প্রচলিত ঈদে মীলাদুন্নবী স. এর শরয়ী হুকুম।

বরাবর, প্রধান মুফতি সাহেব

রাহমানিয়া মাদরাসা মুহাম্মদপুর, ঢাকা-1207

বিষয়: প্রচলিত ঈদে মীলাদুন্নবী স. এর শরয়ী হুকুম।

বিনীত নিবেদন এই যে, শরীয়তের দৃষ্টিতে ঈদে মীলাদুন্নবী স. এর হুকুম কী ? এবং এর উত্তপত্তি কখন থেকে হয় এবং কারা এর উদ্ভাবন করে।

দক্ষিন গোরান দারুস সালাম মসজিদের ইমাম সাহেব বলেন যে, ঈদে মীলাদুন্নবী স. মুসলমানদের সর্বশ্রেষ্ট ঈদ। যারা তা অস্বীকার করবে তারা কাফের। উক্ত ইমাম সাহেবের বক্তব্য সঠিক কিনা ? এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাবেন।

 

                                                                                                            নিবেদক

                                                                                                          মুহা. আব্দুল কাইয়ূম

                                                                                                           দারুস সালাম, ঢাকা।

بسْم الله الرّحْمن الرّحيْم

  ফত্ওয়া বিভাগ                                                                    তারিখ: 21/3/1434 হিজরি

জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া,সাত মসজিদ,মুহাম্মদপুর,ঢাকা-১২০৭,মোবাইলঃ ০১৮১৬৩৬৭৯৭৫    

 

حامدا و مصليا ومسلما

উত্তরঃ-

এ কথা সর্বজন বিদিত যে, সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মদ স. এর প্রতি গভীর ভালবাসা ও শ্রদ্ধা নিবেদন করা ঈমানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত তাঁর পবিত্র জীবনাদর্শ ও কর্মকান্ডের আলোচনার সাথে সাথে তাঁর অনুসরণ আল্লাহ তায়ালার রহমত প্রাপ্তির অন্যতম উপায় এবং গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতও বটে। তবে তা আমাদেরকে অবশ্যই সে পদ্ধতিতে করতে হবে, যে পদ্ধতি স্বয়ং নবী করীম স. তার সাহাবাদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন। যা বিভিন্ন হাদিস ও সীরাতের কিতাব সমূহে বর্ণিত রয়েছে।

উল্লেখ্য যে, হাদিস শাস্ত্র এমন একটি প্রমাণ সম্ভার যাতে ধর্মীয় সকল  বিষয় সহ মানব জীবনের ছোট বড় সকল কাজ করার শিক্ষা রয়েছে। এমনকি পেশাব-পায়খানা করার পদ্ধতি ও দিক নির্দেশনাও রয়েছে। বলাবাহুল্য যে, রাসূল স. এর জীবন চরিত নিয়ে আলোচনা করা এবং তাঁর প্রতি দরুদ পাঠ করার মত গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদতের পদ্ধতিও হাদিস, আসার তথা সাহাবাগণের উক্তি ও কর্ম পদ্ধতি দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত। আর হাদিস শরিফে এর প্রমাণ এভাবে পাওয়া যায় যে, দিন তারিখ ও সময় নির্ধারণ না করে এবং আনুষ্ঠিকতার বাধ্যবাধকতা ব্যতিরেকে কখনো কখনো রাসূল স. এর জীবনী আলোচনা করা এবং সর্বদা তাঁর ওপর দরুদ পাঠ করা। সুতরাং এ সম্পর্কে মনগড়া ভিত্তিহীন কোনো পদ্ধতি আবিস্কার করা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য ও অবশ্য বর্জনীয় বিষয়। রাসূলুল্লাহ স. ইরশাদ করেছেন, দ্বীনের যে কোনো বিষয়ে নতুন কিছু আবিস্কার করলে তা প্রত্যাখ্যান করা হবে। (বুখারী শরীফ-2/959)

তাই রাসূল স. এর জন্ম বৃত্তান্ত আলোচনা করা সাওয়াব ও বরকতের কাজ হলেও শরিয়ত সম্পর্কে অজ্ঞ লোকেরা ‘ঈদে মিলাদুন্নবী’ নামে ‍নির্দিষ্ট দিনে, বিশেষ পদ্ধতিতে যে অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে, তা কোরআন-হাদিস এবং সাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈন, তাবে তাবেঈনগণ থেকে প্রমাণিত না হওয়ায় তা অবশ্য পরিত্যাজ্য। কেননা, সাহাবা, তাবেঈনগণই ছিলেন প্রকৃত নবী প্রেমীক ও তাঁর আদর্শের যথাযথ অনুসারী ।

রবিউল আউয়াল মাসে পালিত প্রচলিত ঈদে মীলাদুন্নবী স. 604 হিজরীতে ইরাকের মুসিল শহরের বাদশাহ আবু সাঈদ মুজাফফার উদ্দীন কুকুরী ও তার এক দরবারী আলেম আবু খাত্তাব উমর ইবনে দিহইয়া এ দুজন মিলে আবিস্কার করে। এরা উভয়ে দ্বীনের ব্যাপারে খুবই উদাসীন এবং ফাসিক ছিলো। পরবর্তীতে অজ্ঞ ও মূর্খ লোকদের দ্বারা আরো অনেক শরিয়ত বিরোধী কর্মকান্ড এতে অনুপ্রবেশ করে। যার সব কিছুই কোরআন-হাদিস, ইজমা-কিয়াস তথা শরিয়তের মৌলিক সকল দলীলেরই পরিপন্থী। এসকল কারণেই সব যুগের হক্কানী আলেমগণ এক বাক্যে প্রচলিত ঈদে মিলাদুন্নবী ও মিলাদ মাহফিলকে নাজায়েয ও বিদআত বলেই ফত্ওয়া দিয়ে থাকেন।

তাই  প্রচলিত  ঈদে মিলাদুন্নবী সম্পর্কে উক্ত ইমাম সাহেবের বক্তব্য ভ্রান্তিপূর্ণ। বিশেষ করে ঈদে মীলাদুন্নবীর অস্বীকারকারীদের কাফের বলা চরম ধৃষ্টতা ও কুরুচিপূর্ণ। এজন্য তার তাওবা করা আবশ্যক।

كما أخرج الإمام البخاري فى صحيحه : (2/ 959)

عن عائشة رضي الله عنها قالت : قال رسول الله صلى الله عليه و سلم ( من أحدث في أمرنا هذا ما ليس فيه فهو رد).

وفى عمدة القاري شرح صحيح البخاري : (8/ 396)

والبدعة لغة كل شيء عمل علي غير مثال سابق وشرعا إحداث ما لم يكن له أصل في عهد رسول الله.

وفى مرعاة المفاتيح شرح مشكاة المصابيح : (1/ 395)

البدعة، وهي لغة: مأخوذة من الابتداع، وهو الاختراع على غير مثال سابق، وشرعاً: المحدث في الدين، أي ما لم يكن عليه أمره – صلى الله عليه وسلم – ولا أصحابه، أي ليس عليه أثارة من كتاب الله ولا من سنة رسوله، ولا فعله أو أمر به أصحاب رسوله، ويعتقد من الدين.

وفى العرف الشذي للكشميري : (2/ 82)

 المولود الذي شاع في هذا العصر وأحدثه صوفي في عهد سلطان إربل سنة ( 600 ) ولم يكن له أصل من الشريعة الغراء.

 وفى المولد : (ص: 21)

وقال الشيخ علي محفوظ : ” وأول من أحدث المولد النبوي بمدينة إربل الملك المظفر أبو سعيد في القرن السابع ، وقد استمر العمل بالموالد إلى يومنا هذا ، وتوسع الناس فيها وابتدعوا بكل ما تهواه أنفسهم وتوحيه إليهم شياطين الإنس والجن ، ولا نزاع في أنها من البدع.

وفى شذرات الذهب – ابن العماد : (5/ 138)

وأما احتفاله بمولد النبي فإن الوصف يقصر عن الإحاطة كان يعمله سنة في الثامن من شهر ربيع الأول وسنة في الثاني عشر لأجل الاختلاف الذي فيه فإذا كان قبل المولد بيومين أخرج من الإبل والبقر والغنم شيئا كثيرا يزيد على الوصف وزفها بجميع ما عنده من الطبول والمغاني والملاهي حتى يأتي بها الميدان .

وفى المدخل لإبن أمير الحاج : (2/3)

ومن جملة ما احدثوه من البدع مع اعتقادهم أن ذلك من اكبر العبادات واظهار الشعائر ما يفعلونه فى شهر ربيع الأول من المولد وقد احتوى على بدع ومحرمات جملة.

وفى فتاوى الأزهر: (6/ 237)

لأن عمل الموالد بالصفة التى يعملها الآن لم يفعله أحد من السلف الصالح ولو كان ذلك من القرب لفعلوه .

ويراجع أيضا :

                   فتاوى محموديه : 5/377 , اشرف الفتاوى : 1/426

والله اعلم بالصواب

محمد رفيق الاسلام عفى عنه

دار الإفتاء والإرشاد

بالجامعة الرحمانية العربية

سات مسجد محمد بور داكا- 1207

Share

বাস্তবতার আলোকে তাকলীদ

 

তাকলীদ একটি নিতান্তই মানুষের স্বভাবজাত বিষয়। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই দেখা যায় মানুষের তাকলীদ করার প্রবনতা। মূলত তাকলীদ ছাড়া মানুষের জীবন অচল। মানুষ নিজের স্বাস্থের চিকিৎসার মত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর বিষয় যাতে তার জীবন মরণের প্রশ্ন। সেখানেও দেখা যায় ডাক্তারের তাকলীদ করে থাকে। জীবনোপকরণ তৈরির ক্ষেত্রেও তাকলীদ করে থাকে ইঞ্জিনিয়ারের। ব্যক্তিগত বা সামাজিক জীবনে তাকলীদ করতে হয় অভিজ্ঞ ব্যক্তিবর্গের। এ ক্ষেত্রগুলোতে তাদের কাছে কোন প্রমাণ চাওয়া হয় না; বরং তাদের জ্ঞানের উপর সুধারণাবশত: তাদের কথার উপর আস্থা রেখে মেনে নেয়া হয়। এসব বিষয়ে তাকলীদ কারীগণ শুধু মাত্র এতটুকু দায়িত্ব পালন করে থাকে যে, তাদের দৃষ্টিতে একজন অভিজ্ঞ ব্যক্তি নির্বাচন করে। অবশ্য কেউ যদি অযোগ্য ব্যক্তিকে তাকলীদের জন্য নির্বাচন করে, তাহলে তা হয় নিন্দনীয়। বিষয়টি এতই স্পষ্ট যে, কেউ এতে দ্বীমত পোষণ করে না বা করার অবকাশ রাখে না। এতদ্বসত্ত্বেও বিপত্তি ঘটে কেবল দ্বীনী ও ধর্মীয় বিষয়াসয়ে। একদল লোক ধর্মীয় ব্যাপারে সব ধরণের তাকলীদের নিন্দায় লেগে আছে। মূলত এই বিরোধটির অনেকাংশই ভুল বুঝাবুঝির কারণে সৃষ্টি হয়েছে। বাসত্মবতার প্রতি লক্ষ্য করলে একথা প্রতিয়মান হয় যে, মূল ব্যত্তয়টি ঘটেছে তাকলীদকে সংজ্ঞায়িত করা নিয়ে। তাই আমার আলোচনা তাকলীদের পরিচয় ও সংজ্ঞার সাথে আবর্তিত হবে।

 

তাকলীদের পরিচয়:

তাকলীদের তিন ধরণের পরিচয় পাওয়া যায়। যথা-

. তাকলীদ বিরোধিরা যে পরিচয় দিয়ে থাকে। অর্থাৎ

التقليد هو رجوع إلى قول لاحجة لقائله عليه ـ كذا فى الجامع فى طلب العلم الشريف: ৩৫০

অর্থা: তাকলীদ হল এমন বক্তব্য গ্রহণ করা, যার বক্তার এর উপর কোন প্রমাণ নেই। তাকলীদের যত নিন্দা কুরআন ও হাদীসে উল্লেখ করা হয়, সবগুলো এই পরিচয়ের উপর ভিত্তি করে। কুরআনে কারীমে ইরশাদ হচ্ছে,

وَإِذَا قِيلَ لَهُمُ اتَّبِعُوا مَا أَنْزَلَ اللَّهُ قَالُوا بَلْ نَتَّبِعُ مَا أَلْفَيْنَا عَلَيْهِ آبَاءَنَا أَوَلَوْ كَانَ آبَاؤُهُمْ لَا يَعْقِلُونَ شَيْئًا وَلَا يَهْتَدُونَ (170)

অর্থাৎ, যখন তাদেরকে বলা হয় আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তা তোমরা অনুসরণ করো। তারা বলে, ‘না; রবং আমরা আমাদের পিতৃপুরুষদেরকে যার উপর পেয়েছি তার অনুসরণ করব। এমনকি তাদের পিতৃপুরুষগণ যদিও কোন কিছুই জ্ঞান এবং হেদায়াত প্রাপ্ত না হয়, তথাপিও? -সূরা বাকারা: ১৭০

اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِنْ دُونِ اللَّهِ وَالْمَسِيحَ ابْنَ مَرْيَمَ وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا إِلَهًا وَاحِدًا لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ سُبْحَانَهُ عَمَّا يُشْرِكُونَ (31)

তারা আল্লাহ ব্যতীত তাদের পন্ডিতগণকে ও সংসার বিরাগীগণকে তাদের প্রভূরূপে গ্রহণ করেছে।

আর প্রভুরূপে গ্রহণ করার উদ্দেশ্য হচ্ছে-

انهم حرموا عليهم الحلال وأحلولهم الحرام فاتبعوهم فذلك عبادتهم اياهم: تفسير ابن كثير:২/৪৫৮

অর্থ: তারা হালালকে হারাম করেছে আর হারামকে করেছে হালাল। আর অনুসারীরা তা গ্রহণ করে নিয়েছে। এটাই হল তাদের ইবাদত করা (প্রভূরূপে গ্রহণ করা)

