তাবলিগ আন্দোলন জিহাদ

প্রথম পর্ব

মুহাম্মদ মামুনুল হক

সাম্প্রতিক সময়ে ইসলামি মহলে একটি বিষয় নিয়ে খুব দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ও বিতর্ক লক্ষ করছি। বিষয়টি অনেক স্পর্শকাতরও বটে। দীর্ঘদিন ধরে দুচার কলম লিখবো- ভাবছিলাম। সময় সুযোগ হয়ে উঠছিলো না। অবশেষে সংক্ষিপ্ত পরিসরেই কিছু আলোকপাত করার উদ্দেশ্যে বক্ষমান লেখাটিতে হাত দিলাম। বর্র্তমান জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষিতে মুসলিম জাতির জন্য জিহাদের বিধান কোন পর্যায়ে পড়ে? অথবা জিহাদের প্রক্রিয়া কী হওয়া বাঞ্ছনীয়? সংশ্লিষ্ট বিষয়ে খোদ আলেম সমাজের মধ্যেই নানা মত ও বিভিন্ন বক্তব্য লক্ষ করা যায়।
নামকা ওয়াস্তের মুসলমানদের বাদ দিলেও যে সকল মুসলমান নিজেদের জীবনে আল্লাহর হুকুম মেনে চলার আবশ্যকতা অনুভব করে তারা মূলত তিনটি ধারায় বিভক্ত বা বিন্যস্ত হয়ে কাজ করছে।
১ম ধারা: একটি ব্যাপক জনগোষ্ঠী সারা মুসলিম বিশ্বেই এমন আছে যারা সকল বিরোধ ও সংঘাতমূলক পথ পরিহার করে শুধু নম্রÑকোমল ভাবে ইসলামের দাওয়াতি কাজে মনোনিবেশ করার পক্ষপাতি। ইতিবাচক ধারায় মানুষের ব্যক্তি সংশোধনের মাধ্যমে ইসলামের মিশনকে অগ্রসর করার চিন্তাই লালন করে এই ধারার মুসলমানগণ।
২য় ধারা: ইতিবাচক ধারায় দাওয়াতি কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি সমাজ ও রাষ্ট্রে ইসলামের বিজয় প্রতিষ্ঠাকামী এরা। মুসলিম অধ্যুষিত জনপদগুলোতে ব্যাপক গণমানুষের সম্পৃক্ততায় সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অন্যায়Ñঅবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ প্রতিরোধ গড়ে তুলে ইসলামি সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখে এরা। তবে সশস্ত্র জিহাদের পথে পা বাড়ায় না।
৩য় ধারা: তারা বর্তমান বিশ্ব প্রেক্ষাপটেও জিহাদের কোনো বিকল্প পথে চলতে প্রস্তুত নয়। মুসলিম দেশ অমুসলিম দেশ নির্বিশেষে সকল স্থানেই যাবতীয় সমস্যার সমাধান জিহাদের পথেই আছে বলে তাদের বিশ্বাস। জিহাদ ছাড়া অন্য  কোনো পথে মুসলমানদের বিজয় আসতে পারে নাÑ এমন চিন্তার বলিষ্ঠ ধারকÑবাহক এই মহলটি।
প্রিয় পাঠক! উপরোক্ত তিনটি ধারার মধ্যে মূলত কোনো বিরোধ নেই। বরং সঠিক ও ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বিচার করলে উত্তম সমন্বয় সাধন সম্ভব। আজকের প্রেক্ষিতে এই সমন্বয়ের প্রয়োজনও অত্যধিক। সমন্বয়হীন প্রান্তিক চিন্তা জাতিয় জীবনে মুসলিম জাতির জন্য অনেক বিপর্যয় ডেকে আনছে। এই সেদিন ৫-৬ মে’ ১৩ ঢাকার শাপলা চত্বরে যে নতুন বালাকোট রচিত হলোÑ তা নিয়ে খোদ ইসলাম পন্থীদের মধ্যে নানা রকম মত ও দৃষ্টিভঙ্গি লক্ষ করেছি। কাউকে বলতে শুনেছি এই ধরনের কর্মসূচির কী দরকার ছিলো? এগুলো রাজনীতি। যারা আল্লাহর পথে চলে, এই ধরনের কাজে তাদের সম্পৃক্ত হওয়া উচিত নয়। আবার বিপরীতমুখি মনোভাবও দেখেছি। অনেকে বলছে সেদিন যদি কিছু মানুষ সশস্ত্র প্রস্তুতি নিয়ে শাপলা চত্বরে থাকতো, তাহলে একতরফা ভাবে মুসলমানদেরকে এভাবে হত্যা করতে পারতো না যৌথবাহিনী। কাজেই তাদের বক্তব্য হলোÑ আগামীতে মাঠে নামতে হলে অস্ত্র নিয়েই নামতে হবে। অস্ত্র ছাড়া নামলে শুধু মার খেতে হবে। আল্লাহর নবীর সৈনিকদেরকে এভাবে হত্যা করার পর জিহাদে ঝাপিয়ে পড়া মুসলমানদের জন্য ফরজ হয়ে গেছে। এমন নানা ভাবনার মধ্য দিয়ে আসলে সঠিক চিন্তা কোনটি তা নির্ধারণ করা সাধারণ মানুষের পক্ষে বড়ই দুস্কর। আর  তাই সম্পূর্ণ বিষয়টির ওপর ইসলামের মূলনীতির আলোকে একটা ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি লালন করা অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিষয়টির পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণের সুবিধার্থে প্রথমে জিহাদ সংক্রান্ত দুটি আলোচনা প্রয়োজন। জিহাদের লক্ষ্য উদ্দেশ্য ও ধাপে ধাপে জিহাদ ফরজ হওয়ার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট।
জিহাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য
ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ও প্রাসঙ্গিকতাসহ জিহাদের উদ্দেশ্য আলোচনা করলে জিহাদের উদ্দেশ্যের একটি দীর্ঘ তালিকা প্রণীত হতে পারে। তবে কোরআন ও হাদিস পর্যালোচনা করে মৌলিকভাবে জিহাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হিসাবে দুটি বিষয়কে নির্ধারণ করা যায়।
এক. আল্লাহর বিধান তথা ইসলামের গৌরব ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠা।
দুই. কুফুর তথা খোদাদ্রহের প্রাবল্য খর্ব করা।
ইসলামি শরিয়তে জিহাদের মতো লড়াই সংঘাতের বিধান অন্তর্ভুক্ত থাকায় ইসলামের স্বভাবজাত দুশমনেরা বেশ সমালোচনামুখর হয়েছে। এবং ইসলামের মধ্যে সম্ভবত জিহাদ নিয়েই তাদের সমালোচনার মাত্রা সবচে বেশি। তাদের সমালোচনার মূল লক্ষ্যই হলো জিহাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য থেকে দৃষ্টি ভিন্ন দিকে ঘুরিয়ে জিহাদের পবিত্র বিধানকে প্রশ্নবিদ্ধ করা।
ইসলাম খুব সরল ও অকৃত্রিমভাবে মানুষকে বিশ্বাস শিক্ষা দিয়েছে যে, পৃথিবীটা হলো স্রষ্টার। পৃথিবীতে মানুষসহ যা কিছু আছে সবই সৃষ্টিকর্তার এখতিয়ারভুক্ত। সৃষ্টিকর্তা  মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এই জগতের শান্তি শৃঙ্খলার জন্য বিধান-ব্যবস্থা দিয়েছেন। যুগের বিবর্তনে স্রষ্টার দেওয়া সর্বশেষ ও চূড়ান্ত ব্যবস্থার নামই হলো ইসলাম। সুতরাং একটা রাষ্ট্রের মধ্যে যেরূপ রাষ্ট্রপ্রণীত বিধিÑবিধানের গৌরব রক্ষা হওয়া এবং রাষ্ট্রদ্রোহ দমন হওয়া যৌক্তিক ও কল্যাণকর পদক্ষেপ বলে বিবেচিত হয়, তদ্রুপ সৃষ্টি জগতে স্রষ্টার মর্যাদা রক্ষা পাওয়া ও খোদাদ্রোহ নির্মূল হওয়ার ব্যবস্থাও প্রশংসিত হতে বাধ্য। খোদাদ্রোহী কুফরি ব্যবস্থা প্রাবল্য নিয়ে  অধিষ্টিত থাকলে মানুষসহ সারা সৃষ্টিজগত তাদের স্রষ্টা প্রদত্ত মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। আর তাই খোদার এই জগতে খোদাদ্রোহের আধিপত্য ও প্রাবল্য মেনে নেওয়া যায় না। সুতরাং স্রষ্টার বিধানের মর্যাদা রক্ষা করা ও খোদাদ্রোহের অধিপত্য খর্ব করা অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গত উদ্দেশ্য। আর এই সুমহান উদ্দেশ্য অর্জনের জন্যই জিহাদের বিধান দেওয়া হয়েছে। কাজেই ইসলামের জিহাদ অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গত ও সুমহান একটি বিধান।
জিহাদ ধাপে ধাপে ফরজ হয়েছে
জিহাদের হাকীকত উপলদ্ধি করতে চাইলে এবং জিহাদ সংক্রান্ত বিভিন্ন বিতর্কের মীমাংসায় পৌঁছতে চাইলে ইসলামি শরিয়তে জিহাদের বিধান অর্ন্তভুক্ত হওয়ার প্রেক্ষাপট ও প্রেক্ষিত নিয়ে আলোচনা জরুরি। জিহাদের প্রেক্ষিত নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে প্রথমেই জানতে হবে যেÑ সকল তাগুত ও কুফুরের বিরুদ্ধে জিহাদের বিধান মহান আল্লাহ তায়ালা সূচনাতেই দেননি। বরং ধাপে ধাপে দিয়েছেন। ধাপগুলো নিুরূপ।
প্রথম ধাপ: জিহাদের বিধানের প্রেক্ষাপট নিয়ে আলোচনায় দেখা যায়, শুরুতে ইসলামি শরিয়তে জিহাদের অনুমতি ছিলো না। বরং নির্দেশ ছিলো শত্র“দের জুলুম নির্যাতন মুখ বুজে সহ্য করা আর ধৈর্য্য ধারণ করার। কোনোরূপ পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণের অনুমতি ছিলো না। আল্লাহর নবী সা. মক্কায় থাকাকালীন তের বছর জুড়েই এমন বিধান বলবৎ ছিলো। এই সময়ে আল্লাহর হুকুম ছিলো ‘আপনাকে যে আদেশ দেওয়া হয় তা আপনি প্রকাশ্যে প্রচার করুন। আর মুশরিকদের সাথে যুদ্ধ-বিগ্রহকে এড়িয়ে চলুন।’ (সুরা হিজর : ৯৪) ‘আপনি ক্ষমার নীতি অবলম্বন করুন। সৎ কাজের আদেশ দিন আর মুর্খ লোকদের এড়িয়ে চলুন।’ (সুরা আরাফ : ১৯৯)
মক্কি জিন্দেগিতে নবীজি সা. তার প্রিয় সাহাবিদের বলতেন ‘আমাকে ক্ষমা করতে বলা হয়েছে। সুতরাং তোমরা যুদ্ধে লিপ্ত হয়ো না। (নাসায়ি-বাইহাকি)
ইমাম কুরতুবি রহ. লিখেছেন ‘আল্লাহর নবীকে মক্কায় থাকাকালীন জিহাদের অনুমতি দেওয়া হয়নি।
দ্বিতীয় ধাপ: সুদীর্ঘ তের বছর একতরফা ভাবে জালেম কাফের গোষ্ঠীর সবধরনের নির্যাতন ও নিগ্রহের শিকার হয়ে নবীজি সা. মদিনায় হিজরত করলেন। মুসলমানদের জন্য নিরাপদ একটা আশ্রয়ের ব্যবস্থা হলো। কিছু শক্তিও সঞ্চিত হলো। তখন মহান আল্লাহ তায়ালা মুসলমানদের জিহাদের অনুমতি দিলেন। জিহাদ করতে বাধ্য করলেন না। বরং জিহাদের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে শুধু অনুমতি দিলেন। যারা স্বেচ্ছায় জিহাদ করতে আগ্রহী কেবলমাত্র তারাই জিহাদ করবে। এমন বিধান সম্বলিত আয়াত অবতীর্ণ হলো। ‘যারা আক্রান্ত হয় তাদেরকে (পাল্টা আক্রমণ তথা জিহাদের) অনুমতি দেওয়া হলো। যেহেতু তারা অত্যাচারিত। নিশ্চয় আল্লাহ তাদেরকে সাহায্য করতে সক্ষম।’ (সুরা হজ : ৩৯)
সুরা হজের এই আয়াতের অনুকূলে ইমাদুদ্দিন ইবনে কাসির রহ. লিখেছেন ‘অনেক পূর্বসূরীদের মতে এটিই হলো জিহাদের স্বপক্ষে অবতীর্ণ প্রথম আয়াত।
এভাবেই দীর্ঘদিন নিষিদ্ধ থাকার পর প্রথমেই সীমিত পর্যায়ে অর্থাৎ কাফেরদের দ্বারা মুসলমানগণ আক্রান্ত ও নির্যাতিত হওয়ার প্রেক্ষিতে স্বেচ্ছায় জিহাদ করেত ইচ্ছুকদেরকে জিহাদের অনুমতি প্রদান করা হলো।
তৃতীয় ধাপ: তৃতীয় ধাপে শুধু ঐচ্ছিক পর্যায়ের অনুমতি নয়। বরং কাফের জালেমদের দ্বারা মুসলিম জনপদ বা জনগোষ্ঠী আক্রান্ত হলে তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর অব্যশ্যকীয় বিধান দেওয়া হলো। অর্থাৎ এখন আর জিহাদ ঐচ্ছিক বিধান রইল না। বরং আক্রান্ত হলে পাল্টা আক্রমন ও রুখে দেওয়ার নিমিত্তে জিহাদ করা ফরজ হয়ে গেল। এই পর্যায়ে পবিত্র কোরআন পাকের আয়াত অবতীর্ণ হলো। ‘যারা তোমাদের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেয় তোমরা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো। আর সীমালঙ্ঘন করো না। নিশ্চয় আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীকে পছন্দ করেন না।’ (সুরা বাকারা : ১৯০)
চতুর্থ ধাপ: শুধু আক্রান্ত হওয়ার পরই নয় বরং আল্লাহর বিধানের বিজয় ও খোদাদ্রোহী শক্তির আধিপত্য ও প্রাবল্য খর্ব করার লক্ষে যেখানেই ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো আদর্শের বিজয় প্রতিষ্ঠিত থাকবে আল্লাহ তায়ালার সেই জমিনকে সেই হানাদারের কবল থেকে  মুক্ত করে সেখানে জিহাদ করাকে ফরজ করা হলো। জিহাদের মাধ্যমে খোদাদ্রোহী শক্তি অধ্যুষিত সকল ভূখণ্ডকে মুক্ত স্বাধীন করতে মুসলমানদের ওপর অবশ্যিক বিধান জারি করা হলো। সুরা তওবায় আল্লাহ তায়ালা বিস্তারিত হুকুম ঘোষণা করলেন। ৯ম হিজরি সনের হজ্বের প্রাক্কালে অবতীর্ন আল্লাহর এই হুকুম আল্লাহ ও তার নবী সা. এর পক্ষ থেকে আবু বকর সিদ্দিক রাযি. এর নেতৃত্বে আলী রাযি. হজ্বের সময় ঘেষণা করে শুনালেন।
‘সম্মানিত মাসগুলো (জিলকদ, জিলহজ্ব ও মুহাররম) শেষ হওয়ার পর খোদাদ্রোহী মুশরিকদেরকে যেখানে পাবে হত্যা করবে। তাদেরকে পাকড়াও করবে, আবদ্ধ করবে আর ওঁৎপেতে থাকবে  তাদের জন্য প্রতিটি ঘাটিতে।’ (সুরা তওবা:৫)
একই সুরায় আল্লাহ তায়ালা বলেছেন ‘আহলে কিতাবদের মধ্য থেকে যারা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে না এবং আল্লাহ ও তার রাসুল সা. যা কিছু হারাম করেছেন সেগুলোকে হারাম মানে না এবং সত্য দ্বীন অনুসরণ করে না, তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কর যে পযর্ন্ত না তারা নত হয়ে জিযইয়া (কর) আদায় করে। (সুরা তওবা : ২৯)
আর সুরা আনফালের বক্তব্য তো আরও দ্বার্থহীন ‘আর তোমরা কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কর যতক্ষন না ফিতনা নির্মূল হয়। এবং সম্পূর্ণ আল্লাহর আনুগত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। (সুরা আনফাল:৩৯)
ফিতনা অর্থ আল্লাহর বিধান পালনে প্রতিবন্ধকতা থাকা। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সকল ক্ষেত্রে আল্লাহর যত বিধান আছে এই বিধান শতভাগ বাস্তবায়িত করার পথে সকল বাধাÑপ্রতিবন্ধকতা যতদিন সম্পূর্ণরূপে উৎখাত না হবে ততদিন এ কথা বলা যাবে না যে, ফিতনা নির্মূল হয়েছে। আর এটা সম্ভব জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর দ্বীন কায়েমের মাধ্যমে। তাই সুরা আনফালের এই আয়াত দ্ব্যর্থহীনভাবে সারা পৃথিবীতে ইসলাম কায়েম না হওয়া পযর্ন্ত জিহাদ করাকে মুসলমানদের ওপর ফরজ করে দিয়েছে।

