জীবনসায়াহ্নে কেমন আছেন শাইখুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক

গাজী মোহাম্মাদ সানাউল্লাহ

কেমন আছেন শাইখুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক, লেখার শিরোনামটি অসংখ্য মানুষের আগ্রহের কাছ থেকে ধার করা। সবাই যেহেতু এ কথাটিই জানতে চান, তাই তাদের আগ্রহের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এটিকেই লেখার শিরানাম দিলাম।
শাইখুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক এই নব্বই-ঊর্ধ্ব বয়সে এখন কেমন আছেন, কীভাবে দিন কাটান, মাদরাসায় আসেন কিনা—এরকম আরও হাজারো প্রশ্ন মানুষের।
পারিবারিকভাবে শায়খের ৫ ছেলে ও ৯ মেয়ে। মেয়েদের সবার বিয়ে হয়েছে অনেক আগেই। তবে শায়খের সর্বশেষ ছেলে মাওলানা মাসরুরুল হকের বিয়ে হলো ক’মাস আগে, ৬ অক্টোবর বৃহস্পতিবার। এ উপলক্ষে দীর্ঘদিন পর শায়খ তার নিজ হাতে প্রতিষ্ঠিত প্রাণপ্রিয় প্রতিষ্ঠান জামিয়া রাহমানিয়াতে অনেক দিন পর এলেন। সেদিন শায়খের ছেলের বিয়ে—এটা যতটা আমাদের আনন্দের, তার চেয়ে অনেক বেশি উপভোগ ও উদযাপনের বিষয় ছিল হজরত শায়খের উপস্থিতি।
সকাল থেকেই বার বার খবর নিচ্ছিলাম কখন শায়খ আসবেন। প্রথম শুনলাম শায়খ বিকাল ৩টায় আসবেন, পরে আবার জানলাম আসরের নামাজ পড়বেন। যা হোক, আমরা অধীর আগ্রহের সঙ্গে অপেক্ষা করছি শায়খের জন্য। সময় যেন আর কাটতে চায় না। অবশেষে সব প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে তিনি, আমাদের প্রাণপ্রিয় শায়খ, শাইখুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক দা.বা. এলেন।
শায়খের চলাচল অনেক আগে থেকেই হুইল চেয়ার মাধ্যম। শারীরিক দুর্বলতার কারণে শায়খ এখন প্রায় সবরকম সফর এড়িয়ে চলেন। প্রায় পুরোটা সময় থাকেন পারিবারিক আবহে। এর ফলে বাসা বা মাদরাসা ছাড়া শায়খের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ সাধারণত হয় না। মারকাজুল ইসলামীর একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে শায়খ এলেন, না এটা শারীরিক কোনো অসুস্থতার কারণে নয়, বরং হুইল চেয়ার সমেত আসার জন্য। বেশ কিছুদিন আগেও তিনি হুইল চেয়ার থেকে উঠে গাড়িতে উঠতে পারতেন। কিন্তু এখন শরীর এতটাই দুর্বল যে বাসা থেকে হুইল চেয়ারে উঠেন, গাড়িতেও এ অবস্থায় বসা থাকেন। ওঠা-বসা করেন না।
যতটা সময় শায়খ মাদরাসায় থাকলেন, পুরোটা সময় প্রায় নীরব। আত্মীয়-স্বজন, ভক্ত, ছাত্র, ওলামা একবাক্যে সবাই চারপাশে ঘিরে থাকলেন সারাক্ষণ। কেউ কেউ সালাম দিলেন। মুসাহাফা করলেন। বার্ধক্যের কারণে হয়তো কানেও একটু কম শোনেন। উচ্চস্বরে সালাম দিলে তাকিয়ে দেখেন, ঠোঁটগুলো কিছুটা নড়ে ওঠে, হয়তোবা কিছু বলেন। কিন্তু অস্পষ্টতার কারণে তা বোঝা যায় না। তবে আশ্চর্যের কথা হলো, সবকিছুর পরও শায়খের জিকির ঠিক আছে। যতক্ষণ জাগ্রত থাকেন, তার প্রায় পুরোটা সময়ই মৃদু আওয়াজে আল্লাহ আল্লাহ জিকির করেন। যে অভ্যেস ছিল তার সুস্থ সময়ে।
আজিমপুরের যে বাড়িটির সামনে নাম্বার প্লেটে লেখা—৭/২ আজিমপুর, এটি যে ঐতিহ্যবাহী একটি বাড়ি তা এর প্রাচীনত্ব ও সেকেলে আমলের স্থাপত্য স্টাইলই বলে দেয়। চার তলার বাড়িটির দোতলায় হজরত শায়খ নিজে থাকেন। অন্যগুলোতে শায়খের ছেলেরা। দীর্ঘদিন পর্যন্ত বাড়ির রং ছিল হলুদ। এখন সাদা রং করা হয়েছে। নিচতলার পুরনো সেই গেটটির সামনে যখন দাঁড়ালে মনে একটা অন্য রকম অনুভূতি জেগে ওঠে। মনে জাগে ভিন্ন রকম শিহরণ। জাগতেই তো হবে, এখানে, ঠিক এ জায়গাটাতে শায়খ এসে গাড়ি থেকে নামতেন মাদরাসা বা কোনো মাহফিল থেকে। গাড়ি থেকে নেমে এ জায়গা দিয়ে ধীরে ধীরে হেঁটে যেতেন, একটু সামনে গিয়ে উঠতেন সিঁড়িতে, শায়খের সুউচ্চ আল্লাহ আল্লাহ জিকির স্বাভাবিকের চেয়ে একটু ছোট এই নিচতলার চারপাশটায় প্রতিধ্বনিত হতো। মনে হতো যেন শায়খের সঙ্গে সঙ্গে চারপাশের পরিবেশ ইট-বালি কণাও জিকির করছে।
এদেশে শায়খুল হাদিস শব্দটি শুনলে, বুখারি শরিফের তর্জমা পড়লে, ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ লংমার্চের কথা মনে হলে আমাদের সবার মনের পর্দায় নিজের অজান্তেই যার প্রদীপ্ত সূর্যময় মুখাবয়ব ভেসে ওঠে, তিনি শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক। দীর্ঘ অর্ধ শতকেরও বেশি সময় ধরে অবিরাম ও ধারাবাহিকভাবে হাদিসে রাসুলের তর্জুমান হজরত শায়খের নেক ছায়া আল্লাহপাক এখনও আমাদের ওপর কায়েম রেখেছেন। এজন্য অসংখ্য শোকরিয়া সে মহান সত্তা আল্লাহর। দীর্ঘ এ সময়ে হজরত শায়খের হাদিসের ছাত্রের সংখ্যা কত? হাজার, লাখো, কোটি। গাণিতিক উপায়ে এটা নির্ধারণ করা কঠিন হবে। তবে এ ধারা প্রবহমান—এ কথা ধ্রুব সত্য।
২০০৪ সালে যখন ছাত্র জীবনের স্বপ্নময় প্রতিষ্ঠান জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়ায় ভর্তি হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করলাম, তখন থেকে হজরত শায়খকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগের দ্বার উন্মুক্ত হলো বলা যায়। জালালাইনের বছর হজরতকে দেখতাম সারা দিন নানা মাদরাসায় পড়িয়ে জোহরের আজানের সময় মাদরাসায় আসতেন। সাদা নোহা মাইক্রোতে করে সাদা রংয়ের কলারবিহিন একটি জামা গায়ে। হাতে চমত্কার ও দামি একটি লাঠি। তখনই শায়খ গাড়ি থেকে একা নামতে পারতেন না। ডান হাতে লাঠি আর বাঁ হাতে কাউকে ধরে আস্তে আস্তে নামতেন। তবে তখনও একা একা হাঁটতে পারতেন। বিকাল বেলা আসরের নামাজের পর শায়খ প্রায় নিয়মিত ২য় তলার বারান্দায় গিয়ে বসতেন। সে সময় দেখেছি, কখনও খাদেমদের কেউ কাছে না থাকলে ভবনের একপ্রান্তের নিজ রুম থেকে একা একা হেঁটে বারান্দায় গিয়ে বসতেন। শায়খের মাথায় দেয়ার একটা সুন্দর তেল ছিল। একেবারে টকটকে লাল রংয়ের গাড় তেল। এর ঘ্রাণটাও ছিল ভিন্নরকম। আমরা বিকাল বেলার সে সময়টাতে শায়খের মাথায় সেই তেল মেখে দিতাম। এই সৌভাগ্য রাহমানিয়ায় পড়া অনেক ছাত্রেরই হয়েছে। শায়খের ধবধবে সাদা চুলে কড়া লাল রংয়ের তেল আস্তে আস্তে মেখে দিচ্ছি আর শায়খ মুখে অমায়িক একটি হাসির আভা ছড়িয়ে কিছুটা উচ্চস্বরে আল্লাহ আল্লাহ জিকির করছেন… এ চমত্কার দৃশ্যটি এখনও চোখে ভেসে বেড়ায়।
শায়খের সে সময়কার সারা দিনের নিয়ম ছিল অনেকটা এরকম—সকালে বাদ ফজর জামিয়া রাহমানিয়ায় বুখারির দরস, তারপর নাস্তা খেতেন নিজ রুমে বসে। সকাল ৯টার দিকে পড়াতে যেতেন লালমাটিয়া বা মিরপুর দারুস সালামে। অথবা বনানী কড়াইল। মাসে একবার করে সাভার টিএন্ডটি কলোনি মাদরাসা, মাদারীপুর জামিয়াতুস সুন্নাহ আর নরসিংদী বৌয়াকুর মাদরাসায়। সেসময় ও তার পর প্রায় একবছর এরকমই ছিল শায়খের রুটিন। তবে দেখতাম সারাদিন পড়িয়ে প্রায় প্রতিদিন বিকালে নানা জায়গার মাহফিলে যেতেন। ফিরতেন মধ্যরাতে।
জামিয়া রাহমানিয়ায় ভেতরে প্রবেশ করার ২টি গেট। একটি ঢুকতেই হাতের বাঁ পাশে। আরেকটি আরেকটু সামনে গিয়ে ভবনের মাঝামাঝি। এখন মাদরাসার সামনের অংশে যে বিশাল সুরম্য তোরণ হয়েছে, এটা সে সময় ছিল না। শায়খকে দেখেছি প্রায় সবসময় প্রথম গেট দিয়ে ঢুকতেন। এ গেটে ঢুকতে মাথার ওপর গাঢ় সবুজ জমিনে সাদা কালিতে চার লাইনে একটি তারানার অংশ লেখা রয়েছে। এটি জামিয়া রাহমানিয়ার শান রচিত তারান। যেটাকে আমরা তারানায়ে জামিয়া বলি। এটার রচনাও করেছেন শায়খ নিজে। শায়খের গাড়ি মাদরাসায় ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে আশপাশের ছাত্রদের জটলা লেগে যেত। কার আগে কে এগিয়ে আসবে। শায়খ আস্তে আস্তে গাড়ি থেকে নামতেন। পরের বছর থেকে যেটা হয়েছে, গাড়ি থেকে নেমে হুইল চেয়ারে বসতেন আর আমরা চার-পাঁচজনে কখনও চালিয়ে, কখনও হুইল চেয়ার সমেত উঁচু করে শায়খকে ২য় তলায় নিয়ে যেতাম।
এরই মাঝে হয়তো গাড়ি থেকে নামতে গিয়ে শায়খের চোখ পড়েছে গেটের উপরের অংশে, যেখানে তারানায়ে জামিয়ার কয়েকটি লাইন লেখা রয়েছে, নিচ তলা থেকে ২য় তলার একেবারে শেষ প্রান্তে হজরতের রুম পর্যন্ত যেতে যেতে শায়খ তারানার সে অংশটুকু সুর করে পড়তেন। শায়খের চমত্কার উচ্চারণ, গুরুগম্ভীর কণ্ঠ আর দরদমাখা সুর—সব মিলিয়ে আমাদের সে সময়ের যে অনুভূতি হতো তা এখানে প্রকাশ করে অন্তরের অম্লান সে স্বাদ কমাতে চাই না। পাঠক এর জন্য আমাকে ক্ষমা করতে পারেন।
ক’দিন আগে শায়খের বাসায় গেলাম। দেখলাম মেহমানদের বসার রুমটা পরিবর্তন হয়েছে। আগের পুরুনো সে রুমটাতে নয়, বসতে দেয়া হলো অন্য একটা রুমে। রুমের নানা জায়গায় শোভা পাচ্ছে বিভিন্ন সম্মেলন ও প্রতিষ্ঠান থেকে শায়খকে দেয়া সম্মাননা ক্রেস্ট। মানপত্রও রয়েছে বেশক’টি।
বাসার ভেতরের দিকের মাঝারি ধরনের একটি রুমে শায়খ থাকেন। একপাশে কমড বাথরুম, অন্যপাশে খাট পাতা। খাটের পাশে জানালা। থাই গ্লাস সিস্টেম হওয়ায় অর্ধেকটা খোলা। আলো কম হওয়ায় ঘরটাতে আলো-আঁধারের এক ভিন্নরকম খেলা, কিছুটা আঁধার আর অনেকটা আলো। খাটের কাছাকাছি গেলে সে আলো প্রকট হয়ে উঠল, সেটা কি খোলা জানালার কারণে, নাকি খোলা মনের আলোকিত এ মানুষটির কারণে। জানালার পাশে পাতা ছোট্ট খাটে শুয়ে আছেন শাইখুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক দা.বা। আমি সালাম দিয়ে মুসাহাফার জন্য এগিয়ে গেলাম। ভক্তিভরে শায়খের হাত দুটোতে চুমো খেলাম, পরম শ্রদ্ধায় হাত দুটো বেশ কিছুক্ষণ ধরে রাখলাম।
শায়খ জীবনের নানা বর্ণাঢ্য প্রান্ত অত্যন্ত সফলভাবে পেরিয়ে এসেছেন। শিক্ষকতা, রাজনীতি, মাদরাসা পরিচালনা, জাতীয় নেতৃত্বসহ জীবনের সব প্রাঙ্গণে হজরতের যে পরিচয়টি বারবার ফুটে উঠেছে তা হলো অমায়িকত্য ও নির্বিবাদিতা। কারও সঙ্গে কোনো শত্রুতা নয়। হিংসা নয়। এত বড় মাপের এ লোকটি যে ছোট্ট এ খাটটিতে শুয়ে আছেন তা ভাবতে অবাক লাগে। দেখে মনে হলো এখানে আরও কয়েকজন আল্লামা আজিজুল হক নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পারবেন, কোনো বিবাদ বাধবে না।
অন্য সবকিছুর মতো শায়খের শোয়ার ধরনও খুব সুন্দর। ডান দিকে ফিরে মাথার নিচে একটি হাত দিয়ে, হাঁটু দুটি ভাঁজ করে খানিকটা বুকের কাছে এনে শুয়ে আছেন, আরেকটি হাত গায়ের ওপর। কেমন যেন নিজেই নিজেকে জড়িয়ে রেখেছেন। পোশাকও খুব স্বাভাবিক। পরনে লুঙ্গি, গায়ে সাদা রংয়ের একটি ফতোয়া। বেশ আগে থেকেই শায়খ লাগানো দাঁত ব্যবহার করেন। মাদরাসায় দেখতাম মাঝে মাঝে পরিষ্কার করার জন্য দাতগুলো খুলে রাখতেন, তবে এখন আর দাঁত ব্যবহার করেন না, যার কারণে চেহারায় ভরাট সে ভাবটা আর নেই। শরীর বেশ দুর্বল হয়ে পড়েছে, এটা প্রথম দেখাতেই বোঝা যায়।
শায়খের ঘরটা খুব নির্জন, সড়কের একেবারে উল্টো পাশে হওয়ায় এখানে নিস্তব্ধতা অনেক বেশি। আমার কাছে সারাটা ঘরময় কেমন যেন খুব গভীর একটা নির্জনতা মনে হলো। কিতাবে পড়া আগের দিনের বুজুর্গ ও সাধকদের গুহা অভ্যন্তরের হুজরায় যেমন নীরবতা বিরাজ করত, অনেকটা সে রকম।
খাবার-দাবারের খবর নিলাম। নাইম ভাই জানালেন, শায়খের খাওয়া-দাওয়ার ধরন পাল্টে গেছে। খাবারের পরিমাণও কম। বাসা থেকে খুব একটা বের হন না। মাঝে মাঝে ডাক্তারের কাছে যান, বারডেম হাসপাতালে। আর বাসায় সারাক্ষণ থাকেন পারিবারিক আবহে। আর থাকবেনই বা না কেন? এ পরিবারে ছেলেমেয়ে মিলিয়ে হাফেজে কোরআনের সংখ্যা একশ’রও বেশি। পরিবারের আলেম সদস্যের সংখ্যাও প্রায় অর্ধশত। এরকম পরিবারের মাঝে থাকলে এমনিতেই মনে হবে কোন স্বর্গীয় পরিবেশে অবস্থান করছি।
যদি প্রশ্ন করা হয় হজরত শাইখুল হাদিসের কোন পরিচয়টি বড়? বর্ষীয়ান রাজনৈতিক নেতা, প্রখ্যাত বক্তা, বাবরি মসজিদ লংমার্চের আপসহীন নেতা, হাদিসে রাসুলের সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ বুখারি শরীফের প্রথম বাংলা ভাষ্যকার, সফল সংগঠক, নির্লোভ রাজনীতিবিদ, আরও কত কী! এসব অসংখ্য পরিচয়ের মাঝে কোন পরিচয়ে তিনি পরিচিত হবেন আগামী দিনে? আগামী প্রজন্মের সন্তানরা মনের ক্যানভাসে কল্পনার তুলিতে শাইখুল হাদিসের যে প্রতিচ্ছবি আঁকবে, তা এ সবের কোন এঙ্গেল থেকে। এ বিষয়ে তর্ক চলতে পারে। নানা মত-অভিমত থাকতে পারে। প্রতিটি মতের পেছনে শক্তিশালী যুক্তিও থাকবে এবং থাকাটাই স্বাভাবিক। তবে খুব ছোট করে আমি নিজের কথাটা বলতে চাই। আমার ক্ষুদ্র দৃষ্টিতে শাইখুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক দা.বা’র বাকি সব পরিচয় ছাপিয়ে যে পরিচয়টি জেগে ওঠে, তা হলো তার সুমহান শিক্ষক সত্তা। তিনি যেমনিভাবে এদেশের অসংখ্য-অগণিত আলেম-ওলামার শিক্ষক, তেমনি লাখ-কোটি ধর্মপ্রাণ মানুষেরও শিক্ষক, যারা ইসলামের আলোকিত পথের শিক্ষা নিয়েছে দেশের নানা প্রান্তে, তার ওয়াজ মাহফিলে। একইভাবে তাদেরও তিনি শিক্ষক, যারা হেরা গুহা থেকে উত্সারিত আলোক শিখার সন্ধান পেয়েছেন তার লিখিত হাদিসে রাসুলের বিখ্যাত গ্রন্থ বুখারি শরীফের তর্জমা ও সরল অনুবাদসহ নানা কিতাব পড়ে।
এর পাশাপাশি আরেকটি বিষয় স্পষ্ট হয়, তা হলো হজরত শাইখুল হাদিসকে সমকালের শিক্ষক বলা যাবে না। কোনো কাল বা যুগ দিয়ে তার মহান শিক্ষকতার প্রজ্বল রুশনিকে আটকানো যাবে না। কাল থেকে কালান্তরে, যুগ থেকে যুগান্তরে বয়ে যাবে তার শিক্ষার সুমহান ধারা। আর এভাবেই শাইখুল হাদিসের শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাবে শতাব্দীপরম্পরায়। কেয়ামত পর্যন্ত। ইনশাআল্লাহ।

gazisanaullah@gmail.com

Share

কওমী মাদরাসার সরকারী স্বীকৃতির বাড়তি পাওয়ার চেয়ে শিক্ষা ব্যবস্থার স্বকীয়তা-স্বাধীনতার মূল্য বহু বহুগুণ বেশি।

সনদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির বিষয়টি কওমী মাদরাসা মহলে সময়ের আলোচিত বিষয়। বিগত প্রায় ৭/৮ বছর যাবত কওমী ঘরানার সকলে ঐকমত্যে এ ব্যাপারে জোড়ালো দাবি জানিয়ে আসছে। শুরুতে কারো কারো কিছুটা দ্বিমত থাকলেও পরিস্থিতি প্রেক্ষাপট দৃশ্যে কওমী মাদরাসার সনদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির প্রয়োজনীয়তা এক অনস্বীকার্য বাস্তবতায় পরিণত হয়। ধীরে ধীরে তাই এই স্বীকৃতির দাবিতে কওমী ছাত্র-শিক্ষকগণ আরো বেশি স্বোচ্ছার হতে থাকে।
উপনিবেশ কালে ১৮৬৬ সালে ভারতের উত্তর প্রদেশের দেওবন্দ এলাকায় দারুল উলূম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দেবন্দী সিলসিলা তথা কওমী মাদরাসার গোড়া পত্তন। উপনিবেশ কালে ইসলামী শিক্ষা ধ্বংস করে মুসলিম জাতিকে ইসলামী চেতনাশূন্য করার রাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্রের মোকাবিলায় সরকারী নিয়ন্ত্রণের বাইরে থেকে বেসরকারী উদ্যোগে পরিচালনার মূলনীতি নিয়ে যাত্রা শুরু করে এই কওমী মাদরাসা শিক্ষা। ১৮৬৬ থেকে ২০০০ অনেক পরিবর্তন এসেছে। প্রয়োজনীয়তার নতুন নতুন দিক উম্মোচিত হয়েছে। সমাজের সর্বস্তরে অবাধে সহীহ দীনী শিক্ষা ও দাওয়াত পৌঁছানোর এবং স্বদেশের মাটিতে শিক্ষার মর্যাদা লাভের লক্ষ্যে শিক্ষাব্যবস্থার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির প্রয়োজনীয়তা তীব্র হতে থাকে।
অপর দিকে কওমী শিক্ষা শিক্ষাধারা তার স্বকীয় বৈশিষ্টের কারণে সমাজের তৃণমূল পর্যায়ে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে ও পড়তে থাকে। কওমী শিক্ষার এ নিরব বিপ্লব ও ব্যাপক বি¯তৃতি একটা সময় অবধি অনেকের অলক্ষ্যে ঘটতে পারলেও সম্প্রতিক সময়ে এটি ইঙ্গ-মার্কিন নেতৃত্বাধীন পাশ্চাত্য শক্তির উদ্বেগের কারণ হয়ে দেখা দেয়। তারা নড়ে চড়ে বসে। সারা দুনিয়ার আনাচে কানাচে ছড়িয়ে পড়া এই শিক্ষার ব্যাপারে তারা খোঁজ-খবর নিতে আরম্ভ করে। তাদের সামনে এটা সম্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থার বি¯তৃতির চেয়ে আরো বেশি হারে কওমী শিক্ষা বি¯তৃতি লাভ করতে পারে। সরকারী কোনো অনুমোদনের তোয়াক্কা না থাকায় ব্যাপারটি খুব সহজে ঘটে যায়। তাই জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মণ্ডলে এই শিক্ষার ক্রমবর্ধমান বি¯তৃতির রশি টেনে ধরার কৌশল গৃহীত হয়। সঙ্গত কারণেই এই শিক্ষাধারার প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকারী ছাঁচে নিয়ে আসার একটা গরজ ঐ মহলে সৃষ্টি হয়।
এহেন পরিস্থিতিতে কওমী শিক্ষা ব্যবস্থার কাণ্ডারীদের কাঁধে জাতীয় আমানতের ঐতিহাসিক দায়িত্ব। এক দিকে শিক্ষার মর্যাদা লাভ ও দীনী তা’লীম ও দাওয়াতকে নির্বিঘ ও ব্যাপক করার প্রয়োজনে শিক্ষা ব্যবস্থার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবি আদায়। অপর দিকে প্রতিপক্ষের পাঁতা ফাঁদ থেকে কওমী শিক্ষার স্বকীয় চরিত্র ও ভাবাদর্শকে রক্ষা করার এক জটিল চ্যালেঞ্জের মুখোমুখী দাঁড়িয়ে কওমী মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থা।
আমরা গভীর উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করছি যে, সরকারীভাবে এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত কুটিল ও জটিল একটি পথ তৈরি করা হয়েছে। অনৈক্য-বিভাজনের বীজ বুনে দিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে স্বীকৃতির রূপ তৈরি করার শর্ত জুড়ে দিচ্ছে আর অপর দিকে নিজেদের মতো করে একটি সিলেবাস ও রোল মডেল তৈরি করে স্বীকৃতির মুলা ঝুলিয়ে দেওয়ার পাঁয়তারা করছে। এটি এমন এক নাজুক চ্যালেঞ্জ যা সফলভাবে মোকাবিলায় ব্যর্থ হলে এর মাশুল গুণতে হবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে।
আমরা যদি একাধিক পক্ষে বিভক্ত হয়ে সরকারের কাছ থেকে মূলা আনার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হই, তাহলে প্রতিযোগিতার সময় লক্ষ্য আর দৃষ্টি থাকবে শুধু মূলার দিকে; দীন-মিল্লাত ও শিক্ষা ব্যবস্থার স্বার্থের কথা চিন্তা করার সুযোগ থাকবে থোড়াই! সুতরাং এমন অন্ধ প্রতিযোগিতা হবে নি:সন্দেহে চরম আত্মঘাতি। আমরা সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি আহবান জানাই, পরস্পর অন্ধ প্রতিযোগিতার বিপদজনক পথ পরিহার করে সম্মিলিত ও সুপরিকল্পিতভাবে জটিলতম এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুত হোন। ভুলে যাবেন না, সরকারী স্বীকৃতির বাড়তি পাওয়া টুকুর চেয়ে শিক্ষা ব্যবস্থার স্বকীয়তা-স্বাধীনতার মূল্য বহু বহুগুণ বেশি।
আয় তায়েরে নাহুতি
উস রিয্ক সে মওত আচ্ছি
যিস রিয্ক সে হো পরওয়াজ মে কোতাহী

Share

বেকারত্ব যদি জঙ্গিতপরতার দিকে নিয়ে যায় তাহলে সোনার বাংলার এক কোটি বেকার এখন কী করছে?