অর্থাৎ, তারা যেভাবে নিজেদের খেয়াল খুশি মত ফতওয়া দিত অনুসারীরা সেভাবেই গ্রহণ করে নিত।

কিন্তু তাকলীদকে নিন্দা করে উদ্ধৃত এই দলীলগুলোর প্রতি গভীরভাবে দৃষ্টি দেই, তা হলে আমাদের কাছে প্রমাণিত হবে যে,

তাকলীদের ইত্তিবা বা ইতাআতের নিন্দায় যে সকল বর্ণনা পাওয়া যায় তার সবগুলোরই মূল কারণ হল দুটি। যথা:

. যাদের তাকলীদ করা হত তারা কিতাবুল্লাহকে ছেড়ে কিংবা তার স্পষ্ট বর্ণনার বিকৃত (تحريف) করে ফতওয়া দিত। যেমন-

وَمِنَ الَّذِينَ هَادُوا سَمَّاعُونَ لِلْكَذِبِ سَمَّاعُونَ لِقَوْمٍ آخَرِينَ لَمْ يَأْتُوكَ يُحَرِّفُونَ الْكَلِمَ مِنْ بَعْدِ مَوَاضِعِهِ يَقُولُونَ إِنْ أُوتِيتُمْ هَذَا فَخُذُوهُ وَإِنْ لَمْ تُؤْتَوْهُ فَاحْذَرُوا

অর্থ: এবং ইয়াহুদীদের মধ্যে যারা অসত্য শ্রবণে তৎপর, তোমার নিকট আসে না এমন এক ভিন্ন দলের পক্ষে যারা কান পেতে থাকে, শব্দগুলো যথাযথ সুবিন্যসত্ম থাকার পরও তারা সেগুলোর অর্থ বিকৃত করে। তারা বলে এই প্রকার বিধান দিলে করো এবঙ তা না দিলে বর্জন করো। সূরা মায়েদা: ৪১

 

আয়াতটি এ অংশে তাদের ফতওয়ার ধরণ স্পষ্ট যে যদি তাদের বিকৃত বিধান পাওয়া যায় তা হলে তারা গ্রহণ করবে নতুবা নয়।

বিষয়টি এর শানে নুযূল থেকে আরোও স্পষ্ট হয়। তাফসীরে ইবনে কাসীরে বুখারী শরীফ ও মুয়াত্তা ইমাম মালিকের বরাতে উল্লেখ করেছেন-

 إن اليهود جاءوا إلى رسول الله صلى الله عليه وسلم الخ تفسير ابن كثير ২/৮১

عن عبد الله بن عمر رضى الله عنه أن اليهود جاءوا إلى رسول الله صلى الله عليه وسلم فذكروا له أن رجلا منهم…… بإمرأة زنيا فقال له رسول الله صلى الله عليه وسلم ماتجدون فى التوراة فى شأن الرجم؟ فقالوا نفضحهم ويجلدون، قال عبد الله بن سلام: كذبتم ، إن فيها الرجم فأتوا بالتوراة، فأتوا بالتوراة فنشروها، فوضع احدهم يده على آية الرجم، فقرأ ماقبلها وما بعدها، فقال عبد الله بن سلام: إرفع يدك فرع يده، فإذا آية الرجم فقالوا: صدق يا محمدا فيها آية الرجم فأمر بهما رسول الله صلى الله عليه وسلم فرجما، فرأيت الرجل يحنى على المرأة يقيها الحجارة ـ رواه البخارى: ২/১০১১

অর্থ. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. বর্ণনা করেন যে, একবার নবী কারীম সা. এর দরবারে একদল ইয়াহুদী এসে বলল, তাদের এক পুরুষ ও এক নারী যিনা করেছে। নবী কারীম সা. তাদের জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা রজম সম্পর্কে তাওরাতে কী পাও? তারা বলল, আমারা তাদের লাঞ্চিত করি এবং বেত্রাঘাত করি। তখন আবদুল্লাহ ইবনে সালাম রা. (যিনি পূর্বে বিশিষ্ট ইয়াহুদী আলিম ছিলেন) বললেন, তোমরা মিথ্যা বলছ। নিশ্চয় তাওরাতে রজমের কথা রয়েছে। তোমরা তাওরাত নিয়ে আস! তারা তাওরাত এনে খুলল এবং তাদের একজন তার হাত রজমের আয়াতের উপর রেখে শুধু উপর নিচে পড়তে লাগল, তখন আবদুল্লাহ ইবনে সালাম রা. বললেন, তোমার হাত উঠাও! অতঃপর সে হাত উঠালে সেখানে রজমের আয়াত দেখা গেল, তখন ইয়াহুদীরা বলল, সত্য বলেছে হে মুহাম্মদ! সেখানে রজমের আয়াত রয়েছে। তাই রাসূল সা. সে দু’জনের ব্যাপারে রজমের ফায়সালা করলেন এবং তাদেরকে রজম করা হয়। (সাহাবী বলেন) আমি দেখেছি পুরুষটি নারীটিকে স্বীয় দেহ দ্বারা ঢেকে প্রসত্মরাঘাত থেকে রক্ষা করার চেষ্টা করছিল। -বুখারী: ২/১০১১

উপরোক্ত আয়াত ও হাদীস থেকে তাদের তাকলীদের নিষেধাজ্ঞার কারণ স্পষ্ট হয়ে গেল যে, তারা কিতাবুল্লাহর বিকৃত সাধন করে ফতওয়া দিত।

এছাড়া إتخذوا أحبارهم الخ এ আয়াতের তাফসীরে আল্লামা ইবনে কাসীর র. বলেন,

وقال السدى: إستنصحوا الرجال ونبذوا كتاب الله وراء ظهورهم ـ ابن كثير: ২/৪৫৯

তারা লোকদের থেকে উপদেশ নিত এবং কিতাবুল্লাহ পশ্চাদে নিক্ষেপ করত।-ইবনে কাসীর : ২/৪৫৯

. যাদের তাকলীদ বা ইত্তিবা’ করত তাদের সঠিক জ্ঞান ও হিদায়াত ছিল না। এজন্যই এই ধরনের তাকলীদকে নিন্দা করা হয়েছে।  যেমন- কুরআনে কারীমে ইরশাদ হয়েছে,

وَإِذَا قِيلَ لَهُمُ اتَّبِعُوا مَا أَنْزَلَ اللَّهُ قَالُوا بَلْ نَتَّبِعُ مَا أَلْفَيْنَا عَلَيْهِ آبَاءَنَا أَوَلَوْ كَانَ آبَاؤُهُمْ لَا يَعْقِلُونَ شَيْئًا وَلَا يَهْتَدُونَ (170)

     অর্থাৎ, যখন তাদের বলা হয় আল্লাহ তা’আলা যা অবতীর্ণ করেছেন তা তোমরা অনুসরণ করো। তারা বলে না; বরং আমরা আমাদের পিতৃপুরুষদের যাতে পেয়েছি তার অনুসরণ করব। এমনকি তাদের পিতৃপুরুষরা কোন কিছুর জ্ঞান রাখত এবং হিদায়াত প্রাপ্ত ছিল না তথাপিও?

এই আয়াত থেকে স্পষ্ট হয়ে গেল যে, তাদের পিতৃ-পুরুষেরা সঠিক পথ ও হিদায়াতপ্রাপ্ত ছিল না। আর এজন্যই তাদের অনুসরণ ও তাকলীদ নিষিদ্ধ। কিন্তু যদি তারা পথ হিদায়াতপ্রাপ্ত হতো এবং কিতাবুল্লাহর পরিবর্তন সাধন না করতো, তা হলে কখনো তাদের অনুসরণ নিন্দনীয় হতো না। যেমন নবী কারীম সা. খুলাফায়ে রাশেদীনের মত ও পথের অনুসরণ করতে বলেছেন। যারা হলেন আমাদের পূর্ব-পুরুষ। আর এটা এই জন্য যে, তারা ছিলেন হিদায়াতপ্রাপ্ত ও কিতাবুল্লাহর সংরক্ষক। মাযহাবপন্থীগণ যে ইমামগণের তাকলীদ করে থাকেন, তাদের কেউই কিতাবুল্লাহর বিকৃতি করেননি। আর তারা গোমরাহ ও পথভ্রষ্টও ছিলেন না। তাদের ব্যাপারে বড় বড় মুহাদ্দিসের প্রশংসা সুলভ বক্তব্যই এর উজ্জ্বল প্রমাণ।

. আমরা যে তাকলীদ গ্রহণ করে থাকি তার পরিচয় হচ্ছে-

التقليد إتباع الغير على ظن أنه محق بلا نظر فى الدليل ، كذا فى حسامى فى شرح النامى : ১৯০

‘ কারো হকপন্থী হওয়ার ব্যাপারে প্রবল ধারণা থাকার ভিত্তিতে দলীল না দেখে তার অনুসরণ করা’। এই পরিচয় প্রমাণহীন কোন বক্তব্যের বক্তার অনুসরণ উদ্দেশ্য নয়। কারণ, প্রমাণহীন বক্তব্যের বক্তা কখনো হক হতে পারে না।

এই সংজ্ঞাটিতে কয়েকটি বিষয় আলোচিত হয়েছে। যার প্রতিটির উপর রয়েছে জাজল্যমান দলীল। যেমন- এই সংজ্ঞায় যে ইত্তিবার কথা বলা হয়েছে, তা সাধারণ মানুষের জন্য অত্যাবশ্যক। কারণ, কুরআনে কারীমে ইরশাদ হচ্ছে,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنْكُمْ (59)

‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহ তা’আলার আনুগত্য করো এবং রাসূল ও তোমাদের মধ্যে ব্যবস্থাপনার দায়িত্বপ্রাপ্তদের আনুগত্য করো। -সূরা নিসা: ৫৯

এ আয়াতে أُولِي الْأَمْرِ দ্বারা উদ্দেশ্য নির্ধারণে আল্লামা ইবনে কাসীর র. হযরত ইবনে আববাস রা. থেকে তাফসীর উল্লেখ করত: বলেন,

 عن إبن عباس وأولى الأمر منكم يعنى أهل الفقه والدين وكنا قال مجاهد وعطاء والحسن البصرى وابو العالية وأولى الأمر منكم يعنى العلماء والظاهر والله اعلم

হযরত ইবনে আববাস রা. থেকে বর্ণিত, أُولِي الْأَمْرِ দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে ফিকহ ও দীনওয়ালা। উল্লেখ্য কেউ কেউ أُولِي الْأَمْرِ এর ব্যাখ্যায় শাসকশ্রেণিকেও অমত্মর্ভুক্ত করেছেন। সেক্ষেত্রেও উলামায়ে কেরামকে এর উদ্দেশ্য থেকে বাদ দেয়া হয়নি।

আল্লামা ইবনে কাসীর তার তাফসীর গ্রন্থে বলেন,

تفسير ابن كثير২/ ৩৪৫

 والظاهر – والله أعلم-أن الآية في جميع أولي الأمر من الأمراء والعلماء،

অর্থাৎ একথা স্পষ্ট যে, আয়াতটি সকল أولي الأمر অর্থাৎ শাসক ও উলামা সকলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। (আল্লাহ ভালো জানেন।)

অপর আয়াতে ইরশাদ হচ্ছে,

فاسئلوا أهل الذكر إن كنتم لاتعلمون سورة النحل : ৪৩

‘তোমরা যদি না জান, তাহলে জ্ঞানীদের জিজ্ঞেস করো। -সূরা নাহল: ৪৩

এধরনের তাকলীদকে আবশ্যক সাব্যসত্ম করলে একথা বলতে হয় যে, দলীল জানা সকলের উপর আবশ্যক বিষয় নয়;

বরং কিছু লোক জানবে তারা অন্যদেরকে শুধুমাত্র বিধান বলে সতর্ক করে দিবে। বক্তব্যটি অত্যমত্ম গ্রহণযোগ্য। যা কুরআনে কারীম থেকে প্রমাণিত । আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন-

فَلَوْلَا نَفَرَ مِنْ كُلِّ فِرْقَةٍ مِنْهُمْ طَائِفَةٌ لِيَتَفَقَّهُوا فِي الدِّينِ وَلِيُنْذِرُوا قَوْمَهُمْ إِذَا رَجَعُوا إِلَيْهِمْ لَعَلَّهُمْ يَحْذَرُونَ (122)

তাদের প্রত্যেক দলের এক অংশ বাইরে বের হয় না কেন? যাতে তারা দীন সম্বন্ধে জ্ঞানানুশীলন করতে পারে এবং তাদের সম্প্রদায়কে সতর্ক করতে পারে, যখন তারা তাদের নিকট ফিরে আসবে, যাতে তারা সতর্ক হয়।

এ আয়াত দ্বারা বুঝা যাচ্ছে সবার জন্য দলীলে চিমত্মা-ভাবনা করা আবশ্যক নয়; বরং এ কাজের জন্য শুধু একটি নির্দিষ্ট দল থাকাই যথেষ্ট।

সবার জন্য দলীল জানা আবশ্যক না হওয়া সংক্রামত্ম প্রমাণে অনেক হাদীসও রয়েছে। যেমন-

عن أبى هريرة رضـ قال قال: رسول الله صلى الله عليه وسلم من افتى بغير علم كان إثمه على من أفتاه ـ رواه ابو داؤد : ২/৫১৫- باب النوفى فى الفتيا

যে ব্যক্তি ইলম ছাড়া ফতওয়া দিবে এর গোনাহ তার উপরই বর্তাবে যে ফতওয়া দিয়েছে। -আবু দাঊদ: ২/৫১৫৮

যদি দলীল জিজ্ঞেস করা আবশ্যক হত, তাহলে এর গোনাহ শুধু মুফতীর না হয়ে উভয়ের হত। সুতরাং যখন শুধু মুফতীর উপর দোষারোপ করা হচ্ছে, বুঝা গেল অপর জনের দলীল না জানা দোষণীয় নয়।

এসংজ্ঞাটিতে বলা হয়েছে, যোগ্য ব্যক্তি যে মতামত পেশ করেছেন, তা হক- এই বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে সুক্ষ্ণ দলীল-পমাণ অনুসন্ধান না করেও তার কথা মতো আমল করা যায় বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। আর এর স্বপক্ষেও প্রমাণ বিদ্যমান রয়েছে। যেমন-