Share

বিশ্ব ইজতেমায় দাওয়াতী কাজের জযবা সৃষ্টি হয়

-মাওলানা মাহফুজুল হক

মাওলানা মাহফুজুল হক। শাইখুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক রহ. এর যোগ্য উত্তরসূরি। জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়ার স্বনামধন্য প্রিন্সিপাল। একই সঙ্গে বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব এবং বাংলাদেশে খেলাফত মজলিস-এর ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব। তাবলিগ সংক্রান্ত স্মৃতি, অনুভূতি, ও চলমান কার্যক্রমসহ নানা বিষয় নিয়ে ইজতেমা বার্তার পক্ষে তার মুখোমুখি হন আমিন ইকবাল।

ইজতেমা বার্তা : জীবনে প্রথম তাবলিগে যান কবে?
মাওলানা মাহফুজুল হক : যতদূর মনে পড়ে, কিতাব বিভাগের শুরুর দিকে পড়া অবস্থায় আমার বয়স যখন ১২/১৩ বছর তখন মসজিদ ওয়ারি তাবলিগের সাপ্তাহিক গাস্ত, তালীম ইত্যাদি কাজে শরিক হই। পরবর্তী কয়েক বছর পর চব্বিশ ঘণ্টার জামাতে ছাত্রদের সঙ্গে অংশ গ্রহণ করি। আর তিনদিনের জামাতে প্রথম যাই ১৯৯২ সালে দ্বিতীয়বার দাওরায়ে হাদিস পড়ার জন্য দারুল উলুম দেওবন্দে ভর্তি পরীক্ষা দেওয়ার পর, ফলাফল প্রকাশের আগের সময়টুকুতে।

ইজতেমা বার্তা : সাল বা চিল্লায় যাওয়ার সুযোগ হয়েছে কখনো?
মাওলানা মাহফুজুল হক : সালে যাওয়ার সুযোগ হয়নি। তবে, চিল্লায় যাওয়ার সুযোগ একবার আল্লাহ তায়ালা করে দিয়েছিলেন। দাওয়াতের সে সফর ছিলো ২০০১ সালে মোমেনশাহীর ফুলপুর থানায়।

ইজতেমা বার্তা : তাবলিগের কাজে দেশ-বিদেশে কোথায় কোথায় সফর করেছেন?
মাওলানা মাহফুজুল হক : দেশে তো চিল্লা উপলক্ষে মোমেনশাহী সফর হয়েছে। বিদেশে শুধুমাত্র তাবলিগের কাজে কোনো সফর হয়নি। তবে, দেওবন্দে থাকা অবস্থায় তাবলিগের কাজে তিনদিন সময় দেওয়া হয়েছে। তখন তাবলিগের মারকাজ নেযামুদ্দীনে যাওয়াও সুযোগ হয়েছিলো।

ইজতেমা বার্তা : তাবলিগ সংশ্লিষ্ট বিশেষ কোনো ঘটনা মনে পড়ে?
মাওলানা মাহফুজুল হক : আমাদের শ্রদ্ধেয় আব্বাজান, শাইখুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক রহ. একবার তিনদিনের তাবলিগে গেণ্ডারিয়া এলাকার এক মসজিদে যান। শায়েখের সঙ্গে মাদরাসার কয়েকজন মুহাদ্দিস-উস্তাদ, মাদরাসার কমিটি এবং এলাকার মুরব্বিরাও অংশগ্রহণ করেন। সেখানে শায়েখের যাওয়াকে কেন্দ্র করে কাকরাইলের অনেক মুরব্বি আসেন। শায়েখ গুরুত্বপূর্ণ বয়ান রাখেন। সে বয়ানে কাকরাইলের মুরব্বিগণসহ এলাকার সাধারণ মুসল্লিরা খুব আপ্লুত হন। তখনকার চিত্রটা আমার আজও মনে পড়ে।

