রাহমানিয়ার আরো একটি ফুল ঝড়ে গেলো

ইসলামি অঙ্গনে মুফতি রুহুল আমিন যশোরী বহুল পরিচিত মুখ। মূলত; লেখালেখির কারণেই তার এতো পরিচিতি। গত ২৭ নভেম্বর চরমোনাই মাহফিলে গিয়েছিলেন তিনি। প্রভুর জিকিরে নিজেকে দগদ্ধ করতে ছুটে ছিলেন ফুলবাগানে। রব্বে ইলাহির আশেকিনদের পুষ্পকাননে। সেখানেই চিরতরে বিদায় নেন এই প্রথিতযশা লেখক। ২৮ নভেম্বর শুক্রবার দিবাগত রাত ১২ টায় স্টোক করেন তিনি। সঙ্গে সঙ্গে মাঠে অবস্থিত অস্থায়ী হাসপাতেলে নেয়া হয়। রাত দু’টায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার বয়স হয়েছিল ৫২ বছর।
মুফতি যশোরী ছিলেন একজন প্রতিভাবান বিজ্ঞ আলেম। ৩৫ টির মতো ধর্মীয় বই লিখেছেন। নারীদের নিয়ে তার লেখা বইগুলো বেশ সাড়া জাগিয়েছে। নববধূর উপহার, আহকামে মুমিনা, মুমিন নারীর সফল জীবনের মতো বিখ্যাত গ্রন্থগুলো জায়গা করে নিয়েছে বাংলা মায়ের ঘরে ঘরে। সমকালীন বিষয়ে নিয়মিত কলামও লিখেছেন তিনি। দেশের জাতীয় দৈনিক থেকে শুরু করে সাপ্তাহিক, মাসিক প্রায় সব পত্রিকায় লেখা ছাপা হতো। তার লেখায় নারীদের অধিকার ফুটে উঠে। কথিত নারীবাদীদের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন সোচ্চার। ইসলাম ও শান্তি প্রতিষ্ঠার আন্দোলেন রাজনীতিও করেছেন সময়ে অসময়ে।

মুফতি যশোরী স্বনামধন্য একজন শিক্ষকও ছিলেন। কর্মজীবনের শুরু থেকেই শাইখুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক রহ. প্রতিষ্ঠিত জামিয়া রাহমানিয়ায় শিক্ষকতা করে আসছেন। দেশে হাজার হাজার বিজ্ঞ ছাত্র রয়েছে তার। জামিয়া রাহমানিয়ার পাশাপাশি দারুল উলুম ইন্টারন্যাশনাল ও মাদরাসায়ে আব্দুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুমেও শিক্ষকতা করেছেন। এহসান হজ্ব কাফেলার পরিচালক এবং দারুল এহসান হাউজিং সোসাইটির চেয়ারম্যান হিসেবেও কর্মরত ছিলেন।

মুফতি রুহুল আমীন যশোরীর গ্রামের বাড়ি যশোরের বারান্দিপাড়ায়। ১৯৬৩ সনের ১ জুলাই হাজী নুর মুহাম্মাদের ঔরসে জন্মগ্রহণ করেন। তার মায়ের নামÑ মালেকা বেগম। প্রাথমিক পড়ালেখা গ্রামেই করেন। ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েন প্রাইমারী স্কুলে। তারপর ভর্তি হন যশোর নন অপিস পাড়া আলীয়া মাদরাসায়। কিছুদিন পর মুরব্বীদের পরামর্শে চলে আসেন যশোর রেল গেইট কওমি মাদরাসায়। সেখান থেকে ভর্তি হন উপমহাদেশের ঐতিহ্যবাহী ইসলামি বিদ্যাপীট মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারী মাদরাসায়। সেখানেও বেশিদিন থাকা হয়নি। ১৯৭৮ সনে চলে আসেন ঢাকার লালবাগ জামিয়া কোরআনিয়ায়। তখনকার সময়ে লালবাগ মাদরাসা ছিল ঢাকার শ্রেষ্ঠ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। মুহাম্মাদুল্লাহ হাফেজ্জি রহ. যফর আহমাদ উসমানী, শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক রহ., মাওলানা আব্দুল মজিদ ঢাকুবী রহ. ও মাওলানা মুজিবুর রহমান রহ. -এর মতো বিদগ্ধ আলেমগণ সেখানে শিক্ষকতা করতেন। তাদের সুহবতে নাহবেমীর থেকে জালালাইন পর্যন্ত পড়ালেখা করেন। মেশকাত পড়েন শায়খুল হাদিস রহ. প্রতিষ্ঠিত জামিয়া মুহাম্মাদিয়ায়। পরে মুরব্বিদের পরামর্শে উচ্চ শিক্ষার জন্য পাড়ি জমান করাচির জামিয়াতুল উলুমিল ইসলামিয়া মাদরাসায়। অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে দাওরায়ে হাদিস এবং উচ্চতর ইসলামি আইন গবেষণা (ইফতা) শেষ করে ফিরে আসেন স্বদেশে।

তার লেখা আরও কিছু বই হলো- নারী জন্মের আনন্দ, আদর্শ স্ত্রী, আদর্শ মা, আদর্শ পিতা, জান্নাতী হুর, গুনাহে জারিয়াহ, সকাল-সন্ধ্যার আমল, মহিলাদের পবিত্র জীবন, মুমিন নারীর সুন্দর জীবন, আদর্শ স্ত্রীর পথ ও পাথেয়, শিশুদের মাসয়ালা-মাসায়িল, হযরত আবু বকর রা. এর ১০০ ঘটনা, হযরত উমর ফারুক রা. এর ১০০ ঘটনা, হযরত উসমান গণী রা. এর ১০০ ঘটনা, হযরত আলী মুরতযা রা. এর ১০০ ঘটনা, হযরত হাসান হুসাইন রা. এর ১০০ ঘটনা, হযরত বিলাল হাবশী রা. এর ১০০ ঘটনা, হযরত সালমান ফারসী রা. এর ১০০ ঘটনা, ৪০ দরূদ ও সালাম, যাদু ও জ্যোতিষবিদ্যা, ইসলামের দৃষ্টিতে মিলাদ ইত্যাদি।
মুফতি যশোরী ১ ছেলে ও তিন মেয়ের জনক। যশোরের পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়েছে।
আল্লাহ তা’য়ালা আল্লাহর এই মকবুল বান্দার সকল দ্বীনি খেদমত কবুল করুন এবং তাকে জান্নাতের উচ্চ মর্যাদা দান করুন। আমীন।

Share

কুরবানীর মাসায়েল

মাওলানা মুহাম্মাদ ইয়াহইয়া

 কুরবানী একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। এটি আদায় করা ওয়াজিব।

সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি এই ইবাদত পালন করে না তার ব্যাপারে হাদীস শরীফে এসেছে, ‘যার কুরবানীর সামর্থ্য রয়েছে কিন্তু কুরবানী করে না সে যেন আমাদের ঈদগাহে না আসে।’-মুস্তাদরাকে হাকেম, হাদীস : ৩৫১৯; আত্তারগীব ওয়াত্তারহীব ২/১৫৫

ইবাদতের মূলকথা হল আল্লাহ তাআলার আনুগত্য এবং তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন। তাই যেকোনো ইবাদতের পূর্ণতার জন্য দুটি বিষয় জরুরি। ইখলাস তথা একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে পালন করা এবং শরীয়তের নির্দেশনা মোতাবেক মাসায়েল অনুযায়ী সম্পাদন করা। এ উদ্দেশ্যে এখানে কুরবানীর কিছু জরুরি মাসায়েল উল্লেখ হল।

কার উপর কুরবানী ওয়াজিব

মাসআলা : ১. প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থমস্তিষ্ক সম্পন্ন প্রত্যেক মুসলিম নর-নারী, যে ১০ যিলহজ্ব ফজর থেকে ১২ যিলহজ্ব সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনের অতিরিক্ত নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হবে তার উপর কুরবানী করা ওয়াজিব। টাকা-পয়সা, সোনা-রূপা, অলঙ্কার, বসবাস ও খোরাকির প্রয়োজন আসে না এমন জমি, প্রয়োজন অতিরিক্ত বাড়ি, ব্যবসায়িক পণ্য ও অপ্রয়োজনীয় সকল আসবাবপত্র কুরবানীর নেসাবের ক্ষেত্রে হিসাবযোগ্য।

আর নিসাব হল স্বর্ণের ক্ষেত্রে সাড়ে সাত (৭.৫) ভরি, রূপার ক্ষেত্রে সাড়ে বায়ান্ন (৫২.৫) ভরি, টাকা-পয়সা ও অন্যান্য বস্ত্তর ক্ষেত্রে নিসাব হল এর মূল্য সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপার মূল্যের সমপরিমাণ হওয়া। আর সোনা বা রূপা কিংবা টাকা-পয়সা এগুলোর কোনো একটি যদি পৃথকভাবে নেসাব পরিমাণ না থাকে কিন্তু প্রয়োজন অতিরিক্ত একাধিক বস্ত্ত মিলে সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপার মূল্যের সমপরিমাণ হয়ে যায় তাহলেও তার উপর কুরবানী করা ওয়াজিব।-আলমুহীতুল বুরহানী ৮/৪৫৫; ফাতাওয়া তাতারখানিয়া ১৭/৪০৫

নেসাবের মেয়াদ

মাসআলা ২. কুরবানীর নেসাব পুরো বছর থাকা জরুরি নয়; বরং কুরবানীর তিন দিনের মধ্যে যে কোনো দিন থাকলেই কুরবানী ওয়াজিব হবে।-বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৬, রদ্দুল মুহতার ৬/৩১২

কুরবানীর সময়

মাসআলা : ৩. মোট তিনদিন কুরবানী করা যায়। যিলহজ্বের ১০, ১১ ও ১২ তারিখ সূর্যাস্ত পর্যন্ত। তবে সম্ভব হলে যিলহজ্বের ১০ তারিখেই কুরবানী করা উত্তম। -মুয়াত্তা মালেক ১৮৮, বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৮, ২৩, ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৫/২৯৫

নাবালেগের কুরবানী

মাসআলা : ৪. নাবালেগ শিশু-কিশোর তদ্রূপ যে সুস্থমস্তিষ্কসম্পন্ন নয়, নেসাবের মালিক হলেও তাদের উপর কুরবানী ওয়াজিব নয়। অবশ্য তার অভিভাবক নিজ সম্পদ দ্বারা তাদের পক্ষে কুরবানী করলে তা সহীহ হবে।-বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৬, রদ্দুল মুহতার ৬/৩১৬

মুসাফিরের জন্য কুরবানী

মাসআলা : ৫.  যে ব্যক্তি কুরবানীর দিনগুলোতে মুসাফির থাকবে (অর্থাৎ ৪৮ মাইল বা প্রায় ৭৮ কিলোমিটার দূরে যাওয়ার নিয়তে নিজ এলাকা ত্যাগ করেছে) তার উপর কুরবানী ওয়াজিব নয়। -ফাতাওয়া কাযীখান ৩/৩৪৪, বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৫, আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩১৫

