অশ্রু ও রক্তের আগুনে জ্বলছে জনপদ

মুহাম্মদ যাইনুল আবিদীন

: ঝন্টু তুমি বলো!

: আমি পাইলট হবো স্যার!
: পাইলট কেন?
: বিনে পয়সায় দেশ-বিদেশে ঘুরে বেড়াতে পারবো। আর কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায় ‘জগতটাকে দেখবো আমি আপন হাতের মুঠোয় ভরে।’ মজা হবে না স্যার!
: অবশ্যই অবশ্যই…
: এবার মিন্টু বলো!
: আমি উকিল হবো স্যার!
: কেন বলো তো!
: স্যার বড় কাকু বলেছেন, উকিল-মুক্তাররা নাকি প্রতিদিন বেতন পান তাই।
: অ আ”ছা!
: এবার সবুজ দাঁড়াও। বলো লেখাপড়া করে ভবিষ্যতে কী হতে চাও।
: স্যার আমি ডাক্তার হতে চাই।
: কিন্তু কেন?
: দুঃখী মানুষদের সেবা করবো। অসহায় মানুষদের দুঃখ মোচনের চেষ্টা করবো।
: সাবাশ বেটা সাবাশ। এই না আদর্শ ছাত্রের কথা। যে শিক্ষা জাতির মেরুদ- সে শিক্ষা গ্রহণ করেও যদি আমরণ জাতির কল্যাণের কথা না ভাবি, জাতির দুঃখ ঘুচাবার স্বপ্ন না দেখি তাহলে আমাদের এই শিক্ষা হবে অর্থহীন। অতঃপর ডাক্তার ও মানবসেবার মহিমা সম্পর্কে শিক্ষাগুরুর দীঘল ভাষণ!
যুগ যুগ ধরে গুরুগৃহে এভাবেই শিক্ষাগুরুগণ তাদের শিষ্যদের দীক্ষা দিয়ে এসেছেন। সামান্য ভাষার ব্যবধানসহ এখনও চালু আছে আদর্শের এই পাঠ। গুরুর বচনে ব্যত্যয় নেই কোনো
কালেই। অথচ আমরাই যখন এই মানবতার স্বপ্নে সমর্পিত সেই ডাক্তারের কাছে যাই তখন কী পাই! পত্রিকার ভাষায়Ñ ‘সড়ক দুর্ঘটনায় ডান পায়ের গোড়ালি বি”িছন্ন হয়ে
যায় জজ মিয়ার। চিকিৎসা নিতে আসেন রাজধানীর পঙ্গু হাসপাতালে। নিচতলায় অপারেশন থিয়েটারে পাঠানো হয় তাকে। কর্তব্যরত চিকিৎসক দেখে বললেন, বি”িছন্ন পা জোড়া লাগানো সম্ভব নয়। কেটে ফেলতে হবে। কিন্তু জজ মিয়া কিছুতেই রাজি হ”িছলেন না। সার্জনও নাছোড়বান্দা। পা কাটবেনই। নিরুপায় জজ মিয়া এক আত্মীয়কে ধরে তৎকালীন স্বাস্থ্যপ্রতিমন্ত্রী ক্যাপ্টেন (অব) মুজিবুর রহমান ফকিরকে দিয়ে তাৎক্ষণিক ফোন করান চিকিৎসকের কাছে। স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীর নির্দেশে পায়ের গোড়ালি জোড়া লাগিয়ে দিতে বাধ্য হন চিকিৎসক। জজ মিয়া সুস্থ হয়ে উঠেন। এখন হাঁটা-চলা করছেন। {আমাদের সময় : ২০ মে ‘১৪}
এটা উপমা। এমন ঘটনা এখন আর বিরল নয়। বরং নিত্যদিনের। আর এই যদি হয় দরদি চিকিৎসকদের চেহারা- তাহলে রাজনৈতিকদের মুখ কেমন হবে তাকি আর বলতে হয়? বিশেষ করে খুনের ঘটনার পর যদি নিহতের পরিবার নিরাপত্তাহীন আর খুনির দল সদর্পে চলাফেরা করার সংস্কৃতি গড়ে ওঠে তখন আর খুন-হত্যার অভিশাপ থেকে মুক্তির আশা করা যায় না। তারপরও দেশে এখনও যারা রাজনীতিক নয়, দলের কর্মী নয়, শুধু ‘মানুষ’ তারা যেকোনো খুনের ঘটনায় আহত বোধ করেন। কাঁদেন এবং ইনসাফের আশায় বুক বাঁধেন।
দুই.
সমাজে মানুষ হওয়ার সমস্যা হলোÑ অন্যের যন্ত্রণায় পাষাণ হয়ে থাকা যায় না। কিছু করতে না পারলেও সঙ্গে কাঁদতে হয়, দীর্ঘশ্বাস ছাড়তে হয়। সান্তনার কথা শোনাতে হয়Ñ ‘অপেক্ষা করো। আল্লাহ তো আছেন। বিচার একদিন হবেই।’
বেদনাবিধুর এমন ঘটনা তো প্রতিদিনই দেখছি, কাঁদছি, দীর্ঘশ্বাস ছাড়ছি। আর না কেঁদে উপায় কি, যখন কোনো মা বুক চাপড়ে বলতে থাকেন  ‘ছেলেটা বিয়ের পিঁড়িতে বসার কথা ছিল। সে অনুযায়ী আত্মীয়-স্বজনদের দাওয়াতকার্ড দেয়া হয়েছিল। বিয়ের
আয়োজন ছিল চূড়ান্ত পর্যায়ের। বিয়ের ব্যয় ও পারিবারিক অন্যান্য কাজ করতে তিলে তিলে গড়া জমিও বিক্রি করি। কিন্তু জমি বিক্রির টাকাগুলো হাতে আসাতেই যত বিপত্তি। র‌্যাব-১১-এর মেজর আরিফ হোসেন তার অস্ত্রধারী র‌্যাব সদস্যদের দিয়ে চোখের সামনে ছেলেটিকে নারায়ণগঞ্জের ক্যাম্পে ধরে নিয়ে যায়। তারপর ছেলেকে ফেরত দেয়ার শর্তে আমার কাছ থেকে ৪২ লাখ টাকাও নেয়। কিন্তু ১৬ দিন পর মেজর আরিফ আমার ছেলে শওকত আলী ইমনের লাশ ফেলে রেখে যায় কাঞ্চন ব্রিজের নিচে। {আমাদের সময় : ১৯.৫.১৪}
এ ছিল গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসের ঘটনা। কিন্তু এই ঘটনা মিডিয়া কিংবা সরকারের এইটুকুও টনক নাড়াতে পারেনি। কারণ, ইমনরা বিশ্বজিতের মতোই এই সমাজের সাধারণ মানুষ। তবুও বিশ্বজিতের কপাল ভালো সামনে দাঁড়িয়ে ধারালো অস্ত্রের ক্রমাগত আঘাতে অসীম অসহায়ত্বে জীবন বিসর্জন দিতে পেরেছে বলে অন্তত জাতির পক্ষ থেকে নগদ কিছু চোখের জল পেয়েছিল। কিন্তু ইমনদের মতো বরাবর যাদের ধরে ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়- অতঃপর সাত সকালে পথের ধারে পাওয়া যায় ক্ষত-বিক্ষত লাশ, তারা আমাদের এই চোখের জলটুকুও পায় না। দেশের সচেতন পাঠক মাত্রই জানেন সাদা কিংবা কালো পোষাকে অস্ত্রধারী একটি দল সাদা মাইক্রোবাসে করে যাকে তাকে যখন তখন তুলে নিয়ে যা”েছ  বিশেষ করে ব্যবসায়ী কিংবা বিরোধী রাজনীতিকদের এটা এখন যেন কোনো ঘটনাই নয়। অথচ এভাবে ধরে নিয়ে যাওয়া অতঃপর পথে কিংবা ডোবায় লাশ পড়ে থাকতে দেখা- সে তো মুক্তিযোদ্ধের সময়কার কাহিনী। বিদেশি হায়েনারা এভাবে এদেশের সূর্যসন্তানদের ধরে নিয়ে খুন করেছে। তখন আমরা ছিলাম পরাধীন। আর এখন? ‘কেতাবে’ আছে আমরা স্বাধীন! আসলেই কি আমরা স্বাধীন?
সুমনের বাবা আবদুল লতিফের কথা শুনুন ‘লাশ উদ্ধারের পর রূপগঞ্জ থানায় র‌্যাবের বিরুদ্ধে মামলা করতে যাই। কিন্তু ওসি হুমকি দেন র‌্যাবের বিরুদ্ধে মামলা করা যাবে না। করলে পুরো পরিবারকে ক্রসফায়ারের ভয় দেখায় আসলাম। এ কারণে এতদিন
মুখ বুঝে ছিলাম। কিন্তু মেজর আরিফ গ্রেপ্তার হওয়ায় এখন সাহস পেয়েছি। {প্রাগুক্ত}
কী ভয়াবহ পরিস্থিতিতে বাস করছি আমরা। যেখানে আমার জন্ম, জন্ম
আমার বাবার সেখানে আমার চোখের সামনে আমার সন্তানকে তুলে নিয়ে খুন করে ফেলছে। আমি খুুনিদের চিনি। কিন্তু তাদের নাম বলতে পারছি না। তাদের বিরুদ্ধে নালিশ করতে পারছি না। এরচে’ কঠিন জঘন্য এবং পাষাণ সময় আর কী হতে পারে? যারা মুক্তিযুদ্ধের সময়কার বদ্ধভূমির ফেরি করে খায়, তারা কি স্বীকার করবেনÑ এখন যে পুরোটা বাংলাদেশই বদ্ধভূমি!

তিন.
তারা স্বীকার করবেন না। ভাবখানা এমনÑ দেশ যে গুম খুন আর একদলীয় সন্ত্রাসের তা-বে ল-ভ-Ñ এ যেন জীবন চঞ্চলতার স্বাভাবিক দৃশ্যপট। এরই মধ্যে ঘটলো নারায়ণগঞ্জের প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামসহ সাত খুনের বাকরুদ্ধকর ঘটনা। দিনের বেলা
শাসকদলের নেতা- নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিকে তার নির্বাচন এরিয়া থেকে তুলে নিয়ে যা”েছ। এর সঙ্গে আরও চারজন সতীর্থ। এই দৃশ্য মোবাইল ফোনে ধারণ করতে গিয়ে অপহরণের শেকলে বাঁধা পড়েন আইনজীবী চঞ্চল ও তার ড্রাইভার ইবরাহীম। এই সাতজনকে খুন করে নদীতে ফেলার সময় দেখে ফেলার অপরাধে দুই মাঝি ও দুই জেলেকে খুন করা হয়। এবং তাদেরও ডুবিয়ে ফেলা হয় নদীর গহীনে। এই ঘটনার পর কে বলবেÑ এই দেশটা আমাদের। এই ঘটনার ভাঁজে ভাঁজে যে পাষ-তা ও নির্মমতা ছড়িয়ে আছে তার ব্যাখ্যা দেয়ার ভাষা কার আছে শুনি! অন্তত মাঝি ও জেলেদের কী অপরাধ ছিল এই ঘটনায়? তাদের বিধবা স্ত্রী এবং এতিম সন্তানদের ভাষা বুঝবার ক্ষমতা কি সত্যিই এই দেশ ও সরকারের আছে? আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কথায় কথায় বলেন- তিনি বাবাহারা সন্তানের কষ্ট বুঝেন। যদি তাই হতো তাহলে তিনি ছুটে যেতেন নিহত জেলে এবং মাঝির ঘরে। হাত রাখতেন তাদের এতিম সন্তানদের মাথায়!
রাজনীতিকরা যেমন পাষাণ এখনকার খেলাধুলাও পাষাণ। শোকে নৃশংসতায় মুহ্যমান নারায়ণগঞ্জের স্মৃতিতে যখন
ক্ষুব্ধ স্তব্ধ ও স্তম্ভিত সারা দেশ, তখনই একই আগুনে জ্বলে উঠলো ফেনী। পত্রিকার শিরোনাম- প্রকাশ্য বর্বরতা : উপজেলা চেয়ারম্যানকে রাজপথে হত্যা ॥ গাড়িসহ পুড়িয়ে ভস্ম!
আর কী বলার থাকে? তবু জঘন্যতার মাত্রা নির্ণয়ের জন্য বলি- নিহত ছাই ভস্ম একরামুল হক ছিলেন সদ্য নির্বাচিত ফেনী ফুলগাজীর উপজেলা চেয়ারম্যান এবং আওয়ামী লীগ সভাপতি। তিনি খুন হয়েছেন সকাল ১০টায় ( ২২.৫.১৪) ফেনী শহরের একাডেমি এলাকার বিলাসী সিনেমা হলের সামনে। অর্থাৎ গোপনে নয়, রাতেও নয়। গুলি করে গাড়িতে আগুন ধরিয়ে পুড়িয়ে ছাই করে হত্যা করার এমন জঘন্য দৃশ্য কোনো সভ্য পৃথিবী কখনো দেখেছে? বিশেষ করে এমন কোনো নির্বিবাদ পরিবেশে!
একটা দুঃখের কথা বলি। এই দুঃখ চলতি বিশ্বের এবং বিশ্বমানবতার। আমেরিকানরা এই যে জাহাজ ভরে উড়ে এসে মুসলমান খুন করে যাচ্ছে।
ইরাকে আফগানিস্তানে কিংবা লিবিয়ায়- সেখানে কি শুধু মুসলমানই খুন হ”েছন না বেঈমানরাও ধ্বংস হ”েছ! কাউকে মারতে গেলে মরতেও হয়। মরছে আমেরিকানরাও। কিন্তু সাহস করে জরিপ প্রকাশ করতে পারছে না- ঠিক কতজন ধ্বংস হয়েছে এ পর্যন্ত আমাদের শহরে। আমরা তার হিসাব রাখি না। শৃগাল কুকুর কতটা বাঁচল আর কতটা মরল- সে হিসাব রাখবে কে? কিন্তু এ দেশে যারা স্বদলের মানিকদের হাতে জীবন দি”েছ- তাদের একটা হিসাব থাকা চাই। হিসাবটা এই কারণে চাই- ভবিষ্যত প্রজন্ম যেন এখান থেকে কিছু শিখতে পারে। করণ- এখন যে খুন হত্যা আর গুমের ধুম চলছে এ কিন্তু কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনা নয়। ইলিয়াস আলীর এতিম কন্যার চোখের পানি আর বিশ্বজিতের তাজা রক্ত থেকে উৎসারিত এই আগুন। যদি ইনসাফ ও সুবিচারের জলে নেভানো না হয় এই আগুন- তাহলে পূর্ব-পশ্চিম আর উত্তর-দক্ষিণের সকল জালেম জনপদ পুড়িয়ে ছাই করবে এই আগুন। নেতা-কর্মী কাউকেই ছাড়বে না।

ঢাকা

Share

মাদরাসা শিক্ষা : একটি পর্যালোচনা ও দারুল উলূম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠার পটভূমি

জাবালে নূর তথা ফারা পর্বত গুহায় রাসূলে আরাবি নির্দেশপ্রাপ্ত হলেন পাঠের। ‘পড়, হে মুহাম্মাদ’। চমকিত-চকিত নবী দ্বিতীয়বার শুনতে পেলেন একই নির্দেশ- ‘পড়’। অভিভূত নবী উত্তর দিলেনÑ ‘আমি উম্মি-পড়া জানি না।’ উত্তর হল- ‘পড় তোমার প্রভুর নামে যিনি তোমায় সৃজিলেন। যিনি সৃজিলেন মানুষকে জমাট রক্ত হতে।’ সুরা আলাক ঃ ১-২
পড়ার নির্দেশ পেয়ে উম্মি নবী স্বয়ং রবের ছাত্রত্বগ্রহণ করলেন। ইলমে ওহী তাবলিগের নির্দেশ পেয়ে দায়িত্ব পেলেন শিক্ষকের।
ছাত্র হিসেবে পেলেন- হযরত আবু বকর রা., হযরত উমর রা. উসমান রা., হযরত আলী রা., হযরত যায়েদ বিন হারেস রা.-এর মতো পূণ্যবান ব্যক্তিদের। ধীরে ধীরে ছাত্র সংখ্যা বাড়তে লাগল। এমতাবস্থায় তাদের দ্বীনি তালিম ও তারবিয়াতের উদ্দেশ্যে সর্বপ্রথম উপ-আনুষ্ঠানিক মাদ্রাসা স্থাপিত হয়, হযরত আবু বকর সিদ্দিক রা.-এর বাড়ির আঙ্গিনায়।

মাদ্রাসা শিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ
এরপর সর্বপ্রথম মাদ্রাসা শিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ মাদ্রাসায়ে ‘দারুল আরকাম’-এর ভিত্তি স্থাপিত হয় হযরত আরকাম বিন আবুল আরকাম রা.-এর বাড়িতে সাফা পাহাড়ের পাদদেশে। যারা প্রথম থেকে দারুল আরকাম মাদ্রাসায় তালিম নিয়েছিলেন- পরবর্তীতে তারাই এখানে শিক্ষকতা করেন।
মদিনায় প্রথম প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসা ও মসজিদ হল মসজিদে বনু যুরাইক মাদ্রাসা। এর উস্তাদ ও ইমাম ছিলেন হযরত রাফে বিন মালেক যরকি আনসারি। এই মসজিদেই প্রথম নামাজ আদায় ও কুরআন তেলাওয়াত শুরু হয়। এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশ ছাত্র খাযরায গোত্রের শাখা বনি যুরাইক গোত্রের মুসলমান ছিলেন।
রাসূল সা.- এর হিজরতের পর মদিনার মসজিদে নববী মাদ্রাসা হয়ে যায় কেন্দ্রিয় প্রতিষ্ঠান। রাসূলুল্লাহ সা. আসহাবে সুফফার দরিদ্র ও দূর্বল নও মুসলিম এবং বর্হিরাগত ব্যক্তিদের নিয়ে সেখানে বৈঠক করতেন, কুরআন-শরিয়তের দরস দিতেন। আর এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই মূলত ইসলামি সাম্রাজ্যের শিক্ষা-দীক্ষার নবদিগন্ত উন্মোচন করে।
মূলত রাসূল সা. এর ইন্তেকালের পর সাহাবায়ে কেরাম দাওয়াত ও তাবলিগের কাজে পুরো পৃথিবী ছড়িয়ে পড়েন। খোলাফায়ে রাশেদার যুগে বিভিন্ন স্থানে মসজিদ-মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা হয়। আর তারা যেখানেই বসতেন সেখানেই মাহফিলের চেরাগ হয়ে সকলের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হতেন।
প্রকৃতপক্ষে খোলাফায়ে রাশেদিনের যুগে সাধারণ থেকে শুরু করে সরকারি কর্মচারি এমনকি ইসলামি সাম্রাজ্যের খলিফা পর্যন্ত যখন যেখানে গিয়ে ছিলেন সেখানেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করে ছিলেন। শিক্ষার জন্য তারা রাজকোষ থেকে প্রচুর অর্থও ব্যয় করেছেন। খোলাফায়ে রাশেদিনের প্রথম যুগেই কুরআন শরিফকে একত্রিত করা হয় এবং এর বহু কপি বিভিন্ন দেশে বিলি করা হয়। শিক্ষার প্রতি খোলাফায়ে রাশেদিনের গুরুত্বারোপ উক্ত ঘটনা হতে আরো স্পষ্ট হয়।
সাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈন, তাবে-তাবেঈনের যুগে মসজিদ কিংবা নিজবাড়ি অথবা খানকা ভিত্তিক ধর্মীয় শিক্ষা ব্যবস্থার প্রচলন সুস্পষ্ট ইতিহাসে বিদ্যমান। পরবর্তীতে উমাইয়া শাসনামলে কিঞ্চিত পরিবর্তন এনে আরো সুন্দরভাবে আনুষ্ঠানিকতার রূপ দেয়া হয়।
খোলাফায়ে রাশেদার যুগে ধর্মীয় শিক্ষার যে ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল তাকে প্রথম যুগ হিসেবে গণ্য করা হয়। উমাইয়া শাসনামলে ধর্মীয় শিক্ষা ব্যবস্থাকে দ্বিতীয় যুগ এবং আব্বাসিয়দের যুগের শিক্ষা ব্যবস্থাকে তৃতীয় যুগ বলা হয়।
এ যাবত বিদ্যা শিক্ষা করা ও বিদ্যা শিক্ষা দেয়া ছিল লিল্লাহিয়্যাতের কাজ। শিক্ষকতাকে কেউ জীবন-জীবিকার উপায় হিসাবে গ্রহণ করেনি। উমাইয়া খলিফা হযরত উমর বিন আব্দুল আজিজ রহ. এর শাসনামলে বিদ্যা শিক্ষার প্রচার-প্রসারের উদ্দেশ্যে প্রচলিত রীতি-নীতি পরিবর্তন করা হয়।

মাদরাসা প্রতিষ্ঠায় উমর বিন আব্দুল আজিজ রহ. এর অবদান
উমাইয়া খলিফা উমর বিন আব্দুল আজিজের ইলমে দ্বীন শিক্ষার নির্দেশে নতুন যুগের সূচনা হয়। পবিত্র মক্কায় হযরত আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস রা. কুরআন মাজীদ, হাদিসে রাসূল, ফিক্বাহ, ফারায়েয ও আরবি ভাষা শিক্ষা দিতেন। মদিনায় রবীয়াতুর রায়-এর মাদ্রাসায় উচ্চ মানের শিক্ষা ও তালিমের কাজ চলত। হিজাজের পর ইরাকই ছিল ইসলামি শিক্ষার দ্বিতীয় প্রধান কেন্দ্র। কুফা নগরিতে আব্দুর রাহমান বিন আবি লাইলা এবং ইমাম শাফি রহ. স্ব-স্ব মাদ্রাসায় কুরআন-সুন্নাহ শিক্ষা দিতেন। বসরা নগরিতে অবস্থিত ইমাম হাসান বসরি রহ. তার পরিচালিত মাদ্রাসা বিশেষ মর্যাদা ও গুরুত্বের অধিকারী ছিল। সে সময় মাদ্রাসাসমূহ মসজিদ কিংবা মসজিদের বারান্দায় অথবা মসজিদ সংলগ্ন চত্বরে বসত।
আব্বাসিয় যুগে শিক্ষার যে বিকাশ রচিত হয়, তা আধুনিক পৃথিবি গড়ায় এক বিপ্লবি অবদান রাখে। সেই যুগে মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার তত্ত্বাবধানে রাষ্ট্র পরিচালিত হত। ওই যুগে পৃথক কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল না। যে কারণে মাদ্রাসা শিক্ষায় শিক্ষিত ব্যক্তিবর্গই বড় বড় চিকিৎসক, বড় বড় ইঞ্জিনিয়ার, দার্শনিকসহ বিভিন্ন বিষয়ে পাণ্ডিত্ব অর্জন করতে পারতেন।
আব্বাসিয় খিলাফতের শাসনামলেই প্রসিদ্ধ ইসলামি চিন্তাবিদ ও মাজহাবি ইমামদের আবির্ভাব ঘটে। হযরত ইমাম আবু হানিফা রহ., হযরত ইমাম মালেক রহ., হযরত ইমাম শাফেয়ি রহ., হযরত ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. প্রমূখ ইমামদের বৈচিত্রময় কর্মের পরিস্ফুটন ঘটে। হযরত ইমাম বুখারি রহ. হযরত ইমাম মুসলিম রহ. হযরত ইমাম আবু দাউদ রহ. হযরত ইমাম তিরমিজি রহ. হযরত ইমাম নাসাঈ রহ. হযরত ইমাম ইবনে মাজা রহ. প্রমূখের হাদিস সংগ্রহ মুসলমানদের জ্ঞান-বিজ্ঞানের অনুশীলনকে শাণিত করে।
আব্বাসিয় যুগেই শিক্ষার মান অনুসারে প্রথম শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচি প্রণীত হয়। এতে সাধারণ জ্ঞান স্থান পায়। শিক্ষাধারাকে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা- এই তিন স্তরে বিন্যস্ত করা হয়।

সর্বপ্রথম মাদ্রাসা শিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি স্থাপন
আল্লামা সুবকি রহ. বলেন- নিজামুল মুলক তুসি সর্বপ্রথম মাদ্রাসা শিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি স্থাপন করেন। মূলত তা ঠিক নয়, বরং নিজামুল মুলকেরও জন্মের পূর্বে নিশাপুরে (ইরানের একটি প্রসিদ্ধ শহর) প্রথম মাদ্রাসাই-বায়হাকিয়া প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এরপর নিশাপুরেই সুলতান মাহমুদের ভাই আমির নাছের ইবনে সবুক্তগীনের পৃষ্ঠপোষকাতায় মাদ্রাসাই সাইয়্যেদিয়া নামে দ্বিতীয় মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। তৃতীয় বৃহত্তর মাদ্রাসাটিও নিশাপুরেই ছিল। উস্তাদ আবু বকর ফাওয়ারেককে জনসাধারণ সমারোহের সাথে আমন্ত্রণ করে আনেন। তার দরস শোনার জন্যই এই মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করা হয়।

দরসে নিজামি ও নিজামিয়া মাদ্রাসার
৪৫৯ হিজরি মুতাবিক ১০৬৭ সালের ১৩ যিলকদ শনিবার সেলজুক সুলতান তুঘরিলের ভ্রাতুষ্পুত্র আলফে আরসালানের প্রধানমন্ত্রী নিজামুল মুলক তুিস কর্তৃক বাগদাদে মাদ্রাসায়ে নিজামিয়া দারুল উলূম প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি সর্বপ্রথম ছাত্রদের জন্য বৃত্তি প্রদানের ব্যবস্থা করেন। ঐ মাদ্রাসায় বিভিন্ন বিভাগ ছিল এবং শ্রেণী অনুসারে প্রতি বিভাগে ছয় হাজার ছাত্র ছিল।
ইমাম গাজালি রহ., ইমাম তাবারি রহ., ইবনুল খতিব রহ., তাবরিযি রহ, আবুল হাসান ফকিহ রহ., আব্দুল কাদের জিলানি রহ. এই মাদ্রাসারই ছাত্র ছিলেন।
নিজামুল মুলূকের হাতে ৫ম শতাব্দিতে আধুনিক মাদ্রাসা শিক্ষার শুভ সূচনা হয় এবং ৬ষ্ঠ শতাব্দির শেষ পর্যন্ত তা বাকি থাকে। ইসলামি সাম্রাজ্যের আনাচে-কানাচে কোথাও মাদ্রাসা গড়ে উঠতে বাকি ছিল না। মুসলিম সাম্রাজ্যে গড়ে উঠা মাদ্রাসাসমূহ নিজামুলমুলক কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসার সিলেবাস গ্রহণ করা এবং মাদ্রাসায়ে নিজামিয়া দারুল উলূম এর সাথে সম্পৃক্ত হওয়ার কারণে অন্যান্য মাদ্রাসাগুলোকেও নিজামিয়া মাদ্রাসা বলা হতে থাকে।