عن عبد الله بن عمر رضـ قال: قيل لعمر لاتستخلف قال ان استخلف ، فقد استخلف من هو خير منى أبو بكر وان اترك فقد ترك من هو خير منى رسول الله صلى الله عليه وسلم ـ رواه البخارى : ২/১০৭২

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, হযরত উমর রা. কে বলা হল, আপনি কেন খলীফা বানিয়ে যান না? তিনি বললেন, যদি খলীফা বানাই তাহলে কোন সমস্যা নেই। কেননা, আমার থেকে যিনি উত্তম আবু বকর তিনি খলীফা বানিয়েছিলেন। পক্ষামত্মরে যদি ছেড়ে দেই, তাহলেও কোন সমস্যা নেই। কেননা, আমার চেয়ে উত্তম ব্যক্তি নবী কারীম সা. তা ছেড়ে দিয়েছিলেন। -বুখারী: ২/১০৭২

এ হাদীসে দেখা গেল, হযরত ওমর রা. হযরত আবু বকর রা.কে  শুধু মাত্র হক হওয়ার উপর বিশ্বাস রেখে তার কর্মপদ্ধতির উপর আমল করদে কোনো সমস্যা নেই বলে ব্যক্ত করলেন।

إن أهل المدينة سألوا إبن عباس رضـ عن إمرأة طافت ثم حاضت ، قال لهم تنفر قالوا لانأخذ بقولك وندع قول زيد ـ رواه البخارى : ১/২৩৭

 হযরত ইবনে আববাস রা. এর নিকটে মদীনা বাসীগণ সে নারী সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন, যে তাওয়াফ করার পর ঋতুবতী হয়ে গেল। তিনি তাদেরকে বললেন, সে চলে যাবে। তারা বলল, আমরা যায়দ বিন সাবিতের কথা ছেড়ে আপনার কথা গ্রহণ করব না। -বুখারী: ১/২৩৭

দেখুন, এই বিশুদ্ধ বর্ণনাটিতে হযরত ইবনে আববাস রা. এর বক্তব্যকে প্রত্যাখ্যান করে হযরত যায়েদ ইবনে ছাবেত রা. এর বক্তব্যকে – তিনি হক হওয়ার বিশ্বাস রেখেই বর্জন করতে অস্বীকার করে ফেললেন। এখানে মদীনাবাসীগণ কোনো দলীলে দৃষ্টি দেননি। এটা স্পষ্ট তাকলীদ ও সম্পূর্ণ التقليد الشخسى বা ব্যক্তি তাকলীদ।

তা ছাড়া দলীলে গভীর দৃষ্টি দেয়া সকলের সম্ভবও নয়। এবং সকলে দলীলের নিগুঢ় অর্থ বুঝতেও সক্ষম নয়। বিষয়টি অত্যমত্ম স্পষ্ট যার দলীলের প্রয়োজন হয় না। এতদসত্ত্বেও ব্যাপারটি প্রামাণসিদ্ধ করেই আমরা উল্লেখ করলাম। অবশ্য একটি আয়াত নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয় যে,

وَلَقَدْ يَسَّرْنَا الْقُرْآنَ لِلذِّكْرِ فَهَلْ مِنْ مُدَّكِرٍ} [القمر: 17])  -

 কুরআনকে আমি সহজ করে দিয়েছি উপদেশ গ্রহণের জন্য। অতএব, উপদেশ গ্রহণকারী কেউ আছে কি? সূরা ক্বমার: ১৭

এই আয়াত থেকে বুঝা যাচ্ছে কুরআনে কারীম সহজ, যা সকলেই বুঝতে সক্ষম।

এর উত্তর হল, কুরআন সহজ হওয়ার অর্থ হচ্ছে, এর তিলাওয়াত ও বাহ্যিক অর্থ সহজ। কিন্তু এর আভ্যমত্মরীণ নিগুঢ় অর্থ সকলেই বুঝতে পারে না; বরং এক শ্রেণীর গভীর জ্ঞানীরাই কেবল বুঝতে পারে। তাফসীরে ইবনে কাসীরে এব্যাপারে স্পষ্ট বর্ণনা রয়েছে।

قال السدى بسرنا تلاوته على الالسن ، وقال الضحاك عن إبن عباس: لولا أن الله يسره على لسان آميين ماإستطاع أحد من الخلق ان يتكلم بكلام الله عز وجل ، قلت من تيسره تعالى على الناس تلاوته ـ 4/336

সুদ্দী বলেন, আমি মুখে এর পাঠ সহজ করেছি। হযরত যাহ্হাক হযরত ইবনে আববাস রা. থেকে বর্ণনা করেন, যদি আল্লাহ তা’আলা মানুষের মুখে সহজ না করতেন, তাহলে কোন সৃষ্টজীব আল্লাহ কালাম উচ্চারণ করতে পারত না। আমি বললাম, আল্লাহ তা’আলা সহজ করণের অর্থ হল, তা তিলাওয়াত করা মানুষের উপর সহজ করা। ৪/৩৩৬

কুরআনের গভীর অর্থ বুঝা যদি সহজ হত, তাহলে কোন সাহাবীর তা বুঝতে ভুল হওয়ার কথা ছিল না। কারণ তারা ছিলেন আরবী এবং কুরআন তাদের মাতৃভাষায় অবতীর্ণ হয়েছে। অথচ বাসত্মবতা হল সাহাবায়ে কিরামেরও কখনো কখনো কুরআনের কিছু বিষয় বুঝার ক্ষেত্রে অসুবিধা হয়েছে।  এর একটি উজ্জ্বল দৃষ্টামত্ম হল-

 لكم الخيط الأبيض من الخيط الأسود ، قال أخذت عقالا أبيض وعقالا أسود فوضعتهما تحت وسادتى فنظرت فلم أتبين فذكرت ذلك لرسول الله صلى الله عليه وسلم فضحك فقال: إن وسادتك إذا لطويل عريض إنما هو الليل والنهار، وقال عثمان إنما هو سواد الليل وبياض النهار ـ روه ابو داؤد : ১/৩২১

হযরত আদী ইবনে হাতিম রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, যখন -حتى يتبين لكم الخيط الأبيض من الخيط الأسود – এ আয়াতটি অবতীর্ণ হল, তখন আমি একটি সাদা সূতা নিলাম এবং একটি কাল সূতা নিলাম। অতঃপর তা আমার বালিশের নিচে রাখলাম। কিন্তু তা দেখে পার্থক্য করতে পারলাম না। ফলে বিষয়টি রাসূল সা. এর নিকট বললে তিনি হেসে উঠলেন এবং বললেন, তাহলে তো তোমার বালিশটি অনেক লম্বা চওড়া। এটাতো কেবল রাতদিন। আবু দাউদ: ১/৩২১

দেখুন, কুরআনের সব অর্থ সকলের জন্য যদি বোধগম্য হতো, তা হলে এখানে সাহাবী কেন বুঝতে পারলেন না?

 

. তাকলীদের আরেকটি পরিচয় আছে যার দুটি ব্যাখ্যা করা যায়-

পরিচয়টি হল- التقليد هو قبول القول من غير دليل (كذا فى الفقيه والمتفقه للخطيب : ২/৬৬) তাকলীদ বিরোধিগণ من غير دليل এর সম্পর্ক القول এর সাথে করে থাকে, ফলে এর অর্থ দাঁড়ায়- দলীলহীন বক্তব্য গ্রহণ করা।

এ অর্থ মুতাবিক এ সংজ্ঞাটি প্রথম সংজ্ঞারই সমার্থক হয়, যা শরীয়তের দৃষ্টিতে নিষিদ্ধ এবং আমরাও তাকলীদের এ অর্থ করি না।

আর যদি (من غير دليل)      এর সম্পর্ক قبول     এর সাথে করা হয়, তাহলে তা আমাদের সংজ্ঞার সমার্থক হবে, যা গ্রহণযোগ্য। তখন অর্থ দাঁড়াবে ‘কারো কথা দলীল বিহীন গ্রহণ করা’ অর্থাৎ, বাসত্মবে দলীল আছে, তবে গ্রহণ করার সময় দলীল চাওয়া হয় না।

উপরোক্ত আলোচনা থেকে দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট হয়ে গেল যে, মাযহাবপন্থীগণ যে তাকলীদ বা ইত্তিবার কথা বলেন, তা সম্পূর্ণ কুরআন ও হাদীস মোতাবেক একটি বিষয়। যা অস্বীকার করা হটকারিতা বৈ কিছু নয়। এবং এর বিরোধীগণ যে তাকলীদের নিন্দা করে থাকে এবং তার উপর যে সকল প্রমাণাদি পেশ করে, তা মাযহাবপন্থীদের তাকলীদ থেকে সম্পূর্ণরূপে ভিন্ন। তাই ঐসকল দলীল দিয়ে তাদের দোষারোপ করা সম্পূর্ণই অপাত্রেরোদন। আল্লাহ তাআলা সকলকে বুঝার তাওফীক দিন।

 লেখক,

- মু.তাউহীদুল ইসলাম

উস্তাদ, দারুল ইফতা,

জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া.

সাত মসজিদ, মুহাম্মদপুর,

 ঢাকা-১২০৭।

Share

ডা. জাকির নায়েক : দারুল উলূম দেওবন্দের ফতোয়া

ডা. জাকির নায়েক :


দারুল উলূম দেওবন্দের ফতোয়া

মূল : যয়নুল ইসলাম কাসেমী ইলাহাবাদী

নায়েবে মুফতি দারুল উলূম দেওবন্দ

 

অনুবাদ : মুফতি তাউহীদুল ইসলাম

উস্তাদ দারুল ইফতা

জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া

সাত মসজিদ মুহাম্মদপুর,ঢাকা

 

ডা. জাকির নায়েকের বয়ানসমূহে বিশুদ্ধ আকীদা থেকে বিচ্যুতি, কুরআনে কারীমের তাফসির বিকৃতি ও মনগড়া ব্যাখ্যা এবং সাইন্সের গবেষণা দ্বারা প্রভাবিত হওয়া    ইসলামবিরোধী পাশ্চাত্যের চিন্তা-চেতনার সাথে সম্পর্ক এবং ফিকহী মাসায়েলে সালফে সালেহীন ও জুমহুরের পথ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়ার মতো বিভ্রান্তকারী বিষয়াদি পাওয়া যায়।

এছাড়া তিনি মুসলিম উম্মাহকে আইম্মায়ে মুজতাহিদীনের ইত্তিবা থেকে ফেরানো, দীনী মাদরাসা সমূহের প্রতি বীতশ্রদ্ধ করা এবং হক্কানী উলামায়ে কেরামের ব্যাপারে জনসাধারণকে কুধারণার বশীভূত করাতে লিপ্ত। নিচে তার বিভ্রান্তকারী বিষয়াদির কিছু দৃষ্টান্ত দেয়া হলো-

 

১. আকীদা (যা অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি বিষয় যাতে সামান্য বিচ্যুতি অনেক সময় ঈমানের জন্য হুমকি  হয়ে দাঁড়ায়)

এ সম্পর্কে ডা. সাহেবের কিছু কথা-

 

ক. আল্লাহ তায়ালাকে বিষ্ণু ও ব্রহ্ম নামে ডাকা বৈধ।

 

ডা. সাহেব একটি প্রোগ্রামে বলেন- ‘আল্লাহ তায়ালাকে হিন্দুদের

উপাস্যদের নামে ডাকা বৈধ, যেমন বিষ্ণু ‘রব’ এবং ব্রহ্ম ‘সৃষ্টিকর্তা’ তবে শর্ত হলো বিষ্ণুর ব্যাপারে এই বিশ্বাস রাখতে পারবে না যে তার চারহাত আছে যে পাখির ওপর আরোহণ করে আছে।’

[ইসলাম আউর আলমী উখুওয়াত-৩৩ ডা. জাকির নায়েক]

অথচ অনারবি ভাষায় ঐ সকল শব্দাবলী দিয়েই কেবল ডাকা বৈধ যা আল্লাহ তা’য়ালার জন্যই বিশেষায়িত। এগুলো ছাড়া অন্যকোনো নামে ডাকা বৈধ নয়। তাহলে বিষ্ণু ও ব্রহ্ম যা হিন্দুদের প্রতীক এগুলো দিয়ে ডাকা কিভাবে বৈধ হতে পারে?