ইজতেমা বার্তা : জীবনের প্রথম ইজতেমায় যাওয়া হয় কবে?
মাওলানা মাহফুজুল হক : সুনির্দিষ্টভাবে মনে পড়ছে না। তবে, যতটুকু মনে হয় বিছানাপত্র নিয়ে তিনদিনের জন্য হেদায়েতুন্নাহু পড়ার সময় যাওয়া হয়েছিলো। তখন লালবাগ মাদরাসায় পড়ি।

ইজতেমা বার্তা : বাংলাদেশের বরেণ্য আলেমদের জন্য ইজতেমার মাঠে খাস রুমের ব্যবস্থা থাকে। শাইখুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক রহ. এর জন্যও ছিল। সে রুমে শায়েখের সঙ্গে যাওয়া হয়েছে কখনো? সেখানকার কিছু চিত্র যদি বর্ণনা করতেন।
মাওলানা মাহফুজুল হক : হ্যাঁ, শায়েখের সঙ্গে যাওয়া হয়েছে। সেখানে বাংলাদেশের বড় বড় মুরব্বি আলেমগণ উপস্থিত হন। তাদের জন্য কয়েকটি খাস রুমের বিশেষ ব্যবস্থা রয়েছে। শায়েখের জন্যও ছিলো। শায়েখের জীবদ্দশায় আমি দেখেছি, বর্তমানে হাটহাজারির হুজুর আল্লামা আহমদ শফি দা. বা., বসুন্ধরার মুফতি আব্দুর রহমান সাহেব, কুমিল্লার আল্লামা আশরাফ আলী সাহেব, ফরিদাবাদ মাদরাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা আব্দুল কুদ্দুস সাহেবসহ ঢাকার বড় বড় আলেম-ওলামা সেখানে উপস্থিত হতেন। বয়ান শুনতেন। বড় বড় আলেমদের একসাথে পাওয়ার সুবর্ণ সুযোগ তৈরি হয় সেখানে।

ইজতেমা বার্তা : ইজতেমার মাঠে অনেক মুসল্লিদের বলতে শোন যায় যে, বিদেশি মেহমানদের চেয়ে বাংলাদেশি মুরব্বি বা আলেমগণ বাংলায় বয়ান করলে আমাদের বুঝতে সুবিধা হতো। এ বিষয়টি আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করবেন।
মাওলানা মাহফুজুল হক : তাবলিগের মুরব্বিগণ পরামর্শের মাধ্যমে যে তরতিব বা নিয়ম চালু করেছেন, আমি মনে করি গুরুত্বের দিক থেকে সেটাই বেশি গ্রহনীয়। কারণ, বিদেশি মেহমানদের বয়ানে গুরুত্ব থাকে বেশি। আলেম-ওলামা, সাধারণ মুসল্লিসহ সবারই আলাদা আগ্রহ থাকে তাদের প্রতি। তাছাড়া সে সব বয়ানের তো বাংলায় সুন্দরভাবে অনুবাদ করার ব্যবস্থাও আছে। বাংলাদেশি মুরব্বিরাও প্রতিদিন কোনো না কোনো বয়ান করেন। যারা এমন প্রশ্ন তুলেন, আমার মনে হয় তাদের সংখ্যা খুবই অল্প।
ইজতেমা বার্তা : দাওয়াত ও তাবলিগের চলমান কার্যক্রম সম্পর্কে কিছু বলুন।
মাওলানা মাহফুজুল হক : বিশ্বব্যাপী তাবলিগের কাজ আল্লাহর রহমতে একই সূত্রে পরিচালিত হচ্ছে। সৌভাগ্যের বিষয় হলো, দাওয়াতের এ কাজ আমাদের ভারত উপমহাদেশ থেকেই শুরু হয়েছে। এবং এর মূল কেন্দ্র উপমহাদেশের ভারতে। গুরুত্বপূর্ণ সব কাজ পরিচালিত হয় ভারত, পাকিস্তান আর বাংলাদেশ থেকে। সব মিলিয়ে তাবলিগের চলমান কার্যক্রম অব্যশই প্রশংসার দাবি রাখে। বাকি, এক্ষেত্রে আমার একটু কথা হলো, ওলামায়ে কেরামগণ নিজেদের অন্যান্য দ্বীনি কাজ ঠিক রেখে তাবলিগে যেমন সময় আরেকটু বেশি দেওয়া উচিত, তাবলিগের মুরব্বিদেরও উচিত আলেমদের সঙ্গে বেশি বেশি যোগাযোগ রাখা এবং তাবলিগের কাজে আলেমদের আরও সম্পূক্ত করার চেষ্টা করা এবং তাবলিগ সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ গ্রহণ করা। কারণ, আলেম-ওলামাগণ ওভাবে সময় না দিতে পারলেও তাবলিগের কল্যাণে পরামর্শ দেওয়ার মতো যোগত্য তারা রাখেন এবং দাওয়াদের কাজে যথেষ্ট পরিমাণ আগ্রহ রাখেন।

ইজতেমা বার্তা : মাদরাসার ক্লাস বন্ধ রেখে বিশ্ব ইজতেমায় ছাত্রদের অংশ গ্রহণের গুরুত্ব কতটুকু?
মাওলানা মাহফুজুল হক : বুঝমান ছাত্রদের জন্য ক্লাস বন্ধ রেখে বিশ্ব ইজতেমায় অংশগ্রহণ করাটাই আমি শ্রেয় মনে করি। কারণ, আমাদের এই কওমি মাদরাসায় তালীমের পাশাপাশি সমভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয় তারবিয়াতের প্রতি। দাওয়াত ও তাবলিগের সঙ্গে সম্পৃক্ততা ছাত্রদের তারবিয়াতের লাইনে অনেকটা অগ্রসর করে দেয়। বিশ্ব ইজতেমা যেহেতু তাবলিগেরই অন্যতম অংশ, সেখানে শরীক হতে পারা এবং দেশ-বিদেশের হাজার হাজার ওলামায়ে কেরাম, বুজুর্গানেদ্বীন এবং লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ মুসল্লির সঙ্গে একত্রে থাকতে পারা সৌভাগ্যের বিষয়। এতে করে ছাত্রদের মাঝে দাওয়াতী কাজের জযবা সৃষ্টি হয়।

 

Share

বিশ্ব ইজতেমা আমাদের জন্য আল্লাহর বড় নিয়ামত

মাওলানা মাহফুজুল হক

আগামি কাল থেকেই শুরু হতে যাচ্ছে বিশ্ব ইজতেমার প্রথম অংশ। এ অংশে ঢাকাসহ অনেক জেলার জমায়েত হবে টঙ্গীর ঐ তুরাগ নদীর তীরে। মুখে লা-ইলাহার জিকির আর অন্তরে দ্বীনের দাওয়াতের  অধম্য  স্প্রীহা নিয়ে  ইতোমধ্যে রওয়া হয়েছে তাবলীগের সাথীরা।

রাহমানিয়া  বরাবরই একাজে অংশগ্রহণ করে সকলের আগে। হযরত শাইখুল হাদিস রহ.  বলতেন- তাবলীগ  হলো জীবনের  মিশন। তাই  তিনি  আমরণ  দাওয়াতে তাবলীগকে  শুধু সমর্নই করতেন  না বরং  স্বীয়ং তিনি একাজে সময় দিয়েছেন এবং প্রতি বছর  শত কষ্ট সহ্য করে সেখানে উপস্থিত থাকতেন।   তারই সুযোগ্য উত্তরসূরি মাওলানা  মাহফুজুল দা.বা. তিনিও দাওয়াতের নিসবতে কয়েকবার চিল্লা ও তাবলীগে সময় দিয়েছেন এবং বতর্মানেও দিয়ে যাচ্ছেন।

তিনি আজ রাহমানিয়ার ছাত্রদের হেদায়াতি বয়ানে বলেছেন- বিশ্ব ইজতেমা আমাদের জন্য আল্লাহর বড় এক নেয়ামত। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে লক্ষ লক্ষ আল্লাহর নেক বান্দারা এ ইজতেমায় অংশগ্রহণ করে।  দাওয়াতি কাজকে বেগবান করার  জন্য আলম ব্যাপী ফিকির হয়।  কাজেই সেখানে উপস্থিত হতে পারা সৌভাগ্যের বিষয়। তোমরা সেখানে তাদের উসূল ও নিয়ম-কানূন মেনে চলবে। এবং সেখন থেকে দাওয়াতি মেজাজ ও বড়দের গুলো নোট করে সেগুলো আমলে আনার চেষ্টা করবে।

ওখান থেকে আমলের জজবা ও প্রেরণা তৈরি করবে। তোমাদের সকল কাজ  যেনো অন্যের অনুকরনীয় হয়- কিছুতে মাদরাসার বদনা হতে দিবে না। ইত্যাদি বিষয়ে গুরুত্বপূণ হেদায়াত প্রদান করেন।

আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে বিশ্ব ইজতেমায় অংশগ্রহণ ও এ মহ’ত কাজে অংশগ্রহণ করার তাউফিক দান করুন। আমীন।

Share

সরকার স্বীকৃতি নিয়ে কওমি উলামার মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে

 

মাওলানা মাহফুজুল হক। রাজধানী ঢাকার অন্যতম বড় মাদরাসা জামিআ রাহমানিয়া আরাবিয়ার প্রিন্সিপাল। তার আরেকটি বড় পরিচয় তিনি শায়খুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক রহ.-এর বড় ছেলে। দীর্ঘদিন ধরে তিনি বাংলাদেশ কওমি মাদরাসা শিক্ষাবোর্ডের সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। রাজনীতির ময়দানে সরব আছেন শায়খুল হাদীস প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমির হিসেবে। এছাড়া হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় নেতা তিনি। সম্প্রতি কওমি মাদরাসার সনদের স্বীকৃতি, হেফাজতে ইসলাম, কওমি শিক্ষাব্যবস্থাসহ আরো নানা বিষয়ে তিনি কথা বলেন সাপ্তাহিক লিখনীর সঙ্গে। তার সঙ্গে কথা বলেছেন

সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর ও এহসান সিরাজ

লিখনী : কওমি মাদরাসার স্বীকৃতি নিয়ে সম্প্রতি যে প্রীতিকর-অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটছে, এই ঘটনাগুলোকে আপনি কোন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছেন?
মাওলানা মাহফুজুল হক : এখানে তো আসলে আমার ব্যক্তিগত কোনো দৃষ্টিকোণ নেই। আমি যেহেতু কওমি মাদরাসার শিক্ষাবিষয়ক একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দীর্ঘদিন যাবত যুক্ত আছি সে কারণে আমার যে মতামত সেটা বেফাকের বক্তব্য হিসেবেই গণ্য হবে।
স্বীকৃতির দাবিটা প্রথম যখন তোলা হয় তখন কওমি মাদরাসার জন্য সেটাকে ভালো মনে করেই তোলা হয়েছিলো এবং এ জন্য বিভিন্নমুখী পদক্ষেপও গ্রহণ করা হয়েছিলো। এই স্বীকৃতির বড় দিকটা হলো, এর দ্বারা কওমি আলেমদের একটা সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে এবং সামাজিকভাবে আলেমদের দ্বীনি কাজ করার ক্ষেত্র আরো বিস্তৃত ও গ্রহণযোগ্য হবে। এমন একটা চিন্তা নিয়েই সনদের স্বীকৃতির প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছি এবং এর জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ এবং আন্দোলন হয়েছে। সেই সঙ্গে ওলামায়ে কেরাম এটাও চেয়েছেন, এই স্বীকৃতির নামে সরকারি কোনো হস্তক্ষেপ বা নিয়ন্ত্রণ যেন কওমি মাদারাসার ওপর না আসে। এটাই স্বীকৃতির সবচেয়ে খারাপ এবং চিন্তার দিক। শুরু থেকে আজ পর্যন্ত যারা স্বীকৃতির দাবি করছেন, তারা এই বিষয়টির ওপর পূর্ণ লক্ষ্য রেখেই তাদের দাবিতে অটল আছেন। এটাই মূলত আমাদের দাবি।
লিখনী : সরকার আপনাদের শিক্ষাকে সরকারি স্বীকৃতি দেবে অথচ তারা আপনাদের কোনোভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না, এটা কীভাবে সম্ভব?
মাওলানা মাহফুজুল হক : হ্যাঁ, এটা অবশ্যই সম্ভব। বৃটিশ আমলে ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দের সনদের স্বীকৃতি ছিলো এবং এখন পর্যন্ত আছে। সেই স্বীকৃতির কারণে দারুল উলুম দেওবন্দসহ ভারতের বড় বড় মাদরাসার ওপর সরকারের কোনো ধরনের নিয়ন্ত্রণ নেই।
লিখনী : এই স্বীকৃতিটা কি শুধু দারুল উলুম দেওবন্দকেন্দ্রিক নাকি পুরো ভারতের কওমি মাদরাসাগুলোরও একইভাবে স্বীকৃতি দেয়া হয়?
মাওলানা মাহফুজুল হক : পুরো ভারতের ব্যাপারটা আমার জানা নেই। দারুল উলুম দেওবন্দের ব্যাপারটা আমার পুরোপুরি জানা আছে। সেখানকার বড় বড় সব কওমি মাদরাসার সনদের স্বীকৃতি আছে এবং সরকার এসব মাদরাসায় কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করেন না।
লিখনী : পাকিস্তানে স্বীকৃতির ব্যাপারটা কেমন?
মাওলানা মাহফুজুল হক : পাকিস্তানেও একইভাবে কওমি মাদরাসার সনদের স্বীকৃতি আছে, তবে সেগুলোর মধ্যে সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত নেই। তাদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন বিগত প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফ। এর প্রতিবাদে পাকিস্তানের আলেমরা বলেছিলেন, দরকার হলে আমরা গাছের নিচে বসে শিক্ষাদান করবো, তবুও সরকারের নিয়ন্ত্রণ মেনে নেবো না। লাল মসজিদ ট্রাজেডিও এই দাবিকে কেন্দ্র করেই ঘটেছিলো।
লিখনী : আপনার কি মনে হয় বর্তমান সরকার যেভাবে স্বীকৃতি দিতে চাচ্ছে, সেভাবে কওমি মাদরাসার উপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হবে?

মাওলানা মাহফুজুল হক : হ্যাঁ, আমরা মনে করি বর্তমানে যে আলোকে স্বীকৃতি দেয়া হচ্ছে এবং স্বীকৃতির জন্য যেভাবে কিছু মানুষ মাঠে নেমে গেছে তাতে সরকারি হস্তক্ষেপ এবং সরকারের নিয়ন্ত্রণ আবশ্যিকভাবেই কওমি মাদরাসাকে গ্রাস করবে।
লিখনী : অনেক বড় বড় আলেমই স্বীকৃতির ব্যাপারে ইতিবাচক কথা বলেছেন এবং সরকারের এই শর্তের মধ্যেই স্বীকৃতি নিতে আগ্রহী।
মাওলানা মাহফুজুল হক : যারা এটাকে সাধুবাদ জানাচ্ছেন, আমার মনে হয় তাদের কাছে স্বীকৃতির ভালো দিকটাই কেবল দেখানো হয়েছে এবং তারাও শুধু এর ভালো দিকটাই দেখছেন। স্বীকৃতির খারাপ দিকটা হয়তো তারা এখন পর্যন্ত সেভাবে বুঝে ওঠতে পারেননি। কারণ এই স্বীকৃতিদানের ব্যাপারে সরকারের কিছু লোকও কাজ করছে। এই লোকগুলো এই আলেমদের সামনে স্বীকৃতির শুধু ভালো দিকটাই তুলে ধরছে। এর খারাপ দিকগুলো তারা সেভাবে বুঝতে পারছেন না বা বুঝতে দেয়া হচ্ছে না।

লিখনী : অনেকেই অভিযোগ করে বলছেন, আওয়ামী লীগ সরকার স্বীকৃতি দেয়ার কারণে আপনারা স্বীকৃতি নিচ্ছেন না। বিএনপি সরকার দিলে ঠিকই নিয়ে নিতেন!
মাওলানা মাহফুজুল হক : এ কথাটা বাস্তবতার নিরীখে সত্য নয় বলে আমি প্রমাণ করবো এভাবেÑ এই সরকারের আমলে বেফাকুল মাদারিসসহ হেফাজতের নেতৃবৃন্দ, যাদের ব্যাপারে এসব কথা বলা হচ্ছে তারাই স্বীকৃতির ব্যাপারে এই সরকারের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এতো ব্যাপকভাবে দুই দুইবার সাক্ষাৎ করেছেন যে ইতোপূর্বে আর কোনো আলেম বা কেউ সাক্ষাৎ করেননি। কিছুদিন আগে যে কওমি মাদরাসার জন্য কমিশন গঠন হলো, সেটা নিয়ে নানা বিতর্ক জন্ম নিয়েছে। তবুও বিতর্ককে পিছনে ফেলে তারা আলোচনা এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন। যদি তারা এই সরকারের অধীনে স্বীকৃতি নিবেন না, এমন মনোভাব রাখতেন তাহলে তারা সরকারের কোনো কার্যক্রমেই সহযোগিতা করতেন না।

লিখনী : বর্তমান সরকার যে পদ্ধতিতে স্বীকৃতি দিতে চাচ্ছে সেখানে আপনাদের দাবির সঙ্গে কী কী অসামঞ্জস্য দেখতে পাচ্ছেন?
মাওলানা মাহফুজুল হক : আমরা মৌলিক যে অসামঞ্জস্য দেখছি, স্বীকৃতি দেয়ার যে প্রক্রিয়াÑ তারা একটা কমিশন গঠন করবে, সেখানে একজন চেয়ারম্যান থাকবে, কিছু সদস্য থাকবে। তবে সেখানকার সবাই কওমি ঘরানারই হবেন, শুধু যুগ্মসচিব বা এই পর্যায়ের একজন কমিশনে থাকবেন। এখন প্রশ্ন হলো, এই যে কমিশন গঠন করার কথা বলা হচ্ছে, এই কমিশন গঠন করবে কে? গঠন করবে সরকার। চেয়ারম্যান নিয়োগ দিবে সরকার, সদস্য নিয়োগ দিবে সরকার এবং এই নিয়োগটা খসড়া আইন অনুযায়ী আমরা দেখতে পাচ্ছি, সেটা একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত হবে। দুই বছর, তিন বছর বা পাঁচ বছরÑ একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত এই নিয়োগ বলবৎ থাকবে। তারপর নতুন সদস্য নেয়া হবে। আবার সরকার চাইলে যে কোনো সময় যে কোনো সদস্যকে বাদ দিয়ে নতুন সদস্য নিতে পারে। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, কওমি মাদরাসার সনদের ব্যাপারে সার্বিকভাবে এই কমিশনই মূল অথরিটির ভূমিকা পালন করবে এবং এই অথরিটিকে পরিচালনা করবে সরকার। আর যখন সরকার কর্তৃক কওমি মাদরাসায় কোনোভাবে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হয়ে যাবে তখন সেখানে কওমি মাদরাসার স্বাতন্ত্র্য বলতে আর কিছু থাকবে বলে আমার মনে হয় না। আমরা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, এই স্বীকৃতি দ্বারা সরকার সেই পথই সুগম করছে।

লিখনী : আপনারা কোন পদ্ধতিতে স্বীকৃতি চাচ্ছেন?
মাওলানা মাহফুজুল হক : বাংলাদেশে কওমি মাদরাসার শিক্ষার মান উন্নয়ন এবং সার্বিক কল্যাণ কামনায় একটি প্রতিষ্ঠান ৩৫ বছর ধরে কাজ করে আসছে। সেটি বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ (বেফাক)। তারা তাদের কর্মদক্ষতা, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ, ঐক্যবদ্ধ কার্যক্রম দিয়ে প্রমাণ করতে পেরেছে যে, তারা এই দেশের কওমি মাদরাসার জন্য কাজ করতে সবার চেয়ে অগ্রগামী এবং দক্ষ। ঢাকার মাত্র দুটি মাদরাসা বাদে সব মাদরাসাই এই বোর্ডের অধীনে। এর বাইরে সারাদেশের ৮০ ভাগের বেশি মাদরাসার শিক্ষা-কার্যক্রমের নিয়ন্ত্রণ বেফাকের হাতে। এসব মাদরাসার শিক্ষা-কার্যক্রমের উন্নয়নে বেফাক কিন্তু তাদের যোগ্যতা প্রমাণ করেছে। এখন কওমি মাদরাসার ভালোর জন্য, উন্নয়নের জন্য যদি স্বীকৃতি দেয়া হয় তবে সেটা বেফাকের অধীনেই দেয়া হোক। এর জন্য কিছু লোককে যদি বেফাকের সঙ্গে যুক্ত করতে হয় তবে সেটা আলোচনার মাধ্যমে করা হোক এবং এ ব্যাপারে বেফাক আন্তরিক। এভাবে যদি স্বীকৃতি দেয়া হয় তবেই সেটা সরকারের নিয়ন্ত্রণমুক্ত থাকবে বলে আমরা মনে করি।