নাবালেগের পক্ষ থেকে কুরবানী

মাসআলা : ৬. নাবালেগের পক্ষ থেকে কুরবানী দেওয়া অভিভাবকের উপর ওয়াজিব নয়; বরং মুস্তাহাব।-রদ্দুল মুহতার ৬/৩১৫; ফাতাওয়া কাযীখান ৩/৩৪৫

দরিদ্র ব্যক্তির কুরবানীর হুকুম

মাসআলা : ৭. দরিদ্র ব্যক্তির উপর কুরবানী করা ওয়াজিব নয়; কিন্তু সে যদি কুরবানীর নিয়তে কোনো পশু কিনে তাহলে তা কুরবানী করা ওয়াজিব হয়ে যায়। -বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯২

কুরবানী করতে না পারলে

মাসআলা : ৮. কেউ যদি কুরবানীর দিনগুলোতে ওয়াজিব কুরবানী দিতে না পারে তাহলে কুরবানীর পশু ক্রয় না করে থাকলে তার উপর কুরবানীর উপযুক্ত একটি ছাগলের মূল্য সদকা করা ওয়াজিব। আর যদি পশু ক্রয় করে ছিল, কিন্তু কোনো কারণে কুরবানী দেওয়া হয়নি তাহলে ঐ পশু জীবিত সদকা করে দিবে।-বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৪, ফাতাওয়া কাযীখান ৩/৩৪৫

প্রথম দিন কখন থেকে কুরবানী করা যাবে

মাসআলা : ৯. যেসব এলাকার লোকদের উপর জুমা ও ঈদের নামায ওয়াজিব তাদের জন্য ঈদের নামাযের আগে কুরবানী করা জায়েয নয়। অবশ্য বৃষ্টিবাদল বা অন্য কোনো ওজরে যদি প্রথম দিন ঈদের নামায না হয় তাহলে ঈদের নামাযের সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর প্রথম দিনেও কুরবানী করা জায়েয।-সহীহ বুখারী ২/৮৩২, কাযীখান ৩/৩৪৪, আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩১৮

রাতে কুরবানী করা

মাসআলা : ১০.  ১০ ও ১১ তারিখ দিবাগত রাতেও কুরবানী করা জায়েয। তবে দিনে কুরবানী করাই ভালো। -মুসনাদে আহমাদ, হাদীস : ১৪৯২৭; মাজমাউয যাওয়াইদ ৪/২২, আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩২০, কাযীখান ৩/৩৪৫, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২৩

কুরবানীর উদ্দেশ্যে ক্রয়কৃত পশু সময়ের পর যবাই করলে

মাসআলা : ১১. কুরবানীর দিনগুলোতে যদি জবাই করতে না পারে তাহলে খরিদকৃত পশুই সদকা করে দিতে হবে। তবে যদি (সময়ের পরে) জবাই করে ফেলে তাহলে পুরো গোশত সদকা করে দিতে হবে। এক্ষেত্রে গোশতের মূল্য যদি জীবিত পশুর চেয়ে কমে যায় তাহলে যে পরিমাণ মূল্য হ্রাস পেল তা-ও সদকা করতে হবে।-বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০২, আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩২০-৩২১

কোন কোন পশু দ্বারা কুরবানী করা যাবে

মাসআলা : ১২.  উট, গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা দ্বারা কুরবানী করা জায়েয। এসব গৃহপালিত পশু ছাড়া অন্যান্য পশু যেমন হরিণ, বন্যগরু ইত্যাদি দ্বারা কুরবানী করা জায়েয নয়। -কাযীখান ৩/৩৪৮, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৫

নর ও মাদা পশুর কুরবানী

মাসআলা : ১৩. যেসব পশু কুরবানী করা জায়েয সেগুলোর নর-মাদা দুটোই কুরবানী করা যায়। -কাযীখান ৩/৩৪৮, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৫

কুরবানীর পশুর বয়সসীমা

মাসআলা : ১৪. উট কমপক্ষে ৫ বছরের হতে হবে। গরু ও মহিষ কমপক্ষে ২ বছরের হতে হবে। আর ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা কমপক্ষে ১ বছরের হতে হবে। তবে ভেড়া ও দুম্বা যদি ১ বছরের কিছু কমও হয়, কিন্তু এমন হৃষ্টপুষ্ট হয় যে, দেখতে ১ বছরের মতো মনে হয় তাহলে তা দ্বারাও কুরবানী করা জায়েয। অবশ্য এক্ষেত্রে কমপক্ষে ৬ মাস বয়সের হতে হবে।

উল্লেখ্য, ছাগলের বয়স ১ বছরের কম হলে কোনো অবস্থাতেই তা দ্বারা কুরবানী জায়েয হবে না। -কাযীখান ৩/৩৪৮, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৫-২০৬

এক পশুতে শরীকের সংখ্যা

মাসআলা : ১৫. একটি ছাগল, ভেড়া বা দুম্বা দ্বারা শুধু একজনই কুরবানী দিতে পারবে। এমন একটি পশু কয়েকজন মিলে কুরবানী করলে কারোটাই সহীহ হবে না। আর উট, গরু, মহিষে সর্বোচ্চ সাত জন শরীক হতে পারবে। সাতের অধিক শরীক হলে কারো কুরবানী সহীহ হবে না। -সহীহ মুসলিম ১৩১৮, মুয়াত্তা মালেক ১/৩১৯, কাযীখান ৩/৩৪৯, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৭-২০৮

সাত শরীকের কুরবানী

মাসআলা : ১৬. সাতজনে মিলে কুরবানী করলে সবার অংশ সমান হতে হবে। কারো অংশ এক সপ্তমাংশের কম হতে পারবে না। যেমন কারো আধা ভাগ, কারো দেড় ভাগ। এমন হলে কোনো শরীকের কুরবানীই সহীহ হবে না। -বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৭

মাসআলা : ১৭. উট, গরু, মহিষ সাত ভাগে এবং সাতের কমে যেকোনো সংখ্যা যেমন দুই, তিন, চার, পাঁচ ও ছয় ভাগে কুরবানী করা জায়েয। -সহীহ মুসলিম ১৩১৮, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৭

কোনো অংশীদারের গলদ নিয়ত হলে

মাসআলা : ১৮. যদি কেউ আল্লাহ তাআলার হুকুম পালনের উদ্দেশ্যে কুরবানী না করে শুধু গোশত খাওয়ার নিয়তে কুরবানী করে তাহলে তার কুরবানী সহীহ হবে না। তাকে অংশীদার বানালে শরীকদের কারো কুরবানী হবে না। তাই অত্যন্ত সতর্কতার সাথে শরীক নির্বাচন করতে হবে। -বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৮, কাযীখান ৩/৩৪৯

কুরবানীর পশুতে আকীকার অংশ

মাসআলা : ১৯. কুরবানীর গরু, মহিষ ও উটে আকীকার নিয়তে শরীক হতে পারবে। এতে কুরবানী ও আকীকা দুটোই সহীহ হবে।-তাহতাবী আলাদ্দুর ৪/১৬৬, রদ্দুল মুহতার ৬/৩৬২

মাসআলা : ২০. শরীকদের কারো পুরো বা অধিকাংশ উপার্জন যদি হারাম হয় তাহলে কারো কুরবানী সহীহ হবে না।

মাসআলা : ২১. যদি কেউ গরু, মহিষ বা উট একা কুরবানী দেওয়ার নিয়তে কিনে আর সে ধনী হয় তাহলে ইচ্ছা করলে অন্যকে শরীক করতে পারবে। তবে এক্ষেত্রে একা কুরবানী করাই শ্রেয়। শরীক করলে সে টাকা সদকা করে দেওয়া উত্তম। আর যদি ওই ব্যক্তি এমন গরীব হয়, যার উপর কুরবানী করা ওয়াজিব নয়, তাহলে সে অন্যকে শরীক করতে পারবে না। এমন গরীব ব্যক্তি যদি কাউকে শরীক করতে চায় তাহলে পশু ক্রয়ের সময়ই নিয়ত করে নিবে।-কাযীখান ৩/৩৫০-৩৫১, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২১০

কুরবানীর উত্তম পশু

মাসআলা : ২২. কুরবানীর পশু হৃষ্টপুষ্ট হওয়া উত্তম।-মুসনাদে আহমদ ৬/১৩৬, আলমগীরী ৫/৩০০, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২৩

খোড়া পশুর কুরবানী

মাসআলা : ২৩. যে পশু তিন পায়ে চলে, এক পা মাটিতে রাখতে পারে না বা ভর করতে পারে না এমন পশুর কুরবানী জায়েয নয়। -জামে তিরমিযী ১/২৭৫, সুনানে আবু দাউদ ৩৮৭, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২১৪, রদ্দুল মুহতার ৬/৩২৩, আলমগীরী ৫/২৯৭

রুগ্ন ও দুর্বল পশুর কুরবানী

মাসআলা : ২৪. এমন শুকনো দুর্বল পশু, যা জবাইয়ের স্থান পর্যন্ত হেঁটে যেতে পারে না তা দ্বারা কুরবানী করা জায়েয নয়। -জামে তিরমিযী ১/২৭৫, আলমগীরী ৫/২৯৭, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২১৪

দাঁত নেই এমন পশুর কুরবানী

মাসআলা : ২৫. যে পশুর একটি দাঁতও নেই বা এত বেশি দাঁত পড়ে গেছে যে, ঘাস বা খাদ্য চিবাতে পারে না এমন পশু দ্বারাও কুরবানী করা জায়েয নয়। -বাদায়েউস সানায়ে ৪/২১৫, আলমগীরী ৫/২৯৮

যে পশুর শিং ভেঙ্গে বা ফেটে গেছে

মাসআলা : ২৬. যে পশুর শিং একেবারে গোড়া থেকে ভেঙ্গে গেছে, যে কারণে

মস্তিষ্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সে পশুর কুরবানী জায়েয নয়। পক্ষান্তরে যে পশুর অর্ধেক শিং বা কিছু শিং ফেটে বা ভেঙ্গে গেছে বা শিং একেবারে উঠেইনি সে পশু কুরবানী করা জায়েয। -জামে তিরমিযী ১/২৭৬, সুনানে আবু দাউদ ৩৮৮, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২১৬, রদ্দুল মুহতার ৬/৩২৪, আলমগীরী ৫/২৯৭

কান বা লেজ কাটা পশুর কুরবানী

মাসআলা : ২৭. যে পশুর লেজ বা কোনো কান অর্ধেক বা তারও বেশি কাটা সে পশুর কুরবানী জায়েয নয়। আর যদি অর্ধেকের বেশি থাকে তাহলে তার কুরবানী জায়েয। তবে জন্মগতভাবেই যদি কান ছোট হয় তাহলে অসুবিধা নেই। -জামে তিরমিযী ১/২৭৫, মুসনাদে আহমদ ১/৬১০, ইলাউস সুনান ১৭/২৩৮, কাযীখান ৩/৩৫২, আলমগীরী ৫/২৯৭-২৯৮

অন্ধ পশুর কুরবানী

মাসআলা : ২৮. যে পশুর দুটি চোখই অন্ধ বা এক চোখ পুরো নষ্ট সে পশু কুরবানী করা জায়েয নয়। -জামে তিরমিযী ১/২৭৫, কাযীখান ৩/৩৫২, আলমগীরী ২৯৭, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২১৪