 

খ. আল্লাহ তায়ালার কালাম কোনটি তা পরখ করার জন্য বিজ্ঞান ও টেকনোলোজির আশ্রয় নেয়া আবশ্যক।

 

ডা. সাহেব একটি প্রোগ্রামে বলেন- প্রত্যেক মানুষ এটা মনে করে যে তার পবিত্র গ্রন্থই আল্লাহ তায়ালার কালাম। যদি আপনি জানতে চান যে কোনো গ্রন্থটি বাস্তবিক পক্ষেই আল্লাহর কালাম তাহলে তাকে চূড়ান্ত পরীক্ষা তথা আধুনিক বিজ্ঞান ও টেকনোলজির সাহায্য নিন। যদি তা আধুনিক বিজ্ঞান মোতাবেক হয় তাহলে মনে করুন এটা আল্লাহর কালাম।’

এই বক্তব্যটি থেকে ডা. সাহেবের বিভ্রান্তকারী ধৃষ্টতা! কিতাবুল্লাহর ব্যাপারে তার চিন্তা-চেতনার পথ ভ্রষ্টতা ও আধুনিক বিজ্ঞানের ব্যাপারে আশংকাজনক পর্যায়ে প্রভাবান্বিত হওয়ার ঠিকানা পাওয়া যায়। কেননা তিনি প্রতি মুহূর্তে পরিবর্তনশীল বৈজ্ঞানিক গবেষণার দিকে আসমানী কিতাবসমূহ বিশেষত; ঐশী কালাম কুরআনে কারীমের যাচাইয়ের মানদন্ড সাব্যস্ত করেছেন। অথচ আল্লাহ তায়ালার কালাম হওয়ার সবচেয়ে বড় প্রমাণ এর অলৌকিকত্ব যার মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা বিভিন্ন জায়গায় চ্যালেঞ্জ করেছেন।

 

গ. ফতোয়া দেয়ার অধিকার যে কোনো ব্যক্তির রয়েছে।

 

ডা. সাহেব এক জায়গায় বলেন- প্রত্যেকের জন্য ফতোয়া প্রদান করা জায়েয। কারণ ফতোয়ার অর্থ হলো মতামত দেয়া।’

ফতোয়া দেয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। আল্লামা ইবনুল কাইয়্যুমের ভাষায় মুফতি আল্লাহ তায়ালার বিধান বর্ণনা করার ক্ষেত্রে বিশ্বজগতের প্রতিপালকের ভাষ্যকার এবং তার স্থলাভিষিক্ত হিসেবে দস্তখত করার দায়িত্বশীল হয়।’দেখুন [ই’লামুল মাআক্কিঈন ১/৯১]

এই ফতোয়াকে তিনি ‘মতামত দেয়ার’ মতো হালকা পাতলা শব্দ দ্বারা ব্যক্ত করে শুধু নিজের জন্যই নয়; বরং প্রত্যেকের জন্য এর বৈধতা দিচ্ছেন। অথচ কুরআনে কারীমে বলা হয়েছে-

‘যদি তোমাদের জ্ঞান না থাকে তাহলে জ্ঞানীদের জিজ্ঞাসা কর।’

নবীজি সা. এর হাদিসে উল্লেখ হয়েছে- ‘যে ব্যক্তি (বিশুদ্ধ) জ্ঞান ছাড়া ফতোয়া দেয় এর গুনাহ ফতোয়া দাতার ওপর হবে।’ [আবু দাউদ হাদিস নং ৩৬৫৯৩]

তিনি এই আয়াত ও হাদিসকে একেবারেই ভুলে গেলেন।

 

২. তাফসীরুল কুরআনের ক্ষেত্রে মনগড়া ব্যাখ্যা অর্থাৎ অর্থগত বিকৃতি।

 

কুরআনে কারীমের তাফসিরের বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। কেননা মুফাসসিরগণ কুরআনে কারীমের আয়াত দ্বারা আল্লাহ তায়ালার উদ্দেশ্য নির্ধারণ করে থাকেন- যে আল্লাহ তায়ালা এই অর্থ উদ্দেশ্য নিয়েছেন। অতএব অনুপযুক্ত ব্যক্তির এই ময়দানে কদম রাখা খুবই আশংকাজনক। হাদিস শরীফে ইরশাদ হয়েছে- ‘যে ব্যক্তি নিছক তার যুক্তি দিয়ে তাফসির করে সে ঘটনাক্রমে সঠিক অর্থ করে ফেললেও সে ভুলকারী সাব্যস্ত হবে।’  [তিরমিযি- হাদিস নং ২৭৭৬]

এ কারণে মুফাসসিরগণের জন্য অনেক শর্ত রয়েছে। যেমন কুরআনে কারীমে সমস্ত আয়াতের প্রতি গভীর দৃষ্টি, হাদিসের ভান্ডারের ব্যাপারে গভীরজ্ঞান আরবি ভাষা ও ব্যকরণ যথা- নাহু, সরফ, ইশতিকাক, ফাসাহাত­-বালাগাত ইত্যাদির ওপর ভালো পান্ডিত্য থাকা ইত্যাদি। যতোদূর জানা যায়, ডা. সাহেবের মধ্যে উল্লেখিত শর্তাবলীর অনেকগুলোই আবশ্যকীয় পর্যায়ে নেই। তিনি আরবি ভাষা ও ব্যাকরণ সমন্ধে যথাযথ অবগত নন। হাদিসের ভান্ডারের ওপর তার গভীর দৃষ্টি নেই। অনুরূপ ফাসাহাত- বালাগাতেও তার নেই তেমন জ্ঞান। (নিম্নে দৃষ্টান্তগুলোতে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যাবে) বরং তাফসীরের ক্ষেত্রে তার মধ্যে গোমরাহীর অনেক কারণ রয়েছে যথা -

নবীজি সা. সাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈন ও তাবে তাবেঈনের তাফসির থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়া। যুগের ধ্যান ধারণা দ্বারা প্রভাবিত কুরআনে কারীমের বিষয়কে ভুল বুঝা ইত্যাদি ডা. সাহেবের মধ্যে পরিপূর্ণভাবে বিদ্যমান। এজন্যই তিনি বেশ কিছু আয়াত নিয়ে তার অজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছেন। নিচে তার কিছু নমুনা লক্ষ্য করুন-

 

ক. কুরআনে কারীমের আয়াত-

{الرِّجَالُ قَوَّامُونَ عَلَى النِّسَاءِ بِمَا فَضَّلَ اللَّهُ بَعْضَهُمْ عَلَى بَعْضٍ وَبِمَا أَنْفَقُوا مِنْ أَمْوَالِهِمْ} [النساء: ৩৪]

‘আররিজালু কাওয়ামুনা আলান্নিসা’

 

এই আয়াতের তাফসীরে ডা. সাহেব বলেন- লোকেরা বলে  قَوَّامُونَ ‘কাওয়ামুন’ শব্দটির অর্থ একস্তর উঁচু মর্যাদা। অথচ মূলত : এই শব্দটি  اقامة‘ইকামাতুন’ থেকে উদ্ভুত হয়েছে, যার অর্থ হচ্ছে দন্ডায়মান হওয়া তাই এর উদ্দেশ্য হচ্ছে দায়িত্বের দিক দিয়ে উঁচু মর্যাদার দিক দিয়ে নয়। [ খুতুবাতে জাকির নায়েক : ২৯০]

ডাক্তার সাহেব পাশ্চাত্যের সমতার ধ্যান ধারণার স্বপক্ষে কুরআনের আয়াতের মনগড়া ব্যাখ্যা করে পুরুষদের এক স্তর মর্যাদাকে নাকচ করে দিলেন অথচ উম্মাহর বড় বড় মুফাসিসরগণ মর্যাদার দিক দিয়ে উঁচু হওয়ার অর্থ ব্যক্ত করেছেন। যেমন ইবনে কাসীরে লিখেছেন- পুরুষের অবস্থান তার স্ত্রীর সামনে শাসক ও সরদারের মতো। প্রয়োজন হলে স্বামী-স্ত্রীকে সমুচীন শাস্তিও দিতে পারে। অনুরূপ

{ وَلِلرِّجَالِ عَلَيْهِنَّ دَرَجَةٌ وَاللَّهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ } [البقرة: ২২৮]

‘লিররিজালি আলাইহিন্না দারাজাহ’

এই আয়াতের তাফসীরে আল্লামা ইবনে কাসির লিখেছেন- ‘স্বামী স্ত্রী থেকে মর্যাদা, সম্মান ও আনুগত্য ইত্যাদির ক্ষেত্রে এক   স্তর ওপরে’ অনুরূপ ডা. সাহেবের তাফসিরটি নবীজি রা. এর হাদিসের পরিপন্থি। হাদিসটি হলো- নবীজি সা. বলেন- ‘আল্লাহ তায়ালা ছাড়া আর কারো জন্য সেজদা বৈধ হলে আমি নারীদেরকে নির্দেশ দিতাম তারা যেনো তাদের স্বামীদের সেজদা করে।’ [আবু দাউদ ২১৪০]


কেননা যদি উভয়ের মর্যাদা এক হতো এবং স্বামীর জন্য স্ত্রীর ওপর কোনো প্রাধান্য না থাকতো তাহলে নবীজি সা. নারীদের তাদের স্বামীদের চূড়ান্ত সম্মানের প্রতীক সেজদা করার নির্দেশ দেয়ার উপক্রম কেন হলেন?

 

খ. ডা. সাহেবকে প্রশ্ন করা হয়েছিলো। কুরআনে কারীমের মধ্যে আছে। কোনো মায়ের জরায়ুতে বিদ্যমান বাচ্চার লিঙ্গ কেবলমাত্র আল্লাহ তায়ালাই জানেন। অথচ বর্তমান বিজ্ঞান যথেষ্ট উন্নতি করেছে। এখন আমরা অতি সহজেই আল্ট্রাসনোগ্রাফির মাধ্যমে ভ্রুণ নির্ধারণ করতে সক্ষম। তাহলে এই আয়াতটি কি মেডিকেল সাইন্সের পরিপন্থি নয়। এর জবাবে তিনি বলেন, একথা ঠিক যে কুরআনের এই আয়াতের বিভিন্ন অনুবাদ ও ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে বলা হয়েছে যে কেবল মাত্র আল্লাহই জানেন যে মায়ের জরায়ুতে বিদ্যমান বাচ্চার লিঙ্গ কি? কিন্তু এই আয়াতের আরবি টেক্সটটি পাঠ করুন সেখানে  সেক্স [লিঙ্গের] কোনো আরবি বিকল্প শব্দ ব্যবহৃত হয়নি। মূলত: কুরআন যা বলছে তা হলো- জরায়ুতে কি আছে? এর জ্ঞান কেবল মাত্র আল্লাহ তায়ালার রয়েছে। অনেক মুফাসসির ভুল বুঝে বসেছেন, তারা এর অর্থ এই করেছেন যে কেবলমাত্র আল্লাহ তায়ালাই মায়ের পেটে বাচ্চার লিঙ্গ সমন্ধে জানেন। এটা ঠিক নয়। এই আয়াত ভ্রণের লিঙ্গের দিকে ইঙ্গিত করছে না এবং এর ইঙ্গিত এই দিকে যে মায়ের পেটে বিদ্যমান বাচ্চার স্বভাব কেমন হবে? সে তার মা বাবার জন্য রহমতের কারণ হবে? না আজাবের কারণ হবে? ইত্যাদি।

[ইসলাম পর চালিস এ'তেরাযাত : [১৩০]

 

ডা. সাহেব বৈজ্ঞানিক গবেষণায় প্রভাবিত হয়ে এ আয়াত থেকে আপাত দৃষ্টিতে সৃষ্ট প্রশ্ন থেকে বাঁচার জন্য কুরআনের অন্যান্য আয়াত এবং সাহাবা ও তাবেঈন থেকে বর্ণিত তাফসীরকে পৃষ্ঠদেশে নিক্ষেপ করে একটি প্রসিদ্ধ অর্থকে অস্বীকার করে বসেছেন এবং বড় বড় মুফাসসিরগনের ওপর দোষারূপ ও তাদের তাফসিরকে ভুল সাব্যস্ত করেছেন। ডা. সাহেব যে অর্থ উল্লেখ করেছেন তা ‘মা’ ইসমে মাউসূল-এর ব্যাপকতায় তো আসতে পারে এবং অনেক মুফাসসিরগণ প্রথম অর্থের মধ্যে এই অর্থও উল্লেখ করেছেন। কিন্তু অপর অর্থকে অস্বীকার করা একেবারেই ঠিক নয়। বরং এটা ডা. সাহেবের খেয়ালিপনা এবং তাফসীরের ক্ষেত্রে সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেঈনের উক্তি থেকে বিমুখ হওয়ার স্পষ্ট প্রমাণ। কেননা ডা. সাহেব যেই অর্থকে নাকচ করে দিয়েছেন তার দিকেই ইঙ্গিত করছে সূরা রা’আদের এই আয়াত- ‘আল্লাহ জানেন প্রত্যেক নারী যা গর্ভধারণ করে এবং গর্ভাশয়ে যা সংকুচিত হয় ও বর্ধিত হয়।

[রা’আদ ৮]

এছাড়া প্রখ্যাত তাবেঈ ও তাফসীরের ইমাম হযরত কাতাদাহ রহ. থেকে এই অর্থই বর্ণিত আছে। যেমন : হযরত কাতাদাহ রহ. বলেন- ‘মায়ের গর্ভাশয়ে ভ্রণ পুরুষ না নারী এর নিশ্চিত জ্ঞান আল্লাহ তা’য়ালা ছাড়া আর কারো নেই। অনুরূপভাবে ইবনে কাসির তার তাফসিরে ৬/৩৫৫ এবং আল্লামা নাসাফী তাফসিরে মাদারেকে ৩/১১৬ ও ইমাম শওকানী ফতহুল কাদির ৫/৪৯৮ এ উল্লেখিত আয়াতের এই অর্থই বর্ণনা করেছেন। অথচ ডা. সাহেব এসকল বড় বড় মুফাসিসরগণের বর্ণনাকে ভুল সাব্যস্ত করে নিজের বর্ণনা করা অর্থটিকে নিশ্চিত সঠিক সাব্যস্ত করায় অটল রয়েছেন।

সঠিক জবাব : আয়াতে কারীমার উদ্দেশ্য আল্লাহ তায়ালার জন্য ইলমে গায়েব প্রমাণ করা আর ইলমে গায়েব মূলত ঐ নিশ্চিত ইলমকে বলে যা বাহ্যিক কোনো কারণ ছাড়া কোনো যন্ত্রের মাধ্যম ব্যতিত অর্জিত হয়। আর চিকিৎসকদের ইলম শতভাগ নিশ্চিতও নয় এবং মাধ্যমহীনও নয়; বরং নিছক প্রবল ধারণা প্রসূত এবং যন্ত্রের মাধ্যমে অর্জিত হয়। তাই আল্ট্রাসনোগ্রাফি দ্বারা অর্জিত ধারণা প্রসূত ইলম দ্বারা কুরআনের আয়াতের ওপর কোনো প্রশ্ন উত্থাপিত হবে না।

 

গ. ইরশাদ হচ্ছে, হে নবী! ঈমানদার নারীরা যখন আপনার কাছে এসে এ মর্মে বাইয়াত করে যে তারা আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করবে না।

 

[সূরা মুমতাহেনা ১২]


ডা. সাহেব এই আয়াতের তাফসিরে বলেন-‘এখানে বাইয়াত শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। আর বাইয়াত শব্দে আমাদের আজ কালের ইলেকশনের অর্থও শামিল আছে। কেননা নবীজি সা. আল্লাহ তা’য়ালার রাসূলও ছিলেন সেই সাথে রাষ্ট্রপতিও ছিলেন। আর বাইয়াত দ্বারা উদ্দেশ্য তাকে সরকার প্রধান হিসেবে মেনে নেয়া ছিল। ইসলাম সেই যুগে নারীদের ভোট দেয়ার অধিকার অর্পণ করেছিল। [ডা. জাকির নায়েক, ইসলাম মেঁ খাওয়াতীনকে হুকুম : [৫ পৃষ্ঠা]