মুহাম্মদ যাইনুল আবিদীন

গল্পটা আমাদের এই সোনার বাংলার। ২০০৮ সালের তথ্য মতে এদেশে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা প্রায় চার কোটি। আর এদের মধ্যে বেকারের সংখ্যা প্রায় এক কোটি বিশ লাখ। মজার বিষয় হলো এই বেকারদের মধ্যে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা প্রায় এক কোটি। অবশিষ্ট বিশ লাখ অশিক্ষিত বেকার। মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী এবং শিক্ষাবিদদের অগ্রপথিকদের পিলে চমকে দেওয়ার মতো তথ্য হলো‘দেশের শিক্ষাপ্রাপ্ত শিক্ষিত শ্রেণীর প্রায় সত্তর ভাগ বেকার। তাছাড়া শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি পায়নি এমন বেকারের সংখ্যাও অনেক।’ [তথ্য : মাধ্যমিক পৌরনীতিÑনমব দশম শ্রেণীর পাঠ্যপুস্তক’ শিরোনাম : বেকারত্ব]
তারপর এই বেকারত্বের গভীর গুহা থেকে বেরিয়ে আসার পথ হিসেবে ছয়টি উপায় নির্দেশ করা হয়েছে এই গ্রন্থে। সংক্ষেপে উপায় ছয়টি হলো
১। শিল্পের উন্নয়ন। শিল্পের উন্নয়ন ও প্রসার ঘটলে কলকারখানা গড়ে উঠবে। কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে।
২। কর্মসংস্থান বৃদ্ধি। গ্রামে গঞ্জে কুটিরশিল্প স্থাপন করে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করা যায়। তাছাড়া মাছের চাষ, হাঁস-মুরগির খামার, পশুপালন ও ফলের চাষ কর্মসংস্থান বাড়াতে পারে।
৩। জনশক্তির উন্নয়ন। হস্তশিল্প, কাঠের কাজ, বেতের কাজ, বাঁশের কাজ, মাছের চাষ, হাঁস-মুরগির খামার, পশুপালন সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ, লেদ মেশিন স্থাপন, ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ, হোটেল সংক্রান্ত ট্রেনিং, চুলকাটার ট্রেনিং, দর্জি, কলকারখানার কাজ, সেলসম্যানশীপ ইত্যাদি বিষয়ে প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশের বিপুল বেকারদের শ্রমশক্তিতে পরিণত করা যেতে পারে।
৪। সর্বজনীন শিক্ষা। বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা, বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রসার, আত্মকর্মসংস্থান সংক্রান্ত শিক্ষা, কর্মমুখী শিক্ষা ও উচ্চশিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে।
৫। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ। সরকার পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমকে জোরদার করে জনসংখ্যা বৃদ্ধি রোধ করতে সক্ষম হলে সহজেই বেকার সমস্যার সমাধান করা যাবে।
৬. গ্রামভিত্তিক উন্নয়ন কার্যক্রম। রাস্তা ঘাট, বৃক্ষরোপণ, হাট-বাজার উন্নয়ন, কুটিরশিল্প ও কৃষি খামার স্থাপন ইত্যাদি সংক্রান্ত কার্যক্রম হাতে নিলে আপনা থেকেই বেকারত্ব হ্রাস পাবে। [ঐ, পৃ. ১৩৪]
এ হলো নব ও দশম শ্রেণীর সরকারী পাঠ্যপুস্তকে প্রকাশিত বেকারত্ব সম্পর্কিত তথ্য ও উত্তরণের পন্থা। যে কোনো পাঠকই বলতে পারেন উল্লেখিত ছয়টি বেকারত্ব-উত্তরণের কোনটি এমন যার জন্যে কাড়ি কাড়ি পড়াশোনা দরকার। সন্দেহ নেই, বেকারত্ব থেকে বের হয়ে আসার যতোগুলো ‘কর্ম’ নির্দেশ করা হয়েছে সেগুলো অশিক্ষিতরাই ভালো পারবে। হয়তো প্রয়োজন হবে স্বাক্ষর জ্ঞান কোথাও বা প্রাথমিক শিক্ষার। তাই বলা যায় বিজ্ঞজনদের দেওয়া এই ফর্মূলা বাস্তবায়িত হলে বিশ লাখ অশিক্ষিত বেকারের ঘর কলঙ্কমুক্ত হবে। কিন্তু এক কোটি শিক্ষিত? রসিকতার বিষয় হলো বেকারত্ব ঘুচাবার কর্মসূচিতে আবার এই শিক্ষাকেও একটি উপায় হিসেবে ধরা হয়েছে ‘সর্বজনীন’ শিরোনামে। তাও বাধ্যতামূলক বৃত্তিমূলক এবং উচ্চশিক্ষার মতো ব্যাপার স্যাপার। কারণ এই ফর্মূলা শিক্ষিতদের প্রসব। শিক্ষার ‘লাজ’ রক্ষা করা আর কি!
বুঝতে কারোরই অসুবিধা হওয়ার কথা নয় বেঈমান ইংরেজদের দেওয়া হাতে ওঠার রঙিন তকমা ‘আধুনিকশিক্ষা’ এখন আমাদের গলার ফাঁস হয়ে দাঁড়িয়েছে। মূর্খ ছেলেটা বেকার হলে একটা সান্ত্বনা থাকে। ওর পেছনে কোনো ইনভেস্ট নেই। কিন্তু লাখ লাখ টাকা খরচ করে উচ্চশিক্ষা দানের পর যদি ছেলেটা বেকার হয়ে পরিবারের পিঠে চেপে বসে তখন একমাত্র ‘ফাঁসি’ ছাড়া এই ‘আপদ’ থেকে মুক্তির আর পথ থাকে কি? সেই সাথে ‘বৃত্তিমূলক’ ও ‘বাধ্যতামূলক’ বিদ্যার ঘোড়া চালিয়ে রাষ্ট্রের অবস্থা কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় তাও তো ভাববার বিষয়।

দুই.
রাষ্ট্রকে অবশেষে একথা ভাবতে হয়েছে। চার কোটি কর্মক্ষম মানুষের মধ্যে যখন এক কোটি ছাড়িয়ে যায় শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা তখন তো অবশ্যই সেই শিক্ষা নিয়ে ভাবতে হয়। অধিকন্তু সেই হার যখন ক্রমবর্ধমান। তাও প্রতি একশ’জন শিক্ষিতের মধ্যে যখন সত্তরজন বেকার। কী রক্ত হিম করা তথ্য!
দেশ ও জাতিকে এই ভার থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন একটি কৌশলপত্র প্রণয়ন করেছে এবং সরকারের হাতে তুলে দিয়েছে। এই কৌশলপত্রের সুপারিশ অনুযায়ী আগামী ২০ বছরের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত করার কথা বলা হয়েছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সব ধরনের ভর্তুকি তুলে নেওয়ার সুপারিশ করেছে এই কমিশন। মঞ্জুরি কমিশনের কৌশলপত্রে বলা হয়েছে ভর্তুকি তুলে নেওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিজস্ব অর্থায়নে চলতে হবে। নিজস্ব অর্থ কিভাবে আসবে তারও একটা ছক তুলে ধরা হয়েছে কৌশলপত্রে।
আলোচিত এই কৌশলপত্রের ১৩ পৃষ্ঠায় মানবিক ও বিজ্ঞান বিভাগ সম্পর্কে বলা হয়েছে ‘পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মানবিক ও বিজ্ঞান শাখা থেকে বের হওয়া ছাত্রদের বর্তমান চাকরির বাজারে ও বাস্তব জীবনে তেমন কোনো মূল্য নেই।’
এসব বিষয় থেকে পাশ করা উচ্চশিক্ষিায় শিক্ষিতদের যেহেতু চাকরি নেই, সেহেতু ওই বিষয়গুলোর প্রয়োজনীয়তাও শেষ হয়ে গেছে বলে মনে করেন কৌশলপত্রের নির্মাতারা। বিজ্ঞান ও মানবিক শিক্ষার বাজারমূল্য নেই। তাই বাজারমুখি উচ্চশিক্ষার বিষয়গুলোর প্রতি জোর দেওয়া হয়েছে কৌশলপত্রে।
কৌশলপত্রে সুপারিশকৃত বিষয় সম্পর্কে বলা হয়েছেÑ ‘তথ্য ও প্রযুক্তিবিদ্যা, ব্যবসা ও শিল্প বিষয়ে উচ্চশিক্ষার দ্বার খুলে গেছে। কিন্তু এই নতুন শিক্ষা খাতের তুলনায় মানবিক শাখার কোনো ভবিষ্যত নেই।’ মানবিক ও বিজ্ঞান শিক্ষার ভবিষ্যত না থাকায় কৌশলপত্রের অন্যত্র বলা হযেছে ‘মৌলিক বিজ্ঞান, সাহিত্য (বাংলা, ইংরেজি) দর্শন ইতিহাস ও ভাষাতত্ত্বের মতো মৌলিক বিষয়গুলো উচ্চশিক্ষা থেকে বাদ পড়ে যাবে।’
কী আশ্চর্য কথা! রবি ঠাকুর যে সাহিত্যে নোবেল এনে বাঙালির মাথা খাড়া করল সেই সাহিত্যটাই বাদ পড়ে যাবে উচ্চশিক্ষার ফর্দ থেকে? তারপর থাকবে না সাধের বিজ্ঞান! রুখে দাঁড়াবার শ্লোগান। নেমে এলো জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহসী শিক্ষার্থীরা। বিজ্ঞানময় ভঙ্গিতে জ্বালাও পোড়াও আন্দোলন। সরকার সরে এলো তার লক্ষ্য থেকে।
প্রধানমন্ত্রী মেনে নিলেন শিক্ষার্থীদের দাবি। শিক্ষার ভার আবার তুলে দিলেন ভারবহনে অভ্যস্ত হতভাগা বাঙালি জাতির কাঁধে। সেই ভার কেমন একজন তরুণের খেদোক্তি দেখুন! গত ১লা অক্টোবর ফেইসবুকের এক তরুণের স্ট্যাটাস ছিল এমন ২১ হাজার শিক্ষার্থীর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট ২০১১-১২ সালের জন্যে মাত্র ৩০ কোটি টাকা। যে দেশে ১লাখ ৬৩ হাজার কোটি টাকার বাজেট করা হয়, যে দেশে জ্বালানি খাতে বহুজাতিক কোম্পানিকে বছরে আড়াই হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেয়া হয়, যে দেশে সামরিক খাতের বাজেট এক বছরে ১০ হাজার ৯১৮ থেকে ১ হাজার ২১৬ কোটি টাকা বাড়িয়ে ১২ হাজার ১৩৪ কোটি টাকায় পরিণত করা হয়, সেই ২১ হাজার শিক্ষার্থীর জন্যে এক বছরে মাত্র ৩০ কোটি টাকা ব্যয় রাষ্ট্রের জন্যে কষ্টকরই বটে। [তথ্য: কালের কণ্ঠের সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন রাজনীতি: ৪ অক্টোবর ২০১১]
খেদ যথার্থ! ২১ হাজার ছাত্রের জন্যে বছরে মাত্র ৩০ কোটি টাকা! কিন্তু মঞ্জুরি কমিশনের কথা হলো দশ টাকাই হোক! টাকা খরচ করে কেউ সংকট কিনে আনে? তাও আবার শিক্ষিত বেকারের মতো সংকট! কথার পুরোটাই যুক্তি।
তিন.
এই যখন আমাদের পরাধীনতার আমলের কথিত আধুনিশিক্ষার হাল তখন আমাদের এক ‘মানিক’ অধ্যাপক একখানা ‘কেতাব’ রচনা করেছেন। রচনা তো নয় রীতিমতো নিষ্ঠুর গবেষণা। গবেষণার বিষয় মাদরাসাশিক্ষা। গবেষণায় নেতৃত্ব দিয়েছেন অর্থনীতিবিদ ড. আবুল বারাকাত। বইয়ের শিরোনাম : ‘পলিটিক্যাল ইকোনমি অব মাদ্রারাসা এডুকেশন ইন বাংলাদেশ।’ এর প্রকাশনা উৎসব অনুষ্ঠিত হয় গত ১লা অক্টোবর রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে। এই গবেষণায় দাবি করা হয়েছে দেশের প্রতি তিনজন শিক্ষার্থীর একজন মাদরাসায় পড়ে। মাদরাসা থেকে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের মাত্র ২ শতাংশ কর্মসংস্থানের সুযোগ পায়। ধীমান গবেষকগণ আরো দাবি করেছেন মাদরাসার শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের ৯২ শতাংশই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এর ৬৭ শতাংশ জড়িত বিএনপি জামায়াত ইসলামি শাসনতন্ত্র কিংবা খেলাফত মজলিসের সঙ্গে। অতঃপর তাদের মেধা সাধনা ও আদর্শকে ‘মারাত্মকভাবে’ প্রতিষ্ঠিত করার জন্যে সেই কথাটা বলেছেন যে কথাটা তাদের পূর্বসূরি বেঈমান বুদ্ধিজীবীরা বলেছেন বহুবার। কথাটা হলো‘তাদের একটি অংশ জঙ্গি তৎপরতায় লিপ্ত হয়।’ গবেষণার ফলাফলে বলা হয়েছে তাদের প্রাপ্ত তথ্য শিক্ষাব্যবস্থায় বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতা নির্দেশ করে। দরিদ্র-নি¤œবিত্ত ঘরের সন্তানদের সংখ্যা মাদরাসায় আনুপাতিক হারে বেশি। এটা নির্দেশ করে যে, রাষ্ট্র দরিদ্র ঘরের সন্তানদের মূলধারার শিক্ষায় আনতে ব্যর্থ হয়েছে। [সূত্র: কালের কণ্ঠ : ২ অক্টোবর ২০১১]
অনুষ্ঠানে উপস্থিত একমাত্র আলেম আলোচক মাওলানা ফরীদউদ্দীন মাসউদ বইটির মূল্যায়ন করতে গিয়ে বলেছেন ‘৯০ ভাগই ভাল হয়েছে আর ১০ ভাগে কলঙক রয়েছে।’ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বইটিতে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। [প্রাগুক্ত]
‘কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে’একথার মাধ্যমে সচেতন বিদ্বান মাত্রই জানেন গবেষণায় চাতুর্য একটা বড় অপরাধ। অথচ এই গবেষণা কর্মে সেই চাতুর্য স্পষ্ট। গবেষকগণ দাবি করেছেন ‘বাংলাদেশে এখন ১৪ হাজার ৫১৮টি আলিয়া মাদরাসা রয়েছে। এর বিপরীতে কওমী মাদরাসা সংখ্যা ৩৯ হাজার ৬১২টি।’ ভালো কথা! তাহলে ছাত্র সংখ্যাও বলুন! সেটা বলেননি। কারণ দাখেল পরীক্ষার্থী যদি আড়াই লাখ হয় তাহলে তার সমমান বাংলাদেশ কওমি মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড (বেফাক) এর মুতাওয়াসতিার পরীক্ষার্থী সংখ্যা হয় আড়াই হাজার। বেফাকের বাইরে অন্য সকল প্রতিষ্ঠান মিলে হয় তো আরো আড়াই হাজার। সুতরাং কোথায় পাঁচ হাজার আর কোথায় আড়াই লাখ। এই সংখ্যা সামনে রাখলেই বের হয়ে আসবে ‘প্রতি তিনজন শিক্ষার্থীর একজন মাদরাসায় পড়ে’ এর অর্থ কি? এরা কোন মাদরাসায় পড়ে? অংকের ফাঁকটা ধরা কোন মুসলমানের পক্ষে কঠিন হওযার কথা নয়। তাছাড়া কওমী মাদরাসাশিক্ষার সবচে’ বড় বোর্ড বেফাকের মাদরাসা সংখ্যা ২০০৯ সালের তথ্য মতে ১৬৭৯টি। সুতরাং সারা দেশে প্রায় চব্বিশ হাজার মাদরাসা কোথা থেকে আবিষ্কার করলেন ড. আবুল সাহেবরা তাও বলেননি। এই সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই স্কুলকে মাদরাসা বানিয়ে নাটক করা হয়েছিল। ড. আবুল সাহেবরা সেই ‘খাজানা’ থেকে তথ্য আনেননি তো? সন্দেহ হতেই পারে।
আরেকটু পরিষ্কার করি বিগত ৩২ বছরে সাতটি স্তরে বেফাক বোর্ডের অধীনে পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করেছে মাত্র ২৯৯৯০৫জন ছাত্র। যা শুধুমাত্র এক বছরের এসএসসি পরীক্ষার্থীর প্রায় তিন ভাগের এক ভাগ। এই হলো সর্বোচ্চ বোর্ডের ছাত্র সংখ্যা। এই সংখ্যাকে প্রতি তিনজনের একজনে এনে দাঁড় করানো কতোটা হাস্যকর এবং বিকৃত চরিত্রের পরিচায়ক তা আর বলতে হয় না।
আরেকটি বিষয় পরিষ্কার করে নিই। স্কুল এবং আলিয়া মাদরাসা বেঈমান দখলদার বৃটিশের সৃষ্টি এটা এ দেশের সচেতন নাগরিক মাত্রই জানেন। সুতরাং ‘মূলধারা’ বলতে যদি ব্রিটিশ-প্রসব’ বুঝানো হয়এবং এই হয়েতো বুঝাচ্ছেন তাহলে আলিয়া মাদরাসাকে মুসলমানদের দেড় হাজার বছরের ‘ধন’ কওমী মাদরাসার সাথে মিলিয়ে ফেলা এই গবেষণার একটি জঘন্যতম কলঙ্কময় দিক। এই কলঙ্ক প্রসব করতে একদল গবেষককে দীর্ঘ দিন ওম তাপ দিতে হয়েছে।
কিন্তু কেন এই কলঙ্কপূর্ণ গবেষণা! পাঠকের মনে হয় উত্তর জানা হয়ে গেছে। আমরা এই নিবন্ধের সূচনায় সরকারি পাঠ্যপুস্তকের বরাত দিয়ে উল্লেখ করেছি এই গুণধর ধীমান কৌশলদীপ্ত মান্যবর অধ্যাপক মহোদয়গণ এরই মধ্যে এক কোটি বেকার জন্ম দিয়েছেন যা রাষ্ট্রের মূল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর এক চতুর্থাংশ। যা রাষ্ট্রের পিঠকে বাঁকা করে ফেলেছে। সচেতন অভিভাবকদের মধ্যে খেদ ক্ষোভ ও হতাশা পুঞ্জীভূত হতে শুরু করেছে লাখ লাখ টাকা খরচ করে সন্তানদের এই শিক্ষায় শিক্ষিত করে কী পেয়েছি কী পাব? যার হরফে বাঁধানো প্রতিধ্বনি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের কৌশলপত্র। সময়ের বাস্তবতা, বিদ্বান বেকারের আদিগন্ত বিস্তৃত মিছিল, হা করা অভাব, অভিভাবকের আকাশ আকাশ স্বপ্ন, স্বপ্ন পূরণে শিক্ষা শক্তির ব্যর্থতা, পাছে উড়াল আশ্বাস, প্রতিষ্ঠানপক্ষের বরাবর বাগাড়ম্বরতাপুরো আধুনিক শিক্ষাকেই অস্তিত্বের সংকটে ফেলে দিয়েছে। মানুষ দেখছে শিক্ষিত বানানো মানেই বেকার বানানো! টাকা খরচ করে সন্তানকে প্রথমে ‘বেকার- বোঝা’ অতঃপর ‘করুণাপত্রে’ পরিণত করা অতি বেকার পক্ষে শোভনীয় নয়। আলোচ্য গবেষণার ভেতর দিয়ে গুণমান গবেষকগণ হয় তো দেখাতে চেয়েছেনÑ বেকার আমরাই বানাচ্ছি না। মাদরাসাগুলোও বেকার বানাচ্ছে। কিন্তু ভুল করেছেন সঙ্গে কওমী মাদরাসার নাম করে। শুধু আলিয়া মাদরাসাকে সঙ্গে নিয়ে কিছু কলঙ্ক হয়তো ওদের পিঠেও চাপানো যেতো। কারণ কওমী মাদরাসা সম্পূর্ণ জনগণের শরীর ও আত্মার আওতায় পরিচালিত।
এদেশের যারা মসজিদে যায় তারা জানে এখনো এদেশে যে পরিমাণ দীনদার আলেম প্রয়োজন কওমী মাদরাসা তা দিতে পারেনি। বেকার হওয়া পরের কথাপ্রয়োজনের ঘরই শূন্য পড়ে আছে। এই গবেষণার আরো কটি মোটা দাগের কলঙ্ক হলো কল্পিত ছক অনুযায়ী ছবি বানাতে গিয়ে এই গবেষকরা জানবারও সুযোগ পাননি জামায়াত আর কওমী মাদরাসা হলো সাপে নেউলের মতো। প্রসবিত গবেষণা হলে যা হয়! কওমী মাদরাসার ছাত্র-শিক্ষকদের পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে তাদের দুশমন জামায়াতের ঘরে। কী দুর্লভ আবিষ্কার। তাছাড়া মাদরাসায় যে কোন ‘কর্মকর্তা’ নেই সে তো যে কোন মুসলমানকে জিজ্ঞেস করলেই হতো। তাছাড়া দরিদ্ররাই যদি মাদরাসায় পড়তো তাহলে জগন্নাথের ছেলেরা কেন রাস্তায় নেমে গাড়ি ভাংচুর করল। বছরে ৩০ কোটি টাকায়ও যাদের শিক্ষা চলছে না তারা ধনী? খাঁটি মুসলমানের সন্তানরা মাদরাসাতেই পড়ে। এই তথ্যটা বোধ হয় গবেষণায় ধরা পড়েনি। ১০ ভাগ কলঙ্কের মধ্যে হয় তো এও ছিল।

অনুষ্ঠানে জাতীয় অধ্যাপক ড. সালাহ উদ্দিন আহমেদ বলেছেন ‘মাদরাসাশিক্ষা ব্যবস্থার প্রধান সীমাবদ্ধতা হলো, এ শিক্ষা পদ্ধতিতে নতুন জ্ঞান চর্চার সুযোগ নেই।’ সবিনয়ে বলি জনাব!
মাদরাসা ধর্ম শেখায়। ধর্ম নতুন হয় না। তাছাড়া নতুন জ্ঞান দিয়ে এক কোটি বেকার তৈরির পরও ওই বস্তুটার চাহিদা পূরণ হয়নি? আপনারা কি পুরো জাতিটাকেই বেকার বানাতে চান? আর জঙ্গি তৎপরতা সম্পর্কে বলব বেকারত্ব যদি জঙ্গিতপরতার দিকে নিয়ে যায় তাহলে আপনার গড়া এক কোটি বেকার এখন কী করছে বলবেন কি?

শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক। একটি হিমালয়ের নাম। যার উু চতা আকাশের মেঘমালা ঠেলে আরো বহুদূর ওঠে গেছে। দিগন্ত জোড়া এই সাদা-শুভ্র নামের বি¯তৃতি দেখে অবাক বিস্ময়ে চেয়ে আছে পৃথিবীর লক্ষ কোটি চোখ। এই নামের সুবিশাল বক্ষ বেয়ে জ্ঞান, প্রজ্ঞা আর বিপ্লবের শত-সহস্র নির্ঝরণীর অপ্রতিরোধ্য অবিরল ধারা যেদিকটাতেই বয়ে গেছে সবুজ-শ্যামলে তার দুই পাশ ভরিয়ে দিয়ে গেছে।

‘শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক’ এই নামের হিমালয়টি বাংলাদেশের হৃদয়ের অতল গহীন থেকে ওঠে এসে দশকের পর দশক ধরে যে সকল অন্যায়-অনাচার আর অপশক্তির বিক্ষুব্ধ ঝড়-ঝাঞ্ঝা এবং যে সকল প্রতিকূলতাকে ছিন্ন ভিন্ন করে দিয়ে বুক চিতিয়ে অনড়-অবিচল দাঁড়িয়ে আছে,সে ইতিহাস আমাদের অনেকের দেখা, অনেকের জানা। কিন্তু ইতিহাসের পেছনের আরেক ইতিহাস-কী করে খন্ড-খন্ড শিলা জমে এরূপ সুদৃঢ়, দীপ্তিময় মেঘ ছোঁয়া হিমালয়ের জন্ম তা আমাদের অধিকাংশেরই অজানা। সেই অজানার তৃঞ্চার্ত জিবে খানিকটা শীতলজল ঢেলে দেয়ার উদগ্র বাসনা নিয়ে এগিয়ে এসেছেন শায়খুল হাদিসেরই দৌহিত্র মাওলানা এহসানুল হক। রচনা করেছেন ‘ছেলেবেলায় শায়খুল হাদিস’ নামের অসাধারণ একগ্রন্থ। দৈনিক নয়া দিগন্তের সহ- সম্পাদক মাওলানা লিয়াকত আলীর সম্পাদনায় গ্রন্থটি পেয়েছে নতুন আবেগ,নতুন প্রাণ। নিজ থেকে আলোচনা-সমালোচনা করবো না। ঢাকা পল্টনের বাংলাদেশ ফটোজার্নালিষ্ট এসোসিয়েশন মিলনায়তনে ১৩ মে বৃহস্পতিবার বইটির মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দের গ্রন্থ সমালোচনা থেকে খন্ডবিশেষ তুলে ধরবো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর বিশিষ্ট কলামিস্ট, বুদ্ধিজীবি ড. মাহবুবুল্লাহ বিসমিল্লাহ দিয়ে শুরু করে নরম গলায় যা বললেন তা শুনে অনেকেই হয়ত চমকে ওঠবেন। চমকে ওঠলে ওঠুন-“বইটি আমি শুরু থেকে নিয়ে শেষ পর্যন্ত এক টানে পড়ে শেষ করেছি। বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি গুরু ত্বপূর্ণ অংশ এই বই” বইয়ের সাহিত্যগুণ, বর্ণনার আঙ্গিক ইত্যাদির বিবেচনা না করে যদি শুধু বিষয়বস্তুর প্রতি দৃষ্টিপাত করি তাহলেও ড.মাহবুবুল্লাহর মন্তব্যের যথার্থ ফুঠে ওঠে। কবি আব্দুল হাই শিকদার অন্য রকম এক হাসিতে সারা হল ঘরটা আলোকিত করে দিয়ে ডান হাতটা দু’গালে ঘষতে ঘষতে বলতে শুরু করলেন-”আমি ভাই চাচা-ছোলা মানুষ। আলোচনা করতে বলেছে বিশাল এক ব্যক্তি নিয়ে তাও আবার এতগুলো হংসের মাঝে আমি এক বককে! আমাদের ইসলামিক বইগুলোর প্রু ছদ, মুদ্রণ ইত্যাদি মানুষের দৃষ্টি কাড়ে না। কিন্তু ‘ ছেলেবেলায় শায়খুল হাদিস’ বইটির প্রু ছদ, মুদ্রণ,বাইন্ডিং অত্যন্ত রু চিশীল এবং নজরকাড়া। দেখলে ধরতে মন চায়।

পৃথিবীতে ভালকাজের সংখ্যা একেবারেই কমে গেছে। এখন আর আগের মত ফুল ফোটে না। পাখিরা গান গায় না। নদীরাও একে একে মরে যাুে ছ। এই অনুর্বর দেশে এমন একটি উর্বর বই শুভদ্বারের উন্মোচন ঘটাল।”

আমাদের কওমিঅঙ্গনের বাংলাসাহিত্যে অনেকটা পদ্মফুলের সাথে তুলনীয়, শক্তিমান লেখক কথাশি-ী মুহাম্মদ যাইনুল আবিদীন। তার বক্তব্য দিয়েই আমার লেখাটি শেষ করব।

তার সুদীর্ঘ সুললিত যুক্তিপূর্ণ আলোচনার অংশ বিশেষ এই – মাওলানা এহসানুল হক এই তরু ণ বয়সেই শায়খুল হাদিসের মত মহামনীষীকে নিয়ে এমন একটি বিষয়িগ্রন্থ রচনা করলেন যা অন্য সকল তরু ণদের অনুপ্রাণিত করবে। সাহস জোগাবে।

দ্বিতীয়ত, এই গ্রন্থ পাঠ করে যে কেউ তার আলোর বিভায় শায়খুল হাদিসের মত আকাশ বিশাল হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে জীবনের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যেতে পারেন। কারণ শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক সুদূর আকাশে মিটিমিটি করে জ্বলতে থাকা কোনো নক্ষত্র নয়। বরং ভোরের মস্ত বড় সাদা ফুলের মতো সবগুলো পাপড়ি মেলে দিয়ে আমাদের সমস্ত হৃদয় জুড়ে ফুটে আছেন। চাইলেই আমরা তার সৌরভে নিমজ্জিত হতে পারি।

Share

ফতোয়া : এখনো অনেক পথ বাকি

মুহাম্মদ যাইনুল আবিদীন

অবশেষে সুপ্রিমকোর্ট ফতোয়া বৈধ বলে রায় দিয়েছে। এর ভেতর দিয়ে আমাদের আাদালত বড় ধরণের একটি কলঙ্ক থেকে জাতিকে মুক্তি দিয়েছে। সব প্রশংসা আল্লাহর। ২০০১ সালে ধর্মাপরাধী আইনজীবী বিচারপতি গোলাম রববানী নাজমুন আরা-‘সব ধরনের ফতোয়া অবৈধ’ বলে রায় প্রদানের মাধ্যমে মুসলিম বাংলার হাইকোর্টকে অপবিত্র করেছিল। রোষে-ক্ষোভে ফেটে পড়েছিল ঈমানদার বাংলাদেশ। শুরু হয়েছিল মাটি-মানুষ ও পতাকার হাজার বছরের ঐতিহ্য উদ্ধারের সংগ্রাম। সাবাস বাংলাদেশ। সাবাস ঈমানদার জনতা। সাহসের মিছিল মুছে দিয়েছে পাপী দুশমনদের কলঙ্কের ছাপ। বিজয়ের সন্দেশ মুঠোয় ভরে ঘরে ফিরেছে সত্যের পতাকাবাহী মানুষের দল। এই ঘটনা আগামী দিনে সত্য-প্রতিষ্ঠার বিপ্লবের পথে বাতিঘর হয়ে থাকবে।

দুই.

ফতোয়া নিষিদ্ধ করে দেয়া হাইকোর্টের রায়ের বিরু দ্ধে আপিল শুনানিতে অ্যামিকাস কিউরি (আদালত সহায়ক আইনজীবি) হিসেবে অভিমত ব্যক্ত করেন দেশের শীর্ষস্থানীয় আইনজীবি-টি এইচ খান, ব্যরিস্টার রফিক উল হক এবং এবি এম নূরু ল ইসলাম প্রমুখ। এতে ফতোয়ার পক্ষে অভিমত দিয়ে ব্যারিস্টার রফিক উল হক বলেছেন-এটি একটি বৈধ বিষয়। ফতোয়া বিজ্ঞ আলেমদের একটি সাংবিধানিক অধিকার। তবে গ্রাম্য সালিশকারীদের ফতোয়ার নামে কোনো আদেশ দিলে তাদের বিরু দ্ধে ফৌজদারি অপরাধ গণ্য করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। তিনি বলেন-ঢালাওভাবে ফতোয়া নিষিদ্ধ করে হাইকোর্ট যে রায় দিয়েছে তা সঠিক হয়নি। কারণ ফতোয়া হুে ছ ব্যাক্তিগত অভিমত। বিজ্ঞ আলেমদের অধিকার রয়েছে এ অভিমত ব্যক্ত করার।

ফতোয়াকে আলেমদের ‘সাংবিধানিক অধিকার’ আখ্যা দিয়ে জ্যৈষ্ঠতম আইনজীবী টি এইচ খান বলেছেন-সংবিধান অনুযায়ি প্রতিটি নাগরিকের স্বাধীন মত প্রকাশের অধিকার রয়েছে। ১০২ অনুুে ছদ অনুযায়ী বিজ্ঞ আলেমদের অধিকার রয়েছে অভিমত দেয়ার। তিনি এও বলেছেন, ফতোয়ার বিরু দ্ধে এই ধরনের রায় দেয়ার অধিকার আদালতের নেই। ফতোয়া নিষিদ্ধ করা হলে, দেশে যৌতুকপ্রথা বেড়ে যাবে। যৌন হয়রানি ও নারী-নির্যাতন বেড়ে যাবে। দেশের পরিস্থিতি ভয়ংকর আকার ধারণ করবে। (ইনকিলাব: ২৬ এপ্রিল ২০১১)

বিজ্ঞ আইনজীবি এবি এম নূরু ল ইসলাম বলেছেন-‘ফতোয়া দেয়ার অধিকার মুফতিদের রয়েছে। সেটা হতে হবে কুরআন ও হাদিসের আলোকে।’ (কালের কন্ঠ:২৮.৪.২০১১)

দেশের বিজ্ঞ আলেমগণ সভা, সেমিনার, মতবিনিময় সভা এবং লেখালেখির মাধ্যমে বার বার একথাই খোলাসা করে বলেছেন-ফতোয়া হলো আমাদের পবিত্র ধর্মের বিধান। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র-সকল ক্ষেত্রে আমাদের ধর্ম আমাদের যে অকাট্য কল্যাণবিধান দান করেছে তাই ফতোয়া। যে কোনো মুসলমান তার প্রয়োজনে বিজ্ঞ আলেমের কাছে এই বিধান জানতে চাইতে পারে এবং জিজ্ঞাসিত আলেমও তাকে সঠিক উত্তর বলে দিতে পারেন বরং ধর্মের আইনে বলে দেয়া তার অধিকার ও কর্তব্য। ধর্মের এ বিধান বর্ণনাটাই ফতোয়া দান। পৃথিবীর কোনো সুস্থ মানুষ এটাকে অবৈধ বলতে পারে না। পৃথিবীর কোনো স্স্থু মানুষ যেটা পারে না- সেটাই পেরেছেন বিচারপতি গোলাম রববানী এবং বিচারপতি নাজমুন্নাহার।

তিন.

বিশ্বাস করি গোলাম রব্বানীর বিকৃত কলঙ্কময় রায় শুনে যারা উল্লাস করেছিল, সুপ্রিমকোর্টের এই সাহসী রায় দীর্ঘ দিন তাদের স্মৃতিতে ‘উড়াল পাদুকা’ হয়ে ঘরে ফিরবে। সেই সাথে এও বলবো- রায়ে বলা হয়েছেÑ‘ধর্মীয় বিষয়ে ফতোয়া দেয়া যেতে পারে।’ তবে যথাযথ শিক্ষিত ব্যাক্তিরাই ফতোয়া দিতে পারবে।’এখানে সবচেয়ে’ গুরু ত্বপূর্ণ যে কথাটি থেকে যাুে ছ, তা হলো অফতোয়াকে ফতোয়া বলে যারা চালিয়ে দিয়ে যারা বারবার জল গোলা করে এসেছে তাদের কি ক্ষতি হবে! আমরা মনে করি ফতোয়া যদি সাংবিধানিক অধিকার হয়, তাহলে রাষ্ট্রীয় বিচারে এর মূল্য অসামান্য। এই সাংবিধানিক অধিকারের মর্যাদা রক্ষার কোনো ব্যবস্থা আদালত দেননি। ফলে বিতর্কের চোরাপথ খোলাই থেকে যাুে ছ। একটা নগদ উপমা দিই।

হালে এদেশের নতুন ধারার একটি দৈনিক ‘ফতোয়া বিষয়ক একটি রিপোর্ট করেছে। মন্তব্যের আগে পুরো রিপোর্টটি তুলে ধরছি!

ফতোয়ার আরেক শিকার

অসামাজিক কাজে জড়িত থাকার মিথ্যা অপবাদে এবার বগুড়ার আদমদিঘীতে ফাতোয়া দিয়ে এক গৃহবধুর মাথা ন্যাড়া করেছে গ্রাম্য মাতব্বররা। শুধু তাই নয়। তারা লাভলী বেগম নামে ওই গৃহবধু এবং তার পরিবারের সদস্যদের দু’দিন বাড়িতে আটকে রাখে। দুদিন পর রোববার রাতে লাভলী ও পরিবারের সদস্যরা দুপচাঁচিয়ায় এক আত্মীয়ের বাড়িতে পালিয়ে যান। পরে একটি বেসরকারি সংস্থা পরিচালিত হিউম্যান রাইটস এ্যান্ড লিগ্যাল এইড সার্ভিস কর্মীদের সহায়তায় লাভলী আদমদিঘি থানায় মামলা করে। আদমদিঘি উপজেলার বিনাহালী গ্রামের আবু তালেবের মেয়ে লাভলী বেগম ও তার স্বামী পাশ্ববর্তী অর্জুনগড়ি গ্রামে আব্দুল করিমের ছেলে আব্দুল কাদিরে প্রায় ৫ বছর আগে ছেলেমেয়েদের নিয়ে কাজের সন্ধানে ঢাকায় যান। সেখানে তারা গার্মেন্টে কাজ শুরু করেন। দু’মাস আগে স্ত্রী-সন্তানকে রেখে কাদের এলাকায় ফিরে আসেনÑ এলাকায় ফিরে তিনি স্ত্রীর বিরু দ্ধে অসামাজিক কাজে জড়িত থাকার অপবাদ দিয়ে প্রচারণা শুরু করেন।

লাভলী বেগম অভিযোগ করেন, ঢাকাতে গিয়ে কাদের মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে। কাজ ছেড়ে দিয়ে লাভলীর আয়ের টাকায় নেশা করতো সে। একপর্যায়ে লাভলী টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাদের মধ্যে দন্ধ দেখা দেয়। স্ত্রীর কাছে টাকা না পেয়ে কাদের বিভিন্ন স্থানে ধার-দেনা করে করে দু’মাস আগে পালিয়ের যায়। গত শুক্রবার লাভলী ঢাকা থেকে বিনাহালী গ্রামে বাবার বাড়ি বেড়াতে এলে কাদের হঠাৎ করেই গ্রামে সালিশ ডাকে। শালিশ চলাকালে গ্রামের মাতব্বর সাদেক হোসেন বাবুসহ বেশ কয়েকজন তার মাথা ন্যাড়া করার ফতোয়া দেন। কাঁচি দিয়ে তার চুল কেটে পরে ব্লেড দিয়ে মাথা ন্যাড়া করা হয়। মাতব্বর উজ্জ্বল, মোজাফফর, শফিকুল ও তার স্বামী আব্দুল কাদের এ কাজে সহযোগিতা করেন। এরপর তাদের বাড়ি থেকে বের হওয়ার ওপর মাতবররা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। রোববার পর্যন্ত তারা বাড়িতে একপ্রকার বন্দিই ছিলেন। তবে ওইদিন রাতে সকলের অগোচরে তারা তার পাশ্ববর্তী দুপাচঁচিয়া উপজেলায় এক আত্মীয়ের বাড়িতে গিয়ে আশ্রয় নেন। গতকাল হিউম্যানরাইটস আ্যান্ড লিগ্যল এইড সার্ভিস কর্মীদের সহযোগিতায় লাভলী আদমদিঘি থানায় স্বামী আব্দুর কাদের ছাড়াও গ্রামের চার মাতব্বরের বিরু দ্ধে নারী-শিশু নির্যাতন ও শ্লীলতাহানির অভিযোগে মাললা দায়ের করেন।

আদমদিঘি থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মোতালেব হোসেন মামলার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, মামলার পর থেকেই আসামিদের ধরতে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। (আমাদের সময় : ১০ মে ১১)

প্রশ্ন হলো, এই রিপোর্টে উল্লিখিত ঘটনাটির কোথাও কি ইসলামের পবিত্র ফতোয়ার সামান্য ছোঁয়া আছে? কিংবা কোনো আলেম মুফতি বা ইমামের নাম? তাহলে গ্রাম মাতব্বরদের এই অবাধ মাস্তানিকে ফতোয়া বলা হুে ছ কেন? উত্তর মহল! যৌনবাদী বুদ্ধিজীবিদের ফতোয়াবিরোধী ক্ষেত্র তৈরি করাই এর লক্ষ্য! তারপর মানিক বুদ্ধিজীবীরা কি বলবেন- ভাবতে অবাক লাগে, আমাদের বিশেষজ্ঞ আইনজীবীরা কি সংবাদপত্র পড়েন না? হয়তো তাদের কর্মব্যস্ততা সেক্ষেত্রে বড় বাধা, তবু তাদের পেশার কারণেই বোধ হয় কাগজ- পড়াটা জরু রি। তাহলে দেখতে পেতেন ফতোয়াবাজী কতো নারীর সর্বনাশ করেছে, জীবন নিয়েছে। (কালের কণ্ঠ ১২ মে,১১)

কথাগুলে, বলেছেন- কবি ভাষাসংগ্রামী ও গবেষক আহমদ রফিকÑ তার সাদা কালো কলামে! বলেছেন ব্যরিস্টার রফিকুল হক সাহেবদের ফতোয়ার পক্ষে রায় দানের প্রতিবাদে! কথার পিঠে কি আমরাও বলতে পারি না? গবেষণা ও লেখালেখির দেশাজগত প্রয়োজনেই কি ফতোয়া বিষয়ে ভিন্নমত দেয়ার আগে অন্তত ফতোয়ার পরিচয়টা জানা জরু রি ছিল না? তবে কাজের কথা হলো, ফতোয়ার পক্ষে যারা বিলাপ করেছেন তাদের পথ আরো বাকি! যৌনবাদী আঁধারমিত্র কবি সাংবাদিক বুদ্ধিজীবী ও তরু ণীপ্রিয় অধ্যাপকদের হাত থেকে ফতোয়াকে বাঁচাতেই হবে। এর জন্যে সুস্পষ্ট আইন, অফতোয়াকে ফতোয়া বলে যারা মানবাধিকারের পথে কাঁটা ছড়ায় তাদের আইনের সামনে দাঁড় করতে হবে। লাখ লাখ শহীদের রক্তে কেনা স্বাধীন রাষ্ট্রের সবুজ জমিনে দেশের ঈমানদার নাগরিকগণ নির্বিঘেœ ধর্ম পালন করতে পারবে না; বিলুপ্তপ্রায় ডাইনোসর প্রজাতির কালো বুদ্ধিজীবীরা আমাদের ধর্মের পাক বদনে যখন তখন চিমটি কাটবেÑআর আমরা নীরবে তামাশা দেখব? এটা ভারত নয়Ñ বাংলাদেশ।

নিজেদের জন্যে বলি, চোর পুলিশের আগমনকে স্বাগত জানাবে না এটাই স্বাভাবিক। গেরস্থ জেগে গেলে চোর আবোল তাবোল বকবেই। জালেম অবিচারী অত্যাচারী শোষক আইয়ুব খানের জন্য মওলানা ভাসানীর ‘খামোশ’ যেমন, সকল অনিষ্টের সওদাগর আমাদের কথিত আধুনিক সংস্কৃতিজীবী কটি সাংবাদিক অধ্যাপকের জন্য ‘ফতোয়া’ কথাটিও তেমন। তাছাড়া ফতোয়া তো অপরাধির চোখে চোখ রেখে তর্জনি ওঠিয়ে মওলানা ভাসানীর ‘খামোশ’ ছাড়া আর কিছু না। তাই শোষক পাকিস্তানীদের মতো সব অপরাধই ভয় পায় এই ফতোয়াকে।

ঢাকা. ২৪.২৫.১১

Share

তাকদীর ও তার ভাল মন্দ

শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক

জাগতিক কার্যক্রম ও ঘটনা-প্রবাহ সাধারণত : দুই প্রকার।
১। যা মানুষের কোনো হস্তক্ষেপ বা ইচ্ছা-অনিচ্ছা ব্যতিরেকে স্বভাবতই অনিুষ্ঠিত হয়ে থাকে যাকে প্রাকৃতিক ঘটনা বলা হয়। ২। যা মানুষের দ্বারা এবং তারই অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মাধ্যমে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে যাকে মানবিক কার্য্যক্রম বা মানুষের দ্বারা সম্পাদিত কাজ বলে গণ্য করা হয়। কিন্তু প্রকৃত প্রস্তাবে উক্ত উভয় প্রকারের সমস্ত বিষয় ও ঘটনাসমূহ যতো বড়, যতো ছোটই হোক না কেন, প্রতিটি কাজ ও ঘটনার মধ্যেই সর্বশক্তিমান আল্লাহর একচ্ছত্র কর্তৃত্ব রয়েছে। তদুপরি আল্লাহ যেহেতু সর্বজ্ঞ, আলেমুল গায়েব; তাই অনন্তকালব্যাপি যে কোনো প্রকার যা কিছু ঘটবে বা যা দ্বারা যা কিছু অনুষ্ঠিত হবে, অনাদিকাল থেকেই আল্লাহ তা’য়ালা সেসব জানেন। এমনকি আল্লাহর সেই অভ্রান্তজ্ঞান অনুযায়ী সুনির্দিষ্ট টাইম-টেবিলের পূর্ণ তালিকা তিনি প্রস্তুত রেখেছেন।

যেহেতু আল্লাহর ইলম বা জ্ঞান কখনও ভ্রমাত্মক বা অপ্রকৃত, অবাস্তব হতে পারে না, সুতরাং সে তালিকার বিন্দুমাত্র ব্যতিক্রম হওয়া সম্ভব নয়। উপরোল্লিখিত বিষয়ের সমষ্টির নামই হলো ‘তাকদীর’ বা অদৃষ্ট-নিয়তি।

এ বর্ণনায় স্পষ্টত দেখা যায় যে তাকদীর বলতে যা কিছু বুঝায় তা বস্তুত আল্লাহ তা’য়ালার দুইটি সিফাত বা গুণেরই বিশেষ অনুচ্ছেদ মাত্র। এর একটি হলো কুদরত অর্থাৎ আল্লাহ তা’য়ালার সর্বশক্তিমান হওয়া। আর দ্বিতীয়টি হলো ইলম অর্থাৎ আল্লাহর অনাদিকাল থেকেই সর্বজ্ঞ ও সর্বজ্ঞানী হওয়া।

জাগতিক ঘটনাপ্রবাহের প্রথম প্রকারের ঘটনাসমূহ সম্বন্ধে তাকদীরের বিষয়ে বিশেষ কোন দ্বিধা বা সংশয়ের উদয় ছিলো না। এমনকি এ প্রকারের কোনো ঘটনা কোনোভাবে বাহ্যিক কারণ ও হেতুর আবরণে পরিবেষ্টিত থাকলেও, যেহেতু কার্য কারণ পরম্পরায় শেষ পর্যন্ত ঐ কারণের কারণ তথা মূল কারণ হাতড়িয়ে পাওয়া যায় না কিংবা নিজেদের সীমাবদ্ধ জ্ঞানের দ্বারা তার রহস্যজাল ভেদ করতে অসমর্থ হয়। তাই বাধ্য হয়ে সেখানে তাকদীরকে স্বীকার করে নেয়া হয় এবং নিজেদের পরিভাষায় তাকে প্রাকৃতিক বলে অভিহিত করা হয়।

আর দ্বিতীয় প্রকার অর্থাৎ মানুষের দ্বারা অনুষ্ঠিত কার্যক্রম সম্বন্ধে তাকদীরের বিষয়ে নানা প্রকার সংশয়ের উদয় হয়ে থাকে। তাই এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে আল্লাহ তা’য়ালা মানুষকে সম্পূর্ণ অক্ষম নির্জিব জড় পদার্থরূপে সৃষ্টি করেন নি। কিংবা স্বয়ং সম্পূর্ণ, সক্ষম, সর্বশক্তিমান করেও সৃষ্টি করেন নি। বরং আল্লাহ মানুষকে নেহায়াত স্বাভাবিক, সীমাবদ্ধ ও পরিমিত জ্ঞান ও বিভিন্ন শক্তি দান করে সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু তা হলেও ঐ সব প্রদত্ত শক্তিসমূহকে আল্লাহ তা’য়ালা একান্তই স্বীয় কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রাণাধীনে রেখেছেন। অবশ্য তার কর্তৃত্বের বিধানে এটাও বিধিবদ্ধ করে রেখেছেন যে, মানুষ তার শক্তিসমূহ কোনো ভালো বা মন্দ পথে পরিচালিত করলে তা আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনোরূপ প্রত্যক্ষ বাধা সৃষ্টি করার কোনো বাধ্যবাধকতা মোটেই থাকবে না; অন্যথায় কর্ম জগতের মূল রহস্য ‘পরীক্ষা’ অনুষ্ঠিত হতে পারে না।

মানবকে উল্লেখিত শ্রেণীর শক্তিতে শক্তিমান করে, ভালোমন্দ চেনার জন্য শরীয়তকে মাপকাঠি হিসেবে প্রদান করে আল্লাহ তা’য়ালা মানবকে কর্মক্ষেত্রে পাঠিয়েছেন পরীক্ষার দ্বারা প্রকাশ করে দেয়ার জন্য যে সে কোন পথ অবলম্বন করে।’ চিন্তা করে দেখুন মানুষ নিশ্চিতরূপে স্বীয় কর্মফল ভোগ করবে না কেন? নিশ্চয় ভোগ করবে। কারণ, আল্লাহ তা’য়ালা মানবকে যে ইচ্ছাশক্তি ও কর্মক্ষমতাটুকু দান করেছেন যদ্বারা মানব জাতি অপরাপর অক্ষম নির্জীব জড়পদার্থ থেকে সম্পূর্ণ পৃথক ও ভিন্ন পরিগণিত হয়; সে শক্তি ও ক্ষমতাকে সৎ বা অসৎ বা ভালোমন্দ উভয় পথে পরিচালিত করার স্বায়ত্বশাসিত ক্ষমতা আল্লাহ তা’য়ালা মানবকে দিয়ে দিয়েছেন। অবশ্য সেই ক্ষমতা আল্লাহর মহাক্ষমতার অধীনেই বটে। কিন্তু এই বিধানও জানিয়ে দিয়েছেন যে, মানবকে তার ক্ষমতা চালনায় বাধা দেয়ার ধরা বাধা নিয়ম রাখা হয়নি। যেমন পরীক্ষার্থী ভুল অঙ্ক লিখতে থাকে, পরীক্ষক মাস্টার ভুল লেখতে দেখে এবং বাধা দেয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও বাধা দেন না। এতদসত্ত্বেও ভুলের জন্য ছাত্র অবশ্যই দায়ী হয়; তার নম্বর কাটা যায়, সে ফেল করে। তদ্রুপ আমাদের এ আলোচনার ক্ষেত্রেও নিজ ক্ষমতায় মন্দ পথে পরিচালনার জন্য মানবই দায়ী। এমতবস্থায় তকদীরের ওপর বিশ্বাস স্থাপনে কর্মক্ষেত্রে কোনো বাধার সৃষ্টি হতে পারে কি?