নতুন পশু ক্রয়ের পর হারানোটা পাওয়া গেলে

মাসআলা : ২৯. কুরবানীর পশু হারিয়ে যাওয়ার পরে যদি আরেকটি কেনা হয় এবং পরে হারানোটিও পাওয়া যায় তাহলে কুরবানীদাতা গরীব হলে (যার উপর কুরবানী ওয়াজিব নয়) দুটি পশুই কুরবানী করা ওয়াজিব। আর ধনী হলে কোনো একটি কুরবানী করলেই হবে। তবে দুটি কুরবানী করাই উত্তম। -সুনানে বায়হাকী ৫/২৪৪, ইলাউস সুনান ১৭/২৮০, বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৯, কাযীখান ৩/৩৪৭

গর্ভবতী পশুর কুরবানী

মাসআলা : ৩০. গর্ভবতী পশু কুরবানী করা জায়েয। জবাইয়ের পর যদি বাচ্চা জীবিত পাওয়া যায় তাহলে সেটাও জবাই করতে হবে। তবে প্রসবের সময় আসন্ন হলে সে পশু কুরবানী করা মাকরূহ। -কাযীখান ৩/৩৫০

পশু কেনার পর দোষ দেখা দিলে

মাসআলা : ৩১. কুরবানীর নিয়তে ভালো পশু কেনার পর যদি তাতে এমন কোনো দোষ দেখা দেয় যে কারণে কুরবানী জায়েয হয় না তাহলে ওই পশুর কুরবানী সহীহ হবে না। এর স্থলে আরেকটি পশু কুরবানী করতে হবে। তবে ক্রেতা গরীব হলে ত্রুটিযুক্ত পশু দ্বারাই কুরবানী করতে পারবে। -খুলাসাতুল ফাতাওয়া ৪/৩১৯, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২১৬, ফাতাওয়া নাওয়াযেল ২৩৯, রদ্দুল মুহতার ৬/৩২৫

পশুর বয়সের ব্যাপারে বিক্রেতার কথা

মাসআলা : ৩২. যদি বিক্রেতা কুরবানীর পশুর বয়স পূর্ণ হয়েছে বলে স্বীকার করে আর পশুর শরীরের অবস্থা দেখেও তাই মনে হয় তাহলে বিক্রেতার কথার উপর নির্ভর করে পশু কেনা এবং তা দ্বারা কুরবানী করা যাবে। -আহকামে ঈদুল আযহা, মুফতী মুহাম্মাদ শফী রহ. ৫

বন্ধ্যা পশুর কুরবানী

মাসআলা : ৩৩. বন্ধ্যা পশুর কুরবানী জায়েয। -রদ্দুল মুহতার ৬/৩২৫

নিজের কুরবানীর পশু নিজে জবাই করা

মাসআলা : ৩৪. কুরবানীর পশু নিজে জবাই করা উত্তম। নিজে না পারলে অন্যকে দিয়েও জবাই করাতে পারবে। এক্ষেত্রে কুরবানীদাতা পুরুষ হলে জবাইস্থলে তার উপস্থিত থাকা ভালো। -মুসনাদে আহমদ ২২৬৫৭, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২২-২২৩, আলমগীরী ৫/৩০০, ইলাউস সুনান ১৭/২৭১-২৭৪

জবাইয়ে একাধিক ব্যক্তি শরীক হলে

মাসআলা : ৩৫. অনেক সময় জবাইকারীর জবাই সম্পন্ন হয় না, তখন কসাই বা অন্য কেউ জবাই সম্পন্ন করে থাকে। এক্ষেত্রে অবশ্যই উভয়কেই নিজ নিজ যবাইয়ের আগে ‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার’ পড়তে হবে। যদি কোনো একজন না পড়ে তবে ওই কুরবানী সহীহ হবে না এবং জবাইকৃত পশুও হালাল হবে না। -রদ্দুল মুহতার ৬/৩৩৪

কুরবানীর পশু থেকে জবাইয়ের আগে উপকৃত হওয়া

মাসআলা : ৩৬. কুরবানীর পশু কেনার পর বা নির্দিষ্ট করার পর তা থেকে উপকৃত হওয়া জায়েয নয়। যেমন হালচাষ করা, আরোহণ করা, পশম কাটা ইত্যাদি।সুতরাং কুরবানীর পশু দ্বারা এসব করা যাবে না। যদি করে তবে পশমের মূল্য, হালচাষের মূল্য ইত্যাদি সদকা করে দিবে।-মুসনাদে আহমদ ২/১৪৬, নায়লুল আওতার ৩/১৭২, ইলাউস সুনান ১৭/২৭৭, কাযীখান ৩/৩৫৪, আলমগীরী ৫/৩০০

কুরবানীর পশুর দুধ পান করা

মাসআলা : ৩৭. কুরবানীর পশুর দুধ পান করা যাবে না। যদি জবাইয়ের সময় আসন্ন হয় আর দুধ দোহন না করলে পশুর

কষ্ট হবে না বলে মনে হয় তাহলে দোহন করবে না। প্রয়োজনে ওলানে ঠান্ডা পানি ছিটিয়ে দেবে। এতে দুধের চাপ কমে যাবে। যদি দুধ দোহন করে ফেলে তাহলে তা সদকা করে দিতে হবে। নিজে পান করে থাকলে মূল্য সদকা করে দিবে। -মুসনাদে আহমদ ২/১৪৬, ইলাউস সুনান ১৭/২৭৭,

রদ্দুল মুহতার ৬/৩২৯, কাযীখান ৩/৩৫৪, আলমগীরী ৫/৩০১

কোনো শরীকের মৃত্যু ঘটলে

মাসআলা : ৩৮. কয়েকজন মিলে কুরবানী করার ক্ষেত্রে জবাইয়ের আগে কোনো শরীকের মৃত্যু হলে তার ওয়ারিসরা যদি মৃতের পক্ষ থেকে কুরবানী করার অনুমতি দেয় তবে তা জায়েয হবে। নতুবা ওই শরীকের টাকা ফেরত দিতে হবে। অবশ্য তার

স্থলে অন্যকে শরীক করা যাবে। -বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৯, আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩২৬, কাযীখান ৩/৩৫১

কুরবানীর পশুর বাচ্চা হলে

মাসআলা : ৩৯. কুরবানীর পশু বাচ্চা দিলে ওই বাচ্চা জবাই না করে জীবিত সদকা করে দেওয়া উত্তম। যদি সদকা না করে তবে কুরবানীর পশুর সাথে বাচ্চাকেও জবাই করবে এবং গোশত সদকা করে দিবে।-কাযীখান ৩/৩৪৯, আলমগীরী ৫/৩০১, রদ্দুল মুহতার ৬/৩২৩

মৃতের পক্ষ থেকে কুরবানী

মাসআলা : ৪০. মৃতের পক্ষ থেকে কুরবানী করা জায়েয। মৃত ব্যক্তি যদি ওসিয়ত না করে থাকে তবে সেটি নফল কুরবানী হিসেবে গণ্য হবে। কুরবানীর স্বাভাবিক গোশতের মতো তা নিজেরাও খেতে পারবে এবং আত্মীয়-স্বজনকেও দিতে পারবে। আর যদি মৃত ব্যক্তি কুরবানীর ওসিয়ত করে গিয়ে থাকে তবে এর গোশত নিজেরা খেতে পারবে না। গরীব-মিসকীনদের মাঝে সদকা করে দিতে হবে। -মুসনাদে আহমদ ১/১০৭, হাদীস ৮৪৫, ইলাউস সুনান ১৭/২৬৮, রদ্দুল মুহতার ৬/৩২৬, কাযীখান ৩/৩৫২

কুরবানীর গোশত জমিয়ে রাখা

মাসআলা : ৪১. কুরবানীর গোশত তিনদিনেরও অধিক জমিয়ে রেখে খাওয়া জায়েয।-বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২৪, সহীহ মুসলিম ২/১৫৯, মুয়াত্তা মালেক ১/৩১৮, ইলাউস সুনান ১৭/২৭০

কুরবানীর গোশত বণ্টন

মাসআলা : ৪২. শরীকে কুরবানী করলে ওজন করে গোশত বণ্টন করতে হবে। অনুমান করে ভাগ করা জায়েয নয়।-আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩১৭, কাযীখান ৩/৩৫১

মাসআলা : ৪৩. কুরবানীর গোশতের এক তৃতীয়াংশ গরীব-মিসকীনকে এবং এক তৃতীয়াংশ আত্মীয়-স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশীকে দেওয়া উত্তম। অবশ্য পুরো গোশত যদি নিজে রেখে দেয় তাতেও কোনো অসুবিধা নেই। -বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২৪, আলমগীরী ৫/৩০০

গোশত, চর্বি বিক্রি করা

মাসআলা : ৪৪. কুরবানীর গোশত, চর্বি ইত্যাদি বিক্রি করা জায়েয নয়। বিক্রি করলে পূর্ণ মূল্য সদকা করে দিতে হবে। -ইলাউস সুনান ১৭/২৫৯, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২৫, কাযীখান ৩/৩৫৪, আলমগীরী ৫/৩০১

জবাইকারীকে চামড়া, গোশত দেওয়া

মাসআলা : ৪৫. জবাইকারী, কসাই বা কাজে সহযোগিতাকারীকে চামড়া, গোশত বা কুরবানীর পশুর কোনো কিছু পারিশ্রমিক হিসেবে দেওয়া জায়েয হবে না। অবশ্য পূর্ণ পারিশ্রমিক দেওয়ার পর পূর্বচুক্তি ছাড়া হাদিয়া হিসাবে গোশত বা তরকারী দেওয়া যাবে।

জবাইয়ের অস্ত্র

মাসআলা : ৪৬. ধারালো অস্ত্র দ্বারা জবাই করা উত্তম।-বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২৩

পশু নিস্তেজ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা

মাসআলা : ৪৭. জবাইয়ের পর পশু

নিস্তেজ হওয়ার আগে চামড়া খসানো বা অন্য কোনো অঙ্গ কাটা মাকরূহ। -বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২৩

অন্য পশুর সামনে জবাই করা

মাসআলা : ৪৮. এক পশুকে অন্য পশুর সামনে জবাই করবে না। জবাইয়ের সময় প্রাণীকে অধিক কষ্ট না দেওয়া।

কুরবানীর গোশত বিধর্মীকে দেওয়া

মাসআলা : ৪৯. কুরবানীর গোশত হিন্দু ও অন্য ধর্মাবলম্বীকে দেওয়া জায়েয।-ইলাউস সুনান ৭/২৮৩, ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৫/৩০০

অন্য কারো ওয়াজিব কুরবানী আদায় করতে চাইলে

মাসআলা : ৫০. অন্যের ওয়াজিব কুরবানী দিতে চাইলে ওই ব্যক্তির অনুমতি নিতে হবে। নতুবা ওই ব্যক্তির কুরবানী আদায় হবে না। অবশ্য স্বামী বা পিতা যদি স্ত্রী বা সন্তানের বিনা অনুমতিতে তার পক্ষ থেকে কুরবানী করে তাহলে তাদের কুরবানী আদায় হয়ে যাবে। তবে অনুমতি নিয়ে আদায় করা ভালো।