এখানেও ডা. সাহেব আয়াতের ভুল ব্যাখ্যা করে নারীদের জন্য ভোট দেয়ার অধিকার প্রমাণ করতে চাচ্ছেন যে নারীদের নবীজি সা. এর দরবারে এসে বাইয়াত করা বর্তমান যুগের গণতান্ত্রিক নির্বাচন প্রক্রিয়ারই একটি প্রাচীন পদ্ধতি। অথচ গণতন্ত্রের বাস্তবতা সম্পর্কে যারা অবগত তারা খুব ভালোভাবেই বুঝতে সক্ষম যে ডা. সাহেবের এই ব্যাখ্যা সম্পূর্ণ বাস্তবতা পরিপন্থী এবং কুরআনের তাফসিরে নিজের জ্ঞানের অযথা ব্যবহার। কারণ বর্তমান গণতন্ত্র মোতাবেক সবার এখতিয়ার থাকে যে তারা প্রধান নির্বাচনের ক্ষেত্রে নিজেদের রায় দিবে। যদি কারো ব্যাপারে সংখ্যাধিক্য ও মতাধিক্য না থাকে তাহলে সে প্রধান হতে পারে না। যদি নবীজি সা. এর বাইয়াত নেয়া ভোট নেয়া হতো তাহলে ঐ সকল নারী সাহাবীদের নবীজি সা. এর নেতৃত্ব মেনে নিতে অস্বীকার করার এখতিয়ার থাকতো।

 

ঘ. ইরশাদ হচ্ছে, হে হারূনের বোন তোমার পিতা মন্দ লোক ছিলেন না এবং তোমার মা ব্যভিচারি ছিলেন না’ [সূরা মারয়াম : ২৮]

 

সূরা মারয়ামের এই আয়াতটি না বুঝার কারণে একটি প্রসিদ্ধ প্রশ্ন তোলা হয় যে- ‘হযরত মরিয়ম আ. হযরত হারূন আ. এর বোন ছিলেন না এবং উভয়ের যুগের মাঝে এক হাজার বছরের ব্যবধান।’

এই প্রশ্নের জবাবে ডা. সাহেব বলেন- খ্রিস্টানরা বলে থাকে যে হযরত মুহাম্মদ সা. যিশুর মা ‘মেরী’ মারয়াম এবং হারূনের বোন মারয়ামের মধ্যে পার্থক্য জানা ছিলো না। অথচ আরবিতে উখতুন এর অর্থ আওলাদ (সন্তান)ও আছে। এ কারণে লোকেরা মারয়ামকে বললো হে হারূনের সন্তান এবং এর দ্বারা মূলত  হারুণ আ. এর সন্তানই উদ্দেশ্য।

ডা. সাহেবের হাদিস ও লুগাত সমন্ধে অজ্ঞতার ওপর প্রতিষ্ঠিত এই গবেষণার বিশ্লেষণ স্বরূপ মুসলিম শরিফের হাদিসই যথেষ্ঠ। সহিহ মুসলিমে আছে- হযরত মুগীরা ইবনে শো’বা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন- ‘যখন আমি নাজরানে গেলাম তো লোকেরা আমাকে প্রশ্ন করলো তোমরা ‘ইয়া উখতা হারূন’ পাঠ করে থাক অথচ মুসা আ. ঈসা আ. থেকে এতো এতো বছর পূর্বে। পরে যখন আমি নবীজি সা. কাছে এলাম তাকে এ সমন্ধে জিজ্ঞেস করলাম, তখন তিনি উত্তরে বললেন- ‘তারা তাদের পূর্ববর্তি নবী ও নেককারদের নামে নিজেদের নাম রাখতো।

[হাদিস নং ৫৭২১]

নবীজি সা. এই আয়াতের ব্যাখ্যা আজ থেকে চৌদ্দশত বৎসর পূর্বেই করেছেন যার ‘সারাংশ হলো হযরত ঈসা আ. এর মা হযরত মারয়াম হযরত মুসা আ. এর ভাই হারূন আ. এর বোন ছিলো না; বরং হযরত ঈসা আ. এর মায়ের ভাইয়ের নামও হারূন ছিলো এবং তারা নিজেদের নবী ও মাকবুল ব্যক্তিত্বের নামে নিজেদের নাম রাখতো। এতে বুঝা গেলো এটা কোনো নতুন প্রশ্নও নয় এবং নিজের পক্ষ থেকে কোনো জবাব বানানোরও কোনো প্রয়োজন নেই।

ডা. সাহেবের তাফসিরসংক্রান্ত হাদিস সমূহের ব্যাপারে কেমন অজ্ঞতা যে হাদিস ও তাফসিরের ভান্ডার থেকে বাস্তবতা পর্যন্ত পৌঁছার চেষ্ট না করে মনগড়া ব্যাখ্যা করছেন।

 

ঙ. ইরশাদা হচ্ছে-

{ وَالْأَرْضَ بَعْدَ ذَلِكَ دَحَاهَا} [النازعات: ৩০]

‘ওয়াল আরদ্বা বা’দা যালিকা দাহা-হা’

এই আয়াতের ব্যাখ্যায় ডা. জাকির নায়েক সাহেব বলেন-‘এখানে دَحَاهَا  দাহা-হা শব্দটি ডিমের অর্থে ব্যবহৃত আরবি শব্দ। যার অর্থ উট পাখির ডিম। উট পাখির ডিম পৃথিবীর আকৃতির সাথে সামঞ্জস্যতা রাখে। অথচ যখন কুরআন নাযিল হয় তখন ধারণা করা হতো পৃথিবী চেপ্টা।’

[খুতুবাতে জাকির নায়েক কুরআন এবং বর্তমান সাইন্স :/৭৩-৭৪]

কুরআনে কারীমের বিষয়বস্ত্ত হলো- তাওহীদ এবং রেসালত প্রাকৃতিক বিষয়াদির আলোচনা প্রাসঙ্গিকভাবে আছে। ব্যাপারটি না বুঝা এবং বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার কারণে ডা. সাহেব পৃথিবীর আকৃতির ব্যাখ্যা করতে যেয়ে আয়াত দিয়ে ভুল পদ্ধতিতে প্রমাণ দিচ্ছেন। এবং আয়াতের মনগড়া ব্যাখা করেছেন। ‘দাহবুন’ শব্দ ও দাল, হা. ওয়াও এর মাদ্দাটি আরবিতে ছড়ানো এবং ছড়িয়ে যাওয়ার অর্থ বুঝায়। সে মোতাবেক ‘দাহা-হা’ -এর ব্যাখ্যা ও অনুবাদ হলো পৃথিবীকে ছড়ানো এবং  বড়

 

৩। হাদিস সম্পর্কে অজ্ঞতা :

 

হাদিসের ভান্ডারের ব্যাপারে অজ্ঞতার কারণে ডা. সাহেব অনেক স্থানে সহীত হাদিসের পরিপন্থি মাসায়েল বলেছেন- এমনকি অনেক জায়গায় কোনো মাসআলায় একাধিক হাদিস থাকা সত্ত্বেও বলে ফেলেছেন যে এ ব্যাপারে কোনো দলীল নেই। নিম্নে ডা. সাহেবের হাদিসের ব্যাপারে অজ্ঞতা, অথবা জেনে বুঝে না দেখার ভান করার কিছু নমুনা উল্লেখ করছি

 

ক. নারীদের জন্য হায়েজ অবস্থায় কুরআন পাঠ করার বৈধতা :

 

এক আলোচনায় নারীদের বিশেষ দিন সম্পর্কে ডা. সাহেব বলেন-‘কুরআন ও হাদিসে নামাজের ব্যাপারে ছাড় দেয়া আছে। তবে কোনো হাদিসে এ কথা নেই যে কুরআন পড়তে পারবে না।’

অথচ তিরমিজি শরিফে স্পষ্ট হাদিস- ‘ঋতুবর্তি ও জুনুবি কুরআনের কিছু পাঠ করবে না।’ [হাদিস নং ১৩১]

এখন চিন্তুা করুন ডা. সাহেব সহীহ ও স্পষ্ট হাদিস থাকা সত্ত্বেও সবজান্তা হওয়ার দাবি করে এটাকে অস্বীকার করে দিলেন।

 

খ. রক্ত বের হলে অজু ভাঙ্গার ব্যাপারে হানাফিদের কোনো দলীল নেই।

 

ডা. সাহেব একটি বক্ততৃায় রক্ত বের হলে অজু ভাঙ্গা ও না ভাঙ্গার বিষয়ে কথা বলতে যেয়ে বলেন- ‘ কোনো কোনো আলেম বিশেষ করে হানাফি মাযহাবের সাথে সম্পৃক্ত উলামায়ে কেরামের ধারণা মতে রক্ত বেয়ে পড়লে অজু ভেঙ্গে যায়। নামাজের মধ্যে রক্ত বেয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে কার কি করা উচিত এই প্রশ্নের জবাবে তাদের (হানাফিদের) ফতোয়া অনেক লম্বা। তবে তাদের এই দৃষ্টিভঙ্গির সমর্থনে বাহ্যিকভাবে কোনো প্রমাণ নেই।’

[হাকিকতে জাকির নায়েক : ২১৪]

এখানে ডা. সাহেব হানাফি মাযহাবের সাথে সম্পৃক্ত উলামায়ে কেরামের ওপর অভিযোগ দিচ্ছেন যে তারা প্রমাণ ছাড়াই অজু ভাঙ্গার কথা বলেন- অথচ রক্ত বের হলে অজু ভাঙ্গাসংক্রান্ত অনেক হাদিস বর্ণিত আছে। তাছাড়া সাহাবায়ে কেরামের আমলও এর উপর ছিলো। নিম্নে কিছু উদ্বৃতি দিচ্ছি- হযরত আয়িশা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন- ফাতিমা বিনতে আবু হুবাইশ রা. নবী কারীম সা. এর কাছে এসে জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার এতো বেশি রক্তস্রাব হয় যে, আর পবিত্র হইনা। এমতাবস্থায় আমি কি সালাত ছেড়ে দেবো? রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করলেন- না, এতো ধমনি নির্গত রক্ত, হায়েয নয়। তাই যখন তোমার হায়েয আসবে তখন সালাত ছেড়ে দিও। আর যখন তা বন্ধ হবে তখন রক্ত ধুয়ে ফেলবে, তারপর সালাত আদায় করবে। হিশাম বলেন, আমার পিতা বলেছেন, তারপর এভাবে আরেক হায়েয না আসা পর্যন্ত প্রত্যেক সালাতের জন্য উযু করবে। [বুখারি ২২৮]

অপর হাদিসে এসেছে- ‘নামাজের মধ্যে যদি কারো নাক দিয়ে রক্ত ঝরতে থাকে তাহলে তার কর্তব্য হচ্ছে রক্ত ধুয়ে নিবে এবং অজু দুহরিয়ে নিবে। [দারেকুতনী হাদিস নং ১৭/১৮/১৯]

অপর হাদিসে এসেছে- ‘রক্ত গড়িয়ে পড়লে অজু আবশ্যক হয়ে যায়।’ [নসবুর রায়াহ ১/৩৭]

এগুলো এবং এগুলো ছাড়াও আরো অনেক রেওয়াত থাকা সত্ত্বেও ডা. সাহেব নিজের অজ্ঞতা প্রকাশ না করে উল্টো মুজতাহিদ সুলভ দাবি করে বসলেন যে বাহ্যিকভাবে রক্তের কারণে অজু ভাঙ্গার ওপর কোনো প্রমাণ নেই।


 

গ. পুরুষ ও নারীর নামাজে পার্থক্য করা বৈধ নয়


 

অন্য এক জায়গায় ডা. জাকির নায়েক সাহেব পুরুষ ও নারীর নামাজের মধ্যে পার্থক সম্পর্কে বলেন- ‘ কোথাও একটিও সহীহ হাদিস পাওয়া যায় না যাতে নারীদের জন্য পুরুষদের থেকে আলাদা পদ্ধিতিতে নামাজ আদায়ের নির্দেশ আছে, বরং তদস্থলে সহীহ বুখারির রেওয়াতে আছে হযরত উম্মে দারদা রা. বর্ণনা করেন আত্তাহিয়্যাতুর মধ্যে নারীদের পুরুষদের মতোই বসার নির্দেশ রয়েছে।

এখানে ডা. সাহেব দুটি বিষয় একেবারেই ভুল বলেছেন- এক. নামাজের ক্ষেত্রে পুরুষ নারীর মাঝে পার্থক্যসংক্রান্ত কোনো হাদিস নেই।

 

দুই. নবীজি সা. নারীদের পুরুষদের মতো বসার নির্দেশ দিয়েছেন।

ডা. সাহেব প্রথম কথাটি বলে ঐ সকল হাদিস অস্বীকার করে দিয়েছেন যার মধ্যে পুরুষ ও নারীর নামাজের পার্থক্য উল্লেখ আছে। নিম্নে এমন কিছু রেওয়াত উল্লেখ করছি-

নবীজি সা. ইরশাদ করেন- ‘তোমাদের কি হয়েছে, সালাতে কোনো ব্যাপার ঘটলে তোমরা হাততালী দিতে থাকো কেন? হাততালি তো মেয়েদের জন্য।’

[বুখারি ১/১৭৪]

হযরত ওয়াইল ইবনে হজর থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন- আমাকে নবীজি সা. বলেছেন- ‘ হে ওয়ায়েল ইবনে হজর! যখন সালাত আদায় করবে তখন তোমার হাতদ্বয় কান পর্যন্ত ওঠাবে এবং নারী তার হাত তার স্তন পর্যন্ত ওঠাবে।

[আল মুজামুল কাবীর ২৮]

হযরত এযিদ ইবনে আবি হাবীব থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন- নবীজি সা. এমন দু’জন নারীর পাশ দিয়ে অতিক্রম করলেন, যারা নামাজ পড়ছিলো, তখন তিনি বললেন- যখন তোমরা সেজদা কর তখন শরীর জমিনের সাথে মিলিয়ে রাখবে, কেননা, নারী এক্ষেত্রে পুরুষের মতো নয়।