উপমহাদেশে মাদ্রাসা শিক্ষা ঃ
একাদশ শতাব্দিতে বাগদাদে মাদ্রাসা শিক্ষার যে আলো জ্বলে উঠেছিল সে আলো ক্রমান্বয়ে পূর্ব দিকে ইসলাম প্রচার ও সাম্রাজ্য বিস্তারের সাথে সাথে আরও অগ্রসর হয়ে পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও ভারত হয়ে বাংলাদেশে চলে আসে।
মুসলিম শাসকদের রাজ্যাভিযান ৭১২ সালে ভারতবর্ষের সিন্ধু, মুলতান জয় করে কাশ্মীর পর্যন্ত অগ্রসর হয়। উমাইয়া সেনাপাতি মুহাম্মদ বিন কাসিম রাজ্য জয় করে সাথে সাথেই বেসামরিক প্রশাসন চালু করেন। একই সঙ্গে তিনি শিক্ষার প্রতিও মনোযোগী হন। তার পরবর্তী শাসকগণ একই নীতি গ্রহণ করেন। উমাইয়া যুগের পর আব্বাসিয় যুগেও পূর্বাঞ্চলে মাদ্রাসা শিক্ষা সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে। বিশেষত দশ শতকের শেষের দিকে সবুক্তগীন এবং একাদশ শতাব্দির প্রারম্ভে তার পুত্র সুলতান মাহমুদ গজনিসহ সমগ্র উত্তর ভারতে মুসলিম শাসন কায়েম করেন। তিনি গজনিতে মাদ্রাসা মসজিদ নির্মাণ করে জ্ঞান-বিজ্ঞান, তাহজিব-তমদ্দুন প্রভৃতি ক্ষেত্রে গজনিকে বাগদাদের সমকক্ষতায় নিয়ে যেতে সক্ষম হয়ে ছিলেন।
অবশেষে সুলতান মুহাম্মদ ঘোরি ও সুলতান কুতুব উদ্দীন আইবেক (১২০৬-১২১০) ভারতের অনেকাংশ জয় করেন। মুসলিম শাসকগণ রাজ্য জয়ের সাথে সাথে মসজিদ, মাদ্রাসা, সরাইখানা প্রভৃতি নির্মাণ কাজে পৃষ্ঠপোষকতা করেন।
বেসরকারি পর্যায়ে সূফি ও আউলিয়া দরবেশগণ ইতিপূর্বে সমগ্র উপমহাদেশ জুড়ে তাদের মিশনে সাফল্য লাভ করেন।
মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা জহিরুদ্দীন মুহাম্মদ বাবর (১৫২৬-১৮৫৭ খৃ.) থেকে শুরু করে প্রায় ৩০০ বছরের সকল শাসককেই বিদ্যা শিক্ষা ও বিদ্যালয় বা মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা ও পৃষ্ঠপোষক হিসেবে পাওয়া যায়।
মুঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা হয় ১৫২৬ সালে। সম্রাট বাবর আরবি, ফার্সী ও তুর্কি ভাষায় পাণ্ডিত্য অর্জন করেছিলেন। বাবর পুত্র হুমায়ূন ও তার পুত্র আকবর বিদ্যোৎসাহী ছিলেন। সম্রাট হুমায়ূন সাম্রাজ্যের চেয়েও কুতুবখানাকে বেশি ভালবাসতেন।

সম্রাট আলমগির রহ. এর পৃষ্ঠপোষকতায় মাদ্রাসা শিক্ষা
মুঘলদের পরবর্তী সম্রাট শাহজাহান (১৬২৭-১৬৬৬ খৃ.), আওরঙ্গজেব তথা সম্রাট আলমগির (১৬৬৬-১৭০৭ খৃ.) তার পূর্বসূরিদের মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতা করেন। শাহজাহান দিল্লির জামে মসজিদ এবং তৎসংলগ্ন একটি বড় মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। যেখান থেকে সাম্রাজ্যের বড় বড় স্থানে কাজি নিয়োগ করা হতো। এ ছাড়া সাম্রাজ্যের বহু মাদ্রাসার সংস্কার ও নতুনভাবে বহু মাদ্রাসা স্থাপন করেন।
আওরঙ্গজেব তথা সম্রাট আলমগির প্রত্যেক মসজিদে সরকারিভাবে ইমাম নিয়োগ করেন। অধিকাংশ মসজিদ সংলগ্ন মক্তব-মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। এ সব মসজিদ মাদ্রাসা পরিচালনার লক্ষ্যে লা-খেরাজ সম্পত্তি দান করে যান। মুঘল সাম্রাজ্য পরবর্তী ইংরেজদের আমলে ১৭৯৩ সালে এক আইন জারির মাধ্যমে তা রহিত করা হয়। মসজিদ এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নামে বরাদ্দকৃত লা-খেরাজ সম্পত্তি না থাকায় ধীরে ধীরে তা বন্ধ হয়ে যায়।

বাংলা অঞ্চলে শিক্ষা ব্যবস্থা ঃ
অষ্টাদশ শতাব্দির শেষের দিকে বঙ্গ দেশের শিলাপুর নামক স্থানে কিছু ছোট ছোট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল। যেখানে হিন্দু ও মুসলমানরা আরবি ও ফার্সি শিক্ষা করতেন। মুসলিম আমলে বাংলাদেশে প্রতি ৪ হাজার লোকের জন্য একটি করে প্রাথমিক মাদ্রাসা ছিল। বাংলাদেশে এরূপ প্রায় ৮০ হাজার প্রাথমিক মাদ্রাসা ছিল। এ জাতীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মসজিদের সঙ্গে যুক্ত ছিল। এগুলোতে আরবি-ফার্সি ইত্যাদি পড়ানো হতো।

দারুল উলূম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠার পটভূমি :
ভারত বর্ষে মুঘল শাসনামলের শেষ দিকে যখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারত বর্ষের ক্ষমতা নিজ হাতে নিয়ে, এ ফরমান জারি করে যে, ‘এখন থেকে বাদশাহ সালামতের রাজ্যে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিরই হুকুমত চলবে।’ সেই দিন মুসনাদুল হিন্দ শাহ ওয়ালীউল্লাহ রহ. এর সুযোগ্য সন্তান হযরত শাহ আবদুল আযীয রহ. দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে এই ফতওয়া ঘোষণা করলেন- ‘ভারতবর্ষ এখন দারুল হরব। (শত্র“ কবলিত দেশ) তাই প্রত্যেক ভারতবাসির ফরজ হল একে স্বাধীন করা।” তার এই ঘোষণা ছড়িয়ে পড়ল দাবানলের ন্যায়। দিশেহারা মুসলিম জাতি উলামাদের নেতৃত্বে ১৮৫৭ সালে সিপাহি বিপ্লব করলেন।
বিদ্রোহের কারণ ও করা নেতৃত্ব দিচ্ছেন মর্মে ইংরেজ সরকার, কোম্পানির কাছে রিপোর্ট চাইলে- ড. উইলিয়াম লিওর এ রিপোর্ট দিয়ে ছিল যে, ‘এটি ছিল মূলত: মুসলমানদের আন্দোলন, আর এর নেতৃত্ব দিয়েছে আলেম সমাজ। সুতরাং এ বিদ্রোহকে চিরতরে নির্মূল করতে হলে মুসলমানদের জিহাদি চেতনাকে অবদমিত করতে হবে। আর এ চেতনার মূল সঞ্জিবনি শক্তি আল-কুরআন ও এর ধারক-বাহক আলেম-ওলামাদেরকে নির্মূল করে ফেলতে হবে।’
এরপর শুরু হলো আলেম-উলামার উপর দমন-নিপীড়ন। হাজার হাজার আলেম-উলামাকে ফাঁসি দেওয়া হলো। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছিল যে, ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য ইসলামের নামটুকু আর বাকি থাকবে না। তবে তো বর্তমানের চেয়ে ভবিষ্যত আরো সঙ্গিন হবে। এমতাবস্থায় দীর্ঘ চিন্তা-ভাবনা, শলা-পরামর্শের পর সাময়িকভাবে সশস্ত্র সংগ্রাম বন্ধ রেখে সাম্রাজ্যবাদ ইংরেজ বেনিয়া বিরোধী, স্বাধীনতা সংগ্রামের চেতনায় উজ্জীবিত, দ্বীনি চেতনায় উৎসর্গ একদল জানবায মুজাহিদ তৈরির লক্ষ্যে এবং ইলমে নববীর সংরক্ষণ, ও ইসলামি শিক্ষা-সংস্কৃতির প্রচার-প্রসারের মহান উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী রহ.-এর ইঙ্গিতে হযরত মাওলানা কাসেম নানুতুবি রহ.-এর নেতৃত্বে এবং যুগশ্রেষ্ঠ বুযুর্গানে দ্বীনের হাতে ১৮৬৬ ঈসায়ী ৩০ মে, মুতাবিক ১৫ মুহররম ১২৮৩ হিজরি সনে ভারতের উত্তর প্রদেশস্থ সাহারানপুর জেলায় দেওবন্দ নামক গ্রামে ঐতিহাসিক সাত্তা মসজিদ প্রাঙ্গনে একটি ডালিম গাছের ছায়ায় ইলহামিভাবে বর্তমান পৃথিবির দ্বীনি শিক্ষার প্রাণকেন্দ্র বলে পরিচিত ‘দারুল উলূম দেওবন্দ’ মাদ্রাসার গোড়াপত্তন হয়।
এ তারা বুঝতে পেরেছিলেন যে, জাতীর এ ক্রান্তিলগ্নে একদল দীক্ষাপ্রাপ্ত সচেতন মুজাহিদ তৈরি করে তাদের মাধ্যমে আযাদি আন্দোলনের স্রোতধারাকে ভারতবর্ষের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে দেয়া সহজতর। তাই চরম অর্থনৈতিক দুর্দশার মাঝে কোনো প্রকার সরকারি সাহায্য ছাড়াই একমাত্র আল্লাহর ওপর ভরসা করে গড়ে তুললেন এ প্রতিষ্ঠানটিকে। সেদিন থেকে শুরু হল স্বাধীনতা সংগ্রামের এক নতুন অধ্যায়। আল্লাহ এবং তাঁর রসূলের বাণী শিক্ষা দেয়ার পাশাপাশি চলতে লাগল আজাদির দীক্ষা। ফলে অল্পদিনেই তৈরি হয়ে গেল এক নতুন জিহাদি কাফেলা। দীর্ঘ সংগ্রাম, ত্যাগ ও কুরবানির বিনিময়ে এদেশের মজলুম জনতা ফিরে পেল কাঙ্খিত স্বাধীনতা।
আজ গড়ে উঠেছে উপমহাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে এর আদলে হাজার হাজার ইসলামি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে যা কওমি মাদরাসা নামে খ্যাত। এখান থেকে ইলমে দ্বীনের অমৃত সুধা পানে পরিতৃপ্ত হচ্ছে কোটি কোটি মুসলমান। ফারা পর্বতের আলোসিক্ত এ কওমি মাদরসাগুলোই হচ্ছে মুসলমানদের দ্বীন-ঈমান সংরক্ষণের সর্বশেষ দুর্গ।

 

Share

ফেসবুক এপিঠ ওপিঠ

হাসনাইন হাফিজ

ফেসবুক একটি আধুনিক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। পৃথিবীর সবদেশেই ফেসবুক সমান জনপ্রিয়। ফেসবুকের জনপ্রিয়তার সবচেয়ে বড় কারণ- এর নানা ধরনের অ্যাপ্লিকেশনসÑ যা অন্য কোনো সামাজিক সাইটে একত্রে পাওয়া যায় না। ব্যবহারবিধিও অপেক্ষাকৃত সহজ ও শৈল্পিক। বর্তমানে এটি প্রাত্যহিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ, তারুণ্যের নতুন জানালা এবং স্বাধীন মত প্রকাশের একটি প্রযুক্তি মাধ্যম। একটি সৃজনশীল মুক্তচিন্তা বিকাশের যোগসূত্রও বটে। এ সৃজনশীলতার পাশাপাশি আবার অনেক নোংরামি, অশ্লীলতা, ভাষার বিকৃতি, অপপ্রচার, সময় ও মেধার অপপ্রয়োগসহ বিভিন্ন পোস্ট, স্ট্যাটাস, মন্তব্য, টুইট, অসংলগ্ন আলাপ, বিকৃত ভাষার ব্যবহার; ব্যাংক, অনলাইন মিডিয়ায় আইডি হ্যাকসহ বন্ধুদের দীর্ঘ তালিকা তরুণীদের মূল্যবোধকে সহজেই পরাস্ত করে প্রতারণার সুযোগ গ্রহণ করছে বুঝে না বুঝে অনেক ব্যবহারকারী।

ফেসবুকের শুরুর কথা
ফেসবুক পৃথিবীর জননন্দিত একটি নেটওয়ার্কিং ওয়েবসাইট। ২০০৪ সালের ৪ ফেব্র“য়ারিতে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ছোট্ট একটি রুমে ফেসবুকের কার্যক্রম শুরু হয়। সেখানকার শিক্ষার্র্থী মার্ক এলিয়ট জুকারবার্গ বন্ধুদের সঙ্গে মিলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডরমেটরিতে বসে নিজেদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের মধ্যে যোগাযোগ গড়ে তোলার জন্য একটি ওয়েবসাইট চালু করেন। তখন বিষয়টি কেবল ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্যই সীমিত ছিল। ইন্টারনেটভিত্তিক এই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমটি এত দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠে যে, চালু হওয়ার মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যেই হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্ধেকের বেশি ছাত্র-ছাত্রী এর সদস্য হয়। পরবর্তী কয়েক মাসের মধ্যে আশেপাশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যায়ের শিক্ষার্থীরাও সদস্য হতে শুরু করলে সদস্য সংখ্যা লাখ ছাড়িয়ে যায়। এরপর শুধুমাত্র আমেরিকায় বসবাসরত ব্যবহারকারীদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। ২০০৬ সালে উন্মুক্ত করে দেয়া হয় সারা বিশ্বের জন্য। এভাবেই ইতি-নেতির ভাবনার ডানায় ফেসবুক দশদিগন্তে উড়াল দিতে সমর্থ হয়েছে।

ফেসবুকের অগ্রযাত্রা ও জয়জয়কার
ফেসবুক ব্যবহার করে না এমন ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা এখন নেই বললেই চলে। এমনকি এখন যারা ইন্টারনেট দুনিয়ার নতুন সদস্য হচ্ছেন, তাদের সূচনাই হচ্ছে ফেসবুক রেজিস্ট্রেশনের মধ্য নিয়ে। নচেৎ মাত্র ২০০৪ সালের ফেব্র“য়ারিতে যাত্রা শুরু করে ২০০৫ সালের ডিসেম্বরেই এর গ্রাহক সংখ্যা ৫৫ লাখে দাঁড়াত না। ২০০৬ সালে কৌশলগত কারণে ফেসবুকের সঙ্গে মাইক্রোসফট সম্পর্ক স্থাপন করার মাধ্যমে সারাবিশ্বের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। ফলে এক লাফে গ্রাহকসংখ্যা দাঁড়ায় ১ কোটি ২০ লাখে। ২০০৭ সালে ভার্চুয়াল গিফট শপ চালুর সঙ্গে সঙ্গে গ্রাহক সংখ্যা ২ কোটি এবং মাত্র একবছর পর ২০০৮ সালে ফেসবুকে জনপ্রিয় ‘চ্যাট’ সেবা চালু হয়। এ বছরই ব্যবহারকারীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১০ কোটিতে। ২০০৯ সালে ফেসবুকে ‘লাইক’ সেবার পাশাপাশি এর গ্রাহক সংখ্যা উন্নীত হয় ১৫ কোটিতে। মাত্র এক বছর পর ২০১০ সালে ব্যবহারকারী দাঁড়ায় ৫০ কোটিতে। আর তাই প্রায় ৭০০ কোটি জনসংখ্যার এই বিশ্বে সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ নেটওয়ার্কর ওয়েবসাইট ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১০০ কোটির বেশি। এর মধ্যে প্রতিদিন ৬১ কোটি ৮০ লাখ ব্যবহারকারী দিনে অন্তত একবার ফেসবুকে লগইন করেন। মোবাইল ফোন থেকে প্রতিদিন লগইন করেন ১৫ কোটি ৭০ লাখ ব্যবহারকারী। বাংলাদেশে ৩০ লাখেরও বেশি ফেসবুক ব্যবহারকারী রয়েছেন। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৭০টিরও বেশি ভাষায় ফেসবুক ব্যবহার করা হচ্ছে। তার উপর ফেসবুকে প্রতিদিন যুক্ত হচ্ছে প্রায় দুই লাখ নতুন ব্যবহারকারী। সম্মিলিতভাবে ব্যবহারকারীরা প্রতিমাসে ফেসবুকে সময় কাটান ৭০ হাজার কোটি মিনিট। এই অবস্থা চলতে থাকলে পৃথিবীর সব মানুষ খুব শিগগিরই হয়তো যুক্ত হয়ে যাবে ফেসবুকের রাজত্বে।
মানুষের পরস্পরের সঙ্গে নানা বিষয়ে মতবিনিময় করার পাশাপাশি সমাজনীতি, রাজনীতির গণ্ডি পেরিয়ে এখন অর্থনীতির চূড়ায় আরোহন করার প্রস্তুতি নিচ্ছে পৃথিবীর সবচে বড় এই সোস্যাল মিডিয়াটি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা প্রকাশ্যেই এক সভায় বলেছিলেন, ফেসবুক আমেরিকার গর্ব। তিনি তার নির্বাচনী প্রচারণায়ও এর ব্যাপক ব্যবহারে উপকৃত হয়েছেন। এর আগে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন টাইম ম্যাগাজিন ২০১০ সালের জন্য বর্ষসেরা ব্যক্তিত্ব হিসেবে নির্বাচন করে জনপ্রিয় নেটওয়ার্কিং সাইট ফেসবুক প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী মার্ক এলিয়ট জুকারবার্গকে। ফেসবুকের বিপুল ব্যবহারের পাশাপাশি মানুষের জীবনে এবং বছরের ঘটনাপ্রবাহে এর প্রভাব বিবেচনা করে জুকারবার্গকে এ খেতাব দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় টাইম ম্যাগাজিন।

ফেসবুক নিয়ে ভবিষ্যত পরিকল্পনা
বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইট ফেসবুক ব্যবহারের ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন বয়সসীমা ১৩ বছর। সম্প্রতি বিবিসির এক খবরে জানা গেছে, ফেসবুক ব্যবহারকারীর জন্য আর কোনো নির্দিষ্ট বয়সসীমা থাকছে না। অর্থাৎ ১৩ বছরের কম বয়সী শিশু থেকে শুরু করে সবার জন্যই উন্মুক্ত হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে বিশ্বের বৃহত্তর নেটওয়ার্ক ফেসবুক। তবে এই কাজটি করতে তারা বিশেষ কিছু কাজ করছে। জানা গেছে, শিশুদের ফেসবুক প্রোফাইল তার মা-বাবার ফেসবুক প্রোফাইলের সঙ্গে যুক্ত করা হবে। ফলে মা-বাবা শিশুদের ফেসবুক তত্ত্বাবধান করতে পারবেন। ওয়ালস্ট্রিট জার্নাল এক খবরে জানিয়েছে, শিশুর ফেসবুক প্রোফাইলের লিংক যেন তার বাবা-মার ফেসবুক প্রোফাইলের সঙ্গে যুক্ত করা যায়, এমন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছেন ফেসবুক সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী মার্ক জুকারবার্গ। যদি বিষয়টি সত্যিই ঘটে তাহলে বিষয়টা এমন দাঁড়াবে যে, পৃথিবীতে একজন নতুন শিশু জন্মগ্রহণ করেই ফেসবুক রেজিস্ট্রেশন করবে। এতে একসঙ্গে জন্ম সার্টিফিকেটের বিষয়টিও নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি দেশের সকল জনসংখ্যার নানা তথ্যও পাওয়া যাবে খুব সহজেই। ইতোমধ্যে বিভিন্ন দেশের গোয়েন্দারা তাদের দেশের জনগণের ওপর নজরদারি করতে ফেসবুকের সহযোগিতাও নিচ্ছে বলে খবরে প্রকাশ।
এছাড়াও ২০১৩ সালে ফেসবুক গ্রাফ সার্চ চালুর ঘোষণা রয়েছে। চলতি বছরে ফেসবুকে ভিডিও বিজ্ঞাপন চালু হয়েছে। ফেসবুকের নিউজ ফিডে ব্যবহারকারী না চাইলেও দেখতেই হবে ১৫ সেকেন্ডের বাধ্যতামূলক বিজ্ঞাপন। এ রকম আরো অনেক নতুন সেবাই হয়তো আমরা দেখতে পাবো চলতি বছরে কিংবা অদূর ভবিষ্যতে।

ফেসবুকের নেতিবাচক দিক
পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও ফেসবুক-ভীতি তৈরি হয়েছে। মনে রাখতে হবে, ফেসবুক যতটা না সামাজিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে ব্যবহার হচ্ছে তারচেয়ে বেশি ব্যবহার হচ্ছে অশ্লীলতা চর্চার মাধ্যম হিসেবে। এতে করে অনেক পরিবার তাদের ছেলেমেয়েদের নেট ব্যবহারে নিরুৎসাহী দেখা যায়। তার পরেও সারাবিশ্বে ৫৬ লাখ শিশু তা ব্যবহার করছে। এদিকে বর্তমান যুগে অধিকাংশ মা-বাবাই তাদের সন্তানের ইন্টারনেট কার্যকলাপ নিয়ে চিন্তিত। সন্তানরা কি করছে সে বিষয়ে নজর রাখার জন্য প্রায় ৭২ শতাংশ অভিভাবকই তাদের টিনএজ ছেলেমেয়েদের সঙ্গে ফেসবুকে ‘বন্ধু’ হিসেবে যুক্ত আছেন। এদের মধ্যে প্রতি ১০ জনের ছয়জনই স্বীকার করেছেন, তারা তাদের সন্তানের অজান্তেই তাদের কার্যকলাপের ওপর নজরদারি করেন। এভিজির তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ২১ শতাংশ অভিভাবক তাদের সন্তানের ফেসবুক প্রোফাইলে অবমাননাকর বার্তা বা অ্যাবিউজিভ মেসেজ পেয়েছেন। এসবই কিন্তু নেতিবাচক সংকেত।
ইদানীং ফেসবুকে যে ভাষার আধিক্য দেখা যায়, তা অশ্লীলতাকেও হার মানায়। ফেসবুকে পরকীয়া সম্পর্কটি খুব সহজেই বেড়ে যাচ্ছে। এটা রীতিমতো ভয়ঙ্কর। যাকে বলা হয় ‘ফেসবুক অ্যাবিউস’। সেখানে নৈতিকতা ব্যাকরণে ধূলির আস্তরণ পড়ে অনৈতিক আর সস্তা শব্দ-সমন্ধ স্থান করে নিচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকা রুমানা মঞ্জুরকে তার স্বামী সাঈদ ফেসবুকের কারণেই মানসিক অশান্তিতে থেকে ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটিয়েছিল। রামুতে ঘটে যাওয়া ঘটনাটি ফেসবুকেরই উস্কানিতে সংঘটিত। আবার ফেসবুকের মাধ্যমে ভালোলাগা, ভালোবাসা, প্রেম, প্রেমের পর দেখা-সাক্ষাত, অতঃপর…। এখানে ‘অতঃপর’-এর পর এমনকিছু ঘটনা ঘটছে  যা খোলামেলা না বলাটা শালীনতার অন্তর্ভুক্ত।

ভিন্নধারার অনুসন্ধানী ওয়েবসাইট উইকিলিকসের প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যসেঞ্জ বলেছেন, ফেসবুক মানুষের ইতিহাসে গুপ্তচর বৃত্তির কাজে নিয়োজিত সবচেয়ে ঘৃণাব্যঞ্জক হাতিয়ার। যারাই নিজ বন্ধুদের নাম ও তাদের জীবনের নানা দিক বা বৈশিষ্ট্য সম্পর্কিত তথ্য এই চ্যানেলকে সরবরাহ করছেন তাদের জানা উচিত যে, তারা আসলে বিনা অর্থে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সেবায় নিয়োজিত রয়েছেন। অন্য কথায় ফেসবুক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর জন্য তথ্যের বিশাল এক ভাণ্ডার। মার্কিন গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলো তথ্যের এইসব ভাণ্ডার বা উৎস ব্যবহার করছে। তথ্য পাচারের অভিযোগ ছাড়াও অতিমাত্রায় ফেসবুক ব্যবহারের ফলে নানা ধরনের সামাজিক সমস্যাও দেখা দিচ্ছে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে।
খোদ যুক্তরাষ্ট্রের একদল আইনজীবী জানিয়েছেন, দেশটির শতকরা ২৫ ভাগ তালাকের ঘটনা বা মোট তালাকের এক পঞ্চমাংশের জন্য দায়ী ফেসবুক। বাংলাদেশেও ফেসবুক প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে প্রতারণার আওয়াজ আসছে চারিদিক থেকে। সম্প্রতি ব্যাংক জব্দ, আইডি হ্যাকসহ নানা ক্ষতিকর সাইড প্রত্যক্ষিত। ফেসবুক নিয়ে বিপাকে পড়েছেন দেশের স্বনামধন্য তারকা শিল্পী-অভিনেত্রীরা। কে বা কারা তাদের ছবি ব্যবহার করে ফেসবুকে একাধিক অ্যাকাউন্ট খুলে রেখেছে। শুধু তাই নয়, ওগুলোর বরাত দিয়ে অশ্লীলতার সয়লাব বয়ে দিচ্ছে। ফাসিয়ে দিচ্ছে ভদ্র মহাজনকেও। এমন ঘটনা খুব সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে আজ। অহিও স্টেট ইউনিভার্সিটির একদল গবেষক জানান, যারা নিয়মিত ফেসবুক ব্যবহার করে তারা পরীক্ষায় খারাপ করে। এটি ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীদের জন্য করা হলেও স্কুল-মাদরাসার জন্যও তা প্রযোজ্য। ওই সংস্থার একজন গবেষক আরিন বলেছেন, প্রতিটি প্রজন্মেই থাকে ধ্বংসাত্মক একটি কালযন্ত্র। বর্তমান সময়ে ফেসবুক নামে এসেছে সে ধ্বংসাত্মক যন্ত্রটি।

ফেসবুকের ইতিবাচক দিক
প্রত্যেকটি জিনিসই তৈরি হয় ইতিবাচক চিন্তা থেকে। ফেসবুকও সে চিন্তারই ফসল। কেউ যদি ফেসবুকের অপব্যবহার করে তবে সে-ই তার প্রায়শ্চিত্য করবে। তাছাড়া ফেসবুকে সবাই অশ্লীলতা, অপরের ইজ্জত হনন, অর্থনৈতিক ধ্বংস সাধন ও বন্ধুত্বের পরিচর্চাতেই ব্যস্ত নয়। ইদানীং ফেসবুকে একে অপরের সুখ-দুঃখ ভাগাভাগির পাশাপাশি শিল্প-সাহিত্য চর্চা, সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে নেয়া মহতী উদ্যোগও চলছে। ফেসবুকের হরেক স্ট্যাটাস আপডেটের মাধ্যমে নিজের প্রতি মুহূর্তের হাল জানিয়ে দিচ্ছে সবাইকে। কেবল কি তাই! যেই বন্ধু এই স্ট্যাটাসে লাইক কিংবা কমেন্ট করছেন তার বন্ধুদের টিকারে ভেসে উঠছে আপনার মনের কথা! ‘টিকার’ ফেসবুকের মোটামুটি নতুন সংযোজিত অংশ। অনেকেই সোশ্যাল অ্যাওয়ার্নেস কথা, সুসংবাদ, কোনোও দুর্লভ ছবি, গান, মজার কিংবা সাম্প্রতিক ঘটনা বন্ধুকে ট্যাগ করে দেয়া যায়, যা খুব সহজেই তার নজরে আসে এবং তার মতামত পাওয়া যায়। ইদানীং ফেসবুকের পাতায় পাতায় বাজারের দেখা মিলে, কাপড়, গহনা, আসবাব, বই নানা যন্ত্রপাতিসহ অন্যসব পণ্যের সমাহার ছাড়াও ঈদ, বিয়ে, সভা-সেমিনার, মাহফিল, দলীয় কর্মকাণ্ডসহ নানা দুর্লভ তথ্য পাওয়া যায়। যা এত সহজেই পাব বলে ধারণাও করা যেত না।
বিশ্বব্যাপী ফেসবুকের মতো মাধ্যমগুলোকে রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মসূচি বাস্তবায়নের হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহার করছেন। ফেসবুক-জাতীয় ওয়েবসাইটগুলোকে কল্যাণকর কাজেই বেশি ব্যবহার করা সম্ভব। যেমন, আরব বিশ্বে স্বৈরশাসন বিরোধী ইসলামি গণজাগরণে জনগণ ও বিশেষ করে যুবসমাজ ফেসবুকে প্রতিবাদ ছড়িয়ে দেয়ার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছে। এমনকি বৃটেনসহ ইউরোপের কোনো কোনো দেশেও সরকার-বিরোধী গণপ্রতিবাদ আন্দোলন সংগঠিত করতে ফেসবুক-এর মতো চ্যানেলগুলো ব্যবহৃত হয়েছে।
এ ফেসবুকে অনেক সৃজনশীল পোস্ট দেখে অভিভূত হতে হয়। কি অসাধারণ সংগ্রহ এবং আইডিয়া তাদের! মুহূর্তে যেন ফিরে যাই দুরন্ত শৈশব, কৈশোর ও যৌবনের অলিগলিতে। আমাদের বোধ এবং ভাবনার দরজায় যেন কড়া নাড়ে একেকটি ছবি। কখনও একটি ছোট্ট কথা অনেক কথার মালা হয়ে অনেক চেনা বিষয়কে নতুন করে চিনিয়ে দেয়। যেমন এক বন্ধু লেখেছিলেন, ‘মা তখনও কাঁদে যখন সন্তান খাবার খায় না। আবার মা তখনও কাঁদে যখন সন্তান খাবার দেয় না’। আরেকটি স্ট্যাটাস, ‘এক বছরে একটি গাছ আমাদের জন্য কত উপকার করে জানেন? শুনুন, ৭৫০ গ্যালন বৃষ্টির পানি শোষণ করে। ১০টি এয়ার কন্ডিশনারের সমপরিমাণ শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ করে। ৬০ পাউন্ডের বেশি ক্ষতিকারক গ্যাস বাতাস থেকে শুষে নেয়। এবার আপনিই ঠিক করুন কেন গাছ কাটবেন এবং কেন গাছ লাগাবেন না।’ এসব স্ট্যাটাস মানবিক মূল্যবোধ সৃষ্টিতে অতুলনীয়। আমাদের বোধের শেকড়ে নাড়া দেয়ার জন্য এমন পোস্ট মাইলফলক ভূমিকা রাখবে।