কুরবানীর পশু চুরি হয়ে গেলে বা মরে গেলে

মাসআলা : ৫১. কুরবানীর পশু যদি চুরি হয়ে যায় বা মরে যায় আর কুরবানীদাতার উপর পূর্ব থেকে কুরবানী ওয়াজিব থাকে তাহলে আরেকটি পশু কুরবানী করতে হবে। গরীব  হলে (যার উপর কুরবানী ওয়াজিব নয়) তার জন্য আরেকটি পশু কুরবানী করা ওয়াজিব নয়।-বাদায়েউস সানায়ে ৪/২১৬, খুলাসাতুল ফাতাওয়া ৪/৩১৯

পাগল পশুর কুরবানী

মাসআলা : ৫২. পাগল পশু কুরবানী করা জায়েয। তবে যদি এমন পাগল হয় যে, ঘাস পানি দিলে খায় না এবং মাঠেও চরে না তাহলে সেটার কুরবানী জায়েয হবে না। -আননিহায়া ফী গরীবিল হাদীস ১/২৩০, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২১৬, ইলাউস সুনান ১৭/২৫২

নিজের কুরবানীর গোশত খাওয়া

মাসআলা : ৫৩. কুরবানীদাতার জন্য নিজ কুরবানীর গোশত খাওয়া মুস্তাহাব। -সূরা হজ্ব ২৮, সহীহ মুসলিম ২২/১৫৯, মুসনাদে আহমদ, হাদীস ৯০৭৮, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২৪

ঋণ করে কুরবানী করা

মাসআলা : ৫৪. কুরবানী ওয়াজিব এমন ব্যক্তিও ঋণের টাকা দিয়ে কুরবানী করলে ওয়াজিব আদায় হয়ে যাবে। তবে সুদের উপর ঋণ নিয়ে কুরবানী করা যাবে না।

হাজীদের উপর ঈদুল আযহার কুরবানী

মাসআলা : ৫৫. যেসকল হাজী কুরবানীর দিনগুলোতে মুসাফির থাকবে তাদের উপর ঈদুল আযহার কুরবানী ওয়াজিব নয়। কিন্তু যে হাজী কুরবানীর কোনো দিন মুকীম থাকবে সামর্থ্যবান হলে তার উপর ঈদুল আযহার কুরবানী করা জরুরি হবে। -ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৫/২৯৩, আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩১৫, বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৫, ইমদাদুল ফাতাওয়া ২/১৬৬

নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ থেকে কুরবানী করা

মাসআলা : ৫৬. সামর্থ্যবান ব্যক্তির রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ থেকে কুরবানী করা উত্তম। এটি বড় সৌভাগ্যের বিষয়ও বটে। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আলী রা.কে তার পক্ষ থেকে কুরবানী করার ওসিয়্যত করেছিলেন। তাই তিনি প্রতি বছর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ থেকেও কুরবানী দিতেন। -সুনানে আবু দাউদ ২/২৯, জামে তিরমিযী ১/২৭৫, ইলাউস সুনান ১৭/২৬৮, মিশকাত ৩/৩০৯

কোন দিন কুরবানী করা উত্তম

মাসআলা : ৫৭. ১০, ১১ ও ১২ এ তিন দিনের মধ্যে প্রথম দিন কুরবানী করা অধিক উত্তম। এরপর দ্বিতীয় দিন, এরপর তৃতীয় দিন। -রদ্দুল মুহতার ৬/৩১৬

খাসীকৃত ছাগল দ্বারা কুরবানী

মাসআলা : ৫৮. খাসিকৃত ছাগল দ্বারা কুরবানী করা উত্তম। -ফাতহুল কাদীর ৮/৪৯৮, মাজমাউল আনহুর ৪/২২৪, ইলাউস সুনান ১৭/৪৫৩

জীবিত ব্যক্তির নামে কুরবানী

মাসআলা : ৫৯. যেমনিভাবে মৃতের পক্ষ থেকে ঈসালে সওয়াবের উদ্দেশ্যে কুরবানী করা জায়েয তদ্রূপ জীবিত ব্যক্তির পক্ষ থেকে তার ইসালে সওয়াবের জন্য নফল কুরবানী করা জায়েয। এ কুরবানীর গোশত দাতা ও তার পরিবারও খেতে পারবে।

বিদেশে অবস্থানরত ব্যক্তির কুরবানী অন্যত্রে করা

মাসআলা : ৬০. বিদেশে অবস্থানরত ব্যক্তির জন্য নিজ দেশে বা অন্য কোথাও কুরবানী করা জায়েয।

কুরবানীদাতা ভিন্ন স্থানে থাকলে কখন জবাই করবে

মাসআলা : ৬১. কুরবানীদাতা এক স্থানে আর কুরবানীর পশু ভিন্ন স্থানে থাকলে কুরবানীদাতার ঈদের নামায পড়া বা না পড়া ধর্তব্য নয়; বরং পশু যে এলাকায় আছে ওই এলাকায় ঈদের জামাত হয়ে গেলে পশু জবাই করা যাবে। -আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩১৮

কুরবানীর চামড়া বিক্রির অর্থ সাদকা করা

মাসআলা : ৬২. কুরবানীর চামড়া কুরবানীদাতা নিজেও ব্যবহার করতে পারবে। তবে কেউ যদি নিজে ব্যবহার না করে বিক্রি করে তবে বিক্রিলব্ধ মূল্য পুরোটা সদকা করা জরুরি। -আদ্দুররুল মুখতার, ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৫/৩০১

কুরবানীর চামড়া বিক্রির নিয়ত

মাসআলা : ৬৩. কুরবানীর পশুর চামড়া বিক্রি করলে মূল্য সদকা করে দেওয়ার নিয়তে বিক্রি করবে। সদকার নিয়ত না করে নিজের খরচের নিয়ত করা নাজায়েয ও গুনাহ। নিয়ত যা-ই হোক বিক্রিলব্ধ অর্থ পুরোটাই সদকা করে দেওয়া জরুরি। -ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৫/৩০১, কাযীখান ৩/৩৫৪

কুরবানীর শেষ সময়ে মুকীম হলে

মাসআলা : ৬৪. কুরবানীর সময়ের প্রথম দিকে মুসাফির থাকার পরে ৩য় দিন কুরবানীর সময় শেষ হওয়ার পূর্বে মুকীম হয়ে গেলে তার উপর কুরবানী ওয়াজিব হবে। পক্ষান্তরে প্রথম দিনে মুকীম ছিল অতপর তৃতীয় দিনে মুসাফির হয়ে গেছে তাহলেও তার উপর কুরবানী ওয়াজিব থাকবে না। অর্থাৎ সে কুরবানী না দিলে গুনাহগার হবে না। -বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৬, ফাতাওয়া খানিয়া ৩/৩৪৬, আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩১৯

কুরবানীর পশুতে ভিন্ন ইবাদতের নিয়তে শরীক হওয়া

মাসআলা : ৬৫. এক কুরবানীর পশুতে আকীকা, হজ্বের কুরবানীর নিয়ত করা যাবে। এতে প্রত্যেকের নিয়তকৃত ইবাদত আদায় হয়ে যাবে।-বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৯, রদ্দুল মুহতার ৬/৩২৬, আলমাবসূত সারাখছী ৪/১৪৪, আলইনায়া ৮/৪৩৫-৩৪৬, আলমুগনী ৫/৪৫৯

কুরবানীর গোশত দিয়ে খানা শুরু করা

মাসআলা : ৬৬. ঈদুল আযহার দিন সর্বপ্রথম নিজ কুরবানীর গোশত দিয়ে খানা শুরু করা সুন্নত। অর্থাৎ সকাল থেকে কিছু না খেয়ে প্রথমে কুরবানীর গোশত খাওয়া সুন্নত। এই সুন্নত শুধু ১০ যিলহজ্বের জন্য। ১১ বা ১২ তারিখের গোশত দিয়ে খানা শুরু করা সুন্নত নয়। -জামে তিরমিযী ১/১২০, শরহুল মুনয়া ৫৬৬, আদ্দুররুল মুখতার ২/১৭৬, আলবাহরুর রায়েক ২/১৬৩

কুরবানীর পশুর হাড় বিক্রি

মাসআলা : ৬৭. কুরবানীর মৌসুমে অনেক মহাজন কুরবানীর হাড় ক্রয় করে থাকে। টোকাইরা বাড়ি বাড়ি থেকে হাড় সংগ্রহ করে তাদের কাছে বিক্রি করে। এদের ক্রয়-বিক্রয় জায়েয। এতে কোনো অসুবিধা নেই। কিন্তু কোনো কুরবানীদাতার জন্য নিজ কুরবানীর কোনো কিছু এমনকি হাড়ও বিক্রি করা জায়েয হবে না। করলে মূল্য সদকা করে দিতে হবে। আর জেনে শুনে মহাজনদের জন্য এদের কাছ থেকে ক্রয় করাও বৈধ হবে না। -বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২৫, কাযীখান ৩/৩৫৪, ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৫/৩০১

রাতে কুরবানী করা

মাসআলা : ৬৮.  ১০ ও ১১ তারিখ দিবাগত রাতে কুরবানী করা জায়েয। তবে রাতে আলোস্বল্পতার দরুণ জবাইয়ে ত্রুটি হতে পারে বিধায় রাতে জবাই করা অনুত্তম। অবশ্য পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা থাকলে রাতে জবাই করতে কোনো অসুবিধা নেই। -ফাতাওয়া খানিয়া ৩/৩৪৫, আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩২০, ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৫/২৯৬, আহসানুল ফাতাওয়া ৭/৫১০

কাজের লোককে কুরবানীর গোশত খাওয়ানো

মাসআলা : ৬৯. কুরবানীর পশুর কোনো কিছু পারিশ্রমিক হিসাবে দেওয়া জায়েয নয়। গোশতও পারিশ্রমিক হিসেবে কাজের লোককে দেওয়া যাবে না। অবশ্য এ সময় ঘরের অন্যান্য সদস্যদের মতো কাজের লোকদেরকেও গোশত খাওয়ানো যাবে।-আহকামুল কুরআন জাস্সাস ৩/২৩৭, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২৪, আলবাহরুর রায়েক ৮/৩২৬, ইমদাদুল মুফতীন

জবাইকারীকে পারিশ্রমিক দেওয়া

মাসআলা : ৭০. কুরবানী পশু জবাই করে পারিশ্রমিক দেওয়া-নেওয়া জায়েয। তবে কুরবানীর পশুর কোনো কিছু পারিশ্রমিক হিসাবে দেওয়া যাবে না। -কিফায়াতুল মুফতী ৮/২৬৫

মোরগ কুরবানী করা

মাসআলা : ৭১. কোনো কোনো এলাকায় দরিদ্রদের মাঝে মোরগ কুরবানী করার প্রচলন আছে। এটি না জায়েয। কুরবানীর দিনে মোরগ জবাই করা নিষেধ নয়, তবে কুরবানীর নিয়তে করা যাবে না। -খুলাসাতুল ফাতাওয়া ৪/৩১৪, ফাতাওয়া বাযযাযিয়া ৬/২৯০, আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩১৩, ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৫/২০০

সৌজন্যে : মাসিক আল কাউসার

Share

জামিয়া রাহমানিয়ার ভর্তি কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন

আলহামদুলিল্লাহ! ১১/১০/৩৫ হিজরি শুক্রবারের ভর্তি কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে ১৪৩৫-৩৬ হিজরি শিক্ষাবর্ষের ভর্তিকার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়েছে। কওমি মাদরাসাগুলোতে প্রতিবছর শাওয়াল থেকে নতুন শিক্ষা বর্ষ শুরু হয়। সে মোতাবেক জামিয়া রাহমানিয়ার ভর্তি কার্যক্রম ৮ শাওয়াল থেকে শুরু হয়ে আজ ১১ শাওয়াল শুক্রবার সুন্দরভাবে সম্পন্ন হয়েছে।  এছাড়াও আগামি ১৩ শাওয়াল রবিবার সকাল ৯.০০ থেকে সিট প্রদান ও ১৪ শাওয়াল সোমবার কিতাব প্রদান ও ফ্রিখানার দরখাস্ত সংগ্রহ। ১৫ শাওয়াল মঙ্গলবার কানুন শোনানো এবং বুধবার বাদ ফজর সবক ইফতেতাহ ও এই দিন থেকে নিয়মিত সবক শুরু হবে ইনশাআল্লাহ।

Share

মোবাইলে এসএমএসের মাধ্যমে বেফাক পরীক্ষার ফলাফল যেভাবে জানা যাবে

যে কোনো মোবাইল থেকে এসএমএস করে ফলাফল পাওয়ার জন্য মোবাইলে ম্যাসেস অপশনে টাইপ করতে হবে befaq স্পেস First letter of class (মারহালার নামের ইংরেজি প্রথম অক্ষর যেমন- তাকমীলের T, ফযিলতের F, সানাবিয়ার S, মুতাওয়াসসিতাহর M, ইবতিদাইয়্যাহর I, হিফজুল কুরআন H, কিরাআতের Q স্পেস রোল নম্বর লিখে ৯৯৩৩ নম্বরে পাঠাতে হবে।

Share

ঝগড়া করে স্বামীকে বাপ বলার হুকুম

জিজ্ঞাসা : স্বামী-স্ত্রীর মাঝে ঝগড়া হয়ে স্বামী স্ত্রীকে প্রচণ্ড প্রহার করতে থাকে। স্ত্রী এক পর্যায়ে স্বামীকে বাপ বলে সম্বোধন করে। এতে শরয়ি কোনো সমস্য আছে কি না? তারা এখন একসঙ্গে ঘর সংসার করতে পারবে কি না?
মুহাম্মদ কামাল
মুহাম্মদপুর, ঢাকা

জবাব : প্রশ্নের বর্ণনা অনুযায়ী প্রশ্নোক্ত স্বামী-স্ত্রীর বৈবাহিক সম্পর্ক নষ্ট হয় নাই, বরং সম্পর্ক অটুট রয়েছে। সেমতে শরিয়তের দৃষ্টিতে তাদের ঘর সংসার করতে কোনো সমস্যা নেই।
স্মরণ রাখতে হবে স্ত্রীর জন্য স্বামীকে প্রশ্নে বর্ণিত এ জাতীয় কথা বলা সম্পূর্ণ শরিয়তবিরুধী, জঘন্য গুনাহ ও গর্হিত কাজ। এজন্য তাকে তওবা ইস্তিগফার করতে হবে এবং ভবিষ্যতে যেন এর পুনরাবৃত্তি না ঘটে সে ব্যাপারে সর্তক থাকতে হবে।
(ফাতওয়া শামি : ৩/৪৬৭, আল বাহরুর রায়েক : ৪/১৫৯)

Share

সেন্ট ব্যবহারের হুকুম ও জুতা পায়ে রেখে জানাযা নামাজ পড়ার হুকুম

জিজ্ঞাসা : সেন্ট যার মধ্যে সাধারণত এলকোহল মিশ্রিত করা হয়। তা ব্যবহার করা জায়েয কি না? এবং তা ব্যবহার করে নামাজ পড়া জায়েয হবে কি না? শরিয়তের দৃষ্টিতে এর হুকুম কী?
হাফেজ মাহমুদুল হাসান
ত্রিশাল, মোমেনশাহী
জবাব : বর্তমানে বাজারে যে সেন্ট পাওয়া যায় তাতে সাধারণত আঙ্গুর বা খেজুরের রস থেকে প্রস্তুত কৃত এলকোহল থাকে না; বরং বিভিন্ন শস্যদানা, গাছ-পালার খাল, পেটোল ইত্যাদি জিনিস থেকে প্রস্তুতকৃত এলকোহল মিশানো হয়, যা নাপাক নয়। সুতরাং তা ব্যবহার করা ও তা ব্যবহার করে নামাজ আদায় করা জায়েজ হবে।
(তাকমিলাতু ফাতহিল মুলহিম : ৩/৬০৮, বুহুস : ১/৩৪১)
জিজ্ঞাসা : আমরা সাধারণত দেখি যে, জুতা সেন্ডেল পায়ে দিয়ে নামাজ পড়া হয় না। তবে জানাজার নামাজের ক্ষেত্রে দেখা যায় যে অনেকেই জুতা সেন্ডেল পায়ে দিয়ে বা খুলে এর উপর দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করে থাকে। এখন প্রশ্ন হলো এমতাবস্থায় নামাজ হবে কিনা?
মুহাম্মদ আব্দুল করীম মোহাম্মদুপুর, ঢাকা

জবাব : জুতায় কোনো নাপাকি না থাকলে তা পায়ে দিয়ে কিংবা এর উপর পা রেখে জানাজার নামাজ পড়তে কোনে অসুবিধা নেই।
(আল বাহরুর রায়েক : ২/৩১৫, এমদাদুল আহকাম : ২/৪৪৬)

Share

ফেসবুক এপিঠ ওপিঠ

হাসনাইন হাফিজ

ফেসবুক একটি আধুনিক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। পৃথিবীর সবদেশেই ফেসবুক সমান জনপ্রিয়। ফেসবুকের জনপ্রিয়তার সবচেয়ে বড় কারণ- এর নানা ধরনের অ্যাপ্লিকেশনসÑ যা অন্য কোনো সামাজিক সাইটে একত্রে পাওয়া যায় না। ব্যবহারবিধিও অপেক্ষাকৃত সহজ ও শৈল্পিক। বর্তমানে এটি প্রাত্যহিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ, তারুণ্যের নতুন জানালা এবং স্বাধীন মত প্রকাশের একটি প্রযুক্তি মাধ্যম। একটি সৃজনশীল মুক্তচিন্তা বিকাশের যোগসূত্রও বটে। এ সৃজনশীলতার পাশাপাশি আবার অনেক নোংরামি, অশ্লীলতা, ভাষার বিকৃতি, অপপ্রচার, সময় ও মেধার অপপ্রয়োগসহ বিভিন্ন পোস্ট, স্ট্যাটাস, মন্তব্য, টুইট, অসংলগ্ন আলাপ, বিকৃত ভাষার ব্যবহার; ব্যাংক, অনলাইন মিডিয়ায় আইডি হ্যাকসহ বন্ধুদের দীর্ঘ তালিকা তরুণীদের মূল্যবোধকে সহজেই পরাস্ত করে প্রতারণার সুযোগ গ্রহণ করছে বুঝে না বুঝে অনেক ব্যবহারকারী।

ফেসবুকের শুরুর কথা
ফেসবুক পৃথিবীর জননন্দিত একটি নেটওয়ার্কিং ওয়েবসাইট। ২০০৪ সালের ৪ ফেব্র“য়ারিতে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ছোট্ট একটি রুমে ফেসবুকের কার্যক্রম শুরু হয়। সেখানকার শিক্ষার্র্থী মার্ক এলিয়ট জুকারবার্গ বন্ধুদের সঙ্গে মিলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডরমেটরিতে বসে নিজেদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের মধ্যে যোগাযোগ গড়ে তোলার জন্য একটি ওয়েবসাইট চালু করেন। তখন বিষয়টি কেবল ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্যই সীমিত ছিল। ইন্টারনেটভিত্তিক এই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমটি এত দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠে যে, চালু হওয়ার মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যেই হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্ধেকের বেশি ছাত্র-ছাত্রী এর সদস্য হয়। পরবর্তী কয়েক মাসের মধ্যে আশেপাশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যায়ের শিক্ষার্থীরাও সদস্য হতে শুরু করলে সদস্য সংখ্যা লাখ ছাড়িয়ে যায়। এরপর শুধুমাত্র আমেরিকায় বসবাসরত ব্যবহারকারীদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। ২০০৬ সালে উন্মুক্ত করে দেয়া হয় সারা বিশ্বের জন্য। এভাবেই ইতি-নেতির ভাবনার ডানায় ফেসবুক দশদিগন্তে উড়াল দিতে সমর্থ হয়েছে।

ফেসবুকের অগ্রযাত্রা ও জয়জয়কার
ফেসবুক ব্যবহার করে না এমন ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা এখন নেই বললেই চলে। এমনকি এখন যারা ইন্টারনেট দুনিয়ার নতুন সদস্য হচ্ছেন, তাদের সূচনাই হচ্ছে ফেসবুক রেজিস্ট্রেশনের মধ্য নিয়ে। নচেৎ মাত্র ২০০৪ সালের ফেব্র“য়ারিতে যাত্রা শুরু করে ২০০৫ সালের ডিসেম্বরেই এর গ্রাহক সংখ্যা ৫৫ লাখে দাঁড়াত না। ২০০৬ সালে কৌশলগত কারণে ফেসবুকের সঙ্গে মাইক্রোসফট সম্পর্ক স্থাপন করার মাধ্যমে সারাবিশ্বের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। ফলে এক লাফে গ্রাহকসংখ্যা দাঁড়ায় ১ কোটি ২০ লাখে। ২০০৭ সালে ভার্চুয়াল গিফট শপ চালুর সঙ্গে সঙ্গে গ্রাহক সংখ্যা ২ কোটি এবং মাত্র একবছর পর ২০০৮ সালে ফেসবুকে জনপ্রিয় ‘চ্যাট’ সেবা চালু হয়। এ বছরই ব্যবহারকারীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১০ কোটিতে। ২০০৯ সালে ফেসবুকে ‘লাইক’ সেবার পাশাপাশি এর গ্রাহক সংখ্যা উন্নীত হয় ১৫ কোটিতে। মাত্র এক বছর পর ২০১০ সালে ব্যবহারকারী দাঁড়ায় ৫০ কোটিতে। আর তাই প্রায় ৭০০ কোটি জনসংখ্যার এই বিশ্বে সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ নেটওয়ার্কর ওয়েবসাইট ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১০০ কোটির বেশি। এর মধ্যে প্রতিদিন ৬১ কোটি ৮০ লাখ ব্যবহারকারী দিনে অন্তত একবার ফেসবুকে লগইন করেন। মোবাইল ফোন থেকে প্রতিদিন লগইন করেন ১৫ কোটি ৭০ লাখ ব্যবহারকারী। বাংলাদেশে ৩০ লাখেরও বেশি ফেসবুক ব্যবহারকারী রয়েছেন। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৭০টিরও বেশি ভাষায় ফেসবুক ব্যবহার করা হচ্ছে। তার উপর ফেসবুকে প্রতিদিন যুক্ত হচ্ছে প্রায় দুই লাখ নতুন ব্যবহারকারী। সম্মিলিতভাবে ব্যবহারকারীরা প্রতিমাসে ফেসবুকে সময় কাটান ৭০ হাজার কোটি মিনিট। এই অবস্থা চলতে থাকলে পৃথিবীর সব মানুষ খুব শিগগিরই হয়তো যুক্ত হয়ে যাবে ফেসবুকের রাজত্বে।
মানুষের পরস্পরের সঙ্গে নানা বিষয়ে মতবিনিময় করার পাশাপাশি সমাজনীতি, রাজনীতির গণ্ডি পেরিয়ে এখন অর্থনীতির চূড়ায় আরোহন করার প্রস্তুতি নিচ্ছে পৃথিবীর সবচে বড় এই সোস্যাল মিডিয়াটি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা প্রকাশ্যেই এক সভায় বলেছিলেন, ফেসবুক আমেরিকার গর্ব। তিনি তার নির্বাচনী প্রচারণায়ও এর ব্যাপক ব্যবহারে উপকৃত হয়েছেন। এর আগে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন টাইম ম্যাগাজিন ২০১০ সালের জন্য বর্ষসেরা ব্যক্তিত্ব হিসেবে নির্বাচন করে জনপ্রিয় নেটওয়ার্কিং সাইট ফেসবুক প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী মার্ক এলিয়ট জুকারবার্গকে। ফেসবুকের বিপুল ব্যবহারের পাশাপাশি মানুষের জীবনে এবং বছরের ঘটনাপ্রবাহে এর প্রভাব বিবেচনা করে জুকারবার্গকে এ খেতাব দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় টাইম ম্যাগাজিন।