[বাইহাকী- ৩০১৬]

এই রেওয়ায়াতগুলোতে পুরুষ ও নারীদের নামাজের মধ্যে বিভিন্ন পার্থক্যের উল্লেখ রয়েছে। এছাড়া আরোও অনেক হাদিস রয়েছে। এ বিষয়ে লিখিত গ্রন্থাবলীতে বিস্তারিত দেখা যেতে পারে। আর দ্বিতীয় কথাটি হলো- বুখারি শরিফে নারীদের পুরুষদের মতো বসার নির্দেশ সম্পর্কিত নবীজি সা. নির্দেশের ব্যাপারটিকে নবীজি সা. এর দিকে একটি ভুল সম্পৃক্তকরণ বৈ কিছু না। হযরত উম্মে দারদা রা. এর যে বর্ণনার রেফারেন্স ডা. সাহেব দিয়েছেন তার ভাষ্য হলো-

হযরত উম্মে দারদা তার সালাতে পুরুষদের মতো বসতেন এবং তিনি ফকীহ ছিলেন। [বুখারি ১/১১৪]

এখানে কোথাও নবীজি সা. এর কর্মের আলোচনা নেই; বরং এটা একজন নারী সাহাবীর আমল। যার উল্লেখ করে ইমাম এই কথারই ঈঙ্গিত দিয়ে ছিলেন যে তিনি ফকিহ ছিলেন নিজের ইজতিহাদে এমন করতেন। উপরন্তু ইমাম বুখারি হাদিসটি মুয়াল্লাক করে উল্লেখ করেছেন সনদ বলেননি।

 

৩। আইয়্যিম্মায়ে মুজতাহিদীনের অনুসরণ থেকে পালায়ন এবং ফেকহী মাসায়েলের ক্ষেত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ মত থেকে স্পষ্ট বিচ্যুতি।

 

ডা. জাকির নায়েক সাহেবের লিখনি ও বক্তব্যের আলোকে তাকে কোনো ইমামের অনুসারী বলে মনে হয় না। বরং তিনি স্বেচ্ছাচারিতা, প্রগতিশীলতা, মাযহাববিহীন মানুষ হিসেবে প্রতিয়মান হন। শুধু যে তিনি নির্দিষ্ট কোনো ইমামের তাকলীদ করেন না- তাই নয়; বরং তাকলীদকারী নিষ্ঠাবান জনসাধারণকে তাকলীদ না করার পন্থা অবলম্বনের শিক্ষা দেন এবং নিজের বয়ান কৃত মাসায়েলে কোথাও কোনো ইমামের কথা ও তার ইস্তিম্বাত করা হুকুম নিজের দিকে সম্পৃক্ত করে নকল করেন। আবার  কোথাও নিজে মুজতাহিদ সুলভ ভঙ্গিতে মাসআলা বয়ান করতে থাকেন। অথচ তার মাসায়েল নকল করার ক্ষেত্রে ঐ নির্দিষ্ট ইমামের নাম নেয়া কর্তব্য ছিল। যিনি এই মাসআলাগুলো ইস্তিম্বাত করেছেন। যাতে করে শ্রোতাগণ এই ভুল না করে বসে কুরআন ও সুন্নাহ থেকে শুধুমাত্র এটাই প্রমাণ হয়। এছাড়া যে অন্য সকল বিষয় যার ওপর লোকেরা আমল করছে তা কুরআন ও হাদিস থেকে প্রমাণিত ও আইয়্যিম্মায়ে মুজতাহিদীনের বক্তব্য হলেও তা ভুল। নিম্নোক্ত উদাহরণসমূহ থেকে বিষয়গুলো খুব সুন্দরভাবে অনুমান করা সম্ভব।


 

 

ক. অযু ছাড়া কুরআন স্পর্শ করা বৈধ


ডা. সাহেব এক স্থানে বলেন- ‘অজুছাড়া কুরআনে কারীম স্পর্শ করার অনুমতি থাকা চাই। অথচ ডা. সাহেবের এই বক্তব্য কুরআনে কারীমের আয়াত-

{لَا يَمَسُّهُ إِلَّا الْمُطَهَّرُونَ} [الواقعة: ৭৯]

‘লাইয়া মাসসাহু ইল্লাল মুতাহ হারুন’ [সূরা ওয়াকিয়া ৭৯]

তাছাড়া সকল মুজতাহিদ ইমামগণের মতেরও বিরুদ্ধে।

 

খ. জুমার খুতবা আরবি ভাষার স্থলে স্থানীয় ভাষায় হওয়া চাই ।

একস্থানে জুমার খুতবার সম্পর্কে ডা. সাহেব বলেন- ‘আমি মনে করি আমাদের দেশে জুমার খুতবা স্থানীয়, মাতৃভাষায় দেয়ার ওপর গুরুত্ব দেয়া হোক যাতে করে …. অথচ নবীজি সা. এর যুগ থেকে আজ পর্যন্ত জুমার খুতবা আরবি ভাষায় দেয়ার ধারাবাবিহক নিয়ম চলে আসছে। আজ ডা. সাহেব এই দাওয়াত দিচ্ছে যে খুতবা স্থানীয় ভাষায় হওয়া চাই। যাতে জনগণ বুঝতে পারে। অথচ এই স্বার্থ আরবি যারা জানেনা তাদের বুঝা নবীজি সা. এর যুগেও বিদ্যমান ছিল। কারণ নবী কারীম সা. খুতবা সমূহতে অনারব ব্যক্তিবর্গও শরীক হতো। তবুও নবী কারীম সা. সর্বদা আরবিতেই খুতবা দিয়েছেন। অন্যকোনো ভাষায় খুতবা দেয়ানোর ব্যবস্থা করেননি। আর পরে এর অনুবাদও করাননি। অনুরূপভাবে সাহাবায়ে কেরাম তাবেঈন ও তাবে তাবেঈন এবং তাদের অনুসারীগণ আরব থেকে বের হয়ে ভিন্ন দেশে গিয়েছেন। প্রাচ্যে পাশ্চাত্যে ইসলাম ছড়িয়েছে। তদুপরি সকল স্থানে খুতবা সর্বদা আরবি ভাষায়ই দিয়েছেন। অথচ তাদের দ্বীনের তাবলীগের প্রয়োজন বর্তমান থেকেও বেশি ছিলো। মোট কথা খোলাফায়ে রাশেদীন, সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেঈনের ইজমামের কর্মধারা ও নিরবচ্ছিন্ন আমল এবং সমস্ত উম্মাহ ধারাবাহিক কর্ম পন্থা। একথার স্পষ্ট প্রমাণ যে খুতবা আরবি ভাষায় দেয়াই আবশ্যক। এমনকি ইমাম মালেক রহ. বলেন- জুমার নামাজ বিশুদ্ধ হওয়ার জন্য খুতবা আরবি ভাষায় হওয়া আবশ্যক। যদিও পূর্ণ উপস্থিতি অনারবদের হোক না কেন এবং আরবি কেউ না জানুক এবং আরবি ভাষায় খুতবা পাঠ করতে সক্ষম এমন একজনও উপস্থিত না হয়ে থাকে তাহলে সকলের জোহরের নামাজ আদায় করা আবশ্যক হবে। জুমা তাদের রহিত হয়ে যাবে।

[হাশিয়ায়ে দুসুকী আলাশ শারহিল কাবীর ১/৩৭৮]

তাছাড়া শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী রহ. বলেন- খুতবা শুধু আরবি ভাষাই হওয়া আবশ্যক। প্রাচ্চ্য থেকে পাশ্চাত্বের সকল মুসলমানের আমল এটাই ছিল। [মুসাফফা শরহে মু’আত্ত্বা ১৫২]

 

গ. তিন তালাক একটি তালাকই হওয়া চাই

 

ডা. সাহেব বলেন- ‘তিন তালাকের জন্য এতো শর্ত রয়েছে যা পূর্ণ হওয়া সম্ভব নয়। সৌদি আরবে তিনশত ফতোয়া আছে। তাই তালাক একটিই বর্তমানের অবস্থার বিবেচনায় একটিই হওয়া চাই’।

[খুতুবাতে জাকির নায়েক : ৩৩১]

অথচ সাহাবায়ে কেরাম তাবেঈনে ইজমা, চার ইমাম, উম্মাহের সংখ্যাগরিষ্ঠ উলামা এবং বর্তমান যুগের সৌদি আরবের সকল গ্রহণযোগ্য আলেমগণের কাছে এক মজলিসের তিন তালাক তিনটি তালাকই সংগঠিত হয়, একটি নয়। এ মাসআলায় পূর্ণ ইতিহাসে গ্রহণযোগ্য কোনো আলেমের মতোবিরোধ নেই। ইবনে তাইমিয়া এবং তার শাগরিদ ইবনুল কাইয়্যিম ছাড়া। কিন্তু সমগ্র জাতির যাদের মধ্যে চার ইমাম- ইমাম আবু হানীফা, ইমাম মালেক, ইমাম শাফেঈ ও ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বলও শামিল। মুকাবিলায় এই দুইজনের মতে কিছুতেই অনুসরণযোগ্য হতে পারে না।

ডা. সাহেব এমন ঐক্যমতের বিধানের পরিপন্থি মাসআলা বলে জাতিকে পথভ্রষ্ট করছেন। এই বিধানটি কুরআনের আয়াত অসংখ্য হাদিস এবং সাবাবায়ে কেরামের কর্মপদ্ধতি থেকে স্পষ্টভাবে প্রমাণীত হয়।

‘হযরত নাফে বলেন, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা. এর কাছে যখন ঐ ব্যক্তি সমন্ধে ফতোয়া জিজ্ঞাসা করা হতো যে তিন তালাক দিয়ে দিয়েছে।  তখন তিনি বলতেন যদি তুমি এক. দুই তালাক দিতে (তাহলে ফিরিয়ে নিতে পারতে) কেননা নবীজি সা. আমাকে এর (ফিরিয়ে নেয়ার) নির্দেশ দিয়েছিলেন। যদি তিন তালাক দেয় তাহলে হারাম হয়ে যাবে যতোক্ষণ না অন্য স্বামীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়।

অপর হাদিসে আছে- হযরত মুজাহিদ বলেন, আমি ইবনে আববাস রা. কাছে ছিলাম এমতাবস্থায় এক ব্যক্তি এসে বললো, সে তার স্ত্রীকে তিন তালাক দিয়ে দিয়েছে। তিনি বলেন হযরত ইবনে আববাস রা. চুপ থাকলেন। আমি মনে করলাম তিনি স্ত্রীকে ফিরিয়ে দিবেন। (রোজআতের নির্দেশ দিবেন) কিন্তু তিনি বললেন তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ বোকামি করে বসে অতঃপর ইবনে আববাস ইবনে আববাস বলে চিল্লাতে থাকে। শোন আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন- ‘ যে আল্লাহকে ভয় পায় তার জন্য রাস্তা  করে দেন। তোমরা নিজেদের প্রভুর সাথে নাফরমানী করছে (তিন তালাক দিয়ে দিয়েছে) তাই তোমাদের স্ত্রী বিচ্ছেদ হয়ে গেছে।

হযরত ইমাম মালিকের কাছে এই বর্ণনা পৌঁছেছে যে এক ব্যক্তি হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আববাসের কাছে জিজ্ঞাসা করলে। আমি আমার স্ত্রীকে এক তালাক দিয়ে দিয়েছি। আপনি এ ব্যাপারে কি বলেন?  হযরত ইবনে আববাস রা. উত্তর করলেন এর মধ্য থেকে তিন তালাক তোমার স্ত্রীর ওপর পতিত হয়েছে অবশিষ্ট সাতানববই তালাকের মাধ্যমে তুমি আল্লাহ পাকের আয়াত নিয়ে খেলেছ।

আরেক হাদিসে আছে- হযরত ইমাম মালিকের কাছে এই রেওয়াত পৌঁছেছে যে এক ব্যক্তি আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদের কাছে এসে বললো আমি আমার স্ত্রীকে আটটি তালাক দিয়েছি। হযরত ইবনে মাসউদ রা. জিজ্ঞাসা করলেন লোকেরা তোমাকে কি বলেছে? সে জবাব দিলো আমার স্ত্রী বিচ্ছেদ হয়ে গেছে। হযরত ইবনে মাসউদ রা. বলেন ঠিক বলেছে। অর্থাৎ তিন তালাক হয়েছে।

[মুআত্ত্বা ইমাম মালেক-১৯৯]

অপর হাদিসে আছে- হযরত হাসানের বর্ণনা আমাদের হযরত ইবনে উমর রা. বলেন- যে তিনি তার স্ত্রীকে মাসিকের সময় এক তালাক দিয়ে দিয়েছিলেন। অতপর ইচ্ছা করলেন দুই তোহরে (পবিত্রতার সময়) অবশিষ্ট দুই তালাক দিয়ে দিবেন। নবীজি সা. অবগত হলেন এবং বললেন- ‘হে ইবনে উমর! এভাবে আল্লাহ তোমাকে নির্দেশ দেননি। তুমি সুন্নত তরীকার খেলাফ করেছো। সুন্নত তরীকা হলো তোহরের অপেক্ষা করবে এবং প্রতি তোহরে এক তালাক করে দিবে। এরপর নবীজি সা. আমাকে ফিরিয়ে নেয়ার নির্দেশ দিলেন। সেমতে আমি ফিরিয়ে নিলাম। এরপর বললেন- যখন সে পবিত্র হয়ে যাবে তখন তোমার এখতিয়ার, ইচ্ছা করলে তালাক দিয়ে দিতে পারবে আর ইচ্ছা করলে রেখেও দিতে পারবে। হযরত ইবনে উমর রা. বলেন, এরপর আমি নবীজি সা. কে জিজ্ঞাসা করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! যদি আমি তিন তালাক দিয়ে দিতাম তাহলে কি আমার ফিরিয়ে আনা জায়েজ হতো? নবীজি বললেন- না। সেক্ষেত্রে তোমার স্ত্রী তোমার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতো এবং তোমার এই কাজ (তিন তালাক প্রদান) গুনাহের কাজ হতো। দারেকুতনী ২/৪৩৮