লিখনী : আওয়ামী লীগ সরকার যদি আপনাদের এ দাবি মেনে নিয়ে স্বীকৃতি দেয় তাহলে কি আপনারা স্বীকৃতি নেবেন?
মাওলানা মাহফুজুল হক : অবশ্যই। এই সরকারের আমলে আমরা সনদের স্বীকৃতি চেয়ে স্মারকলিপি দিয়েছি। আমরা যদি স্বীকৃতি নাই-ই চাইতাম তাহলে স্মারকলিপি দিতে যাবো কেনো?
লিখনী : এই স্বীকৃতি দেয়া-না দেয়ার ব্যাপারে ধারণা করা হচ্ছে রাজনীতি একটা বড় ফ্যাক্টর। আপনার দৃষ্টিতে এই স্বীকৃতির ব্যাপারে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা কতোটুকু?
মাওলানা মাহফুজুল হক : রাজনৈতিক কিছু সংশ্লিষ্টতা এখানে থাকতে পারে। সরকারি দল-বিরোধী দল রাজনীতি করে। কওমি আলেমরাও ব্যাপকভাবে রাজনীতি করেন। এসব এড়িয়ে সরকার এবং কওমি আলেমরা যদি একটি সমঝোতায় আসতে পারেন তাহলে স্বীকৃতি সম্ভবপর বলে আমি মনে করি।

লিখনী : স্বীকৃতি নিয়ে বলা হচ্ছে, সরকারের শর্ত অনুযায়ী স্বীকৃতি যদি দেয়া হয় তাহলেও সরকারের লাভ। এতে সরকার কওমি মাদরাসার উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারবে। আর যদি স্বীকৃতি না-ও দেয় তবু তারা কওমি আলেমদের মাঝে স্বীকৃতির পক্ষ-বিপক্ষ নিয়ে একটা বিভেদ সৃষ্টি করতে পারবে। দু’দিকেই সরকারের লাভ। ব্যাপারটিকে কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?
মাওলানা মাহফুজুল হক : এ ব্যাপারে আমরা আগে থেকেই বলছি, প্রথম থেকেই স্বীকৃতি নিয়ে সরকারের কার্যক্রমে একটা ষড়যন্ত্র একটা চক্রান্তের আভাস পাই। স্বীকৃতি নিয়ে প্রথমদিকে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যখন বৈঠক হলো তখনই কমিশন গঠনের ব্যাপারে চূড়ান্ত আলোচনা হয়। তখন স্বীকৃতি নিয়ে দুটি পক্ষ ছিলো। কিন্তু বাস্তবতার আলোকে কমিশন গঠনের ক্ষেত্রে যাদের প্রাধান্য দেয়া দরকার তাদের প্রাধান্য দেয়া হয় না। আবার তারা বলে আপনারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে আসতে পারছেন না এজন্য স্বীকৃতি দেয়া হচ্ছে না। দোষটা আমাদের ঘাড়ে রেখে বিষয়টিকে তারা দীর্ঘদিন এড়িয়ে গেছে।
লিখনী : অনেকে বলছেন, এখানে স্বীকৃতিটাই তো মুখ্য, সেটা কওমি অঙ্গনের যে কারো অধীনে হলেই তো হয়।
মাওলানা মাহফুজুল হক : ব্যাপারটা আপনি নির্বাচন দিয়ে চিন্তা করুন। নির্বাচনে সবাই কিন্তু এক দলকে ভোট দেয় না। যারা বেশি ভোট পায় তারাই সরকার গঠন করে। অধিকাংশের ম্যান্ডেটটাই ধর্তব্য। কওমি মাদরাসার কমিশন গঠনে সরকার এই পদ্ধতিকে সম্পূর্ণভাবে এড়িয়ে গেছে। তারা যদি সারাদেশের মাদরাসার দায়িত্বশীলদের নিয়ে বসে দেখতো যে তারা যেটা চায় সেভাবেই কমিশন গঠন করা হবে। কিন্তু তারা সেদিকে না গিয়ে দীর্ঘদিন এ স্বীকৃতির ব্যাপারটি আটকে রাখে। তারা শুধু বলেÑ আপনারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে আসেন।
দীর্ঘ সময় যাওয়ার পরে ২০১২ সালে যখন কমিশন গঠন করা হলো, কমিশন গঠনের সেই বৈঠকে মাত্র দুজন কওমি আলেম ছিলেন। একজন মাওলানা ফরীদউদ্দীন মাসঊদ অন্যজন মাওলানা রুহুল আমীন। তারপরও বেফাকের দায়িত্বশীলরা মনে করলেন, কওমি মাদরাসার স্বীকৃতিটা যখন দরকার এবং তারাও যেহেতু আমাদেরই লোক-কওমি আলেম, তাদের দ্বারাই কওমি কমিশন গঠন হোক। উনারা যেটা চাচ্ছেন সেটাই হোক, আবার আমরা যে দাবিগুলো করছি সেগুলো উনাদের মাধ্যমেই বাস্তবায়িত হোক। সেমতে তাদেরকে সহযোগিতার আশ্বাস দেয়া হলো এবং বলা হলো, বেফাক যেহেতু বড় প্রতিষ্ঠান সে হিসেবে বেফাকেরও দু-একজন প্রতিনিধি আপনারা কমিশনে রাখেন। কিন্তু তারা সে ব্যাপারে রাজি হলেন না। এই কাজটির মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছিলেন ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ডিজি সামীম আফজাল। তাকে বলা হলে তিনি প্রথমে আশ্বাস দিলেও পরবর্তীতে তাদের বাধার সম্মুখীন হয়ে এ দাবিকে নাকচ করে দেন।
যা হোক, সরকার এই দুজনকে নিয়েই পরবর্তীতে কওমি কমিশন গঠন করে ফেললেন। এরপর এ দুজনের সঙ্গে ঘরোয়াভাবে দীর্ঘ আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বেফাকের মহাসচিব মাওলানা আব্দুল জব্বার সাহেবকে সে কমিশনে রাখা হয়। এসব ঘরোয়া বৈঠকে কিছু শর্তের ব্যাপারে দুই পক্ষই সম্মত হয়। এরপর সরকারিভাবে কমিশনের প্রথম বৈঠকে গিয়ে এই দুইজন পূর্বে আলোচিত এবং সম্মত হওয়া সমস্ত শর্ত অস্বীকার করে বসেন।
এই বৈঠকের পর বেফাকের নীতি নির্ধারণী কমিটির বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, আমাদের শর্ত মেনে কমিশন গঠন করতে হলে আমাদের দাবি অনুযায়ী সেটা শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে গেজেট আকারে প্রকাশ করতে হবে। এর আগে আমরা কমিশনের আর কোনো বৈঠকে যাবো না এবং চেয়ারম্যানও কমিশনের কোনো বৈঠক ডাকবেন না।
এরপর এ নিয়ে আলোচনা একদম চুপচাপ। দীর্ঘদিন পর কোনো রকমের কোনো মিটিং ছাড়াই হঠাৎ তারা কমিশনের রিপোর্ট পেশ করে সবাইকে বোকা বানিয়ে দেন। কিন্তু চেয়ারম্যান সংবাদ সম্মেলন করে এই রিপোর্ট প্রত্যাখ্যান করেন। তবু তাদের কার্যক্রম থেমে নেই। সর্বশেষ ১৩ এপ্রিল ২০১৩ তারা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করে কমিশনের রিপোর্ট পেশ করে। অথচ সেই রিপোর্টে চেয়ারম্যানের কোনো সম্মতি বা স্বাক্ষর নেই। অথবা স্বাক্ষর জাল করে ব্যবহার করে।
তো শুরু থেকেই আমরা দেখতে পাচ্ছি, সরকার সনদের স্বীকৃতির ব্যাপারে কখনোই আন্তরিক নয় এবং এই স্বীকৃতি নিয়ে তারা শুধু ষড়যন্ত্রই করে আসছে। ভালো কিছু এখন পর্যন্ত জাতিকে দিতে পারেনি।

লিখনী : কওমি মাদরাসা নিয়ে সরকারের এ ষড়যন্ত্র কি উদ্দেশ্যমূলক?
মাওলানা মাহফুজুল হক : আমার অন্তত তাই মনে হয়। কারণ বাংলাদেশে ইসলামের সঠিক শিক্ষা একমাত্র কওমি মাদরাসাতেই রয়েছে। এই কওমি মাদরাসাই যুগ যুগ ধরে এ দেশে ইসলামকে সঠিকভাবে মানুষের সামনে উপস্থাপন করছে। এখন সরকার চাচ্ছে যে কোনোভাবে এই শিক্ষাধারাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে। আর ক্ষতিগ্রস্ত করার অন্যতম উপায় হচ্ছে বেফাকুল মাদারিসকে কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা। বেফাক যেহেতু বাংলাদেশের কওমি মাদরাসার অন্যতম অভিভাবক, তাই তারা এটিকে নিষ্ক্রিয় কিংবা নিয়ন্ত্রণ করার জন্যই এই ষড়যন্ত্রমূলক কার্যক্রম চালাচ্ছে।
এখন সরকার যদি তাদের এই ষড়যন্ত্রে সফল না-ও হতে পারে তারপরও তাদের লাভ। কারণ এর দ্বারা তারা কওমি উলামার মধ্যে একটি বিভেদ-বিভক্তি সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে। সরকার এই উদ্দেশ্যমূলক কাজ দ্বারা মূল দু’দিক থেকেই লাভবান হয়েছে। আর আমরাও ভুল করে সরকারের পাতা ফাঁদে পা দিয়ে আমাদের স্বীকৃতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছি।

লিখনী : আপনারা কি মনে করেন, আপনারা যে শর্ত দিয়ে স্বীকৃতি চাচ্ছেন, ভবিষ্যতে বিএনপি সরকার যদি ক্ষমতায় আসে তাহলে তারা কি আপনাদের এই শর্ত মেনে নিয়ে স্বীকৃতি দেবে?
মাওলানা মাহফুজুল হক : আমরা মনে করি, কোনো সরকারই সহজে এই স্বীকৃতি দিতে চাইবে না। বাংলাদেশে ঘুরেফিরে দুটি দলই ক্ষমতায় আসে। আওয়ামী লীগ নিজেরাও ধর্মনিরপেক্ষতার প্রবক্তা, আবার তাদের ঘাড়ে ভর করে আছে বামপন্থীরা। অপরদিকে বিএনপি তারাও ইসলামের যে খুব দরদিবন্ধু তা-ও বলা যাবে না। তার ওপর তাদের ঘাড়ে ভর করে আছে কওমিপন্থীদের অপছন্দের দল জামায়াতে ইসলামী। সে কারণে স্বীকৃতির ব্যাপারটি কোনো সরকারের আমলেই খুব সহজে পাওয়া যাবে বলে আমি মনে করি না।