ভালো-মন্দের দোলাচলে ফেসবুক
আজকের সময়ে ফেসবুকে ভালো-মন্দ নিয়ে জানার আগ্রহ প্রায় সবার। তাই বিষয়টি আরো ভালো করে জানার জন্য বিভিন্ন শ্রেণির ফেসবুক ব্যবহারকারীর দ্বারস্ত হতে হয়েছে আমাকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্টবিজ্ঞানের ছাত্র আনোয়ার হোসেন সাগর বলেন, ফেসবুক বর্তমান সময়ে যাদুকরী একটি প্রযুক্তি। ফেসবুকের কল্যাণে আমাদের জীবন অনেক সহজ হয়ে গেছে। অবশ্য একটি শ্রেণি এর অপব্যবহারও করছে, তাতে আমাদের কিছু যায় আসে না। অনুরূপ বক্তব্য ইডেনের ফাইনাল ইয়ারের ছাত্রী নাসরিন সুলতানারও। তবে নাসরিন আরেকটু বাড়িয়ে বলে যে, যদি ফেসবুক নিয়ে কর্তৃপক্ষের আরেকটু সচেতন ও সতর্ক দৃষ্টি থাকত তবে অনেক ভালো হত। তিতুমীর সরকারী কলেজের মেথম্যাটিক্সের ছাত্র জাহাঙ্গীর আলম জানান, ফেসবুকের কল্যাণে লাভবান হওয়ার চেয়ে ক্ষতি হয়েছে বেশি। যে সময় ফেসবুক ছিল না, সে সময় আমরা ফেসবুকের ঘাটতিও উপলব্ধি করিনি। আজ ফেসবুকের কারণে বহুলাংশে মানুষ প্রতারণার আশ্রয় নিচ্ছে। অনেকে একাধিক অ্যাকাউন্ট খুলে একেকটিতে একেক রকম মুখোশ উন্মোচন করছে। কাওরান বাজারের ভেতরে একটি গোদামে ব্যবসায়ী আব্দুল হাশিমকে দেখলাম কম্পিউটারে ফেসবুক খুলে টিপাটিপি করতে। কেন ফেসবুক ব্যবহার করেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ব্যবসায়িক কাজে ফেসবুকের প্রয়োজন হয়। এই যেমন আমার দোকানের বিভিন্ন পণ্যের এ্যাড দিয়ে দিতে পারছি। আমাদের ঘরানার সবাই বিষয়টি উপলব্ধি করতে পারছে। অনেকেই ফেসবুকে দেখে এসে পণ্য চাচ্ছে। ফেসবুকে খারাপ কী আছে জানতে চাইলে তিনি সাফ বলে ফেললেন, একটা অপরাধ অবশ্য করি তাহলো, একাধিক অ্যাকাউন্ট খুলে বা বন্ধু-বান্ধবদের বলে নিজেদের পণ্যের বিজ্ঞাপনে ‘লাইক’ মেরে অনেক সময় ভূয়া জনপ্রিয়তা বাড়াতে হয়। এতে একটি বিজ্ঞাপন হয়ে যায়। এ ছাড়াও খারাপ আছে বলে শুনে থাকলেও ব্যবসায়িক চাপে সেদিকে নজর দেয়ার সময় থাকে না।  আমরা জানি, ফেসবুকে অনেক জরুরি খবর খুব স্বল্প সময়ে শেয়ার করা যায়। ফেসবুকের কল্যাণে ইসলামের বহু নিদর্শন তথা কুরআন-সুন্নাহ ও শরিয়তের মাসলা-মাসায়েল বিষয়ে প্রচার-প্রচারণা সহজ হয়। অনেকে নিজের প্রকাশিত বই বা অন্য যে কোনো পণ্যের খুব সহজেই বিজ্ঞাপন দিতে পারে। তবে মাঝে-মধ্যে কিছুসংখ্যক আননোন ফ্রেন্ডের কারণে কিছু বিপত্তিকর পোস্টের ঝামেলাও পোহাতে হয়।

Share

বিজয়ের রমজান শানিত হোক আমাদের প্রার্থনার ভাষা

মুহাম্মাদ যাইনুল আবেদিন

আজ রকমারি ইফতারির স্বাদে উৎসবমুখর আমাদের রমজান। ইফতারের বর্ণিল আয়োজন আর ঈদের চঞ্চল স্বপ্নের দাপাদাপিতে আমরা ভুলেই গেছি এই রমজান ছিল একদা মুষ্ঠিবদ্ধ বিজয়ের প্রতীক। দুর্দণ্ড অসম শক্তিকে প্রবল দুঃসাহসে পরাজিত করে একদা বুক টান করে দাঁড়িয়েছিল ‘সত্য’। আর সময়টা ছিল রমজান মাস।
হিজরি দ্বিতীয় বছর। হযরত রাসুল সা. সংবাদ পেলেন প্রতিপক্ষ মক্কাবাসি মেরুদণ্ড শক্তিশালী করতে বড় ধরনের একটি সম্মিলিত বাণিজ্যিক দল পাঠিয়েছে সিরিয়ায়। হযরত রাসুল সা. গোয়েন্দা মারফত জানতে পারলেন ৪০ সদস্যের এই ব্যবসায়ী টিম সফল বাণিজ্যের পর এখন মক্কায় ফেরার পথে। এও জানতে পারলেন তারা অর্থনৈতিকভাবে শক্তি সঞ্চয় করছে মুসলমানদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের যুদ্ধের প্রস্তুতি স্বরূপ। শত্র“র পায়ের তলে মাটি জমতে দেয়া কোনো বিচক্ষণ প্রতিপক্ষের কাজ নয়। শত্র“ পক্ষকে ঘায়েল করার সহজ পন্থা হলো তাদের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়া। হযরত রাসুল সা. সমরনীতির এই পরীক্ষিত পথেই এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। কিন্তু করুণাময় আল্লাহ দয়া করে বেঈমানদের কোমরের জায়গায় তাদের মাথাগুলো বিছিয়ে দিলেন। ফলে ব্যবসায়ীকাফেলা কৌশলে পালিয়ে গেলেও হাতের মুঠোয় এসে ধরা দেয় আবু জাহালের নেতৃত্বে মক্কার সব রাঘববোয়াল। সমকালীন সর্বোচ্চ সমরাস্ত্রে সজ্জিত প্রায় ১০০০ বাহিনীর প্রতিপক্ষের সামনে মাত্র ৩১৩ জন মুসলমান। শত্র“পক্ষের হাতে ২০০ ঘোড়া। আর মুসলমানদের হাতে মাত্র দুটি ঘোড়া, ৭০ টি উট। শত্র“পক্ষের সঙ্গে আছে সমরসঙ্গীত গায়িকা নটিনীর দল। আছে দামামা বাদক। এই অসম যুদ্ধে জয় হয় মুসলমানদের। কোরআনের ভাষায় আর বদর যুদ্ধে যখন তোমরা হীনবল ছিলে, আল্লাহ তোমাদের সাহায্য করেছিলেন। সুতরাং তোমরা আল্লাহকে ভয় করো। যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারো।’ (আল-ইমরান : ১২৩)

বিজয়ের এই শুভ সময়টি ছিল পবিত্র রমজানের সতের তারিখ। আমরা স্মরণ করতে পারি আল্লাহ তায়ালা রমজানুল মুবারকের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেছেন ‘রমজান মাস, যাতে মানুষের দিশারী এবং সতপথের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যাসত্যের পার্থক্যকারীরূপে কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে।’ (বাকারা : ১৮৫)
রমজানের রোজা ফরজ হয়েছে হিজরি ২য় সালে। এই মাসেরই শবেকদরে অবতীর্ণ হয়েছে পূর্ণ কোরআন। অবতীর্ণ হয়েছে সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারীরূপে। এবং শুধু যৌক্তিক ও বিশ্বাসিকভাবেই নয়, বাস্তবে সত্য ও মিথ্যার চূড়ান্ত পার্থক্য করে দেখিয়ে দিয়েছেন বদর ময়দানে। আমাদের ইতিহাসের এই শির উঁচু করা অধ্যায় নানা কারণে আজ স্ববিশেষ স্মরণীয়।
প্রথমত এই কারণে আজও আমরা পৃথিবীব্যাপী হতবল। আমাদের নিষ্পাপ শিশু, অসহায় নারী ও বৃদ্ধদের পবিত্র রক্তে প্রতিদিন মনের সুখে আলপনা আঁকছে বেঈমানরা। আর আবু জাহালদের মানসপুত্রেরা দিকে দিকে গাইছে সমরসঙ্গীত। জাতিসংঘের প্রশিক্ষিত কসাইবাহিনী অবিরাম বাজিয়ে চলেছে যুদ্ধের বন্য দামামা। জ্বলছে কাশ্মীর, সিরিয়া,্ আফগান, বসনিয়া, ইরাক আর প্রাণের ফিলিস্তিন। অভাগা মিয়ানমার তো জ্বলছেই। জ্বলছে মুসলিম ঐতিহ্যের দেশ মিশর। পুড়ে ছাই হয়েছে গাদ্দাফির লিবিয়া বেঈমানদের বিষ গণতন্ত্রের অনলে।
এই আগুনে প্রতিদিন ঢালা হচ্ছে নতুন ঘি। অনেক রক্ত দানের পর সেই ইরাকে মুসলমানরা একটু ঘুরে দাঁড়াবার চেষ্টা করছে, বীর সাদ্দামের ভূমি তিকরিতে স্বাধীনতার শ্লোগান শব্দময় হতে চলেছে, অমনি কসাই আমেরিকার রাজা ওবামা বাণী দিয়ে বলেছেন ইরাকি জনগণকে জঙ্গিদের হাত থেকে রক্ষা করতে এবং আঞ্চলিক ও মার্কিন স্বার্থে দেশটির সরকারী বাহিনীকে সাহায্য করা হবে। (আমাদের সময় : ২১ জুন’১৪)
শুধু সাহায্য করবে বলেই বসে থাকেনি এই কসাই সম্্রাট। পত্রিকার ভাষ্যÑ ‘ইরাকে আরও সেনা পাঠাল যুক্তরাষ্ট্র’। ইরাকে আরও তিনশতাধিক সেনা পাঠিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরাকে আগে পাঠানো সেনাদের মতো নতুনরাও রাজধানী বাগদাদে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস ও দেশটিতে অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বে থাকবে।
সুন্নি বিদ্রোহীদের হামলার পর দুই সপ্তাহ আগে ইরাকে পৌঁনে তিনশতাধিক সেনা পাঠিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। ইরাকি সেনাদের যুদ্ধ পরিকল্পনায় সহায়তা করতে তিন’শ সামরিক বিশেষজ্ঞ পাঠায় যুক্তরাষ্ট্র্। যাদের একটি অংশ এরই মধ্যে দেশটিতে পৌঁছে কাজ শুরু করে দিয়েছে। এ ছাড়াও জঙ্গিদের হামলা ঠেকাতে ও তাদের ওপর নজরদারী করতে অস্ত্রশজ্জিত ও গোয়েন্দাকাজে নিয়োজিত বেশ কিছু মার্কিন বিমান ও ড্রোন দেশটিতে কাজ করছে। (আমাদের সময় : ২ জুলাই’১৪)
কী মধুর বর্ণনা। স্বদেশে নির্যাতিত সুন্নি মুসলমানগণ যখনই স্বাধীনতার শ্লোগানে মুষ্ঠিবদ্ধ তখনই তারা হয়ে গেল জঙ্গি। আর বিদেশি বর্বর ড্রোনবাজরা এসেছে বাগদাদের স্বার্থ রক্ষা করতে সশস্ত্র বিমান নিয়ে। অধিকন্তু নির্লজ্জের মতো চলছে ‘মার্কিন স্বার্থ’ রক্ষার কথা। কথা হলো, যে বাগদাদের প্রতিষ্ঠাতা হযরত উমর, হযরত আলী যে বাগদাদের শাসক, যে ইরাকে আজও ঘুমিয়ে আছেন হযরত হুসাইন রাযি. এবং উম্মাহর শ্রেষ্ঠ ইমাম আবু হানিফা রহ.- সেখানে আবার বেঈমানদের স্বার্থ কী?
কথা কিন্তু এখানেই থেমে যায়নি। ইরাকের এই নতুন যুদ্ধে বেরিয়ে এসেছে গোপন বন্ধুত্বের তালিকা। পত্রিকায় খবর বেরিয়েছে ‘ইরাকে সুন্নি বিদ্রোহীদের রুখতে যুদ্ধবিমান সরবরাহ করছে ইরান। রাশিয়া থেকে যুদ্ধ বিমান ক্রয়ের কয়েকদিন পর ইরাকে ইরানের য্্ুদ্ধবিমান পৌঁছানোর শক্ত প্রমাণ পাওয়া গেছে। উল্লেখ্য, এর আগে ইরাকি শিয়া সরকারকে সাহায্য করতে যুদ্ধবিমান ও ড্রোন মোতায়েন করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এ থেকে বোঝা যায় ইরাকের শিয়াপন্থি সরকারকে রক্ষা করতে দুই বিরোধপূর্ণ দেশ- যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান এক সঙ্গে কাজ করছে’। (আমাদের সময় : ৩ জুলাই’১৪)
আমাদের দুঃসময় হলেও শিয়াদের প্রকৃত মুখ মুখোশ ভেঙে বেরিয়ে এসেছে। মুখে যতই তারা নিজেদের মুসলমান বলে দাবি করুক, তারা যে মুসলমানদের শত্র“Ñ যুক্তরাষ্ট্র খুব সরলভাবে তা প্রমাণ করে দিয়েছে।
এদিকে মিয়ানমারের মুসলমানরা তো প্রতিদিনই নির্যাতিত হচ্ছে। হচ্ছে আশ্রয় হারা। গতকালও (২.৭.১৪) মিয়ানমারের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মান্দালায় অবস্থিত মুসলিম দোকান ও মসজিদে হামলা চালিয়েছে কয়েক’শ বৌদ্ধ। ২০১২ সালের জুলাই থেকে শুরু হওয়া বৌদ্ধ-মুসলিমের এই দাঙ্গায় পত্রিকার ভাষ্যমতে ২০০ জনের বেশি নিহত হয়েছে। আর ঘর ছাড়া হয়েছে এক লাখ ৪০ হাজারেরও বেশি মুসলমান।
আমাদের পহেলা কেবলা অবরুদ্ধ। ফিলিস্তিন ইহুদি নির্যাতনের যেন প্রশিক্ষণ মঞ্চ। এইতো একদিন আগেও তিন ইসরায়েলি কিশোরের লাশকে কেন্দ্র করে ইসরায়েল ৩০ দফা বিমান হামলা করেছে ফিলিস্তিনের ওপর। কী ভয়াবহ কথা!
ইরান, আমেরিকা, ইসরায়েল, মিয়ানমারসহ সব বেঈমান যখন একজোট আমাদের বিরুদ্ধে; আমাদের শিশু, বৃদ্ধ নারীদের নিষ্পাপ রক্তে যখন প্রতিদিন তৃপ্ত হচ্ছে বেঈমান পিশাচদের খুনি আত্মা তখনই আমাদের দুয়ারে উপস্থিত রমজান-বিজয়ের মহানায়ক। আজ বিশ্বমুসলিমের সামনে এ এক মহা প্রশ্ন। কিভাবে গ্রহণ করবো আমরা এই বিজয়ের বার্তাবাহক মাসকে।
রমজান। যেখানে খুলে যায় প্রভুর রহমতের সব কপাঠ। ক্ষমা ও মুক্তির আশিষে ছেয়ে যায় আমাদের আকাশ। লাখ লাখ হাফেজের কণ্ঠনিঃসৃত তেলাওয়াত আল্লাহর আরশকে বেঁধে দেয় মাটির পাটাতনের সঙ্গে  যে পাটাতনে আমাদের বাস। আমরা যখন ক্লান্ত, ক্ষুধার্তপ্রাণে ইফতারের পসরা সাজিয়ে বসি দস্তরখানে, আরশ তখন মুখিয়ে থাকে আমাদের প্রার্থনা শোনার জন্যে। ইফতারের শুভ মুহূর্তে এবং রাতের নিশুতিপ্রহরে আমাদেরই চোখে পানিতে রচিত আমাদের ভবিষ্যত ইতিহাস। এই ইতিহাস রচিত হয় খোদার আরশে। পৃথিবীর কোনো শক্তি যা কোনোদিন মিটাতে পারে না।
আজ প্রতিটি মুসলমানকে ভাবতে হবে পৃথিবীর সব মুসলমান একই পরিবারভুক্ত। এও ভাবতে হবে আমার ঘরে আমি নিরাপদ। আমার সন্তান নিরাপদ। অথচ আমার ভাই ও তার সন্ত্রানরা শত্র“র অস্ত্রের মুখে। এই নিরাপত্তায় আমরা নিজেদেরকে নিরাপদ ভাবতে পারি না। ভাইকে শত্র“র যুদ্ধবিমান আর ড্রোনের নিচে রেখে শান্তিতে ঘুমোতে পারে যে পাষাণ সে কী করে দাবি করবে আমি মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সা. এর উম্মত। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না রমজানের সাধনা শুধু উপোস করা নয়; এতো ঈমানকে শানিয়ে নেয়ার মওসুম। বস্তুর শক্তিকে উজিয়ে মহান মালিকের শক্তিকে উপলব্ধি করার মাস। নিরস্ত্রগণ যখন আল্লাহনাম ভরসা করে সত্য প্রতিষ্ঠার আহ্বানে ঝাপিয়ে পড়ে আল্লাহ তখন আকাশ থেকে ফেরেশতা পাঠিয়ে সাহায্য করেন। এ কেবল বদর যুদ্ধের কথাই নয়; এই সত্য সর্বকালের। তাই আমাদের প্রার্থনার ভাষা হোক ব্যাপক ও দিগন্তস্পর্শী। আমাদের ঈমান হোক আসমানি সাহায্যে নির্ভর এবং বিশ্বের সকল মুসলিম মজলুমানের বিজয় প্রত্যাশায় আকুল। আমাদের মন ও সামর্থ্য ছড়িয়ে পড়–ক আমাদের মজলুম ভাইদের মুক্তি আন্দোলনে। আমাদের কান্নায় ফিলিস্তিনের শহিদ শিশুদের রক্ত জেগে ওঠুক রাতের গভীরে। আমাদের ইফতার ও জুমার মোনাজাতে ভাষা পাক মজলুম ইরাক, কাশ্মীর, মিয়ানমার ও রক্তাক্ত সিরিয়া। মজলুম মুসলমানের প্রতি আমাদের আহত হৃদয় শক্তিমান বন্ধুরূপে জেগে ওঠুক। ইরান, আমেরিকা, ইসরায়েল, মিয়ানমারে জালেমদের প্রতি আমাদের আত্মায় পুষিত ঘৃণা লাভাময় হোক প্রতিটি মজলুম জনপদে। বিজয়ের মাসে বিজয় লেখা হোক আমাদের মজলুমান ভাইদের নসীবে।