আপনি লক্ষ্য করেছেন যে উল্লেখিত হাদিসসমূহে তিন তালাকের মাধ্যমে তিন তালাকই হওয়ার বিধান রয়েছে। এছাড়াও আরোও অনেক রেওয়াত স্পষ্টভাবে প্রমাণ করছে যে- তিন তালাক তিন তালাকই হবে। এক তালাক নয়।

বি:দ্র: ডা. জাকির নায়েক তার বক্তৃতায় সৌদি আরবের তিনশত আলেমের উদ্বৃতি দিয়েছেন। তারপর নিজের মতামতও পেশ করেছেন। কিন্তু তারা কোন কোন আলেম তা উল্লেখ করেননি। অথচ সৌদি আরবে তাহকীকাতে ইলমিয়ার সম্মানীত মুফতীগণ তিন তালাক দ্বারা তিন তালাক হওয়ারই ফতোয়া দিয়েছেন। তাদের সিদ্ধান্তটি নিম্নরূপ :-

এক শব্দে তিন তালাকসংক্রান্ত বিষয়ে হাইয়াতুল বিবারিল উলামা এর সাধারণ পরিষদ থেকে পেশকৃত ও লাজনাতুদ্দায়েমা লিল বুহুস ওয়াল ইফতা থেকে প্রস্ত্ততকৃত গবেষণার ওপর অবগতি লাভ পূর্বক মাসআলাটি নিয়ে স্টাডি মতবিনিময় ও সংশ্লিষ্ট মতামতসমূহ পেশ করা এবং প্রত্যেক মতামতের ওপর আরোপিত বিষয়াদি নিয়ে আলোচনার পর বোর্ডের অধিকাংশ এক শব্দের তিন তালাকে তিন তালাক পতিত হওয়ার বিষয়টিই গ্রহণ করেছেন। মাজাল্লাতুল বুহুস আল ইসলামিয়া ১ম খন্ড ৩য় সংখ্যা

 

১৩৯৭ হি:


ঘ. ডা. সাহেব একটি আলোচনায় বক্তৃতার সময় পরামর্শ দেন ‘ মুসলমানদের এমন পদ্ধতি গ্রহণ করা উচিত যেনো সমগ্র বিশ্বে একই দিন ঈদ হতে পারে।’

 

ডা. সাহেবের এই বক্তব্য ‘ছূমূ লিরুয়াতিহী ওয়া আফতিরুলি রুয়াতিহী’ মুসলিম-২৫৬৭

অর্থাৎ ‘চাঁদ দেখে রোজা রাখা ও চাঁদ দেখেই ইফতার করো।’ এ হাদিসটির পরিপন্থি হওয়ার সাথে সাথে সুস্থ বিবেকেরও পরিপন্থি। কেননা একই দিনে ঈদের মাসআলাটির মূলত এই ভিত্তিতে সৃষ্টি হয় যে ঈদকে একটি উৎসব দেশীয় অনুষ্ঠান বা জাতীয় দিবস সাব্যস্ত করা হয়। অথচ এটা চূড়ান্ত পর্যায়ের একটি ভুল চিন্তা। কেননা আমাদের ঈদ রমজান বা মুহাররম কোন উৎসব নয়, বরং সবগুলোই ইবাদত, তাছাড়া সময় সব দেশ ও এলাকার আকাশ সীমার বিবেচনায় হওয়া একটি আবশ্যকীয় বিষয় আমরা হিন্দুস্তানে যখন আসরের নামাজ আদায় করি তখন ওয়াশিংটনে সকাল হয়। যখন হিন্দুস্তানে আমরা জোহরের নামাজ আদায় করি তখন লন্ডনে মাগরিবের নামাজ হয়ে যায়। এছাড়া এমনও হয় যে এক দেশে জুমার দিন হলে অন্যদেশে তখনো বৃহস্পতিবার, আবার কোথাও শনিবার শুরু হয়ে গেছে। এই পরিস্থিতিতে সারাবিশ্বে একই দিনে ঈদ পালনের চিন্তা কিভাবে করা যায়?

মোটকথা এসকল সমালোচনার আলোকে বুঝা গেলো ডা. জাকির নায়েক অনেক মাসআলায় আহলে সুন্নাতওয়াল জামাআত থেকে বিচ্যুত। কুরআন ও হাদিসের ব্যাখ্যায় আরবি ভাষাও পূর্বসূরিদের থেকে বর্ণিত তাফসিরসমূকে দূরে ঠেলে দিয়ে খোড়া যুক্তির মাধ্যমে তাফসির করে অর্থগত বিকৃতির শিকার। তাছাড়া তিনি (ডা. সাহেব) শরীয়তের ইলম ও এর উদ্দেশ্যাবলী সম্পর্কে গভীর জ্ঞান না থাকা সত্ত্বেও কোনো ইমামের তাকলীদ করেন না। বরং উল্টো তিনি মুজতাহিদ ইমামগণের সমালোচনা করেন। তাই তার কথাবার্তা কিছুতেই গ্রহণযোগ্য নয়। তার প্রোগ্রাম দেখা তার বয়ান শোনা এবং তাহকীক ছাড়া তার ওপর আমল করা অত্যন্ত ক্ষতিকর। আর যেহেতু বাস্তব তাহকীক করা সব ধরনের মানুষের কাজ নয়। তাই তার প্রোগ্রাম সমূহ থেকে সাধারণ জনতার বেঁচে থাকাই আবশ্যক। তাছাড়া প্রত্যেক মুমিনের সর্বদা মনে রাখতে হবে যে দ্বীনের বিষয় যা অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি বিষয়। মানুষ দীনের  কথা শুনে এবং এর ওপর আমল করে  শুধু আখেরাতের নাজাতের জন্য। এক্ষেত্রে শুধু মাত্র নতুন নতুন তাহকীক, ত্বরিত জবাব, রেফারেন্সের আধিক্য এবং মানুষের মাঝে বাহ্যিক গ্রহণযোগ্যতা দেখে তাহকীক ছাড়া কারো কথার ওপর কখনোই আমল করা উচিত নয়; বরং মানুষের চিন্তুা করা জরুরি যে সে ব্যক্তি দীনী ইলমের কতোটুকু যোগ্যতা রাখে।  কোন কোন উস্তাদদের থেকে ইলম অর্জন করেছে। কোন পরিবেশে সে প্রতিপালিত হয়েছে। তার পোশাক-আসাক, বাহ্যিক অবস্থা অন্যান্য উলামায়ে কেরামের সাথে সামঞ্জস্যতা রাখে কিনা?

তাছাড়া সমসাময়িক গ্রহণযোগ্য উলামা মাশায়েখের তার ব্যাপারে কি মতামত? এটাও দেখা জরুরি যে তার দ্বারা প্রভাবিত ও তার আশপাশে একত্র হয় এমন ব্যক্তিবর্গের মধ্যে কি পরিমাণ সহীহ দ্বীনি অনুভূতি রাখে এবং দীনি খিদমতে জড়িত গ্রহণযোগ্য ব্যক্তির পরিমাণই বা কেমন? তার কাছাকাছি কিছুগ্রহণ যোগ্য ব্যক্তি থাকলে তাদের কাছে জানা প্রয়োজন যে তার ধরন কি? তারা কেন তার কাছে আছে? এমন তো নয় যে কোন ভুল ধারণার বশিভূত হয়ে বা জ্ঞানের স্বল্পতা অথবা কোন স্বার্থে কাছাকাছি দেখাচ্ছে। মোটকথা এই সকল বিষয় তাহকীক করার পর যদি নিশ্চিত হওয়া যায় তাহলেই কেবল দ্বীনি বিষয়ে তার কথা গ্রহণ ও আমলযোগ্য সাব্যস্ত হবে। নতুবা তার কাছ থেকে দূরত্ব অবলম্বন করার মধ্যেই ঈমানের নিরাপত্তা। প্রসিদ্ধ তাবেঈ মুহাম্মদ ইবনে সীরিনের বাণী- ‘দীনের কথা শোনা ও শিখার জন্য জরুরি হলো যে খুব চিন্তা করো যে কেমন লোক থেকে ইলম অর্জন করছো এবং দীন শিখছো। আল্লাহ তা’য়ালা সবাইকে সঠিক পথে চলার তাওফিক দান করুন।


আমীন

 

আরবি হাওয়ালা ও বিস্তারিত দেখার জন্য নিচের লিঙ্কে মুল ফতোয়াটি দেখুন ।

http://darulifta-deoband.org/

Share

সহীহ হাদীসের আলোকে মহিলাদের নামাজের উত্তমস্থান

 

 

সহীহ ও গ্রহণযোগ্য হাদীসের বর্ণনা মোতাবেক মহিলাদের জন্য মসজিদ অপেক্ষা ঘরে নামাজ আদায় করা উত্তম। এ সংক্রামত বহু সহীহ হাদীস রয়েছে। তন্মধ্য থেকে কয়েকটি হাদীস নিম্নে পেশ করছি-

 

 عن أم حميد امرأة أبي حميد الساعدي : ” أنها جاءت النبي صلى الله عليه وسلم فقالت : يا رسول الله إني أحب الصلاة معك قال : قد علمت أنك تحبين الصلاة معي وصلاتك في بيتك خير لك من صلاتك في حجرتك وصلاتك في حجرتك خير من صلاتك في دارك وصلاتك في دارك خير لك من صلاتك في مسجد قومك وصلاتك في مسجد قومك خير لك من صلاتك في مسجدي ، قال : فأمرت فبني لها مسجد في أقصى شيء من بيتها وأظلمه فكانت تصلي فيه حتى لقيت الله عز وجل “. رواه أحمد ( 26550 ) .

  1. হযরত উম্মে  হুমাইদ আস সাআদী রা. থেকে বর্ণিত- একবার তিনি রাসুলুল্লাহ সা. এর নিকট এসে আরজ করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমি আপনার পিছনে নামাজ আদায় করতে চাই। নবী করীম সা. উত্তরে ইরশাদ করলেন, আমি ভালো করেই জানি, তুমি আমার পিছনে নামাজ আদায় করতে চাও। কিন্তু তোমার জন্য তোমার রুমে নামাজ আদায় করা অন্য রুমে আদায় করার চেয়ে উত্তম। আর তোমার ঘরের কোনো রুমে আদায় করা বাড়িতে আদায় করার চেয়ে উত্তম। আর তোমার  বাড়িতে নামাজ আদায় করা কওমের (এলাকার ) মসজিদে আদায় করার চেয়ে উত্তম। আর তোমার কওমের (এলাকার ) মসজিদে নামাজ আদায় করা আমার পিছনে নামাজ আদায় করার চেয়ে উত্তম। এরপর ঐ মহিলা তার অন্ধকার কুঠরিতে নামাজের জন্য জায়গা নির্ধারণ করে নেয়। এবং মৃত্যু পর্যমত সেখানেই নামাজ আদায় করতে থাকে।-মুসনাদে আহমাদ : ৩৭/৪৫

 

অনুরূপ রেওয়ায়াত সহীহ হাদীসের কিতাব ‘সহীহে ইবনে খুযাইমাতে’ও বর্ণিত আছে। আর উক্ত হাদীস সম্পর্কে বিশিষ্ট হাদীস বিশারদ আল্লামা নাসিরুদ্দিন আলবানী বলেছেন, হাদিসটি হাসান ।

 

সহীহ হাদীসের কিতাব ‘ সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম শরীফে’ বর্ণিত আছে,

 

وعن عائشة رضي الله عنها قالت : ” لو أدرك رسول الله صلى الله عليه وسلم ما أحدث النساء لمنعهن كما منعت نساء بني إسرائيل قلت لعمرة أو منعن قالت نعم . ” البخاري ( 831 ) ومسلم (445) .

 ২. হযরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন- যদি রাসুলুল্লাহ সা. বর্তমান কালের মহিলাদের অবস্থা দেখতেন তাহলে তাদেরকে মসজিদে আসতে নিষেধ করতেন। যেমন নিষেধ করা হয়েছিল  বনি ইসরাইলের মহিলাদেরকে। ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ বলেন- আমি আ‘মরা র. কে বললাম, তাদেরকে কি নিষেধ করা হয়েছিল? তিনি বললেন, হ্যাঁ।-সহীহ বুখারী : ১/২৯৬ সহীহ মুসলিম:

 

عن عبد الله بن مسعود ، عن النبي صلى الله عليه وسلم قال : ” صلاة المرأة في بيتها أفضل من صلاتها في حجرتها وصلاتها في مخدعها أفضل من صلاتها في بيتها ” . رواه أبو داود

  1. হযরত ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন- নবী করীম সা. ইরশাদ করেন- মহিলাদের  ঘরে নামাজ আদায় করা বৈঠকখানায় নামাজ আদায় করার চেয়ে উত্তম। মহিলাদের থাকার ঘরে নামাজ আদায় করার চেয়ে গোপন প্রকোষ্ঠে নামাজ আদায় করা অধিক উত্তম।-আবু দাউদ:  ১/২২৩

 

عن عبد الله بن مسعود قال صلاة المرأة فى بيتها أفضل من صلاتها فيما سواها ثم قال إن المرأة إذا خرجت تشرف لها الشيطان.

  1. হযরত ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন- মহিলাদের জন্য নিজ বাসস্থানে  নামাজ আদায় করা অন্য সকল স্থানে আদায় করার চেয়ে উত্তম। কেননা, মহিলারা বাসস্থানের বাইরে বের হলে শয়তান তার দিকে উকি-ঝুকি মারে।-মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক : ৩/১৫০

 

শ্রদ্ধেয় মা ও বোনেরা!