তাকদীর বলতে আল্লাহর যে অসীম কর্তৃত্ব, প্রাধান্য ও শক্তিমত্তা বুঝায়, তার ওপর বিশ্বাস স্থাপনের দ্বারা বহু সুফল প্রতিফলিত হতে পারে।

এক. কর্মক্ষেত্রে মানুষ নিজকে বাহ্যত যৎকিঞ্চিত ক্ষমতাবান দেখতে পেলেও সে নিজেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ তথা অবিমিশ্র শক্তির অধিকারী বলে ধারণা করবে না। যেমনভাবে ফেরাউনপ্রকৃতির ব্যক্তিগণ নিজেদের সম্পর্কে সে প্রকার ধারণা পোষণ করতো, যা বাস্তবায়িত করতে গিয়ে বহু অশান্তির সৃষ্টি করে থাকে।

দুই. আল্লাহ তা’য়ালা যে মহান ও সর্বশক্তিমান তা সর্বদা মনে জাগ্রত থাকবে এবং নিজকে সর্বদাই তার মুখাপেক্ষী, সাহায্যপ্রার্থী ও দয়ার ভিখারী হিসেবে গণ্য করে জীবনের সকল কার্য পরিচালিত করবে।

তিন. কোনো কাজে শত চেষ্টার পরও অকৃতকার্য বা বিফল হলে তাতে ব্যর্থ মনোরথ হয়ে একেবারে মন ভেঙ্গে ধৈর্যহারা হয়ে পড়বে না, বরং স্বীয় মনকে এ বলে প্রবোধ দান করবে যে, সর্বশক্তিমান আল্লাহ তা’য়ালার তরফ থেকে এমনটি হয়েছে এবং নিশ্চিত এর অন্তরালে হয়তো আল্লাহ তা’য়ালার এমন কোনো সুফলপ্রসূ ইঙ্গিত অথবা মঙ্গলসূচক ইচ্ছা নিহিত রয়েছে যার দ্বারা এটা আমার জন্য তার অভিপ্রেত ছিলো তাই এতে আমাদের কিছুই করার নেই; আমরা তো তার গোলাম মাত্র। অতএব মনিবের যা ইচ্ছা গোলামের প্রতি করতে পারেন। মনের মধ্যে এই প্রকার ভাবজাগ্রত করার ধৈর্য ধারণপূর্বক উৎসাহ ও উদ্দীপনাকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে পারে।

চার. কোনো বিষয়ে বাহ্যত স্বীয় চেষ্টা ও শক্তির দ্বারা কর্তৃকার্য ও সফলকাম হলেও তজ্জন্য সে ব্যক্তি ফেরাউন প্রকৃতির হবে না, বরং মনে মনে আল্লাহর নিকট কৃতজ্ঞ ও শোকরগোজার হবে এই ভেবে যে, আল্লাহ তা’য়ালা তার অপার করুণাবলে আমাকে এ সাফল্য লাভের তৌফিক ও সুযোগ দান করেছেন; ফলে তার স্বভাবে নম্রতা আসবে; উগ্রতা ও ঔদ্ধত্য সৃষ্টি হবে না, আল্লাহর বান্দাদের প্রতি সে বিনয়ী ও সদয় হবে।

এ সবই হচ্ছে তাকদীরের ওপর বিশ্বাস স্থাপনের অনিবার্য ও বাস্তব প্রতিক্রিয়ার সুফল। এর পরিবর্তে কেউ যদি তাকদীরের নামে স্বীয় কর্মজীবনে দুর্বলতা টেনে আনে, অর্থাৎ অকর্মণ্য, নিরুৎসাহ ও উদ্যমহীন হয়ে পড়ে তবে তা ঐ ব্যক্তির নিজের ত্র“টি ও শয়তানের ধোকা ব্যতীত আর কি হতে পারে?

তাকদীরের যে সংজ্ঞা ও তাৎপর্য বর্ণিত এবং তাকদীরের ওপর ঈমান স্থাপনের যে ফলাফল ব্যক্ত হলোএ সব তথ্যের প্রতি পবিত্র কুরআনেই ইঙ্গিত রয়েছে। আল্লাহ বলেন ভূপৃষ্ঠে যে কোনো বিপদ-আপদ, দুর্যোগ-দুর্ভোগের আগমন হয় এবং তার যে কোনটা কারো ওপর আসে তার প্রতিটিই কিতাবে তথা লৌহে মাহফুজে লিখিত আছে উক্ত বিপদ ও দুর্যোগকে আমি সৃষ্টি করার পূর্বেই ( বরং ঐ মানুষটিকে সৃষ্টি করার পূর্বেই। তদ্রুপই জগতে যখন যখন যে সুযোগ-সুদিন, সুখ-সমৃদ্ধির সঞ্চার হয় এবং তা যে কারো জীবনে সমাগত হয় তাও কিতাবে লিখিত আছে তাকে সৃষ্টি করার পূর্বে। এমনিভাবে লিখে রাখা (আমি) আল্লাহর পক্ষে নিতান্তই সহজ ব্যাপার। এই তথ্যটা তোমাদেরকে অবগত করা হলো শুধু এ উদ্দেশ্যে যে, তোমরা কেউ কোনো মনোবাঞ্ছনা থেকে বঞ্চিত বা তা লাভে ব্যর্থ হলে কিংবা কোনো ধন-জনহারা হলে সে যেনো ক্ষোভ-বিহ্বল বা শোকাহত হয়ে না পড়ে। ধৈর্যধারণ করে মনোবল অক্ষুন্ন রাখে) এবং কেউ আল্লাহর তরফ থেকে ভালো অবস্থা প্রাপ্ত হলে সে যেনো ঔদ্ধত্যে, দম্ভে ও খুশিতে উন্মাদ না হয়; (শুকরগোজার-আল্লাহর নিকট কৃতজ্ঞ ও বান্দাদের প্রতি বিনয়ী হয়। কোনো অহঙ্কারী দাম্ভিককে আল্লাহ মোটেই পছন্দ করেন না। সূরা-

তাকদীরের ওপর ঈমান ও দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করা যে অপরিহার্য তা মুসলিম শরীফের একটি হাদিস দ্বারা বিশেষভাবে প্রমাণিত। হাদিসটি হচ্ছে

এক ব্যক্তি আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রা. কে বললেন, আমাদের দেশে নতুন মতবাদের একদল লোক আবির্ভূত হয়েছে। তারা একদিকে বেশ কুরআন শরীফ পাঠ করে থাকে এবং জ্ঞান-চর্চা তথা ধর্মীয় গবেষণাদিও করে থাকে, কিন্তু অন্যদিকে তারা তাকদীরের প্রতি বিশ্বাসী নয়; বরং তারা তাকদীরকে অস্বীকার করে থাকে। এতদশ্রবণে আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রা. বললেন, তাদেরকে বলে দাও যে, আমাদের তথা খাঁটি মুসলিমগণের সঙ্গে তাদের কোনো সংশ্রব নেই; তারা মুসলিম জাতি থেকে বিচ্ছিন্ন। আমি মহান আল্লাহর শপথ করে বলছি, তারা যতো প্রকার ও যতো বড় নেক আমলই করুক না কেন, এমনকি পাহাড় সমতুল্য স্বর্ণও যদি তারা আল্লাহর রাস্তায় দান-খয়রাত করে, তথাপি তা আল্লাহর দরবারে কবুল হবে না; তারা তার কোনো সওয়াবও পাবে না। যতোক্ষণ না তারা উক্ত ইসলামবিরোধী ধারণা ও মতবাদ পরিত্যাগ করে তাকদীরের ওপর পূর্ণ বিশ্বাস ও ঈমান স্থাপন না করে।

সুপ্রিয় পাঠক! এখানে তাকদীরের যে ব্যাখ্যা ও তত্ত্ব প্রকাশ করা হয়েছে সে অনুযায়ী সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে ওমরের এই উক্তি অত্যন্ত সঙ্গত। তাকদীরকে অস্বীকার করা প্রকারান্তরে আল্লাহ তা’য়ালার দুটি বিশেষ সিফাত ও গুণকে অস্বীকার করা। কারণ, পূর্বেই বলা হয়েছে, তাকদীর বলতে যা কিছু বুঝায় বস্তুত তা আল্লাহ তা’য়ালার দুটি সিফাত বা গুণেরই অনুচ্ছেদ মাত্র। বলাবাহুল্য যে কোনো ক্ষেত্রে আল্লাহ তায়ালার কোনও একটি সিফাত বা গুণকে অস্বীকার করলে ঈমান ও ইসলাম বহাল থাকতে পারে না।

Share

নারী উন্নয়ন নীতিমালা বিভ্রান্তির নিরসন ও সরকারের করণীয়

মাওলানা আবুল ফাতাহ মুহাম্মদ ইয়াহইয়া

ইসলামই নারী উন্নয়ন ও নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রথম প্রবক্তা। কখনই এর বিপক্ষে নয়। নারী নির্যাতনের এক চরম সন্ধিক্ষনে দাঁড়িয়ে সারা বিশ্বের নির্যাতিত ও নিগৃহীত নারীর পক্ষে ইসলামই সর্বাগ্রে আওয়াজ বুলন্দ করেছে। জীবন্ত প্রোথিত হওয়ার আবহ থেকে, পন্য হিসাবে বাজারে বিক্রি হওয়ার পরিবেশ থেকে উঠিয়ে এনে নারীকে সম্মানের রাজাসনে ইসলামই সর্বপ্রথম অধিষ্ঠিত করেছে। সামাজিক সমূহনিগ্রহের অক্টোপাস থেকে মুক্ত করে নারীকে স্বাধীন জীবন উপভোগ করার সুযোগ করে দিয়েছে। নারীর মর্যাদাকে করেছে সমুন্নত। মাতৃত্বের গৌরবে বিভূষিত নারীদেহ যাতে যার তার লালসা ও লোলুপ দৃষ্টির শিকার না হয় সেজন্য পর্দার বিধান দিয়ে মানব-রূপী পশুদের দৃষ্টি সীমার অন্তরালে নিয়ে নারীকে করেছে দুর্লভ, মহামূল্যবান ও মহাসম্মানী। বিয়েতে মোহরের প্রথার প্রবর্তন করে নারীল মূল্য যে পুরুষের তুলনায় বেশি সে বিষয়টি পরিস্কার করে দিয়েছে। পারিবারিক অর্থযোগানের দায়-দায়িত্ব ও কায়িক কষ্টকর শ্রমের বোঝা নারীর উপর অর্পন না করে পুরুষের কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর নারীকে আগামী পৃথিবীর জন্য যোগ্য, আদর্শবান, সৎপরায়ন, ন্যায়নিষ্ঠ ও মমত্ববোধ সম্পন্ন নতুন প্রজন্ম গড়ে তোলার সর্বশ্রেষ্ঠ দায়িত্ব অর্পন করে তাকে মর্যাদার শীর্ষ বিন্দুতে পৌঁছিয়ে দিয়েছে। কোনরূপ আর্থিক ব্যয়ের দায়িত্ব নারীর উপর অর্পন না করেও পৈত্রিক উত্তরাধিকারে তাকে পুরুষের অর্ধেক প্রদান করে তার জীবনের অর্থনৈতিক ভিত্কে করা হয়েছে সুদৃঢ়। যাতে দুর্যোগের মোকাবেলা সে সহজেই করতে পারে। যৌথ জীবনে পুরুষকে তার অভিভাবক সাব্যস্ত করে সমস্ত জটিলতা ও দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত রেখে নারীকে দান করেছে উদ্বেগহীন এক আনন্দময় জীবন। বলতে গেলে ইসলাম নারীকে যে সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত করেছে তার চেয়ে বেশি সম্মান দেওয়া আদৌ সম্ভব নয়। পৃথিবীতে কেউ দেয়নি কোন কালে দিতে পারবেনা ।

বস্তুতঃ নারী-পুরুষের স্বভাব ও মেজাজ বিবেচনা করে ইসলাম কোনক্ষেত্রে নারীকে দায়িত্ব দিয়েছে কম পুরুষকে দিয়েছে বেশি। আর কোন ক্ষেত্রে পুরুষকে দায়িত্ব দিয়েছে কম নারীকে দিয়েছে বেশি। আবার-অধিকারের প্রশ্নেও কোন কোন ক্ষেত্রে পুরুষকে দেওয়া হয়েছে বেশি আর নারীকে দেওয়া হয়েছে কম বা নারীকে দেওয়া হয়েছে বেশি কিন্তু পুরুষকে দেওয়া হয়েছে কম। তবে এ ধরনের ক্ষেত্র খুব একটা বেশি নয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ইসলাম উভয়ের দায়িত্ব ও অধিকারে সাম্য বিধান করেছে । যেসব ক্ষেত্রে কাউকে বেশি ও কাউকে কম দেওয়া হয়েছে তার যুক্তিসঙ্গত কারন ব্যাখ্যা করে দিয়েছে ইসলাম। সামাজিক ভারসাম্য ও পারিবারিক বন্ধন অটুট রাখার জন্যই যে এরূপ করা হয়েছে তা বলা বাহুল্য। ইসলামের এই ভারসাম্য পূর্ণ নীতি অনুসরন করে দেড় হাজার বছর যাবত মুসলিম সমাজ নির্বিঘেœ পরম শান্তি ও শৃংখলার সাথে অতিবাহিত করে আসছে তাদের জীবন। কিন্তু পাশ্চাত্য নারী ইসলাম প্রদত্ত অধিকার থেকে বঞ্চিত থাকার কারণে ছিল চরম নিগ্রহের শিকার। সেই নিগৃহের যাতাকলে পিষ্ট হতে হতে একদিন তথাকার নারীরা বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। তারা তাদের অধিকারের দাবী নিয়ে রাজপথে অবর্তীন হয়। সেই আন্দোলন জোরদার হয়ে একদিন তা সমঅধিকারের দাবীতে পরিনত হয়। বস্তুত সেই প্রেক্ষাপটেই গৃহীত হয় “কনভেনশন অন দা এলিমিনেশন অব অলফর্ম অব ডিসক্রিমিনেশন এগেইনস্ট উইমেন্স” সংক্ষেপে (সিডও)। জাতিসংঘ এ সিডও সনদ জারি করতে চাইলে বিশ্বের অনেক দেশই তা মেনে নেয়নি। কেননা সেই সনদে নারীকে যেভাবে চিত্রায়ন করা হয়েছে তা স্থানীয় সংস্কৃতির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ করে বাস্তবায়ন করা সম্ভব ছিল না। অনেক মুসলিম দেশও তা মেনে নেয়নি। কেননা তার বহু ধারা ইসলামের সাথে ছিল সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। কেননা সিডও সনদের মূল বক্তব্য ছিল রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক সব ক্ষেত্রেই নারী ও পুরুষকে সমান করে ফেলা। আর এ লক্ষ্য বাস্তবায়নের দায়িত্ব রাষ্ট্র সমূহের ওপর অর্পণ করা হয়েছে। রাষ্ট্র এ দায়িত্ব বাস্তবায়নকল্পে পূর্বেকার আইনকানুন, ধর্মীয় বিধি-বিধান সংস্কার ও সংস্কৃতি সবকিছুকে পরিবর্তন করে নতুন করে আইনকানুন ও বিধি-বিধান তৈরী করবে। আসলে জাতিসংঘের মাধ্যমে এই নীতি সেই নীতি জারীর নামে ইসলামি সভ্যতার মূলোৎপাটনই পশ্চিমা দুনিয়ার উদ্দেশ্য। এক এক নীতির নামে তারা কিছু কিছু ইসলামি বিধানের মূলোৎপাটনের পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হয়। এভাবে এই নীতি সেই নীতি গেলানোর কৌশল করে। তারা ইসলামি সভ্যতার জড় কর্তনের কাজ এমন ভাবে করে যাচ্ছে তাতে একদিন ইসলামি সভ্যতা ও সংস্কৃতি, বিধান ও আইন কানুনের কিছুই পৃথিবীতে অবশিষ্ট না থাকে। মুসলিম সভ্যতা পৃথিবী থেকে চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে যায়। নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় মুসলিম জাতি। মুসলিম রাষ্ট্রের অপরিনামদর্শী শাসকরা তাদের প্রচারনায় বিভ্রান্ত হয়ে এবং আন্তর্জাতিক সাহায্য সুবিধার প্রলোভনে পড়ে সেসব উন্নয়ন ফর্মূলা নির্বিবাদে গলধ: করন করে থাকে। হায়রে দুর্ভাগা মুসলিম জাতি।

সিডও সনদও সেই পরিকল্পনারই অংশ। নারী উন্নয়নের শ্লোগানের মাঝ দিয়ে নারীর জন্য ইসলাম প্রদত্ত স্ট্রাকচারকে এতে সম্পূর্ন পাল্টিয়ে ফেলার কৌশল করা হয়েছে। এক্ষেত্রে ইসলামের প্রচলিত বিধি-বিধানকে পরিবর্তন করে নতুন বিধি-বিধান প্রনয়নের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানদেরকে। এমনকি প্রয়োজনে সংবিধানও পরিবর্তন করে ফেলতে বলা হয়েছে। তাদের উদ্দেশ্য যাই হোক শ্লোগানটি গ্রহন করা হয়েছে বড়ই চিত্তাকর্ষক, মোহনীয়, নারী নির্যাতন রোধ, নারী উন্নয়ন ও সকল ক্ষেত্রে নারীর সমঅধিকার নিশ্চিত করণের নামে এই শ্লোগানে কেবল নারীরা খুশি হবে তাই নয় পুরুষরাও মানবতা বোধের তাড়নায় এই শ্লোগানের সাথে একাত্ম হয়ে যাবে। কিন্তু ইসলাম নির্মূলের কৌশলগুলোর প্রতি সহজে কারো নজর পড়বে না। বিভিন্ন সচেতন মুসলিম দেশ সিডও সনদের কিছু কিছু ধারার ব্যাপারে গুরুতর আপত্তি জানিয়েছে, যেমন- তুরস্ক, মালয়েশিয়া, আলজেরিয়া, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, মরক্কো, মিশর, লিবিয়া, লেবানন। বাংলাদেশও প্রথমে ২.১৩,১৬ ধারায় আপত্তি জানিয়েছিল। কিন্তু বর্তমান সরকার সেসব আপত্তি প্রত্যাহার করে নিয়ে সিডও পরিপূর্ণ বাস্তবায়নের পক্ষে স্বাক্ষর করে এসেছে। অনেক অমুসলিম দেশও সিডও সনদ তাদের সামাজিক কোড ও সাংস্কৃতিক ভাবধারার সাথে অসংগতিপূর্ন বলে আপত্তি জানিয়েছে। যেমন- যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, রাশিয়া, সুইজারল্যান্ড, আর্জেন্টিনা, অষ্ট্রেলিয়া, ইসরাইল, লুক্সেমবার্গ, অষ্ট্রিয়া, বেলারুশ, ব্রাজিল, বেলজিয়াম, বুলগেরিয়া, কানাডা, চিন, চিলি, হাংগেরী, ভারত, আয়ারল্যান্ড, ইতালী, মেক্সিকো, মোঙ্গলিয়া, মিয়ানমার, নিউজিল্যান্ড, পোল্যান্ড, কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, স্পেন, থাইল্যান্ড, ভেনিজুয়েলা, ডেনমার্ক, গ্রিস, লাটভিয়া, নরওয়ে, পর্তুগাল, রুমানিয়া, সুইডেন। এসব দেশগুলোর অনেক রাষ্ট্রই আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। যেমন- যুক্তরাজ্য, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড, ইতালি, ফ্রান্স, অষ্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ইত্যাদি। মুসলিম দেশগুলোর পক্ষ থেকে যেসব ধারার উপর আপত্তি জানানো হয়েছে সেগুলো হল- ২, ৩, ৯, ১৩ এবং ১৬নং ধারা। এই ধারা গুলোর বক্তব্য আমরা হুবহু উদ্বৃত করছি।

২নং ধারায় বলা হয়েছে- নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্যের প্রতি নিন্দা জানিয়েছে সনদে স্বাক্ষরকারী দেশগুলো। নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য দূর করতে তারা নিজ নিজ দেশে প্রয়োজনীয় আইন তৈরীর ঘোষনা দিচ্ছে। সংবিধানে সমঅধিকারের ঘোষনা না থাকলে সমঅধিকারের নিশ্চয়তা দিয়ে সংবিধান নতুন করে প্রণয়ন করবে। নারীর প্রতি বৈষম্য মূলক সব আইন কানুন ও বিধি-বিধান বিলোপ করবে।

৩নং ধারায় বলা হয়েছে- রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সব ক্ষেত্রেই পুরুষের পাশাপাশি নারীর সমান অধিকার নিশ্চিত করবে রাষ্ট্র।