Share

তাবলীগ আন্দোলন জিহাদ

প্রথম পর্ব

মুহাম্মদ মামুনুল হক

সাম্প্রতিক সময়ে ইসলামি মহলে একটি বিষয় নিয়ে খুব দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ও বিতর্ক লক্ষ করছি। বিষয়টি অনেক স্পর্শকাতরও বটে। দীর্ঘদিন ধরে দুচার কলম লিখবো- ভাবছিলাম। সময় সুযোগ হয়ে উঠছিলো না। অবশেষে সংক্ষিপ্ত পরিসরেই কিছু আলোকপাত করার উদ্দেশ্যে বক্ষমান লেখাটিতে হাত দিলাম। বর্র্তমান জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষিতে মুসলিম জাতির জন্য জিহাদের বিধান কোন পর্যায়ে পড়ে? অথবা জিহাদের প্রক্রিয়া কী হওয়া বাঞ্ছনীয়? সংশ্লিষ্ট বিষয়ে খোদ আলেম সমাজের মধ্যেই নানা মত ও বিভিন্ন বক্তব্য লক্ষ করা যায়।
নামকা ওয়াস্তের মুসলমানদের বাদ দিলেও যে সকল মুসলমান নিজেদের জীবনে আল্লাহর হুকুম মেনে চলার আবশ্যকতা অনুভব করে তারা মূলত তিনটি ধারায় বিভক্ত বা বিন্যস্ত হয়ে কাজ করছে।
১ম ধারা: একটি ব্যাপক জনগোষ্ঠী সারা মুসলিম বিশ্বেই এমন আছে যারা সকল বিরোধ ও সংঘাতমূলক পথ পরিহার করে শুধু নম্রÑকোমল ভাবে ইসলামের দাওয়াতি কাজে মনোনিবেশ করার পক্ষপাতি। ইতিবাচক ধারায় মানুষের ব্যক্তি সংশোধনের মাধ্যমে ইসলামের মিশনকে অগ্রসর করার চিন্তাই লালন করে এই ধারার মুসলমানগণ।
২য় ধারা: ইতিবাচক ধারায় দাওয়াতি কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি সমাজ ও রাষ্ট্রে ইসলামের বিজয় প্রতিষ্ঠাকামী এরা। মুসলিম অধ্যুষিত জনপদগুলোতে ব্যাপক গণমানুষের সম্পৃক্ততায় সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অন্যায়Ñঅবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ প্রতিরোধ গড়ে তুলে ইসলামি সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখে এরা। তবে সশস্ত্র জিহাদের পথে পা বাড়ায় না।
৩য় ধারা: তারা বর্তমান বিশ্ব প্রেক্ষাপটেও জিহাদের কোনো বিকল্প পথে চলতে প্রস্তুত নয়। মুসলিম দেশ অমুসলিম দেশ নির্বিশেষে সকল স্থানেই যাবতীয় সমস্যার সমাধান জিহাদের পথেই আছে বলে তাদের বিশ্বাস। জিহাদ ছাড়া অন্য  কোনো পথে মুসলমানদের বিজয় আসতে পারে নাÑ এমন চিন্তার বলিষ্ঠ ধারকÑবাহক এই মহলটি।
প্রিয় পাঠক! উপরোক্ত তিনটি ধারার মধ্যে মূলত কোনো বিরোধ নেই। বরং সঠিক ও ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বিচার করলে উত্তম সমন্বয় সাধন সম্ভব। আজকের প্রেক্ষিতে এই সমন্বয়ের প্রয়োজনও অত্যধিক। সমন্বয়হীন প্রান্তিক চিন্তা জাতিয় জীবনে মুসলিম জাতির জন্য অনেক বিপর্যয় ডেকে আনছে। এই সেদিন ৫-৬ মে’ ১৩ ঢাকার শাপলা চত্বরে যে নতুন বালাকোট রচিত হলোÑ তা নিয়ে খোদ ইসলাম পন্থীদের মধ্যে নানা রকম মত ও দৃষ্টিভঙ্গি লক্ষ করেছি। কাউকে বলতে শুনেছি এই ধরনের কর্মসূচির কী দরকার ছিলো? এগুলো রাজনীতি। যারা আল্লাহর পথে চলে, এই ধরনের কাজে তাদের সম্পৃক্ত হওয়া উচিত নয়। আবার বিপরীতমুখি মনোভাবও দেখেছি। অনেকে বলছে সেদিন যদি কিছু মানুষ সশস্ত্র প্রস্তুতি নিয়ে শাপলা চত্বরে থাকতো, তাহলে একতরফা ভাবে মুসলমানদেরকে এভাবে হত্যা করতে পারতো না যৌথবাহিনী। কাজেই তাদের বক্তব্য হলোÑ আগামীতে মাঠে নামতে হলে অস্ত্র নিয়েই নামতে হবে। অস্ত্র ছাড়া নামলে শুধু মার খেতে হবে। আল্লাহর নবীর সৈনিকদেরকে এভাবে হত্যা করার পর জিহাদে ঝাপিয়ে পড়া মুসলমানদের জন্য ফরজ হয়ে গেছে। এমন নানা ভাবনার মধ্য দিয়ে আসলে সঠিক চিন্তা কোনটি তা নির্ধারণ করা সাধারণ মানুষের পক্ষে বড়ই দুস্কর। আর  তাই সম্পূর্ণ বিষয়টির ওপর ইসলামের মূলনীতির আলোকে একটা ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি লালন করা অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিষয়টির পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণের সুবিধার্থে প্রথমে জিহাদ সংক্রান্ত দুটি আলোচনা প্রয়োজন। জিহাদের লক্ষ্য উদ্দেশ্য ও ধাপে ধাপে জিহাদ ফরজ হওয়ার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট।
জিহাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য
ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ও প্রাসঙ্গিকতাসহ জিহাদের উদ্দেশ্য আলোচনা করলে জিহাদের উদ্দেশ্যের একটি দীর্ঘ তালিকা প্রণীত হতে পারে। তবে কোরআন ও হাদিস পর্যালোচনা করে মৌলিকভাবে জিহাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হিসাবে দুটি বিষয়কে নির্ধারণ করা যায়।
এক. আল্লাহর বিধান তথা ইসলামের গৌরব ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠা।
দুই. কুফুর তথা খোদাদ্রহের প্রাবল্য খর্ব করা।
ইসলামি শরিয়তে জিহাদের মতো লড়াই সংঘাতের বিধান অন্তর্ভুক্ত থাকায় ইসলামের স্বভাবজাত দুশমনেরা বেশ সমালোচনামুখর হয়েছে। এবং ইসলামের মধ্যে সম্ভবত জিহাদ নিয়েই তাদের সমালোচনার মাত্রা সবচে বেশি। তাদের সমালোচনার মূল লক্ষ্যই হলো জিহাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য থেকে দৃষ্টি ভিন্ন দিকে ঘুরিয়ে জিহাদের পবিত্র বিধানকে প্রশ্নবিদ্ধ করা।
ইসলাম খুব সরল ও অকৃত্রিমভাবে মানুষকে বিশ্বাস শিক্ষা দিয়েছে যে, পৃথিবীটা হলো স্রষ্টার। পৃথিবীতে মানুষসহ যা কিছু আছে সবই সৃষ্টিকর্তার এখতিয়ারভুক্ত। সৃষ্টিকর্তা  মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এই জগতের শান্তি শৃঙ্খলার জন্য বিধান-ব্যবস্থা দিয়েছেন। যুগের বিবর্তনে স্রষ্টার দেওয়া সর্বশেষ ও চূড়ান্ত ব্যবস্থার নামই হলো ইসলাম। সুতরাং একটা রাষ্ট্রের মধ্যে যেরূপ রাষ্ট্রপ্রণীত বিধিÑবিধানের গৌরব রক্ষা হওয়া এবং রাষ্ট্রদ্রোহ দমন হওয়া যৌক্তিক ও কল্যাণকর পদক্ষেপ বলে বিবেচিত হয়, তদ্রুপ সৃষ্টি জগতে স্রষ্টার মর্যাদা রক্ষা পাওয়া ও খোদাদ্রোহ নির্মূল হওয়ার ব্যবস্থাও প্রশংসিত হতে বাধ্য। খোদাদ্রোহী কুফরি ব্যবস্থা প্রাবল্য নিয়ে  অধিষ্টিত থাকলে মানুষসহ সারা সৃষ্টিজগত তাদের স্রষ্টা প্রদত্ত মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। আর তাই খোদার এই জগতে খোদাদ্রোহের আধিপত্য ও প্রাবল্য মেনে নেওয়া যায় না। সুতরাং স্রষ্টার বিধানের মর্যাদা রক্ষা করা ও খোদাদ্রোহের অধিপত্য খর্ব করা অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গত উদ্দেশ্য। আর এই সুমহান উদ্দেশ্য অর্জনের জন্যই জিহাদের বিধান দেওয়া হয়েছে। কাজেই ইসলামের জিহাদ অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গত ও সুমহান একটি বিধান।
জিহাদ ধাপে ধাপে ফরজ হয়েছে
জিহাদের হাকীকত উপলদ্ধি করতে চাইলে এবং জিহাদ সংক্রান্ত বিভিন্ন বিতর্কের মীমাংসায় পৌঁছতে চাইলে ইসলামি শরিয়তে জিহাদের বিধান অর্ন্তভুক্ত হওয়ার প্রেক্ষাপট ও প্রেক্ষিত নিয়ে আলোচনা জরুরি। জিহাদের প্রেক্ষিত নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে প্রথমেই জানতে হবে যেÑ সকল তাগুত ও কুফুরের বিরুদ্ধে জিহাদের বিধান মহান আল্লাহ তায়ালা সূচনাতেই দেননি। বরং ধাপে ধাপে দিয়েছেন। ধাপগুলো নিুরূপ।
প্রথম ধাপ: জিহাদের বিধানের প্রেক্ষাপট নিয়ে আলোচনায় দেখা যায়, শুরুতে ইসলামি শরিয়তে জিহাদের অনুমতি ছিলো না। বরং নির্দেশ ছিলো শত্র“দের জুলুম নির্যাতন মুখ বুজে সহ্য করা আর ধৈর্য্য ধারণ করার। কোনোরূপ পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণের অনুমতি ছিলো না। আল্লাহর নবী সা. মক্কায় থাকাকালীন তের বছর জুড়েই এমন বিধান বলবৎ ছিলো। এই সময়ে আল্লাহর হুকুম ছিলো ‘আপনাকে যে আদেশ দেওয়া হয় তা আপনি প্রকাশ্যে প্রচার করুন। আর মুশরিকদের সাথে যুদ্ধ-বিগ্রহকে এড়িয়ে চলুন।’ (সুরা হিজর : ৯৪) ‘আপনি ক্ষমার নীতি অবলম্বন করুন। সৎ কাজের আদেশ দিন আর মুর্খ লোকদের এড়িয়ে চলুন।’ (সুরা আরাফ : ১৯৯)
মক্কি জিন্দেগিতে নবীজি সা. তার প্রিয় সাহাবিদের বলতেন ‘আমাকে ক্ষমা করতে বলা হয়েছে। সুতরাং তোমরা যুদ্ধে লিপ্ত হয়ো না। (নাসায়ি-বাইহাকি)
ইমাম কুরতুবি রহ. লিখেছেন ‘আল্লাহর নবীকে মক্কায় থাকাকালীন জিহাদের অনুমতি দেওয়া হয়নি।
দ্বিতীয় ধাপ: সুদীর্ঘ তের বছর একতরফা ভাবে জালেম কাফের গোষ্ঠীর সবধরনের নির্যাতন ও নিগ্রহের শিকার হয়ে নবীজি সা. মদিনায় হিজরত করলেন। মুসলমানদের জন্য নিরাপদ একটা আশ্রয়ের ব্যবস্থা হলো। কিছু শক্তিও সঞ্চিত হলো। তখন মহান আল্লাহ তায়ালা মুসলমানদের জিহাদের অনুমতি দিলেন। জিহাদ করতে বাধ্য করলেন না। বরং জিহাদের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে শুধু অনুমতি দিলেন। যারা স্বেচ্ছায় জিহাদ করতে আগ্রহী কেবলমাত্র তারাই জিহাদ করবে। এমন বিধান সম্বলিত আয়াত অবতীর্ণ হলো। ‘যারা আক্রান্ত হয় তাদেরকে (পাল্টা আক্রমণ তথা জিহাদের) অনুমতি দেওয়া হলো। যেহেতু তারা অত্যাচারিত। নিশ্চয় আল্লাহ তাদেরকে সাহায্য করতে সক্ষম।’ (সুরা হজ : ৩৯)
সুরা হজের এই আয়াতের অনুকূলে ইমাদুদ্দিন ইবনে কাসির রহ. লিখেছেন ‘অনেক পূর্বসূরীদের মতে এটিই হলো জিহাদের স্বপক্ষে অবতীর্ণ প্রথম আয়াত।
এভাবেই দীর্ঘদিন নিষিদ্ধ থাকার পর প্রথমেই সীমিত পর্যায়ে অর্থাৎ কাফেরদের দ্বারা মুসলমানগণ আক্রান্ত ও নির্যাতিত হওয়ার প্রেক্ষিতে স্বেচ্ছায় জিহাদ করেত ইচ্ছুকদেরকে জিহাদের অনুমতি প্রদান করা হলো।
তৃতীয় ধাপ: তৃতীয় ধাপে শুধু ঐচ্ছিক পর্যায়ের অনুমতি নয়। বরং কাফের জালেমদের দ্বারা মুসলিম জনপদ বা জনগোষ্ঠী আক্রান্ত হলে তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর অব্যশ্যকীয় বিধান দেওয়া হলো। অর্থাৎ এখন আর জিহাদ ঐচ্ছিক বিধান রইল না। বরং আক্রান্ত হলে পাল্টা আক্রমন ও রুখে দেওয়ার নিমিত্তে জিহাদ করা ফরজ হয়ে গেল। এই পর্যায়ে পবিত্র কোরআন পাকের আয়াত অবতীর্ণ হলো। ‘যারা তোমাদের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেয় তোমরা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো। আর সীমালঙ্ঘন করো না। নিশ্চয় আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীকে পছন্দ করেন না।’ (সুরা বাকারা : ১৯০)
চতুর্থ ধাপ: শুধু আক্রান্ত হওয়ার পরই নয় বরং আল্লাহর বিধানের বিজয় ও খোদাদ্রোহী শক্তির আধিপত্য ও প্রাবল্য খর্ব করার লক্ষে যেখানেই ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো আদর্শের বিজয় প্রতিষ্ঠিত থাকবে আল্লাহ তায়ালার সেই জমিনকে সেই হানাদারের কবল থেকে  মুক্ত করে সেখানে জিহাদ করাকে ফরজ করা হলো। জিহাদের মাধ্যমে খোদাদ্রোহী শক্তি অধ্যুষিত সকল ভূখণ্ডকে মুক্ত স্বাধীন করতে মুসলমানদের ওপর অবশ্যিক বিধান জারি করা হলো। সুরা তওবায় আল্লাহ তায়ালা বিস্তারিত হুকুম ঘোষণা করলেন। ৯ম হিজরি সনের হজ্বের প্রাক্কালে অবতীর্ন আল্লাহর এই হুকুম আল্লাহ ও তার নবী সা. এর পক্ষ থেকে আবু বকর সিদ্দিক রাযি. এর নেতৃত্বে আলী রাযি. হজ্বের সময় ঘেষণা করে শুনালেন।
‘সম্মানিত মাসগুলো (জিলকদ, জিলহজ্ব ও মুহাররম) শেষ হওয়ার পর খোদাদ্রোহী মুশরিকদেরকে যেখানে পাবে হত্যা করবে। তাদেরকে পাকড়াও করবে, আবদ্ধ করবে আর ওঁৎপেতে থাকবে  তাদের জন্য প্রতিটি ঘাটিতে।’ (সুরা তওবা:৫)
একই সুরায় আল্লাহ তায়ালা বলেছেন ‘আহলে কিতাবদের মধ্য থেকে যারা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে না এবং আল্লাহ ও তার রাসুল সা. যা কিছু হারাম করেছেন সেগুলোকে হারাম মানে না এবং সত্য দ্বীন অনুসরণ করে না, তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কর যে পযর্ন্ত না তারা নত হয়ে জিযইয়া (কর) আদায় করে। (সুরা তওবা : ২৯)
আর সুরা আনফালের বক্তব্য তো আরও দ্বার্থহীন ‘আর তোমরা কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কর যতক্ষন না ফিতনা নির্মূল হয়। এবং সম্পূর্ণ আল্লাহর আনুগত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। (সুরা আনফাল:৩৯)
ফিতনা অর্থ আল্লাহর বিধান পালনে প্রতিবন্ধকতা থাকা। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সকল ক্ষেত্রে আল্লাহর যত বিধান আছে এই বিধান শতভাগ বাস্তবায়িত করার পথে সকল বাধাÑপ্রতিবন্ধকতা যতদিন সম্পূর্ণরূপে উৎখাত না হবে ততদিন এ কথা বলা যাবে না যে, ফিতনা নির্মূল হয়েছে। আর এটা সম্ভব জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর দ্বীন কায়েমের মাধ্যমে। তাই সুরা আনফালের এই আয়াত দ্ব্যর্থহীনভাবে সারা পৃথিবীতে ইসলাম কায়েম না হওয়া পযর্ন্ত জিহাদ করাকে মুসলমানদের ওপর ফরজ করে দিয়েছে।

Share

বিশ্ব ইজতেমায় দাওয়াতী কাজের জযবা সৃষ্টি হয়

-মাওলানা মাহফুজুল হক

মাওলানা মাহফুজুল হক। শাইখুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক রহ. এর যোগ্য উত্তরসূরি। জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়ার স্বনামধন্য প্রিন্সিপাল। একই সঙ্গে বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব এবং বাংলাদেশে খেলাফত মজলিস-এর ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব। তাবলিগ সংক্রান্ত স্মৃতি, অনুভূতি, ও চলমান কার্যক্রমসহ নানা বিষয় নিয়ে ইজতেমা বার্তার পক্ষে তার মুখোমুখি হন আমিন ইকবাল।

ইজতেমা বার্তা : জীবনে প্রথম তাবলিগে যান কবে?
মাওলানা মাহফুজুল হক : যতদূর মনে পড়ে, কিতাব বিভাগের শুরুর দিকে পড়া অবস্থায় আমার বয়স যখন ১২/১৩ বছর তখন মসজিদ ওয়ারি তাবলিগের সাপ্তাহিক গাস্ত, তালীম ইত্যাদি কাজে শরিক হই। পরবর্তী কয়েক বছর পর চব্বিশ ঘণ্টার জামাতে ছাত্রদের সঙ্গে অংশ গ্রহণ করি। আর তিনদিনের জামাতে প্রথম যাই ১৯৯২ সালে দ্বিতীয়বার দাওরায়ে হাদিস পড়ার জন্য দারুল উলুম দেওবন্দে ভর্তি পরীক্ষা দেওয়ার পর, ফলাফল প্রকাশের আগের সময়টুকুতে।

ইজতেমা বার্তা : সাল বা চিল্লায় যাওয়ার সুযোগ হয়েছে কখনো?
মাওলানা মাহফুজুল হক : সালে যাওয়ার সুযোগ হয়নি। তবে, চিল্লায় যাওয়ার সুযোগ একবার আল্লাহ তায়ালা করে দিয়েছিলেন। দাওয়াতের সে সফর ছিলো ২০০১ সালে মোমেনশাহীর ফুলপুর থানায়।

ইজতেমা বার্তা : তাবলিগের কাজে দেশ-বিদেশে কোথায় কোথায় সফর করেছেন?
মাওলানা মাহফুজুল হক : দেশে তো চিল্লা উপলক্ষে মোমেনশাহী সফর হয়েছে। বিদেশে শুধুমাত্র তাবলিগের কাজে কোনো সফর হয়নি। তবে, দেওবন্দে থাকা অবস্থায় তাবলিগের কাজে তিনদিন সময় দেওয়া হয়েছে। তখন তাবলিগের মারকাজ নেযামুদ্দীনে যাওয়াও সুযোগ হয়েছিলো।

ইজতেমা বার্তা : তাবলিগ সংশ্লিষ্ট বিশেষ কোনো ঘটনা মনে পড়ে?
মাওলানা মাহফুজুল হক : আমাদের শ্রদ্ধেয় আব্বাজান, শাইখুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক রহ. একবার তিনদিনের তাবলিগে গেণ্ডারিয়া এলাকার এক মসজিদে যান। শায়েখের সঙ্গে মাদরাসার কয়েকজন মুহাদ্দিস-উস্তাদ, মাদরাসার কমিটি এবং এলাকার মুরব্বিরাও অংশগ্রহণ করেন। সেখানে শায়েখের যাওয়াকে কেন্দ্র করে কাকরাইলের অনেক মুরব্বি আসেন। শায়েখ গুরুত্বপূর্ণ বয়ান রাখেন। সে বয়ানে কাকরাইলের মুরব্বিগণসহ এলাকার সাধারণ মুসল্লিরা খুব আপ্লুত হন। তখনকার চিত্রটা আমার আজও মনে পড়ে।

ইজতেমা বার্তা : জীবনের প্রথম ইজতেমায় যাওয়া হয় কবে?
মাওলানা মাহফুজুল হক : সুনির্দিষ্টভাবে মনে পড়ছে না। তবে, যতটুকু মনে হয় বিছানাপত্র নিয়ে তিনদিনের জন্য হেদায়েতুন্নাহু পড়ার সময় যাওয়া হয়েছিলো। তখন লালবাগ মাদরাসায় পড়ি।

ইজতেমা বার্তা : বাংলাদেশের বরেণ্য আলেমদের জন্য ইজতেমার মাঠে খাস রুমের ব্যবস্থা থাকে। শাইখুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক রহ. এর জন্যও ছিল। সে রুমে শায়েখের সঙ্গে যাওয়া হয়েছে কখনো? সেখানকার কিছু চিত্র যদি বর্ণনা করতেন।
মাওলানা মাহফুজুল হক : হ্যাঁ, শায়েখের সঙ্গে যাওয়া হয়েছে। সেখানে বাংলাদেশের বড় বড় মুরব্বি আলেমগণ উপস্থিত হন। তাদের জন্য কয়েকটি খাস রুমের বিশেষ ব্যবস্থা রয়েছে। শায়েখের জন্যও ছিলো। শায়েখের জীবদ্দশায় আমি দেখেছি, বর্তমানে হাটহাজারির হুজুর আল্লামা আহমদ শফি দা. বা., বসুন্ধরার মুফতি আব্দুর রহমান সাহেব, কুমিল্লার আল্লামা আশরাফ আলী সাহেব, ফরিদাবাদ মাদরাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা আব্দুল কুদ্দুস সাহেবসহ ঢাকার বড় বড় আলেম-ওলামা সেখানে উপস্থিত হতেন। বয়ান শুনতেন। বড় বড় আলেমদের একসাথে পাওয়ার সুবর্ণ সুযোগ তৈরি হয় সেখানে।

ইজতেমা বার্তা : ইজতেমার মাঠে অনেক মুসল্লিদের বলতে শোন যায় যে, বিদেশি মেহমানদের চেয়ে বাংলাদেশি মুরব্বি বা আলেমগণ বাংলায় বয়ান করলে আমাদের বুঝতে সুবিধা হতো। এ বিষয়টি আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করবেন।
মাওলানা মাহফুজুল হক : তাবলিগের মুরব্বিগণ পরামর্শের মাধ্যমে যে তরতিব বা নিয়ম চালু করেছেন, আমি মনে করি গুরুত্বের দিক থেকে সেটাই বেশি গ্রহনীয়। কারণ, বিদেশি মেহমানদের বয়ানে গুরুত্ব থাকে বেশি। আলেম-ওলামা, সাধারণ মুসল্লিসহ সবারই আলাদা আগ্রহ থাকে তাদের প্রতি। তাছাড়া সে সব বয়ানের তো বাংলায় সুন্দরভাবে অনুবাদ করার ব্যবস্থাও আছে। বাংলাদেশি মুরব্বিরাও প্রতিদিন কোনো না কোনো বয়ান করেন। যারা এমন প্রশ্ন তুলেন, আমার মনে হয় তাদের সংখ্যা খুবই অল্প।
ইজতেমা বার্তা : দাওয়াত ও তাবলিগের চলমান কার্যক্রম সম্পর্কে কিছু বলুন।
মাওলানা মাহফুজুল হক : বিশ্বব্যাপী তাবলিগের কাজ আল্লাহর রহমতে একই সূত্রে পরিচালিত হচ্ছে। সৌভাগ্যের বিষয় হলো, দাওয়াতের এ কাজ আমাদের ভারত উপমহাদেশ থেকেই শুরু হয়েছে। এবং এর মূল কেন্দ্র উপমহাদেশের ভারতে। গুরুত্বপূর্ণ সব কাজ পরিচালিত হয় ভারত, পাকিস্তান আর বাংলাদেশ থেকে। সব মিলিয়ে তাবলিগের চলমান কার্যক্রম অব্যশই প্রশংসার দাবি রাখে। বাকি, এক্ষেত্রে আমার একটু কথা হলো, ওলামায়ে কেরামগণ নিজেদের অন্যান্য দ্বীনি কাজ ঠিক রেখে তাবলিগে যেমন সময় আরেকটু বেশি দেওয়া উচিত, তাবলিগের মুরব্বিদেরও উচিত আলেমদের সঙ্গে বেশি বেশি যোগাযোগ রাখা এবং তাবলিগের কাজে আলেমদের আরও সম্পূক্ত করার চেষ্টা করা এবং তাবলিগ সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ গ্রহণ করা। কারণ, আলেম-ওলামাগণ ওভাবে সময় না দিতে পারলেও তাবলিগের কল্যাণে পরামর্শ দেওয়ার মতো যোগত্য তারা রাখেন এবং দাওয়াদের কাজে যথেষ্ট পরিমাণ আগ্রহ রাখেন।

ইজতেমা বার্তা : মাদরাসার ক্লাস বন্ধ রেখে বিশ্ব ইজতেমায় ছাত্রদের অংশ গ্রহণের গুরুত্ব কতটুকু?
মাওলানা মাহফুজুল হক : বুঝমান ছাত্রদের জন্য ক্লাস বন্ধ রেখে বিশ্ব ইজতেমায় অংশগ্রহণ করাটাই আমি শ্রেয় মনে করি। কারণ, আমাদের এই কওমি মাদরাসায় তালীমের পাশাপাশি সমভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয় তারবিয়াতের প্রতি। দাওয়াত ও তাবলিগের সঙ্গে সম্পৃক্ততা ছাত্রদের তারবিয়াতের লাইনে অনেকটা অগ্রসর করে দেয়। বিশ্ব ইজতেমা যেহেতু তাবলিগেরই অন্যতম অংশ, সেখানে শরীক হতে পারা এবং দেশ-বিদেশের হাজার হাজার ওলামায়ে কেরাম, বুজুর্গানেদ্বীন এবং লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ মুসল্লির সঙ্গে একত্রে থাকতে পারা সৌভাগ্যের বিষয়। এতে করে ছাত্রদের মাঝে দাওয়াতী কাজের জযবা সৃষ্টি হয়।

 

Share

আওয়ামীলীগ-জামায়াত সংঘাত : আলেম সামাজের ভাবনা

মুহাম্মদ মামুনুল হক

বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে একটা রহস্যময়তা রয়েছে। রাজনীতি নিয়ে যারা ভাবেন এবং যথেষ্ট পরিমাণ ভাবেন, তারাও এর কোনো কুল-কিনারা খুঁজে পাননা। আমার কাছে এর মূল কারণ যা মনে হয়, রাজনীতি ও রাজনীতিবিদদের ভেতর-বাইরের অমিল। রাজনীতিবিদগণ বাইরে যেমন সুন্দর সুন্দর কথা বলেন। দেশ-জনতার প্রতি ভালোবাসা দেখান। বাহিরটা তাদের যতো সুন্দর ভেতরটা তাদের ততই কদর্য। রাজনীতির অঙ্গনের এই ভেতর-বাইরের অমিলের ব্যাপারটাকে অন্যান্য ক্ষেত্রের মতো গড়পড়তায় বলে দেয়া যায় না যে, ভালো মন্দ সব জায়গাতেই আছে। সুতরাং রাজনীতিতেও থাকবে। কারণ রাজনীতিতে ভালো আর মন্দের তফাৎটা এতই বেশি মনে হয় যে, মন্দের বিপরীতে ভালোর পরিমাণটা এখানে কোনো পরিসংখ্যানেই আসার উপযুক্ত নয়। জানিনা এ থেকে মুক্তি মিলবে কি না আদৌ। মিললেও কীভাবে এবং কবে? তা এক আলেমুলগায়েব আল্লাহই বলতে পারেন।
সাম্প্রতিক সময়ের রাজনীতি ও রাজনৈতিক অঙ্গনের অস্থিরতা দেশের চিন্তাশীল সকল মানুষকে গভীর উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। উৎকণ্ঠায় গোটা জাতি এর ভবিষ্যৎ পরিণাম নিয়ে। সাধারণ মানুষের মতো আমরাও উদ্বিগ্ন ও চিন্তিত। আমাদের উদ্বেগ ও চিন্তার মাত্রা বোধ করি অন্য দশজনের চেয়ে একটু বেশি। কারণ যুগপৎ ধর্ম ও দেশ আমাদের চিন্তার বিষয়। মানুষের নিরাপত্তা ও ইসলামের ভবিষ্যৎ চিন্তা আমাদের উদ্বেগের কারণ। রাজনীতির খুব জটিল মারপ্যাচে না গিয়ে ইসলাম ও দেশের কল্যাণ চিন্তায় ইসলামিক অঙ্গণ থেকে স্রেফ একটি সাধারণ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা বক্ষমান নিবন্ধের উদ্দেশ্য। আমাদের এই পর্যবেক্ষণের মূল বিষয় বাংলাদেশের বর্তমান সংঘাতময় রাজনৈতিক পরিস্থিতি। যুদ্ধাপরাধের বিচার, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ও নাস্তিক মুরতাদগোষ্ঠী কর্তৃক মহান আল্লাহ তা’য়ালা, মহানবী হযরত মুহাম্মদ সা. ও ইসলামের চরম অবমানা এই তিন ইস্যুতে এখন অগ্নিগর্ভ বাংলাদেশ। ইস্যু তিনটি ভিন্ন ভিন্ন হলেও সময়, প্রেক্ষাপট ও পারিপার্শিকতার কারণে অনেক ক্ষেত্রে এক সূত্রে গেথে যাচ্ছে এবং জাতি দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ছে।
উপরোক্ত তিন ইস্যুর ভিত্তিতে আমাদের জাতীয় রাজনীতির পর্যবেক্ষণের পূর্বে সুবিধার জন্য জাতীয় রাজনীতির পক্ষগুলো সম্পর্কে একটু আলোচনা করে নেয়া প্রয়োজন। ইসলামিক অঙ্গণ থেকে আমরা বাংলাদেশের রাজনীতিতে পাঁচটি পক্ষকে ক্রিয়াশীল দেখতে পাই। যার দুটি ইসলামি অঙ্গনের আর তিনটি এর বাইরের। পক্ষগুলো যথাক্রমে এক. ধর্ম নিরপেক্ষ ও বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী আওয়ামীলীগ। দুই. ইসলামি মূল্যবোধ ও বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী বিএনপি। তিন. ইসলামবিদ্বেষী, কম্যুনিজমে বিশ্বাসী বামপন্থী দলগুলো। চার. মডারেট ইসলাম ও মাওলানা মওদুদীর দর্শনে বিশ্বাসী জামায়াতে ইসলামী। পাঁচ. কওমি মাদরাসা কেন্দ্রিক আলেম-ওলামাদের নেতৃত্বাধীন ইসলামি শক্তি। ভোটের রাজনীতিতে হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয়পার্টির বিশাল ভূমিকা থাকলেও রাজনৈতিক দর্শনের ক্ষেত্রে বিএনপির সাথে মৌলিক ব্যবধান কম। বিদ্যমান পাঁচটি পক্ষের মধ্যেই পরস্পর কিছু স্বার্থ সংশ্লিষ্ট দ্বন্দ্ব-সংঘাত রয়েছে। ঐতিহাসিক ভাবেই এ অঞ্চলের মানুষ দুটি শিবিরে বিভক্ত। একটি হলো ইসলামের পক্ষাবলম্বী আর অপরটি হলো ইসলামবিরোধী। মুসলিমলীগ থেকে আওয়ামী মুসলিমলীগ হয়ে আওয়ামীলীগের জন্ম সূত্রের ইতিহাস একথাই প্রমাণ করে যে, তারা নিরেট মুসলিম বলয় থেকে বেরিয়ে গিয়ে ভিন্ন বলয়ের আনুকূল্যে রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এতদঞ্চলে মুসলিমবিরোধী শক্তির প্রতিনিধিত্বকারী দল হিসেবেই আওয়ামীলীগের উত্থান। অপর দিকে এর বিপরীত ধারার যে শক্তিগুলো বিভিন্নভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল এবং সবচেয়ে বড় কথা যে বিশাল জন সমর্থন ছিল তারই প্রতিনিধিত্বের রূপ নিয়ে আত্মপ্রকাশ ঘটে বিএনপির। আওয়ামীলীগ ও বিএনপির এই জন্মগত প্রেক্ষাপট স্বাভাবিক ভাবেই দুই দলকে দুই শিবিরের সমর্থন পেতে সাহায্য করেছে। নদীর স্রোত যেমন ভাসমান কচুরিপানাগুলোকে অনুকূল প্রান্তে নিয়ে জড়ো করে তেমনি এই দুটি স্রোত ভাসমান পক্ষগুলোকে আপন আপন অনুকূলে একত্রিত করেছে। সেই সূত্রেই চরম ইসলাম বিদ্বেষী, নাস্তিক খোদাদ্রোহী শক্তির সখ্যতা আগাগোড়াই আওয়ামীলীগের সাথে। অপর দিকে ইসলামের পক্ষের জনসমর্থন পায় বিএনপি। আওয়ামীলীগ, বিএনপি শুধুই ক্ষমতার রাজনীতি করে। এই কারণেই লক্ষ্য করা যায়, আগাগোড়া ইসলামের দোহাই দিয়ে রাজনীতি করলেও প্রকৃতপক্ষে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থেকেও ইসলামের পক্ষে বড় কোনো কাজ বিএনপি করেনি। সমর্থন আদায় করতে যতটুকু করতে হয় দায়সাড়া গোছের সেটুকুতেই আটকে থেকেছে তারা। আর বলার মতো আকেটি বড় বিষয় হলোÑ ইসলামের বিরুদ্ধে বিএনপির নিজস্ব কোনো এজেন্ডা নেই। পক্ষান্তরে ইসলামবিরোধী কট্টর বামপন্থীদের প্ররোচনায় আওয়ামীলীগের দ্বারা ইসলামের বিরুদ্ধে বড় বড় পদক্ষেপ পরিচালিত হয়েছে এই বাংলাদেশে। অবশ্য এ কারণে ইসলামের পক্ষের জনসমর্থন সব সময় গিয়েছে আওয়ামীলীগের বিরুদ্ধে।
বিগত নির্বাচনের আগে আওয়ামীলীগ তার এই দীর্ঘদিনের ইসলামবিরোধী পরিচয়ের খোলস থেকে বেরিয়ে আসার জন্য কিছু পদক্ষেপ নিয়েছিল। (যদিও তাতে তারা অটল থাকতে পারেনি) সেই সাথে ইসলামপন্থীদের সাথে দূরত্ব কমানোর চেষ্টাও তারা করেছে। এক্ষেত্রে আওয়ামীলীগ কৌশলী ভূমিকা গ্রহণ করে। ইসলামপন্থীদের মধ্যকার জামায়াত ও কওমি মহলের বিভাজনকে উপলব্ধিতে নিয়ে কওমি মহল ও অন্যান্য জামায়াতবিরোধী ইসলামি পক্ষের সাথে সখ্যতা গড়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু বরাবরের মতো আওয়ামীলীগের মাথায় বামপন্থীদের ভুত সাওয়ার থেকেছে। সেজন্য বামপন্থী রাজনীতি থেকে আওয়ামীলীগে যোগদানকারী ও বাম নেতা-নেত্রীরা প্রায়ই ইসলাম, ইসলামি রাজনীতি, সংবিধানে অবশিষ্ট ইসলামের নাম নিশানা বিষয়ে কঠোর ও বিদ্বেষমূলক বক্তব্য প্রদান অব্যাহত রাখে। এমনকি সর্বশেষ শাহাবাগে গড়ে ওঠা গণজাগরণমঞ্চ যে সকল দাবি নিয়ে মাঠে নামে তার মধ্যে অন্যতম প্রধান দাবি ছিল ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করা। যদিও সরকারের বর্তমান কৌশলের আলোকে পরে শাহাবাগীরা সংশোধন করে শুধু জামায়াত-শিবিরের রাজনীতির বিরুদ্ধে কথা বলে। আওয়ামীলীগের বর্তমান এই কৌশল, কওমি মাদরাসা কেন্দ্রিক ইসলামি মহলের প্রতি আওয়ামীলীগের কিছুটা নমনীয় মনোভাব, আওয়ামীলীগ-জামায়াতে ইসলামির বর্তমান মুখোমুখি অবস্থান ও আলেম সমাজের সাথে জামায়াতে ইসলামীর দীর্ঘদিনের বিরোধের প্রকৃতি নিয়ে একটু পর্যালোচনা করা দরকার।
আওয়ামীলীগ-জামায়াত সংঘাত, আলেম সমাজ-জামায়াত বিরোধ ও আলেম সমাজের সাথে আওয়ামীলীগের নমনীয়তা সব মিলিয়ে এখানে একটি ত্রিভূজ সম্পর্ক-সংঘাতের ব্যাপার রয়েছে। যারা ইসলামি রাজনীতি নিয়ে ভাবেন তাদের বিষয়টির ওপর গভীর দৃষ্টি দিতে হবে। এজন্য আমরা প্রথমে আলেম সমাজ বনাম জামায়াতে ইসলামী বিরোধের এবং পরে আওয়ামীলীগ বনাম জামায়াতে ইসলামী বিরোধের প্রকৃতি তুলে ধরতে চাই।
আলেম সমাজ বনাম জামায়াতে ইসলামী বিরোধ :
এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ আলেম ওলামাদের সাথে মাওলানা মওদুদী সাহেবের প্রতিষ্ঠিত জামায়াতে ইসলামের বিরোধ নতুন নয়; দীর্ঘ অর্ধ শতাব্দী কালের। এই বিরোধ মূলত কোনো রাজনৈতিক চিন্তা দর্শনের বিরোধ নয়। বরং নিতান্তই কিছু ধর্মীয় চিন্তা, বিশ্বাস ও দর্শনের বিরোধ। উপমহাদেশের আলেম সমাজের মধ্যে ১৯৪৭ এর ভারত বিভক্তির সময় যে বড় রকমের রাজনৈতিক মতপার্থক্য ছিল। হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রহ. এর শিষ্য শাগরেদগণ ভারতের বিভক্তি তথা পাকিস্তান আন্দোলনের পক্ষে ছিলেন। পক্ষান্তরে হযরত মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানী রহ. এর নেতৃত্বে তার অনুসারীগণ অভিভক্ত ভারতের পক্ষে ছিলেন। রাজনৈতিক এই ইস্যুতে উপমহাদেশের আলেম সমাজ স্পষ্টত:ই দুই শিবিরে বিভক্ত হওয়া সত্ত্বেও মাওলানা মওদুদী সাহেব ও তার প্রতিষ্ঠিত জামায়াতে ইসলামীর ব্যাপারে অভিন্ন অবস্থানেই ছিলেন। জামায়াতে ইসলামী আগাগোড়াই আলেম সমাজের সাথে তাদের বিরোধকে একটি রাজনৈতিক বিরোধ হিসেবে চিত্রিত করার প্রয়াস চালিয়েছে। কিন্তু সচেতন আলেম সমাজ কখনোই এই প্রয়াসকে প্রশ্রয় দেননি। আওয়ামীলীগ বনাম জামায়াতে ইসলামী বিরোধ :
জামায়াতে ইসলামীর সাথে আওয়ামীলীগের বিরোধ মূলত রাজনৈতিক বিরোধ। আওয়ামীলীগ ইসলাম বিদ্বেষী ধর্ম নিরপেক্ষ রাজনৈতিক দর্শনের দল। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ইসলামি শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ঘোর বিরোধী রাজনৈতিক দর্শনই আওয়ামীলীগের দর্শন। রাষ্ট্রের সকল স্তর থেকে ধর্মীয় পরিচয় তুলে দিয়ে শুধু ব্যক্তি পর্যায়ে ধর্মপালনের চিন্তায় বিশ্বাসী তারা। সংবিধানে ইসলাম ও মুসলমানদের সামান্য প্রাধান্যও তাদের অসহ্য। তাদের সংসদীয় উপনেতার ঘোষণা হলোÑ ‘সংবিধান থেকে ধর্মের কালো ছায়াকে অপসারণ করা হবে।’ অপর পক্ষে জামায়াতে ইসলামী হলো রাষ্ট্রে ইসলামী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গঠিত একটি ধর্মীয় রাজনৈতিক সংগঠন। এ ছাড়া আওয়ামীলীগ ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যকার আরো একটি বড় বিরোধের বিষয় হলো স্বাধীনতা যুদ্ধে দুই দলের বিপরীতমুখী ভূমিকা।