আল্লাহ তাআলা জিন ও ইনসানকে সৃষ্টি করেছেন তার ইবাদতের জন্য। সেই সাথে তিনি তাদেরকে ইবাদতের পথ ও পদ্ধতিও বলে দিয়েছেন। এক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের ইবাদতে কিছুটা ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। তাহারাত-পবিত্রতা থেকে নিয়ে কাফন-দাফন পর্যমত শরীয়তের প্রায় সকল বিধি-নিষেধে নারী ও পুরুষের ক্ষেত্রে সামান্য হলেও পার্থক্য রয়েছে। যেমনটি রয়েছে তাদের স্বাভাবিক জীবন যাপনেও।

নামাযের বিভিন্ন মাসআলার ক্ষেত্রেও এই পার্থক্য বিদ্যমান। একটি পার্থক্য তো এই যে, পুরুষ মসজিদে নামায পড়বে আর নারী তার ঘরে পড়বে। আশা করা যায়, উপরের হাদীসগুলোর দ্বারা বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে।

অতএব, মা-বোনদের সকলের প্রতি উদাত্ত আহবান জানাচ্ছি, আপনারা মসজিদে না গিয়ে নিজ নিজ ঘরেই নামায আদায় করে বেশি সওয়াব অর্জন করুন। আল্লাহ তাআলা সকলের সহায় হোন।

 

আপনাদের দীনী ভাই

মুফতি তাউহীদুল ইসলাম

নায়েবে মুফতি,

জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া

মুহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

        ০১৮১৬৩৬৭৯৭৫

Share

প্রচলিত মিলাদ, কিয়ামের পদ্ধতি জায়েয কি না?

এনামুল হাসান, ঢাকা

জবাব : আখেরি নবী ও শ্রেষ্ঠ রাসূল হযরত মুহাম্মদ সা. এর প্রতি ভালবাসা ও গভীর মহব্বত রাখা ঈমানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রিয় নবীজী সা. এর জন্মলগ্ন থেকে তিরোধানের পূর্ব পর্যন্ত তার পবিত্র জীবনাদর্শ ও কর্ম-কাণ্ডের আলোচনা এবং পূর্ণ অনুসরণ ও অনুকরণ আল্লাহর রহমত প্রাপ্তির বড় মাধ্যম এবং গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতও বটে। তবে উক্ত ইবাদত অবশ্যই সে পদ্ধতিতে করতে হবে, যে পদ্ধতি স্বয়ং নবীজী সা., সাহাবায়ে কেরামকে শিক্ষা দিয়েছেন। তারপর সাহাবায়ে কেরাম রা. তাবেঈনদের শিক্ষা দিয়েছেন এবং তাবেঈনগণ পরবর্তীদের শিখিয়ে গেছেন। সে পদ্ধতি হচ্ছে, দিন-ক্ষণ ও সময় নির্ধারণ এবং আনুষ্ঠানিকতা ব্যতিরেকে রাসূল সা.-এর জীবনী আলোচনা এবং দুরূদ শরীফ পাঠ করা। মনগড়া বা ভিত্তিহীন কোনো তরীকায় করলে তা ইবাদত বলে গণ্য হবে না। এ জন্যই রাসূল সা. এর জীবনাদর্শ আহকামে দীন ও শরীয়ী বিধি-বিধান সম্পর্কে সম্যক ধারণা রাখা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য ফরজ।
সুতরাং রাসূল সা.-এর জন্ম বৃত্তান্ত আলোচনা করা সওয়াব ও বরকতের বিষয় এবং মহান দীনী কাজ হলেও দেশের শরীয়তের নিয়ম-নীতি সম্পর্কে কোনো কোনো শ্রেণীর লোকেরা ‘মীলাদ শরিফ’ নামে সম্মিলিত সুরে গদভাধা কিছু পাঠের অনুষ্ঠান এবং কিয়ামের যে রীতি চালু করেছে, তার কোনো ভিত্তি কুরআন-হাদীসে, সাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈন ও তাবে তাবেঈনের সোনালী যুগে পাওয়া যায় না। অথচ সর্বস্বীকৃত সত্য হলো, তারাই ছিলেন প্রকৃত নবীপ্রেমী খাঁটি আশেকে রাসূল এবং নবীজী সা. এর আদর্শের পরিপূর্ণ অনুসারি ও বাস্তব নমুনা।
প্রচলিত এই মিলাদ ও কিয়ামের উদ্ভব ঘটে ৬০৪ হিজরি সনে। ইরাকের মাসূল শহরের বাদশা আবু সাঈদ মুজাফ্ফর কাকরী এবং তার দরবারি আলেম আবু খাত্তাব উমর ইবনে দিহইয়া এদু’জন মিলে এর প্রচলন ঘটায়। এরা উভয়ে দীনের ব্যাপারে খুবই উদাসীন এবং ফাসিক প্রকৃতির লোক ছিল। পরবর্তীতে অজ্ঞতা, মূর্খতা ও জাহালতের অন্ধকারে নিমজ্জিত শ্রেণীর লোকদের মাধ্যমে আরো অনেক কুসংস্কার, শরীয়ত বিরোধী বিশ্বাস ও কার্যাবলী এতে সংযোজিত হতে থাকে। যার সবকিছুই কুরআন-হাদিস, ইজমা-কিয়াস তথা শরীয়তের মূল প্রমাণ পরিপন্থী। তা ছাড়া মিলাদের মধ্যে রাসূলুল্লাহ সা.কে হাজির-নাজির মনে করে কিয়াম করা তো রীতিমতো শিরক। হাজির-নাজির মনে না করলেও শরীয়তে এর ভিত্তি নেই।
এ সকল কারণে প্রচলিত মিলাদ, কিয়াম না জায়েজ ও বিদআতের অন্তর্ভুক্ত বলেই সকল হক্কানী ওলামায়ে কেরাম একবাক্যে ফতওয়া দিয়ে থাকেন। এজন্য প্রচলিত মীলাদের আয়োজন না করে ‘বিশেষ দোয়া’ করা যেতে পারে। এতে দোয়া কবুললের উদ্দেশ্য নিয়মানুযায়ী কিছুক্ষণ দরূদ শরিফ, তাসবীহ-তাহলীল, ওজীফা, সূরা ফাতেহা, সূরা ইখলাস ইত্যাদি যার যা জানা আছে প্রত্যেকে নিজস্বভাবে পড়বে। সম্মিলিত সুরে নয়। এরপর মুনাজাত করবে। এ পদ্ধতিতে আমল করার অবকাশ রয়েছে। এটি সর্বোতভাবে শরীয়তসম্মত। এ সম্পর্কে কোনো বিতর্ক বা কারো দ্বিমত নেই। আর ইয়া নাবী সালাম আলাইকা বলে দরূদ শরীফ রাসূলে পাক সা. কে হাজির-নাজির মানে করে পাঠ করলে তো শিরক হবে। তবে যদি এই বিশ্বাস নিয়ে পা ঠ করে যে, এটি নবী করীম সা. এর কাছে পৌঁছানো হয়-তাহলে শিরক হবে না।
[ফাতাওয়া শামী ১/৫২৪,এমদাদুল ফাতাওয়া ৬/৩২৭ আহসানুল ফাতাওয়া ১/৩৪৭]

Share

রাসূল সা. হাজির নাজির কিনা?

প্রশ্ন: আস সালামু আলাইকুম, আশা করি ভাল আছেন, আমার প্রশ্ন, নবী করিম সা. হজির ও নাজির কি না? যারা পক্ষে বলে তাদের দলিল হলো সূরা আহযাবের একটি আয়াতের শাহদান শব্দ। এই শব্দের ব্যখ্যা কি? মেহেরবানী করে দলিল সহ উত্তর দিবেন।

কামাল
সৌদি আরব
uare_myfriend@yahoo.com
(This mail is sent via Ifta Department on Jamia Rahmania Arabia Dhaka’s website http://rahmaniadhaka.com)

উত্তর: হাজির ও নাজির শব্দদুটো আরবী। হাজির অর্থ বিদ্যমান বা উপস্থিত। আর নাজির অর্থ দ্রষ্টা। যখন এ শব্দ দুটিকে এক সাথে মিলিয়ে ব্যবহার করা হয় তখন অর্থ হয় ঐ স্বত্তা যার অস্তিত্ব এক স্থানে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তার অস্তিত্ব একই সময়ে গোটা দুনিয়াকে বেষ্টন করে রাখে এবং দুনিয়ার প্রত্যেকটি জিনিসের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অবস্থা তার দৃষ্টির সামনে থাকে।
পূর্বোক্ত ব্যখ্যা অনুসারে হাজির নাজির এটি একমাত্র আল্লাহ তায়ার সিফাত এবং তার জন্যই প্রযোজ্য, এমনকি নবী সা. বা কোন ওলী সব জায়গায় হাজির নাজির হতে পারে না। আল্লাহ তায়ালার সিফাতের সঙ্গে বান্দাকে মিলানো কুফর, শিরক ও চরম ভ্রষ্টতা। বিদাতীদের আক্বীদা মতে শুধু হুজুরে পাক সা. নন, বরং বুজুরগানে দ্বীনও পৃথিবীর সবকিছুকে হাতের তালুর মত দেখতে পান। তারা দূরের ও কাছের আওয়াজ শুনতে পান এবং হাজার হাজার মাইল দূরের সমস্যাগ্রস্ত ব্যক্তির সমস্যা দূর করেন। এ ধরনের বিশ্বাস করার দ্বরা ঈমান চলে যায়।
প্রশ্নে উল্লেখিত আয়তের সঠিক অর্থ হলো হে নবী, আমি আপনাকে স্বাক্ষী, সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী রূপে প্রেরণ করেছি। প্রষিদ্ধ তাফসীর গ্রন্থ তাফসীরে রূহুল মাআনীতে উক্ত আয়াতের ব্যখ্যায় বলা হয়েছে, আমি আপনাকে আপনার উম্মতের প্রতি স্বাক্ষী হিসাবে প্রেরণ করেছি। আপনি তাদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করবেন। তাদের আমলের স্বাক্ষী দিবেন এবং তাদের থেকে তাদের সত্য-মিথ্যার অবস্থা সকল ধরনের হেদায়াত ও পথভ্রষ্টতার সাক্ষী গ্রহণ করে কিয়ামত দিবসে আল্লাহর নিকট এমনভাবে উত্থাপন করবেন, যা অবশ্যই গ্রহনযোগ্য হবে।
কোন হক্কানী মুফাসসিরই এই আয়াতের অথ্য নবী সা. হাজির নাজির বা এই আয়াতের ব্যখ্যায় নবী সা. কে হাজির নাজির বলেন নাই। সুতরাং ‘শাহিদান’ দ্বারা হুজুর সা. কে হাজির নাজির বলার অবকাশ নাই।
সে মতে নবী সা. হাজির নাজির হওয়ার পক্ষে কোরআন ও হাদীসে কোন প্রমান নেই। যারা এর বিপরীত বিশ্বাস রাখে তারা গুমরাহ ও বেদআতী এবং এ আক্বীদায় বিশ্বাসী ব্যক্তির পিছনে নামাজ পড়া মাকরূহে তাহরিমী।

Share

মাজারে সিজদা করা

জিজ্ঞাসা : এক. ফেরেস্তারা হযরত আদমকে যেভাবে সম্মানপূর্বক সিজদা করেছিল সেভাবে বর্তমান যামানায় ওলী-আউলিয়াদের মাজারে সিজদা করা বা মাথা ঝুকানো জায়েজ কি না? জায়েজ না হলে প্রমাণ কী?

দুই. সুন্নত তরিকায় কবর জিয়ারতের পদ্ধতি কী? বিস্তারিত জানালে কৃতজ্ঞ থাকব।

মুহাম্মদ মোফাজ্জাল হুসাইন মোহাম্মদপুর ঢাকা

জবাব : এক. ইবাদতের উদ্দেশ্যে আল্লাহ ছাড়া কাউকে সেজদা করা বা মাথা নোয়ানো কোনো কালেই বৈধ ছিল না। তবে সম্মান জ্ঞাপনার্থে সেজদা করা মাথা নোয়ানো পূর্ববর্তী যুগে বৈধ ছিল।

কিন্তু ইসলাম ধর্মে শিরকের গন্ধ পর্যন্ত মিটিয়ে খালেস তাওহিদ প্রতিষ্ঠার্থে সম্মান সূচক সেজদা ও মাথা নোয়ানোও হারাম করে দেয়া হয়েছে। তাই ইসলাম ধর্মে কোনো ব্যাখাতেই ওলী-আউলিয়াগণের মাজারে-দরবারে সেজদা করা বা মাথা ঝুকানোর অবকাশ নেই।

ফেরেস্তাগণ কর্তৃক স্বয়ং আল্লাহ পাকের হুকুমে আদম আ. এর প্রতি সম্মান প্রকাশার্থে সেজদা করার বিষয়টি আসমানী জগতের সাথে সম্পৃক্ত। এটি উর্দ্ধ জগতের বৈশিষ্ট। তার সাথে দুনিয়ার জগতের বিধি বিধান তুলনীয় নয়। সুতরাং এ দ্বারাও বিভ্রান্ত হওয়া যাবে না।

দুই. কবর জিয়ারতের ইচ্ছা হলে মুস্তাহাব হলো প্রথমে দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করা। অতপর কবরস্থানে যাওয়ার সময় সর্বপ্রকার অনর্থক কাজ পরিহার করা। কবরস্থানে পৌঁছে সম্ভব হলে জুতা খুলে নিবে। অতঃপর মৃত ব্যক্তির পায়ের দিক দিয়ে এসে চেহারা বরাবর মৃত ব্যক্তির দিকে মুখ করে দাঁড়াবে। অতঃপর সালাম ও দুয়া পাঠ করবে। এরপর যতটুকু সম্ভব হয় সূরা ফাতিহা, সূরা বাকারার শুরু থেকে ৫ আয়াত পর্যন্ত, আয়াতুল কুরসী, সূরা ইয়াসিন, সূরা মুলক, সূরা তাকাসূর এবং সূরা ইখলাস ১২, ১১, ৭ বা ৩ বার পড়ে মৃত ব্যক্তিকে সওয়াব পৌঁছে দিবে। সর্বশেষে কেবলার দিকে মুখ করে যতক্ষণ সম্ভব হয় দীর্ঘ দুয়ার মাধ্যমে জিয়ারত শেষ করবে।

উল্লেখ্য, কবর জিয়ারত করতে গিয়ে কবর স্পর্শ করা বা চুমু খাওয়া নিষেধ। এটা বিধর্মীদের রীতি।

আল বাহরুর রায়েক ৮/২৬৪, ফাতাওয়া আলমগিরী ৫/৩৬৮

Share