১৩নং ধারায় বলা হয়েছে- অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনের সবক্ষেত্রে নারীর প্রতি সব বৈষম্য দূর করে সমতার ভিত্তিতে নারী ও পুরুষের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠায় রাষ্ট্র পদক্ষেপ গ্রহন করবে। এ অধিকারের মাঝে পারিবারিক সুযোগ সুবিধা ও ব্যাংক লোনও অর্ন্তভুক্ত রয়েছে।

১৬নং ধারায় বলা হয়েছে- বিয়ে এবং পারিবারিক সম্পর্কসহ সব বিষয়ে নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য দূর করতে রাষ্ট্র পদক্ষেপ নেবে এবং এসব ক্ষেত্রে নারী পুরুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করবে।

১৬.ক – বিবাহিত জীবনে প্রবেশের ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের সমান অধিকার থাকবে।

১৬. খ- বিয়ে এবং তালাকের ক্ষেত্রে নারী পুরুষের সমান অধিকার ও সমান দায়-দায়িত্ব থাকবে।

১৬.চ- শিশু লালন পালনের ক্ষেত্রে নারী পুরুষের সমান অধিকার ও সমান দায় দায়িত্ব থাকবে।

আলজেরিয়া সিডও সনদের ২,৯,১৫, ১৬, ও ২৯নং ধারার উপর আপত্তি জানিয়ে বলেছে যে, সিডও সনদের এসব ধারার আলজেরিয়ান ন্যাশনাল কোড ও আলজেরিয়ান ফ্যামেলি কোডের সাথে সাংঘর্ষিক। ১৫নং ধারার সমালোচনা করে বলা হয়েছে যে, সবক্ষেত্রে নারী পুরুষের সমান অধিকার প্রদান করা তাদের ফ্যামেলি কোড বিরোধী। তারা এটি মানতে বাধ্য নয়। অন্যান্য মুসলিম দেশও প্রায় একই মর্মে প্রতিবাদ জানিয়েছে। বাংলাদেশও এই ধারাগুলোর ব্যাপারে আপত্তি জানিয়েছিল। এতে পরিস্কার হয়ে যায় যে এই ধারাগুলো যে, ইসলামি আইন ও মুসলিম সংস্কৃতির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয় এই উপলব্ধি বাংলাদেশ সরকারেরও আছে। তার পরও কোন স্বার্থে বর্তমান সরকার আপত্তি প্রত্যাহার করে নিল। ইসলাম প্রিয় ৯০% নাগরিকের আজ সেটিই জিজ্ঞাসা।

বর্তমান সরকার নারী উন্নয়ন নীতিমালার নামে যে খসড়া প্রণয়ন করেছে তা সিডও বাস্তবায়নের অঙ্গিকারেরই একটি কৌশলপত্র। সিডও সনদের ধারা সমূহের হুবহু প্রতিধ্বনি করা হয়েছে নারী উন্নয়ন নীতিমালা-২০১১ এর খসড়ায়। তারপরও প্রধানমন্ত্রীসহ বিভিন্ন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রীরা বলছেন নারী উন্নয়ন নীতিমালায় ইসলাম বিরোধী কোন কিছু নেই। অথচ দেশের বিজ্ঞ আলেম উলামা ও ইসলামী বিশেষজ্ঞরা বলছেন নারী উন্নয়ন নীতিমালা কুরআন সুন্নাহ ও ইসলামী শরীয়তের সাথে সাংঘর্ষিক। তথ্য ভিত্তিক পর্যালোচনার মাধ্যমেই বিতর্কের নিরসন হওয়া উচিৎ।

বর্তমান নারী উন্নয়ন নীতিমালা বিগত ৭ইমার্চ মন্ত্রী সভায় অনুমোদিত হয়। অনুমোদনের পর বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) পরিবেশিত খবরে বলা হয় “ভূমিসহ সম্পদ, সম্পত্তি ও উত্তরাধিকারে নারীর সমান অধিকারের স্বীকৃতি দিয়ে নারী উন্নয়ন নীতি ২০১১ এর খসড়া অনুমোদন করেছে মন্ত্রীসভা। মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী বলেন “জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি ২০১১ অনুমোদন করেছে মন্ত্রীসভা। এটি কার্যকর করার জন্য কোন আইন করা হবে না। নতুন নীতিতে উত্তরাধিকারসহ উপার্জন ও বাজার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অর্জিত সম্পদে নারীকে পূর্ন নিয়ন্ত্রন অধিকার দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে উত্তরাধিকার সম্পদে নারীর সমঅধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। কালের কন্ঠ ৮ই মার্চ ২০১১। বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে যে, ৭ই মার্চ যে খসড়াটি অনুমোদন লাভ করেছিল তার ২৫.২ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছিল যে, “ভূমিসহ সম্পদ সম্পত্তি এবং উত্তরাধিকারে নারীর সমান অধিকার থাকবে”। ৮ই মার্চ এই বক্তব্যটি বিভিন্ন দৈনিকে প্রকাশিতও হয়েছিল। মন্ত্রনালয়ের এক কর্মকর্তার সূত্রে জানাগেছে যে সর্ব মহলের প্রতিবাদের প্রেক্ষিতে ধারাটিতে সামান্য ঘষামাজা করা হয় এবং উত্তরাধিকারে নারীর সমান অধিকার থাকবে এর স্থলে উপার্জন, উত্তরাধিকার, ঋণ, ভূমি ও বাজার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অর্জিত সম্পদের ক্ষেত্রে নারীর পূর্ননিয়ন্ত্রনাধিকার থাকবে- এরূপ উল্লেখ করা হয়। (নয়া দিগন্ত ১১ই মার্চ-২০১১) এতটুকু সংস্কারের পরই সরকারী মহল থেকে জোরে শোরে বলা হতে থাকে যে নারী উন্নয়ন নীতিমালায় ইসলাম বিরোধী কিছু নেই। মন্ত্রী প্রতিমন্ত্রী এমনকি প্রধানমন্ত্রীও বেশ জোরের সাথেই একথা দাবী করে চলেছেন।

এদেশের বিজ্ঞ উলামায়ে কেরাম খসড়া নারী নীতিটি গভীর মনোযোগসহ অধ্যয়ন করেছে এবং ইসলামের সাথে সঙ্গতি অসঙ্গতির বিষয়টি পর্যবেক্ষন করছে। আলেমদের দৃষ্টিতে নারী উন্নয়ন নীতিমালায় ঘষামাঝার পরও থেকে যাওয়া সমস্যাগুলো এবং ইসলামের সাথে তথা কুরআন সুন্নাহর সাথে সাংঘর্ষিক বিষয়গুলো নিুরূপ

১. এই নীতিমালা সিডও সনদ বাস্তবায়নের অঙ্গিকারে কৌশল হিসাবে প্রনয়ন করা হয়েছে। সিডও সনদের ২,৩,৯,১৩,১৬ ধারায় ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিকতা মুসলিম রাষ্ট্রগুলো কর্তৃক স্বীকৃত। যার কথাপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে অথচ নারী নীতিতে সিডও বাস্তবায়নের অঙ্গিকার স্পষ্ট ভাষায় বারবার ব্যক্ত করা হয়েছে। (দ্রষ্টব্য নারী উন্নয়ন নীতিমালা ৪নং ধারার শেষ প্যারা ৪.১, ১৭.২।

২. এই নীতি মালায় সিডও এরই প্রতিধ্বনি করা হয়েছে মাত্র। সিডও সনদে নারীকে উপস্থাপন করা হয়েছে ইউরোপিয় জীবনধারা ও সংস্কৃতির আলোকে। ফলে এই নীতিমালায় মুসলিম নারীর জীবনধারা ও ইসলামী সংস্কৃতির মোটেই প্রতিফলন ঘটেনি। যে কারনে এই নীতিমালা ৯০% মুসলমানের দেশের জীবনাচারের সাথে সঙ্গতি পূর্ণ নয়। আমাদের বিশ্বাস এই নীতিমালার মাধ্যমে মুসলমানদেরকে মুসলিম সংস্কৃতি বর্জন করে ইউরোপিয় সংস্কৃতি অবলম্বনে বাধ্য করার নীরব কৌশল অবলম্বন করা হয়েছে।

৩. ইসলাম নারী উন্নয়ন ও নারী অধিকারের সর্বোচ্চ প্রবক্তা হলেও এবং নারী নির্যাতনের রোধে সর্বাধিক বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করলেও পুরুষপ্রধান সমাজব্যবস্থার সপক্ষে। পরামর্শের সকল পর্যায়ে নারীকে সমঅধিকার প্রদান করলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অধিকার পুরুষকেই প্রদান করা হয়েছে। আল কুরআনে এই মর্মে স্পষ্টতই উল্লেখ আছে যে,

‘নারীদেরও ন্যায়সঙ্গত অধিকার ও দায় দায়িত্ব রয়েছে পুরুষের প্রতি যেমন পুরুষের রয়েছে নারীদের ওপর তবে পুরুষের নারীদের উপর একপর্যায়ের প্রাধান্য রয়েছে। আল্লাহ পরাক্রমশালী ও বিজ্ঞানময়।’ (সূরা-২ বাকারা আয়াত ২২৮)

আরো ইরশাদ হয়েছে -

‘পুরুষগণ নারীদের ওপর কর্তৃত্বশীল হবে। যেহেতু আল্লাহ তাদের কতিপয়কে কতিপয়ের ওপর মর্যাদাবান করেছেন। আর এজন্যও যে পুরুষরা নারীদের জন্য তাদের অর্থ সম্পদ ব্যয় করে।’ (সূরা নিসা, আয়াত ৩৪)

বুখারী ও মুসলিম শরীফের এক হাদীসে রাসূল সা. ইরশাদ করেছেন -

শুন! তোমরা সবাই (কোন না কোন পর্যায়ে) দায়িত্বশীল। তোমাদের প্রত্যেকেই আপন দায়িত্বাধীন বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। ইমাম বা রাষ্ট্রপ্রধান দায়িত্বশীল, সে জিজ্ঞাসিত হবে আপন দায়িত্বাধীন নাগরিকদের ব্যাপারে। পুরুষ আপন স্ত্রী পরিজনের দায়িত্বশীল, সে জিজ্ঞাসিত হবে আপন দায়িত্বাধীনদের ব্যাপারে, রমনী দায়িত্বশীল তার স্বামীর ঘর সংসারের। সে জিজ্ঞাসিত হবে আপন দায়িত্বাধীন বিষয়ে। বুখারী, খন্ড-২, পৃষ্ঠা ১০৫৭ মুসলিম খন্ড-২, পৃঃ ১২২।

এই হাদীস থেকেও পরিস্কার ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে নারীর তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব পুরুষের।

সুতরাং, কর্তৃত্বের প্রশ্নে নারীকে সমানাধিকার প্রদান করা হলে তা হবে সম্পূর্ণ কুরআন সুন্নাহর পরিপন্থী। অথচ নারী উন্নয়ন নীতিমালার বিভিন্ন ধারায় তা সুষ্পষ্টই উল্লেখ করা হয়েছে। দ্রষ্টব্য ১৯.৯, ৩২.৯, ৩৩.৭ নারী উন্নয়ন নীতিমালা-২০১১

৪. নারী উন্নয়ন নীতিমালা যেহেতু ইউরোপিয় নারীর কল্পচিত্রকে সামনে রেখে প্রনীত হয়েছে অতএব নীতিমালাটি প্রনয়নের ক্ষেত্রে ইসলামের অলঙ্ঘনীয় বিধান পর্দার বিষয়টির প্রতি মোটেও লক্ষ্য রাখা হয়নি। ফলে এর অধিকাংশ ধারা পর্দার বিধান লংঘন না করে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না। ফলে উন্নয়ন পরিকল্পনা হিসাবে উপস্থাপিত বিষয়গুলোর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কুরআনের বিরুদ্ধাচরন প্রকাশ পেয়েছে এবং পর্দার বিধান লংঘন হওয়ার কারনে তা কুরআন বিরোধী বলে প্রতিপন্ন হয়েছে।

৫. ইসলাম মূলতঃ নারী পুরুষের পারষ্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে যে সৌহার্দ্যপূর্ণ পারিবারিক জীবন গড়ে তুলতে চেয়েছে নারীনীতি বাস্তবায়ন হলে তা সম্পূর্ণ রূপে ধ্বংস হয়ে যাবে। অধিকারের টানাটানিতে পারিবারিক জীবন এর সংঘাতময় কুরুক্ষেত্রে পরিনত হবে। পারিবারিক সৌহার্দ্য শেষ হয়ে যাবে। যা এখন ইউরোপের সমাজ ব্যবস্থায় নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাড়িয়েছে। সুতরাং এদিক থেকে এই নীতিমালা ইসলামের পারিবারিক নীতির সাথে সাংঘর্ষিক।

৬. ইসলাম পৈত্রিক উত্তরাধিকারে নারীকে পুরুষের তুলনায় অর্ধেক প্রদান করেছে। এই বিধান সূরা নিসার ১১নং আয়াতে সুষ্পষ্টভাবে বিবৃত হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে-

আল্লাহ তোমাদের সন্তানদের (উত্তরাধিকার প্রাপ্তির) ব্যাপারে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, পুত্র সন্তান পাবে দুই কন্যাসন্তানের সমান। এ হল আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত বিধান। আল্লাহ সর্বজ্ঞাতা ও প্রজ্ঞাময়। সুরাঃ ৪ নিসাঃ আয়াতঃ১১

সুতরাং উত্তরাধিকারে যদি নারীকে পুরুষের সমান অংশ প্রদানের সুযোগ রাখা হয় তাহলে এটি হবে সুষ্পষ্ট কুরআন বিরোধী।

কিন্তু সরকার মুখে বলছে যে, কুরআন বিরোধী কোন বিষয় নারী নীতিতে নেই। সরকারের এই বক্তব্যকে অন্য ক্ষেত্রে নাহলেও শুধু উত্তরাধিকারের প্রশ্নে সরল অর্থে গ্রহন করা যেত যদি সিডও বাস্তবায়নের অঙ্গিকার দৃঢ়তার সাথে নারী নীতিতে ব্যক্ত না করা হত। সিডও সনদের পূর্বোল্লেখিত ধারা সমূহ যে কুরআন সুন্নাহ ও ইসলামী জীবন দর্শনের পরিপন্থী তা আন্তর্জাতিক ভাবেই স্বীকৃত। যে কারনে মুসলিম দেশগুলো সেগুলো মেনে নেয়নি। স্বয়ং বাংলাদেশও সেগেুলোকে কুরআন সুন্নাহর পরিপন্থী মনে করে সেগেুলো সংরক্ষন করেই সিডও সনদে স্বাক্ষর করেছিল। সকল ক্ষেত্রে নারীর সমঅধিকারের ঘোষনার মাধ্যমে মুসলিম উত্তরাধিকার আইনকে অকার্যকর করাই যে সিডও সনদের মূল লক্ষ্য তা অন্ধজনও বুঝতে সক্ষম। আমাদের শিশু ও নারী বিষয়ক মন্ত্রী শিরীন শারমিন চৌধুরীও তাই বুঝেছিলেন। আলেম উলামা ও বুদ্ধিজীবিরা যদি এরূপ বুঝে থাকেন তাতে আর দোষের কী?

তাছাড়া নারী নীতির ভূমিকা – ২য় লাইন ৪,৪.১, ১৬.১, ১৬.৮, ১৬.১২, ১৭.১, ১৭.৪, ২৩.৫, ধারা সমূহ যেভাবে বর্ণিত হয়েছে তাতে যেকোন ব্যক্তি তা দ্বারা উত্তরাধিকারে নারী পুরুষ সমান পাবে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারবে। সিডও বাস্তবায়নের অঙ্গিকারে আবদ্ধ সরকার পরে সেই ধারাগুলোকে পুঁজি করে উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রেও যে সমতার ব্যাখ্যা করবেন না এর নিশ্চয়তা কে দিবে?

পাঠকের সুবিধার্থে উপরোল্লেখিত ধারা সমূহের বক্তব্য আমরা সরকারের নারী নীতি থেকে উদ্ধৃত করে দিচ্ছি।

* ভূমিকার ২য় লাইনে উল্লেখ করা হয়েছে “সকল ক্ষেত্রে নারীর সমসুযোগ ও সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা জাতীয় উন্নয়ন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একান্ত অপরিহার্য”।

* ৪নং ধারার মাঝামাঝি উল্লেখ করা হয়েছে যে, “ক্ষমতা বন্টন, ও সিদ্ধান্ত গ্রহনের ক্ষেত্রে নারী পুরুষের মাঝে তীব্র অসমতা বিদ্যমান। এই অসমতা ও সীমাবদ্ধতা নিরসনের উদ্দেশ্যে সরকার সমূহকে উদ্যোগ নিতে তাগিদ দেওয়া হয়”।

* ৪.১ ধারায় নারীর প্রতি বৈষম্য বিলোপ সনদ শিরোনামের অধীনে উল্লেখ করা হয় “রাষ্ট্র, অর্থনীতি, পরিবার, সমাজ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য দূরী করনের লক্ষ্যে ডিসেম্বর ১৯৭৯ইং সালে জাতিসংঘে নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ সনদ (সিডও) গৃহীত হয়।

* জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতির লক্ষ্য শিরোনামের অধীন ১৬.১ ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে “রাষ্ট্রীয় ও গণজীবনের সকল ক্ষেত্রে নারী পুরুষের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা করা।

* ১৬.৮ ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে ”নারী পুরুষের বিদ্যমান বৈষম্য দূর করা”।

* ১৬.১২ ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে “রাজনীতি প্রশাসন ও অন্যান্য কর্মক্ষেত্রে আর্থসামাজিক কর্মকান্ড, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ক্রীড়া এবং পারিবারিক জীবনের সর্বত্র নারী পুরুষের সমানাধিকার প্রতিষ্ঠা করা।”

* ১৭.১ ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, “রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইত্যাদি ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষ যে সমঅধিকারী তার স্বীকৃতি স্বরূপ নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ করা।”

* ১৭.৪ ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, “বিদ্যমান সকল বৈষম্যমূলক আইন বাতিল করা এবং নতুন আইন প্রণয়ন ও সংস্কারের লক্ষ্যে গঠিত কমিশন বা কমিটিতে নারী আইনজ্ঞদের অংশগ্রহন নিশ্চিত করা”।

* ২৩.৫ ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, “সম্পদ, কর্মসংস্থান বাজার ও ব্যবসায় নারীকে সমান সুযোগ ও অংশিদারিত্ব দেওয়া। বস্তুতঃ এই ধারাগুলো ব্যাখ্যা করে “উত্তরাধিকারে নারী পুরুষের সমান অংশ পাবে” এই বক্তব্য বের হয়ে আসা খুবই সহজ একটি বিষয়। যারা সিডও বাস্তবায়নের অঙ্গিকারাবদ্ধ তারা আজ না হউক কাল যে এই ধারা সমূহের আলোকে উত্তরাধিকারে নারীর সমঅংশিদারিত্বের বিধান উদ্ভাবন করবেন না, এ নিশ্চয়তা কে দেবে?

তাছাড়া নারী বিষয়ে যে কোন নতুন আইন প্রনয়নের পথ ও খোলা রাখা হয়েছে নারী নীতিতে। দ্রষ্টব্য ২৬.৬, ১৯.২, ১৯.৪। এমতাবস্থায় এই নীতিমালার মাধ্যমে উত্তরাধিকারে নারী পুরুষের সমতা বিধানের কৌশল অবলম্বন করা হয়েছে বলে যদি আলেম উলামা ইসলামী চিন্তাবিদরা ধারনা করে থাকেন তাহলে এটা মোটেও অযৌক্তিক নয়।

নারীকে উত্তরাধিকারে সমান না দেওয়ার প্রশ্ন উঠিয়ে এক শ্রেনীর তথা কথিত বুদ্ধিজীবি নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য যে মায়াকান্না কাদেন তারা আসলে ইসলামী সমাজ ব্যবস্থা সম্পর্কে ধারনা রাখেন বলে মনে হয় না। কেননা পৈত্রিক উত্তরাধিকারই নারীর এক মাত্র উত্তরাধিকারের সূত্র নয়। বরং নারীরা পিতামাতার সম্পদে উত্তরাধিকার লাভের সাথে সাথে স্বামীর সম্পদেও উত্তরাধিকার লাভ করে থাকেন। স্বামী নিঃসন্তান হলে তার সম্পদের ১৪অংশ লাভ করেন। আর স্বামীর সন্তান থাকলে তখন ১৮অংশ লাভ করেন। আর নারীর জীবদ্দশায় তার সন্তান মারা গেলে তার সম্পদের ১৬অংশ লাভ করে থাকেন। এভাবে বিভিন্ন সূত্রে থেকে পাওয়া তার সম্পদের পরিমান তার দায়-দায়িত্ব ও প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি।

ইসলামী সমাজে নারীর কোন অর্থনৈতিক দায়িত্ব বহন করতে হয় না। এমনকি তার নিজের দায়িত্বও তাকে বহন করতে হয় না। জন্মের পর থেকে বিয়ের পূর্ব পর্যন্ত তার লালন পালন ও ভরন পোষনের দায়িত্ব পিতার। বিয়ের পর তার ভরন পোষনের দায়িত্ব স্বামীর। স্বামীর মৃত্যুর পর তার ভরন পোষনের দায়িত্ব ছেলের। সুতরাং কোন এক সন্ধিক্ষনেও তার নিজের দায়িত্ব তাকে বহন করতে হয় না। সন্তানের ভরন পোষনের দায়িত্ব পিতার, মাতার নয়। বাবা মা বৃদ্ধ হয়ে গেলে তাদের ভরন পোষনের দায়িত্ব ছেলের। পারিবারিক আত্মীয়-স্বজনের আপ্যায়ন ও সামাজিকতার দায়িত্ব পুরুষের, নারীর নয়। সার কথা এই দাড়ায়, জীবনের কোন ক্ষেত্রেই নারীকে তার নিজের বা অন্যের দায়িত্ব বহন করতে হয় না। অথচ ছেলেসন্তান হলে বালেগ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তার ভরন পোষনের দায়িত্ব পিতার। বালেগ হওয়ার পর থেকে তার নিজের ভরন পোষনের দায়িত্ব আইনগত ভাবে তার নিজের। বিয়ে করলে স্ত্রীর ভরন পোষনের দায়িত্ব তার ওপর বর্তায়। সন্তান জন্মালে তাদের ভরন পোষনের দায়িত্ব বাবা হিসাবে তার ওপর। পিতা মাতা বৃদ্ধ হয়ে গেলে তাদের সম্পদ না থাকলে এবং উপার্জনে অক্ষমহলে তাদের দায় দায়িত্ব ছেলের। আত্মীয় স্বজনের আপ্যায়নের দায়িত্ব ছেলের ওপর। বেচারা পুরুষ নিজের, নিজের স্ত্রী সন্তান ও পিতা-মাতা সহ সকলের দায়িত্ব বহন করে যা পায় তা নারীর প্রাপ্তির তুলনায় যথেষ্ট কম। পক্ষান্তরে নারী নিজের দায়িত্বও বহন করে না আর অন্যকারো কোন দায়িত্ব বহন করে না তারপরও তাকে যদি পৈত্রিক উত্তরাধিকারে পুরুষের অর্ধেকসহ অন্য সূত্রেও উত্তরাধিকারের অংশ দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলেও কি বিষয়টা অবিচার করা হয়েছে বলে মনে হবে ? তদুপরি মহর হিসাবে প্রাপ্ত টাকা, বৈধ পন্থায় উপার্জিত যাবতীয় সম্পদে তার পূর্ন অধিকার থাকে। স্বামী অভাবে পড়লেও স্ত্রীর ব্যক্তিগত সম্পদে হস্তক্ষেপ করার কোন অধিকার তার নেই। সুতরাং বলা যায় যে দায় দায়িত্ব ও প্রয়োজনের বিচারে নারীকে উত্তরাধিকারের হিসাবে যতটুকু দেওয়া হয়েছে তা অনেক বেশি। নারী দুর্বল বলেই দায়িত্ব না দিয়ে তাকে পিতা মাতার উত্তরাধিকারে অর্ধেক দেওয়া হয়েছে যাতে দুর্যোগের সময় বা কারো অসহযোগিতার মুহূর্তে সে সংকটে নিপতিত না হয়। ইসলামী সমাজের এই ষ্ট্রাকচারাল দিক সম্পর্কে যারা অবগত নয় তারাই আল্লাহর বিচারে সন্তুষ্ট হতে না পেরে নিজেরা অন্যায় অধিকারের দাবীতে সোচ্চার হয়।