ফেসবুক নিয়ে ভবিষ্যত পরিকল্পনা
বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইট ফেসবুক ব্যবহারের ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন বয়সসীমা ১৩ বছর। সম্প্রতি বিবিসির এক খবরে জানা গেছে, ফেসবুক ব্যবহারকারীর জন্য আর কোনো নির্দিষ্ট বয়সসীমা থাকছে না। অর্থাৎ ১৩ বছরের কম বয়সী শিশু থেকে শুরু করে সবার জন্যই উন্মুক্ত হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে বিশ্বের বৃহত্তর নেটওয়ার্ক ফেসবুক। তবে এই কাজটি করতে তারা বিশেষ কিছু কাজ করছে। জানা গেছে, শিশুদের ফেসবুক প্রোফাইল তার মা-বাবার ফেসবুক প্রোফাইলের সঙ্গে যুক্ত করা হবে। ফলে মা-বাবা শিশুদের ফেসবুক তত্ত্বাবধান করতে পারবেন। ওয়ালস্ট্রিট জার্নাল এক খবরে জানিয়েছে, শিশুর ফেসবুক প্রোফাইলের লিংক যেন তার বাবা-মার ফেসবুক প্রোফাইলের সঙ্গে যুক্ত করা যায়, এমন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছেন ফেসবুক সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী মার্ক জুকারবার্গ। যদি বিষয়টি সত্যিই ঘটে তাহলে বিষয়টা এমন দাঁড়াবে যে, পৃথিবীতে একজন নতুন শিশু জন্মগ্রহণ করেই ফেসবুক রেজিস্ট্রেশন করবে। এতে একসঙ্গে জন্ম সার্টিফিকেটের বিষয়টিও নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি দেশের সকল জনসংখ্যার নানা তথ্যও পাওয়া যাবে খুব সহজেই। ইতোমধ্যে বিভিন্ন দেশের গোয়েন্দারা তাদের দেশের জনগণের ওপর নজরদারি করতে ফেসবুকের সহযোগিতাও নিচ্ছে বলে খবরে প্রকাশ।
এছাড়াও ২০১৩ সালে ফেসবুক গ্রাফ সার্চ চালুর ঘোষণা রয়েছে। চলতি বছরে ফেসবুকে ভিডিও বিজ্ঞাপন চালু হয়েছে। ফেসবুকের নিউজ ফিডে ব্যবহারকারী না চাইলেও দেখতেই হবে ১৫ সেকেন্ডের বাধ্যতামূলক বিজ্ঞাপন। এ রকম আরো অনেক নতুন সেবাই হয়তো আমরা দেখতে পাবো চলতি বছরে কিংবা অদূর ভবিষ্যতে।

ফেসবুকের নেতিবাচক দিক
পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও ফেসবুক-ভীতি তৈরি হয়েছে। মনে রাখতে হবে, ফেসবুক যতটা না সামাজিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে ব্যবহার হচ্ছে তারচেয়ে বেশি ব্যবহার হচ্ছে অশ্লীলতা চর্চার মাধ্যম হিসেবে। এতে করে অনেক পরিবার তাদের ছেলেমেয়েদের নেট ব্যবহারে নিরুৎসাহী দেখা যায়। তার পরেও সারাবিশ্বে ৫৬ লাখ শিশু তা ব্যবহার করছে। এদিকে বর্তমান যুগে অধিকাংশ মা-বাবাই তাদের সন্তানের ইন্টারনেট কার্যকলাপ নিয়ে চিন্তিত। সন্তানরা কি করছে সে বিষয়ে নজর রাখার জন্য প্রায় ৭২ শতাংশ অভিভাবকই তাদের টিনএজ ছেলেমেয়েদের সঙ্গে ফেসবুকে ‘বন্ধু’ হিসেবে যুক্ত আছেন। এদের মধ্যে প্রতি ১০ জনের ছয়জনই স্বীকার করেছেন, তারা তাদের সন্তানের অজান্তেই তাদের কার্যকলাপের ওপর নজরদারি করেন। এভিজির তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ২১ শতাংশ অভিভাবক তাদের সন্তানের ফেসবুক প্রোফাইলে অবমাননাকর বার্তা বা অ্যাবিউজিভ মেসেজ পেয়েছেন। এসবই কিন্তু নেতিবাচক সংকেত।
ইদানীং ফেসবুকে যে ভাষার আধিক্য দেখা যায়, তা অশ্লীলতাকেও হার মানায়। ফেসবুকে পরকীয়া সম্পর্কটি খুব সহজেই বেড়ে যাচ্ছে। এটা রীতিমতো ভয়ঙ্কর। যাকে বলা হয় ‘ফেসবুক অ্যাবিউস’। সেখানে নৈতিকতা ব্যাকরণে ধূলির আস্তরণ পড়ে অনৈতিক আর সস্তা শব্দ-সমন্ধ স্থান করে নিচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকা রুমানা মঞ্জুরকে তার স্বামী সাঈদ ফেসবুকের কারণেই মানসিক অশান্তিতে থেকে ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটিয়েছিল। রামুতে ঘটে যাওয়া ঘটনাটি ফেসবুকেরই উস্কানিতে সংঘটিত। আবার ফেসবুকের মাধ্যমে ভালোলাগা, ভালোবাসা, প্রেম, প্রেমের পর দেখা-সাক্ষাত, অতঃপর…। এখানে ‘অতঃপর’-এর পর এমনকিছু ঘটনা ঘটছে  যা খোলামেলা না বলাটা শালীনতার অন্তর্ভুক্ত।

ভিন্নধারার অনুসন্ধানী ওয়েবসাইট উইকিলিকসের প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যসেঞ্জ বলেছেন, ফেসবুক মানুষের ইতিহাসে গুপ্তচর বৃত্তির কাজে নিয়োজিত সবচেয়ে ঘৃণাব্যঞ্জক হাতিয়ার। যারাই নিজ বন্ধুদের নাম ও তাদের জীবনের নানা দিক বা বৈশিষ্ট্য সম্পর্কিত তথ্য এই চ্যানেলকে সরবরাহ করছেন তাদের জানা উচিত যে, তারা আসলে বিনা অর্থে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সেবায় নিয়োজিত রয়েছেন। অন্য কথায় ফেসবুক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর জন্য তথ্যের বিশাল এক ভাণ্ডার। মার্কিন গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলো তথ্যের এইসব ভাণ্ডার বা উৎস ব্যবহার করছে। তথ্য পাচারের অভিযোগ ছাড়াও অতিমাত্রায় ফেসবুক ব্যবহারের ফলে নানা ধরনের সামাজিক সমস্যাও দেখা দিচ্ছে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে।
খোদ যুক্তরাষ্ট্রের একদল আইনজীবী জানিয়েছেন, দেশটির শতকরা ২৫ ভাগ তালাকের ঘটনা বা মোট তালাকের এক পঞ্চমাংশের জন্য দায়ী ফেসবুক। বাংলাদেশেও ফেসবুক প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে প্রতারণার আওয়াজ আসছে চারিদিক থেকে। সম্প্রতি ব্যাংক জব্দ, আইডি হ্যাকসহ নানা ক্ষতিকর সাইড প্রত্যক্ষিত। ফেসবুক নিয়ে বিপাকে পড়েছেন দেশের স্বনামধন্য তারকা শিল্পী-অভিনেত্রীরা। কে বা কারা তাদের ছবি ব্যবহার করে ফেসবুকে একাধিক অ্যাকাউন্ট খুলে রেখেছে। শুধু তাই নয়, ওগুলোর বরাত দিয়ে অশ্লীলতার সয়লাব বয়ে দিচ্ছে। ফাসিয়ে দিচ্ছে ভদ্র মহাজনকেও। এমন ঘটনা খুব সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে আজ। অহিও স্টেট ইউনিভার্সিটির একদল গবেষক জানান, যারা নিয়মিত ফেসবুক ব্যবহার করে তারা পরীক্ষায় খারাপ করে। এটি ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীদের জন্য করা হলেও স্কুল-মাদরাসার জন্যও তা প্রযোজ্য। ওই সংস্থার একজন গবেষক আরিন বলেছেন, প্রতিটি প্রজন্মেই থাকে ধ্বংসাত্মক একটি কালযন্ত্র। বর্তমান সময়ে ফেসবুক নামে এসেছে সে ধ্বংসাত্মক যন্ত্রটি।