লিখনী : এবার হেফাজতে ইসলাম প্রসঙ্গে আসি। নভেম্বর মাসজুড়ে আপনাদের কর্মসূচি পালনের কথা রয়েছে। সে কর্মসূচি বাস্তবায়নে হেফাজতের তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না।
মাওলানা মাহফুজুল হক : নভেম্বরের এক তারিখে আমাদের সমাবেশ করার কথা ছিলো। কিন্তু দেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতি এবং একই দিনে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি সমাবেশ ঘোষণায় আমরা সে সমাবেশ প্রত্যাহার করি। এছাড়া সারা দেশব্যাপী আমাদের যে কর্মসূচি হওয়ার কথা সেগুলো যথানিয়মে অনুষ্ঠিত হবে।
লিখনী : কওমি কমিশনের ব্যাপারটি তো মন্ত্রিসভার বৈঠক থেকে বাতিল করা হয়েছে। এখন তো হেফাজতের দাবি অনুযায়ী আর কোনো কর্মসূচি না দেয়ারই কথা। কারণ এই ইস্যু নিয়েই হেফাজত নতুন কর্মসূচির ডাক দিয়েছিলো।
মাওলানা মাহফুজুল হক : যদিও কমিশন গঠনের ব্যাপারটি পিছিয়েছে সেটি কিন্তু একেবারে শেষ হয়ে যায়নি। আবার যারা এর পেছনে কাজ করছিলো তারা কিন্তু এখনও মাঠে তৎপর। তারা নানা তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের প্রতিহত করতে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই। এছাড়াও হেফাজতের অনেক নেতৃবৃন্দ কারাগারে মিথ্যা মামলায় কারাভোগ করছেন, তাদের মুক্তির দাবি আমাদের অন্যতম ইস্যু। মুফতি মুহাম্মদ ওয়াক্কাস, হারুন ইজহারসহ অনেক নেতাকর্মী জেলে আছেন। সর্বোপরি হেফাজতের ১৩ দফা দাবি তো রয়েছেই। সুতরাং আমাদের কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই।
লিখনী : হেফাজতের আন্দোলনে আখেরে লাভ হলো বিএনপি-জামায়াতেরÑ রাজনীতি সচেতন মানুষের এই বক্তব্যকে কীভাবে খ-ন করবেন?
মাওলানা মাহফুজুল হক : এটা খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। একটা শক্তি যদি একজনের বিরুদ্ধে যায় তাহলে তার বিরুদ্ধে যে থাকবে সেটা অবশ্যই তার পক্ষে যাবে। এটা আমরা হেফাজত চাইলেও যাবে না চাইলেও যাবে। শত্রুর শত্রু যেমন বন্ধু হয় তেমন আর কি! আমরা কুরআন শরিফেও সুরা রুমের প্রথম আয়াতে দেখতে পাই সেখানে মুসলমানদের রোমীয়দের পরাজয়ের সুসংবাদ দেয়া হয়েছে। অথচ তখন পর্যন্ত মুসলমানদের সঙ্গে রোমানদের কোনো ধরনের যুদ্ধ-বিগ্রহ কিছুই হয়নি। তবুও তারা যেহেতু শত্রুর শত্রু ছিলো তাই তাদের পরাজয়ই মুসলমানদের সান্ত¦নার কারণ বলা হয়েছিলো। সুতরাং আমার কাজের দ্বারা আরেকজনের যদি লাভ হয় তাই বলে তো আমি আমার কাজকে ফেলে রাখতে পারি না।
লিখনী : আপনার কি মনে হয় বিগত পাঁচ সিটি নির্বাচনের মতো আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও হেফাজত বড় ফ্যাক্টর হয়ে দেখা দেবে?
মাওলানা মাহফুজুল হক : এই সরকার ইসলামের বিপক্ষে তাদের কঠোর অবস্থানকে একেবারে পরিষ্কার করে দিয়েছে। বিশেষ করে গণজাগরণ মঞ্চকে সমর্থন দিয়ে দেশের ধর্মপ্রাণ মানুষের মনে গভীরভাবে রেখাপাত করেছে। সুতরাং স্বাভাবিকভাবেই এই দলের বিপক্ষে যারা থাকবে তাদের পক্ষে জনগণের ম্যান্ডেটটা যাবে, এটাই স্বাভাবিক। তবে এখানে যেহেতু এখন রাজনীতির একটা বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে, তাই তাদের উচিত আগামীতে যারা ক্ষমতায় আসবে তাদের কাছ থেকে এখনই দাবি-দাওয়া আদায় করে নেয়া। কারণ ক্ষমতায় গেলে অধিকাংশ মানুষই অতীত ভুলে যায়। এটা ক্ষমতার একটা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া।
লিখনী : মাদরাসার শিক্ষা প্রসঙ্গে আসি। বর্তমান মাদরাসা শিক্ষাকে আপনি কতোটা যুগোপযোগী মনে করেন?
মাওলানা মাহফুজুল হক : এ ক্ষেত্রে আমাদের উলামায়ে কেরাম যতোটা অগ্রসর হয়েছেন আমি মনেকরি এটা যথেষ্ট এবং যুগের সঙ্গে সামঞ্জস্যশীল। বেফাকের সিলেবাসে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত সাধারণ শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আরও বাড়ানো যায় কি-না সে ব্যাপারে আলাপ-আলোচনা হচ্ছে। সর্বোপরি আমি মনেকরি আমাদের মাদরাসাগুলো থেকে যেসব ছাত্র পাস করে বের হচ্ছে তারা সমাজ বিনির্মাণে যথেষ্ট ভূমিকা পালন করছে। সবচে’ বড় কথা হলো, আমাদের সনদের স্বীকৃতিটা যদি হয়ে যায়, তাহলে এই বিশাল কওমিগোষ্ঠী সরকারের নানা পর্যায়ে কাজ করার সুযোগ পাবে এবং দেশের কাজে সবার সঙ্গে সমান তালে ভূমিকা রাখতে পারবে বলে আমার বিশ্বাস।
লিখনী : এখন টেকনোলজির যুগ। সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই আধুনিক তথ্য-প্রযুক্তির দিকটিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। সে তুলনায় মাদরাসায় এখন পর্যন্ত সেভাবে প্রযুক্তির ছোঁয়া লাগেনি। এভাবে চলতে থাকলে মাদরাসার ছেলেরা কি যুগের তুলনায় পিছিয়ে পড়বে না?
মাওলানা মাহফুজুল হক : আসলে আমাদের মাদরাসার অনেক সীমাবদ্ধতা আছে। তবে এটার প্রয়োজনীয়তা আমরা কখনোই অস্বীকার করি না। দারুল উলুম দেওবন্দে প্রযুক্তিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়া হয় এবং সে অনুযায়ী শিক্ষাদান করা হয়। বাংলাদেশেরও অনেক বড় এবং যাদের সাধ্য আছে এমন মাদরাসা এ ব্যাপারে যথেষ্ট উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। আবার এর মধ্যে ভালোর দিকটা যেমন আছে তেমনি মন্দ দিকটাও আছে। অনেক সময় ভালোর নিয়তে সুযোগ দিলেও দেখা যায় সেখানে মন্দটাই বেশি প্রভাবিত হয়। তবে যথেষ্ট তত্ত্বাবধায়ন করে এটিকে কাজে লাগানো যেতে পারে। আমরা আমাদের সাধ্যমতো সে ব্যাপারে পদক্ষেপ নেবো বলে আশা করি।
লিখনী : বর্তমান সমাজব্যবস্থায় কওমি মাদরাসার প্রয়োজনীয়তা এবং এর ভবিষ্যতকে আপনি কীভাবে চিত্রায়িত করবেন?
মাওলানা মাহফুজুল হক : পেছনের কয়েক বছরের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে যদি জরিপ করা হয় তাহলে দেখা যাবে কওমি মাদরাসা কতোটা দ্রুত বাংলাদেশের প্রতিটি আনাচে কানাচে ছড়িয়ে পড়ছে। সাধারণ মানুষ পার্থিব শিক্ষাব্যবস্থা দেখে হতাশ। তারা এখান থেকে ভালো কিছুর আশা ছেড়ে দিয়েছেন। তারা সামাজিক কোনো শান্তি, নিরাপত্তা দিতে পারছে না। দুর্নীতি থেকে সমাজকে মুক্ত করতে পারছে না। এই কারণে মানুষ এখন প্রবলভাবে কওমি মাদরাসার দিকে ঝুঁকছে। আমি মনেকরি, এই শিক্ষাব্যবস্থাকে যদি সঠিকভাবে পরিচর্যা করা হয় তবে অদূর ভবিষ্যতে এই শিক্ষাব্যবস্থাই মানবতাকে শান্তির সোপান এনে দিতে পারবে।
লিখনী : সম্প্রতি মহিলা মাদরাসার প্রসার ব্যাপকভাবে লক্ষ করা যাচ্ছে। এ ব্যাপারে আপনার অভিমত কী?
মাওলানা মাহফুজুল হক : মহিলা মাদরাসা আসলে খুবই সেনসিটিভ একটি বিষয়। অনেক আলেম এটা অপছন্দ করেন। একটা সময় ছিলো যখন মেয়েদের অল্প কিছু শিক্ষা গ্রহণ করলেই চলতো। সমাজের সঙ্গে তারা মানিয়ে নিতে পারতেন। বাধ্যতামূলক কোনো শিক্ষা ছিলো না। কিন্তু বর্তমান সমাজ পরিবেশটাই এমন হয়েছে যে, একটা মেয়ে সে যে মাধ্যমেই শিক্ষা নিক তাকে একটা সম্মানজনক পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষা নিতে হয়। নইলে মেয়েকে তো বটেই তার অভিভাবকদেরকেও সমাজে খাটো হয়ে থাকতে হয়। এ কারণেই আমি মনেকরি, মহিলা মাদরাসার প্রয়োজনীয়তা আছে। তবে এর জন্য অধিক সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। মহিলা মাদরাসার পরিবেশ সুন্দর হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু দেখা যায়, অধিকাংশ মহিলা মাদরাসার পরিবেশ মেয়েদের জন্য উপযোগী নয়। তাদের অধিক পরিচর্যা দরকার, কিন্তু সেভাবে মাদরাসাগুলোতে তাদের পরিচর্যা করা হয় না। তাদের সুন্দরভাবে তত্ত্বাবধান করা দরকার। এমন সব সমস্যাগুলোকে কাটিয়ে যদি মহিলা মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করা হয় তাহলে সেটা সমাজের জন্য উপকারী হবে বলেই আমি মনে করি।
লিখনী : আমাদেরকে সময় দেয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
মাওলানা মাহফুজুল হক : আপনাদেরকেও ধন্যবাদ।