সার কথা এই যে, নারীনীতিতে কিছু বিষয় ইসলাম বিরোধী হওয়ার বিষয়টি সুষ্পষ্ট। উত্তরাধিকারের বিষয়টি ধোয়াটে ধুম্রাচ্ছন্ন। সরকার বলছে এগুলো দ্বারা উত্তরাধিকারে নারী পুরুষের সমান অধিকারের কথা বলা হয়নি। আর আলেম উলামারা বলছেন বিষয়টি ধুম্রাচ্ছন্ন করে উল্লেখ করা হয়েছে যা ব্যাখা করলে উত্তরাধিকারে নারী পুরুষের সমতার বিধান বের করে আনা যায়। সুতরাং এমতাবস্থায় এ সংকটের নিরসন সরকারকেই করতে হবে। নারী নীতির যে সব বিষয় সুষ্পষ্ট কুরআন সুন্নাহ ও ইসলামী ভাবধারার পরিপন্থী সেগুলোকে সংশোধন করে এমন ভাবে উপস্থাপন করতে হবে যাতে সেগুলো কোরআন সুন্নাহর সাথে সাংঘর্ষিক না হয়। আর উত্তরাধিকারের বিষয়টি নিয়ে মৌখিক বক্তব্য যথেষ্ট নয়। বরং নারী নীতিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে যে, উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে মুসলমানদের বেলায় ইসলামের উত্তরাধিকার আইন প্রযোজ্য হবে। অন্যথায় ৯০% মুসলিম নাগরিক এই নীতি কিছুতেই মেনে নিবে না।

বরং আমরা পরামর্শ দেই, যে ইসলাম নারীকে যে অধিকার ও মর্যাদা দিয়েছে তার আলোকে ইসলামী বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে নতুন করে নারী উন্নয়ন নীতিমালা প্রণয়ন করিয়ে নেওয়া হউক। কেননা ইসলামই নারীকে সর্বোচ্চ মর্যাদা ও অধিকার দিয়েছে এবং নারী নির্যাতনের বিপক্ষে সবচেয়ে বেশি সোচ্চার ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। পশ্চিমাদের দীক্ষা গ্রহন না করে ইসলামের মহান শিক্ষার আলোকে ৯০% মুসলমানের দেশের নারী উন্নয়ন নীতি প্রনয়ন করাই হবে গণতন্ত্রের অনুকূলে এবং আগামী দিনে ভোট যুদ্ধে বিজয়ী হওয়ার উত্তম রণকৌশল। অন্যথায় পরিনতি কোন দিকে গড়াবে তা আল্লাহই ভাল জানেন।

Share

ফতোয়ার বিরোদ্ধে ফতোয়াবাজী

ভারতের উত্তর প্রদেশের মুজাফফর নগর জেলা। কর্মসূত্রে আমাদের এক সহপাঠী মুজাফফর নগর থাকতো। কোনো এক ছুটিতে ভারতের দারুল উলূম দেওবন্দে আমরা দু’জন (আমি ও হাফেজ মাওলানা সাজিদুর রহামন) মুজাফফরনগর চলে গেলাম। উদ্দেশ্য মুজাফফর নগর শহরটা ঘুরে দেখা এবং বন্ধুর সাক্ষাৎ। কিন্তু ওখানে গিয়ে দেখলাম, বেলা ১২টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ‘হিন্দু বজরঙ্গী’ দল ‘বন্ধ’ (হরতাল) এর ডাক দিয়েছে। রাস্তায় অলিগলিতে খণ্ডখণ্ড মিছিল হচ্ছে। ভারতে বন্ধ বা ধর্মঘট এই প্রথম দেখলাম। দেওবন্দে যাওয়ার পর এ ধরনের আন্দোলন বা বিক্ষোভ আর দেখা হয়নি। তাই এ নিয়ে কৌতূহলও ছিলো ব্যাপক। খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম। এর ইস্যু একটু ভিন্ন রকমের।

ইস্যুটা এরকম বিলেত ফিরত এক হিন্দু শেঠের ছেলে মন্দিরে পূজা দিতে গিয়েছিলো। বেচারা ভুলক্রমে পূজার পবিত্র বেদিতে জুতা নিয়ে উঠেছিলো। তাই মন্দির অবমাননার বিচার চেয়ে এই বন্ধ। আমাদের কৌতূহল হলো, ওখানকার স্থানীয়দের প্রতিক্রিয়া কী? তারা এই বন্ধ বা মন্দির অবমাননার বিচার দাবীর সঙ্গে এক কি না? আমাদের সহপাঠি বন্ধু আবিদ হাসান স্থানীয় এক মসজিদের ইমাম এবং কাপড় ব্যবসায়ী। সে জানালো, এখানে মন্দির, মূর্তি, বেদ, রামায়ণ অবমানা অর্থাৎ ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিতে পারে এমন তুচ্ছ ঘটনা ঘটলেও সাধারণ মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। ধনী, গরিব, শিক্ষিত, অশিক্ষিত, বুদ্ধিজীবী, অবুদ্ধিজীবী সব শ্রেণীর মানুষ একতাবদ্ধ হয়ে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত আসে এমন ঘটনা মন্তব্য ইত্যাদির বিরুদ্ধে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেন। ভারত হিন্দু প্রধান দেশ। তবে মুসলমানের সংখ্যাও এখানে কম নয়। হিন্দু সম্প্রদায়ের এ ধরনের কোনো কর্মসূচীতে মুসলমান কখনো হস্তক্ষেপ করে না। এমনকি অভিজাত এবং অতি আধুনিক শ্রেণীর হিন্দু বুদ্ধিজীবীরাও এর বিরুদ্ধে মৌলবাদী, জঙ্গিবাদী, বলে কলাম লেখার অবতারণা করেন না।

যাহোক, আমাদের কৌতূহল মিটলো না তবুও। আমরা অপেক্ষায় রইলাম পরের দিন পত্রিকার উপ সম্পাদকীয়গুলোয় এ সম্পর্কে কোনো প্রতিবেদন ছাপা হয় কি না। পরের দিন কেন এর পরের এক সপ্তাহ পর্যন্ত আমরা বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা, ম্যাগাজিন, সাপ্তাহিক, পাক্ষিকের পাতায় খোঁজলাম মন্দির অবমাননার বিরুদ্ধে সেই বন্ধ বা আন্দোলনের বিরুদ্ধে কোনো হিন্দু প্রগতিশীল লেখক কিছু লেখেন কি না? বজরঙ্গী দলের সেই কর্মসূচীকে কেউ মৌলবাদী, জঙ্গীবাদী বা ফতোবাজী বলে কটূক্তি করে কি না? না এ ধরনণর কোনো লেখাই আমরা খুঁজে পেলাম না। বরং পত্রিকাগুলো ফাস্ট লিড বা সেকেন্ড লিড করে নিজউ করলো এবং উপসম্পাদকীয়গুলোতেও এর পক্ষে অনেক লেখালেখি হলো। অবশেষে যথেষ্ট প্রভাবশালী এবং ক্ষমতাধর হওয়া সত্ত্বেও সেই হিন্দু শেঠের ছেলের জেল-জরিমানা হলো এবং তাকে হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে করজোড়ে ক্ষমা চাইতে হলো।

ঘটনাটি আমরা আমাদের দেশের অবস্থার সঙ্গে তুলনা করতে বাধ্য হলাম। বাংলাদেশ শুধু মুসলিম প্রধান দেশই নয়। অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরা এখানে সংখ্যায় নেয়ায়তই কম। অবশ্য তাদের ধূসর চ্যালা-চামুণ্ডাদের সংখ্যা অগণিত। এখানে যখন এধরনের কোনো ঘটনা ঘটে, কুরআন নিয়ে মসজিদ নিয়ে, মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার মতো কেউ কিছু বলে বা করে, গণতান্ত্রিক অধিকারের ভিত্তিতেই মুসলমানরা বিক্ষুব্ধ হলে, প্রতিবাদমুখর হলে এক শ্রেণীর কলামবাজ, ফতোয়াবাজ, বকাবাজ লোকেরা কিছুদিনের জন্য মুখরোচক খোরাক পেয়ে যায়। অথচ এরাও কিন্তু নামে মুসলমান। এদের পিতৃ-মাতৃ পরিচয়ের সূত্রও যে মুসলমানিত্বের এটা তারা কখনো অস্বীকার করে না। অথচ এদেরেই ধর্ম ইসলামের বিরুদ্ধে যখন কথা বলে, কুরআনের আইনের বিরুদ্ধে আইন করে, তখন এদের কলম এবং মুখ থাকে নীরব। ঈমানী চেতনায় উদ্দীপ্ত, কুরআনিক আদলে উজ্জীবীত আপামর মুসলিম জনগণ যখন বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠে এবং কোনো কর্মসূচীতে বাধ্য হয়, তখন তারা সরব হয়ে উঠেন। মৌলবাদী, জঙ্গিবাদী, ফতোয়াবাজী, এসব ভোতা এবং হালে পানি না পাওয়া নিয়ে কলাম ফেদে বসেন।

গত ৭ এপ্রিল ১১ আমার দেশ পত্রিকায় এমন একটি উদ্ভট এবং ভিত্তিহীন কলাম ফাদেন জনাব বদরুদ্দিন উমর। বদরুদ্দিন উমর আমার একজন পছন্দের কলাম লেখক। সাম্রাজ্যবাদ অপশক্তির বিরুদ্ধে বদরুদ্দিনের তীক্ষèধার ও তথ্যনিষ্ঠ লেখা পেলেই আমি মন দিয়ে পড়ি। দৃষ্টিগোচর হলে তার লেখা না পড়ে থাকতে পারিনা। এভাবে তার ব্যাপারে একটা সমীহ আমার মধ্যে গড়ে উঠেছে। অনুমান করেছিলাম তিনি একজন বিপ্লবী কমরেড হলেও ইসলাম ও আলেমদের সম্পর্কে অতোটা অজ্ঞত নন। ভেবেছিলাম তিনি অধার্মিক হলেও ইসলাম ও আলেমদের সম্পর্কে অসৎ বা ভ্রান্ত ধারণা পোষণ করেন না। কারণ, প্রকৃত মুসলমান ও আলেম সমাজও সব সময় সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী অপশক্তির বিরুদ্ধে আপোষহীন। কিন্তু আমার অনুমান বা ধারণা কোনটাই অভ্রান্ত হলো না। বদরুদ্দিন উমরের ৭ এপ্রিলের লেখা পড়ে নিশ্চিত হওয়া গেলো, তিনি ইসলামের ‘ই’-ও জানেন না এবং আলেমদের ‘আ’-ও জানেন না। সাম্রজ্যবাদী ইহুদি লতিদের প্রচার করা তথ্য-উপাত্ত এবং প্রোপাগণ্ডায় কলুষিত সে­াগানগুলোই উগড়ে দিলেন মাত্র। মৌলভী, মোল্লারা অশিক্ষিত, মুর্খ, পশ্চাদপদ, গোঁড়া, জঙ্গীপ্রিয়, এসব বস্তাপচা ভাড়া করে আনা শব্দ সেঁটে দিয়ে তিনি আলেম সমাজকে যতোটা না খাঁটো করেছেন এর চেয়ে বেশি প্রমাণ করেছেন, তলাহীন ঝুড়ি নিয়ে তিনি এতোদিন কলাম ব্যবসা করে গেছেন এবং সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী মুখোশ পরা একজন সাম্রাজ্যবাদীদের পদলেহী কলামবাজ তিনি।

একই দিন কালের কণ্ঠে আরেক বামরাজনীতিক ও কলাম লেখক হায়দার আকবর খান রনো(নামে তিনিও মুসলমান) আলেম উলামাদের গালিগালাজ করে বিশাল এক লেখার অবতারণা করেছেন। যার মোদ্দাকথা হলো, ফাতোয়া নিয়ে যতোই ধর্মহীন লোকেরা ফাতওয়াবাজী করুক, নারীনীতি নিয়ে নারীদেরকে নিয়ে যতোই টানা হেচড়া করুক এবং শিক্ষানীতি নিয়ে যতোই কুশিক্ষার প্রসার ঘটাক এনিয়ে আলেম উলামাদের কোনো কিছু বালার অধিকার নেই। আলেম উলামারা অযথাই লম্ফঝম্ফ করেন। আলেম উলামারা কুরআন হাদিস বুঝেন না, না বুঝেই কথা বলেন, আর তারা কুরআন পড়তে না পারলেও কুরআন হাদিস বুঝেন এবং সঠিক ‘ব্যাখ্যা’ দেন।

বদরুদ্দিন উমর, হায়দার আকবর খান রনো ও সমমনাদের জন্য বয়ষ্ক পাঠশালা

ঢাকা শহরের অসংখ্য স্থানে বয়ষ্ক মক্তব বা পাঠশালার ব্যবস্থা রয়েছে। বিনা বেতনে এবং যতেœর সঙ্গে সেসব অস্থায়ী পাঠশালায় বয়ষ্ক লোকদের কুরআন ও ইসলামের প্রাথমিক শিক্ষা দেয়া হয়। উমর, রনো ও সমমনা পণ্ডিত কলাম লেখক, যারা নিজেদেরকে সবজান্তা বলে জাহির করেন, তাদেরকে বিনা পয়সায় বয়ষ্ক পাঠশালায় ভর্তি হতে একজন মুসলমান হিসেবে অনুরোধ করছি। আল্লাহর তাওফিকে সেখানে ভর্তি হলে দেখবেন আপনাদের সবজান্তা ধরনের প্রদর্শিত পণ্ডিতি কতোটা দণ্ডিত। আপনারা দেখবেন, মাদরাসার মক্তবের ৬ বছরের শিশুটা যে চোখবন্ধ করে ৪০টি হাদিস অর্থসহ প্রত্যয়দীপ্ত কণ্ঠে বলে যাচ্ছে তার সামনে আপনাদের মতো শিক্ষিত কলাম লেখক ও বুদ্ধিজীবীরা কতোটা দীন-হীন এবং প্রকৃত শিক্ষার আলো বঞ্চিত-বিস্তৃত অন্ধকারে নিমজ্জিত।

উমর ও রনো সাহেবরা জেনে রাখুন, আপনারা যেমন এদেশের নাগরিক, আলেম উলামারাও এদেশের নাগরিক। পার্থক্য কেবল এতটুকু যে, আপনারা ক্যাম্পাসের, অস্ত্রবাজী, সন্ত্রসী, দখলদারিত্ব, ছিনতাই রাহাজানির অসুস্থ পরিবেশে থেকে শিক্ষার সনদ নিয়ে বেরিয়েছেন। আর মাদরাসার ছেলেরা সন্ত্রাসমুক্ত, অস্ত্রহীন, পেশীশক্তিহীন সুন্দর-সচ্ছ সুস্থ শান্তিপূর্ণ পরিবেশে, ঈমান ও কুরআনের জ্যোর্তিময় আভায় উদ্ভাসিত হয়ে ওয়ারিসে নবী তথা নবীর উত্তরাধিকারের আল-াহ প্রদত্ত সনদ নিয়ে বের হন। এই পার্থক্যের কারণে তারা তো দেশের নাগরিকত্ব হারায় না। আপনাদের পাশ্চত্য শিক্ষা ও ধর্মহীনতা আপনাদেরকে যতোই তাদের প্রতি সহিংস করে তুলুক এজন্য তো তারা দায়ি নয়। দাড়িওয়ালা টুপি ওয়ালাদের দেখলে আপনাদের গা জ্বালা করলে সেটা আপনাদেরই সমস্যা। আপনাদের সেটা হীনমন্নতা ও শ্রেণী চরিত্রের পরিচয়। এটা দাড়ি টুপিওয়ালাদের সমস্যা নয়। তাদেরকে আপনারা যতোই গালিগালাজ করুন না কেন এতে তাদের কোনো ক্ষতিবৃদ্ধি হয় না। বরং এভাবে গালগাল করতে করতেই একদিন কবরে চলে যাবেন; তখন মুখে কালেমায়ে তায়্যিবা উচ্চারিত হবে না। আযরাঈল আ. কে দেখলে তাকেও মৌলবাদী ও রূহকবজকারী বলে প্রলাপ বকতে বকতে নরকের পথে রওয়ানা হয়ে যাবেন ।

আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মুফতী না মুফাসসির ?

গত ৩ এপ্রিল ১১ কক্সবাজার শহরের পুরনো সি-বিচ রেস্ট হাউজ মাঠে আওয়ামীলীগের একটি জনসভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ফজলুল হক আমিনী পবিত্র কুরআন শরীফের অপব্যাখ্যা দিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছেন। আওয়ামীলীগের বিভিন্ন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরাও একই ধরনের কথা বলেছেন। এ প্রতিমন্ত্রী তো আমিনী সাহেবকে ইবলিশ বলেছেন। নয়া দিগন্ত ২৫.৪.১১

মুফতি আমিনীর ইসলামী আইন বাস্তবায়ন কমিটির সমর্থক আমি নই। তিনি যে ধারার রাজনীতি করেন তারও সমর্থক নই আমি। বহু উলামা মাশায়েখ আছেন যারা আমীনীর দলভুক্ত নন। কিন্তু নারীনীতি যে ইসলাম বিরোধী এ বিষয়ে মুফতী আমিনীর সাথে উলামা-মাশায়েখের কোন দ্বিমত নেই। অবশ্য এর মধ্যে আওয়ামী উলামালীগ সাভাবিক নিয়মেই ব্যতিক্রম। তো আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্যের অর্থ হলো, সমস্ত উলামা মাশায়েখ কুরানের অপব্যাখ্যার পক্ষে। (নাউযুবিল্লাহ)

তারা কুরআন বুঝেন না। শেখ হাসিনাই একমাত্র কুরআনের সঠিক ব্যাখ্যাদাতা। তিনিই কুরআন বুঝেন। আলেমরা বুঝেন না। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, শেখ হাসিনা কি তার হাসিল করা এ্যান্ডার ডিগ্রির সঙ্গে ‘মুফাসসির’ ডিগ্রিও অর্জন করেছেন? তিনি কোন মাদরাসা থেকে এই মুফাসসির ডিগ্রি হাসিল করেছেন? কোন স্কুল, কলেজ, ভার্সিটি থেকে নিশ্চয় মুফাসসির ডিগ্রি হাসিল করা যায় না এবং আওয়ামী উলামালীগের লোকেরাও নিশ্চয় কোন ‘আওয়ামী মাদরাসা’ প্রতিষ্ঠা করেনি; যেখান থেকে রাতারাতি এধরনের ডিগ্রি হাসিল করা যায়। আমাদের নীতিগত প্রস্তাব হলো, শেখ হাসিনা পবিত্র কুরআনের ব্যাপারে পাণ্ডিত্য অর্জন করে থাকলে তিনি কোথাও তাফসীর মাহফিল করুন। দেশের কোটি কোটি মানুষ তার তাফসীর শুনে মুগ্ধ হয়ে ঈমান আমল ও আখলাক পরিশুদ্ধ করার প্রয়াস পাবে। মুফতি আমিনী ও উলামা মাশায়েখরাও পরিশুদ্ধ আলেম হয়ে যাবে। কিন্তু তারপরও প্রশ্ন থাকে যে, ত্রিশ/চল্লিশ বছর কুরআন ও হাদিসের নিবিড় চর্চার পরও উলামা মাশায়েখরা যদি কুরআন হাদিস না বুঝেন তাহলে যারা সব সময় কুরআন হাদিসের বিরুদ্ধে কথা বলে গেলেন তারা কোন ভুতের ঘাড়ে সওয়ার হয়ে কুরআন বুঝে ফেললেন? এমন চলতে থাকলে একদিন দেখা যাবে, দেশের প্রধানমন্ত্রী ‘মুফতি’ ‘মুফাসসির’ হওয়ার সুবাদে বাংলার ঘরে ঘরে সবাই মুফতি মুফাসসির বনে গেছেন। হে খোদা রক্ষা করো!

প্রধানমন্ত্রী ও তার দলীয় কিছু লোক বলেছেন- আলেমরা নারী নীতি পড়েননি। নারীনীতি নিয়ে অযথাই বিশৃংখলা সৃষ্টি করেছেন। নারীনীতিতে কুরআন বিরোধী কোনো কথা নেই। নারীনীতি বাংলা ভাষায় প্রণীত। আলেমরা কি বাংলাও পড়তে পারেন না? নারী নীতির ১৬.৮, ১৬.১১, ১৬.১২, ১৭.১, ১৭.৩, ১৭.৪, ১৭.৫, ২৩.৫,২৫.২ ইত্যাদি ধারাগুলো যে, আলেমরা চিহিত করেছেন এবং এগুলো যে পবিত্র কুরআনের আইনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়, তা কি জিবরাঈল আ. এসে বলে গেছেন? আরে সাধারণ মুসল্লীরাও এসব ধারার গোলমেলে অর্থগুলো ধরতে পারছেন। প্রধানমন্ত্রী ও উনার লোকদের কথা শুনলে মনে হয়, উলামায়ে কেরামের মা-বোন, স্ত্রী কন্যা নেই। তারা ফেরেশতাদের মতো আকাশ থেকে নেমে এসেছেন।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, কোন বেকুব এবং পাড়মাতাল কলামিস্ট লিখেছেন, নারীনীতি বাস্তবায়নে আলেম সমাজ বাধা দিচ্ছে বলে দেশের সর্বত্র নারী নির্যাতন বেড়ে গেছে। (নয়া দিগন্ত ২৫/৪/১১) প্রকৃত জরিপে দেখা যাবে, দেশে প্রতিদিন অসংখ্য ধর্ষণ, অপহরণ, ইভটিজিং ইত্যাদির খবর পত্রিকায় বেরুচ্ছে, এগুলো যারা ঘটাচ্ছে এতো আপনাদের ছেলারাই ঘটাচ্ছে। লক্ষ লক্ষ নারী অপহরণকারী, ধর্ষণকারী ও ইভটিজিং এর মধ্য থেকে কি দু’চারজন আলেম উলামা কেউ সনাক্ত করতে পারছে? অবশ্য ষড়যন্ত্র বা চক্রান্ত করে কাউকে ফাঁসাতে পারবে কিন্তু বাস্তবে ইনশাআল্লাহ তা কখনো ঘটবে না।

বরং প্রত্যেক জুমায় লক্ষ লক্ষ আলেম ও খতীব ইভটিজিং, নারী নির্যাতন ইত্যাদির বিরুদ্ধে বয়ান করে মানুষকে সচেতন করে দিচ্ছেন। কিন্তু আপনাদের মতো নামধারী মুসলমানরা কি কখনো সেসব ওয়াজ মাহফিলে যাওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছেন? আলেম ও টুপি দাড়িওয়ালা দেখলেই আপনারা রাম নাম জপ করতে থাকেন। আপনারা কি কখনো উলামায়ে কেরামের সংস্পর্শে যাওয়ার সৎসাহস দেখাতে পারবেন? সেই তাওফিক হবে কি না আল্লাহই ভালো জানেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার ফতোয়ার বিরুদ্ধে ফতোয়া জারি করেছেন। সরকারে কিংবা বিচার বিভাগের কোন মুফতি সাহেবরা আছেন যারা মুফতি সাহেবদের ফাতোয়ার বিরুদ্ধে ফাতোয়া দিতে পারেন? বিচারক গোলাম রব্বানী ও নাজমুন্নাহারের বেঞ্চেও কোনো মুফতি তো দূরের কথা কম শিক্ষিত আলেমও ছিলেন না। আর এখন সরকারের কথায় মনে হয়, শেখ হাসিনা এবং তার দলের সবাই মুফতি এমনকি ঘরে ঘরে মুফতি বনে গেছেন।

আদালতে যেহেতু কোনো বিচারপতি আলেম, মুফতি বা শরীয়াহ বিশেজ্ঞ নেই। তাই আদালত পরামর্শক বা কনস্যাল্ট্যানট হিসেবে এ্যামিকাস কিউরি নিয়োগ করতে পারতো। জটিল রায়ের ক্ষেত্রে আদালত এ্যামিকাস কিউরি নিয়োগ দিয়ে থাকে। যদি বিশেষজ্ঞ কোনো আলেমদীন ফকীহকে এ্যামিকাস কিউরি নিয়োগ করতো আদালত তাহলে আজকের এই গোলযোগ অবস্থার সৃষ্টি হতো না। দায়িত্বশীলদের শুভ বুদ্ধির উদয় কখনও ঘটবে কিনা আল্লাহই ভালো জানেন।