আওয়ামীলীগ ও জামায়াতে ইসলামীর বর্তমান মুখোমুখি অবস্থান ও আলেম সমাজের ভাবনা
আওয়ামীলীগ ও জামায়াতে ইসলামীর অতীতÑ বর্তমান কর্মকাণ্ড ও চরিত্র নিয়ে সমালোচনামূলক আলোকপাতের মাধ্যমে আলেম সমাজের ভাবনার জন্য কিছু বিষয় তুলে ধরতে চাই। জামায়াতে ইসলামীর সাথে আওয়ামীলীগের ঐতিহাসিকভাবে বিরোধ থাকলেও বর্তমান মুখোমুখি অবস্থানটি একটু ভিন্নভাবেই বিশ্লেষণ করতে হবে। আওয়ামীলীগ ও তার মিত্রদের মধ্যে দুটি ধারা রয়েছেÑ
এক. যারা মনে প্রাণে ইসলামি রাজনীতি ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় ইসলামের উপস্থিতির প্রতি চরম বিদ্বেষ পোষণ করে। এদের রাজনীতি হলো রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে ইসলামকে নির্মূল করা।
দুই. যারা ক্ষমতার পাগল। ক্ষমতার জন্য যা করা দরকার তাই করতে এরা প্রস্তুত। সাম্প্রতিক সময়গুলোতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে জোটবদ্ধতার হাওয়া লেগেছে। এই সূত্রে বিএনপি জামায়াত বেশ সংহত এক জোটে পরিণত। বিপরিত দিকে আওয়ামীলীগ বামপন্থী গোষ্ঠী গাটছড়া বাধা। জোটের এই রাজনৈতিক মেরুকরণে আওয়ামীলীগ চায় বিরোধী জোটকে দুর্বল করতে। এই জন্য তারা জামায়াতের দুর্বল স্থানকে টার্গেট করেছে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় দলটির রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে মানবতা বিরোধী অপরাধের নামে যুদ্ধাপরাধের বিচার করার উদ্যোগ নিয়েছে আওয়ামীলীগ। আওয়ামীলীগের এই উদ্যোগের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে দেখা আজকের প্রেক্ষাপটে অতীব প্রয়োজন। ইতিপূর্বে আওয়ামীলীগ আরও দুইবার ক্ষমতায় ছিল। স্বাধীনতার পরপর আধিপত্য নিয়ে একবার এবং ৯৬ থেকে ২০০১ পর্যন্ত দ্বিতীয়বার। তখন কিন্তু তারা এমন উদ্যোগ নেয়নি। স্বাধীনতার পর পর আওয়ামীলীগ বাংলাদেশে, যাই চাইত করতে পারত। কিন্তু তখন তারা জামায়াতের বিচার করেনি। ৯৬ এর মেয়াদেও করেনি। তাহলে এবার তারা এই ইস্যুতে এতোটা মরিয়া কেন? এর সম্ভাব্য দুটি উত্তর হতে পারে।
প্রথমটি হলোÑ স্বাধীনতা পরবর্তী ঐ সময়ে জামায়াতে ইসলামী এতোটা শক্তিশালী ছিল না। আর ৯৬ এর মেয়াদে তাদের সাথে লিয়াজোঁর সম্পর্ক ছিল। আর দ্বিতীয়টি, বিএনপির সাথে জোটবদ্ধ হয়ে জামায়াত আওয়ামীলীগের ক্ষমতার পথে বাঁধা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তাই তাদের সাথে এতো বিরোধ।
যদি জামায়াতের বিরুদ্ধে আওয়ামীলীগের কঠোর ভূমিকার কারণ এই হয়ে থাকে যে, জামায়াত আগে এতা শক্তিশালী ছিল না, বর্তমানে তাদের শক্তিমত্ত্বা বেড়ে যাওয়ার কারণেই তাদের ওপর এই খড়গ। মৌলবাদী ও ইসলামী রাজণৈতিক দল হিসেবে জামায়াতের উত্থানই যদি এই কঠোরতার কারণ হয়ে থাকে তাহলে হক্কানী আলেম সমাজের জন্য চিন্তার বিষয় হলোÑ যারা জামায়াতের মডারেট কাট-ছাট মার্কা ইসলামকেই বরদাশত করতে পারে না সত্যিকার ইসলামপন্থীদের যদি রাজনৈতিকভাবে সেই শক্তি অর্জন হয়, তাহলে পূর্ণাঙ্গ ইসলামি শক্তি ও কঠোর ইসলামি অনুশাসনের রাজনীতির সঙ্গে তাদের আচরণ কী হবে? কোনো কোনো ধর্মনিরপেক্ষতাবাদিকে জামায়াতের বিরোধিতা করার সময় এমনও বলতে শোনা যায় যে, তারা মওদূদীর ইসলামে বিশ্বাসী নয় তারা মদিনার ইসলামে বিশ্বাসী।
এক্ষেত্রে নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে, এই ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা কোন কওমি আলেমের কাছ থেকে ‘মওদূদীবাদ’ শব্দটি শিখে নিয়েছে। কিন্তু হায়! এই ধরনের মুর্খ ধর্মনিরপেক্ষবাদিরা যদি জানতো, তাদের ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদের সাথে মওদূদী সাহেবের ইসলামের যতো বিরোধ, মদিনার ইসলামের সাথে তাদের মতবাদের বিরোধ আরো অনেক বেশি! সুতরাং এই বিবেচনায় সম্পূর্ণ ব্যাপারটিকে ইতিবাচকভাবে ভাববার কোনো সুযোগ নাই। দ্বিতীয় সম্ভাবনা ছিল বিএনপির সাথে জোট বদ্ধতাই এ কঠোরতার কারণ। তাহলে এটাকে ‘রাজনীতির খেল’ বলতে হবে। এমন অনেক খেল চলতে থাকে নিষ্ঠুর রাজনীতিতে। এক্ষেত্রে কট্টর ইসলাম বিদ্বেষী বামপন্থী গোষ্ঠি যারা ইসলামি রাজনীতিকে একবারেই বরদাশত করতে পারে নাÑ আওয়ামীলীগের এই রাজনৈতিক গেমের মধ্যে দিয়ে তারা তাদের দৃষ্টিতে এদেশের ইসলামি রাজনীতির সবচেয়ে শক্তিশালী গোষ্ঠী জামায়াত-শিবিরকে নিশ্চিহ্ন করতে চায়। আর আওয়ামীলীগের মূল লক্ষ হলো সম্ভাব্য দুটি সুবিধার যে কোন একটি লাভ করা। অর্থাৎ যুদ্ধাপরাধের বিচারের নামে চাপ প্রয়োগ করে বিএনপি থেকে জামায়াতকে বিচ্ছিন্ন করা আর তা না পারলে জামায়াতকে কোনঠাসা করে বিরোধী জোটকে দুর্বল করে দেয়া।
আওয়ামীলীগের এই কৌশল বিষয়ে সাধারণ নাগরিক হিসেবে বলতে হয়, রাজনীতিতে অনেক খেলা চলে। ল্যাং মারামারিও চলে। বিরোধী পক্ষকে ঘায়েল করার সম্ভাব্য সকল পন্থাই গ্রহণ করা হয়। আমরা এগুলো দেখতে দেখতে অভ্যস্ত। কিন্তু খেলতে খেলতে এমন শক্তিশালী, দেশের সর্বত্র সেকড় গেড়ে বসা একটি সংগঠনের শীর্ষ নেতৃত্বকে ফাঁসি দিয়ে দিবেÑ এই পর্যায়ের রাজনীতির খেল কতোটা বাস্তবসম্মত?
কোনো দেশে অভ্যুত্থান পরিস্থিতি ছাড়া সাধারণ রাজনৈতিক পরিবেশে এই পর্যায়ের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃবর্গকে ফাঁসি দিয়ে হত্যা করার নজির বিরল। এমন পরিস্থিতিতে জামায়াত-শিবিরের জন্য ব্যাপারটি জীবন মরণের প্রশ্ন হয়েই দেখা দিয়েছে। এই ধরনের পরিস্থিতে বেঁচে থাকার জন্য যা করার দরকার তা করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প পথ খোলা থাকে না।
জামায়াত-শিবির জীবন-মরণের প্রশ্নে যা করছে আওয়ামীলীগ এই ধরণের পরিস্থিতির শিকার হলে কমপক্ষে এর চেয়েও দশগুণ বেশি তাণ্ডব চালাতো। আওয়ামীলীগ যদি এ বিষয়ে আরো অগ্রসর হয় সে ক্ষেত্রে সচেতন মহলের উদ্বেগ হলো যে, দেশ একটি দীর্ঘ মেয়াদি গৃহযুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাবে। আল্লাহ না করুন, যদি এমন অনাকাক্সিক্ষত কোনো পরিস্থতির সৃষ্টি হয়Ñ তাহলে এর দায়ভার কি সম্পূর্ণ আওয়ামীলীগের ওপর বর্তাবে না?
আমরা পরিস্কার বুঝতে চাই, জামায়াতের বিরুদ্ধে যদি এমন পদক্ষেপই নিতে হবে, তাহলে সেটা ৭১-৭৫ এর সময়ে নেয়া হয়নি কেন? ৯৬ এ কেন তাদের সাথে লিয়াজোঁ করে এক সাথে পথ চলা হলো? কেন গোলাম আযমের আশীর্বাদ গ্রহণ করা হলো? এসব করে করে জামায়াত-শিবিরকে দেশের সবচেয়ে সংঘবদ্ধ শক্তিতে পরিণত হওয়ার পথে সহযোগিতা করা হয়েছে। কিন্তু নিজেদের ক্ষমতার রাজনীতির পথে যখন শক্তিশালী বাঁধা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, তখন চরমপন্থা অবলম্বন করতে চাইছে।
জনগণের জানমালের নিরাপত্তার প্রশ্ন উপেক্ষা করে, দেশের মধ্যে গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতি সৃষ্টি করে রাজনৈতিক স্বার্থ উদ্ধার করবে; বিবেকহীনতার এই সময়েও এতোটা নৃশংস রাজনীতি মেনে নিতে বিবেকের সাড়া পাওয়া যাবে না। আমাদের বক্তব্য হলোÑ রাজনৈতিক ও আদর্শিক দেওলিয়াত্বের এই সময়েও বিরোধে জড়াবেন, জড়ান। আবার আতাঁত করবেন, করেন। পর্দার পিছনে আঁতাত করবেন। আর বাইরে এসে লম্বা লম্বা বক্তৃতা দিয়ে জনগণের সরলতার সাথে বিশ্বাস ঘাতকতা করবেন তাও করেন। কিন্তু দয়া করে এতোটা চরমন্থী হয়ে উঠবেন না যে দেশ একটি দীর্ঘ অরাজকতার মধ্যে পতিত হয়।
নাগরিকদের মধ্যে এই যে বিদ্বেষ ও চরমপন্থী মনোভাব তৈরি হচ্ছে এর কারণেই প্রকাশ্যে পিটিয়ে পিটিয়ে জীবন্ত মানুষকে হত্যা করে তার মরদেহের উপর নৃত্য ও উল্লাস করার পেশাচিকতা আমরা প্রদর্শন করতে পেরেছি। মানবতার এই বিপর্যস্ত চিত্র জাতি হিসেবে আমাদের জন্য কি খুবই সুখকর?
বিরোধি থাকলে আদর্শ, যুক্তি ও সৃজনশীলতার মাধ্যমে মোকাবিলা করুন। নির্মূল করে দেওয়ার চরমন্থী চিন্তা আজকের পৃথিবীতে বড় ভয়ঙ্কর।
আওয়ামীলীগ তাদের বর্তমান জামায়াত বিরোধী এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে পারুক অথবা না পারুক দেশের সাধারণ জনগণের মধ্যে কিন্তু স্পষ্ট একটা বিভাজন তৈরি হয়ে যাচ্ছে। এই ক্ষেত্রে আওয়ামীলীগের কর্মকাণ্ড বুমেরাং হয়ে যেতে পারে।
ধর্মপ্রাণ ব্যাপক জনগোষ্ঠী আওয়ামীলীগের মাত্রাতিরিক্ত বাড়াবাড়ির কারণে জামায়াতের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে উঠতে পারে। যার কিছু কিছু আলামতও দেখা যাচ্ছে। এই পয়েন্ট থেকে আলেম সমাজের ভূমিকা খুবই সুচিন্তিত ও দায়িত্বশীল হওয়া বাঞ্চণীয়। জামায়াতের সাথে আলেম সমাজের দ্বন্দ মোটেও আওয়ামীলীগের মতো নয়। রাজনৈতিক সুবিধার জন্য জামায়াত কখনো আওয়ামীলীগের বন্ধু হয় আবার কখনো শত্র“ হয়। তাদের এই বন্ধুত্ব ও শত্র“তা রাজনৈতিক স্বার্থকে জড়িয়ে। আর আলেম সমাজের দ্বন্দ সম্পূর্ণ ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে। আদৌ কোনো সাময়িক স্বার্থ কিংবা রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে নয়। জামায়াত চায় এটাকে রাজনৈতিক কালার দিতে। অতি উৎসাহি কোন কোন আলেমের ভূমিকাও জামায়াতের উদ্দেশ্য সফলে সহায়ক বলে মনে হয়।
দীর্ঘ আলোচনার উপসংহারে এসে বলতে চাই, আলেম সমাজকে বর্তমান আওয়ামীলীগ জামায়াত দ্বন্দের ক্ষেত্রে নিজেদের ভূমিকা নিজেদের অবস্থান থেকেই নির্ধারণ ও পালন করতে হবে। আওয়ামীলীগের এজেন্ডা কিংবা তাদের বক্তব্যের সমর্থনে জামায়াত বিরোধিতায় নামলে জামায়াতের সাথে আলেম সমাজের দ্বন্দও রাজনৈতিক রূপ লাভ করবে এবং আওয়ামীলীগের বাড়াবাড়ির কারণে ধর্মপ্রাণ মহল জামায়াতের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ার পাশাপাশি আলেম সমাজের কাছ থেকে দূরে সরে যেতে পারে।
আর জামায়াতের সাথে মৌলিক ও আদর্শিক মতপার্থক্য গুলোকে স্বযতেœ রাজনৈতিক রঙ চড়ানো থেকে বিরত থাকতে ও রাখতে হবে। কাদিয়ানীদের দোসর শাহরিয়ার কবিরদের মুখ থেকে যেমন মওদূদীর ইসলাম ও মদিনার ইসলামের পার্থক্য শুনে খুশি হওয়ার কিছু নেই। আওয়ামীলীগারদের কাছ থেকেও তদ্রুপ। এরা মদিনার ইসলামকে বুঝলে মওদূদীর ইসলামকেই নিজেদের জন্য অধিকতর নিরাপদ মনে করবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
জামায়াতের সাথে আলেম সমাজের বিরোধকে হ-য-ব-র-ল অবস্থা থেকে নিরাপদে রেখে পরিস্কারভাবে জামায়াতকে বলে দিতে হবে, আলেম সমাজের সমর্থন পেতে হলে মওদূদী সাহেবের বিভ্রান্ত চিন্তা ও দর্শনগুলো থেকে প্রকাশ্যে সরে আসার ঘোষণা দিতে হবে। সেই সাথে জামায়াতের ব্যাপারে আরো সুনির্দিষ্ট দুটি অভিযোগ আলেম সমাজের পক্ষ থেকে উত্থাপিত হওয়া বাঞ্চণীয়। এক. জামায়াত-শিবির ইসলামের নামে রাজনীতি করা সত্ত্বেও তাদের বিভিন্ন কর্মসূচি ও কর্মকাণ্ডে নানা রকম অনৈসলামী কর্মকাণ্ডের অনুপ্রবেশ ঘটছে।
দুই. তারা ইসলামের নামে রাজনীতি করে, অথছ বিভিন্ন ইসলামি ইস্যুতে এমন কি আল্লাহ, রাসূল সা. ও পবিত্র কুরআনের সম্মান রক্ষায় তাদের জোড়ালো কোনো ভূমিকা নেই। উপরন্তু আলেম সমাজের সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক নিরেট ইসলামি ইস্যুর বিভিন্ন কর্মসূচিতে অনুপ্রবেশ করে সেগুলোকেও তারা তাদের দলীয় রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার কতে চায়। এটা বড়ই কাপুরুষোচিত ও ধূর্ত আচরণ!

Share

আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ পরিচিতি

মু. তাউহীদুল ইসলাম

দেশ-বিদেশে এখন মুসলিম উম্মাহর দুর্দিন চলছে। বাতিলের বহুমুখী ষড়যন্ত্র তাদের অস্তিত্বকে হুমকির সম্মুখীন করেছে। ব্যক্তি, সামাজ, দেশ ও বিশ্ব- সবই যেন তাদের বিরুদ্ধে আমরণ যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। তাই মুসলিম ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সভ্যতা-সংস্কৃতি আজ চরম হুমকির শিকার। শুধু তাই নয়, মুসলিম উম্মাহর জীবন পরিচালিত হয় যে শরীয়ার আলোকে, সেই শরীয়াকে আজ সমাজের সামনে বিতর্কের বিষয় হিসাবে উপস্থাপন করে তাকে খেলনার বস্ত্ততে পরিণত করা হচ্ছে। এ অবস্থা বেশি দিন স্থায়ী হলে আমরা সত্যি অস্তিত্ব সঙ্কটে পড়ে যাবো। তাই দেশ, জাতি ও মুসলিম উম্মাহকে যাবতীয় ফিতনা-ফাসাদ থেকে রক্ষার স্বার্থে আমাদেরকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে যেতে হবে।

এজন্য প্রথমেই প্রয়োজন মুসলিম উম্মাহ হিসাবে আমাদের পরিচয় জানা। এই পরিচয়ের মধ্য দিয়ে আমরা আমাদের আদর্শের সন্ধান পাবো। আর আমরা যখন আমাদের আদর্শের সন্ধান পাবো, তখন আমাদের আদর্শ বিরোধী সব দল ও ফিরকা চিহ্নিত হয়ে যাবে। স্পষ্ট হয়ে যাবে তাদের যাবতীয় বাতিল কর্ম-কান্ড। আর আদর্শ বিরোধী দল ও ফিরকা এবং তাদের কর্ম-কান্ড সম্পর্কে যখন জানা হয়ে যাবে, তখন আমাদের কর্মপন্থা নির্ধারণও সহজ হবে। আল্লাহ তাআলা তাউফীক দান করুন।

আমাদের পরিচয়:

আমাদের সংক্ষিপ্ত ও সাধারণ পরিচয়, আমরা ‘মুসলিম’ বা ‘মুসলমান’। আর কুরআন-হাদীসের আলোকে কিছুটা বিস্তৃত ও বিশেষায়িত পরিচয়, আমরা ‘আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ’।

‘মুসলিম’ তো আমাদের ধর্মীয় পরিচয়। এ নামের সূচনার কথা পবিত্র কুরআনে এসেছে। হযরত ইবরাহীম আ. সর্বপ্রথম এ শব্দ ব্যবহার করেছেন। যুগে যুগে নবী-রাসূলদের আনীত সত্যধর্ম- কোনোরূপ পরিবর্তন-পরিবর্ধন না করে- যারা গ্রহণ ও অনুসরণ করেছেন এবং করেন, তারাই ‘মুসলমান’। একটি হাদীসে এর সমর্থনও পাওয়া যায়। হাদীসটি যথাস্থানে উল্লেখ করা হবে।  মুহাম্মদ সা. ‘ইসলাম’ ধর্মকে যে রূপ ও আঙ্গিকে তার উম্মতকে উপহার দিয়েছেন, আর তার একনিষ্ঠ অনুসারী সাহাবায়ে কেরাম রা. যেভাবে এই ‘ইসলাম’কে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, তাকে কোনো ধরনের রদবদল না করে যারা এই ‘ইসলাম’ এর অনুসরণ-অনুকরণ করে কিংবা চর্চা ও প্রচার করে, তারাই ‘আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ’।

 

সুতরাং আমাদের পরিচয়, আমরা ‘মুসলিম’ এবং ‘আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ’।

 

যুগের পালা বদলে ‘ইসলাম’ ও ‘মুসলিম’ শব্দের প্রতি বেশ অবিচার শুরু হয়। যে কেউ নিজ খিয়াল-খুশি মতো ‘ইসলাম’ এর ব্যাখ্যা করে এবং সে অনুযায়ী জীবন যাপন করে নিজকে ‘মুসলিম’ বলতে ও ভাবতে শুরু করে। তাই ‘আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ’ নামে আমাদের পরিচয় বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। রাসূল মুহাম্মদ সা. এর মাধ্যমে আমাদের সঠিক পরিচয় জানিয়ে আল্লাহ তাআলা আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন। তাই ‘আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ’র সঠিক মর্ম ও তাৎপর্য অনুধাবন করা জরুরি।

আমাদের পরিচয় ‘আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ’ কেন?

সুন্নাহ ও জামাআর আনুসারী যারা তারাই ‘আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ’। তাই ‘সুন্নাহ’ ও ‘জামাআহ’ কী, বিষয়টি স্পষ্ট হওয়া দরকার। এখানে সংক্ষেপে উক্ত দু’টি বিষয়ে আলোকপাত করা হলো।

সুন্নাহ:

আমাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে ‘অনুসৃত দলীল’ আকড়ে ধরার জন্য। তাই ‘অনুসৃত দলীল’ অনসন্ধান করা আমাদের জন্য জরুরি। আল্লাহ তাআলা মানবজীবনের উন্নতি ও সফলতার জন্য পবিত্র গ্রন্থ ‘আল কুরআন’ নাযিল করেছেন। আর এর ব্যাখ্যা করে তাকে সমাজ্জীবনে প্রতিষ্ঠার জন্য প্রেরণ করেছেন রাসূল মুহাম্মদ সা.কে। আর রাসূল সা. যেসময় যে সমাজে আগমন করেন, তখন সে সমাজে বিরাজ করছিল মানবেতিহাসের সব চেয়ে খারাপ অবস্থা। সমাজের এই খারাপ ও অস্থিতিশীল অবস্থা মুহূর্তেই বদলে যায়নি। রাসূল মুহাম্মদ সা. এর প্রতি ধাপে ধাপে ওহী প্রেরণ করে আল্লাহ তাআলা সমাজকে পরিশুদ্ধ করেন। নবুওয়াতের দীর্ঘ ২৩ বছরে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। পরবর্তীতে যা একটি পরিপূর্ণ ইসলামী জীবন-ব্যবস্থা তথা ‘শরীয়াহর রূপ লাভ করে।

এখানে একটি লক্ষণীয়। আর তা হলো, ওহীর মাধ্যমে রাসূল সা. বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে পর্যায়ক্রমে যেসব বিধান প্রবর্তন করেছেন, তার কোনোটা ছিলো সাময়িক, কোনোটা স্থায়ী। আর তা ছিলো সামাজিক প্রয়োজনেই। পরবর্তীতে রাসুল সা. সাময়িক বিধানগুলোর কোনোটা রহিত ঘোষণা করেছেন, কোনোটা আংশিক পরিবর্তিত আকারে রেখেছেন, আবার কোনোটা অপরিবর্তিত অবস্থায়ই রেখে দিয়েছেন। তাই একথা বলাই বাহুল্য যে, কিছু হাদীসের উপর সাহাবায়ে কেরামের আমল আছে আর কিছু হাদীসের উপর নেই। কিছু হাদীস অনুসৃত আর কিছু হাদীস অনুসৃত নয়। তাই প্রশ্ন হলো, ‘হাদীস’ এর বিশাল ভান্ডার থেকে ‘অনুসৃত দলীল’ হিসাবে কোন্ ধরনের ‘হাদীস’ গৃহীত হবে?