ফেসবুকের ইতিবাচক দিক
প্রত্যেকটি জিনিসই তৈরি হয় ইতিবাচক চিন্তা থেকে। ফেসবুকও সে চিন্তারই ফসল। কেউ যদি ফেসবুকের অপব্যবহার করে তবে সে-ই তার প্রায়শ্চিত্য করবে। তাছাড়া ফেসবুকে সবাই অশ্লীলতা, অপরের ইজ্জত হনন, অর্থনৈতিক ধ্বংস সাধন ও বন্ধুত্বের পরিচর্চাতেই ব্যস্ত নয়। ইদানীং ফেসবুকে একে অপরের সুখ-দুঃখ ভাগাভাগির পাশাপাশি শিল্প-সাহিত্য চর্চা, সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে নেয়া মহতী উদ্যোগও চলছে। ফেসবুকের হরেক স্ট্যাটাস আপডেটের মাধ্যমে নিজের প্রতি মুহূর্তের হাল জানিয়ে দিচ্ছে সবাইকে। কেবল কি তাই! যেই বন্ধু এই স্ট্যাটাসে লাইক কিংবা কমেন্ট করছেন তার বন্ধুদের টিকারে ভেসে উঠছে আপনার মনের কথা! ‘টিকার’ ফেসবুকের মোটামুটি নতুন সংযোজিত অংশ। অনেকেই সোশ্যাল অ্যাওয়ার্নেস কথা, সুসংবাদ, কোনোও দুর্লভ ছবি, গান, মজার কিংবা সাম্প্রতিক ঘটনা বন্ধুকে ট্যাগ করে দেয়া যায়, যা খুব সহজেই তার নজরে আসে এবং তার মতামত পাওয়া যায়। ইদানীং ফেসবুকের পাতায় পাতায় বাজারের দেখা মিলে, কাপড়, গহনা, আসবাব, বই নানা যন্ত্রপাতিসহ অন্যসব পণ্যের সমাহার ছাড়াও ঈদ, বিয়ে, সভা-সেমিনার, মাহফিল, দলীয় কর্মকাণ্ডসহ নানা দুর্লভ তথ্য পাওয়া যায়। যা এত সহজেই পাব বলে ধারণাও করা যেত না।
বিশ্বব্যাপী ফেসবুকের মতো মাধ্যমগুলোকে রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মসূচি বাস্তবায়নের হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহার করছেন। ফেসবুক-জাতীয় ওয়েবসাইটগুলোকে কল্যাণকর কাজেই বেশি ব্যবহার করা সম্ভব। যেমন, আরব বিশ্বে স্বৈরশাসন বিরোধী ইসলামি গণজাগরণে জনগণ ও বিশেষ করে যুবসমাজ ফেসবুকে প্রতিবাদ ছড়িয়ে দেয়ার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছে। এমনকি বৃটেনসহ ইউরোপের কোনো কোনো দেশেও সরকার-বিরোধী গণপ্রতিবাদ আন্দোলন সংগঠিত করতে ফেসবুক-এর মতো চ্যানেলগুলো ব্যবহৃত হয়েছে।
এ ফেসবুকে অনেক সৃজনশীল পোস্ট দেখে অভিভূত হতে হয়। কি অসাধারণ সংগ্রহ এবং আইডিয়া তাদের! মুহূর্তে যেন ফিরে যাই দুরন্ত শৈশব, কৈশোর ও যৌবনের অলিগলিতে। আমাদের বোধ এবং ভাবনার দরজায় যেন কড়া নাড়ে একেকটি ছবি। কখনও একটি ছোট্ট কথা অনেক কথার মালা হয়ে অনেক চেনা বিষয়কে নতুন করে চিনিয়ে দেয়। যেমন এক বন্ধু লেখেছিলেন, ‘মা তখনও কাঁদে যখন সন্তান খাবার খায় না। আবার মা তখনও কাঁদে যখন সন্তান খাবার দেয় না’। আরেকটি স্ট্যাটাস, ‘এক বছরে একটি গাছ আমাদের জন্য কত উপকার করে জানেন? শুনুন, ৭৫০ গ্যালন বৃষ্টির পানি শোষণ করে। ১০টি এয়ার কন্ডিশনারের সমপরিমাণ শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ করে। ৬০ পাউন্ডের বেশি ক্ষতিকারক গ্যাস বাতাস থেকে শুষে নেয়। এবার আপনিই ঠিক করুন কেন গাছ কাটবেন এবং কেন গাছ লাগাবেন না।’ এসব স্ট্যাটাস মানবিক মূল্যবোধ সৃষ্টিতে অতুলনীয়। আমাদের বোধের শেকড়ে নাড়া দেয়ার জন্য এমন পোস্ট মাইলফলক ভূমিকা রাখবে।

ভালো-মন্দের দোলাচলে ফেসবুক
আজকের সময়ে ফেসবুকে ভালো-মন্দ নিয়ে জানার আগ্রহ প্রায় সবার। তাই বিষয়টি আরো ভালো করে জানার জন্য বিভিন্ন শ্রেণির ফেসবুক ব্যবহারকারীর দ্বারস্ত হতে হয়েছে আমাকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্টবিজ্ঞানের ছাত্র আনোয়ার হোসেন সাগর বলেন, ফেসবুক বর্তমান সময়ে যাদুকরী একটি প্রযুক্তি। ফেসবুকের কল্যাণে আমাদের জীবন অনেক সহজ হয়ে গেছে। অবশ্য একটি শ্রেণি এর অপব্যবহারও করছে, তাতে আমাদের কিছু যায় আসে না। অনুরূপ বক্তব্য ইডেনের ফাইনাল ইয়ারের ছাত্রী নাসরিন সুলতানারও। তবে নাসরিন আরেকটু বাড়িয়ে বলে যে, যদি ফেসবুক নিয়ে কর্তৃপক্ষের আরেকটু সচেতন ও সতর্ক দৃষ্টি থাকত তবে অনেক ভালো হত। তিতুমীর সরকারী কলেজের মেথম্যাটিক্সের ছাত্র জাহাঙ্গীর আলম জানান, ফেসবুকের কল্যাণে লাভবান হওয়ার চেয়ে ক্ষতি হয়েছে বেশি। যে সময় ফেসবুক ছিল না, সে সময় আমরা ফেসবুকের ঘাটতিও উপলব্ধি করিনি। আজ ফেসবুকের কারণে বহুলাংশে মানুষ প্রতারণার আশ্রয় নিচ্ছে। অনেকে একাধিক অ্যাকাউন্ট খুলে একেকটিতে একেক রকম মুখোশ উন্মোচন করছে। কাওরান বাজারের ভেতরে একটি গোদামে ব্যবসায়ী আব্দুল হাশিমকে দেখলাম কম্পিউটারে ফেসবুক খুলে টিপাটিপি করতে। কেন ফেসবুক ব্যবহার করেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ব্যবসায়িক কাজে ফেসবুকের প্রয়োজন হয়। এই যেমন আমার দোকানের বিভিন্ন পণ্যের এ্যাড দিয়ে দিতে পারছি। আমাদের ঘরানার সবাই বিষয়টি উপলব্ধি করতে পারছে। অনেকেই ফেসবুকে দেখে এসে পণ্য চাচ্ছে। ফেসবুকে খারাপ কী আছে জানতে চাইলে তিনি সাফ বলে ফেললেন, একটা অপরাধ অবশ্য করি তাহলো, একাধিক অ্যাকাউন্ট খুলে বা বন্ধু-বান্ধবদের বলে নিজেদের পণ্যের বিজ্ঞাপনে ‘লাইক’ মেরে অনেক সময় ভূয়া জনপ্রিয়তা বাড়াতে হয়। এতে একটি বিজ্ঞাপন হয়ে যায়। এ ছাড়াও খারাপ আছে বলে শুনে থাকলেও ব্যবসায়িক চাপে সেদিকে নজর দেয়ার সময় থাকে না।  আমরা জানি, ফেসবুকে অনেক জরুরি খবর খুব স্বল্প সময়ে শেয়ার করা যায়। ফেসবুকের কল্যাণে ইসলামের বহু নিদর্শন তথা কুরআন-সুন্নাহ ও শরিয়তের মাসলা-মাসায়েল বিষয়ে প্রচার-প্রচারণা সহজ হয়। অনেকে নিজের প্রকাশিত বই বা অন্য যে কোনো পণ্যের খুব সহজেই বিজ্ঞাপন দিতে পারে। তবে মাঝে-মধ্যে কিছুসংখ্যক আননোন ফ্রেন্ডের কারণে কিছু বিপত্তিকর পোস্টের ঝামেলাও পোহাতে হয়।

Share

বিজয়ের রমজান শানিত হোক আমাদের প্রার্থনার ভাষা

মুহাম্মাদ যাইনুল আবেদিন

আজ রকমারি ইফতারির স্বাদে উৎসবমুখর আমাদের রমজান। ইফতারের বর্ণিল আয়োজন আর ঈদের চঞ্চল স্বপ্নের দাপাদাপিতে আমরা ভুলেই গেছি এই রমজান ছিল একদা মুষ্ঠিবদ্ধ বিজয়ের প্রতীক। দুর্দণ্ড অসম শক্তিকে প্রবল দুঃসাহসে পরাজিত করে একদা বুক টান করে দাঁড়িয়েছিল ‘সত্য’। আর সময়টা ছিল রমজান মাস।
হিজরি দ্বিতীয় বছর। হযরত রাসুল সা. সংবাদ পেলেন প্রতিপক্ষ মক্কাবাসি মেরুদণ্ড শক্তিশালী করতে বড় ধরনের একটি সম্মিলিত বাণিজ্যিক দল পাঠিয়েছে সিরিয়ায়। হযরত রাসুল সা. গোয়েন্দা মারফত জানতে পারলেন ৪০ সদস্যের এই ব্যবসায়ী টিম সফল বাণিজ্যের পর এখন মক্কায় ফেরার পথে। এও জানতে পারলেন তারা অর্থনৈতিকভাবে শক্তি সঞ্চয় করছে মুসলমানদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের যুদ্ধের প্রস্তুতি স্বরূপ। শত্র“র পায়ের তলে মাটি জমতে দেয়া কোনো বিচক্ষণ প্রতিপক্ষের কাজ নয়। শত্র“ পক্ষকে ঘায়েল করার সহজ পন্থা হলো তাদের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়া। হযরত রাসুল সা. সমরনীতির এই পরীক্ষিত পথেই এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। কিন্তু করুণাময় আল্লাহ দয়া করে বেঈমানদের কোমরের জায়গায় তাদের মাথাগুলো বিছিয়ে দিলেন। ফলে ব্যবসায়ীকাফেলা কৌশলে পালিয়ে গেলেও হাতের মুঠোয় এসে ধরা দেয় আবু জাহালের নেতৃত্বে মক্কার সব রাঘববোয়াল। সমকালীন সর্বোচ্চ সমরাস্ত্রে সজ্জিত প্রায় ১০০০ বাহিনীর প্রতিপক্ষের সামনে মাত্র ৩১৩ জন মুসলমান। শত্র“পক্ষের হাতে ২০০ ঘোড়া। আর মুসলমানদের হাতে মাত্র দুটি ঘোড়া, ৭০ টি উট। শত্র“পক্ষের সঙ্গে আছে সমরসঙ্গীত গায়িকা নটিনীর দল। আছে দামামা বাদক। এই অসম যুদ্ধে জয় হয় মুসলমানদের। কোরআনের ভাষায় আর বদর যুদ্ধে যখন তোমরা হীনবল ছিলে, আল্লাহ তোমাদের সাহায্য করেছিলেন। সুতরাং তোমরা আল্লাহকে ভয় করো। যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারো।’ (আল-ইমরান : ১২৩)