Share

বাংলা ভাষার শেকড়ের খোঁজে

বেহুলা-লক্ষ্মীন্দরের রূপকথা আমাদের জানা আছে। কাহিনী জানা না থাকলেও বেহুলা-লক্ষ্মীন্দর যে আমাদের বাঙালি সংস্কৃতির-লোককথায় অত্যন্ত প্রতাপশিষ্ট প্রবাদকথা সে ব্যাপারে কম-বেশি সবাই ওয়াকিফহাল। কেবল বেহুলা-লক্ষ্মীন্দর নয় আমাদের বাঙালি রূপকথায় ছড়িয়ে আছে এমন আরো অনেক রূপক কিংবা ইতিহাসাশ্রিত চরিত্র যাদের প্রভাব আমাদের সামাজিক জীবন-যাপনে হরেক রঙে মিশে আছে। এগুলো আবেগী দুর্বলতার বিষয় নয় কিংবা নাক সিঁটকে ছুঁড়ে ফেলে দেয়ার মতো অচ্ছুৎ চিজও নয়। এগুলো ঐতিহাসিক সমাজ-পরম্পরার স্বাভাবিক সাংস্কৃতিক বিষয়। বিগত সমাজের প্রতিচ্ছবি অঙ্কিত থাকে এসব লোক কাহিনীতে।

কেবল বেহুলা-লক্ষ্মীন্দর নয়; কালু-গাজী, সোনাভান, ঈসা খাঁ-স্বর্ণময়ী, মনসা গীতিকা, রাম-লক্ষ্মণ-সীতা, চন্দ্রাবতীসহ আরো অনেক লোকজ-কাহিনী আমাদের সমাজে প্রচলিত রয়েছে। এসব লোককাহিনীর প্রধান আশ্রয় ছিলো পুঁথিতে। সেকালের সাহিত্য বলতে এই পুঁথিকেই বুঝাতো। কবিরা নানাজন থেকে নানা কাহিনী শুনে সেসব ছন্দাকারে পুঁথি লিখতেন। তারপর সেই পুঁথি সুর করে পাঠ হতো গ্রামীণ আসরে। সেখান থেকে ছড়িয়ে পড়তো গ্রাম-গঞ্জে, হাট থেকে মাঠে। পুঁথি হয়ে পড়তো সমাজের সর্বস্তরের মানুষের ‘বাংলাঘরে’র সাহিত্য।

অনেক সময় ধর্মীয় ঐতিহাসিক কাহিনী নিয়েও পুঁথি রচিত হতো। যেমন ষোড়শ শতকের কবি শেখ চান্দ রাসূল সা.-এর বিজয়কাহিনী নিয়ে লিখেছিলেন ‘রসূল বিজয়’। এ শতকেরই আরেক কবি শেখ পরান রাসূল সা.-এর সীরাত নিয়ে লিখেছিলেন ‘নূরনামা’ পুঁথি। এ শতকেরই বিখ্যাত মহিলা কবি ছিলেন চন্দ্রাবতী। তিনি হিন্দুধর্মের দেব-দেবীদের নিয়ে রচনা করেন রামায়ণ। আবার দেখা গেছে সমসাময়িক শাসকদের বিজয়-বন্দনা নিয়েও রচিত হতো পুঁথি। ষোড়শ শতকে ঈসা খানের সমসাময়িক কবি শাহ বন্দে আলীর যেমন ঈসা খানের বিজয়-বন্দনা করে লিখেন

সালার সাজাইয়া যবে আসিলেক রণে

পরাজিত হইল তবে মোঘল পাঠানে

রাজত্ব করিল কায়েম ঈসা খান বীর

গড়িয়া উঠিল জনপদ লোহিত্যের তীর।

পুঁথিসাহিত্য আমাদের এই ‘ঝাক্কাস’ প্রজন্মের কাছে দারুণ বেমানান শোনালেও পুঁথির লুপ্তি কিন্তু খুব বেশিদিনের নয়। আমরা ছোটবেলায় আমাদের দাদা-চাচাদের মুখে হররাত সন্ধ্যায় পুঁথি শুনতাম। বড়বাড়িতে পুঁথিপাঠের আসর বসতো। সুর করে করে পাঠক পড়তেন ‘আল্লাহর নাম স্মরণ করি কাগজ-কলম হাতে ধরি লেখি কিছু ভাবিয়া খোদায় …’।

তবে হিন্দু দেব-দেবীদের কেচ্ছা-কাহিনীনির্ভর রূপকথাই লোককাহিনীর অন্তরালে পুঁথিতে বাঁধা পড়েছে বেশি। অবশ্য এর কারণও আছে। কারণ জানতে কিছুটা গোড়ার দিকে যাওয়া যাক। ত্রয়োদশ শতক এবং তৎপরবর্তী বাংলায় মুসলিম শাসকদের আগমন হয়েছে মূলত আফগান, পারস্য, তুর্কিস্তান বা এতদঞ্চল থেকে। দিল্লির সিংহাসনের শাসকরাও এসেছেন এসব অঞ্চল থেকেই। বস্তুত তাদের ভাষা ছিলো ফার্সি নয়তো আরবি। সে ভাষাতেই তারা প্রশাসনিক, দাপ্তরিক কার্যক্রম চালাতেন। ফলে বাংলাভাষার দিকে মুসলিম শাসকদের সেভাবে নজর দেয়া হয়ে ওঠেনি কোনোকালেই। তবে কোনো কোনো শাসক যদিও পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছেন কিন্তু পরবর্তী শাসকরা তা ধরে রাখার প্রয়োজন বোধ করেননি। যেমন আলাউদ্দীন হোসেন শাহ নিজের দরবারে অনেক বাঙালি কবিদের স্থান করে দিয়েছিলেন।

এই প্রয়োজন বোধ না করার কারণেই বাংলা ভাষাটা দাপ্তরিকভাবে সুলতানী আমলে খুব বেশি কদর পায়নি। ফলে তৎকালীন মুসলমানদের কাছেও এর প্রয়োজনীয়তা কথ্য হয়েই থেকেছে লেখ্য আর হয়ে ওঠেনি। বিশেষ করে ভিনদেশি মুসলমানদের বেলায়। অপরদিকে হিন্দুরা ছিলো সংস্কৃত ভাষার সেবাদাস। কেননা সংস্কৃত তাদের ধর্মগ্রন্থের ভাষা। তাদেরকে এটা শিখতেই হয়। এটা শেখার ফলে বাংলা লেখাপড়াটা তাদের আয়ত্তেই থাকতো। বাংলায় লেখালেখির বিষয়টাও স্বাভাবিকভাবে তাদের দ্বারাই বেশি সংরক্ষণ হয়েছে মুসলমানদের তুলনায়। এ কারণেই বাংলাসাহিত্যে তৈরি হয়েছে দেব-দেবীদের নিয়ে নানা কল্পকাহিনী, অনেক মহাভারত।

আরেকটি কারণও ছিলো। তখনকার মুসলমানরা মনে করতো হিন্দুদের ধর্মগ্রন্থের ভাষা যেহেতু সংস্কৃত তাই এটি তাদের ভাষা। আর বাংলা যেহেতু এ ভাষা থেকেই উদ্ভব সুতরাং এ ভাষা শিক্ষা করা মুসলমানদের উচিত নয়। কিন্তু ভাষা কি আল্লাহ কারো জন্য নির্ধারিত করে দিয়েছেন যে, অমুক জাতি অমুক ভাষায় কথা বলবে, তমুক জাতি বলবে তমুক ভাষায়? বিষয়টি মোটেও এমন নয়। ভাষা আল্লাহ তায়ালার বিশেষ রহমত। এ রহমতকে হেলাভরে তাচ্ছিল্য করা কোনো কাজের কথা নয়। পৃথিবীর সব জনপদে সকল ভাষায় আল্লাহ নবী পাঠিয়েছেন। সংস্কৃত ভাষায়ও যে কোনো নবী আসেনি এর নিশ্চয়তা আপনি কীভাবে দেবেন? হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী পৃথিবীর সকল জনপদে সবভাষাতেই নবী এসেছিলেন। সেমতে কোনো না কোনো নবী এতদঞ্চলেও এসেছিলেন এবং হাদিসের ভাষ্য সত্য জানলে তিনি সংস্কৃত ভাষায়ই কথা বলেছেন। সুতরাং নবী যদি সংস্কৃত কিংবা বাংলাভাষায় কথা বলতে পারেন তাহলে আমাদের বলতে তো কোনো বাধা থাকতে পারে না। আমরা তো আর নবীর চেয়ে বড় পরহেযগার হইনি।

অনেকে ব্যঙ্গ করে বলতে পারেন নিজ দেশে যখন ইসলামের নাম-নিশানা মুছে ফেলার জন্য সেক্যুলারচক্র খড়গহস্ত; সরকার যখন নারীনীতির কাঁধে বন্দুক রেখে ইসলামের বুক বরাবর তাক করে রেখেছে তখন এসব পশ্চাতে হারিয়ে যাওয়া বিষয়-আশয় নিয়ে বাতচিত করাটা নিতান্তই অবিবেচনাপ্রসূত কাজ। আসলে দেব-দেবী আর সংস্কৃত-সংস্কৃতি নিয়ে এতো কথা বলার তাড়নাটি অনেক আশার ভেতর দিয়ে বড় হয়েছে।

আজকের বাংলাদেশের আলেমরা বাংলাভাষায় কথা বলা শিখছে, লেখালেখির হাতেখড়ি নিয়ে নাড়াচাড়া করছে। আশার খবর। কিন্তু কীভাবে শিখছি আমরা? কী শিখছি? গভীরে নেমে কখনো শেকড় খোঁজার চেষ্টা করেছি? অথচ শেকড়ের খোঁজ জানতে হয়, শেকড়ের যতœ নিতে হয়। তাহলেই কেবল বৃক্ষ ছায়াসুনিবিড় পাতাঘন হয়।

ঝড় কাকে উপড়ে ফেলে? প্রবল প্লাবন কাকে ভাসিয়ে নেয়? যার শেকড় গভীরে প্রোত্থিত নয় ঝড় তাকেই উপড়ে ফেলে। ভিত্তি যার মজবুত নয় প্লাবন তাকেই খড়কুটোর মতো ভাসিয়ে নিয়ে যায়। আমাদের চারদিকে প্রবল ঝড়ের প্রতাপ গর্জন করছে। কুরুচির সাহিত্য-সংস্কৃতির প্লাবনে ভেসে যাচ্ছে দেশ-জাতি-বিশ্ব। এমন ঝড়-প্লাবনে সীনাটান করে রুখে দাঁড়াতে হলে শেকড়ের ঠিকানা জানতে হবে। মজবুত পাটাতনে দাঁড়িয়ে যুদ্ধের ভিত গাড়তে হবে। বাংলাভাষায় লিখতে হলে বাংলার শেকড়কে জানতে হবে। অল্পকিছু শব্দ আর ব্যাকরণের প্রথাগত কায়দা-কানুন দিয়ে যুদ্ধজয়ের আশা করা বাতুলতা। এ জ্ঞান দিয়ে হয়তো কিছু সস্তা বাজারি নাম-যশ কেনা যায়, সাহিত্যের অমরত্ব আশা করা যায় না। তরবারীর প্রতিপক্ষ তরবারী দিয়েই দ্বন্দ্বে লড়ে, সুঁই দিয়ে নয়।

তাই বলে আমি বলছি না যে লুপ্ত হওয়া পুঁথিসাহিত্যের নিপুণ সমঝদার হওয়াটা একান্ত আবশ্যক। পুঁথিসাহিত্য আপনাকে একটি জাতির ইতিহাসের সন্ধান দেবে ঠিকই কিন্তু সেখান থেকে নিজের রসদ নিজেকেই জোগাড় করে নিতে হবে। আমরা কি জানি বাংলাভাষায় এপর্যন্ত কতোগুলো সীরাতগ্রন্থ রচিত হয়েছে? বিশিষ্ট গবেষক নাসির হেলাল তার ‘বাংলা ভাষায় সীরাত বিষয়ক গ্রন্থপঞ্জি’ বইটিতে ১০২৮টি সীরাতগ্রন্থের সন্ধান দিয়েছেন। আমরা হয়তো উর্দু-আরবির কয়েকটি সীরাতগ্রন্থের কথাই কেবল শুনেছি, বাংলাভাষায় এতো বিশাল সীরাতরচনা হয়েছে তা কি আমরা কখনো জানতে পেরেছি? এমন আরো অনেক স্বয়ম্ভর অবদান রয়েছে বাংলা ভাষায় মুসলমানদের। পরিতাপের বিষয়, আমরা সেগুলো উদ্ধারে কখনো ত্বরিত তৎপরতা দেখাতে আগ্রহ বোধ করিনি।

তাহলে এই বিশাল সম্ভারের পুনরুত্থান কে করবে? আপনাকেই করতে হবে। এ গুরুভার নিজের কাঁধেই তুলে নিতে হবে। যদি সাহিত্য দিয়ে, কলমের মাধ্যমে জাতিকে জাগিয়ে তোলাটাকে জিহাদ মনে করেন তবে নিজেকেই এগিয়ে যেতে হবে। সম্মুখসমরে আপনিই হবেন জাতির দামামা বাজাবার শিরউঁচু করা মুসলমান।

সা লা হ উ দ্দী ন জা হা ঙ্গী র

Share

ফতোয়াই আমাদের ধর্ম

মুহাম্মদ যাইনুল আবিদীন

বাঘ যদি তার থাবা ভুলে যা, বাঘ যদি তার গর্জন ভুলে যায় এবং মাংস ছেড়ে হরিণের মতো কোমল সুবাসিত ঘাস খেতে শুরু করেÑ তাহলে কি তার রাজ-সম্মান অটুট থাকবে? সম্মান কেন ঘাসে ভাগ বসানোর অপরাধে ষাড়ের গুতো খেয়ে বন ছাড়তে হবে। সভ্য ও ভদ্র-মানুষির মন্ত্র পড়িয়ে চুতর বুদ্ধিজীবীরা আমাদেরও চায় আমাদের গৌরবের আসনছাড়া করতে। শান্তি ও উদারতার বাণী শুনিয়ে চায় প্রতিবাদেরÑঅন্যায়কে রুখে দাঁড়াবার মানবতার শাশ্বত পথকে বন্ধ করে দিতে। আমরা মুসলমানরা যদি এতটাই বোকা হতাম, তাহলে এই দেড় হাজার বছরের পথ হাঁটলাম কি করে!

শুধু যে হেঁটেছি তা নয়! মনজিলও ভুলিনি আমরা। যদি কখনো অলস হয়েছি, ধূর্ত প্রতারকদের ধাঁধায় পড়েছি কিংবা বেঈমানদের লাফ-ঝাপ দেখে থমকে দাঁড়িেেয়ছিÑ আমাদের অভিভাবক আলেমগণ তখনই নড়ে ওঠেছেন। জাগিয়ে দিয়েছেন, প্রতারকদের কথার কথাগুলো ফাঁস করে দিয়েছেন। বেঈমানদের চোখ  বরাবর তর্জনি তুলে বলেছেনÑ এরা বেঈমান! এদের ভেতরে বাতাস ছাড়া কিছুই নেই। সময়ের পেঠে উচ্চারিত তাদের এই বাণী সংকেত হুশিয়ারিই ফতোয়া। এই ফতোয়াই আমাদের পথ চলার শ্রেষ্ঠ পাথেয়। আমাদের অবিকৃত ধর্মÑবিশ্বাসের প্রধান সহায়িকা এই ফতোয়া।

ফতোয়া যুগ যুগ ধরে আমাদের স্বাতন্ত্রতা কিভাবে বাঁচিয়ে রেখেছে তার একটি ক্ষুদ্র উপমা দেই। আমাদের ধর্মগ্রন্থ পাক কুরআন। আমাদের চিন্তা আদর্শ স্বপ্ন বিশ্বাসের মূল শেকড় এই মহাগ্রন্থ। ইসলামের শিক্ষা দাওয়াত ও বাণী এই কুরআন। তাই এই কুরআনকে ছড়িয়ে দেয়া আমাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ টার্গেট। এই টার্গেট অর্জনে আমাদের সংগ্রাম ইসলামের প্রথম কাল থেকে আজ পর্যন্ত সমানভাবে চলছে। মুসলমানগণ এই দেড় হাজার বছরের ইতিহাস যখন যেখানেই গেছেন সঙ্গে বয়ে নিয়ে গেছেন আল কুরআন। ছড়িয়ে দিয়েছেন কুরআনের অপূর্ব পদ্য-ভিাব।

আমরা সকলেই জানি পবিত্র কুরআনের ভাষা  আরবি। এও জানি, ঐশী-আশীর্বাদপুষ্ট এই ভাষার উচ্চারণও জলের মতো সহজ নয়। অথচ এর বাণী ও শিক্ষার আলো ছাড়া মুক্তির কোনো পথ নেই।  তাই স্বাভাবিকভাবেই দাবী ওঠতে পারে- কুরআন কি আরবি ভাষায়ই পড়তে হবে? তাছাড়া মূলকথাগুলো যদি প্রতিটি জনপদের ভাষায় রূপান্তরিত করে ছড়িয়ে দেয়া হয় তাহলে কি দীনের বাণী উপলব্ধি করা সহজ হবে না? অতীতে এমন কথা উঠেছেও।

এই দাবীর পিঠে আমাদের পূর্বসুরী আলেমগণ যে ফতোয়া দিয়েছিলেন এবং যে ফতোয়া শত শত বছর ধরে এই উম্মত আত্মার সিন্ধুকে লাল করে এসেছে তাহলো-

এক. আরবি ব্যতীত অন্য কোনো ভাষার বর্ণমালায় কুরআনের মূল্য টেক্সট লেখা যাবে না। যাকে আমরা বাঙলা উচ্চারণ বলে থাখি।

দুই. কুরআনে কারীমের যে লিখিনপদ্ধতি হযরত উসমান রা. এর কাল থেকে চালু আছে তারমধ্যে কোনো একটি হরফেরও হেরফের করা যাবে না।

তিন. উসমান রা. এর কাল থেকে চলে আসা কপির বিন্যাসে কোনো শব্দ আয়াত কিংবা সূরাÑ কোনো ক্ষেত্রেই আরোপ করা যাবে না।

চার. মূল আরবি টেক্সট ব্যতীত শুধু তরজমা ছাপা যাবে না।

পাঁচ. যদি কেউ শুধু তরজমা ছাপে তাহলে তা বেচা যাবে না এবং কেনা যাবে।

ছয়. তরজমা প্রকাশে সহযোগিতা হয় এমন কোনো ক্ষেত্রে অংশগ্রহণ করা যাবে নাÑ যেমন তার বিজ্ঞাপন প্রচার, একথায় আমাদের ফতোয়ার চোখে এসবই হারামÑজঘন্য অপরাধ।

মুসলমানগণ যুগ যুগ ধরে এই ফতোয়া মেনে এসেছেন। মোটাদাগের এর যে উপকারটা হয়েছে তাহলোÑপৃথিবীর যেখানেই কুরআন শরীফ গিয়েছে সেখানে কুরআন শরীফই গিয়েছে। শুধু আরবি ভাষার কুরআন শরীফ নয়Ñ বর্ণবিন্দু ও লিপিকাভঙ্গিসহ বিস্ময়কর অভিন্নরূপের কুরআন শরীফ। উচ্চারণের তাল লয় মাত্রাসহ পৌঁছেছে। ফলে পৃথিবীর সর্বত্র এখন কুরআন পঠিত হয় একই কণ্ঠেÑ শিল্পের একই মুদ্রায়। ধর্মগ্রন্থের ইতিহাসে এ এক মহাবিষ্ময়।

পৃথিবীর পূর্ব-পশ্চিম যেখানেই মুসলমান আছে সেখানেই এই অভিন্ন-কণ্ঠে উচারিত কুরআন পাঠের মুগ্ধকর আসর। নামাযে সকাল-সন্ধ্যায় এবং রমযান মাসের পাক প্রহরে জগৎজুড়ে বসে এই অলৌকিক গ্রন্থের অপরূপ জলসা। তাজবীদ নামক অভিনব পাঠবিধি কী যে বিস্ময়কর ছাঁচে ঢেলে গড়েছে এর পাঠ পদ্ধতিÑ তা ভাষায় প্রকাশ করা  সম্ভব নয়। ফলে হয়েছে কিÑ জগতের যে কোনো প্রান্তে যখন কোনো মুসলমান অপর মুসলমানের মুখোমুখি হয়Ñ ভাষা তার যাই হোকÑ নামাযের সময় হতেই তারা চিরচেনা এক অলৌকিক ভাষার মোহনায় এসে মিলিত হয়। একই ভাষায় একই নিয়মে একই মিনতি নিয়ে দাঁড়ায় পাশাপাশি। যেনো কতো কালের চেনা! বিনে সুতোর এই বন্ধনকে মাপতে পারি সেই সাধ্য কোথায় পাব।

কোথাও পড়েছিÑএক বুড়ো বাংলাদেশি গিয়েছিল হজ করতে। ফিরে আসার পর যখন জিজ্ঞেস করা হলোÑ কেমন কাটল সময়? বলল : যে আর বলো না। হাঁটাচলা নাওয়াÑখাওয়া সব আরবিতে। শুধু আযান আর নামাযটা বাঙলায় হয়েছে বলে ঈমান রক্ষা। গর্ব করে বলতে পারিÑএই যে আযান নামায বাঙলা হয়ে গেলÑএকি আরবি ভাষার কুরআনের বরকতে নয়। সাথে এও সত্যÑ কুরআনের এই স্বরূপে বিস্তারের মূলে রয়েছে আলেমগণের ফতোয়া।

পৃথিবীর প্রচলিত ধর্মগুলোর সাথে ইসলামের তুলনামূলক পার্থক্য ও ইসলামের অনন্য-স্বতন্ত্র বৈশিষ্টগুলোর কথা যারা জানেন তাদের কথা হলোÑইসলামের জীবন্ত সব বৈশিষ্ট্যের কথা যদি বাদ দিই তাহেল এই একটিমাত্র বৈশিষ্ট্যকে উজিয়ে পৃথিবীর কোনো ধর্ম কোনোদিন ইসলামের পাশে  এসে দাঁড়াতে পারবে না। আর তাহলো কুরআন। এর বাইরে সম্ভব ইহুদিÑখ্রিস্টানরাই কেবল ধর্মগ্রন্থ নিয়ে আড়ালে-আবডালে সামান্য চেঁচামেচি করে। কিন্তু তারা কি পৃথিবীর সামনে বলতে পারবে তাদের নবীর প্রতি কোন ভাষায় কোন শব্দে অবর্তীণ হয়েছিল এই গ্রন্থ। দেখাতে পারবে তারা কোনো নমুনা? যা আছে, বাজারে, এনজিওর খামারে মূর্খ নারীদের মাঝে বিতরণ করা হয় তাতো অনুবাদ। তাও যুগে যুগে  কৃত অনুবাদসমূহের মাঝে পার্থক্য বিস্তর। সেই পার্থক্য কোথাও কোথাও তৈরি করেছে বৈপরীত্ব। সেই বৈপরীত্বগুলো তুলে ধরে মাওলানা রহমতুল্লাহ কেরানবী রহ. যখন চ্যালেঞ্জ করেছেন ইংরেজ ধর্মগুরুরা তখন পালিয়ে গেছে। এই ইতিহাস পুরনো।

এর বিপরীতে পৃথিবীর একপ্রান্ত থেকে অপরপ্রান্ত পর্যন্ত চষে আসুন। দেড়শ’ কোটি মুসলমানের ভাষা শুমার করা হলে দাঁড়াবে এক দুরূহ বিষয়। কিন্তু সকলের ধর্মগ্রন্থের ভাষা এক। আরবি! ফলে ইসলাম ধর্মের মূল ও কেন্দ্রীয় শিক্ষা ও বিশ্বাসে গলদ সৃষ্টি করা এক দুঃসাধ্য বিষয়। হোক তার বাড়ি আফ্রিকার ক্ষুধাকাতর নিরন্ন অঞ্চলে। ধর্মের প্রশ্নে সে ধনী। সে বুক উচিয়ে বলতে পারেÑআমি যে কুরআন পাঠ করছি এটা সরাসরি আল্লাহর কালাম। আমার নবী এই কালামই তেলাওয়াত করতেন। আফ্রিকার জঙ্গলে দাঁড়িয়ে আমি যে ভাষায় যে নিয়মে যে মর্মে তেলাওয়াত করছি ঠিক সেই নিয়মে সেই ভাব ও আবেদনে সেই ভাষায়ই সবার সামনে পঠিত হচ্ছে এই কুরআন। পৃথিবীময় পারমানবিক বোমা হাতে দাবড়ে বেড়াচ্ছে যে খ্রিস্টানগোষ্ঠী বুক টান করে এমন একটা কথা কি বলতে পারবে তারা?