এব্যাপারে গভীর অধ্যয়নের পর জানা যায়, ‘হাদীসে’র দু’টি অবস্থা আমাদের সামনে বিদ্যমান। যার একটি ‘হাদীস’ নামেই প্রসিদ্ধ। অপরটি ‘সুন্নাহ হিসাবে পরিচিত। ‘হাদীসে’র বিশাল ভান্ডারের যেসবের উপর উম্মতের ‘আমল বিদ্যমান, তাকেই ‘সুন্নাহ’ বলে। অর্থাৎ ‘সুন্নাহ’র উপর উম্মতের ‘আমল রয়েছে, তাই ‘অনুসৃত দলীল’ হিসাবে এই ‘সুন্নাহ-ই নির্ধারিত, ‘হাদীস’ নয়।

বিষয়টি দলীল-প্রমাণের সাহায্যে স্পষ্ট করার প্রয়াস পাবো।

‘সুন্নাহ’কে ‘অনুসৃত দলীল’ বলার কারণ দু’টি। যথা-

  1. ইসলাম মুসলমানদের একমাত্র জীবনাদর্শ। তাই ইসলামী শরীয়তকে জীবনের সর্বোত্র বাসত্মবায়নের তাগিদ দেয়া হয়েছে অসংখ্য হাদীসে। আর হাদীসে যেখানেই এই তাগিদ দেয়া হয়েছে, সেখানেই ‘সুন্নাহ’র কথা বলা হয়েছে, হাদীস নয়।

রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন,

من رغب عن سنتى فليس منى ـ رواه البخارى عن أنس بن مالك : ২/৭৫৭

 

অর্থ: যে ব্যক্তি  আমার সুন্নত থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলো, সে আমার দলভূক্ত নয়। (বুখারী: ২/৭৫৭)

 

 عليكم بسنتى وسنة الخلفاء الراشدين المهديين تمسكوا بها وعضوا عليها بالنواجذ ـ رواه ابوداؤد عن العرباض بن ساريةصـ ২/৬৩৫, والترمذى وابن ماجه واحمد

অর্থ: তোমরা আমার সুন্নাহের এবং হেদায়াত ও সুপথপ্রাপ্ত খলীফাদের সুন্নাহের অনুসরণ করো এবং তা সুদৃঢ়ভাবে আকড়ে ধরো এবং মাড়ির দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরো। (আবু দাউদ: ২/৬৩৫, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ, মুসনাদে আহমদ)

 

 

أن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال: تركت فيكم أمرين لن تضلوا ماتمسكتم بهما- كتاب الله وسنة نبيه ـ رواه مالك صـ ৩৬৩

 

অর্থ: নবী কারীম সা. ইরশাদ করেন- আমি তোমাদের কাছে দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি, যতক্ষণ পর্যন্ত এদুটিকে দৃঢ়ভাবে আকড়ে ধরবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তোমরা কখনো পথভ্রষ্ট হবে না; – আল্লাহর কিতাব ও তাঁর নবীর সুন্নাহ।- মুয়াত্তা ইমাম মালিক: ৩৬৩

 

أن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال العلم ثلاثة أية محكمة، وسنة قائمة ، وفريضة عادلة.أخرجه إبن ماجه فى سننه عن عبد الله بن عمرو صـ

 

অর্থ: রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেছেন, ইলম তিন প্রকার- আয়াতে মুহকামা, সুন্নাতে কায়েমা ও ফারিযায়ে আদেলা।

উপরে চারটি ‘হাদীস’ পেশ করা হয়েছে। প্রতিটি ‘হাদীসে’ ‘শরীয়তে ইসলাম’ অনুযায়ী জীবন পরিচালনার প্রতি ‘উম্মত’কে জোর তাগিদ দেয়া হয়েছে। লক্ষণীয় বিষয়, প্রতিটি ‘হাদীসে’ ‘‘সুন্নাহ’’ শব্দটির উল্লেখ রয়েছে, ‘হাদীস’ নয়। তাই কোনো বিষয়ে কোনো ‘হাদীস’ পাওয়া গেলেই তা নির্দ্বিধায় আমলযোগ্য বিবেচনা করার সুযোগ নেই।

 

২. সহজের জন্য দ্বিতীয় কারণটি আলোচনার পূর্বে জানা দরকার ‘হাদীস’ কী?

হাদীসবিদগণ বিভিন্নভাবে হাদীসের সংজ্ঞা  দিয়েছেন। তন্মধ্যে এখানে কয়েকটি উল্লেখ করা হলো।

 

الحديث هو أقوال النبى صلى الله عليه وسلم وأفعاله وسهوه وتقاريره وتروكه وماهمّ به ففعله أو لم يفعله وأحواله وشمائله وصفاته الخِلقية و الخُلُقية حتى الحركات والسكنات فى اليقظة والمنام سواء كان قبل البعثة أو بعدها ـ أنظر توجيه النظر ولمحات من تاريخ السنة و علوم الحديث صـ১১

 

অর্থ: হাদীস হল, নবী কারীম সা. এর কথা, কাজ, সাহু, সমর্থন, বর্জন এবং যা ইচ্ছা করেছেন বাস্তবে রূপান্তর করে থাকুন বা না থাকুন। তার অবস্থা, শামায়েল এবং তাঁর অবয়বগত ও চরিত্রগত গুণাবলী। এমনকি ঘুমন্ত বা জাগ্রত অবস্থায় নড়াচড়া এবং তা নবুওয়াতের পূর্বে হোক বা পরে।

শায়েখ তাহের জাযায়েরী হাদীসের সংজ্ঞায় বলেন,

 

الحديث ما أضيف إلى النبى صلى الله عليه وسلم من قول أو فعل أو تقرير أو ترك أو هَمٍّ أو سيرة أو حالة أو صفة خِلقية أو خُلُقية سواء كان قبل البعثة أو بعدها ـ أنظر توجيه النظر إلى أصول الآثر صـ ১/৩৭ للشيخ طاهر الجزائرى ومجموع الفتوى صـ ১৮/২-১০

 

অর্থ: নবী কারীম সা. এর দিকে সম্পৃক্ত কৃত কাজ, তার সমর্থন, বর্জন, ইচ্ছা, সীরাত, অবস্থা, অবয়ব ও চরিত্রগত গুণাবলী- তা নবুওয়াতের পূর্বে হোক বা পরে- তার সবই ‘হাদীস’। বিস্তারিত দ্রষ্টব্য: তাওযীহুন নজর ও মাজমুআতুল ফতওয়া ইবনে তাইমিয়্যা।

হাদীসের পরিচয় সংক্রান্ত হাদীস-বিশারদদের উপরোক্ত আলোচনার দ্বারা স্পষ্ট হয় যে, হাদীসের একটি বড় ভান্ডার দখল করে আছে যেসব জিনিস তার মধ্যে রয়েছে-

ক. মানসূখ হাদীস,

খ. নবী কারীম সা. এর জন্য নির্ধারিত বিষয়াদি (যেমন, চারের অধিক বিবাহ),

গ. নবী কারীম সা. এর অবয়বগত গুণাবলী,

ঘ. নবুওয়াতের পূর্বের বিষয়াদি,

ঙ. জাল হাদীস … ইত্যাদি।

সচেতন পাঠক লক্ষ করলে দেখতে পাবেন, হাদীসের সংজ্ঞানুযায়ী যেসব বিষয় হাদীসের অন্তর্ভূক্ত হতে পারে বা হয়ে থাকে, তার সবই ‘অনুসৃত’ নয়। তাই তা আমাদের দলীলও নয় এবং এসবের উপর আমল করাও জরুরি নয়। পক্ষান্তরে হাদীসে ইরশাদকৃত ‘সুন্নাহ’ হল, নবী কারীম সা. এর ঐসকল বিষয়াদি, যেগুলো আমাদের জন্য অনুসরণযোগ্য। এবং এটাই দীন ও শরীয়তের  অনুসৃত পথ।

শায়েখ অব্দুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ র. বলেন,

قال الشيخ عبد الفتّاح أبو غدّه فى هامش لمحات من تاريخ السنة وعلوم الحديث  ولفظ السنة إذا ورد فى كلام النبى صلى الله عليه وسلم وكلام الصحابة والتابعين رضى الله تعالى عنهم فالمرادبهالطريقةالمشروعةالمتبعةفىالدينوالمنهجالنبوىالحنيفوذلك فيما جاء منه في سياق الإستحسان و الثناء والطلب والإقتضاء والإيراد والسنة الفقهية التى تقابل الواجب ولايراد به ايضا المعنى الذى اصطلح عليه الأصوليون او المحدثون صـ১৪

 

অর্থ: ‘সুন্নাহ’ শব্দটি যখন নবী কারীম সা., সাহাবায়ে কেরাম রা. ও তাবেঈনে কেরাম র. এর ভাষায় উল্লেখ করা হয় তখন এর উদ্দেশ্য হয়, দীনের বিধিবদ্ধ অনুসরনযোগ্য ও নবী কারীম সা. এর মধ্যপন্থী জীবন ব্যবস্থা। এবং তা পছন্দনীয়, প্রসংশিত কাম্য ও কাঙ্খিত বিষয়াদীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। এর দ্বারা ফিকহী ‘সুন্নাত’ উদ্দেশ্য নয়, যা ওয়াজিবের বিপরীতে ব্যবহৃত হয়। এবং সেই অর্থও উদ্দেশ্য নয়, যা উসূল ও হাদীস-বিশারদদের পরিভাষায় ব্যবহার হয়। (টীকা: লমহাত মিন তারীখিস সুন্নাহ: ১৪)

হাদীসের এই পরিচয় থেকে ‘সুন্নাহ’ ‘অনুসৃত দলীল’ হওয়ার দ্বিতীয় কারণও স্পষ্ট হলো। অর্থাৎ হাদীসে ‘সুন্নাহ’ দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, ঐসকল বিষয়, যা অনুসরণযোগ্য এবং দীন ও শরীয়ত হিসেবে গৃহীত হয়েছে।

 

উপরের সংক্ষিপ্ত আলোচনার দ্বারা একথা বুঝে আসে যে, মুসলমানদের জন্য ইসলামের শেষ নবী মুহাম্মদ সা. এর রেখে যাওয়া আদর্শ হচ্ছে ‘সুন্নাহ’। তাই আদর্শ হিসাবে গ্র্হণ করতে হবে সুন্নাহকে, হাদীসকে নয়।

 

জামাআহ:

جماعةএর পূর্ণরূপ হচ্ছে جماعة الصحابة। অর্থাৎ মুসলিমজীবনের সর্বোত্র সাহাবায়ে কেরামের জামাআতকে অনুসরণ করা হবে। কারণ, কুরআন নাযিল হয়েছে রাসূল মুহাম্মদ সা. এর উপর। আর এই কুরআনের আমল প্রত্যক্ষ করেছেন কেবল তারাই, যারা রাসূল সা. এর প্রতি ঈমান এনে তার একান্ত সান্নিধ্যে সময় কাটিয়েছেন। তাই ‘সুন্নাহ’ এর সঠিক মর্ম তারাই ভালোভাবে বুঝে আত্মস্থ করতে সক্ষম হয়েছেন। সুতরাং ‘সুন্নাহ’কে তার প্রকৃত ও সঠিক ব্যাখ্যা মোতাবেক নিজের জীবনে প্রয়োগ করতে হলে তা অবশ্যই সাহাবায়ে কেরামের জামাতের আমলের নমূনায় করতে হবে; নতুবা সে ‘আমল’ ‘সুন্নাহ’ অনুযায়ী হবে না। আর কোনো ‘আমল’ ‘সুন্নাহ’ অনুযায়ী না হলে তা কখনোই আল্লাহ তাআলার নিকট গৃহীত হবে না।

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করছেন,

آمنوا كما آمن الناس قالوا أنؤمن كما آمن السفهاء ـ سورة البقرة: ১৩

 

অর্থ: তোমরা ঈমান আনো, যেমন লোকেরা ঈমান এনেছে। তখন (মুনাফিকরা) বলল, আমরা কি সেভাবে ঈমান আনবো যেভাবে নির্বোধরা ঈমান এনেছে? -সূরা বাকারা: ১৩

এই আয়াতে الناسالسفهاء  দ্বারা সাহাবায়ে কেরাম উদ্দেশ্য। তাফসীরে ইবনে কাসীর গ্রন্থে এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে,

 

يعنون اصحاب رسول الله صلى الله عليه وسلم رضى الله عنهم قال ابو العالية والسدى بسنده عن أبن عباس وإبن مسعود وغير واحد من الصحابة صـ১/৭২

 

অর্থাৎ, তারা এদ্বারা রাসূল সা. এর সাহাবাগণকে উদ্দেশ্য করেছে। এটা আবুল আলিয়া ও সুদ্দী নিজ সনদে হযরত ইবনে আববাস ও ইবনে মাসউদ  এবং একাধিক সাহাবা থেকে বলেছেন। ১/৭২

বিখ্যাত হাদীস গ্রন্থ তিরমিযী শরীফে এসেছে,

 

২. عن عبد الله بن عمرو قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم إن بنى إسرائيل تفرقت على ثنتين وسبعين ملة وتفترق أمتى على ثلاث وسبعين ملة كلهم فى النار إلا ملة واحدة قالوا من هى يارسول الله! قال ماأنا عليه وأصحابى ـ رواه الترمذى فى أبواب العلم صـ ২/৯৩

 

অর্থাৎ, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর রা. থেকে বর্ণিত নবী কারীম সা. ইরশাদ করেন, নিশ্চয় বনী ইসরাঈল বাহাত্তরটি দলে বিভক্ত হয়েছে। আমার উম্মত তিহাত্তরটি দলে বিভক্ত হবে সকলেই জাহান্নামে যাবে শুধু মাত্র একটি দল ছাড়া। সাহাবাগণ জিজ্ঞেস করলেন, তারা কারা? নবী কারীম সা. ইরশাদ করলেন, আমি ও আমার সাহাবারা যার উপর আছে।-তিরমিযী: ২/৯৩

উপরোক্ত আয়াত ও হাদীস স্পষ্টভাবেই প্রমাণ করছে, আমল ও ঈমান তখনই নাজাতের মাধ্যম হবে, যখন তা জামা‘আতে সাহাবায়ে কেরামের আমলের নমূনায় হবে। তাই দ্ব্যার্থহীন ভাষায় বলা যায়, আদর্শের প্রশ্নে মুসলিম জাতির নাম হলো, আহলুস সুন্নাহ ওয়া জামা‘আতিস্ সাহাবা, আহলুল হাদীস নয়।

 

‘‘আহলুল হাদীস’’ পরিচয় কেন কাম্য নয়

উপরে আমারা বিভিন্ন দলীল-প্রমাণের দ্বারা মোটামুটি স্পষ্টভাবে বলে এসেছি যে, মুসলমানদের আদর্শিক পরিচয়, আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ। স্বভাবতই এর বিপরীত কোনো নামে তাদের পরিচয় দেয়া হলে তা তাদের আদর্শের পরিচয় বহন করবে না। সেহেতু আহলুল হাদীস নাম তাদের জন্য কোনোভাবেই প্রযোজ্য নয়। কারণ, কুরআন ও হাদীস এর প্রমাণ নেই। তাই এটা বিদআত।

 

আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহর বৈশিষ্ট

আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের সবচেয়ে বড় আলামত হচ্ছে, তারা-

১. আকীদায় সবসময় মধ্যপন্থী।

২. বান্দাকে একেবারে কর্মক্ষমতাহীন জড় পদার্থও মনে করে না। আবার বান্দাকে কোনো কাজের কর্তাও মনে করে না।

৩. গোনাহগারকে বেঈমান মনে করে না। আবার কবীরা গোনাহকারীকে জাহান্নামে যাওয়ার উপযুক্ত নয়- এমনও মনে করে না।

৪. হযরত আলী রা.কে ফাসেকও মনে করে না। অপরদিকে তাকে মা’বূদ কিংবা নবীদের মতো মা’সূমও মনে করে না।

৫. পীরকে সকল ক্ষমতার অধীকারী মনে করে না।

৬. বাইআত হওয়াকে ফরয মনে করে না। আবার এটাকে পীর-তন্ত্র বলে শিরক বা বিদআতও বলে না।

সুন্নাহ ও জামাআতুস সাহাবার বিপরীত কোনো কর্ম-কান্ডকে ইসলামের নামে করা হলে তা বিদআত বলে গণ্য। তাই আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহর বিপরীতে যেকোনো নামে বাতিল আত্ন প্রকাশ করলে আমাদের ঈমানী দায়িত্ব, তার অসারতা প্রমাণ করে দ্বীন-ইসলামের সঠিক অবয়ব জনমানুষের সামনে তুলে ধরা। এপর্যায়ে তাদের সাথে মোকাবেলার কিছু পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করছি।

 

 

                          বাতিলের মোকাবেলা কিভাবে করবো

  1. দ্বীনী কাজ এখলাসের সাথে করতে হয় নতুবা সেটা দ্বীনী কাজ বলে গন্য হয় না। তাই এক্ষেত্রে সর্বপ্রথম নিয়তকে খালিস করে নেয়া জরুরি।
  2. বাতিলের মোকাবেলা নবী ও সাহাবীদের কাজ। তাই একাজের উপর আল্লাহ তাআলার কাছ থেকে প্রতিদানের আশা রাখা।
  3. যেকোনো বাতিলের ব্যাপারে সম্মক অবগতি লাভ করতে হবে। এবং তাদের প্রকৃত স্বরূপ ঊদঘাটন করতে হবে। নতুবা আমাদের বক্তব্যকে মানুষ অপপ্রচার সাব্যস্থ করবে।
  4. যেকোনো বাতিলের ব্যাপারে উলামায়ে হাক্কানী ও আকাবেরে কেরামের বক্তব্য এবং তারা তাদের যে সকল ত্রুটি ধরেছেন তা জানা। এবং তাদের রদ্দের পদ্ধতি দেখা আবশ্যক।
  5. বাতিলের প্রতি ব্যক্তিগত কোনো বিদ্বেষ রাখা যাবে না। ব্যক্তিগতভাবে তাদের প্রতি হামদরদী থাকতে হবে। তাদেরকে হক বুঝানোর আকাঙ্খা থাকতে হবে।
  6. দাওয়াতের ভিত্তি সর্বদা কুরআন ও সুন্নাহ হতে হবে। কেননা, কুরআনের أدع إلى سبيل ربك بالحكمة বলে সুন্নাহকেই উদ্দেশ্য  নেয়া হয়েছে। সুন্নাহের ত্বরীকায় দাওয়াত দিতে হবে। তাই نصوص এর বড় অংশ মুখস্থ করে নিতে হবে।
  7. নিজে কুরআন ও সুন্নাহের উপর মযবুতভাবে আমলদার হতে হবে।  জামাতের পাবন্দী ইবাদত ও জিকরের পাবন্দী করতে থাকতে হবে।
  8. কখনোই আঘাত করে বা খোচা দিয়ে কথা বলা যাবে না। কেননা, এভাবে কাউকে হিদায়াতের পথে আনা যায় না। এগুলো করা হয় আত্মতৃপ্তিলাভ করার জন্য যা সম্পূর্ণ تشهى। মনে রাখা দরকার,  تشهى  থেকে বাঁচতেই تقليد  বা  تقليد شخصى     কে আবশ্যক মনে করা হয়।
  9. বাতিলকে প্রথমে হকের পথে আনার চেষ্টা করতে হবে। তাদের বক্তব্যগুলোকেও সঠিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা চাই। তাদের কথায় কোনো সঠিক বিষয় থাকলে তা বিবেচনায় আনা চাই। কেননা, إن الكذوب قد يصدق

10. তাদের ভ্রান্তিগুলোকে প্রথমে আপসে নিরসনের চেষ্টা করতে হবে। যদি তা কোনোভাবেই সম্ভব না হয়, তা হলে জনসাধারণকে তাদের বিভ্রান্তি থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করতে হবে। এক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্কতা ও খায়েরখাহীর বহিরপ্রকাশ ঘটাতে হবে। যাতে কেউ মনে করতে না পারে যে, এটা হিংসাত্মক কোনো মতানৈক্য।

  1. বাতিলের মাঝে অবশ্যই فرق مراتب করতে হবে। এক্ষেত্রে তাওহীদ ও ঈমানিয়াতের উপর আঘাতকারী বাতিল প্রথমে প্রতিহত করতে হবে। আমার ধারণা, এদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ভন্ড পীরদের দ্বারা মানুষের ঈমান বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। তাই মুকাবেলায় তাদেরকে প্রথমে তাদেরকেই বেছে নেয়া উচিত বলে মনে করি।

12. আমাদের মাঝে আত্মসমালোচনার মনোভাবও থাকা চাই। আমাদের সকল কাজ কি ‘আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআত এর নীতি ও আদর্শ মোতাবেক কি না? এক্ষেত্রে বাতিলের কোনো কোনো কথা গ্রহণযোগ্যও থাকতে পারে। সব মিলিয়ে নিজেদের সংশোধন করার চেষ্টা করতে হবে। নতুবা لم تقولون ما لا تفعلون এর وعيد থেকে কেউ বাঁচতে পারব না।

 

কিছু সুপারিশ

  1. সারা দেশের জেলা ভিত্তিক কমিটি করা যেতে পারে। যারা তাদের এলাকার বাতিল ও ভ্রান্তিগুলো স্টাডি করে দেশের বিজ্ঞ আলেম, মুফতীদের কাছ থেকে তাদের শরয়ী বিধান জেনে নিয়ে জনসাধারণকে على وجه البصيرة পথ প্রদর্শন করবেন।
  2. যেসকল বিজ্ঞ আলেম সময় দিতে পারেন, তাদেরকে নিয়ে সাব কমিটি গঠন করে সারা দেশের ফেতনাগুলোর উপর প্রতিবেদন তৈরি করা। তাদের আকীদাগুলো বিশ্লেষণ করে তাদের ব্যাপারে শরয়ী বিধান জারী করা। যাতে করে স্থানীয় আলেমগণ এসকল ফিতনার মুকাবেলা على وجه البصيرة করতে পারে।
  3. প্রত্যেক এলাকায় ঐ এলাকার ফিতনার ভ্রান্তি ও তার নিরসন পদ্ধতির উপর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।
  4. একটি ওয়েবসাইট করে সেখানে সারা দেশের ফেতনার উপর পর্যালোচনা, ভ্রান্তি নিরসন এবং সেসবের জবাব ইত্যাদি প্রচার করা।
  5. টেলিভিশন প্রোগ্রামসমূহের মাধ্যমে সারা দেশে প্রচুর পরিমাণে ভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। তাই দেশের চেনেলগুলোর কর্ণধারদেরকে বুঝানোর ব্যবস্থা করার উদ্যোগ গ্রহণ করা। এজন্য ইসলমিক ফাউন্ডেশনের মধ্যস্থতাও গ্রহণ করা যেতে পারে।
Share

শাপলা চত্বর ট্রাজেডি : চেতনায় প্রজ্জলিত নতুন বালাকোট

মাওলানা মামুনুল হক

৫ মে বাংলাদেশের ইতিহাসে আরো একটি কালো অধ্যায় রচিত হলো। তৌহিদি জনতার স্বত:স্ফূর্ত ঈমানী জাগরণের বিরুদ্ধে ফ্যাসিবাদী স্বৈরাচারের কাপুরুষোচিত বর্বর গণহত্যা ও দমন-পীড়নের নজির হয়ে থাকবে এ দিনটি। হেফাজতে ইসলামের ডাকা এ দিনের ‘ঢাকা অবরোধ’ কর্মসূচিতে রাজধানীর ছয়টি প্রবেশ পথে লক্ষ লক্ষ তৌহিদি জনতা শান্তিপূর্ণভাবে অংশগ্রহণ করে। অবরোধ শেষে ঢাকার প্রাণকেন্দ্র মতিঝিলের শাপলা চত্বরের মহাসমাবেশে যোগদানের লক্ষ্যে উল্লেখিত ছয় স্থানের সমবেত জনতা যাত্রা শুরু করে। আল্লাহর জিকির ও তাকবির ধ্বনিতে মুখরিত সাদা-শুভ্র ঈমানী কাফেলার এ যাত্রা যেন শান্ত কিন্তু অনি:শেষ জনস্রোত। ছয়দিক থেকে বহতা নদীর মতো এগিয়ে আসা পবিত্র ও শান্তিপূর্ণ এই জনস্রোত শাপলা চত্বরের মোহনায় মিলিত হওয়ার পূর্বেই এর একটি শাখা আক্রান্ত হয় দুর্বৃত্তদের আক্রমনে। আওয়ামী দুবৃত্তদের এই আক্রমনই উম্মাতাল করে তোলে শান্ত বয়ে চলা জনতার স্রোতকে। এ ভাবেই সূচনা উত্তেজনার। তার পরের ইতিহাস নারকীয় তাণ্ডবের। নজিরবিহীন বর্বতার। বুলেটের আঘাতে তৌহিদি প্রাণ কেড়ে নেয়ার আর স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে রেকর্ড নারকীয় হত্যা কাণ্ডের। পেশি শক্তি, আর বুলেটের জোরে ক্ষমতাসীন দাম্ভিকের দল পৈশাচিক বিজয়োল্লাস করতে পারে। কিন্তু ইতিহাসের নির্মম বাস্তবতা হলো এই দাম্ভিকতা ও পৈশাচিকতাই পতনের কফিনে শেষ পেরাক ঠুকে দেয়।