বিজয়ের এই শুভ সময়টি ছিল পবিত্র রমজানের সতের তারিখ। আমরা স্মরণ করতে পারি আল্লাহ তায়ালা রমজানুল মুবারকের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেছেন ‘রমজান মাস, যাতে মানুষের দিশারী এবং সতপথের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যাসত্যের পার্থক্যকারীরূপে কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে।’ (বাকারা : ১৮৫)
রমজানের রোজা ফরজ হয়েছে হিজরি ২য় সালে। এই মাসেরই শবেকদরে অবতীর্ণ হয়েছে পূর্ণ কোরআন। অবতীর্ণ হয়েছে সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারীরূপে। এবং শুধু যৌক্তিক ও বিশ্বাসিকভাবেই নয়, বাস্তবে সত্য ও মিথ্যার চূড়ান্ত পার্থক্য করে দেখিয়ে দিয়েছেন বদর ময়দানে। আমাদের ইতিহাসের এই শির উঁচু করা অধ্যায় নানা কারণে আজ স্ববিশেষ স্মরণীয়।
প্রথমত এই কারণে আজও আমরা পৃথিবীব্যাপী হতবল। আমাদের নিষ্পাপ শিশু, অসহায় নারী ও বৃদ্ধদের পবিত্র রক্তে প্রতিদিন মনের সুখে আলপনা আঁকছে বেঈমানরা। আর আবু জাহালদের মানসপুত্রেরা দিকে দিকে গাইছে সমরসঙ্গীত। জাতিসংঘের প্রশিক্ষিত কসাইবাহিনী অবিরাম বাজিয়ে চলেছে যুদ্ধের বন্য দামামা। জ্বলছে কাশ্মীর, সিরিয়া,্ আফগান, বসনিয়া, ইরাক আর প্রাণের ফিলিস্তিন। অভাগা মিয়ানমার তো জ্বলছেই। জ্বলছে মুসলিম ঐতিহ্যের দেশ মিশর। পুড়ে ছাই হয়েছে গাদ্দাফির লিবিয়া বেঈমানদের বিষ গণতন্ত্রের অনলে।
এই আগুনে প্রতিদিন ঢালা হচ্ছে নতুন ঘি। অনেক রক্ত দানের পর সেই ইরাকে মুসলমানরা একটু ঘুরে দাঁড়াবার চেষ্টা করছে, বীর সাদ্দামের ভূমি তিকরিতে স্বাধীনতার শ্লোগান শব্দময় হতে চলেছে, অমনি কসাই আমেরিকার রাজা ওবামা বাণী দিয়ে বলেছেন ইরাকি জনগণকে জঙ্গিদের হাত থেকে রক্ষা করতে এবং আঞ্চলিক ও মার্কিন স্বার্থে দেশটির সরকারী বাহিনীকে সাহায্য করা হবে। (আমাদের সময় : ২১ জুন’১৪)
শুধু সাহায্য করবে বলেই বসে থাকেনি এই কসাই সম্্রাট। পত্রিকার ভাষ্যÑ ‘ইরাকে আরও সেনা পাঠাল যুক্তরাষ্ট্র’। ইরাকে আরও তিনশতাধিক সেনা পাঠিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরাকে আগে পাঠানো সেনাদের মতো নতুনরাও রাজধানী বাগদাদে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস ও দেশটিতে অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বে থাকবে।
সুন্নি বিদ্রোহীদের হামলার পর দুই সপ্তাহ আগে ইরাকে পৌঁনে তিনশতাধিক সেনা পাঠিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। ইরাকি সেনাদের যুদ্ধ পরিকল্পনায় সহায়তা করতে তিন’শ সামরিক বিশেষজ্ঞ পাঠায় যুক্তরাষ্ট্র্। যাদের একটি অংশ এরই মধ্যে দেশটিতে পৌঁছে কাজ শুরু করে দিয়েছে। এ ছাড়াও জঙ্গিদের হামলা ঠেকাতে ও তাদের ওপর নজরদারী করতে অস্ত্রশজ্জিত ও গোয়েন্দাকাজে নিয়োজিত বেশ কিছু মার্কিন বিমান ও ড্রোন দেশটিতে কাজ করছে। (আমাদের সময় : ২ জুলাই’১৪)
কী মধুর বর্ণনা। স্বদেশে নির্যাতিত সুন্নি মুসলমানগণ যখনই স্বাধীনতার শ্লোগানে মুষ্ঠিবদ্ধ তখনই তারা হয়ে গেল জঙ্গি। আর বিদেশি বর্বর ড্রোনবাজরা এসেছে বাগদাদের স্বার্থ রক্ষা করতে সশস্ত্র বিমান নিয়ে। অধিকন্তু নির্লজ্জের মতো চলছে ‘মার্কিন স্বার্থ’ রক্ষার কথা। কথা হলো, যে বাগদাদের প্রতিষ্ঠাতা হযরত উমর, হযরত আলী যে বাগদাদের শাসক, যে ইরাকে আজও ঘুমিয়ে আছেন হযরত হুসাইন রাযি. এবং উম্মাহর শ্রেষ্ঠ ইমাম আবু হানিফা রহ.- সেখানে আবার বেঈমানদের স্বার্থ কী?
কথা কিন্তু এখানেই থেমে যায়নি। ইরাকের এই নতুন যুদ্ধে বেরিয়ে এসেছে গোপন বন্ধুত্বের তালিকা। পত্রিকায় খবর বেরিয়েছে ‘ইরাকে সুন্নি বিদ্রোহীদের রুখতে যুদ্ধবিমান সরবরাহ করছে ইরান। রাশিয়া থেকে যুদ্ধ বিমান ক্রয়ের কয়েকদিন পর ইরাকে ইরানের য্্ুদ্ধবিমান পৌঁছানোর শক্ত প্রমাণ পাওয়া গেছে। উল্লেখ্য, এর আগে ইরাকি শিয়া সরকারকে সাহায্য করতে যুদ্ধবিমান ও ড্রোন মোতায়েন করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এ থেকে বোঝা যায় ইরাকের শিয়াপন্থি সরকারকে রক্ষা করতে দুই বিরোধপূর্ণ দেশ- যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান এক সঙ্গে কাজ করছে’। (আমাদের সময় : ৩ জুলাই’১৪)
আমাদের দুঃসময় হলেও শিয়াদের প্রকৃত মুখ মুখোশ ভেঙে বেরিয়ে এসেছে। মুখে যতই তারা নিজেদের মুসলমান বলে দাবি করুক, তারা যে মুসলমানদের শত্র“Ñ যুক্তরাষ্ট্র খুব সরলভাবে তা প্রমাণ করে দিয়েছে।
এদিকে মিয়ানমারের মুসলমানরা তো প্রতিদিনই নির্যাতিত হচ্ছে। হচ্ছে আশ্রয় হারা। গতকালও (২.৭.১৪) মিয়ানমারের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মান্দালায় অবস্থিত মুসলিম দোকান ও মসজিদে হামলা চালিয়েছে কয়েক’শ বৌদ্ধ। ২০১২ সালের জুলাই থেকে শুরু হওয়া বৌদ্ধ-মুসলিমের এই দাঙ্গায় পত্রিকার ভাষ্যমতে ২০০ জনের বেশি নিহত হয়েছে। আর ঘর ছাড়া হয়েছে এক লাখ ৪০ হাজারেরও বেশি মুসলমান।
আমাদের পহেলা কেবলা অবরুদ্ধ। ফিলিস্তিন ইহুদি নির্যাতনের যেন প্রশিক্ষণ মঞ্চ। এইতো একদিন আগেও তিন ইসরায়েলি কিশোরের লাশকে কেন্দ্র করে ইসরায়েল ৩০ দফা বিমান হামলা করেছে ফিলিস্তিনের ওপর। কী ভয়াবহ কথা!
ইরান, আমেরিকা, ইসরায়েল, মিয়ানমারসহ সব বেঈমান যখন একজোট আমাদের বিরুদ্ধে; আমাদের শিশু, বৃদ্ধ নারীদের নিষ্পাপ রক্তে যখন প্রতিদিন তৃপ্ত হচ্ছে বেঈমান পিশাচদের খুনি আত্মা তখনই আমাদের দুয়ারে উপস্থিত রমজান-বিজয়ের মহানায়ক। আজ বিশ্বমুসলিমের সামনে এ এক মহা প্রশ্ন। কিভাবে গ্রহণ করবো আমরা এই বিজয়ের বার্তাবাহক মাসকে।
রমজান। যেখানে খুলে যায় প্রভুর রহমতের সব কপাঠ। ক্ষমা ও মুক্তির আশিষে ছেয়ে যায় আমাদের আকাশ। লাখ লাখ হাফেজের কণ্ঠনিঃসৃত তেলাওয়াত আল্লাহর আরশকে বেঁধে দেয় মাটির পাটাতনের সঙ্গে  যে পাটাতনে আমাদের বাস। আমরা যখন ক্লান্ত, ক্ষুধার্তপ্রাণে ইফতারের পসরা সাজিয়ে বসি দস্তরখানে, আরশ তখন মুখিয়ে থাকে আমাদের প্রার্থনা শোনার জন্যে। ইফতারের শুভ মুহূর্তে এবং রাতের নিশুতিপ্রহরে আমাদেরই চোখে পানিতে রচিত আমাদের ভবিষ্যত ইতিহাস। এই ইতিহাস রচিত হয় খোদার আরশে। পৃথিবীর কোনো শক্তি যা কোনোদিন মিটাতে পারে না।
আজ প্রতিটি মুসলমানকে ভাবতে হবে পৃথিবীর সব মুসলমান একই পরিবারভুক্ত। এও ভাবতে হবে আমার ঘরে আমি নিরাপদ। আমার সন্তান নিরাপদ। অথচ আমার ভাই ও তার সন্ত্রানরা শত্র“র অস্ত্রের মুখে। এই নিরাপত্তায় আমরা নিজেদেরকে নিরাপদ ভাবতে পারি না। ভাইকে শত্র“র যুদ্ধবিমান আর ড্রোনের নিচে রেখে শান্তিতে ঘুমোতে পারে যে পাষাণ সে কী করে দাবি করবে আমি মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সা. এর উম্মত। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না রমজানের সাধনা শুধু উপোস করা নয়; এতো ঈমানকে শানিয়ে নেয়ার মওসুম। বস্তুর শক্তিকে উজিয়ে মহান মালিকের শক্তিকে উপলব্ধি করার মাস। নিরস্ত্রগণ যখন আল্লাহনাম ভরসা করে সত্য প্রতিষ্ঠার আহ্বানে ঝাপিয়ে পড়ে আল্লাহ তখন আকাশ থেকে ফেরেশতা পাঠিয়ে সাহায্য করেন। এ কেবল বদর যুদ্ধের কথাই নয়; এই সত্য সর্বকালের। তাই আমাদের প্রার্থনার ভাষা হোক ব্যাপক ও দিগন্তস্পর্শী। আমাদের ঈমান হোক আসমানি সাহায্যে নির্ভর এবং বিশ্বের সকল মুসলিম মজলুমানের বিজয় প্রত্যাশায় আকুল। আমাদের মন ও সামর্থ্য ছড়িয়ে পড়–ক আমাদের মজলুম ভাইদের মুক্তি আন্দোলনে। আমাদের কান্নায় ফিলিস্তিনের শহিদ শিশুদের রক্ত জেগে ওঠুক রাতের গভীরে। আমাদের ইফতার ও জুমার মোনাজাতে ভাষা পাক মজলুম ইরাক, কাশ্মীর, মিয়ানমার ও রক্তাক্ত সিরিয়া। মজলুম মুসলমানের প্রতি আমাদের আহত হৃদয় শক্তিমান বন্ধুরূপে জেগে ওঠুক। ইরান, আমেরিকা, ইসরায়েল, মিয়ানমারে জালেমদের প্রতি আমাদের আত্মায় পুষিত ঘৃণা লাভাময় হোক প্রতিটি মজলুম জনপদে। বিজয়ের মাসে বিজয় লেখা হোক আমাদের মজলুমান ভাইদের নসীবে।

Share