Share

শাপলা চত্বর ট্রাজেডি : চেতনায় প্রজ্জলিত নতুন বালাকোট

মাওলানা মামুনুল হক

৫ মে বাংলাদেশের ইতিহাসে আরো একটি কালো অধ্যায় রচিত হলো। তৌহিদি জনতার স্বত:স্ফূর্ত ঈমানী জাগরণের বিরুদ্ধে ফ্যাসিবাদী স্বৈরাচারের কাপুরুষোচিত বর্বর গণহত্যা ও দমন-পীড়নের নজির হয়ে থাকবে এ দিনটি। হেফাজতে ইসলামের ডাকা এ দিনের ‘ঢাকা অবরোধ’ কর্মসূচিতে রাজধানীর ছয়টি প্রবেশ পথে লক্ষ লক্ষ তৌহিদি জনতা শান্তিপূর্ণভাবে অংশগ্রহণ করে। অবরোধ শেষে ঢাকার প্রাণকেন্দ্র মতিঝিলের শাপলা চত্বরের মহাসমাবেশে যোগদানের লক্ষ্যে উল্লেখিত ছয় স্থানের সমবেত জনতা যাত্রা শুরু করে। আল্লাহর জিকির ও তাকবির ধ্বনিতে মুখরিত সাদা-শুভ্র ঈমানী কাফেলার এ যাত্রা যেন শান্ত কিন্তু অনি:শেষ জনস্রোত। ছয়দিক থেকে বহতা নদীর মতো এগিয়ে আসা পবিত্র ও শান্তিপূর্ণ এই জনস্রোত শাপলা চত্বরের মোহনায় মিলিত হওয়ার পূর্বেই এর একটি শাখা আক্রান্ত হয় দুর্বৃত্তদের আক্রমনে। আওয়ামী দুবৃত্তদের এই আক্রমনই উম্মাতাল করে তোলে শান্ত বয়ে চলা জনতার স্রোতকে। এ ভাবেই সূচনা উত্তেজনার। তার পরের ইতিহাস নারকীয় তাণ্ডবের। নজিরবিহীন বর্বতার। বুলেটের আঘাতে তৌহিদি প্রাণ কেড়ে নেয়ার আর স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে রেকর্ড নারকীয় হত্যা কাণ্ডের। পেশি শক্তি, আর বুলেটের জোরে ক্ষমতাসীন দাম্ভিকের দল পৈশাচিক বিজয়োল্লাস করতে পারে। কিন্তু ইতিহাসের নির্মম বাস্তবতা হলো এই দাম্ভিকতা ও পৈশাচিকতাই পতনের কফিনে শেষ পেরাক ঠুকে দেয়।

৫ মে দুপুর থেকে ৬ মে ভোর পর্যন্ত চলা শাপলাচত্বর ট্রাজেডি ঈমানদার মানুষের হৃদয়ে স্মরিত হবে স্বাধীন বাংলার নতুন বালাকোট হিসেবে। প্রিয় নবীজি সা. এর অবমাননার বিরুদ্ধে ফুঁসে ওঠা ঈমানদার মানুষের শহিদী রক্তে ঢাকার রাজপথ যেভাবে রঞ্জিত হয়েছে, বালাকোট প্রাঙ্গণে সাইয়্যেদ আহমাদ শহীদ রহ. ও তার সহযোদ্ধাদের আত্মত্যাগের সাথেই তার তুলনা চলে। ১৮৩১ এর ৬ মে বালাকোটের প্রান্তরে উপমহাদেশের আজাদি আন্দোলনের বীর শহীদানদের শাহাদাতে বাহ্যত মনে হয়েছিল ঈমানদারদের পরাজয় আর বৃটিশ বেনিয়াদের বিজয় হয়েছে। কিন্তু ইতিহাস বলে ভিন্ন কথা। সেদিনের বীর শহীদদের আত্মদান যেমন যুগ যুগ ধরে মহান স্বাধীনতার চেতনা সম্মুন্নত রেখেছে লাখো মানুষের হৃদয়পটে আর দ্রোহের আগুন জ্বেলেছে সাম্রাজ্যবাদী বৃটিশের বিরুদ্ধে, তেমনি ২০১৩ এর ৬ মেও যুগ যুগ ধরে বাংলাদেশের মানুষের মনে এক দিকে যেমন জ্বালবে ঈমানী চেতনার প্রোজ্জ্বল মশাল তেমনি ইতিহাসের ঘৃণিত খুনি হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে আজকের ক্ষমতাসীন মহল।
তবে মর্মান্তিক, লোমহর্ষক ও বর্বরোচিত এই হত্যাকাণ্ডের কার্যকারণ ও দায়-দায়িত্বের প্রশ্নে কয়েকটি বিষয়ের পর্যালোচনা প্রাসঙ্গিক মনে হচ্ছে। এই ঘটনার সাথে নানাভাবে সংশ্লিষ্ট, যারা কোনো না কোনোভাবে এর দায়ভার গ্রহণ করতে বাধ্য তারা হচ্ছে সরকার, আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী, হেফাজত নেতৃবৃন্দ ও বিরোধী দল। নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে সংশ্লিষ্ট এই পক্ষগুলোর ভূমিকা ও দায়িত্ব পর্যালোচনা করলে পূর্ণ ঘটনার একটি প্রয়োজনীয় ও যৌক্তিক ব্যাখ্যা বেরিয়ে আসবে বলে আমরা মনে করি।
সরকারি দলের ভূমিকা
সরকারি দল আওয়ামী লীগের ভূমিকা পর্যালোচনায় প্রথমেই যে কথাটি বলতে হয় সেটি হলো, সরকার বিরোধী যে কোনো কর্মসূচি পালন কালে আওয়ামীলীগ বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন এক সংস্কৃতি চালু করেছে আর তাহলোÑ বিরোধী পক্ষকে ঠেঙ্গানোর জন্য আইনশৃংখলা রক্ষাকারীদের সাথে রাজপথে দলীয় ক্যাডার বাহিনীর ইপস্থিতি। স্বভাবতই ময়দানে একই সময়ে পরস্পর বিরোধী দুটি পক্ষ মারমুখি অবস্থানে থাকলে উত্তেজনা ও সংঘাত অনেক বেশি হয়। মাঠ দখল ও নৈরাজ্য প্রতিরোধের নামে এমনই এক উস্কানিমূলক কর্মসূচি গ্রহণ করে আওয়ামীলীগ। হেফাজতে ইসলামের অবরোধ কর্মসূচির আগের দিন আওয়ামীলীগ নেতারা তাদের ক্যাডার বাহিনীকে অবরোধকারী হেফাজত কর্মীদেরকে প্রতিরোধ করার আহ্বান জানায়। সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে আওয়ামীলীগের ছাত্র ও যুব ক্যাডাররা অবরোধের বিভিন্ন পয়েন্টে উত্তেজনা সৃষ্টি করে। বিশেষ করে কদমতলী-বাবু বাজার পয়েন্ট থেকে অবরোধকারীরা শাপলা চত্বরের সমাবেশে আসার পথে আওয়ামীলীগের অফিসের সামনে দুপক্ষের মধ্যে সংঘাত শুরু হয়। এই সংঘাতের জন্য পরস্পর একপক্ষ অন্য পক্ষকে দায়ি করছে। যদিও মিডিয়াতে শুধু সরকার দলীয় সন্ত্রাসীদের গুলি চালানোর ও লাঠিসোটা দিয়ে হেফাজতকর্মীদের উপর চড়াও হওয়ার ছবি এসেছে। বিপরিতে আওয়ামীলীগের কার্যালয়ে কথিত হামলার কোনো ছবি সরকারপন্থী মিডিয়াতেও দেখা যায়নি। তবুও এই বিতর্কে না গিয়েই মোটা দাগের দুটি প্রশ্নের কি কোনো জবাব সরকারি দল দিতে পারবে? একটি হলোÑ যদি কোনো নিয়ন্ত্রণ বা নিরাপত্তার প্রয়োজন হয় সে জন্য কি পুলিশ-র‌্যাব, বিজিবি যথেষ্ট ছিল না? দলীয় ক্যাডার বাহিনীর কী প্রয়োজন ছিল? স্বাভাবিক কথা, এখানে লাখো জনতার ঈমানী আবেগের ব্যাপার। সেখানে খোদ সরকারই কেন উস্কানি দিয়ে সংঘাতের পথ খুলল?
দ্বিতীয়টি হলো, সরকারের ঘোর সমর্থক মিডিয়াগুলোতেও ছাত্র ও যুবলীগের ক্যাডারদের ফ্রী স্টাইলে আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে অ্যাকশনের বহু সচিত্র সংবাদ প্রকাশ হয়েছে। বিপরিতে হেফাজতের নিজস্ব কর্মী তো দূরের কথা হেফাজতের নামে যারা ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ায় অংশ নিয়েছে তাদের ব্যাপারেও এই ধরণের কোনো সংবাদ তারা প্রকাশ করতে পারেনি। এ থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, সরকারদলীয় ক্যাডার বাহিনীর এই সন্ত্রাসী এ্যাকশন ও হেফাজতের নিরীহ কর্মীদেরকে বিচ্ছিন্ন পেয়ে তাদের উপর বর্বরোচিত হামলার পরিপ্রেক্ষিতেই সংঘাতের সূচনা। সংঘাত শুরু হওয়ার পর বিক্ষিপ্ত লোকজন সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। হেফাজতে ইসলামের শান্তিপূর্ণ অরাজনৈতিক ঈমানী এই আন্দোলনকে বাধা দিয়ে সরকার কী পেল? লাখো জনতার এই জাতীয় আবেগপ্রবণ কর্মসূচিতে যেখানে ধৈর্য ও সহনশীলতাই প্রধান কাম্য সেখানে দায়িত্বশীল সরকারই ঘটালো সবচেয়ে বড় ব্যাঘাত।আরো একটি সংশয় হলো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের দোকান-পাটসহ ভবন ও গাড়িতে অগ্নি সংযোগের ঘটনা আসলে কারা ঘটিয়েছে? হেফাজতের কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারীরা না আসলে এটা সরকার দলীয় স্যাবোটাজ? আওয়ামী মিডিয়াগুলো ফলাও করে পুড়ে যাওয়া ধ্বংসস্তুপের ছবি ছাপিয়েছে, কিন্তু হেফাজতের কর্মীরা অগ্নিসংযোগ করছে বা ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে এমন কোনো সচিত্র সংবাদ নেই। এতেও কি এই সন্দেহ ঘনিভূত হয় না যে, এটা সরকারের পরিকল্পিত স্যাবোটাজ? হ্যা আমাদের দৃষ্টিতে যেটা এসেছে যে কাঁদানে গ্যাস থেকে আত্মরক্ষার জন্য হেফাজতের কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারী বিক্ষিপ্ত কিছু মানুষ রাস্তার পাশ থেকে কাঠের চৌকি, বাঁশ ইত্যাদি সংগ্রহ করে রাস্তার মধ্যখানে এনে আগুন ধরিয়ে দেয়। ধ্বংসযজ্ঞ ও অগ্নি সংযোগ যদি হেফাজত কর্মীরাই করবে তবে তো তাদের এক চেটিয়া দখলে থাকা ইত্তেফাকের মোড় থেকে ফকিরাপুল পর্যন্ত এই এলাকাতেই করতো?এর পরের কথা হলো, সংঘাত-সহিংসতা হয়েছে হেফাজতে ইসলামের মূল কর্মসূচিস্থলের বেশ দূরে। এবং সেটাও চলেছে সন্ধ্যা নাগাদ। সন্ধার পর সব দিকের সংঘাত বন্ধ হয়ে যায়। গোটা এলাকা আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। হেফাজতে ইসলামের শান্তিপ্রিয় সুশৃংখল কর্মসূচি চলতে থাকে দৈনিক বাংলা-নটরডেম-ইত্তেফাক এই এলাকায়। হেফাজত নিয়ন্ত্রিত এই এলাকায় লক্ষ লক্ষ শান্তি প্রিয় ঈমানদার মানুষের জিকিরের কাফেলায় সন্ধা রাতে একবার অভিযান চালানো হয়। তখন দৈনিক বাংলা সড়ক থেকেও হেফাজতের কর্মীরা অনেক পিছু হটে দুই পাশের নটরডেম ও ইত্তেফাকের দিকের সড়কে শুয়ে-বসে সময় কাটাতে থাকে। এই অবস্থায়ই রাস্তার সকল আলো নিভিয়ে দিয়ে ভূতুরে এক পরিবেশ সৃষ্টি করে রাত পৌনে তিনটায় তিন দিক থেকে সাড়াষি অভিযানে জঘন্যতম নরকীয় হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়।

আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী

আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকাও ছিল বেশ প্রশ্নবিদ্ধ। কেন তাদের আশ্রয়ে থেকে সরকারি দলের ক্যাডাররা প্রতিপক্ষের উপর গুলি বর্ষণ করবে? আর সব চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, তারা এমন একটা সময় ঘুমন্ত, বিশ্রামরত ও তাহাজ্জুদের নামাজরত ঈমানদার মানুষের ওপর ক্র্যাকডাউন চালালো যখন সমাবেশস্থল ছাড়া বাকি সব তাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে। শান্তিপূর্ণ অবস্থান-কর্মসূচি পালনরত হেফাজতে ইসলাম এমন কী অপরাধ করল যার কারণে লক্ষ লক্ষ মানুষের ওপর এমন বর্বরোচিত হামলা করতে হবে?

হেফাজত নেতৃবৃন্দের ভূমিকা

হেফাজতে ইসলাম কেন এমন ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ নিতে গেলন? কী উদ্দেশ্য ছিল এর পিছনে? কোনো কোনো মহল এমন প্রশ্নও উত্থাপন করছে। এই প্রসঙ্গে আমাদের কাছে যা তথ্য-উপাত্ত আছে এবং সামগ্রিক অবস্থার পর্যবেক্ষণে যা বেরিয়ে আসে তাহলো, প্রথমত: ইসলামের পক্ষে বড় কিছু অর্জনের সম্ভাবনা। বাংলাদেশের ইতিহাসে ইসলামের পক্ষে হেফাজতে ইসলামের ব্যানারে যে গণজাগরণ সৃষ্টি হয়েছে নিকট অতীতে এর নজির নেই। তাই ধারণা ছিল প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করতে পারলে ইসলাম ও মহানবী সা. এর বিরুদ্ধে কটুক্তিকরার বিরুদ্ধে কঠোর আইন পাশের দাবিটি অন্তত: আদায় করা সম্ভব হবে। শাহাবাগীদের অবস্থানে বসিয়ে সরকার যেমন নিজেদের এজেণ্ডায় আইন সংশোধন করেছে। তেমনি অবস্থানের মাধ্যমে সরকারকে রাজনৈতিকভাবে চাপে ফেলা যাবে। কারণ সরকারি প্রশ্রয়ে শাহবাগে টানা অবস্থান এবং শোডাউন হয়েছে। সরকার অবস্থান কর্মসূচিকে সমীহ করেছে শাহাবাগের ক্ষেত্রে। কাজেই অবস্থানের ব্যাপারে সরকারের নৈতিকভাবে দুর্বল থাকার কথা। সেই সাথে মাঠ পর্যায়ের জনশক্তির পক্ষ থেকে এমন কর্মসূচির চাপ ছিল। সব সময় ইসলামপন্থীরা আন্দোলন করে কিন্তু কোনো দাবি দাওয়া আদায় হয় না। এবারের জাগরণ নজিরবিহীন হওয়ায় মানুষের প্রত্যাশাটাও ছিল বেশি। তাছাড়া লক্ষ লক্ষ মানুষের শান্তিপূর্ণ অবস্থানের উপর সরকার নরকীয় হত্যাযজ্ঞ চালাবে এমন কল্পনাও ছিলনা। এতো বিশাল জনসভার শান্তিপূর্ণ অবস্থানের ওপর এহেন ঘৃণ্য হামলার ঘটনা বাংলাদেশের ইতিহাসে দ্বিতীয়টি নেই।
হেফাজতের নেতৃবৃন্দের রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ ছিল ও আছে মর্মে যে প্রচারণা কোনো কোনো মহল চালায় সে ব্যাপারে আমাদের পর্যবেক্ষণ হলো, হেফাজতের বয়োজেষ্ঠ নেতৃবৃন্দ ও সামগ্রিক নেতৃত্ব রাজনৈতিক চিন্তার উর্দ্ধেই ছিল।
অবশ্য হেফাজত নেতৃবৃন্দের আশংকা ছিল, কোনো কোনো মহল হেফাজতের কর্মসূচিতে অনুপ্রবেশ করে বিশৃংখলা সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু সরকার দলীয় ক্যাডাররা মাঠে নেমে পরিস্থিতি আরো বেশি ঘোলাটে করেছে।

বিরোধী দলের ভূমিকা

হেফাজতে ইসলাম বিষয়ে প্রধান বিরোধীদল বিএনপির ভূমিকা হেফাজতের জন্য বড়ই বিব্রতকর। একদিকে তারা হেফাজতের কোনো একটি দাবির ব্যাপারেও ইতিবাচক দৃষ্টি দেখায় না কিন্তু গায়ে মেখে আবার হেফাজতের আন্দোলনের ফসল নিজেদের ঘরে তুলতে চায়। হেফাজতের আন্দোলনে গড়ে ওঠা সেন্টিমেন্টকে এমনি এমনিই নিজেদের পকেটে ভরতে শস্তা ঘোষণাও দেয়। হেফাজতের পক্ষে মাঠে নামার বিরোধী দলীয় ঘোষণায় বিএনপির কোনো জনশক্তি তো নামেইনি, উপরন্তু হেফাজত সরকারের আরো বেশি টার্গেটে পরিণত হয়েছে। হেফাজতে ইসলামের সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক ও ঈমানী ইমেজ নষ্ট করতেই বরং বেশি ভূমিকা রেখেছে বিএনপির এই সকল কার্যক্রম।

সম্ভাব্য ফলাফল

হেফাজত নেতৃবৃন্দের কিছু অসচেতনতা, বিরোধী দলের সুবিধাবাদী ভূমিকা প্রতীয়মান হলেও ঐতিহাসিকভাবে ৫-৬ মের নতুন বালাকোটের রক্তাক্ত প্রান্তরের মূল খলনায়কের কালিমা আওয়ামীলীগের কপালেই লেপ্টে থাকবে। বিরোধী প্রচার মাধ্যমগুলোকে বন্ধ করে হত্যাযজ্ঞের প্রকৃত চিত্র তারা আড়াল করতে পেরেছে মনে করে তৃপ্তির ঢেকুর তুললেও ঘটনা এখানেই থেমে থাকবে বলে মনে হয় না। নিজেদের পোষা মিডিয়ার মাধ্যমে পবিত্র কুরআন শরিফ আগুনে পুড়ে যাওয়ার ঘটনাকে তারা গোয়েবলসিয় প্রচারণা চালিয়ে মনে করছে দেশের সকল ধর্মপ্রাণ মানুষ এখন থেকে হেফাজতে ইসলাম এবং আলেম সমাজকে কুরআনের শত্র“ মনে করবে আর রাশেদ খান মেনন ও হাসানুল হক ইনুর মতো কমুনিস্টদেরকে কুরআনের পক্ষের শক্তি বলে বিশ্বাস করতে থাকবে। ইতিপূর্বেও ২০০১ সালে তারা শাইখুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক রহ. কে পুলিশের হত্যাকারী হিসেবে মিডিয়াতে অনেক প্রচার করে মনে করেছিল মানুষ বুঝি সত্যিই শাইখুল হাদীস রহ. ও আলেম সমাজকে হত্যাকারী আর আওয়ামীলীগকে শান্তিকামী বিশ্বাস করেছে।
সে বার যেমন পরিণাম আওয়ামীলীগের জন্য শুভ হয়নি। এখনও হেফাজতে ইসলাম ও আলেম সমাজের বিরুদ্ধে এ সকল অপপ্রচার চালিয়ে ধর্মপ্রাণ মানুষের ক্ষোভ প্রশমন করতে পারবে মনে করলে মস্ত বড় ভুল করবে। বরং সরকারের পোষা মিডিয়ার অতিরঞ্জিত প্রচারণাকে ধর্মপ্রাণ মানুষ সরকারের অপকর্ম বলেই ধরে নিচ্ছে। মানুষের মনের আস্থা ও ভালোবাসা শুধু প্রচারণা দিয়েই হয় না। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তার দীন ইসলামের সত্যিকার ধারকদের ভাব-মর্যাদা মানুষের হৃদয়ে এই পরিমাণ দান করেন যে, তার মোকাবিলা কোনো প্রচারণা দিয়েই সম্ভব নয়। আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী সত্তুরোর্ধ একজন বৃদ্ধ হাদিসের শিক্ষক। হাজার হাজার আলেমের সম্মানিত এই উস্তাদের প্রতি সরকারের অসম্মানজনক আচরণ কোনোভাবেই ভালো পরিণাম বয়ে আনতে পারে না। আমাদের বিশ্বাস দিন যতো গড়াবে আঁধার কেটে ততো আলো ফুটতে থাকবে। আর সেই সাথে ক্রমান্বয়ে ৬ মের গভীর রাতের ভুতুরে অন্ধকারে ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগের কপালে লেপ্টে যাওয়া তৌহিদি জনতাকে গণহত্যার তিলক চিহ্নিও স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হতে থাকবে…।

Share

মৃত্যুদণ্ড কার্যকরে শিরোচ্ছেদই মানবিক পদ্ধতি

আলোচক : মাওলানা মামুনুল হক
স্থান : ঐতিহাসিক সাত মসজিদ চত্বর, মুহাম্মদপুর, ঢাকা
বয়ানটি শুনুন :

বয়ানটি ডাউনলোড করুন :
http://www.4shared.com/mp3/6wAE8bvh/mittodondo.html

Share