৫ মে দুপুর থেকে ৬ মে ভোর পর্যন্ত চলা শাপলাচত্বর ট্রাজেডি ঈমানদার মানুষের হৃদয়ে স্মরিত হবে স্বাধীন বাংলার নতুন বালাকোট হিসেবে। প্রিয় নবীজি সা. এর অবমাননার বিরুদ্ধে ফুঁসে ওঠা ঈমানদার মানুষের শহিদী রক্তে ঢাকার রাজপথ যেভাবে রঞ্জিত হয়েছে, বালাকোট প্রাঙ্গণে সাইয়্যেদ আহমাদ শহীদ রহ. ও তার সহযোদ্ধাদের আত্মত্যাগের সাথেই তার তুলনা চলে। ১৮৩১ এর ৬ মে বালাকোটের প্রান্তরে উপমহাদেশের আজাদি আন্দোলনের বীর শহীদানদের শাহাদাতে বাহ্যত মনে হয়েছিল ঈমানদারদের পরাজয় আর বৃটিশ বেনিয়াদের বিজয় হয়েছে। কিন্তু ইতিহাস বলে ভিন্ন কথা। সেদিনের বীর শহীদদের আত্মদান যেমন যুগ যুগ ধরে মহান স্বাধীনতার চেতনা সম্মুন্নত রেখেছে লাখো মানুষের হৃদয়পটে আর দ্রোহের আগুন জ্বেলেছে সাম্রাজ্যবাদী বৃটিশের বিরুদ্ধে, তেমনি ২০১৩ এর ৬ মেও যুগ যুগ ধরে বাংলাদেশের মানুষের মনে এক দিকে যেমন জ্বালবে ঈমানী চেতনার প্রোজ্জ্বল মশাল তেমনি ইতিহাসের ঘৃণিত খুনি হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে আজকের ক্ষমতাসীন মহল।
তবে মর্মান্তিক, লোমহর্ষক ও বর্বরোচিত এই হত্যাকাণ্ডের কার্যকারণ ও দায়-দায়িত্বের প্রশ্নে কয়েকটি বিষয়ের পর্যালোচনা প্রাসঙ্গিক মনে হচ্ছে। এই ঘটনার সাথে নানাভাবে সংশ্লিষ্ট, যারা কোনো না কোনোভাবে এর দায়ভার গ্রহণ করতে বাধ্য তারা হচ্ছে সরকার, আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী, হেফাজত নেতৃবৃন্দ ও বিরোধী দল। নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে সংশ্লিষ্ট এই পক্ষগুলোর ভূমিকা ও দায়িত্ব পর্যালোচনা করলে পূর্ণ ঘটনার একটি প্রয়োজনীয় ও যৌক্তিক ব্যাখ্যা বেরিয়ে আসবে বলে আমরা মনে করি।
সরকারি দলের ভূমিকা
সরকারি দল আওয়ামী লীগের ভূমিকা পর্যালোচনায় প্রথমেই যে কথাটি বলতে হয় সেটি হলো, সরকার বিরোধী যে কোনো কর্মসূচি পালন কালে আওয়ামীলীগ বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন এক সংস্কৃতি চালু করেছে আর তাহলোÑ বিরোধী পক্ষকে ঠেঙ্গানোর জন্য আইনশৃংখলা রক্ষাকারীদের সাথে রাজপথে দলীয় ক্যাডার বাহিনীর ইপস্থিতি। স্বভাবতই ময়দানে একই সময়ে পরস্পর বিরোধী দুটি পক্ষ মারমুখি অবস্থানে থাকলে উত্তেজনা ও সংঘাত অনেক বেশি হয়। মাঠ দখল ও নৈরাজ্য প্রতিরোধের নামে এমনই এক উস্কানিমূলক কর্মসূচি গ্রহণ করে আওয়ামীলীগ। হেফাজতে ইসলামের অবরোধ কর্মসূচির আগের দিন আওয়ামীলীগ নেতারা তাদের ক্যাডার বাহিনীকে অবরোধকারী হেফাজত কর্মীদেরকে প্রতিরোধ করার আহ্বান জানায়। সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে আওয়ামীলীগের ছাত্র ও যুব ক্যাডাররা অবরোধের বিভিন্ন পয়েন্টে উত্তেজনা সৃষ্টি করে। বিশেষ করে কদমতলী-বাবু বাজার পয়েন্ট থেকে অবরোধকারীরা শাপলা চত্বরের সমাবেশে আসার পথে আওয়ামীলীগের অফিসের সামনে দুপক্ষের মধ্যে সংঘাত শুরু হয়। এই সংঘাতের জন্য পরস্পর একপক্ষ অন্য পক্ষকে দায়ি করছে। যদিও মিডিয়াতে শুধু সরকার দলীয় সন্ত্রাসীদের গুলি চালানোর ও লাঠিসোটা দিয়ে হেফাজতকর্মীদের উপর চড়াও হওয়ার ছবি এসেছে। বিপরিতে আওয়ামীলীগের কার্যালয়ে কথিত হামলার কোনো ছবি সরকারপন্থী মিডিয়াতেও দেখা যায়নি। তবুও এই বিতর্কে না গিয়েই মোটা দাগের দুটি প্রশ্নের কি কোনো জবাব সরকারি দল দিতে পারবে? একটি হলোÑ যদি কোনো নিয়ন্ত্রণ বা নিরাপত্তার প্রয়োজন হয় সে জন্য কি পুলিশ-র‌্যাব, বিজিবি যথেষ্ট ছিল না? দলীয় ক্যাডার বাহিনীর কী প্রয়োজন ছিল? স্বাভাবিক কথা, এখানে লাখো জনতার ঈমানী আবেগের ব্যাপার। সেখানে খোদ সরকারই কেন উস্কানি দিয়ে সংঘাতের পথ খুলল?
দ্বিতীয়টি হলো, সরকারের ঘোর সমর্থক মিডিয়াগুলোতেও ছাত্র ও যুবলীগের ক্যাডারদের ফ্রী স্টাইলে আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে অ্যাকশনের বহু সচিত্র সংবাদ প্রকাশ হয়েছে। বিপরিতে হেফাজতের নিজস্ব কর্মী তো দূরের কথা হেফাজতের নামে যারা ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ায় অংশ নিয়েছে তাদের ব্যাপারেও এই ধরণের কোনো সংবাদ তারা প্রকাশ করতে পারেনি। এ থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, সরকারদলীয় ক্যাডার বাহিনীর এই সন্ত্রাসী এ্যাকশন ও হেফাজতের নিরীহ কর্মীদেরকে বিচ্ছিন্ন পেয়ে তাদের উপর বর্বরোচিত হামলার পরিপ্রেক্ষিতেই সংঘাতের সূচনা। সংঘাত শুরু হওয়ার পর বিক্ষিপ্ত লোকজন সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। হেফাজতে ইসলামের শান্তিপূর্ণ অরাজনৈতিক ঈমানী এই আন্দোলনকে বাধা দিয়ে সরকার কী পেল? লাখো জনতার এই জাতীয় আবেগপ্রবণ কর্মসূচিতে যেখানে ধৈর্য ও সহনশীলতাই প্রধান কাম্য সেখানে দায়িত্বশীল সরকারই ঘটালো সবচেয়ে বড় ব্যাঘাত।আরো একটি সংশয় হলো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের দোকান-পাটসহ ভবন ও গাড়িতে অগ্নি সংযোগের ঘটনা আসলে কারা ঘটিয়েছে? হেফাজতের কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারীরা না আসলে এটা সরকার দলীয় স্যাবোটাজ? আওয়ামী মিডিয়াগুলো ফলাও করে পুড়ে যাওয়া ধ্বংসস্তুপের ছবি ছাপিয়েছে, কিন্তু হেফাজতের কর্মীরা অগ্নিসংযোগ করছে বা ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে এমন কোনো সচিত্র সংবাদ নেই। এতেও কি এই সন্দেহ ঘনিভূত হয় না যে, এটা সরকারের পরিকল্পিত স্যাবোটাজ? হ্যা আমাদের দৃষ্টিতে যেটা এসেছে যে কাঁদানে গ্যাস থেকে আত্মরক্ষার জন্য হেফাজতের কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারী বিক্ষিপ্ত কিছু মানুষ রাস্তার পাশ থেকে কাঠের চৌকি, বাঁশ ইত্যাদি সংগ্রহ করে রাস্তার মধ্যখানে এনে আগুন ধরিয়ে দেয়। ধ্বংসযজ্ঞ ও অগ্নি সংযোগ যদি হেফাজত কর্মীরাই করবে তবে তো তাদের এক চেটিয়া দখলে থাকা ইত্তেফাকের মোড় থেকে ফকিরাপুল পর্যন্ত এই এলাকাতেই করতো?এর পরের কথা হলো, সংঘাত-সহিংসতা হয়েছে হেফাজতে ইসলামের মূল কর্মসূচিস্থলের বেশ দূরে। এবং সেটাও চলেছে সন্ধ্যা নাগাদ। সন্ধার পর সব দিকের সংঘাত বন্ধ হয়ে যায়। গোটা এলাকা আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। হেফাজতে ইসলামের শান্তিপ্রিয় সুশৃংখল কর্মসূচি চলতে থাকে দৈনিক বাংলা-নটরডেম-ইত্তেফাক এই এলাকায়। হেফাজত নিয়ন্ত্রিত এই এলাকায় লক্ষ লক্ষ শান্তি প্রিয় ঈমানদার মানুষের জিকিরের কাফেলায় সন্ধা রাতে একবার অভিযান চালানো হয়। তখন দৈনিক বাংলা সড়ক থেকেও হেফাজতের কর্মীরা অনেক পিছু হটে দুই পাশের নটরডেম ও ইত্তেফাকের দিকের সড়কে শুয়ে-বসে সময় কাটাতে থাকে। এই অবস্থায়ই রাস্তার সকল আলো নিভিয়ে দিয়ে ভূতুরে এক পরিবেশ সৃষ্টি করে রাত পৌনে তিনটায় তিন দিক থেকে সাড়াষি অভিযানে জঘন্যতম নরকীয় হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়।

আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী

আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকাও ছিল বেশ প্রশ্নবিদ্ধ। কেন তাদের আশ্রয়ে থেকে সরকারি দলের ক্যাডাররা প্রতিপক্ষের উপর গুলি বর্ষণ করবে? আর সব চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, তারা এমন একটা সময় ঘুমন্ত, বিশ্রামরত ও তাহাজ্জুদের নামাজরত ঈমানদার মানুষের ওপর ক্র্যাকডাউন চালালো যখন সমাবেশস্থল ছাড়া বাকি সব তাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে। শান্তিপূর্ণ অবস্থান-কর্মসূচি পালনরত হেফাজতে ইসলাম এমন কী অপরাধ করল যার কারণে লক্ষ লক্ষ মানুষের ওপর এমন বর্বরোচিত হামলা করতে হবে?

হেফাজত নেতৃবৃন্দের ভূমিকা

হেফাজতে ইসলাম কেন এমন ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ নিতে গেলন? কী উদ্দেশ্য ছিল এর পিছনে? কোনো কোনো মহল এমন প্রশ্নও উত্থাপন করছে। এই প্রসঙ্গে আমাদের কাছে যা তথ্য-উপাত্ত আছে এবং সামগ্রিক অবস্থার পর্যবেক্ষণে যা বেরিয়ে আসে তাহলো, প্রথমত: ইসলামের পক্ষে বড় কিছু অর্জনের সম্ভাবনা। বাংলাদেশের ইতিহাসে ইসলামের পক্ষে হেফাজতে ইসলামের ব্যানারে যে গণজাগরণ সৃষ্টি হয়েছে নিকট অতীতে এর নজির নেই। তাই ধারণা ছিল প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করতে পারলে ইসলাম ও মহানবী সা. এর বিরুদ্ধে কটুক্তিকরার বিরুদ্ধে কঠোর আইন পাশের দাবিটি অন্তত: আদায় করা সম্ভব হবে। শাহাবাগীদের অবস্থানে বসিয়ে সরকার যেমন নিজেদের এজেণ্ডায় আইন সংশোধন করেছে। তেমনি অবস্থানের মাধ্যমে সরকারকে রাজনৈতিকভাবে চাপে ফেলা যাবে। কারণ সরকারি প্রশ্রয়ে শাহবাগে টানা অবস্থান এবং শোডাউন হয়েছে। সরকার অবস্থান কর্মসূচিকে সমীহ করেছে শাহাবাগের ক্ষেত্রে। কাজেই অবস্থানের ব্যাপারে সরকারের নৈতিকভাবে দুর্বল থাকার কথা। সেই সাথে মাঠ পর্যায়ের জনশক্তির পক্ষ থেকে এমন কর্মসূচির চাপ ছিল। সব সময় ইসলামপন্থীরা আন্দোলন করে কিন্তু কোনো দাবি দাওয়া আদায় হয় না। এবারের জাগরণ নজিরবিহীন হওয়ায় মানুষের প্রত্যাশাটাও ছিল বেশি। তাছাড়া লক্ষ লক্ষ মানুষের শান্তিপূর্ণ অবস্থানের উপর সরকার নরকীয় হত্যাযজ্ঞ চালাবে এমন কল্পনাও ছিলনা। এতো বিশাল জনসভার শান্তিপূর্ণ অবস্থানের ওপর এহেন ঘৃণ্য হামলার ঘটনা বাংলাদেশের ইতিহাসে দ্বিতীয়টি নেই।
হেফাজতের নেতৃবৃন্দের রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ ছিল ও আছে মর্মে যে প্রচারণা কোনো কোনো মহল চালায় সে ব্যাপারে আমাদের পর্যবেক্ষণ হলো, হেফাজতের বয়োজেষ্ঠ নেতৃবৃন্দ ও সামগ্রিক নেতৃত্ব রাজনৈতিক চিন্তার উর্দ্ধেই ছিল।
অবশ্য হেফাজত নেতৃবৃন্দের আশংকা ছিল, কোনো কোনো মহল হেফাজতের কর্মসূচিতে অনুপ্রবেশ করে বিশৃংখলা সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু সরকার দলীয় ক্যাডাররা মাঠে নেমে পরিস্থিতি আরো বেশি ঘোলাটে করেছে।

বিরোধী দলের ভূমিকা

হেফাজতে ইসলাম বিষয়ে প্রধান বিরোধীদল বিএনপির ভূমিকা হেফাজতের জন্য বড়ই বিব্রতকর। একদিকে তারা হেফাজতের কোনো একটি দাবির ব্যাপারেও ইতিবাচক দৃষ্টি দেখায় না কিন্তু গায়ে মেখে আবার হেফাজতের আন্দোলনের ফসল নিজেদের ঘরে তুলতে চায়। হেফাজতের আন্দোলনে গড়ে ওঠা সেন্টিমেন্টকে এমনি এমনিই নিজেদের পকেটে ভরতে শস্তা ঘোষণাও দেয়। হেফাজতের পক্ষে মাঠে নামার বিরোধী দলীয় ঘোষণায় বিএনপির কোনো জনশক্তি তো নামেইনি, উপরন্তু হেফাজত সরকারের আরো বেশি টার্গেটে পরিণত হয়েছে। হেফাজতে ইসলামের সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক ও ঈমানী ইমেজ নষ্ট করতেই বরং বেশি ভূমিকা রেখেছে বিএনপির এই সকল কার্যক্রম।

সম্ভাব্য ফলাফল

হেফাজত নেতৃবৃন্দের কিছু অসচেতনতা, বিরোধী দলের সুবিধাবাদী ভূমিকা প্রতীয়মান হলেও ঐতিহাসিকভাবে ৫-৬ মের নতুন বালাকোটের রক্তাক্ত প্রান্তরের মূল খলনায়কের কালিমা আওয়ামীলীগের কপালেই লেপ্টে থাকবে। বিরোধী প্রচার মাধ্যমগুলোকে বন্ধ করে হত্যাযজ্ঞের প্রকৃত চিত্র তারা আড়াল করতে পেরেছে মনে করে তৃপ্তির ঢেকুর তুললেও ঘটনা এখানেই থেমে থাকবে বলে মনে হয় না। নিজেদের পোষা মিডিয়ার মাধ্যমে পবিত্র কুরআন শরিফ আগুনে পুড়ে যাওয়ার ঘটনাকে তারা গোয়েবলসিয় প্রচারণা চালিয়ে মনে করছে দেশের সকল ধর্মপ্রাণ মানুষ এখন থেকে হেফাজতে ইসলাম এবং আলেম সমাজকে কুরআনের শত্র“ মনে করবে আর রাশেদ খান মেনন ও হাসানুল হক ইনুর মতো কমুনিস্টদেরকে কুরআনের পক্ষের শক্তি বলে বিশ্বাস করতে থাকবে। ইতিপূর্বেও ২০০১ সালে তারা শাইখুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক রহ. কে পুলিশের হত্যাকারী হিসেবে মিডিয়াতে অনেক প্রচার করে মনে করেছিল মানুষ বুঝি সত্যিই শাইখুল হাদীস রহ. ও আলেম সমাজকে হত্যাকারী আর আওয়ামীলীগকে শান্তিকামী বিশ্বাস করেছে।
সে বার যেমন পরিণাম আওয়ামীলীগের জন্য শুভ হয়নি। এখনও হেফাজতে ইসলাম ও আলেম সমাজের বিরুদ্ধে এ সকল অপপ্রচার চালিয়ে ধর্মপ্রাণ মানুষের ক্ষোভ প্রশমন করতে পারবে মনে করলে মস্ত বড় ভুল করবে। বরং সরকারের পোষা মিডিয়ার অতিরঞ্জিত প্রচারণাকে ধর্মপ্রাণ মানুষ সরকারের অপকর্ম বলেই ধরে নিচ্ছে। মানুষের মনের আস্থা ও ভালোবাসা শুধু প্রচারণা দিয়েই হয় না। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তার দীন ইসলামের সত্যিকার ধারকদের ভাব-মর্যাদা মানুষের হৃদয়ে এই পরিমাণ দান করেন যে, তার মোকাবিলা কোনো প্রচারণা দিয়েই সম্ভব নয়। আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী সত্তুরোর্ধ একজন বৃদ্ধ হাদিসের শিক্ষক। হাজার হাজার আলেমের সম্মানিত এই উস্তাদের প্রতি সরকারের অসম্মানজনক আচরণ কোনোভাবেই ভালো পরিণাম বয়ে আনতে পারে না। আমাদের বিশ্বাস দিন যতো গড়াবে আঁধার কেটে ততো আলো ফুটতে থাকবে। আর সেই সাথে ক্রমান্বয়ে ৬ মের গভীর রাতের ভুতুরে অন্ধকারে ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগের কপালে লেপ্টে যাওয়া তৌহিদি জনতাকে গণহত্যার তিলক চিহ্নিও স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হতে থাকবে…।

Share
Share

কোটি হৃদয়ের আলোর মিনার একজন শায়খুল হাদিস একটি জামিয়া ও কিছু স্মৃতি

কামরুল হাসান রাহমানী

আশির দশকের শেষের কথা। আমি তখন দুরন্ত কৈশোর পার করছি। হাফেজ্জি হুজুর, বটগাছ, খেলাফত আন্দোলন, শায়খুল হাদিস এই শব্দগুলো তখন শহরের গণ্ডি পেরিয়ে অজপাড়াগাঁয়ের মানুষেরও মুখে মুখে। আমার বাংলা শিক্ষিত বাবা আলেম-ওলামা বা রাজনীতি সচেতন ব্যক্তি পেলেই অক্টোপাসের ন্যায় আঁকড়ে ধরেন। আর বাড়ি ফিরে প্রবল আগ্রহ নিয়ে গল্পের ঝাঁপি খুলে বসেন। অগ্র-পশ্চাতের ধারাবাহিকতা আমরা বুঝি না, হয়তো তা বোঝার বয়সও ছিল না। তবুও  রাজ্যের বিস্ময় নিয়ে গোগ্রাসে গিলতে থাকি। কৌতূহলবশত হয়তো কখনো-কখনো দু’একটি প্রশ্নও করি। আমাদের কৌতূহল নিবারণের প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা চলতে থাকে বড়দের। এসব আলোচনা-পর্যালোচনার সূত্রধরেই এককালের স্কুল শিক্ষক আমার বাবা এবং সত্তুর দশকের আলিয়া মাদরাসা পড়–য়া আমার মা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন তারা তাদের সকল সন্তানকে কওমি মাদরাসায় পড়াবেন এবং যথাসম্ভব শায়খুল হাদিসের তত্ত্বাবধানেই।

বড় এবং মেজোভাই তখন অলরেডি কওমি মাদরাসায় অধ্যায়নরত। তাদের ওপর মা-বাবার পক্ষ থেকে বরাবর চাপ বাড়ছিল শায়খুল হাদিসের মাদরাসায় ভর্তি হওয়ার জন্য। বিশেষত বড়ভাই ওপরের দিকে পড়ায় মূল চাপটা তার ওপরই ছিল। নানা অজুহাতে তিনি সময় নিচ্ছিলেন। অজুহাত বলতে, হুজুর নিচের দিকে পড়ান না, ঢাকা শহরে পড়ালেখার খরচ অনেক, খাওয়া দাওয়ার সমস্যা, তাই আরও ওপরের জামাতে গিয়ে ভর্তি হব ইত্যাদি। যাহোক একপর্যায়ে বড় ভাই শায়খুল হাদিসের মাদরাসায় হাজির হলেন। হুজুর তখন জামিয়া মুহাম্মদিয়া ছেড়ে বর্তমানের রাহমানিয়ার অদূরে নূর হোসেন  কোম্পানীর নির্মাণাধীন বিল্ডিং, সাত মসজিদ এবং মসজিদ সংলগ্ন টিনের ছাপড়া মিলিয়ে তার মাদরাসার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। যতদূর মনে পড়ে আমি সেই সময় সর্বপ্রথম ঢাকা আসি বেড়াতে। বেড়ানো বলতে হযরত শায়খুল হাদিস এবং তার জামিয়া দেখা। মনে পড়ে বড় ভাই থাকতেন সাত মসজিদে। তখন বর্ষাকাল। এই রোদ এই বৃষ্টি। চৈত্র্যের কাঠফাঁটা রৌদ্র উপেক্ষা করেই চলতো পঠন-পাঠন। ইলমে ওহীর সুমধুর তানে যখন পুরোমাত্রায় মুখরিত সাতমসজিদ চত্বর, হঠাৎ শুরু হতো বৃষ্টি। রোদের মতো বৃষ্টিতো আর উপেক্ষা করা যায় না। অগত্যা শুরু হয় ছোটাছুটি। খাতা-কিতাব বাঁচানোর জানতুড় মেহনত। একই অবস্থা পাশের টিনশেড ঘরটিরও। মেঝেতে ইট বিছানো স্যাতসেঁতে পরিবেশ। সূর্যের শাসন আর আষাঢ়ের বর্ষণ সমান সমস্যার কারণ। সম্ভবত সাতমসজিদ গম্বুজের দোতলায়ও থাকতো ছাত্ররা। সে এক অকল্পনীয় দৃশ্য। মানুষ জানতো আগুনের পরশে পঙ্গপালের জীবন উৎসর্গের কথা। আর জামিয়ার শুরুর দিনগুলিতে রচিত হলো শায়খুল হাদিসের জন্য প্রিয় ছাত্রদের জীবন উৎসর্গের নতুন ইতিহাস। দারুসসুফফা আর দারুল উলূম দেওবন্দের ঈমান জাগানিয়া উপাখ্যানের নতুন অধ্যায় রচিত হয় শায়খুল হাদিস ও তার সন্তানতুল্য ছাত্রদের মাধ্যমে। যে ইতিহাসকে কলমের আঁচড়ে চিত্রায়িত করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

সেই সফরে যদিও শায়খুল হাদিসকে নামেমাত্র দেখতে পেরেছিলাম, কিন্তু আজকের অবয়বে তখনো অস্তিত্বহীন জামিয়ার উস্তাদ-ছাত্রদের ত্যাগ আর কুরবানির জান্নাতি দৃশ্য আমাকে এক অদৃশ্য মায়াজালে আবদ্ধ করে ফেলেছিল। শায়খুল হাদিস আর তার জামিয়ার প্রেমে ততদিনে আমি পাগলপ্রায়। এই সফর পর্যন্ত আমি স্কুলের ছাত্র। ঢাকা থেকে বাড়ি ফেরার পর স্কুলের পাঠ শিকেয় তুললাম। আমার ধ্যানে-জ্ঞানে তখন পুরামাত্রায় মাদরাসা স্থান করে নিয়েছে। বড় ভাই মাওলানা এনামুল হক দাওরা ফারেগ হয়ে শায়খুল হাদিসের পরাপর্শে রাহমানিয়ায় উস্তাদ হিসেবে খেদমতে নিয়োজিত হলেন। আমি স্কুলের পড়ার ফাঁকে ফাঁকে মাদরাসার প্রাথমিক কিতাব পড়া শুরু করলাম। ওই বছরটি শেষ করে আর স্কুলে ভর্তি হলাম না। এলাকার মাদরাসায় মিজান পর্যন্ত মাদরাসার কিতাবপত্র একবছরে শেষ করলাম। মক্তব, নাজেরা ও কিতাববিভাগের নাহবেমির পর্যন্ত প্রায় ৬ থেকে ৮ বছরের বি¯তৃপ্রান্তর। যা আমি মাত্র দুবছরেরও কম সময়ে অতিক্রম করি। অবশ্য এই কৃতিত্বের কারামতি দ্রুতই আমার সামনে উদ্ভাসিত হয়েছিল।

 

একানব্বই শেষ বিরানব্বই শুরু। ঈদুল ফিতরের কয়েকদিন পর বড় ভাইয়ের সঙ্গে রাহমানিয়ার পথে রওনা হলাম। আমার মধ্যে সে কী আবেগ, উৎকণ্ঠা আর উত্তেজনা। লিখে বোঝানো যাবে না। আমি যে রাহমানিয়ায় যাচ্ছি এবং নাহবেমিীর জামাতে ভর্তি হচ্ছি তা এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছিল। পড়েছিল না, আসলে ছড়িয়ে দিয়েছিলাম। প্রবাদ আছে, পাঠায় কুঁদে খুঁটার জোরে। আমার অবস্থাও তাই। বড় ভাই রাহমানিয়ার উস্তাদ। আমাকে আর ঠেকায় কে? মা গভীর রাত পর্যন্ত আমার সামানপত্র ঠিকঠাক করলেন। সাতসকালে মা-বাবা, ভাই-বোন, পাড়া প্রতিবেশীরা অনেকদূর পর্যন্ত আসলেন আমাদের বিদায় জানাতে।

পেছনে ফিরে দেখছিলাম আর চোখ মুছছিলাম। একসময় সবকিছু দৃষ্টির আড়ালে ঢাকা পড়লো। কল্পনার পর্দায় আস্তে আস্তে রাজধানী ঢাকা ও মাদরাসার দৃশ্যাবলী উদ্ভাসিত হলো। হযরত জাফর আহমাদ ওসমানী, শামসুল হক ফরিদপুরী, হযরত হাফেজ্জি হুজুর, হযরত মুহাদ্দিস সাহেব হুজুর, হযরত শায়খুল হাদিস দা.বা.সহ জগৎবিখ্যাত মনীষীগণের পদধূলিতে একসময় যে জামিয়াটি ছিল বাংলার জমিনে এক কিংবদন্তির নাম, সেই জামিয়া ততদিনে তার দিপ্রহরের তেজস্ক্রিয়তা হারিয়ে বিকালের সূর্যের রূপ ধারণ করেছে। আর খরস্রোতা নদী যেমন বাধা পেয়ে খুঁজে নেয় নতুন গতিপথ, মিলিত হয় নতুন মোহনায়- জামিয়া রাহমানিয়া তখন সেই খরস্রোতার নতুন মোহনা। যেই মোহনায় ঠাঁই নিতে তখন পঙ্গপালের মতো ছুটছে ইলমপিপাসু হাজারো বনিআদম। আস্তে আস্তে আপনজনদের স্মৃতি অপসারিত হয়ে সে স্থান দখলে নিল এই জামিয়া। কল্পনায় স্বপ্নের জাল বুনতে বুনতে আসরের সময় রাহমানিয়ায় হাজির হলাম। জামিয়া ততদিনে ফুলে ফলে সুশোভিত এক ষোড়শীর রূপ নিয়ে পথিকের হৃদয় হরণে পুরোমাত্রায় তৎপর। পুরোনো ভবনের পাঁচতলার নির্মাণ সমাপ্ত। চলছে রং ঢংয়ের কাজ। তিন তলার কাজ যখন চলমান তখন আরও একবার এসেছিলাম। কলেবর বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় সে অংশকে পাঠক সম্মুখে আনা হলো না। হযরত শায়খুল হাদিসের ৫০ সালা সম্মেলনস্মারকের একটি লেখায় সেই সফরের কিছু স্মৃতি স্থান পেয়েছে।

কিছু পাঠকের মনে কৌতূহল সৃষ্টি হতে পারে যে, জামিয়া রাহমানিয়ায় তো বিল্ডিং একটাই। এখানে নতুন-পুরাতন এলো কী করে। তাদের জ্ঞাতার্থে বলছি, মাঝখানের সিঁড়িসহ উত্তরদিকের পাঁচতলা বিল্ডিংটি সম্পূর্ণ হওয়ার অনেকদিন পর দক্ষিণদিকের সিঁড়িসহ নতুন বিল্ডিংটি নির্মিত হয়। কিন্তু দুটি বিল্ডিং এর মাঝে কোনো ব্যবধান না রাখায় নির্মাণ সমাপ্তির পরের দর্শকদের নিকট একটি ভবন রূপেই পরিচিতি লাভ করেছে।

যাহোক, মোঘল সম্রাজ্যের স্থাপত্যশিল্পের অপূর্ব নিদর্শন- উপমহাদেশের অসংখ্য পুরাকীর্তির অন্যতম ঐতিহাসিক সাতমসজিদে আসর নামাজ পড়লাম। সম্ভবত শাওয়াল মাসের ৮ তারিখ। পুরোমাত্রায় ভর্তির কাজ চলছে। দফতর ও এর আশপাশে তিল ধারনের ঠাঁই নাই। ইলমেওহীর মধু সন্ধানীরা শায়খুল হাদিসের এই কাননে জায়গা করে নেওয়ার মানসে প্রাণান্তকর প্রচেষ্ঠা চালিয়ে যাচ্ছে। আমি হজরেআসওয়াদে পৌঁছার মতো আস্তে আস্তে দফতরের গ্রিল পর্যন্ত পৌঁছতে সক্ষম হলাম। হযরত আসাতিযায়েকেরাম ভর্তির কাজকর্মে ব্যস্ত। শায়খুল হাদিস  ব্যতীত আমি আর কাউকেই তেমন একটা চিনি না। লক্ষ করলাম হুজুর দফতরে নেই। চার-পাঁচজনের কাছে জিজ্ঞেসা করলাম হুজুর আসবেন কি না। মনে হলো আমার এই প্রশ্নে তারা মহাবিরক্ত। কারণ দফতর ও এর আশপাশে তখন কিয়ামতে ছুগরা চলছে। সকলেই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত। অন্যের কথায় মনোযোগ দেওয়ার মতো সামান্য ফুরসতও কারও নেই। মানুষের আধিক্যে ছোট ছোট শব্দগুলোর সমন্বয়ে শব্দতরঙ্গ বয়ে যাচ্ছে। বার বার ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে, সকলেই চুপ থাকুন এবং বলা যায় চুপই আছে। কিন্তু আওয়াজ থামছে না।