এক কথায়Ñ কুরআনের এক অভিন্ন ভাষার ধর্ম আজ আমাদের শ্রেষ্ঠ অর্জন। কুরআন যদি বাঙলা উচ্চারণে লেখা হয় কিংবা শুধু অনুবাদটা বাঙলা ইংরেজিতে ছাপা হয়Ñ তাহলে অনেকেই পড়তে পারতো; আরো অনেকেই বুঝতে পারত। এই যে মিনতিÑ যদি এই মিনতি রাখতেন আমাদের অতীতকালের আলেমগণ তাহলে সহজতার স্রোতে করে হারিয়ে যেত কুরআনের প্রকৃতরূপ। তারাবীহ তো পরের কথাÑ সাধারণ ফরজ নামাযেই হয়তো একজনে কুরআন পড়তো নোয়াখালীর উচ্চারণে অন্যজন পড়তো বরিশালের উচ্চারণে। আর চট্টগ্রামের উচ্চারণে পঠিত কুরআন বুঝবার সাধ্য কি পৃথিবীর কারো হতো? শত বিভক্তির মাঝেও যে আজ নামাযের পথ ধরে বিশ্বমুসলিম দিনে পাঁচবার এককণ্ঠে একসুরে এক ভঙিতে ঐক্যের উপমা রচনা করে যাচ্ছেÑ ধুলোয় মিশে যেত এই অসামান্য অর্জন; গর্বের ধন। এই ধন জিইয়ে রেখেছে আমাদের ফতোয়া। এই ফতোয়ই আমাদের ধর্ম। আর ধর্ম রক্ষায় আমরা কতো সাগর রক্ত দিয়েছি তাতো বেদীনরাও জানে।

ঢাকা ২০.৩.২০১০ইং

Share

নারী নীতিতে ইসলাম বিরোধী ভাবধারা : বিরোধ নিরসনে সততা ও সচ্ছতার বিকল্প নেই

ওবায়দুর রহমান খান নদভী

বিষয়টি অনেক পুরনো এবং বিতর্কটি যথেষ্ট জটিল হলেও জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি ২০১১-এর উত্তরাধিকার সম্পদে নারী-পুরুষ সমান অধিকার প্রসঙ্গ নিয়েই প্রধাণত বর্তমান বিতর্ক। সরকার পক্ষ বলছে, নারী উন্নয়ন নীতিতে উত্তরাধিকার সম্পদে নারী-পুরুষ সমান অধিকারের কথা বলা হয়নি। ইসলামি আইনবিদ, ওলামা-মাশায়েখ তথা মুসলিম নাগরিকদের ধর্মীয় অভিভাবকগণ বলেছেন, নারী উন্নয়ন নীতির ১৬.১, ১৬.৮, ১৬.১১, ১৬.১২, ১৭.১ ধারাসমূহে সকল ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ সমান অধিকার বৈষম্য দূরিকরণ, বিশেষ করে অর্থ সামাজিক ও পারিবারিক ক্ষেত্রে সমঅধিকার প্রদানের যে বক্তব্য রয়েছে, উত্তরাধিকার সক্রান্ত বিধান যে এর বাইরে থাকবে এর নিশ্চয়তা কোথায়? সুতরাং প্রচ্ছন্নভাবে এ কথা অবশ্যই বলা হয়েছে যে, আইন তৈরির সময় সব ধরনের বৈষম্যই দূর করা হবে এবং সকল ক্ষেত্রে সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা করা হবে। এ সম্ভাবনা আরো প্রকট ও সুস্পষ্ট হয়ে গেছে ১৭.৩, ১৭.৪, ১৭.৫, ধারাসমূহ থেকে। পাশাপাশি দেশের আলেম সমাজ, মুফতি ইসলামি আইনবিদদের বক্তৃতা ও বিবৃতিতে দেখা যাচ্ছে যে, তারা বলছেনÑ নারী উন্নয়ন নীতি ২৩.৫ ধারা সম্পদ, কর্মসংস্থান, বাজার ও ব্যবসায়িক নারীকে সমান সুযোগ ও অংশিদারিত্ব দেয়া। অংশে সম্পদ বলতে নারীর উত্তরাধিকার সম্পদও অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সুযোগ থেকে যায় এবং এ ক্ষেত্রেও ২৫.২ ধারায় বর্ণিত উপার্জন উত্তরাধিকার, ঋণ, ভূমি, এবং বাজার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অর্জিত সম্পদের ক্ষেত্রে নারীর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রদান করা প্রযোজ্য হতে পারে। সুতরাং এ দুটি ধারা মিলিত অর্থ ও ফলাফল ভবিষ্যতে কোন দিকে গড়াবে এ নিয়েও তারা উদ্বিগ্ন। তা ছাড়া মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত মূল নীতিমালায় তো উত্তরাধিকার সম্পদও অন্তর্ভুক্ত ছিল। পরে আলেমদের প্রতিবাদে তা মন্ত্রনালয়ের কর্মকর্তারা বদলে ফেলে নারী নীতির বর্তমান রূপ দেন। এতে জনগণ বিভ্রান্তির শিকার হন এবং প্রতিবাদকারীগণ বেকায়দায় পড়ে যান। মন্ত্রিদের কেউ কেউ বলেনÑ কই, নারী নীতি তো ইসলাম বিরোধী কিছুই নেই। এ ধরনের বাল্যসূলভ আচরণে জনমনে অবিশ্বাস ও সন্দেহ আরো দানা বাঁধে। প্রতিবাদ ও আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে আইনমন্ত্রি, আইন প্রতিমন্ত্রি ও মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রির বক্তব্যের জবাবে বলা হয়েছে ২৩.৫ এবং ২৫.২ ধারা দু’টির মিলিত ব্যাখ্যা এক সময় উত্তরাধিকারে নারী-পুরুষের সমান অধিকার দাবীর প্রেক্ষাপট তৈরি করবে এবং এ সংক্রান্ত আইন প্রণয়নের দাবী জোড়দার হবে। সুতরাং স্পষ্ট সিদ্ধান্ত ও সরকারের অবস্থান পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত নারী নীতি গ্রহণযোগ্য নয়। সবচেয়ে মারাত্বক যে বিষয়টি আলেম সমাজ ও মুসলিম জনগণকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে, সেটি হচ্ছে, নতুন নারী নীতির ১৭.২ ধারা। এতে বলা হয়েছে, নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলুপ সনদ (সিডো)-এর প্রচার ও বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় প্রদক্ষেপ গ্রহণ করা। এখানো সিডো বাস্তবায়নের যে নীতি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, এটাকে আলেম সমাজ কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক তথা ইসলাম বিরোধী রীতি-নীতির বাস্তবায়নের চাবিকাঠী বলে আখ্যায়িত করেছেন । কেননা ১৯৭৯ সালে জাতীয় সংঘে গৃহিত এই সনদটির লক্ষ ছিল রাষ্ট্র, অর্থনীতি, পরিবার সমাজ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য দূরিকরণ। নারীর জন্য আন্তর্জাতিক বিল অব রাইট্স বলে চিহ্নিত এ দলিল নারী অধিকার সংরক্ষণের একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ মানদন্ড বলে বিবেচিত। সিডো বাস্তবায়নের জন্য দেশে সংবিধান আইন ও রাষ্ট্রীয় নীতি পর্যন্ত বদল হতে পারে।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকার, জোট সরকার ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় নারী নীতি বিষয়ে যে বিতর্ক-এর মূল কেন্দ্রই ছিল এই সিডো সনদ। আলেম সমাজ এটাই বলে এসেছেন যে, ধর্মীয় ক্ষেত্রে অবধারিত যে সুষম ব্যবস্থা এর তাৎপর্য ও শ্রেষ্ঠত্ব বিবেচনা না করে সব ক্ষেত্রে সমঅধিকারের নামে যেনো ইসলাম বিরোধী আইন তৈরি না হয়। বিগত সময়ের প্রতিবাদ ও বিতর্ক নারী নীতির ভাষাগত বিবর্তন, কৌশলী শব্দ প্রয়োগ বা বাক্য বিন্যাসের চেয়ে সিডো সনদ নিয়েই ছিল বেশি। কোনোরূপ পরিমার্জন বা শর্ত ছাড়া হুবহু সিডো সনদের আগে কোনো প্রস্তাবিত নারী নীতিতেও গৃহিত হয়নি। বর্তমান নারী নীতিতে সেই সিডো সনদ হুবহু গৃহিত হওয়ায় আলেম সমাজ, মুফতি, ইসলামি আইনবিদ ও সাধারণ মুসলিম জনতা চরম বিস্মত। পাশাপাশি তারা আরো হতাশ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে কারচুপিমূলক ঘষামাজা ও সরকারের দায়িত্বশীলদের বক্তব্য ও বিবৃতি দেখে। যেখানে তারা বলতে চাচ্ছেন যে, নারী নীতিতে ইসলামের সাথে সংঘর্ষিক কিছু নেই। সিডো সনদের বাস্তবায়নে যে নীতি অঙ্গীকারাবদ্ধ, সেটাকে যদি আলেম সমাজ কুরআন ও ইসলামি বিধানের সাথে সাংঘর্ষিক একটি নিরব টাইম বোমা বলে আখ্যায়িত করে থাকেন, তাহলে কি এটা তাদের অত্যুক্তি হবে? সিডো সনদে কুরআন-সুন্নাহ বিরোধী ধারাগুলো অতীতের বিভিন্ন বিতর্ককালে বিজ্ঞ আলেম ও মুফতিগণ চিহ্নিত করেছেন। সরকারের রেকর্ডপত্রে সেগুলো রক্ষিত আছে। সিডোর যেসব ধারা উত্তরাধিকারে নারী-পুরুষ সমবণ্টন নীতি সাব্যস্ত করে, সেগুলো বাদ দিয়ে সিডো বাস্তবায়নের প্রস্তাব নতুন কিছু নয়। তাহলে হুবহু সিডো বাস্তবায়নের এ সিদ্ধান্ত নতুন নারী নীতিতে গ্রহণ করে সরকার কীভাবে বিতর্ক এড়াতে চান, সেটাই আজকের জিজ্ঞাসা।

এক পর্যায়ে মুসলিম জনগণ ও আলেম সমাজকে নির্বোধ না ভেবে সরকারকে সততা ও সচ্ছতার সাথে বিতর্ক অবসানের পথে এগুতে হবে। নারী উন্নয়ন নীতি মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর যখন মহিলা ও শিশু প্রতি মন্ত্রি ড.শিরীন শারমিন চৌধুরী বললেন, ‘জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি ২০১১ অনুমোদন করেছে মন্ত্রিসভা। এটি কার্যকর করার জন্য কোনো আইন করা হবে না। নতুন নীতিতে উত্তরাধিকারসহ উপার্জন ও বাজার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অর্জিত সম্পদে নারীকে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ অধিকার দেয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে উত্তরাধিকার সম্পদে নারীর সমঅধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। (কালের কণ্ঠ ঢাকা মঙ্গলবার ৮ই মার্চ ২০১১)। তখন পর্যন্ত নারী নীতির খসরার কপি মন্ত্রিসভার বাইরের কেউ পায়নি। ওয়েব সাইটেও ছাড়া হয়নি। মূলকপির আলোকেই সম্ভবত কালের কণ্ঠকে মাননীয় প্রতিমন্ত্রি নারী নীতি সম্পর্কে এসব কথা বলেন। ধরা যায়, মূলত এ নিউজটি থেকেই ধর্মপ্রাণ মুসলিম নাগরিক এবং তাদের ধর্মীয় অভিভাবক শ্রেণী নারী নীতিতে নারী-পুরুষ সমঅধিকারের ধরনটি জানতে পারেন। প্রতিবাদ, নিন্দা, বিক্ষোভ বা আন্দোলন যাই বলি, সব শুরু হয় ড.শিরীন শারমিনের এই বক্তব্যের ফলেই। প্রতিমন্ত্রির বরাত দিয়ে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষা ও ভাষ্যে যে কথাটি পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। তিনি এর কোন প্রতিবাদ করেছেন বলেও শোনা যায়নি। জন সাধারণের জানাটা শুদ্ধ ও প্রামাণ্য হওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনালয়ে প্রতিমন্ত্রির এ বক্তব্য কি যথেষ্ট ছিল না? পরিবার সমাজ ও সভ্যতার স্বাভাবিক কাঠামোর সুরক্ষায় সচেষ্ট ও ধর্মীয় বিধান প্রতিপালনে আগ্রহী মানুষ আরো উদ্বিগ্ন হন মিডিয়ায় প্রচারিত এতো সংশ্লিষ্ট আরো কিছু লেখা ও উক্তি লক্ষ করে। যেখানো দায়িত্বশীল অনেকের মুখ থেকেই ধর্মবিরোধী কিছু মন্তব্য ও উক্তি প্রকাশিত হয়। যা নির্মমভাবে বাংলাদেশের ধর্মবিশ্বাসী মানুষের অনুভূতিকে আহত করে। নারী নীতির খসরাকে ভর করে একটি মহল যে আরো অনেক দূর এগুবার স্বপ্ন দেখেন, তারা যে সীমালঙ্ঘনের পাঁয়তারা করেছেন, তা আন্দাজ করতে পেরেই মানুষ ক্ষুব্ধ ও চিন্তিত হয়ে পড়ে। দেশে নারী সংক্রান্ত যেসব আইন ও নীতি আছে, তা অপ্রতুল ছিল বলেই সরকার নতুন নীতি প্রণয়ন করেছে, এখন সেই নীতির আলোকে সংশ্লিষ্ট আইনেও পরিবর্তন আনতে হবে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কারিগরী শিক্ষা, উপার্জনের সুযোগ, উত্তরাধিকার সম্পদ, ঋণ প্রযুক্তি ও বাজার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অর্জিত সম্পদসহ ভূমির উপর অধিকার ইত্যাদি ক্ষেত্রে নারীর পূর্ণ ও সমান সুযোগ। তবে আমরা মনে করি, নারীর সমঅধিকার প্রতিষ্ঠায় ভালো নীতি গ্রহণই যথেষ্ট নয়। নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক যতো আইন আছে, সেই নীতির আলোকে তা পরিবর্তন করতে হবে।

(সম্পাদকীয়র অংশ বিশেষ প্রথম আলো। ঢাকা, ৯ই মার্চ ২০১১)।

নারী নীতি থেকে উদ্বৃত, এর নীতিগুলোর মর্মার্থ তুলে ধরা এ নিবন্ধনে প্রণয়নের যে প্রেরণার বিষয়টি উঠে এসেছে, এটি নারী নীতির স্বার্থকতার জন্য খুবই জরুরি। কিন্তু ধর্মপ্রাণ মুসলমান যদি এখানে উত্তরাধিকার সম্পদেও নারী-পুরুষ সমান বণ্টনের যুক্তি বিরোধী এবং পবিত্র কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক আইন জারীর আশঙ্কা করে, তাহলে বিষয়টি কি অমূলক হবে? নারী নেত্রী সালমা খান নারী নীতির প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘নীতিমালাটি আইনে পরিণত করা দরকার। কারণ, স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে নারী যখন আদালতে যাবে, তখন নীতিমালা গুরুত্ব পাবে না। পরবর্তী আইন কি বলে, তাই গুরুত্ব পাবে’। এখানে স্বাভাবিকভাবেই নীতি বাস্তবায়নের জন্য আইনের পরিবর্তন, নতুন আইন প্রণয়ন বা গোটা নীতিমালাটিকেই আইনে পরিণত করার কথা উঠবে। তাহলে সরকারী তরফ থেকে ‘এটি কোনো আইনই নয়’ মর্মে যা বলা হচ্ছে, তার উপর ধর্মপ্রাণ মানুষ কতটুকু ভরসা রাখতে পারবেন, সেটা সরকারকে ভেবে দেখতে হবে। ১০ই মার্চ জাতীয় প্রেসক্লাবের এক অনুষ্ঠানে আইন মন্ত্রি ব্যারিষ্টার শফিক আহমাদ বলেছেন, ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাততে আসে এমন কোনো বিষয় নারী উন্নয়ন নীতিতে নেই। সংবিধান অনুসরণ করেই নীতিটি করা হয়েছে। কিন্তু একটি মহল বিনা কারণে রাজনৈতিক ইসু সৃষ্টির জন্য এই নীতির বিরোধীতা করছে। আমাদের সংবিধানে সমান অধিকার সংক্রান্ত যে কটি ধারা রয়েছে, এর মধ্যে ২৮ (২) অনুচ্ছেদে বর্ণিত ‘রাষ্ট্র ও সমাজ জীবনের সর্বস্তরে নারী-পুরুষের সমান অধিকার লাভ করিবেন।’ কথাটিই অধিক স্পষ্ট। এর আলোকে যারা সকল ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমান অধিকর প্রতিষ্ঠা করতে চান, তারা কি নারী-পুরুষের মধ্যকার জৈবিক পার্থক্যও প্রকৃতিগত ব্যবধানের বিষয়টি বোঝেন না? নাগরিকদের ধর্মীয় অধিকার রক্ষাও তো সংবিধানে স্বীকৃত। অতএব নির্বিচারে সকল ক্ষেত্রে বৈষম্য দূর করার প্রবক্তারা সংবিধানের ধারাসমূহের ওজন আওতা ও ভারসাম্য সম্পর্কে আরো ভালোভাবে জেনে নিলেই সম্ভবত তারা স্বাভাবিক চিন্তায় ফিরে আসবেন। সংবিধান রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বস্তরের নারীকেই সমান অধিকার দিয়েছে, জৈব, প্রাকৃতিক, ধর্মীয় ও ফলিত সামাজিক জীবনে দিতে পারেনি। তা রাষ্ট্র বা সংবিধান পারেও না। এ পথ সকল প্রতিপক্ষের জন্যই অগম্য। সুতরাং সংবিধানের আলোকে নারী নীতি হয়েছে, উত্তরাধিকার সংক্রান্ত কুরআনী আইন লঙ্ঘিত হয়নি। ধর্মীয় অনুভূতি আহত হওয়ার কোনো কারণ কেউ দেখতে পাচ্ছেন না। যারা ক্ষুব্ধ হচ্ছে, নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছে, তাদের উদ্দেশ্যে দায়িত্বশীলরা যাচ্ছে তাই মন্তব্য ছুড়ে দিচ্ছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রি, স্বরাষ্ট্রপ্রতিমন্ত্রি, পুলিশের আইজি একই ভাষায় প্রতিবাদকারীদের কর্মসূচী শক্ত হাতে দমনের কথা বলে চলেছেন। ফৌজদারী ভীতিতে তাদের সাথে আচরণ করবেন বলে আগাম জানিয়ে দিচ্ছেন। এ সবই কি সমস্যা নিরসনের পথ? ক্ষোভ ও আঘাতটি কোন জায়গায়, এটি প্রশমনে কি করা উচিত, এ সব নিয়ে ভাবার মত কেউ কি সরকারে নেই? পরিস্থিতি সৃষ্টিতে কি সংশ্লিষ্টদের কোনো ত্র“টি বা দায় নেই। সরকারের কর্মকান্ডে আস্থা বা ভরসা হারানোর মতো কিছুই কি ঘটেনি এখানে? ধর্মপ্রাণ মানুষ যদি সরকারের কোনো কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তির ম্যাকানিজমে বিচলিত বোধ করে থাকে, তাহলে কি তাদের এ বিব্রত ও অস্থিরতাবোধ পূর্ণতই অযৌক্তিক ও অমূলক প্রতীয়মান হবে? মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের ঠিক তিন দিন পরই নারী উন্নয়ন নীতিমালাকে ঘষামাজা করা হলো। উত্তরাধিকার আইনের (মিরাসী আইন) উপর হস্তক্ষেপ করার কারণে সারা দেশে প্রতিবাদের ঝর উঠায় নীতিমালায় সমঅধিকার শব্দের জায়গায় পূর্ণনিয়ন্ত্রণ শব্দ প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। মহিলা ও শিশু বিষয় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রির কক্ষে বসে এই শব্দ পরিবর্তন করা হয়েছে বলে মন্ত্রণালায়ের এক কর্মকর্তা সূত্রে জানা গেছে। মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রি ড.শিরীন শারমিন চৌধুরী গত বুধবার তাৎক্ষনিক সংবাদ সম্মেলনের দাবী করেন, মুসলিম সম্পত্তি আইনের সাথে বর্তমান নারী নীতির কোন বিরোধ নেই। বর্তমান নারী নীতিতে উত্তরাধিকার সম্পদে সমান অধিকারের কথা উল্লেখ নেই। অথচ গত ৭ই মার্চ এই নীতিমালা অনুমোদনের পর সরকারী সংবাদ সংস্থার (বাসস) খবরে বলা হয়েছে, ভূমিসহ সম্পদ, সম্পত্তি ও উত্তরাধিকারে নারীর সমান অধিকারের স্বীকৃতি দিয়ে নারী উন্নয়ন নীতি ২০১১ এর খসরা অনুমোদন করেছে মন্ত্রিসভা। মন্ত্রিসভার নীতিমালা অনুমোদনের পর তিন দিন এটি নিয়ে লুকোচুরী করা হয়েছে। অনুমোদিত নারী উন্নয়ন নীতিমালাকে গত তিন দিন আলোর মুখ দেখতে দেয়া হয়নি। মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তার সাথে গতকাল বিকালে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, শব্দগত ও বানান ভুল থাকার কারণে তা মন্ত্রির অফিস কক্ষেই সংশোধন করা হচ্ছে। ভুলগুলো সংশোধনের পর তার কপি সাংবাদিকদের দেয়া হবে। জানা যায়, গত ৭ই মার্চ মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত নীতিমালার নারী অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন সংক্রান্ত ২৫.২ নম্বর অনুচ্ছেদে বলাছিল, ভূমিসহ সম্পদ, সম্পত্তি এবং উত্তরাধিকারে নারীর সমান অধিকার থাকবে বলে ৮ মার্চ দেশে বিভিন্ন দৈনিকে প্রকাশিত হয়। আর পরবর্তী অংশে বলা হয়েছে, উপার্জন, উত্তরাধিকার, ঋণ, ভূমি এবং বাজার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অর্জিত সম্পদের ক্ষেত্রে নারীর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রদান করা। (নয়াদিগন্ত ১১ই মার্চ ২০১১ শুক্রবার )
সংবাদপত্রে প্রকাশিত এই প্রতিবেদনটি দেখেই বলুন, সরল স্বীকারোক্তি বা খোলামেলা ভুল সংশোধনের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ও উদারতার পথ পরিহার করে অন্য পথ কি শান্তির? সন্দেহ ও অবিশ্বাস দানা বেধে উঠার মতো বাতাবরণ তৈরি করে যারা সরকারের নৈতিক ভীতকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছেন। যারা জনগণকে বোকা ভাবছেন অথবা জনগণের সামনে আলেম সমাজকে ধূর বানানোর জন্য ঘষামাজা ও চাতুর্যের আশ্রয় নিচ্ছেন, তারা যে সরকারের কতো বড় ক্ষতি করছেন, তা কি তারা জানেন? আন্দোলনরত ধর্মীয় নেত্রীবৃন্দের দাবী অনুযায়ী নারী নীতি ২০১১ সংশোধনই ইতিবাচক চিন্তার পথ। কোন বিষয়ে লুকোচুরী, রাখ-ঢাক, গুড়গুড় বিরোধ নিরসনের উপায় হতে পারে না। যৌক্তিক কারণে সংক্ষুব্ধ নিরীহ নাগরিক ও ধর্মপ্রাণ মানুষকে দমন-পিড়নের ভয় প্রদর্শন শুভ ফল বয়ে আনে না। একটি অসত্ব, ভুল বা অপকৌশলকে ঢাকতে একের পর এক অন্যায় আচরণ মুক্তির পথ নয়। সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান ও ভূমিকায় স্বচ্ছতার পরিচয় দিতে হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রি গত ১০ মার্চ ২০১১ গণভবনে অনুষ্ঠিত মহাজোটের সংসদীয় দলে সভায় ঘোষণা করেছেন, ‘সরকার কুরআন-সুন্নাহ বিরোধী কোনো আইন করবে না।’ প্রদত্ত এই ঘোষণার আলোকে নারী নীতির বিষয়টি সুন্দর, ও শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য সমাধানে সংশ্লিষ্ট সকল মহল দ্রুত এগিয়ে আসবেন। এটাই ধর্মপ্রাণ কোটি মানুষের প্রত্যাশা।

Share