্তু যদি প্রয়োজনের অতিরিক্ত যে কোন ধরণের সম্পদ সারে বায়ান্ন ভরি রূপার মূল্য পরিমাণ (৬৩ হাজার টাকা) থাকে চাই তার উপরে যাকাত আসুক বা না আসুক তাকে যাকাত দেয়া যাবে না।

খ. ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি  যার ঋণ পরিশোধের কোন ব্যবস্থা নেই।

গ. মুসাফির যার কাছে সফর কালের প্রয়োজনীয় অর্থ নেই। যদিও তার বাড়িতে সম্পদ থাকে না কেন।

ঘ. মাদ্রাসার গোরাবা ফান্ডে যাকাত দেয়া যাবে। এতে দ্বিগুণ সাওয়াব পাওয়া যায়। কেননা, এফান্ডে যাকাত দিলে একদিকে যাকাত আদায় হয় অপর দিকে দ্বীনের সহযোগিতা হয়। -সূরা তাওবা: ৬০

উল্লেখ্য, মসজিদে বা মাদ্রাসার সাধারণ ফান্ডে কিংবা নির্মাণ ফান্ডে যাকাত দেয়া যাবে না। অনুরূপ কোন ধরনের জনকল্যাণমূলক কাজেও যাকাত দেয়া যাবে না।- আলমগীরী: ১/১৮৮

যেসব সম্পদে যাকাত নেই

পূর্বে উল্লিখিত যাকাত যোগ্য সম্পদগুলো ছাড়া অন্য কোন সম্পদ যা যত মূল্যবানই হোক না কেন, তাতে যাকাত আসবে না। যেমন,

ক. হীরা-মুক্তা বা মূল্যবান পাথর পদার্থ যা ব্যবসার  জন্য নয়।

খ. ব্যবহারের কাপড়-চোপর।

গ. ব্যবহারের আসবাবপত্র। যেমন, ডেক, পাতিল, ফ্রিজ, কম্পিউটার ইত্যাদি।

ঘ. মিল ফ্যাক্টরী বা কারখানার মেশিনপত্র, মাল রাখার পাত্র।

ঙ. একাধিক বাড়ি-গাড়ি নিজের ব্যবহার বা ভাড়া দেয়ার জন্য হলে।

চ. ভাড়ায় খাটানো আসবাব পত্র।

ছ. থাকার উদ্দেশ্যে ক্রয়কৃত প্লট বা ফ্ল্যাট ইত্যাদি।  কিন্তু এই জিনিসগুলো যদি কারো মালিকানায় প্রয়োজনাতিরিক্ত থাকে এবং তার মূল্য সারে বায়ান্ন ভরি রূপার মূল্য পরিমাণ (৬৩০০০/=) হয় তাহলে সে দরিদ্র হলেও যাকাত গ্রহণ করতে পারবে না।

পোলট্রি ফার্মের যাকাত

পোলট্রি ফার্মে যে সকল মুরগী বা ডিম সরাসরি বিক্রির উদ্দেশ্যে থাকে তার মূল্যের উপর যাকাত প্রদান করতে হবে। কিন্তু যেসকল লিয়ার মুরগী ডিম উৎপাদনের জন্য রাখা হয়, সরাসরি বিক্রয়ের জন্য না হয়, সেগুলোর মূল্যের উপর যাকাত আসবে না। -দূররুল মুখতার: ২/২৭৩-২৭৪

মৎস্য খামারের যাকাত

কেউ যদি পুকুর বা হাউজ ইত্যাদিতে বিক্রির উদ্দেশ্যে মাছ বা মাছের পোনা ক্রয় করে ছাড়ে তাহলে সেগুলোরও বাজার মূল্য হিসাব করে যাকাত আদায় করতে হবে। -দূররুল মুখতার: ২/২৭৩-২৭৪

গরুর ফার্ম

ক. শুধু দুধ বিক্রির উদ্দেশ্যে করা হলে গরুর মূল্যের উপর যাকাত আসবে না।

খ. গরু সরাসরি বিক্রি করা উদ্দেশ্য হলে তার মূল্যমানের উপর যাকাত আবশ্যক হবে। -দূররুল মুখতার: ২/২৭৩-২৭৪

গার্মেনটসের যাকাত

গার্মেনটসের কাঁচামাল তথা কাপড়,সূতা ইত্তাদির উপর যাকাত আসবে , তবে এর মেশিনারি,যন্ত্রপাতি,আসবাবপত্র ইত্তাদির উপর  যাকাত  আসবে না।

ফসলের যাকাত তথা উশর

আমাদের দেশে যেসকল জমির সেচ বৃষ্টি বা নদীর পানিতেই সম্পন্ন হয় এবং সেচ কাজে ডিপটিউবয়েল বা অন্য কোন খরচ না লাগে তাহলে ফসল যে পরিমাণই হোক তার দশ ভাগের এক ভাগ এবং ডিপটিউবয়েলের মাধ্যমে সেচ দিতে হয় তাহলে বিশ ভাগের এক ভাগ যাকাত দেওয়া উচিৎ। একে উশর বলা হয়। উল্লেখ্য উশর আদায়ের ক্ষেত্রে সার, সেচ ও জমি চাষের খরচ বাদ না দিয়ে পূর্ণ ফসলের দশ কিংবা  বিশ ভাগের একভাগ উশর আদায় করতে হবে। -হেদায়া: ১/২০১-২০২

হারাম মালের উপর যাকাত

সুদ বা এ জাতীয় হারাম মাল সম্পূর্ণটাই মালিকের কাছে পৌঁছে দিতে হয় কিংবা সদকা করে দিতে হয়। তাই এর উপর যাকাতের প্রশ্নই আসতে পারে না। – শামী: ২/২৯১

যেসব আত্মীয়-স্বজনদেরকে যাকাত দেয়া যায় না

ক. নিজ পিতা-মাতা, দাদা-দাদী, নানা-নানী অর্থাৎ যাকাত দাতার সকল পিতৃকুল ও মাতৃকুলের সকল উর্ধ্বতন নারী-পুরুষকে যাকাত দেয়া যাবে না।

খ. স্বীয় ঔরষজাত  ছেলে মেয়ে, নাতী নাতনী, পরনাতী পরনাতনী,  অর্থাৎ নিজের অধস্তন সকল নারী-পুরুষকে যাকাত দেয়া যাবে না।

গ. স্বামী স্ত্রীকে এবং স্ত্রী স্বামীকে দিতে পারবে না। এছাড়া অন্য সকল দরিদ্র আত্মীয়-স্বজনকে যাকাত দেয়া যাবে। যেমন, ভাইবোন, চাচা-ফুফু, মামা- খালা, শশুর-শাশুরি, সৎ মা-সৎ বাবা, জামাতা পুত্রবধূ ইত্যাদি। -হেদায়া: ১/২০৬

 

Share

Comments are closed.