হঠাৎ চতুর্দিক নিরব নিস্তব্ধ। কোনো শব্দ নেই, আওয়াজ নেই, নেই কোনো নড়াচড়া। যাকে বলে পীনপতন নিরবতা। পরিবেশের এই আমূল পরিবর্তনে আমি চকিত হলাম। কারণ অনুসন্ধানে নিজ মস্তিস্ককে কাজে লাগানোর পূর্বেই পেছনে তাকিয়ে দেখি মুসা আ. আর তার উম্মতের পারাপারের জন্য নীলনদের রাস্তার ন্যায় এক বিরাট রাস্তা তৈরি হয়েছে। করিডোরের দুই দিকের দেয়াল ঘেষে জমাট পানির ন্যায় দাঁড়িয়ে আছে নতুন-পুরাতন ছাত্ররা। আর সীমাহীন বিনয় ও নম্রতা নিয়ে অত্যন্ত সাদাসিধে পোশাকে অনুচ্চস্বরে জিকির করতে করতে নিচতলা থেকে সিঁড়ি ভেঙে ওপরে ওঠছেন কোটি হৃদয়ের আলোর মিনার-আশার বাতিঘর, যুগের নকীব, আকাবিরে দেওবন্দের মূর্তপ্রতীক উপমহাদেশের অবিসংবাদিত রাহবর শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক দা. বা.।

হযরত ইউসুফ আ. কে দেখার পর মিশরীয় রমণীকুল কতোটা অভিভূত, চমকিত ও সম্মোহিত হয়েছিল সে অনুমান আমার নেই, তবে কুরআনের বর্ণনা অনুযায়ী তারা ফলের পরিবর্তে হাত কেটে রক্তাক্ত করেছিল তা নিশ্চিত জানা যায়। এদ্বারা বোঝা যায় তাদের কর্মক্ষমতা অর্থাৎ কর্তনক্ষমতা বিদ্যমান ছিল কিন্তু নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা লোপ পেয়েছিল। কিন্তু সেদিন ছাত্ররা এতটাই চমকিত ও অভিভূত ছিল যে, তাদের চেহারাগুলো পর্যন্ত ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছিল। আমার পাশের একজন ছাত্রের হাত থেকে তার ভর্তিফরমটি পড়ে গেল। কিন্তু সেটা তোলার মতো বোধশক্তি ও কর্মশক্তি কোনোটাই তার বাকি ছিল না। হুজুর দফতরে প্রবেশের পর যতক্ষণ ছিলেন ততক্ষণ আশপাশে কোনো মানব অস্তিত্ব বিদ্যমান ছিল কিনা, শব্দ দ্বারা তা নির্ণয় করার কোনো উপায় ছিল না। আমার এই ক্ষুদ্র জীবনে এমন সম্মোহনী ক্ষমতাসম্পন্ন দ্বিতীয় কোনো ব্যক্তিত্ব আর দেখিনি। অথচ লেবাসে-পোশাকে, চলনে-বলনে এতটাই সাদাসিধে যে, আজকে আমার মতো মৌলবীকেও যদি অমন সাদাসিধে পোশাকে কোথাও যেতে বলা হয় তাহলে প্রেস্টিজ নিয়ে ভাবতে ভাবতে হৃদক্রিয়া বন্ধ হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। হুজুরের রুয়ুব বা ব্যক্তিত্বপূর্ণ সম্মোহনী ক্ষমতার এই বর্ণনা চুল পরিমাণও অতিরঞ্জিত নয়। আমি রাহমানিয়ার দীর্ঘ বিশ বছরের জীবনে এমন অসংখ্য ঘটনার জ্বলন্ত সাক্ষী। কলেবর বেড়ে যাবে তাই এই নিবন্ধে সেদিকে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আল্লাহ যদি তৌফিক দেন তাহলে অন্যকোনো লেখায় সে বিষয়গুলো তুলে ধরার প্রয়াস পাব ইনশাআল্লাহ।

সংক্ষেপে শুধু এতটুকুই বলবো, আমাদের সমাজে কিছুলোক খুব অল্পতেই অন্যের সমালোচনা করে আনন্দ পান। শায়খুল হাদিস বরাবর এমন কতিপয় অপরিণামদর্শী সমালোচকের অহেতুক সমালোচনার শিকার। যদিও হুজুর এসব সমালোচনাকে কখনোই গায়ে মাখেন না এবং রুচিহীন তাসনিফের ক্ষেত্রে তিনি যে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন তাও এজাতি আজীবন মনে রাখবে। বি¯তৃত পরিসরে বুখারি শরিফের বঙ্গানুবাদের মাধ্যমে তিনি হাদিসে নববীকে আলেম ওলামা থেকে শুরু করে সাধারণ মুসলমানদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়েছেন। অনেকে মনে করেন, বাংলা বোখারি শরিফ বাংলাশিক্ষিত সাধারণ লোকদের জন্য। একটি সময় পর্যন্ত আমিও তাই মনে করতাম। ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল। কিতাবটি পড়ার পর দেখলাম- সীমিত শব্দে তিনি এমন কিছু গুপ্তধনের সন্ধান দিয়েছেন, যার গভীরতা উপলব্ধি করা সাধারণের জন্য প্রায় অসম্ভব। যদিও এই গভীরতায় পৌঁছতে অক্ষমের জন্যেও প্রয়োজনীয় ইলম অর্জনের রাস্তা মসৃণ রেখেছেন। এছাড়াও তিনি বাংলা ভাষায় আরও অনেকগুলো গ্রন্থ রচনা করেছেন।

তাকরির ও বয়ানের ময়দানে হুজুর এক বেমেছাল দীনের দায়ী ও ওয়ায়েজ। জটিল থেকে জটিল বিষয়গুলোকে গ্রাম্য উপামা ও গল্পচ্ছলে খুবই সাবলীল ভঙ্গিতে শ্রোতাদের মন-মস্তিষ্কে ঢুকিয়ে দেওয়া হুজুরের এক অনন্য বৈশিষ্ট্য। যে বৈশিষ্ট্য তুলে ধরতে হলে স্বতন্ত্র প্রবন্ধ লিখতে হবে। আমি তখন সবে মাদরাসায় আসা-যাওয়া শুরু করছি, সেই সময়ের কথা। হুজুর আসলেন আমাদের ফরিদপুর জেলার বোয়ালমারীতে। শায়খুল হাদিস সাহেব আসছেন এই খবরে দীনদার শ্রেণী তো বটেই, সচরাচর যারা মাহফিলে যায় না তাদের মধ্যেও সাড়া পড়ে গেল। মানুষের ঢল নামলো সেই মাহফিলে। কিন্তু সকলের মনে একটিই প্রশ্ন- হুজুরের বয়ান কি আমরা বুঝবো ? আমাদের মহল্লার লোকজনসহ আমি আব্বার সঙ্গে হেঁটে হেঁটে সেই মাহফিলে শরীক হলাম। দীর্ঘ ৬-৭ কিলোমিটার রাস্তা। পুরো রাস্তায় আলোচ্য বিষয় একটিই ‘হুজুর এতবড় শাইখুল হাদিস হুজুরের বয়ান বোঝা আমাদের জন্য কি সম্ভব?’ আব্বা তাদের আশ্বস্ত করলেন, সব না বুঝলেও কিছুতো বুঝবো। সবটা না বুঝলেও চলবে। এখলাসের সঙ্গে যারা যাবে, বয়ান শুনবে তাদের আল্লাহ ঠিকই সওয়াব দিয়ে দিবেন। যাহোক এমন নানা জল্পনা-কল্পনার মধ্যদিয়ে প্রতীক্ষার প্রহর শেষ হলো। হুজুরকে বয়ানের জন্য স্টেজে আনা হলো।

হুজুর নাতিদীর্ঘ খুতবা শেষ করে সর্বপ্রথম যে কথাটা বললেন তা হল, ‘আপনারা কি ছেড়াকাঁথা চেনেন?’ হাজার হাজার শ্রোতা সকলেই নিশ্চুপ। হুজুর আবার প্রশ্ন করলেন, আপনারা কাঁথা চেনেন না? এবারও শ্রোতাদের কোনো উত্তর নেই। এবার মঞ্চের থেকে দু’একজন বললেন, হুজুর! কাঁথা মানে শীতের সময় আমরা যে গায়ে দেই সেই কাঁথা? হুজুর হেসে বললেন, হ্যাঁ গায়ে দেওয়া কাঁথা।

উপস্থিত শ্রোতারা একটু নড়ে চড়ে বসলেন। শীতের তীব্রতা এবং হুজুরের অসামান্য ব্যক্তিত্বের সামনে এতোক্ষণ তারা বরফতুল্য জমাট ছিলেন। গ্রামীণ তুচ্ছ বস্তু কাঁথা দিয়ে হুজুর কথা শুরু করায় শ্রোতাদের মধ্যে এক ধরনের ফিসফিসানি এবং কৌতুহল সৃষ্টি হলো। আমার ধারণা হুজুর শ্রোতাদের মনোভাব আঁচ করেই পরিস্থিতিকে স্বাভাবিক করার জন্য ছেড়াকাঁথার প্রসঙ্গ টেনে এনেছেন। হুজুর বললেন, মুমিনের ঈমান হলো কাঁথার মতো। কাঁথা যতো পুরাতন হয় তত তাড়াতাড়ি তাতে ওম ধরে। আর কাঁথা যদি নতুন হয় তাহলে তা গরম হতে এবং ওম ধরতে দেরি হয়। মুমিনের ঈমান যত পুরাতন এবং মজবুত হয় দীনের কথা শুনলে ততো তাড়াতাড়ি জযবা সৃষ্টি হয়। আর যদি দীনের কথা শুনে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হতে বিলম্ব হয় তাহলে বুঝতে হবে তার ঈমান নতুন। শ্রোতাদের প্রশ্ন করলেন, আপনারা কি আমার কথা বুঝছেন ?

শ্রোতারা সমস্বরে চিৎকার করে বলে উঠল, জ্বি হুজুর। মুহূর্তেই যেনো সকলের ঈমানী শক্তি জেগে উঠল। জযবা বেড়ে গেলো। এরপর হুজুর দীর্ঘসময় বয়ান করলেন। শ্রোতারা সময়জ্ঞান ভুলে মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় আত্মস্থ করলেন সে বয়ান। ফেরার পথে শ্রোতাদের মুখে মুখে একটি কথাই ভাসছিল, হুজুর তো একেবারে আমাদের মতো করেই কথা বলেন। এতবড় আলেম অথচ…  ইত্যাদি।

বোদ্ধাজনরা বলে থাকেন, শায়খুল হাদিসকে যদিও আমরা জানি- দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম হাদিস বিশারদ হিসেবে। কিন্তু বাস্তবে তিনি একজন শায়খুত্তাফসিরও বটে। হুজুরের এলমে তাফসীর এমন উঁচুমানের যা শুধুমাত্র একজন উঁচুমাপের মুফাসসিরের পক্ষেই অনুধাবন করা সম্ভব। হুজুর সাধারণত ঢাকার আঞ্চলিক ভাষার সংমিশ্রণে বয়ান করে থাকেন। কিন্তু তাঁর বড় বৈশিষ্ট্য হলো, আলোচ্য বিষয়ের গভীরে গিয়ে বর্তমান সময়ের একটি উপমা টেনে গরল বিষয়কে সরলভাবে উপস্থাপন করা। অনেক বিতর্কিত বিষয়কে অভিনব উপমার আড়ালে তিনি এমনভাবে শ্রোতাদের হৃদয়ে গেঁথে দেন যে, বিষয়টি সকলেই বিনাবাক্যে মেনে নিতে বাধ্য হয়।

হুজুর একবার তাবলিগি ভাইদের উৎসাহিত করতে তিনদিনের জামাতে বের হলেন। কাকরাইল মসজিদে সাজ সাজ রব পড়ে গেল। মুরব্বিরা পরামর্শের মাধ্যমে হুজুরকে পুরান ঢাকায় পাঠালেন। বরকতময় সঙ্গ পেতে মুহাম্মাদপুর এবং কাকরাইল মিলে এক বিরাট কাফেলা হুজুরের পিছু নিল। এলাকাটি ছিল উপশহরীয় অঞ্চল। এক-দুটি প্রাইভেটকার সে অঞ্চলে কখনো-সখনো প্রবেশ করতো। একসঙ্গে অনেকগুলো প্রাইভেট ও মাক্রোবাস প্রবেশ করতে দেখে তারা তো কিংকর্তব্যবিমূঢ়। মাইকে হুজুরের আগমনবার্তা ঘোষণা করা হলো। পঙ্গপালের ন্যায় বনিআদম ছুটে এলো ঐতিহাসিক লংমার্চ নেতাকে দেখার জন্য। ইমাম সাহেব এসে জানালেন তিনি হুজুরের ছাত্র। যার অর্থ হলো, হুজুরের জুমার বয়ান করার পথের সব বাধা দূর হলো। হুজুর তাঁর স্বভাবজাত ভঙ্গিতে বয়ান করে যচ্ছেনÑ আর শ্রোতারা বিমোহিত হয়ে শুনছেন। সময় শেষ হয়ে এলো। পাঁচ মিনিটও বাকি নেই। কিন্তু হুজুর তাবলিগের কথা কিছুই বলছেন না। হুজুরের সঙ্গী-সাথীরা পেরেশান। বারবার ঘড়ি দেখছেন। বিরাট কিছু অর্জনের পর হারানোর বেদনা তাদের চোখে-মুখে। বয়ানের দু’তিন মিনিট বাকি। হুজুর হঠাৎ প্রশ্ন করলেন, আমি এতোক্ষণ যে বয়ান করলাম আপনাদের কেমন লেগেছে? ‘খুব ভালো লেগেছে’  তিনতলা বিশাল মসজিদ কেঁপে ওঠলো। হুজুর বললেন, এই পূর্ণ আলোচনার নাম-ই তাবলিগ। এখন বলেন, তাবলিগ ভালো না মন্দ? আবার চিৎকার ধ্বনি ‘খুবভালো’। বললেন, যারা এই ভালো কাজ করতে রাজি আছেন তারা নাম লেখান। অসংখ্য লোক দাড়িয়ে নাম লেখালেন এবং তিন দিনের বেশ কয়েকটি জামাত নগত বের হলো।

সমাজের অন্যায়-অপকর্মগুলোকে এমনভাবে চোখে আঙুল দিয়ে ধরিয়ে দেন যে, অপরাধী মাত্রই সতর্ক হতে ব্রতী হয়। যেমন, হুজুর এক বয়ানে বললেন আপনারা কি জানেন, বনি ইসরাঈলের আলোচনা কুরআন শরিফে বার বার কেন এসেছে? এজন্যই এসেছে যে, নবীদের কথার বিরুদ্ধাচারণ করা তাদের স্বভাবে পরিণত হয়ে গিয়েছিল। আপনারা মনে মনে ভাবছেন, আমরা বনি ইসরাঈল থেকে কতো ভালো ! শোনেন, এই কথা মনে করে আত্মতৃপ্তিতে ভোগার কোনো সুযোগ নেই। কারণ আপনারাও নবীর সা. আদেশ অমান্য করতে তাদের থেকে কোনো অংশে কম নন।   হয়তো বলবেন, হুজুর এতো শক্ত কথা কেন বললেন? তাহলে শুনুন, হাদিস শরিফে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, পুরুষরা তাদের কাপড় হাঁটুর নিচে এবং টাখনুর উপরে পরবে। অথচ এই সমাজের লোকেরা হয়তো পরবে টাখনুর নিচে নয়তো হাটুর উপরে। আল্লাহর নবী যেখানে পরতে বললেন সেখানে পরলে নাকি ফ্যাশন হয় না। তাহলে আর বনি ইসরাঈলের দোষ কী? এভাবেই তিনি সমাজের চলমান ত্র“টি-বিচ্যুতি চোখে আঙুল দিয়ে ধরিয়ে দিতেন।

প্রিয় পাঠক! যেহেতু এই লেখাটি স্মৃতিচারণমূলক। তাই হাজারো স্মৃতি হৃদয়পটে উকিঝুঁকি মারছে। কারণ হুজুরের মতো মহান ব্যক্তিত্বের সান্নিধ্যে এক-দুইদিন কাটানোর স্মৃতিই এতো সমৃদ্ধ হতে বাধ্য যে, এমন একটি প্রবন্ধ তা ব্যক্ত করতে যথেষ্ট নয়। আর দীর্ঘ প্রায় দুই যুগের স্মৃতিচারণে এমন একটি কেন ২০টি প্রবন্ধ কি যথেষ্ট হতে পারে? কলেবরের সীমাবদ্ধতায় তার যৎকিঞ্চিত আলোচনা করেই ইতি টানতে হবে।

হুজুর যেহেতু শায়খুল হাদিস পরিচয়ে দেশ-মহাদেশ এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সমাদৃত। তাই বাস্তবতার দাবি ছিল এ ব্যাপারে বিশেষভাবে কিছু বলা। কিন্তু সমস্যা হলো, আমার যোগ্যতার সুতা এতটাই ছোট যে, যে সব সফলতার মুক্তা গেঁথে গেঁথে হুজুর শায়খুল হাদিস খেতাবে ভূষিত হলেন। তার একটা মুক্তা ভেদ করে দ্বিতীয় মুক্তা পর্যন্ত পৌঁছতে আমার এ সুতা অকার্যকর। তাছাড়া হুজুরকে আমরা তখন পেয়েছি যখন হুজুর মধ্যগগনের জ্যোতির্ময় সূর্যের আলো নিয়ে জগতবাসীকে হাদিসের আলো বিতরণে পুরোমাত্রায় ব্যস্ত একজন পরিপূর্ণ শায়খুল হাদিস। উলামায়ে উম্মত স্বপ্রণোদিত হয়ে হুজুরকে এনামে ডেকেই তৃপ্তি বোধ করছেন। তাই বলা যায়, এ উপাধি কোনো বিশেষ প্রতিষ্ঠান কর্তৃক প্রদত্ত স্বীকৃতি বা  কোনো ব্যক্তি বিশেষের মূল্যায়নের ভিত্তিতে প্রদত্ত ডক্টরেড জাতীয় নিছক কোনো ডিগ্রি নয়। বরং ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান নির্বিশেষে সম্মিলিত সম্মানবোধের অতুলনীয় বহিঃপ্রকাশ এই উপাধি। অতএব বিন্দু বিন্দু মুক্তাকণা জমা করে হুজুর কি করে এই মহাসিন্ধুতে পরিণত হলেন তা অনুধাবনে হুজুরের হাজার হাজার প্রবীণ ছাত্রদের মূল্যায়ন জানতে হবে। আমি এ প্রবন্ধে এমন একজন প্রবীণ এবং প্রিয় ছাত্রের আংশিক মূল্যায়ন তুলে ধরবো।

হুজুরের সুহবতে দীর্ঘদিন অবস্থান করার সুযোগ ও সৌভাগ্য যাদের হয়েছে, তাদের অন্যতম মুফতি মাওলানা মনসূরুল হক সাহেব। মুফতি সাহেব হুজুর যখন লালবাগ জামিয়ার নবীন উস্তাদ সেই সময়কার এবং তার পরবর্তী জীবনের নানা ঘটনাপ্রবাহ, ঘাত-প্রতিঘাত আর ভাঙ্গাগড়ার অসংখ্য উপাখ্যান আমাদের কাছে বর্ণনা করতেন আবেগভরা হৃদয় নিয়ে। আর সেসব আলোচনায় বার বার ঘুরেফিরে আসত শাইখুল হাদিসের সুমহান ব্যক্তিত্ব ও সীমাহীন কর্তৃত্বের প্রসঙ্গ। সেসব আলোচনার বিস্তারিত বর্ণনার সুযোগ এখানে নেই। তবুও সংক্ষেপে একটি বিষয় উল্লেখ করতে চাই। যে বিষয়টি আমাদের হৃদয়কে খুব নাড়া দিত। আর তাহলো, আমরা যখন মোটামুটি ওপরের দিকে পড়ি, তখন দেখতাম মুফতি সাহেব হুজুর একটা তেপায়া নিয়ে ছাত্রদের পাশাপাশি বসে নিয়মিত হযরত শায়খুল হাদিসের সবকে শরীক হতেন। আমাদের সম্বোধন করে মাঝে মধ্যেই বলতেন, ‘তোমরা তো নামমাত্র হুজুরকে চেন। হুজুরের ইলমী গভীরতা অনুধাবন এবং তা ধারণ করার জন্য আমি এই পর্যায় এসে নিজেকে উপযুক্ত মনে করি। তোমরা হুজুরের তাকরীর কি বুঝবে? আমরা সেই লালবাগ থেকেই হুজুরকে দেখছি। প্রতিদিন, প্রতিমাস এবং প্রতিবছর হুজুরের ইলমে এমন সব সূক্ষ্মবিষয় যোগ হচ্ছে যা আমাদের রীতিমতো অবাক করে দেয়।’

মুফতি সাহেব হুজুরের পূর্ণ আদব ও এহতেরামের সঙ্গে দরসে শরীক হওয়া এবং এসব নসিহত একদিকে যেমন শায়খুল হাদিসের প্রতি আমাদের আরও উৎসর্গপ্রাণ হতে উদ্বুদ্ধ করত, অন্যদিকে হুজুরের দরসে বসার অপেক্ষাকে আমাদের জন্য অসহনীয় করে তুলতো।

বাস্তবেই মুফতি সাহেব হুজুরের মতো হাজারও প্রতিভা পরশপাথরতুল্য শায়খুল হাদিসের ছোঁয়া পেয়ে আজ দেশ ও জাতির খেদমতে অসামান্য অবদান রেখে চলছেন। জগতের চিরাচরিত নিয়মে শায়খুল হাদিস একদিন নশ্বর এ ধরা থেকে বিদায় নিয়ে চলে যাবেন। কিন্তু হাজার হাজার রুহানীসন্তানদের মাধ্যমে তিনি জগতবাসীর হৃদয়আকাশে দ্বিপ্রহরের সূর্যের দীপ্তিতে আলো ছড়াবেন কাল থেকে কালান্তরে।

একজন নগণ্য ছাত্রের দেখা শায়খুল হাদিস

একজন ছাত্র যে কখনো দেখেনি সদর সাহেব হুজুর, পীরজী হুজুর বা ফখরে বাঙ্গাল তাজুল ইসলাম রহ.দের মতো কাউকে। নামমাত্র দেখেছে হাফেজ্জি হুজুরের মতো ব্যক্তিত্বকে। শাব্বির আহমাদ উসমানী আর জাফর আহমাদ উসমানীকে তো দেখার প্রশ্নই আসে না, কিন্তু ছাত্রটি দেখেছে উল্লেখিত মহান ব্যক্তিত্বদের যোগ্য উত্তরসূরি আল্লামা আজিজুল হক দা.বা. এর মতো শায়খুল হাদিসকে। তাহলে এমন ছাত্রের জন্য গর্ব করার জন্য সবচেয়ে উত্তম আর সবচেয়ে তৃপ্তির উপলক্ষ কী হতে পরে? তাইতো আমিও আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন ও গৌরব মনে করি হুজুরের ছাত্রত্ব অর্জনকে। বাস্তবেই আমরা হুজুরের স্বর্ণযুগের ছাত্র হিসেবে অনেক প্রবীণ ও নবীন ছাত্রদের ওপর গর্ব করতেই পারি।

যোগ্যতা ও গ্রহণযোগ্যতার সকলক্ষেত্রে ষোলকলাপূর্ণ শায়খুল হাদিসকে আমরা এমন এক সময় পেয়েছি, যখন এলম ও কামালাত, শখসিয়্যাত ও মাকবুলিয়্যাতের আঠারকলা পূর্ণ করেছেন। প্রত্যেক বস্তুর চূড়ান্ত শিখর রয়েছে এবং প্রত্যেক পূর্ণতার ক্ষয় রয়েছে’। শাশ্বত এই বাণীর চূড়ান্ত শিখরে অবস্থানরত শায়খুল হাদিসকেই যে আমরা পেয়েছি, সে কথা জোর দিয়েই বলা যায়। আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে নব্বই দশকের শেষ পর্যন্ত সময়টা হুজুরের জীবনের কর্মমুখর স্বর্ণযুগ। তাসলিমাবিরোধী আন্দলন, নাস্তিক-মুরতাদবিরোধী আন্দোলন, ভাস্কর্যের নামে ঢাকার যত্রতত্র মূর্তি স্থাপনের বিরুদ্ধে আন্দোলন, বাবরী মসজিদ পুনপ্রতিষ্ঠার দাবিতে অযোধ্যা অভিমুখে লংমার্চ, ফতোয়াবিরোধী রায় বাতিলের দাবিতে আন্দোলন, খেলাফত প্রতিষ্ঠার দাবিতে নিরন্তর আন্দোলন-সংগ্রামের সঙ্গে হুজুরের এই সময়টা জড়িত। আর এই সময়গুলোতে আমরা হুজুরের সান্নিধ্যে থেকে ধন্য হয়েছি।

আমার এই ক্ষুদ্র জীবনের বড় একটা অংশ হুজুরের সান্নিধ্যে কাটানোর অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, হুজুরকে কলমের আঁচড়ে তুলে ধরা অত্যন্ত দুরূহ কাজ। কারণ পরস্পরবিরোধী অনেকগুলো গুণ আমরা তার মধ্যে দেখতে পাই। যেমন- এলমি ব্যাপারগুলো যতটাই তার নখদর্পণে, জাগতিক বিষয়গুলোর সাথে তিনি ততটাই অপরিচিত। দীন-ধর্মের শত্র“দের ব্যাপারে তিনি এতোটাই কঠোর যে, জীবনের প্রশ্নেও আপস করতে রাজি নন, আর তাকে যারা কষ্ট দেন তাদের ব্যাপারে এতোটাই ক্ষমাশীল যে, সামান্য প্রতিবাদ করতেও রাজি নন। দীনের দুশমনদের সমালোচনায় তিনি যতোটাই মুখর, নিজের সমালোচকদের ব্যাপারে ততোটাই নিথর।  অনারম্বড় জীবন-যাপনের ক্ষেত্রে নজিরবিহীন নজির হলেন শায়খুল হাদিস। জীবনের পড়ন্ত বেলায় যখন হুজুরের খুবই মহব্বতের কিছু লোকদের অবদানে হুজুরকে নিজ প্রতিষ্ঠিত হৃদয়তুল্য জামিয়া থেকে নির্বাসনে যেতে হয়, তখনও তাদের ব্যাপারে কিছু বলা হলে হুজুর বলতেন, ওরা এমনটি করতেই পারে না। মনে হয় তৃতীয় কারও কারণে ওরা এমনটি করছে। কেউ তাদের সমালোচনা করলে হুজুর তাদের পক্ষ হয়ে সমালোচনার জবাব দিতেন। এক কথায় হুজুরের ধৈর্য দেখে আমাদের অনেক সময় ধৈর্যচ্যুতি ঘটত। হুজুর বেশি অসুস্থ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত সর্বদা মাদরাসাতেই থাকতেন। তখন ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে হুজুরকে দেখতে হুজুরের রুমে যেতাম। গেলে অনেক কথা হতো। সরলতায় পরিপূর্ণ সব কথাবার্তা। না আছে কপটতা না আছে কারও সমালোচনা। মনে মনে ভাবতাম, আহ! এমন সহজ সরল মানুষকেও কি কষ্ট দেওয়া যায়?

প্রিয় সুধী! হুজুর বর্তমান শারীরিকভাবে অসুস্থ। তথাপি তার বরকতপূর্ণ ছায়া আমাদের জন্য বিরাট নিয়ামত। আল্লাহ তা’য়ালা এই রহমতি ছায়া আমাদের ওপর দীর্ঘ করে দিন। আমিন

 

 

Share